Golpo কাজরী

কাজরী পর্ব ৩২


কাজরী-৩২

সাবিকুননাহারনিপা

সন্ধ্যের আলো ফুটতেই চৌধুরী প্যালেস আলোকসজ্জায় সেজে উঠলো। আজ প্যালেসে ডিনার পার্টির এলাহি আয়োজন আছে। চৌধুরী প্যালেসে পার্টি মানেই আবারও কিছু নাটকীয় মুহুর্ত। পার্টির আয়োজক ইশান চৌধুরী। মিস্টার চৌধুরীর কাছের সব মানুষজন কে আমন্ত্রন জানিয়েছে। সেই সঙ্গে বাদ যায় নি নিজের বন্ধু বান্ধবরা। নামকরা শেফের হোটেল থেকে খাবার আসছে। প্রত্যেকের জন্য এসেছে দামী পোশাক। স্টাফরাও বাদ যায় নি।

কাজরীর জন্য দেশের নামী বুটিক থেকে শাড়ি এসেছে। এসেছে নামকরা রুপটান শিল্পীও। ইশানের ভোলচাল হঠাৎ করে পাল্টে যায় নি। আস্তে ধীরে সবকিছুর সঙ্গে অভ্যস্ত হচ্ছে। ক্ষমতা, প্রতিপত্তি হাতে পেলে মূর্খরা এক লহমায় নিজেকে পরিবর্তন করে ফেলে। আর বুদ্ধিমানরা আস্তেধীরে মানিয়ে নেয়। ইশান বুদ্ধিমানের কাতারে পড়েছে। সবকিছু নিজের হয়ে যাওয়ার পর উন্মাদ হয়ে যায় নি। সময় নিয়েছে, দেখছে, শুনছে সবকিছু বোঝার চেষ্টা করছে।

কাজরী এখনো তৈরী হয় নি দেখে ইশান খোঁজ নিতে এলো। ভীষণ ব্যস্ততা সামলেও আসতে হলো ও’কে। কাজরীকে সকালের ক্রপ টপ, জিন্সে দেখে ইশান প্রশ্ন করলো,

“আর ইউ ওকে? ডিনার পার্টিতে এটেন্ড করতে হবে কিন্তু। ডোন্ট মেক এক্সকিউজ। “

ঠান্ডা গলায় কথাগুলো বললেও সূক্ষ্ম খবরদারি আছে। কাজরী খেয়াল করলো না। শুকনো হাসি দিয়ে বলল,

“আজকের পার্টিতে কী হবে? “

“এনজয় আর খাওয়া দাওয়া। দ্যাটস ইট। “

“ক্ষমতা হাতের মুঠোয় আসার পর তুমি বদলে যাচ্ছ মনে হচ্ছে। “

ইশান ঠোঁট উল্টে বলল,

“ন্যাচারালি। “

কাজরী পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো ইশানের দিকে। অফ হোয়াইট আউটফিটে ও’কে অন্য সময়ের চেয়ে বেশী ম্যাচিউর ও হ্যান্ডসাম লাগছে। হেয়ার স্টাইলও চেঞ্জ হয়েছে। আগের স্টাইলে বোল্ড ব্যাপার টা ছিলো। আজকের স্টাইলে আত্মবিশ্বাসী, প্রখর দৃঢ় ব্যক্তিত্বের লাগছে। পোশাক অনেকটাই মানুষের পার্সোনালিটি প্রকাশ করে। ইশান মৃদু হেসে প্রশ্ন করলো,

“এম আই লুকিং ভেরি হ্যান্ডসাম?”

কাজরী চোখ সরিয়ে নিয়ে মৃদু হাসলো।

“তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো। আই এম ওয়েটিং ফর ইউ। “

“ইশান!”

ইশান থমকে দাঁড়ায়। জিজ্ঞাসু চোখে তাকায়। কাজরী প্রশ্ন করলো,

“আজ কী এমন কিছু হবার সম্ভাবনা আছে…..

ইশান প্রশ্নটা শেষ করতে দিলো না। বলল,

“না। এরপর প্যালেসে নাটক হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে তুমি আবার তাতে এখানে থাকার ইন্টেরেস্ট হারিয়ে ফেলতে পারো! “

ইশান চলে গেল। কাজরী গভীর চিন্তায় মগ্ন। নানান রকম নাটকীয় ঘটনা ওর জীবনে ভালোরকম প্রভাব পড়েছে। দূর্বল হওয়া, অস্থির হওয়া ব্যাপারগুলো আগে ছিলো না, এখন হচ্ছে। দরজায় মৃদু আওয়াজ। কাজরীর সাহায্যকারী শবনম এসেছে।

“ম্যাম, মেকাপ আর্টিস্ট কে এখন আসতে বলব? “

কাজরী প্রবল অনিচ্ছায় বলল,

“বলো। “


অনামিকা ওর বাবা, মা’কে নিয়ে প্যালেসে এসে পৌছেছে সপ্তাহ খানিক হলো। যে আন্তরিকতা শিরিন চৌধুরী আগে ওদের দেখিয়েছিলেন সেটা এখানে আসার পর দেখান নি। প্যালেসের গেস্ট রুমে ওদের থাকতে দেয়া হয়েছে। যেটা নিয়ে অনামিকার প্রচন্ড মন খারাপ হয়ে যায়। কারণ গেস্ট রুমগুলো মূল প্যালেসের ভেতরের দিকে। ও চেয়েছিল দোতলার সুন্দর ঘরগুলোর কোনো একটায় থাকবে। সময়ে, অসময়ে নিশানকে নিয়ে কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করবে পুলসাইডে। অনামিকা প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে ওর মা’কে প্রশ্ন করেছে,

“আম্মু কী হয়েছে এক্সাক্টলি? নিশান আমার সঙ্গে কথা বলছে না ঠিক করে। ফোনকলে পোলাইটলি কথা বললেও এখন কেন ইগ্নোর করছে?”

অনামিকার মা লোভী ধরনের মহিলা হলেও ধূর্ত আছেন। শিরিনকে ভীষণ তেল দিয়ে চলেন। তার বোনের ননদ শিরিন। টাকা, পয়সার দেমাগ আছে ভালোই। তার স্বামীরও কোনো হেলদোল নেই। প্যালেসের আরাম, আয়েশ উপভোগ করতে ব্যস্ত। এদিকে ওদের যে এর আগে আসা ক্যান্সেল হয়েছে, এখন আসার পরের আচরণও আন্তরিক নয় সেটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না।

অনামিকার মায়ের নাম অনিতা। তিনি চিন্তিত গলায় বললেন,

“একটা কিছু ঝামেলা আছে। শিরিন আপা কেমন যেন নিশ্চুপ হয়ে আছেন। আইরিন আপাও দেখা হলে উল্টাপথে হাটা দেন। “

অনামিকা বিরক্ত গলায় বলল,

“মানে কী? আমরা কী ভিখিরির বাচ্চা! আমাদের সঙ্গে এমন ট্রিট কেন করছে? বিয়ের প্রোপোজাল তো আন্টিই দিয়েছিল! “

অনিতা চাপা স্বরে বলেন,

“আস্তে বলো। শিরিন আপার সামনে এমন মেজাজ দেখানো যাবে না মামুনী। তিনি কিন্তু তার ছেলের জন্য শান্ত বউ চান। “

অনামিকা বিরক্ত চোখে তাকালো। শিরিনের উদ্দেশ্যে কিছু গা*লি এসে ঠোঁটের কাছে জমা হলেও গিলে ফেলল। এই বিয়েটা ওর জন্য জরুরী, কারণ অগুনিত টাকা এলে তবেই ইচ্ছেমতো লাইফ এক্সপ্লোর করতে পারবে। প্রচন্ডরকম পরিশ্রম করে পড়াশোনা করে ডিগ্রি অর্জন করেছে, নিজেকে গ্রুমিং করেছে শুধু রিচ হাজবেন্ড পাবার জন্য। চাকরি, বাকরি করে ম্যারম্যারে লাইফ কাটাতে চায় না। ম্যুড অফ হলেই যেন চলে যেতে পারে ভ্যাকেশনে। ডায়মন্ড শপে গিয়ে ইচ্ছেমতো শপিং করার জন্য যেন ডলারের চিন্তা না করতে হয়! নিশানের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাবে ও সানন্দে রাজি। শিরিন কিছু শর্ত দিয়েছিলেন। সেগুলো মৌখিকভাবে মেনেও নিয়েছে। লাইফে ভালো থাকতে হলে কতো কম্প্রোমাইজ করতে হয়! ও’কে তো দিয়েছিল হালকা কিছু শর্ত। কিন্তু এখন এদের মতিগতি ঠিক লাগছে না।

“মামুনী আজকের পার্টির জন্য রেডি হয়ে নাও। তোমাকে কিন্তু পার্টিতে সবচেয়ে সুন্দর দেখাতে হবে। কাজরীর চেয়েও সুন্দর। “

অনামিকা সাদা গাউনটা হাতে নিলো। এটা ও’কে চৌধুরী প্যালেস থেকে গিফট করে নি। ওর নিজের নেয়া। নামী ফ্যাশনহাউজ থেকে নেয়া হয়েছে। ভেবেছিল দেশে এসেই এনগেইজমেন্ট এর শপিং লিস্ট, লোকেশন বানিয়ে ফেলবে। কিন্তু এখানে এসে দেখছি সবকিছু অন্যরকম।


“কাজরী! “

কাজরী চমকালো। হেয়ার স্টাইলিস্ট চুল ম্যানেজ করছিল। কাজরী ইশারায় তাকে যেতে বলল।

“তুমি?”

আল্পনা স্মিত হাসলো। হালকা নীল রঙের শিফনের শাড়িতে আল্পনাকে স্টাইলিশ লাগছে। “

“তোমাকে সুন্দর লাগছে কাজরী। “

“থ্যাংক ইউ। এখনো হেয়ার ম্যানেজ করা বাকী… থ্যাংকস ফর ইওর কমপ্লিমেন্ট। তুমি কেন এসেছ আল্পনা? “

আল্পনা কাজরীর এমন ব্যবহারে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। মৃদু হেসে বলল,

“তোমার হাজবেন্ড আসতে বলল….. আই মিন রিকোয়েস্ট করলো।”

কাজরী সরু চোখে তাকালো। ঠোঁটে হালকা হাসি লেগে আছে।

“ইশান? রিকোয়েস্ট? “

আল্পনা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।

“আচ্ছা!”

কাজরীর কপালে সূক্ষ্ম ভাজ। ইশানের মাথায় কী কোনো পরিকল্পনা চলছে! ইশান এখন ওর সঙ্গে ভালো ম্যুডে কথা বলে। মাঝেমধ্যে মজার ছলে লিমিটলেস দুই একটা কথা বললেও সেখানে হার্ট করার মতো কিছু থাকে না। কাজরী ও’কে বলেছিল যে আল্পনাকে নিয়ে ওর চিন্তা হয়, ভয় হয়। ইশান সেই কারণে ধরে নিলো যে আল্পনা ওর পছন্দের মানুষ৷ কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে, কাজরী আল্পনাকে খুব একটা সহ্য করতে পারে না।

“কাজরী?”

“হু?”

কাজরী আনমনে জবাব দিলো।

“তোমার জন্য একটা গিফট এনেছি। গিফট টা তোমার পছন্দ হবে না জানি। “

কাজরী জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো। আল্পনা নিশ্চুপে বেরিয়ে গেল, ফিরেও এলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। একটা পেইন্টিং। মাখন রঙা কাগজে মুড়িয়ে এনেছে। কাজরী আগ্রহ করে খুলল।

“তোমার রঙ, তুলির শখ ছিলো? আমি জানতাম না তো! “

“এটা সুন্দর না?”

কাজরী মুগ্ধ গলায় বলল,

“সুন্দর! খুব সুন্দর। আমি এই পেইন্টিং এর মতোই নিখুঁত সুন্দর? “

আল্পনা মৃদু হাসলো। কাজরীর মুগ্ধতা কাটছে না। এতো যত্ন করে আঁকা, চোখের অংশ টুকু বেশী সুন্দর হয়েছে। চোখ ছল ছল করছে, মুখ হাসি হাসি। অপূর্ব সুন্দর সেই দৃশ্য। আল্পনার চোখ এড়ালো না কাজরীর মুগ্ধতাটুকু।


গেস্টরা আসতে শুরু করেছিলেন সন্ধ্যের পর পর ই। কাজরীই দেরি করে ফেলেছিল। ও এটেন্ড করলো সবার শেষে। যখন সকলের মাঝখানে গেল তখন একবার চোখ ঘুরিয়ে সবাই ই দেখলো। তিনটে কারণে সবাই ই ও’কে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। প্রথমটা হলো, ওর বোল্ড পার্সোনালিটি! ইশানের সো কল্ড ফ্রেন্ডস গ্রুপের মুখের এক্সপ্রেশন এতো হাস্যকর ছিলো! দ্বিতীয়টা হলো ওর পরিচয়! মিসেস ইশান চৌধুরী। বয়স্ক মানুষেরা মূলত সেই জন্য তাকিয়ে দেখেছে। আর তৃতীয় কারণ ওর স্টাইল আর সৌন্দর্য। শিরিন চৌধুরীর ফ্রেন্ডস গ্রুপ ও প্যালেসে আসা নতুন গেস্ট অনামিকার মুখের অভিব্যক্তি সেরকম কিছুই মিন করছে। তবে কাজরীর অস্বস্তি নেই, ও উপভোগ করলো সবকিছুই। ইশানের বন্ধুদের সঙ্গে আগ বাড়িয়ে কথা বলে ওদের কিছুটা অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিলো। ধামড়া ছেলেগুলো পার্টির নাম শুনলেই গার্লফ্রেন্ড বগলদাবা করে চলে আসে। এদিকে ফ্যামিলি পার্টিতে কোনো হার্ড ড্রিংকস রাখা হয় নি। পাইনএপেল জুস হাতে নিয়ে এদিক ওদিক দেখছে।

শিরিন চৌধুরী খুব বিরক্ত গলায় সবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছেন। কেউ নিশানের ব্যাপারে প্রশ্ন করলেই ক্ষে*পে উঠছেন। অনামিকা এসে কিছু একটা বলার চেষ্টা করতেই মেজাজ খারাপ করে বললেন,

“পরে কথা বলো, এখন গরম লাগছে। “

অনামিকা আর ওর মা হতভম্ব হয়ে গেল। শিরিন এসে দাঁড়ালেন কাজরীর পাশে। নিচু স্বরে গল্পও করতে লাগলেন। অথচ এই ছেলের বউয়ের কতো বদ*নাম করেছে।

ইশান চৌধুরী গ্রুপের বিজনেস পার্টনার দের সঙ্গে কাজরীকে ইন্ট্রডিউস করালো হাসিমুখে। পার্টিতে তাকে দেখা গেল সারাক্ষণ ই বউয়ের হাত ধরে আছে। অনেকে অনেক কিছু আশঙ্কা করলেও শেষ অবধি পার্টিতে তেমন কিছু ঘটে নি। নিশানের ব্যাপারে যখন প্রশ্ন এলো তখন শিরিন এড়িয়ে যেতে চাইলেও ইশান বলল,

খুব শিগগিরই নিশান সারপ্রাইজ নিয়ে আসবে সকলের সামনে। আপাতত ও একটু আড়ালেই থাকুক।

স্বাভাবিক গলায় ইশান কথাটা বলছিল। তবুও কাজরীর কানে খট করে শব্দটা লাগলো। সারপ্রাইজ!

চলবে…..

(সবাই রিয়েক্ট, কমেন্ট কইরেন তো। অনেক দিন পর দেয়া হয়েছে, রিয়েক্ট কমেন্ট না হলে সবার ওয়ালে পৌছাবে না।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply