কি_আবেশে (২৬)
জেরিন_আক্তার
পরক্ষনেই মেরাব চোখের ভুল ভেবে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। দরজা বন্ধ করে চলে এলো উপরে নিজের রুমে। স্নেহা ঘুমিয়ে আছে। মেরাব এসে স্নেহার পাশে বসলো। স্নেহার মুখপানে তাকিয়ে থেকে বলল,
“জানো আল্লাহর কাছে যা চেয়েছিলাম তাই পেয়েছি। তোমাকে সাত বছর আগে এই দিন থেকে ভালোবাসতে শুরু করেছিলাম। মন প্রাণ দিয়ে আল্লাহর কাছে চেয়ে গিয়েছি। অনেক করে চেয়েছি। পেয়েওছি। হালাল ভাবেই পেয়েছি। আগে দূরে থেকে ভয় হতো তোমাকে নিয়ে। সবসময় চিন্তা করতাম। ভাবতাম কবে দেশে গেলে তোমায় দেখতে পাবো। দেশে ফিরে এসে আপনাআপনিই তোমাকে পেয়ে গেলাম।”
স্নেহা তখন চোখ পিটপিট করে খুলে বলল,
“তার মানে সাত বছর ধরে ভালোবাসেন আমাকে?”
মেরাব হতবাক। তাহলে স্নেহা ঘুমিয়ে ছিলো না অভিনয় করলো তার সাথে। মেরাব এখন উঠে দাড়িয়ে না বোঝার ভান করে বলল,
“কিহ! কে কাকে সাত বছর ধরে ভালোবাসে?”
স্নেহা উঠে বসে হেসে বলল,
“আমি শুনে নিয়েছি!”
মেরাব মুখ বেকিয়ে বলল,
“বয়রা মানুষ কিছু শুনলেই কি আর না শুনলেই কি। সেই তো বলবে হাতি আকাশে উড়ে।”
স্নেহা বিছানায় থেকে নেমে মেরাবের সামনে এসে দাড়ালো। মেরাব ওয়াশরুমে যেতে নিলে স্নেহা মেরাবকে জড়িয়ে ধরলো। মেরাব স্নেহার পিঠের উপরে হাত রেখে বলল,
“চাদ কোনদিকে উঠেছে আজ?”
“যেদিক দিয়ে উঠার কথা, সেদিকেই উঠেছে।”
মেরাব স্নেহাকে ছেড়ে দিয়ে বলল,
“বসো, আমি শাওয়ার নিয়ে আসছি!”
স্নেহা পুনরায় বিছানার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,
“হুম, যান! আপনার তো আবার তিনবেলা শাওয়ার আর জামা না পাল্টালে পেটের ভাত হজম হয়না।”
“না হয়না। আমার জায়গায় থাকলে বুঝতে ঘামের স্মেল কেমন!”
“তাইতো আপনার জায়গায় নেই আমি। আমার ভাই, আপনার মতো বদভ্যাস হবেও না।”
মেরাব ওয়াশরুমের ঠিক সামনে দাড়িয়ে বলল,
“গরমের দিন আসছে। যদি তোমার থেকে ঘামের স্মেল পাই সোজা ঘর থেকে বের করে দিবো।”
স্নেহা ভেঙচি কেটে শুয়ে পড়লো।
এদিকে আসিফকে দেখে মৌ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
“আপনি এখানে কেনো এসেছেন? কেউ দেখে ফেললে কি হবে?”
“প্রথমত আমার ভয় হচ্ছে না কারণ তোমায় আমি ভালোবাসি। আর তোমার কাছে আসার অধিকার আছে। আর দ্বিতীয়ত তোমার কোনো খবরই পাচ্ছিলাম না তাই আসতে বাধ্য হলাম।”
“আপনি চলে যান, প্লিজ!”
“একটু থাকি না। চলেই তো যাবো।”
মৌ বিছানায় বসে পড়লো। ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এসেছে। আর চোখ দিয়ে তো পানি পড়ছেই।
আসিফ মৌয়ের কান্না দেখে কিছুটা নরম হলো। মৌয়ের দিকে এগিয়ে এসে হাটু গেরে নিচে বসলো। এরপরে মৌয়ের দিকে তাকিয়ে জড়ানো গলায় বলল,
“বিশ্বাস করো তোমায় আমি অনেক ভালোবাসি। সারাজীবন তোমাকে ভালো রাখবো। তুমি আমায় বিশ্বাস করতে পারো। তোমাকে কোনোদিন কষ্ট পেতে দিবো না।”
মৌ কোনো উত্তর দিলো না। শুধু তাকিয়ে রইলো। আসিফ আগের ন্যায় আবারও বলল,
“কি হলো কথা বলবে না? আর কালকে তোমায় নামিয়ে দিয়ে গেলাম এরপর থেকে ফোন বন্ধ করে রেখেছো কেনো? দুইটাদিনে তোমার কোনো খবর না পেয়ে জানো কতটা চিন্তায় ছিলাম। অজানা ভয়েরা তাড়া করে বেড়াচ্ছিলো।”
মৌ কিছুক্ষন অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। বিয়ের সময় আসিফকে অবিশ্বাস করেছিলো। এখন অবিশ্বাস করে থাকতে পারলো না। এই পর্যন্ত দেখে এইটুকু নিশ্চিত হলো, আসিফ সত্যিই ভালোবাসে। বিয়ে করেছে তাও ভালোবেসেই করেছে। তবে এইটা একদিন না একদিন সবাই জেনে যাবে। তখন কি জবাব দিবে বিশেষ করে তার আব্বুকে আর ভাইকে। কথাগুলো ভাবার সাথে সাথে মৌয়ের মনটা বিষিয়ে উঠলো। মৌ আকুতি সুরে আসিফকে বলল,
“আপনি প্লিজ বাড়ির সবাইকে প্রস্তাবের মাধ্যমে জানিয়ে দিন না।”
আসিফ গভীর শ্বাস ছেড়ে বোঝানোর সুরে বলল,
“প্রস্তাবের মাধ্যমে কি বলবো আমাকে বলো তুমি? তোমার বয়স কত? তুমি তো সবে আঠারোতে পা দিলে। আর আমার আটাশ প্লাস। যতই হোক তোমার বাবা কখনই তোমার থেকে দশ বছরের বড় কোনো ছেলের সাথে তোমার বিয়ে দিতে চাইবে না। আর আমারও তো বয়স কম না। তোমাকে বুঝতে হবে তো। তুমি অবুঝের মতো কথা বললে কি করবো এখন আমি।”
মৌ আসিফের কথা বুঝলো। এরপরে বলল,
“আমি বুঝতে পেরেছি আপনার কথা। এখন আপনি প্লিজ চলে যান না। আমি আপনার সাথে ফোনেই কথা বলবো। চলে যান আপনি। কেউ দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে।”
আসিফ উঠে দাড়িয়ে বলল,
“চলে যাবো। আর একটু থাকতে দিবে?”
মৌ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। কি বলবে মানুষটাকে কিচ্ছু জানে না। আসিফ মৌয়ের পাশে বসলো। মৌয়ের হাতের উপরে হাত রাখতেই মৌ সরে বসলো। আসিফ তবুও হাত রেখে বলল,
“ভয় পাচ্ছো। ভয় পেওনা আমি আর মিনিট-পাঁচেক থেকেই চলে যাবো।”
মৌ গোল গোল চোখে তাকিয়ে বলল,
“আপনার ভয় করলো না এখানে আসতে?”
“না। ভয় করবে কেনো? আমি তো খুন করতে আসিনি। যথেষ্ট রাইট আছে এখানে আসার।”
আসিফ আর দশ মিনিটের মতো থেকে খুব সাবধানের সাথে রুমের দরজা খুলে বের হলো। মৌ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলো। আসিফ ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে মেইন দরজার কাছে এলো। এদিকে মেরাবের কেমন একটা খুঁতখুঁত লাগছে। ওয়াশরুম থেকে টাওয়াল পড়ে বের হলো। শার্ট-ট্রাউজার হাতে নিয়েও আবার বিছানায় রেখে রুম থেকে বের হলো।
আসিফ দরজা বন্ধ দেখে আশ্চর্য হলো। একটু আগে তো দরজা খোলাই ছিলো এখনই আবার দরজা বন্ধ কেনো? কেউ জেগে আছে নাকি। আসিফ আশেপাশে তাকিয়ে চট করে দরজা খুলে চলে গেলো। এটা উপরে থেকে মেরাব স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে যে কোনো ছেলে চলে গেলো। মেরাব চোখ-মুখ শক্ত করে মৌয়ের রুমের দিকে গেলো। মৌ দরজা বন্ধ করবে এই সময় ভাইকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো।
মেরাব মৌয়ের সামনে দাড়িয়ে কর্কশ গলায় বলল,
“এতো রাতে কে এসেছিলো?”
মৌ কাঁপাকাঁপি শুরু করলো। কান্নাও করে দিলো। মেরাব ধমক দিয়ে বলল,
“কি হলো চুপ করে আছিস কেনো? বল!”
মৌ ভাঙা স্বরে বলল,
“ভা ভাইয়া ও ও আ আসলে….”
পেছনে থেকে মারুফুল খান এসে দাঁড়ালেন। মৌ তার বাবাকে দেখে দুই কদম পিছিয়ে গেলো। মারুফুল খান গম্ভীর গলায় বললেন,
“মেরাব সরো তো!”
মেরাব কোমরে হাত রেখে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে সরে দাড়ালো। মৌ কাঁদতে শুরু করলো। মারুফুল খান মৌয়ের সামনে দাড়িয়ে বললেন,
“আমি কিচ্ছু জানতে চাইবো না, শুধু বলো ছেলেটা কি এই ঘরেই এসেছিলো?”
মৌ নত হয়ে মাথা হালকা উপর-নিচে নামালো। এখন মৌয়ের সত্য বলা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তার বাবা আর ভাই আসিফকে বেরিয়ে যেতে দেখেছে। মিথ্যে বললেও কোনো লাভ হবে না।
মারুফুল খান মৌয়ের উত্তর শুনে বিছানায় গিয়ে বসলেন। হাত দুটো দুই পাশে রেখে মাথা নত করে রইলেন। কিছু বলার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছেননা। মেয়েকে কত বিশ্বাস করতেন। আর সেই মেয়েই কিনা।
মৌ কাঁদতে কাঁদতে তার বাবার কাছে গিয়ে পা ধরে বসলো। ভাঙা গলায় বলল,
“আব্বু, তুমি যা ভাবছো তা নয়। বিষয়টা হুট্ করে হয়ে গিয়েছে। আমি তোমার বিশ্বাস ভাঙতে চাইনি। আব্বু আব্বু তুমি প্লিজ আমার ভুল বুঝো না।”
মৌ কাঁদতে কাদতে কি বলছে নিজেও জানে না। মেরাব এগিয়ে এসে দাড়ালো। মারুফুল খান মেরাবের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বললেন,
“ওর কাছে থেকে ওই ছেলের নাম্বার নিয়ে কল দিয়ে আসতে বলো।”
মৌ ভয়ে উঠে দাড়ালো। মেরাবকে কিছু বলার আগেই মেরাব বলল,
“তোর ফোন কই? নিয়ে আয়!”
মৌ মেরাবের হাত ধরে আকুতি-মিনুতি করে বলল,
“ভা ভাইয়া এবারের মতো ক্ষমা করে দাও। আমি তোমাকে সব বলে দিবো।”
“ফোন নিয়ে আয়!”
মৌ সবশেষে ফোনটা নিয়ে এলো। মেরাব ফোনটা ছো মেরে নিয়ে বলল,
“কোন নাম্বার?”
মৌ হাতের আঙুল দিয়ে নাম্বার দেখিয়ে বলল,
“ওইটা!”
মেরাব কল দিতে গিয়েও থেমে গেলো। নাম্বারটা আসিফের। মেরাব মৌয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসু কণ্ঠে বলল,
“তু্ই শিওর এই নাম্বারই?”
“হুম।”
মেরাব ফোনটা মৌকে দিয়ে বলল,
“তু্ই কল দে!”
মৌ নিচু স্বরে বলল,
“ভাইয়া, কল নাই দিলাম। আমি তোমায় সব বলবো এবারের মতো ছেড়ে দাও না।”
মারুফুল খান গম্ভীর গলায় বললেন,
“মেরাব, তোমার বোনকে কল দিতে বলো!”
মৌ কয়েক কদম দূরে গিয়ে কল দিলো আসিফের নাম্বারে। আসিফ ধরলো। মৌ এপাশে থেকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল,
“আপনি কোথায়?”
“রাস্তায় রয়েছি। কেনো?”
“আ আব্বু আর ভাইয়া জেনে গিয়েছে। আপনি প্লিজ আসুন না।”
“তুমি কেঁদো না। আমি আসছি।”
মৌ কল কেটে দিয়ে এগিয়ে এলো। মারুফুল খান উঠে দাঁড়িয়ে ভারী গলায় বললেন,
“মেরাব তুমি জামা-কাপড় পড়ে ওকে নিচে নিয়ে এসো। আর সবাইকে ডাকো। এর একটা বিহিত আজই করবো।”
মেরাব রাগে হনহন করে নিজের রুমে চলে গেলো।
সবাই ড্রইং রুমে বসে আছে। মৌ একপাশে দাড়িয়ে কাদছে। মেরাব একপাশে বসে মাথার চুল খামচে ধরে নিচু হয়ে বসে আছে। বলতেও পারছে না ওর বন্ধুই এতো রাতে মৌয়ের ঘরে এসেছিলো।স্নেহা মেরাবের পিঠে হাত রেখে দাড়িয়ে আছে। ফাহমিদা খান ডাইনিং টেবিলে বসে কাঁদছেন। স্নেহা মেরাবকে ছেড়ে ফাহমিদা খানের পাশে এসে দাঁড়ালেন। মিনিট দশেক পরে আসিফ, খান বাড়ির ভিতরে ঢুকলো। মারুফুল খান আসিফকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন। কপাল কুঁচকে বললেন,
“আসিফ তুমি এখানে, এতো রাতে?”
আসিফ ভনিতা না করে স্বাভাবিকভাবেই বলল,
“মৌ ফোন করেছিলো। আমিই এসেছিলাম।”
মারুফুল খানের কাছে সব পানির মতো পরিষ্কার। তিনি ধপ করে বসলেন। সাদাফ তার পেছনে এসে দাড়ালো।
চলবে….
দুঃখিত আজ বেশি দেরি করে দেওয়ার জন্য। পরবর্তী কালকে রাত আট টায় দিবো। ইনশাআল্লাহ। যারা যারা পড়বে অবশ্যই রিএক্ট দিবে।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। রেসপন্স করবেন!!!!!!
[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]
Share On:
TAGS: কি আবেশে, জেরিন আক্তার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কি আবেশে পর্ব ১০(স্পেশাল পার্ট)
-
কি আবেশে পর্ব ৯
-
কি আবেশে পর্ব ৩
-
কি আবেশে পর্ব ১৯
-
কি আবেশে পর্ব ১১
-
কি আবেশে পর্ব ২৪
-
কি আবেশে পর্ব ২০
-
কি আবেশে পর্ব ১৩
-
কি আবেশে পর্ব ১৫
-
কি আবেশে পর্ব ১৬