Golpo romantic golpo কি আবেশে

কি আবেশে পর্ব ১৯


কি_আবেশে (১৯)

জেরিন_আক্তার

মেরাব স্নেহাকে মেসেজ দিয়ে উপরে উঠবে ঠিক তখন ডেলিভারি ম্যান কল দেয়। গেটের সামনে যেতে বলে মেরাবকে। মেরাব বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেটের সামনে এসে পার্সেল রিসিভ করে নিয়ে আসে। মেইন দরজা লক করে খাবারগুলো ডাইনিং টেবিলে রেখে উপরে চলে আসে। স্নেহা ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে, রুমে মেরাবকে দেখে বলল,

“রুমে এলেন কেনো? জানেন না এই রুমে পেত্নী থাকে?”

মেরাব কপাল চুলকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“পেত্নীই তো! ভুল কি বলেছি।”

স্নেহা বলল,

“কি বলছেন জোরে বলুন!”

মেরাব মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,

“জোরেই তো বলেছি তুমি মনে হয় শুনতে পাওনি?”

স্নেহা কোমরে হাত গুজে বলল,

“আপনি জোরেই বলেননি আর বলছেন আমি শুনিনি। এখন যদি বলেন বয়রা তাহলে আপনার খবর আছে।”

মেরাব এগিয়ে এসে বলল,

“কি করবে বলো বলো!”

“বেধে রাখবো।”

“রাখো। না করেছে কে?”

এই বলে মেরাব স্নেহার কোমরে হাত রেখে নিজের কাছে এনে বলল,

“কেমন করে বেধে রাখবে একটু যদি বলতে!”

স্নেহা ঝাড়ি মেরে বলল,

“সরুন তো”

মেরাব আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলল,

“সবসময় এতো দূরে দূরে সরিয়ে দিতে চাও কেনো? আমার স্পর্শ ভালো লাগে না বুঝি?”

স্নেহা মিনমিন করে বলল,

“আমি তা বলিনি!”

মেরাব স্নেহার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে নেশালো কণ্ঠে বলল,

“তাহলে সরে যেতে বলো কেনো? আমি বকি?না মারি? কোনোটাই তো করিনা। তাহলে আমাকে এমন দূরে সরিয়ে রাখো কেনো?”

মেরাবের এমন নেশালো কণ্ঠ শুনে স্নেহার ঠোঁট তিরতির করে কাঁপছে। চোখে পিটপিট করে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,

“ক কই দূরে সরিয়ে রাখি? এখনও তো কাছেই রয়েছেন।”

মেরাব স্নেহার ঠোঁটের দিকে অগ্রসর হতেই স্নেহা আসফাঁস করতে করতে বলল,

“ক কি করবেন এগোচ্ছেন কেনো?”

মেরাব নেশালো কণ্ঠে বলল,

“কেনো এগোচ্ছি বোঝোনা!”

স্নেহা নড়াচড়া শুরু করে বলল,

“দেখি সরুন।”

“নাহ!”

স্নেহা পট করে বলে উঠলো,

“আপনি তো ঘেমে গিয়েছেন, ফ্রেশ হবেন না।”

মেরাবের কানে কথাটা যেতেই সাথে সাথে স্নেহাকে ছেড়ে দেয়। নিজের শার্ট শুকে বলল,

“সিরিয়াসলি ঘেমে গিয়েছি?”

স্নেহা মাথা নাড়িয়ে বলল,

“হুম। ভালো করে দেখুন!”

বলেই স্নেহা সরে গেলো। মেরাব বেশ বুঝতে পারছে এটা তাকে দূরে সরানোর জন্যই বলেছে। মেরাব যে ঘাম সহ্য করতে পারে না সেটা স্নেহা এই কয়েকদিনেই বুঝে গিয়েছে। মেরাব স্নেহার দিকে তাকালো। স্নেহা দাঁত এলিয়ে হেসে রুম থেকে চলে গেলো।

মেরাব ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো। আর এদিকে মেরাবকে বোকা বানিয়ে স্নেহা খিলখিল করে হাসছে। মেরাবও তো কম না। এবার বোকা বনে গিয়েছে বলে কি পরেও যাবে! না, মেরাব স্নেহাকে এরপরের বার বোকা বানানোর কোনো চান্সই দিবে না।

মেরাব ফ্রেশ হয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে বের হয়। স্নেহা ড্রইং রুমে টিভি দেখছে। মেরাব আসতেই স্নেহা ডাইনিং টেবিলে গিয়ে খাবার বাড়তে থাকে। মেরাব খাবার টেবিলে বসলো। স্নেহা মেরাবকে খাবার বেড়ে দিয়ে টেবিলের শেষ মাথায় গিয়ে বসলো। কারণ মেরাবের কাছাকাছি বসলে মেরাব তার পায়ের উপরে পা দিয়ে রাখে।

মেরাব স্নেহার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল,

“ওইখানে বসলে কেনো?”

“এমনেই!”

“এখানে এসে বসো!”

“না।”

“কেনো?”

“আপনি পায়ের উপরে পা দিয়ে রাখেন বলে।”

মেরাব নাক-মুখ কুঁচকে বলে উঠলো,

“এইটা কোনো কারণ হলো?”

“হুম।”

“এখানে এসো!”

“না, যাবো না।”

“আসতে বলেছি!”

“আমি যাবো না।”

মেরাব খানিকটা নরম হয়ে বলে উঠলো,

“স্নেহা, এখানে এসো। আমি আর পা রাখবো না। এসো!”

স্নেহা ভাবে মেরাব হয়তো আর পা রাখবে না। তাই উঠে মেরাবের পাশের চেয়ারে গিয়ে বসলো। মেরাব নিজের মতো খাচ্ছিলো। স্নেহাও নিজের মতো করে খাচ্ছিলো। মিনিট দুই পরে মেরাব চট করে স্নেহার পায়ের উপরে পা রেখে নিজের আয়ত্তে নিয়ে নেয়। স্নেহা বলল,

“আপনি তো ভারী মিথ্যেবাদী!”

মেরাব গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,

“তাও ভালো। তোমার মতো বয়রা তো না!”

স্নেহা চোখ বড় বড় করে বলল,

“কি বললেন?”

মেরাব খাওয়া রেখে গড়গড় করে বলে উঠলো,

“এই দেখেছো, তুমি এখনও শুনতে পাওনি আমার কথা। আল্লাহ, কি বয়রা কপালে জুটালে। আমি এই বয়রাকে নিয়ে কোথায় যাবো। আমি কালকেই তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।”

স্নেহা কটমট দৃষ্টিতে তাকালো। মেরাব একটা হাসি দিয়ে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। স্নেহা রাগে কোনোরকম খেয়ে প্লেট নিয়ে কিচেনে চলে এলো। আর মেরাব খাওয়া শেষ করে উপরে চলে গেলো।

রাত দশটা মেরাব ব্যালকনিতে বসে আছে। স্নেহা রুমে শুয়ে শুয়ে ফোন চাপছিলো। অনেকক্ষণ হলো মেরাব রুমে নেই। স্নেহা আর শুয়ে থাকতে পারলো না। উঠে ব্যালকনিতে চলে এলো। মেরাব চেয়ারে বসে দুটো চুরি দেখছিলো। খুব মনোযোগ দিয়েই দেখছিলো। স্নেহা পাশে বসলো। মেরাব স্নেহার দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুমি উঠে এলে?”

“আপনি রুমে যাচ্ছিলেন না বলে এলাম।”

“ওহ।”

স্নেহা কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,

“এই চুরি কার? এতো মনোযোগ দিয়ে দেখছেন যে!”

মেরাব ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,

“আমার মায়ের চুরি এগুলো।”

“ওহ। খুব মনে পড়ে তাইনা?”

“হুম। খুব মনে পড়ে।”

স্নেহা মেরাবের হাতে হাত রেখে বলল,

“আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো, আমায় বলবেন?”

“কি কথা?”

“মামিমা কি করে মারা গেলো আমায় বলবেন? আমি জানতে চাই।”

মেরাব মিনিট দুই চুপচাপ থেকে বলল,

“আমি সেদিন আসিফের সাথে ক্রিকেট খেলা শেষ করে বাড়িতে ঢুকছিলাম। সেদিন আবার আসিফের সাথে ঝগড়া হয়েছিলো ও আমার দলে ছিলো না বলে। আমি রাগ করে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। মায়ের কাছে আসিফের মানে নালিশ করবো বলে। আমি বাড়িতে ঢুকবো তখন দেখি মেইন দরজা বন্ধ। এরপরে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়েছিলাম। ওইটাই ছিলো জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।”

স্নেহা কপালে ভাজ ফেলে বলল,

“মানে? ভুল বলছেন কেনো?”

মেরাব বলল,

“সেদিন যদি ওই জানালা দিয়ে উঁকি না দিতাম তাহলে মায়ের মৃত্যুটা দেখতে পেতাম না। জানালা দিয়ে দেখেছিলাম আমার মা ফ্লোরে পড়ে কাতরাচ্ছিলো। ওই আহনাফ মির্জা তখন দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখছিলো। চাইলেই মাকে তুলে নিয়ে বাঁচাতে পারতো। কিন্তু ওই কুত্তার বাচ্চায় হাসছিলো। সেই দৃশ্য আমার পেছনে দাড়িয়ে আসিফও দেখছিলো। পরে আমি গিয়ে কলিং বেল বাজাই, কত ডাকি, কিন্তু আমার কোনো শব্দই সেখানে পৌঁছায়নি। পেছনের দরজা দিয়ে ভিতরে যেতে যেতে আহনাফ মির্জা তখন সামনের দরজা খুলে চলে যায়। আমি মাকে গিয়ে ধরি, মা আমাকে শেষবার ডেকেছিল। এই কপালে হাত বুলিয়ে দিয়েছিলো। শেষবারের মতো একটা ডাক দিয়েছিলো। ইশ, সেই দৃশ্যগুলো আমার চোখের সামনে এখনও ভেসে উঠে। আমি সহ্য করতে পারিনা এখনও।”

কথাগুলো বলতে বলতে মেরাবের চোখ বেয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ছে। স্নেহাও নিজের কান্না আটকে রাখতে পারে না। কেঁদে দেয়। মেরাবকে দেখে কখনই বুঝতে পারেনি তার ভিতরেও এতো কষ্ট জমা আছে। আসলে, কিছু মানুষকে উপরে থেকে দেখলে বোঝা যায় না তারাও কষ্টে থাকতে পারে। তারা মুখে হাসি দিয়েও কষ্ট ভুলে থাকতে পারে।

মেরাব নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,

“বসো আমি আসছি!”

মেরাব উঠে রুমে চলে আসে। কাভার্ড খুলে একটা জুয়েলারি বক্স বের করলো। সেটা নিয়ে আবারও ব্যালকনিতে স্নেহার কাছে চলে এলো। স্নেহা জিজ্ঞাসু সুরে বলল,

“কি এটায়?”

“আমার মায়ের সব গহনা।”

মেরাব একে একে সব গহনা স্নেহাকে দেখায়। স্নেহা বলল,

“এগুলো তো মামার কাছে থাকার কথা। আপনি আপনার কাছে এনে রেখেছেন কেনো?”

“বাবার কাছেই ছিলো। বাবা যখন আন্টিকে বিয়ে করলো তখন এগুলো আমার কাছে এনে রেখেছি।”

এই শুনে স্নেহা বলল,

“তা না আনতেই পারেন। কিন্তু মামনি কে মা হিসেবে কেনো মেনে নেননা। উনিও অনেক কষ্টে আছে শুধু আপনার মুখ থেকে মা ডাক শোনার জন্য।”

“হুম, জানি।”

“তাহলে একটা ডাক দিতে আপনার কি সমস্যা!”

মেরাব শক্ত গলায় বলল,

“যেদিন আমার মায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ আমি নিজে নিতে পারবো সেদিনই উনাকে মা বলে ডাকবো। উনি আমার জন্য নিজের জীবনের কথা চিন্তা করেনি। উনি আমার জন্যই এই সংসারে এসেছে। আমি আর উনাকে কষ্টে রাখবো না, শুধু আর কয়েকটা দিন।”

কথাগুলো বলার পরে মেরাব হাতের গহনাগুলো স্নেহাকে দিয়ে বলল,

“এগুলো আজ থেকে তোমার দায়িত্বে। পারবে না এগুলো যত্নে রাখতে?”

স্নেহা ছলছল চোখে তাকিয়ে বলল,

“আপনি চিন্তা করবেন না। আপনি এগুলো যেভাবে যত্নে রেখেছেন ঠিক সেভাবেই আমি যত্নে রাখবো।”


দুজনেই কথা বলা শেষ করে রুমে চলে এলো। মেরাব আগে এসে শুয়ে পড়লো। স্নেহা তার বরাদ্দকৃত জায়গা মেরাবের কাছাকাছি এসে শুয়ে পড়লো। স্নেহা মেরাবকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আপনাকে একটা কথা বলবো?”

“বলো, শুনি!”

“বলছিলাম তখন কে আপনার ফোনে আমার ছবি দেখলাম সেটা কি করে পেলেন?”

মেরাব হেয়ালি করে বলল,

“তুমি কি একটা কথা নিয়ে পড়ে আছো? তোমার ছবি আমার ফোনে থাকতেই পারে এটা বুঝতেছো না কেনো?”

স্নেহা বিড়বিড় করে বলল,

“শুধু কথা ঘোরায়।”

মেরাব ধমক দিয়ে বলল,

“চুপচাপ ঘুমাও! আবার যদি কোনো প্রশ্ন করতে দেখি তাহলে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় থেকে ফেলে দিবো।”

স্নেহা চুপচাপ মেরাবের বুক ঘেঁষে শুলো। মেরাব মুখটিপে হাসলো।

সকালবেলা মেরাবের আগে স্নেহার ঘুম ভাঙে। আরমোড়া ভেঙে উঠে বিছানায় থেকে নেমে ওয়াশরুমে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে শুনতে পায় মেরাবের ফোন বাজছে। স্নেহা এগিয়ে গিয়ে মেরাবের বালিশের নিচে থেকে ফোন আনতেই মেরাব জেগে যায়। স্নেহা ফোনের স্ক্রিনে দেখতে পায় বাবা নাম। তার মানে মারুফুল খান কল দিয়েছে। স্নেহা ফোনটা মেরাবের দিকে এগিয়ে দেয়। মেরাব কল রিসিভ হয়ে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে উঠলো,

“হ্যালো, বাবা কেমন আছো?”

“ভালো। তোমরা কেমন আছো?”

“ভালো।”

“কি করছো উঠে গিয়েছো?”

“মাত্র তোমার ফোনে ঘুম ভাঙলো। এখনও উঠিনি। উঠবো।”

“ওহ।”

“তোমরা আসবে কবে বাবা?”

“কালকে।”

“ওহ, সবাই কেমন আছো?”

“ভালো। তাহলে আর কি বলবো। উঠে ফ্রেশ হয়ে নাও। পরে নাহয় কল দিবো।”

“ঠিক আছে।”

মেরাব ফোন রেখে উঁবু হয়ে শুলো। স্নেহা কাছে এসে বলল,

“বড় মামা কি বলল?”

মেরাব বাকা হেসে বলল,

“হানিমুনে যেতে বলল। যাবে?”

স্নেহা রুমের লাইট জ্বালিয়ে দরজা খুলতে খুলতে বলল,

“আপনাকে দূর থেকে দেখে ইনোসেন্ট ভেবেছিলাম কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আপনার থেকে অসভ্য লোক একটাও নেই।”

মেরাব গলা উঁচিয়ে বলল,

“সময় হলে বোঝাবো।”

স্নেহা দাঁড়িয়ে থেকে মেরাবের দিকে তাকিয়ে বলল,

“দুদিন পর থেকে রোজা, ভালো হয়ে যান!”

মেরাব মুখে এক চিলতে বাকা হাসি ফুটিয়ে বলে উঠলো,

“তাহলে এই দুইদিন একটু না হয় খারাপ হলাম।”

চলবে….

১৪০০+ শব্দ। এই পর্বটা কেমন হয়েছে কমেন্টে জানিও….
পরবর্তী পর্ব কালকে ইফতারের পরেই দিবো ইনশাআল্লাহ। যারা যারা পড়বে অবশ্যই রিএক্ট দিবে।

ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। রেসপন্স করবেন!!!!!!

[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply