কি_আবেশে (৩১)
জেরিন_আক্তার
মেরাব দূরে থাকতে বলেছে বলে স্নেহা মাথা নত করে কান্না করে দিলো। মেরাব স্নেহার কান্না দেখে কিছুটা কড়া গলায় বলল,
“আমি কান্না করার মতো কিছু বলিনি। চোখের পানি মুছো!”
স্নেহার কান্নার গতি আরও বেড়ে গেলো। মেরাব স্নেহার থুতনি ধরে মাথা সোজা করে বলল,
“কাঁদছো কেনো?”
স্নেহা নাক টেনে বলল,
“আপনি আমার সাথে এমন করছেন কেনো?”
“কেমন করেছি?”
“আমার সাথে ভালো করে কথা বলছেন না। আবার দূরে দূরে থাকছেন।”
মেরাব মুখে একটা ঠান্ডা হাসি দিয়ে বলল,
“এতে তো তোমার ভালোই লাগার কথা।”
স্নেহা আবারও নাক টেনে বলল,
“আমি বলেছি যে এতে আমার ভালো লাগছে?”
মেরাব উত্তর দিলো না। কাভার্ড খুলে টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করে ওয়াশরুমে চলে গেলো। স্নেহা বিছানায় বসে কাদতে লাগলো। এ কান্না যেনো থামছেই না। মেরাব ওয়াশরুম থেকে বের হলো স্নেহা বসা ঠেকে উঠে দাড়ালো। মেরাবের সামনে গিয়ে বিনা বাক্যে জড়িয়ে ধরলো। নাক টেনে অনুনয়ের সুরে বলে উঠলো,
“আমার ভুল হয়েছে। আমি আর আপনার থেকে দূরে যাবো না। আপনি যা বলবো তাই করবো।আপনি উঠতে বললে উঠবো আবার বসতে বললে বসবো। প্লিজ আর রাগ করে থাকবেন না।”
মেরাব অগোচরে মুচকি হাসলো। সাথে সাথে আবার গম্ভীর হয়ে গেলো। স্নেহা মাথা তুলে তাকিয়ে মেরাবের গালে হাত ছুঁইয়ে বলল,
“সত্যি বলছি আমি আর দূরে যাবো না। একটু তো হেসে কথা বলুন। আপনি রাগ করে আছেন বলে আমার কষ্ট হচ্ছে আপনি বুঝতে পারছেন না?”
মেরাব অনেক কষ্টে নিজের রাগ বজায় রেখেছিলো। কিন্তু এবার আর পারলো না। স্নেহার শেষের কথা শুনে হালকা হেসে স্নেহাকে নিজের বক্ষে জড়িয়ে নিলো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“আমি রাগ করে আছি বলে কষ্ট হয়েছে তোমার?”
“হুম। অনেক কষ্ট হয়েছে। সারাদিন একটু ডাকও দেননি। কথা বলেননি। সামনেও আসেননি।”
মেরাব স্নেহার অভিযোগে হেসে উঠে বলল,
“ওরা পাগলীরে! কত কষ্টে ছিলো। তাওতো দেখলাম না কল দিয়েছো একবার।”
একথা শুনতেই স্নেহা মেরাবের পিঠে চিমটি কেটে বলল,
“কে বলেছে কল দেইনি? ফোন চেক করুন।”
মেরাব জিভে কামড় দিয়ে বলল,
“সরি জান, ফোনে চার্জ ছিলো না।”
“বুঝেছি এখন নিচে চলুন, খাবেন।”
“তুমি এখনও খাওনি বুঝি!”
“হুম।”
“চলো তাহলে!”
পরদিন বেলা বারোটার দিকে মৌ একা, খান বাড়িতে ঢুকলো। ড্রইং রুমে পা রাখতেই ফাহমিদা খানের চোখে পড়লো মেয়ে এসেছে। তিনি ছুটে গেলেন মেয়ের সামনে। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
“অবশেষে এলি! এখন মনে পড়লো আমাদের।”
পরক্ষনে সাহারা খান আর স্নেহা এগিয়ে গেলো। সাহারা খান মৌয়ের সাথে আসিফকে না দেখে বললেন,
“কিরে মা, তু্ই একা এসেছিস? আসিফ কই, বাহিরে নাকি?”
মৌ গভীর শ্বাস ছেড়ে হেটে হেটে সোজা সোফায় এসে গা এলিয়ে দিয়ে বসলো। ফাহমিদা খান, সাহারা খান আর স্নেহা তিনজনেই কাছে এসে দাড়ালো। মৌ হিজাব খুলে গলায় ঝুলিয়ে রাখলো। স্নেহা ওর পাশে বসে বলল,
“কিরে আসিফকে সাথে নিয়ে আসতে পারিসনি?”
মৌ ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,
“কি আর বলবো, উনাকে হাজারবার বলেছি কিন্তু উনি আসতে রাজি হয়নি। শুধু বলে কাজের চাপ আছে যেতে পারবো না। তোমরা বলোতো আর কিভাবে বললে উনি আসবে।”
ফাহমিদা খান আর সাহারা খান দুজনে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন। দুজনেই এখন মারুফুল খানের সাথে কথা বলতে উপরে চলে গেলেন। কি একটা সমস্যায় পড়েছে। এই ছেলেকে বলতে বলতে সবাই হাপিয়ে উঠেছে তাও এই ছেলে আসার জন্য রাজিই হচ্ছে না।
স্নেহা মৌয়ের সাথে কথা বলে রুমে চলে এলো। মৌও মেরাবের সাথে দেখা করতে এলো। মেরাব শুয়ে মোবাইল স্ক্রল করছিলো। মৌ এসে মেরাবের পাশে বসলো। মেরাব তখনও খেয়াল করেনি যে মৌ ওর পাশে বসে আছে। পরক্ষনেই মেরাব ফোন থেকে চোখ সরিয়ে মৌকে দেখে বলল,
“কোথায় থেকে এই ফকিন্নি এসেছে রে!”
মৌ চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে বলল,
“চৌধুরী বাড়ি!”
মেরাব উঠে বসতে বসতে মুখ বেকিয়ে বলল,
“এহ, সারাজীবন খান বাড়ির খেয়ে-পড়ে দুইদিন ধরে অন্য বাড়ির ভাত খেয়ে এখন নিজেকে সেই বাড়ির দাবি করছে।”
মৌ রেগে গিয়ে বলল,
“কথা সেটা না। আমি এই বাড়ি থেকে যেতে চাইনি তোমরা আমাকে জোর করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছো।”
মেরাব ঠাট্টা করে বলল,
“ভালো করেছি। তোরা যেমন না আমাকে না জানিয়ে বিয়ে করেছিলি তার শাস্তি ছিলো এটা। আর ভাগ্য দেখ, সেই তো আমার বুদ্ধিতেই তোদের মেনে নিলো।”
মৌ মেরাবের হাত ধরে বলল,
“ভাইয়া এগুলো বাদ দাও! বলো কেমন আছো?”
মেরাব মৌকে আরও খেপাতে মুখ বেকিয়ে বলল,
“এতক্ষনে জিজ্ঞাসা করছিস কেমন আছি। তু্ই এতো চেঞ্জ হয়ে গিয়েছিস যে ভাইয়ের ভালো-মন্দই জিজ্ঞাসা করতে ভুলে যাস। নিশ্চই ওই আমার বন্ধুর পাল্লায় পড়ে। বলি ও কোথায় রে?”
“আসেনি!”
“কিহ আসেনি?”
“না।”
“কেনো? বলিসনি ভালো করে?”
“বলেছি তবুও আনতে পারলাম না।”
মেরাব মিনিট দুই ভেবে বলল,
“দাড়া আমি বাবার সাথে কথা বলে আসি। দরকার হলে আবারও যাবো।”
স্নেহা বলল,
“মামনি আর ছোট মামিমা অলরেডি বড় মামার সাথে কথা বলতে গিয়েছে।”
এই শুনে মেরাব বিছানায় থেকে নামলো। স্নেহা মৌয়ের পাশে বসলো। মৌয়ের দিকে তাকিয়ে কৌতূহল নিয়ে বলল,
“আসিফ আসতে চায় না কেনো? আর কেমন করে বলেছিস যে রাজিই হয়নি?”
“কেমন করে বলবো, ভালো করেই বলেছি। তবুও আসলো না।”
“কি বলেছিস বলতো আমায়!”
“বলেছি যে চলুন না আমাদের বাড়ি। সবাই যেতে বলছে।”
স্নেহা নাক-মুখ কুঁচকে বলল,
“এইভাবে বলে কেউ? একটু মায়া-মহব্বত করে বলতে পারিসনা।”
মেরাব স্নেহার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এহ, নিজেই মায়া-মহব্বত করে কথা বলতে পারে না আবার অন্যকে সাজেস্ট করছে।”
স্নেহা পাশ থেকে বালিশ নিয়ে মেরাবের দিকে ছুড়ে মারলো। মেরাব সেটাকে ক্যাচ করে সাথে সাথে স্নেহার দিকে ছুড়ে মারলো। স্নেহার মুখে এসে বালিশটা লাগলো। স্নেহা “ উফ ” সুচক শব্দ করে উঠে দাড়ালো। রাগে কটমট দৃষ্টিতে তাকালো মেরাবের দিকে। মেরাব সুন্দর একটা হাসি উপহার দিয়ে চলে গেলো। স্নেহা মৌয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সব তোর জন্য। তোকে ভালো কথা বলতে গিয়েছিলাম আর উনি আমাকে তেড়া কথা শুনিয়ে গেলো।”
“আপু, তেড়া কথা ছাড়ো। এখন বলো কি করা যায়!”
স্নেহা শান্ত হয়ে বসলো। এরপরে কি যেনো ভেবে মৌকে বলল আরেকটু পরে আসিফকে ফোন দিতে। আর ফোনে কথা বলার সময় ওকে যেনো ডাকে। মৌও সম্মতি জানালো। এই সময় আসিফ কল দিলো মৌকে। মৌ স্নেহাকে বলে উঠলো,
“আপু এই যে দেখো উনি ফোন দিয়েছে।”
স্নেহা বলল,
“ফোন ধরে আসিফকে বল, আমি আপনাকে মিস করছি। আপাতত এইটুকুই বল আর কিছুই বলতে হবে না।”
মৌ কাঁদো কাঁদো মুখ নিয়ে বলল,
“মিস করার কথা বলতে হবে?”
“হুম। বলতে হবে। কল ধর! না ধরলে মার খাবি।”
মৌ কল রিসিভ করলো। আসিফ বলল,
“মৌ কি করছো?”
“কিছুনা বসে আছি। আপনি কি করছেন?”
“বাড়িতে এলাম। আর তুমি যাওয়ার পরে কিছু বলেছে কি?”
“হুম।”
“কে কি বলেছে?”
“সবাই আমাকে না আপনাকে খুঁজছে। আমার সাথে আপনি আসেননি বলে সবাই বলছে আমি নাকি আপনাকে আসার জন্য বলিনি।”
আসিফ হেসে বলল,
“ঠিকই তো বলেছে। বলোনিই তো!”
“কি বললেন? আমি বলিনি?”
“না। বলোনি?”
“আপনাকে হাজার বার বলেছি কিন্তু আপনি রাজিই হননি।”
“কে বলেছে, মিথ্যে কথা বলছো কেনো? তুমি তো আমায় বলোনি। ওও এখন বাপের বাড়ি গিয়ে মিথ্যে বলে আমার বদনাম করছো। ভালো ভালো।”
মৌ হা হয়ে রইলো। এই মিথ্যেবাদী লোকটা কি বলছে এগুলো। মৌ দুদিন ধরে ওকে বলছে যাওয়ার জন্য। আর এই মিথ্যেবাদী বলছে তাকে নাকি বলাই হয়নি।
স্নেহা ফোনটা নিয়ে বলল,
“হ্যালো, ভাইয়া আমি স্নেহা বলছি। ভালো আছেন?”
“হুম ভাবি ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?”
“ভালো। তো আপনি এলেন না কেনো? মৌকে একা পাঠিয়ে দিলেন কেনো?”
“আর বইলেন না ভাবি ও সেভাবে বলেইনি যে আমাদের বাড়ি চলো। সবাই বললেও ও বলেনি তাহলে আমি যাই কি করে?”
মৌয়ের চোখদুটো বড় বড় হয়ে গেলো। স্নেহাও অবাক হয়ে মৌয়ের দিকে তাকালো। মৌ সাথে সাথে ফোনটা নিয়ে কল কেটে দিলো। আর বলল,
“আপু এই মিথ্যেবাদীর কথা বিশ্বাস করো না। আমি অনেক বার বলেছি কিন্তু উনি এখন মিথ্যে বলছে। আর আমি যে বলেছি সেটা স্বীকারই করছে না। উনি এমনই। সিরিয়াস সময়ে এসে না করে।”
স্নেহা বিড়বিড় করে বলল,
“দুই বন্ধু একই গোয়ালের গরু।”
সন্ধ্যার পরে,,স্নেহা আর ফাহমিদা খান মিলে রান্না করছেন। আজ রান্নাটা পরেই বসিয়েছেন। মেরাব সোফায় বসে ফোন নিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে থাকা স্নেহার ছবি তুলছে। স্নেহা টের পাচ্ছে না বলতে খেয়ালই করছে না। মেরাব একটা ছবি স্নেহার ফোনে সেন্ড করে দিলো। স্নেহা কাজের মাঝে সেদিকে তাকিয়ে একবার মেরাবের দিকে তাকালো। মজা করছে নাকি সামনে থেকে মেসেজ দিচ্ছে। স্নেহা ফোনটা হাতে নিয়ে আবার রেখে দিলো। মেরাব স্নেহা আরও একটা ছবি পাঠালো। সাথে মেসেজ দিলো—-
–বউ!
–বউ!
–বউজান!
–আমার সোনাপাখি!
–আমার গুলুমুলু!
–বউ!
স্নেহা মেসেজের নোটিফিকেশন দেখে মুখ ভেঙচি কেটে ফোন রেখে দিয়ে কাজে মনোযোগ দিলো। ফাহমিদা খান আড়চোখে মেরাব আর স্নেহাকে দেখলেন। দুজনের মাঝে যে কিছু একটা চলছে এটা তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন।
স্নেহা ভ্রু উঁচিয়ে মেরাবকে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো। মেরাব ফোন দিলো। স্নেহা ফোন সাইলেন্ট করে রাখলো। মেরাব আবার মেসেজ দিলো—
–এই বউ মেসেজ সিন্ করছো না কেনো?
—বউ!
—বউ!
—এই বউ!
স্নেহা রেগে গিয়ে ফোন হাতে নিয়েমেসেজ দিলো—
—কি বলুন!
মেরাব লিখলো—রুমে চলো!
—পারবোনা!
—কেনো পারবে না? চলো!
—পারবো না। আর মেসেজ দেবেন না। নাহলে খবর আছে।
মেরাব লিখলো—এতো কিছু জানিনা রুমে যাবে কি না?
—যাবো না।
মেরাব উঠে দাড়িয়ে ফোনটা পকেটে ভরে নিয়ে কিচেনের দিকে গেলো। ফাহমিদা খান তাকিয়ে রইলেন কিছু বললেন না। মেরাব স্নেহার সামনে গিয়ে দাড়িয়ে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ওকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে কিচেন থেকে বেরিয়ে গেলো। ফাহমিদা খান হা হয়ে তাকিয়ে রইলয়েন। স্নেহা নড়াচড়া করতে গিয়েও পারছে না। মেরাব ওকে আষ্টেপৃষ্টে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। মেরাব সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে স্নেহার কানে ফিসফিসিয়ে বলল,, “আজ আর ছাড়াছাড়ি নেই। একবারে ভোরে।”
চলবে….
বড় করে দিতে গিয়ে দেরি করে ফেললাম। রিচেক দেওয়া হয়নি। পরবর্তী পর্ব কালকে রাত আট টায় দিবো। ইনশাআল্লাহ। যারা যারা পড়বে অবশ্যই রিএক্ট দিবে।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। রেসপন্স করবেন!!!!!!
[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]
Share On:
TAGS: কি আবেশে, জেরিন আক্তার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কি আবেশে পর্ব ৫
-
কি আবেশে পর্ব ২২
-
কি আবেশে পর্ব ১৭
-
কি আবেশে পর্ব ৯
-
কি আবেশে পর্ব ২৬
-
কি আবেশে পর্ব ২৭
-
চোরাবালির পিছুটানে গল্পের লিংক
-
কি আবেশে পর্ব ১৩
-
কি আবেশে পর্ব ৬
-
কি আবেশে পর্ব ১২