Golpo romantic golpo কি আবেশে

কি আবেশে পর্ব ২০


কি_আবেশে (২০)

জেরিন_আক্তার

স্নেহা মেরাবের কথা শুনে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়েই চলে গেলো। বলতে গেলে লজ্জা পেয়েই গিয়েছে। মেরাব উঁবু হয়েই শুয়ে রইলো। স্নেহা ড্রইং রুমে এসে টুকটাকি কিছু কাজ করলো। এরপরে সোফায় এসে বসার পরে মনে হলো ওয়াশরুমে মেরাবের কিছু জামাকাপড় পড়ে আছে। সেগুলো ধুয়ে দিতে হবে। রহিমা আন্টি থাকলে সেই ধুয়ে দিতো সে না থাকার কারণে স্নেহাকেই ধুয়ে দিতে হবে।

স্নেহা চট করে উপরে চলে আসে। রুমে ঢুকে দেখে মেরাব শুয়ে আছে। সেদিকে কোনো কথা না বলে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকলো। কাপড় গুলো ধুয়ে রুমে এলো। ব্যালকনিতে মেলে দিবে। ব্যালকনি খোলার শব্দ পেয়েই মেরাব সেদিকে তাকায়। দেখতে পায় স্নেহা কোমরে কাপড় গুজে কাজ করছে। মেরাব উঠে বসে স্নেহাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল,

“ভালোই হয়েছে রহিমা আন্টি বাড়ি নেই। আর সে এলে তাকে বলবো যে আমার জামাকাপড় কাঁচার লোক পেয়ে গিয়েছি।”

স্নেহা শুনেও কিছু বলল না। শুধু সয়ে গেলো। সময় হলে এই লোকটাকে আচ্ছামতো দিবে। স্নেহা এই ভেবে পাচ্ছে না মেরাব কার মতো হয়েছে। না বাবার মতো হয়েছে, না তার মায়ের মতো হয়েছে। সে আলাদা এক মানব।। শুধু পায়ে পারা দিয়ে ঝগড়া করে। কথাগুলো মনে মনে বলতে বলতে স্নেহা নিজেই হেসে উঠলো।

মেরাব বিছানায় থেকে নামতে নামতে বলল,

“আমি জ্বালানোর জন্য কথাটা বললাম আর উনি হাসছে। পাগল-টাগল হয়ে গেলো নাকি!”

স্নেহা কাপড়গুলো মেলে দিয়ে রুমে এসে বিছানা গুছিয়ে রাখলো। মেরাব ফ্রেশ হয়ে রুমে পা রেখে বলল,

“স্নেহা, আমি কিন্তু তোমাকে এই দুটো দিন ধরে পড়াশোনা করতে দেখছি না।”

স্নেহা গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,

“পড়াশোনা করে কি হবে?”

“মানে?”

“পড়াশোনা নিয়ে আমার কোনো চিন্তা নেই।”

মেরাব কপাল কুঁচকে বলল,

“কেনো?”

স্নেহা উৎফুল্লতার সাথে বুক ফুলিয়ে বলল,

“আমার শশুর কলেজের প্রিন্সিপাল আর আমার জামাই ইংলিশ টিচার আমার পড়াশোনা করার কি দরকার বলুন!”

মেরাব এই মেয়ের কথা শুনে নিজেই কথা বলতে ভুলে গেলো। এদিক-ওদিক তাকিয়ে কিছু খুঁজতে খুঁজতে বলল,

“বলি রুমের ঝাড়ুটা কোথায়?”

স্নেহা উঠে দাড়িয়ে বলল,

“কেনো কি করবেন?”

মেরাব দাঁত চেপে বলল,

“বউ পেটাবো। লোকে কেনো যে বউ পেটায় আজ বুঝলাম।”

স্নেহা হেসে এগিয়ে এসে মেরাবের কাঁধে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,

“অমন করে বলছেন কেনো? আপনিই তো বলেন যে আমি আপনার দশটা না পাঁচটা না একটা মাত্র বউ। তাহলে বউয়ের জন্য এইটুকু না হয় করলেনই।”

মেরাব চট করে স্নেহাকে পাঁজা কোলে নিলো। আচমকা এমন হওয়ায় স্নেহা মেরাবের শার্ট খামচে ধরলো যাতে পড়ে না যায়।

“এই আ আপনি কোলে তুললেন কেনো নামান!”

মেরাব বিছানার মাঝে স্নেহাকে শুইয়ে দিয়ে বোঝানোর কণ্ঠে বলল,

“শোনো, তুমি আমার দশটা না পাঁচটা না একটা মাত্র বউ, তোমার জন্য নাহয় এইটুকু করলামই কিন্তু তার বিনিময়ে তুমি কি দিবে আমায়?”

স্নেহা আমতা আমতা করে বলল,

“ক..কি..দিবো?”

মেরাব স্নেহার ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে নেশালো কণ্ঠে বলল,

“দেওয়ার তো অনেক কিছুই আছে। শুধু তোমার ইচ্ছেটাই দরকার।”

স্নেহা চোখ বন্ধ করে নিলো। মেরাব স্নেহার ঠোঁটে ছোট্ট করে চুমু খেয়ে হেসে বলল,

“যাও কফি বানিয়ে নিয়ে এসো।”

স্নেহা সাথে সাথে উঠে বিছানায় থেকে নেমে ফোনটা নিয়ে চলে গেলো। মেরাব সেদিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে চিত হয়ে শুয়ে বিড়বিড় করে বলল,

“হাহ, বুঝতে পেরেছি বউজান তুমি এখনও প্রস্তুত নও। কি আর করার অপেক্ষা করতে হবে।”

স্নেহা কিচেনে ঢুকে কিছু রান্না করার সিদ্ধান্ত নিলো। কিন্তু কি রান্না করবে এই তো জানে না। ভাত, তরকারি কেমন করে রান্না করতে হয় তাও জানে না। কোনো উপায় না পেয়ে ফোন বের করে ইউটিউব অন করে। অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করার পরে তার মনে হলো খিচুড়ি রান্না করাই সহজ। আরও ঘাঁটাঘাঁটি করলো কিভাবে সহজ উপায়ে খিচুড়ি রান্না করা যায়।

স্নেহা চাল, ডাল বের করে হাঁড়িতে নিলো। ধুয়ে এনে ইউটিউবের ভিডিও দেখে এরপরে মসলাগুলো দিলো। লাস্টে পানি অ্যাড করলো। পানি মাপ ছাড়াই দিয়েছে।

মেরাব ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে ড্রইং রুমে আসে। স্নেহাকে কিচেনে দেখে আশ্চর্য হলো না। মনে করলো হয়তো কফি বানাচ্ছে। মেরাব স্নেহার দিকে তাকিয়ে ফোন বের করে খাবার অর্ডার করে বাহিরে বাগানের দিকে চলে গেলো।

স্নেহা গ্যাসের চুলায় হাঁড়ি উঠিয়ে গ্যাস অন করলো।

বিশ-পঁচিশ মিনিট পরে মেরাব এলো। স্নেহাকে কিচেনে রান্না করতে দেখে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,

“কি করছো?”

স্নেহা খুশি মনে উত্তর দিলো,

“এখানে আসুন, দেখুন আমি রান্না করছি।”

মেরাব ভ্রু উঠিয়ে বলল,

“বাব্বাহ, এতো চেঞ্জ! তো কি রান্না করছো?”

“খিচুড়ি!”

মেরাব অবাক হয়ে বলল,

“তুমি রান্না করতে জানো?”

“না, ইউটিউব দেখে প্রথম রান্না করছি।”

মেরাব মনে মনে ভেবেই নিলো, এই রান্নার মধ্যে গোলমাল কিছু হবেই।

মেরাব আগ্রহ দেখিয়ে বলল,

“আমাকে একটু দেখাবে?”

“এখন না। আপনি খাবার টেবিলে বসুন। হয়ে এসেছে প্রায়।”

মেরাব কথা বাড়ালো না। সোজা ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসলো। স্নেহা মিনিট দশেক পরে গ্যাস অফ করে একটা প্লেট নিয়ে এসে খিচুড়ি বেড়ে মেরাবের জন্য নিয়ে এলো। খুব খুশি হয়ে মেরাবের সামনে প্লেট এনে রাখলো। মেরাব প্লেটের দিকে তাকিয়ে তব্দা খেয়ে গেলো। এমন খিচুড়ি রান্না করেছে যে সাঁতার কাটা যাবে। মেরাব গালে হাত রেখে অবাক হওয়ার ভঙ্গিমায় বলে উঠলো,

“তুমি এতো সুন্দর রান্না পারো!”

স্নেহা হেসে বলল,

“খেয়ে দেখুন না কেমন হয়েছে?”

“কি করে খাবো?”

“কেনো হাত দিয়ে!”

“একটা চামচ দাও!”

স্নেহা হাত বাড়িয়ে একটা চামচ এগিয়ে দিলো। মেরাব চামচ হাতে নিয়ে খিচুড়ির দিকে তাকিয়ে খিলখিলিয়ে হাসতে থাকে। সেই হাসি আর থামাতে পারে না। মেরাবের হাসি দেখে স্নেহা তাজ্জব বনে চলে গেলো। মেরাব হাসতে হাসতে চামচ দিয়ে অল্প খিচুড়ি তুলে মুখে নিলো। সবই ঠিক আছে কিন্তু লবণ দেয়নি। মেরাব স্নেহাকে অল্প একটু খাইয়ে দেয়। স্নেহা নাক-মুখ কুঁচকে নিয়ে বলে উঠলো,

“ছ্যাহ! এটা খাওয়া যায় নাকি?”

মেরাব আবারও খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। স্নেহা গাল ফুলিয়ে বলল,

“আপনি থামবেন? তখন থেকে হেসেই যাচ্ছেন। এবার কিন্তু আমি সব টুকু খিচুড়ি আপনাকে দিয়েই খাওয়াবো।”

মেরাব হাসি থামাতে চেয়েও হাসতে থাকে। এরপরে স্নেহার দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমাকে বলতে! আমি না হয় হেল্প করতাম।”

“আমিই পারি না রান্না। আর আপনি কি হেল্প করবেন?”

“তবুও করতাম।”

স্নেহা কিচেনে যেতে যেতে বলল,

“আপনাকে দিয়ে রান্না! আপনি খোঁচাখুচি ছাড়া আর কি করতে পারেন!”

মেরাব মুখ বেকিয়ে বলল,

“তোমার ভাগ্য ভালো খোঁচাখুচি করি। অন্য স্বামীদের মতো এখনও কিচ্ছু করিনি।”

স্নেহা মুখ ভেঙচি দিয়ে বলল,

“এসব কথা রাখুন। এখন কি খাবো সেইটা ম্যানেজ করুন।”

মেরাব গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,

“কিচ্ছু ম্যানেজ করতে পারবো না। খিচুড়ি খাও!”

এর একটু পরে কলিং বেল বেজে উঠলো। মেরাব উঠে দরজার কাছে দাড়ালো। ডেলিভারি ম্যান এসে খাবারের পার্সেল দিয়ে চলে গেলো।

মেরাবের আগে খাওয়া শেষ হলো। হাত ধুয়ে সোফায় গিয়ে বসলো। ফোন বের করে তার বাবাকে কল দিলো।

“হ্যালো বাবা, কি করছো?”

“বুঝলে পুকুর পারে বসে ছিপ ফেলে মাছ ধরছি। কি যে ভালো লাগছে। তুমি না এসে বড্ড মিস করলে।”

“তোমরাই তো নিয়ে গেলে না।”

মারুফুল খান রাসভারী কণ্ঠে বললেন,

“নিয়ে আসিনি তবে ভালো লাগার জিনিস তো দিয়েই এসেছি। কি করছে স্নেহা?”

“খাচ্ছে।”

“ওহ। তুমি খেয়েছো?”

“হুম, মাত্র খেলাম।”

“এতো দেরিতে খেলে দুজনে।”

মেরাব স্নেহাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল,

“আর বলো না বাবা, তোমার বউমা রান্না করতে দেরি করেছে তাই খেতে দেরি হলো।”

মারুফুল খান ভাবুক গলায় বললেন,

“মেরাব সিরিয়াসলি!”

“হুম।”

“ভালোই তো!”

“তোমরা কালকে কখন আসবে বাবা?”

“বিকেলের দিকে।”

“আচ্ছা। ঠিক আছে।”

“তাহলে দেখেশুনে থেকো, স্নেহাকেও দেখে রেখো। আর সময়মতো খাবার অর্ডার করে নিও। আজ দেরি হয়েছে বলে এরপরে দেরি করো না।”

“হুম।”

“রাখছি!”

“ঠিক আছে। বাবা শোনো!”

মেরাব ইতস্তত নিয়ে বলল,

“তুমি কি ওইখানে একাই?”

“হুম। কেনো কিছু বলবে?”

“না, তাহলে থাকো!”

মেরাবের কথাটা জিজ্ঞাসা করার একটাই কারণ ফাহমিদা খানের সাথে একটু কথা বলতো। ইচ্ছে করে একবার মা ডাক দিয়ে কথা বলতে। কিন্তু ভিতরে থেকে কি থেকে যেনো আসে না। ইতস্তত লাগে।

এদিকে বলতে বলতে ফাহমিদা খান তখন মারুফুল খানের কাছে এসে বললেন,

“কে কল দিয়েছে?”

“মেরাব। কথা বলবে?”

“দাও!”

ফাহমিদা খান ফোন নিয়ে বললেন,

“মেরাব কেমন আছো বাবা!”

মেরাবের মুখের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো। সাথে সাথে বলল,

“ভালো, তুমি কেমন আছো?”

“ভালো। তোমার অসুবিধা হচ্ছে না তো ওইখানে? আর সমস্যা হওয়ারই কথা। রহিমাকে তো সাথেই নিয়ে এসেছি। আসলে তোমার বাবাই বলল যে রহিমাকেও সাথে নিতে।”

মেরাব নিঃশব্দে হাসলো। মানুষটা ঠিকই তার মায়ের মতোই। একটু সমস্যা হওয়ার আগেই উতলা হয়ে যায়। মেরাব হালকা হেসে তাকে বলল,

“সমস্যা নেই। আমাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। তুমি কোনো চিন্তা করো না।”

“ঠিক আছে। তোমরা দেখেশুনে থেকো। আমরা কালকেই চলে আসবো।”

“ঠিক আছে। সাবধানে এসো।”

হুম।”

মেরাব ফোন রেখে স্নেহাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“স্নেহা, বাড়ির সবাই চলে এলে তোমাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিবো।”

স্নেহা মেরাবের পাশে এসে দাড়িয়ে বলল,

“কেনো?”

“বিয়ে করবো!”

“কিহ!”

মেরাব স্নেহাকে পাশে বসিয়ে বলল,

“আমাদের তো বিয়ের কোনো অনুষ্ঠানই হয়নি। বাবা এসেই তাড়াতাড়ি সবকিছু করে ফেলবেন। আর তুমি কি এই বাড়িতেই থাকবে নাকি? এটা আবার কেমন দেখায়! তাই ভেবেছি তোমাকে তোমার বাড়ি থেকেই তুলে আনবো।”

“ওহ, বুঝতে পেরেছি। তবে আমার না একটা ইচ্ছে ছিলো।”

“কি?”

“প্রেম করে বিয়ে করার কিন্তু আপনি তো সেই সুযোগটাই দিলেন না। হুট্ করে বিয়ে করে নিয়ে এলেন।”

মেরাব হেসে বলল,

“এ তো মহাভুল করেছি। তাহলে একটা কাজ করো, আমাদের বিয়ের আগ পর্যন্ত প্রেম করে যাই। লোকে প্রেম করে বিয়ে করে আর আমরা নাহয় একটু ইউনিক ভাবেই করবো। বিয়ে করে প্রেম,, তারপর আবার বিয়ে করবো।”

দুজনে দুজনার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলো। মিনিট দুই পরে মেরাব ফোন বের করে আসিফকে মেসেজ দেয়।একটু পরে আহনাফ মির্জাকে দেখতে যাবে। সাথে স্নেহাকেও নিয়ে যাবে। ওকে একা রেখে যাবে না। সেখানে মেরাব গেলে আজ কোনো না কোনো কিছু জেনে আসতে পারবে। এউ জেনে আসবে কেনো আহনাফ মির্জা তার মাকে বাঁচালোনা আর তারা এভাবে লুকিয়েই আছে কেনো।

মেরাব আসিফকে মেসেজ দিয়ে ফোনটা টি-টেবিলে রেখে স্নেহাকে আদুরে কণ্ঠে ডাক দিলো,

“বউ!”

স্নেহা সাথে সাথে উত্তর দিলো,

“হুম, বলুন!”

চলবে….

পরবর্তী পর্ব কালকে ইফতারের পরেই দিবো ইনশাআল্লাহ। যারা যারা পড়বে অবশ্যই রিএক্ট দিবে। নেক্সট পার্ট একটু স্পেশাল হবে।

ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। রেসপন্স করবেন!!!!!!

[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply