Golpo romantic golpo কি আবেশে

কি আবেশে পর্ব ১৭


কি_আবেশে (১৭)

জেরিন_আক্তার

মেরাব নিজের পা স্নেহার পায়ের উপরে থেকে সরালো না। স্নেহা আসফাঁস করতে করতে বলল,

“কি করছেন পা সরান!”

মেরাব বাঁকা হেসে বলল,

“একটু রাখি না!”

স্নেহা বলল,

“আমার অস্বস্তি হচ্ছে।”

“হোক! সমস্যা কি? পরপুরুষ কি পা রেখেছে নাকি? আমিই তো!”

স্নেহা লজ্জায় মাথা নত করে খেতে শুরু করলো। তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে উঠে চলে গেলো কিচেনে। কিচেনে কিছু কাজ করে মেরাবের দিকে তাকিয়ে উপরে চলে গেলো। মেরাব স্নেহার যাওয়ার পানে তাকিয়ে নিজেই হেসে উঠলো। মেয়েটাকে জব্দ করার একটা উপায় পেয়েছে বলা যায়।

মেরাব খাওয়া শেষ করে উপরে চলে এলো। স্নেহা বিছানায় বসে মোবাইল স্ক্রল করছিলো। মেরাব স্নেহার সামনে গিয়ে বলল,

“বাড়ির সবাই কি গিয়েছে?”

“হুম।”

“রহিমা আন্টিও চলে গিয়েছে?”

“হুম। কেনো কিছু দরকার নাকি?”

“হুম।”

“কি দরকার বলুন। আমি করে দিচ্ছি!”

মেরাব বিছানায় উঠে শুয়ে পড়তে পড়তে বলল,

“এখন কোনো দরকার নেই। সময় হলে জানিয়ে দিবো।”

এই বলে মেরাব শুয়ে নিজেও মোবাইল বের করে স্ক্রল করতে শুরু করলো। স্নেহা থেকে থেকে মেরাবের দিকে তাকাচ্ছিলো। মেরাবও আড়চোখে সেটা লক্ষ করলো। এর কিছুক্ষন পরে স্নেহা বলে উঠলো,

“দুপুরে কি খাবেন?”

“তুমি রান্না করবে নাকি?”

“না।”

“তাহলে জিজ্ঞাসা করলে কেনো?”

“জানতে চেয়েছিলাম যে কি খাবেন!”

“রান্না তো পারো না। তাহলে জিজ্ঞাসা করে কি লাভ! আমি খাবার অর্ডার করে নিবো।”

স্নেহা মিনমিন করে বলল,

“তাহলে তো ভালোই হলো। রান্না করতে হলো না।”

এই শুনে মেরাব স্নেহার দিকে তাকিয়ে বলল,

“ও হ্যালো! আজ খাবার বাহিরে অর্ডার করছি বলে ভেবো না রোজ রোজ হবে। তাড়াতাড়ি রান্না শিখে ফেলবে।”

স্নেহা হেসে বলল,

“ঠিক আছে।”

স্নেহা বিছানায় থেকে নেমে ব্যালকনিতে চলে গেলো। আজ সকালে ফুল গাছগুলো সেভাবে দেখেনি। ফুল গাছগুলো দেখা শেষ করেই সেখানে থেকে একটা ফুল তুলে নিয়ে কানে গুজলো। এরপরে ছবি তুলার জন্য নিজের ফোন নিতে রুমে আসে। মেরাবের চোখ যায় স্নেহার দিকে। ফুল কানে গুজাতে স্নিগ্ধ লাগছে। স্নেহা মেরাবের দিকে তাকিয়ে ভ্রু উঠিয়ে বলল,

“ওভাবে কি দেখছেন?”

“তোমাকে?”

স্নেহা মুখ ভেঙচি কেটে ফোন নিয়ে চলে গেলো ব্যালকনিতে। মেরাবও চট করে উঠে ব্যালকনিতে চলে গেলো। ব্যালকনির দেয়ালে হেলান দিয়ে বুকে হাত গুজে স্নেহাকে বলল,

“আমার গাছের ফুল ছিঁড়ে ঢং করা হচ্ছে।”

স্নেহা এগিয়ে এসে বলল,

“কি বললেন?”

“কেনো কানে শুনতে পাও না নাকি? আমি সেই শুরুর দিন থেকেই বলছি তুমি বয়রা। দেখেছো সেটাই প্রমান হলো।”

স্নেহা রেগে গিয়ে বলল,

“আপনি বয়রা।”

মেরাব হাসি দিয়ে বলল,

“আমি স্পষ্ট কানে শুনতে পাই। এক কথা বারবার রিপিট করতে বলিনা।”

স্নেহা রেগে গাল ফুলিয়ে রুমে চলে এলো। বিছানায় বসে ছবিগুলো দেখতে লাগলো। মেরাব রুমে এসে গাড়ির চাবি নিয়ে বলল,

“তাহলে থাকো আমি একটু বাহিরে থেকে ঘুরে আসছি!”

স্নেহা যাওয়ার জন্য সম্মতি জানিয়ে দিবে ঠিক তখন মনে হলো মেরাব চলে গেলে সে তো একা পড়ে যাবে। আর বিশাল এই বাড়িতে সে একা একা থাকবে কি করে? যদি ভূত-পেত ধরে তখন!

মেরাব চলে যাবে ঠিক তখন স্নেহা বিছানায় থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মেরাবের হাত টেনে ধরে বলল,

“আপনি প্লিজ যাবেন না।”

“কেনো?”

“আমার ভীষণ ভয় করছে। এই এতো বড় বাড়িতে একা একা থাকবো কি করে?”

মেরাব স্নেহার মুখোমুখি হয়ে দাড়িয়ে বলল,

“কে বলেছে তুমি একা! তোমার সাথে একজন আছে তো!”

স্নেহা চোখ ছোট ছোট করে বলল,

“কে আছে?”

“কেনো ভূত!”

“কিহ? না প্লিজ যাবেন না আপনি। আপনি চলে গেলে যদি ভূতে ধরে আমাকে তখন?”

মেরাব নিজের হাত ছাড়িয়ে বলল,

“আরে কি ভয় পাচ্ছো, ছাড়ো! এই দিন-দুপুরে কি ভূত আসবে!”

“আপনি না বললেন ভূত আছে একটা।”

“ওইটা মজা করে বলেছি। ভূত বলতে কিছু নেই। হাত ছাড়ো।”

“না না, হাত ছাড়বো না। প্লিজ যাবেন না।”

“আরে যাবো আর আসবো। বেশি দেরি হবে না। হাত ছাড়ো!”

“না আমি যেতে দিবো না।”

এই বলে স্নেহা মেরাবকে টেনে বিছানায় বসালো। এরপরে চট করে রুমের দরজা লাগিয়ে দিয়ে মেরাবের কাছে এসে গাড়ির চাবিটা নিয়ে বলল,

“কোথাও যেতে হবে না।”

মেরাব আর কি করবে শুয়ে মোবাইল দেখতে লাগলো। স্নেহাও তার পাশে বসে মোবাইলে নাটক দেখা শুরু করলো। আধঘন্টা পরে আসিফের ফোন এলো। মেরাব ফোন রিসিভ করে কানে নিতেই ওপাশে থেকে আসিফ রাগী কণ্ঠে বলল,

“এই ভাই তু্ই কই রে? সেই কখন থেকে রেডি হয়ে দাঁড়িয়ে আছি তোর কোনো খবরই নেই! কোথায় তু্ই?”

“আমি বাড়িতে।”

“ তু্ই এখনও বাড়িতে? আসবি না নাকি?”

“আর বলিস না ভাই, বাড়ির সবাই চলে গিয়েছে গ্রামে। এখন আমি আর স্নেহাই বাড়িতে রয়েছি। এখন ও বের হতে দিচ্ছে না।”

“কেনো?”

“ভূতের ভয় পায়।”

আসিফ হাসতে হাসতে বলল,

“ভূত না ভাই, ও আসলে তোকে কাছে চায়!”

“হপ শালা, ফোন রাখ!”

“ভাই, সত্যি কথা বলছি।”

“তোর সত্যি কথা তোর কাছে রাখ!”

মেরাব কল কেটে দিয়ে ফোনটা পাশে রাখতেই স্নেহা বলল,

“কে ফোন দিয়েছিলো?”

“আসিফ!”

“ওহ।”

বিকেল বেলা,,, মেরাব ঘুমিয়ে ছিলো। স্নেহা কিচেনে এসে নিজের জন্য কফি বানাচ্ছিলো। এখন কফি খেতে খেতে টিভি দেখবে। কিন্তু একা একা থাকতেও তো ভয় লাগছে। মেরাবও ঘুমিয়ে আছে। ওকে ডাকলে এখন আরও রেগে যাবে। এমনেই সকাল থেকে বাহিরে বের হতে দেয়নি। আর এখন বললে নির্ঘাত মারবে। তাই কোনো উপায় না পেয়ে রুমে চলে এলো। ব্যালকনিতে বসে কফি খাচ্ছিলো আর কিছু কথা ভাবছিলো। স্নেহার মনে হচ্ছিলো যদি তার বাবার বিষয়টা মিথ্যে হতো। যেকোনো ভাবে অন্যদিকে ঘুরে যেতো ইশ কতই না ভালো হতো।

মেরাব ঘুমের মাঝে দুঃস্বপ্ন দেখে হুট্ করে জেগে উঠলো। চট করে বসে নিজের অবস্থান দেখলো। সাথে সাথে হাত বাড়িয়ে পানির গ্লাসটা নিয়ে সবটুকু পানি খেয়ে নিলো। গ্লাস রেখে মাথার চুলগুলো খামচে ধরে নিচু হয়ে রইলো। ঠিক তখন স্নেহা রুমে ঢুকে বলল,

“উঠে গিয়েছেন?”

মেরাব কিছু বলে না। বড় বড় শ্বাস ফেলে ঘামতে শুরু করলো। স্নেহা কাছে এসে বসে বলল,

“দুঃস্বপ্ন দেখেছেন নাকি?”

“হুম।”

“কি দেখেছেন?”

মেরাব থমথমে মুখে বলল,

“আমার মাকে। ওই যে ওই সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়েছে।”

বলেই মেরাব মাথার চুলগুলো খামচে ধরলো। বুকের মধ্যে মনে হচ্ছে কিছু ধারালো জিনিস দিয়ে আঘাত করছে। যা মেরাবের কাছে অসহনীয় লাগছে।

স্নেহা মেরাবকে ধরে বোঝানোর কণ্ঠে বলল,

“দেখি আমার দিকে তাকান! আপনি স্বপ্ন দেখেছেন বাস্তবে না তো। আর এই নিয়ে কষ্ট পাবেন না।”

মেরাব কিছুক্ষন চুপ থেকে বিছানায় থেকে নেমে ওয়াশরুমে চলে গেলো। শরীর ঘেমে যাওয়ার কারণে শাওয়ার নিলো। ঘামের স্মেল তার কাছে অসহ্য লাগে। শাওয়ার নিয়ে শুধু একটা টাওয়াল পড়ে বের হলো। স্নেহা বিছানা গুছিয়ে বসে আছে। মেরাব এগিয়ে গিয়ে কাভার্ড থেকে টিশার্ট আর ট্রাউজার বের করলো। স্নেহা রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। মেরাব আর ওয়াশরুমে গেলো না। রুমেই জামাকাপড় পড়ে নিলো। এরপরে রুম থেকে বের হয়ে গেলো স্নেহা কোথায় গিয়েছে সেটা দেখতে।

মেরাব ড্রইং রুমে পা রাখতেই স্নেহা তার হাত ধরে বাড়ির বাহিরে নিয়ে গেলো। এখন মেরাবের মন ভালো নেই বেশ বোঝা যাচ্ছে। যদি বাগানের দিকে হাটাহাটি করলে মনটা হালকা হয়। তাই স্নেহা মেরাবকে নিয়ে বাগানের দিকে গেলো।

মেরাব স্নেহার সাথে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

“বাড়িতে ফোন দিয়েছিলে আজ?”

“না।”

“কেনো?”

“এমনেই রাতে দিবো।”

“কেনো এখন দাও!”

“ফোন আনিনি। রুমে রয়েছে।”

“আমারটা নাও!”

“এখনই দিতে হবে?”

“হুম।”

স্নেহা চুপচাপ হাঁটতে লাগলো। মেরাব স্নেহার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

“স্নেহা এইটুকু সিওর হও তোমার বাবা বিয়ে করেনি। অন্য কোনো রহস্য আছে এইখানে।”

“ওই মহিলা কিছু বলেনি?”

“বলবে আজকে।”

“আপনি যাবেন?”

“হুম।”

“আমিও যাবো আপনার সাথে। নিয়ে যাবেন আমাকে?”

“ঠিক আছে নিয়ে যাবো। এখন কল দাও। তোমার মা কল দিয়েছিলো।”

“আম্মু কল দিয়ে কি বলেছে?”

“কি বলবে তোমাকে ফোনে পায়নি তাই বলল।”

“ফোনটা দিন।”

মেরাব ফোন বের করে স্নেহাকে দিলো। স্নেহা তার মায়ের নাম্বারে কল না দিয়ে বাবার নাম্বারে কল দিলো। কয়েকদিন হয় কথা হয়না তার সাথে।

সন্ধ্যার দিকে দুজনেই বের হলো ওই মহিলাটির সাথে দেখা করতে। মেরাব স্নেহাকে নিয়ে চলে গেলো সেই জায়গায় যেখানে মহিলাটিকে রেখেছে। আসিফ আগেই চলে এসেছে। মেরাব স্নেহাকে নিয়ে সেখানে ঢুকতেই মহিলাটি কেঁদে কেঁদে বলল,

“তুমি আমাকে ছেড়ে দাও। আমার হসপিটালে যাওয়াটা খুব দরকার।”

মেরাব ঠান্ডা গলায় বলল,

“কিসের দরকার সেটা বলুন আমি ছেড়ে দিচ্ছি।”

মহিলাটি নিশ্চুপ। মেরাব আয়েসি ভঙ্গিতে বসে বলল,

“কি হলো বলুন! হসপিটালে কেনো যাবেন সেটা বলুন আমি সাথে সাথে ছেড়ে দিচ্ছি। আমারও ভালো লাগছে না বিষয়টা ঝুলিয়ে রাখতে। হয় বলুন, না হয় এখানেই থাকুন।”

মহিলাটি আকুতি ভরা কণ্ঠে বলল,

“প্লিজ, বাবা আমাকে ছেড়ে দাও। এই জায়গায় যদি তোমার মা থাকতো তাহলে কি তুমি ছেড়ে দিতে না বলো!”

মেরাবের ঠান্ডা মস্তিষ্কে আবারও টগবগ করে আগুন জলে উঠলো। মাকে নিয়ে কোনো কিছু তুলনা করলে তার মাথা ঠিক থাকে না। মেরাব হাতের মুঠো শক্ত করে উঠে দাঁড়াতে নিলে স্নেহা তার কাঁধে হাত রেখে বসিয়ে রাখে। স্নেহা জানে এই কথাগুলো শুনলে মেরাব কতটা রেগে যায়। নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না।

মেরাব তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলল,

“আপনাকে আমি ফাস্ট এন্ড লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি। নিজের সাথে আমার মাকে তুলনা দিবেন না। আপনি ভুলে গেলেও আমি ভুলিনি আপনিই আমার মায়ের খুনি।”

মহিলাটি সরু চোখে তাকালো। কান্না থামিয়ে থমথমে মুখে বলল,

“কি বলছো তুমি? তোমার মায়ের খুনি আমি হবো কেনো?”

“খুন করেছেন আমার মাকে।”

“আমি তোমার মাকে খুন করবো কিভাবে? তোমাকে তো চিনিই না। আর তোমার মাকে কিভাবে চিনবো?”

মেরাব কর্কশ গলায় বলল,

“আমার মাকে চিনেন না? নাটক করছেন!”

“সত্যিই চিনি না তোমার মাকে।”

মেরাব দাঁত চেপে বলল,

“মারুফুল খানের ওয়াইফ তাহমিনা খান কে চিনেন না আপনি?”

নামটা শুনতেই মহিলাটি চুপ হয়ে গেলো। মাথা নুইয়ে ফেলল। মেরাব গর্জে উঠে বলল,

“কি হলো, এখন বলুন চিনেন না!”

“চিনি।”

এই শুনে মেরাব বাজখাই গলায় বলল,

“চিনেন তো বলুন! কেনো আমার মাকে মেরেছেন। না আগে এটা বলুন আফনান মির্জার সাথে আপনার কি সম্পর্ক? আজ আমি না জেনে এখানে থেকে এক পাও নড়বো না। আর আপনার কাছেও লাস্ট সুযোগ, আজকে সব বলে দেবেন। আজ যদি না বলেন তাহলে আমি মেরাব খান কথা দিচ্ছি আমি আপনাকে এখানেই আটকে রেখে চলে যাবো। আপনি আর আপনার মেয়ে এখানে থেকে পঁচে গেলেও আমার কিচ্ছু যায় আসবে না। নিজেকে বলতে পারবো আমার মায়ের খুনির শাস্তি আমি নিজেই দিয়েছি।”

চলবে….

যারা যারা গল্প পড়বে অবশ্যই রিএক্ট দিবে। পরবর্তী পর্ব কালকে দুপুরে দিবো ইনশাআল্লাহ।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। রেসপন্স করবেন!!!!!!

[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply