কি_আবেশে (৩৪)
জেরিন_আক্তার
মেরাব মারুফুল খান আর ফাহমিদা খান তিনজনে আহনাফ মির্জার বাসায় যাবেন। ফাহমিদা খান মেরাবের মায়ের কথা আজ পর্যন্ত জানতো না। রাতে মারুফুল খান বলেছেন। ফাহমিদা খান বোনের এমন মৃত্যুর কথা শুনে সেই থেকে কেঁদেই যাচ্ছেন। এতদিন জানতো তার বোন সিঁড়ি থেকে পড়েই মারা গিয়েছে। তবে শেষে এসে জানলো তার বোনকে মারা হয়েছে।
ফাহমিদা খান ব্যাকসিটে বসে কাঁদছেন। পাশে থেকে মারুফুল খান শান্তনা দিচ্ছেন তবুও যেনো তিনি কিছুতেই শান্ত হতে পারছে না। মেরাব লুকিং গ্লাসে ফাহমিদা খানকে দেখছে। কিছু বলার মতো বা শান্তনা দেওয়ার মতো কথা গলা দিয়ে আসছে না। ভারী হয়ে আসছে কণ্ঠ। শান্তনা দিতে গেলেই প্রথমে মা ডাকটা মুখে আসে। মেরাব এতবছর পরে তাকে মা ডাকতে ইতস্ততবোধ করছে। তবুও মন মানছে না। মনে চাচ্ছে একটাবার মা ডাকতে। মেরাব মা ডাকতে গিয়েও থেমে গেলো। পেছনে ফিরে ভারী গলায় বলল,
“তুমি কেঁদো না। কাঁদলে কি এখন আমার মা ফিরে আসবে? তুমি আমার মায়ের জন্য দোয়া করে যাও!”
ফাহমিদা খান নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললেন,
“তুমি তোমার বাবা, সব জানতে তাহলে আমাকে বললে না কেনো? আমাকে পর ভাবো তাইনা?”
মেরাব সামনে তাকিয়ে মুখটা কালো করে ফেললো। মেরাব তাকেও নিজের মা-ইই মনে করতো। এখনও মনে করে। শুধু অজানা অভিমানে ডাকতে পারে না, কথা বলতে পারে না। কোনোদিনই পর ভাবেনি, আর না ভাববে।
ফাহমিদা খান মেরাবের দিকে তাকিয়ে মেরাবের ভাবমূর্তি বোঝার চেষ্টা করছেন। মেরাব গম্ভীর হয়ে আছে। তবে কি মেরাব তার বলা কথার জন্য কিছু মনে করলো। ফাহমিদা খান তখনই মেরাবকে ডেকে উঠলেন,
“মেরাব বাবা!”
মেরাব সামনে থেকেই উত্তর দিলো,
“হুম বলো!”
“তুমি আমার কথায় রাগ করেছো? আমি তোমায় ঐভাবে বলতে চাইনি। বলতে চেয়েছি তোমরা এতো বড় সত্যি জানার পরেও নিজেদের মধ্যে চেপে গেলে। আমাকে বললে কি এমন হতো। তোমাদের কষ্টটা কি আমার সাথে ভাগাভাগি করা যেতো না। আমি তো তোমার…………!”
ফাহমিদা খান কথাটা পূর্ণ করলেন না। মেরাব পেছনে ফিরলো। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো। আর বলল,
“তুমি আমার? কি বলতে চাইলে?”
ফাহমিদা খান যদি এখন বলেন আমি তোমার মায়ের মতোন বা মা হই তাহলে মেরাব রেগে যাবে। কারণ, মেরাব ছোটবেলা থেকে আর যাই হোক মায়ের সাথে কারো তুলনা সহ্য করতে পারে না। উন্মাদ হয়ে উঠে। সেই হিসেবে ফাহমিদা খান আজ পর্যন্ত মেরাবকে কখনও বলেনি যে আমি তোমার মা কিংবা মায়ের মতোন।
এদিকে মেরাবের ব্যাকুল মন ফাহমিদা খানের থেকে শুধু একবার শুনতে চায় যে,, আমিই তোমার মা। মেরাব সবার বেলায় রাগ করলেও ফাহমিদা খানের প্রতি তার রাগ আসে না। আর না কোনোদিন আসবে। একজন মা হারা সন্তানই জানে বেঁচে থাকতে হলে মায়ের কি ভূমিকা।
এই মুহূর্তে ফাহমিদা খান কথা ঘুরিয়ে বললেন,
“আরে কি বলোতো বাবা, বলতে চেয়েছি যে আমি তোমার..খারাপ তো চাই না। না কোনোদিন চাইবো। এরপরে থেকে তুমি আর তোমার বাবা প্লিজ আমার থেকে কিচ্ছু লুকিওনা।”
মেরাব গভীর শ্বাস ছেড়ে বলল,
“ঠিক আছে। লুকাবো না।”
এদিকে সবাই মেরাবের উপর সেই রকম ক্ষেপে আছে। মাহিন আর আসিফ ওকে আর স্নেহাকে গোসল করাতে চেয়েও পারছে না কারণ, মেরাব যে দিনে তিনবেলাই গোসল করে। তাকে গোসল করলেও কিচ্ছু লাভ হবে না। অন্য ফন্দি বের করতে হবে।
আসিফ ভাবুক গলায় সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমার মনে হয় এই মেরাবকে শায়েস্তা করা যাবে না। রাতে আমাদের যেভাবে পচালো ওকে না পচানো পর্যন্ত আমার শান্তি হচ্ছে না।”
মাহিন বলল,
“ঠিক বলেছো ভাই। তুমি যে আগুনে জ্বলছো আমরাও সেই আগুনেই জ্বলছি। এখন ওকে কি করা যায়?”
“সেটাই তো ভাবছি। কিন্তু পাচ্ছি না। মৌ তুমি কিছু ভেবে পেলে?”
“না।”
সাইদা বলল,
“তোমরা কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না। অযথা বসে বসে ভাবা। আর স্নেহাও আমাদের এভাবে বসে থাকতে দেখে নিশ্চই সন্দেহ করবে।”
মাহিন ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল,
“করুক তাতে আমাদের কি? আজকে কিছু একটা ঠিক না করে এখানে থেকে উঠবো না।”
সাইদা উঠে দাড়িয়ে বলল,
“দুই ঘণ্টা ধরে বসে ভাবছো কিছু করতে পেরেছো? আর না উঠলে থাকো! শুধু রুমে এসো, বের করে দিবো!”
মৌ ফিক করে হেসে দিলো। আসিফ চুপ করতে বলল। কিন্তু মৌ সে হাসি থামাতে পারছে না। মাহিন সাইদাকে বলে উঠলো,
“যাও যাও, আমিও যাবো না তোমার রুমে।”
সাইদা কোমরে হাত রেখে বলল,
“তাহলে থাকবে কোথায়?”
মাহিন দোপাটি দাঁত বের করে হেসে বলল,
“শশুরের সাথে।”
সাইদা চোখ গরম করে তাকিয়ে চলে গেলো। স্নেহা এইদিকেই আসছিলো। মাঝে সাইদাকে রেগে চলে যেতে দেখে বলল,
“আপু কি হয়েছে গো? এমন রেগে আছো কেনো?”
“কি আর বলবো, তোর দুলাভাই মেরাবকে পচাতে কু-বুদ্ধি বের করছে। সেখানে আমাকেও নিচ্ছে তাই আমি চলে এসেছি। দেখ রাতে যা হওয়ার হয়েছে। সেটা নিয়ে তোর দুলাভাই পাল্টা চাল চালবে। চালুক, দেখিস মেরাব আবার ওদের কি অবস্থা করে।”
কথাটা শুনে স্নেহা তাজ্জব বনে চলে গেলো।আগেই টের পেয়েছে ওরা বসে থাকার প্লেয়ার না। কিছু না কিছু করবেই। তাই হলো ওরা প্ল্যান করছে। ভাগ্গিস সাইদা আপু বলে দিয়েছে। স্নেহা কথাগুলো মনে মনে আওড়িয়ে সাইদাকে বলল,
“আপু দুলাভাইরা দেখো কিছুই করতে পারবে না। তুমি শুধু শুধু দুলাভাইয়ের সাথে রাগারাগি করছো।”
সাইদা কথা বলতে বলতে স্নেহা নিয়ে চলে গেলো।
দুপুরে মেরাব বাড়িতে এসে শাওয়ার নিয়ে নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে ছিলো। স্নেহাও ঘুমিয়ে ছিলো। মেরাবের পাশ থেকে সরেনি। বলা তো যায় না ওরা আবার কি করে ফেলে। মেরাবের ঘুম ভাঙলো। পাশে স্নেহাকে দেখে আরও জড়িয়ে ধরে শুলো। একহাতে ফোনটা নিয়ে স্ক্রল করতে লাগলো। মিনিট দশেক এভাবে যাওয়ার পরে স্নেহা নড়েচড়ে উঠে। চোখ পিটপিট করে খুলে মেরাবকে সজাগ দেখে বলে উঠলো,
“ঘুম ভেঙে গিয়েছে?”
“হুম।”
মেরাব ফোন পাশে রেখে বলল,
“তুমি না শপিংয়ে যেতে চেয়েছিলে আজ যাবে?”
“না।”
“কেনো?”
“বাসায় সবাইকে রেখে আমরা বের হবো কি করে? ওরা কি মনে করবে? বলবে না যে আমরা রয়েছি তার উপরে আবার ওরা শপিং করতে গিয়েছে।”
“হুম। তাতো মনে করবেই। এর থেকে চলো সবাই মিলে যাই?”
“তাও মন্দ নয়। ওদের বলে দেখেন।”
“ঠিক আছে।”
“আর শুনুন!”
“বলো?”
“আজকে না সাবধানে থাকবেন। দুলাভাইরা সবাই আপনার সাথে কিছু একটা করবে!”
“যা ইচ্ছে করুক। তুমি সাবধানে থাকো!”
“ঠিক আছে।”
ইফতারের পরে আবারও ওরা সবাই একসাথে হলো। সবাই ঠিক করেছে মেরাবকে অজ্ঞান করেই কিছু একটা করবে। অজ্ঞান করার জন্য একটা রাস্তা তো আছেই। কালকে সাদাফ যেভাবে মৌকে অজ্ঞান করে রেখেছিলো সেভাবেই করবে। স্নেহা নিচে কাজ করছে। মেরাব রুমে শুয়ে আছে। মাহিন, আসিফ, মৌ, সাদাফ চারজনে মেরাবের রুমের সামনে এলো। মাহিন সাদাফের কাছে সেন্সলেস হওয়ার স্প্রে চাইলো। সাদাফ বলল সেটা তার কাছে নেই। মেরাবের কাছে আছে। যা শুনে মাহিন রেগে গিয়ে বলল,
“আগে বলবে তো? এখন কি করবো?”
সাদাফ বলল,
“চেয়ে নিয়ে আসি মেরাব ভাইয়ের থেকে?”
আসিফ বলল,
“ওর কাছে চাইতে গেলে ও যদি জিজ্ঞাসা করে কি করবি, তখন কি বলবে?”
“আমি যা বলার বলবোনি আপনারা থাকুন আমি নিয়ে আসছি।”
সাদাফ রুমে ঢুকে গেলো। মেরাব বলল,
“কিরে কিছু বলবি?”
“হুম। আসলে ভাইয়া, কালকে যে মৌকে সেন্সলেস হওয়ার স্প্রে দিলে সেটা দাও না। একটু কাজ আছে।”
মেরাব কপালে ভাজ ফেলে বলে উঠলো,
“কাকে অজ্ঞান করবি?”
“মৌ! মৌকে।”
মেরাব কি যেনো ভেবে বলে উঠলো,
“দাড়া নিয়ে আসছি। ওয়াশরুমে রেখেছি।”
“ঠিক আছে।”
মেরাব ওয়াশরুমে গিয়ে সেই স্প্রেটা নিয়ে এসে সাদাফকে দিয়ে দিলো। স্প্রেটা দিয়ে বড়োজোর ঘন্টা খানিক সেন্সলেস করা যায়। সাদাফ খুশি মনে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। এরপরে সেটা মাহিনকে দিলো। মাহিন সাথে সাথে সবাইকে নিয়ে রুমে ঢুকলো। মেরাব বিছানায় মাত্রই বসেছে। ওদের দেখে বসতে বলল। মাহিন সামনে বসলো আর সবাই পেছনে। মাহিন কথা বলার মাঝে স্প্রেটা বের করে মেরাবের মুখে স্প্রে করে দেয়। মেরাব সেন্সলেস হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো।
মাহিন সাথে সাথে মৌকে কিছু একটা দিতে বলল। মৌ একটা লাল টকটকে লিপস্টিক বের করে দিলো। সেটা দিয়ে মাহিন মেরাবের সাদা শার্টে ছোঁপছোঁপ দাগ বানিয়ে দিলো, ঘাড়েও দিলো।যাতে বোঝা যায় স্নেহাই এগুলো করেছে। মাহিন শুধু এতটুকুতেই ক্ষান্ত হলো না। আসিফকে বলল,
“আসিফ, একটা বোতল নিয়ে এসো।”
“বোতল দিয়ে কি করবেন?”
“আরে বোঝো না যে, ওর গলায় দাগ বানাবো? রিলসে দেখো না বোতল দিয়ে সিঙ্গেলরা গলায় কামড়ের দাগ বানিয়ে স্টোরি লাগায়। সেটাই করবো।”
আসিফ বাকা হেসে বলল,
“বোতল দিয়ে করার কি আছে? আপনিই কামড় দিন!”
এ কথা শোনার সাথে সাথে মেরাব ধপ করে উঠে বসলো। মাহিনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
“শেষমেষ এই রোজা-রমজানের দিনে কামড়া-কামড়ি ছ্যাহ! দুলাভাই, আপনাকে আমি ভালো মনে করতাম আর এই ছিলো আপনার মনে? আপনি ছেলে হয়ে আমাকে কামড়াতে এসেছেন? আস্তাগফিরুল্লাহ! আল্লাহ উনাকে হেদায়েত দান করো!”
সবাই তাজ্জব বনে চলে গেলো। মেরাব না অজ্ঞান হয়ে ছিলো তাহলে উঠলো কেমন করে? কালকে তো মৌ অনেকক্ষণ অজ্ঞান ছিলো। তাহলে আজ মেরাব অজ্ঞান হলো না কেনো?
মেরাব বিছানায় থেকে নেমে যেতে যেতে বলল,
“ভাগ্গিস আমি ওয়াশরুমে গিয়ে স্প্রের ভিতরে পানি ভরে দিয়েছিলাম নাহলে তো বুঝতেই পারতাম না। আল্লাহ! তুমি সবাইকে মাফ করো।”
সবাই একে একে কেটে পড়লো রুমে থেকে। মাহিন মিনিট দুই একা বসে থেকে চলে গেলো।
মেরাব ওদের ভাব দেখে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। স্নেহা রুমে এসে মেরাবকে হাসতে দেখে বলল,
“এই হাসছেন কেনো? আর ওরা এভাবে চলে গেলো কেনো? এই আপনার এই অবস্থা কেনো? মনে হচ্ছে লিপস্টিকের দাগ? এই সত্যি করে বলুন তো কি হয়েছে এখানে?”
মেরাব স্নেহার কথা শুনেই মনে হলো হাপিয়ে উঠলো। একসাথে এতো প্রশ্ন কেউ করে? ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়ে স্নেহার কাছে এলো। স্নেহা রাগে বুদবুদ করছে। মেরাব শার্ট খুলে ফ্লোরে ছুড়ে মেরে স্নেহাকে নিয়ে বিছানায় দিকে এগোলো। স্নেহা বিছানায় পড়ে যেতেই মেরাব স্নেহার উপরে উঠে গেলো। স্নেহা দুহাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিতে নিলে মেরাব স্নেহার দুহাত বিছানার সাথে পিন করে নিলো। স্নেহার ঠোঁটে কয়েকটা চুমু দিয়ে বলল,
“আজকে গোসল করেই বের হবো।”
স্নেহা বলল,
“সবার সাথে আপনার মাথাটাই গিয়েছে। সরুন! এখনই দরজা লাগিয়ে দিলে কি মনে করবে?”
মেরাব বাকা হেসে বলল,
“তাহলে গভীর রাতে হ্যা! আর আজও ওরাও বিরক্ত করবে না। রিলাক্সএ বাসর হবে।”
স্নেহা লাজুক চোখে তাকিয়ে বলল,
“ঠিক আছে। যা বলবেন তাই হবে। এখন গোসল দিয়ে লিপস্টিকের দাগ উঠিয়ে আসুন।”
মেরাব উঠে বসে নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলল,
“না, আগে সবাইকে দেখিয়ে আসি। যে বউ চুমু দিয়েছে। কেমন হবে?”
চলবে….
পরবর্তী পর্বতে সিরিয়াস কিছু হবে। আর পরবর্তী পর্ব কালকে রাত আট টায় দিবো। ইনশাআল্লাহ। যারা যারা পড়বে অবশ্যই রিএক্ট দিবে।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। রেসপন্স করবেন!!!!!!
[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]
Share On:
TAGS: কি আবেশে, জেরিন আক্তার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কি আবেশে পর্ব ৩৩
-
কি আবেশে পর্ব ৩
-
কি আবেশে পর্ব ১৪
-
কি আবেশে পর্ব ১৫
-
কি আবেশে পর্ব ১৩
-
চোরাবালির পিছুটানে পর্ব ১
-
কি আবেশে পর্ব ১১
-
চোরাবালির পিছুটানে পর্ব ২
-
কি আবেশে পর্ব ৮
-
কি আবেশে পর্ব ১৬