কাজরী-২৮+২৯
সাবিকুননাহারনিপা
থমথমে, গুমোট পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে প্যালেসের ভেতরে। কেউ বুঝতে পারছে না আসল ঘটনা কী! নিশান অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাকে হাসপাতালে শিফট করার পরিবর্তে বাড়িতে রেখে ট্রিটমেন্ট এর ব্যবস্থা করা হচ্ছে বাড়তি সচেতনতার জন্য। মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত শিরিন চৌধুরীও। তিনি রুটিন মেনে দিন যাপন করেন। শপিং, স্পা, ক্লাবের আড্ডা, মিটিং এ নিয়মিত এটেন্ড করেন। বন্ধুদের সঙ্গে দুই মাসে, তিন মাসে ঘুরতে যাওয়া স্কিপ করে গেছেন পারিবারিক ব্যস্ততার অজুহাতে। তাছাড়া সবকিছুতে ছিলেন নিয়মিত। তার বান্ধবীরা দেখতেও এসেছিলেন, কিন্তু অসুস্থতার দোহাই দিয়ে সামনে যান নি। নিজের ঘরে লুকিয়ে থাকছেন চোরের মতো।
ইশান পাটোয়ারী সাহেবের সঙ্গে কথা বলেছে। তাকে অনুরোধ করেছে যেন মিস্টার চৌধুরীর উইল সম্পর্কে কাউকে কিছু না জানায়। ইশান তার ভাইকে পছন্দ না করলেও এই মুহুর্তে মানবিকতার খাতিরে পাশে আছে। টেক কেয়ার করছে এশনাও। মন্যুজান খাতুন এতোকিছু বুঝতে পারলেন না। তিনি ভাবলেন মায়ের খবরদারি নিয়ে ছেলে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে পাগলামি করছে। উঠতি বয়সের ছেলে, তাছাড়া ক্ষমতার লোভ। বাপের ছায়ায় থেকে তার চেয়ারে বসার লোভ সামলানো মুশকিল। তবুও কাজরীকে জিজ্ঞেস করলেন,
“তোমার শাশুড়ীর খবর কিছু জানো? তার নাকি দেখা পায় না কেউ?”
কাজরী হালকা গলায় জবাব দিলো,
“উনি অসুস্থ একটু। “
“কী অসুখ। “
“সিজনাল রোগ, ব্যধি দাদী। তেমন কিছু না। “
“ওহ! দেখো কী মতলব যেন আছে। ও তো একটা শয়তান। শয়তানে*র অসুখ, বিসুখ হওয়ার কথা না।”
কাজরী হেসে ফেলল। মন্যুজান খাতুন ছেলের বউকে নিয়ে সবসময় ই এমনসব কথা বলেন। কাজরী সুপুরি কাটছিলো ওনার জন্য। ও জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি ওনাকে পছন্দ করেন না কেন?”
“ওরে পছন্দ করা যায়? তুমি করো? খুব দেমাগ ওর। ওর দাদা, চাচারা তরমুজের ব্যবসা করতো। তরমুজ বেইচ্যা বড়লোক হইয়া নামের পাশে শিল্পপতি লাগাইছে। যত টাকা, পয়সাই হোক ছিলো তো তরমুজ ব্যবসায়ী। “
কাজরী আবারও হাসলো। মন্যুজান খাতুন আবারও বললেন,
“আমার দাদায় ছিলেন জমিদার। আমার যখন বিয়া হয় তখন একশ ভরি সোনা দিয়াও তার মন ভরে নাই। আফসোস করে কতো কান্নাকাটি করছেন। আর আমার পোলায় বিয়া করছে তরমুজ বেঁচা ঘরের মাইয়া। “
“উনি তো ডাক্তার ছিলেন। “
মন্যুজান খাতুন মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন,
“ওর মতো দুই চারটা ডাক্তার আমার বাপেই কিনতে পারতো। আমার পোলার তো তারচেয়ে সম্পদ বেশী। “
কাজরী লক্ষ্য করেছে। উনি বাপ, দাদা, ছেলে, নাতি সবাইকে নিয়ে গল্প করলেও স্বামীর কথা কখনো বলেন না। তাও ইশান বলল বলে জানতে পারলো যে ওনার দুইবার বিয়ে হয়েছিল। সচেতন ভাবে ছোট ছেলের কথাও এড়িয়ে যান। তাতেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে ওনার ছোট ছেলের কোনো ঘটনা আছে। কাজরী বাইরে থেকে নরমাল হবার ভান করে যাচ্ছে, কিন্তু ভেতরে একটা প্রশ্ন কুড়ে খাচ্ছে। নিশানের বাবা কোনোভাবে মন্যুজান খাতুন এর ছোট ছেলে নয় তো! কাজরী বিচলিত হয় এটা ভেবে। এই ব্যাপারে ইশান ওর মা’কে প্রশ্ন করতে চায় না, শিরিন কে ও নিজেও আগ বাড়িয়ে প্রশ্নটা করতে পারছে না। একজন জানতে পারে, তিনি হলেন আখতারউজ্জামান। কিন্তু কাজরীর ধারণা তিনিও জানেন না। এতো গোপন কথা ওনার জানার কথা নয়। তাছাড়া উনি শুরুতে চেয়েছিলেন নিশানের সঙ্গে যেন কাজরীর বিয়ে হয়। এর থেকে স্পষ্ট যে উনি জানে না।
আখতারউজ্জামান এর সঙ্গে ওর কথা হয় নি। পাটোয়ারী সাহেব প্যালেসে আসার আগেরদিন উনি শিরিন চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। শিরিন ব্যস্ততা দেখিয়ে তাকে দুই ঘন্টা বসিয়ে রেখেছিলেন। কাজরী ব্যাপার টা প্যালেসে এসে শুনলো শবনমের কাছে। শিরিন নাকি দুই ঘন্টা পর এসে বললেন,
“একটা জরুরী মিটিং আছে জামান সাহেব। আপনাকে বেশীক্ষণ সময়ও দিতে পারব না। একটু জলদি বলুন যা বলার। “
“বুঝতে পারছি আপনি এখন ব্যস্ত। তবে ছোট্ট উপদেশ হলো এক্ষুনি এতো ব্যস্ত হলে গদি টা পেতে মুশকিল হবে। ব্যস্ততা গদিতে বসে দেখানোই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আপনাকে একটা কথা স্পষ্ট বলে যাই, সুবর্ননগরের এক তৃতীয়াংশ মানুষ আমাকে ভরসা করে। যে মঞ্চ তৈরী করে আপনি স্বামীশোকে ব্যথিত হয়ে আমার মেয়েকে অপমান করেছেন সেই মঞ্চে আপনার মুখে জুতা ছুড়ে মারার ক্ষমতা ওইদিনও আমার হাতে ছিলো। মিস্টার চৌধুরী জানতেন যে সেখানে এমপি ইলেকশন করতে হলে আমার সমর্থন জরুরী। কেন আমার মেয়ের সঙ্গে আপনার ছেলের বিয়ে দেয়া জরুরী ছিলো সেটা আপনার জানা প্রয়োজন বলে জানাচ্ছি। উনি ইলেকশনে জিতলে মন্ত্রী পদটা নিশ্চিত হতো। তাই তার মাথায় বন্দুক তাক করে কিছু করাতে হয় নি৷ উনি ব্যবসায়ী মানুষ বলে ব্যবসা বুঝেছে। আপনি জটিল মানুষ হলেও কম বুদ্ধির মানুষ। “
শিরিন শীতল চোখে তাকিয়ে কথাগুলো শুনছিলেন। অপমানে জর্জরিত শিরিন নিজের কাঠিন্যতা দেখানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন।
“হাউ ডেয়ার ইউ! আমার বাড়িতে এসে আপনি এইভাবে কথা বলছেন কেন?
“আপনার আসন্ন সময়টা খারাপ মিসেস চৌধুরী। শান্ত হন। “
শিরিন বৃথা আস্ফালন দেখালেন।
আখতারউজ্জামান বেরিয়ে যাবার সময় ভদ্রতাও দেখান নি শিরিন কে।
“কাজরী!”
“জি দাদী। “
“কী চিন্তা করো এতো? শিরিন তোমার কিছু করতে পারবে না। আমার নাতিরে তো তুমি ভালোই আঁচলে বেঁধে ফেলছো। হিহিহি। “
কাজরীর কান গরম হয়ে উঠলো অকারণেই। মন্যুজান খাতুন লক্ষ্য করে বললেন,
“যে রুপ তোমার মাশাল্লাহ! তাতে সাধুপুরুষ হইলেও তার মাথা গরম হয়ে যাবে। আমার নাতি তো….
বৃদ্ধা রসিকতার ছলে অশ্লীল কথাবার্তা বলতে শুরু করেছেন। কাজরী ওনার সঙ্গে নরম হয়ে মিশেছে বলেই উনি এগুলো বলার সুযোগ পাচ্ছেন। শবনম এসে কাজরীকে জানালো, ইশান ওর খোঁজ করছে। মন্যুজান খাতুন সেটা শুনেও বেশ আপ্লুত হলেন। তার এই নাতির সুখী সংসারের জন্য প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তার অনেক প্রার্থনা শুনেন নি, এটা যেন শুনেন।
“তুমি আমাকে খুঁজছিলে?”
ইশান ঘড়িটা পরা শেষ করে জবাব দিলো,
“হ্যাঁ। পাটোয়ারী সাহেব এসেছেন। এই কাগজটায় তুমি তোমার শাশুড়ীর সিগনেচার আনবে। “
“আমি?”
“এশনা ওনাকে ফেস করছে না। আর আমিও যে ইন্টেরেস্টেড নই, সেটা নিশ্চয়ই এক্সপ্লেইন করতে হবে না তোমাকে। “
“আচ্ছা। “
কাজরী কাগজ টা হাতে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলো। ইশান ডাকলো,
“কাজরী শোনো। “
কাজরী জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো। ইশান অন্যরকম গলায় বলল,
“এই কাগজে সিগনেচার আনাটা জরুরী। প্লিজ একটু সফট ল্যাঙ্গুয়েজে কথা বোলো।”
কাজরী ইশানের শান্ত রুপে অন্যরকম কিছু ফিল করছে। নিজেও এই ব্যাপারে বুঝতে পারছে না। ইশান এইমাত্র যে সুরে ওর সঙ্গে কথা বলল, তাতে ওর মনটা আদ্র হলো ইশানের জন্য। একটা জেদ তৈরী হলো, যে করেই হোক ইশানের জন্য এই কাজটা করতে হবে। নিজের মনের অবস্থা বুঝতে না দিয়ে কাজরী মাথা নেড়ে দৃঢ় গলায় বলল,
“আমি চেষ্টা করব। “
শিরিনকে দেখে কাজরী চমকে উঠলো। বয়স যেন এক ধাক্কায় দশ বছর বেড়ে গেছে। মুখে বলিরেখার ছাপ স্পষ্ট। উজ্জ্বল সিল্কি চুলগুলো এলোমেলো। তিনি কাজরীকে বললেন,
“আমি তোমার সঙ্গে এখন কথা বলব না। “
“কথা বলতে হবে না। আপনি এই কাগজে সিগনেচার করে দিলেই হবে। “
কাজরীর হাতের পেপারস গুলো দেখে শিরিনের মন মুহুর্তেই বিতৃষ্ণায় ভরে উঠলো। তিনি জায়গা ছেড়ে দিয়ে কাজরীকে ঘরে ঢুকতে দিলেন। কাজরী পেপারস এগিয়ে দিয়ে বলল,
“এখনই সিগনেচার করে দিন প্লিজ। পাটোয়ারী আঙ্কেল বসে আছেন। “
শিরিন তীর্যক হেসে বললেন,
“ইশান নিজে না এসে তোমাকে পাঠালো! ও কী প্রমাণ করতে চাইছে?”
“কিছুই প্রমাণ করতে চাইছে না। আপনাকে স্পেস দিচ্ছে। “
“কাজরী, আমি যদি এখন সিগনেচার না করি?”
কাজরী ভদ্রমহিলার দিকে তাকালো। আহত বাঘের ন্যায় চোখের দৃষ্টি। কাজরী নরম গলায় বলল,
“আপনার জেদে কোনো কিছুই বদলাবে না আন্টি। এটাই মেনে নিতে হবে আপনাকে। “
শিরিন হাসলেন। হাসিটা স্বাভাবিক নয়, কাগজগুলো টুকরো করে করে ফেললেন কাজরীর সামনেই। কঠিন গলায় বললেন,
“আমি এই উইল মানি না… মানবও না। “
কাজরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আপনি বাচ্চাদের মতো জেদ করছেন। আপনার না মানায় কারোর কোনো ক্ষতি হবে না, আপনার ছাড়া। ইশান, এশনা সবকিছু পাবে ভাগমতো। আপনি নিজের অংশ হারাবেন। নিশানকে দেয়ার জন্যও কিছু থাকবে না। “
শিরিন চিৎকার করে বললেন,
“স্টপ কাজরী। গেট আউট ফ্রম মাই রুম। “
কাজরী আর কথা বাড়ালো না, চলে এলো। ইশান প্রশ্ন করার আগেই বলল,
“তোমার মা সব ছিড়ে ফেলেছেন ইশান। উনি এই উইল মানেন না। “
ইশান ত্বরিৎ গতিতে ছুটে গেল শিরিন চৌধুরীর কাছে। তিনি ছেলেকে দেখে বললেন,
“তোমার বাবার খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত আমি মানব না। “
ইশান শান্ত গলায় বলল,
“ওকে। তবে উইল অনুযায়ী তোমার অংশ জনকল্যাণে ব্যয় হবে। এটা ওয়াইজ ডিসিশন হবে, শূন্য হাতে তুমি রাজনীতিতে নামবে। মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করবে। “
“শাট আপ ইশান। তোমার বাবার এই অন্যায় আমি কিছুতেই মানব না। দলিল তো ছিড়ে ফেলেছি, কী করবে তুমি এখন?”
ইশান হাসলো। বলল,
“তুমি আগে নিজের মাইন্ড ঠিক করো। নিজের আসল চরিত্র বাইরে আসায় সব তালগোল পাকিয়ে ফেলেছ। ওরকম দলিল আরও পাঁচটা কপি রেখে গেছেন ওয়াজেদ চৌধুরী। “
শিরিন নিভলো। বিড়বিড় করে বলল,
“খুব অন্যায় করেছে আমার উপর। এটা আমি ডিজার্ভ করি না। “
ইশান একটু নরম হলো। বলল,
“তুমি কো অপরেট না করলে আমার কিন্তু কোনো ক্ষতি নেই। “
শিরিন ইশানের হাত ধরে বলল,
“প্লিজ ইশান। গিভ মি সাম টাইম। আমার কথা শোনো, নিজের স্বপক্ষে আমারও অনেক কিছু বলার আছে। “
“আমি ইন্টেরেস্টেড না। তুমি নিশানকে বলো। হি ইজ ভেরি আপসেট রাইট নাউ। “
“নিশান আমাকে আঘাত করলো ইশান! আমি বিশ্বাস করতে পারি না! তোমরা… তোমরা সবাই আমাকে ঘৃনা করো। আমি এটা ডিজার্ভ করি না। “
ইশান বেরিয়ে গেল। মায়ের আহাজারি ওর হৃদয়ে কোনো প্রভাব ফেলল না। মায়ের জন্য কোনো সিম্প্যাথি আসছে না। উনি সচেতনভাবে নিশানকে সবকিছুর উর্ধ্বে রাখতে চেয়েছেন। অথচ ওয়াজেদ চৌধুরীর তিলে তিলে গড়ে তোলা সাম্রাজ্য নিশান কোনোভাবেই ডিজার্ভ করে না।
পাটোয়ারী সাহেবের পাঠানো নতুন দলিলে শিরিন সিগনেচার করে দিলো। এবারও তার কাছে দলিল নিয়ে কাজরীই গেল। তিনি ক্লান্ত গলায় বললেন,
“এরকম একজন মানুষের সঙ্গে সংসার করেছি আমি! নিজেকে প্রচন্ড ঘৃনা করি এখন। “
“আপনি শান্ত হন আন্টি। নিশানের সঙ্গে কথা বলুন। সত্যিটা কনফেস করুন। যা হবার তা তো হয়েই গেছে। এরপর আর কিছু আটকাতে পারবে না। “
শিরিন শান্ত চোখে কাজরীকে দেখলো। তিনি ভীষণ একা বোধ করছেন। কাউকে নিজের মনের কথা বলতে পারছেন না। কাজরী তাকে একা ছেড়ে চলে এলো।
কাগজগুলো নেবার সময় ইশানকে বেশ ফুরফুরে মেজাজে দেখা গেল। কাজরী লক্ষ্য করেছে যা কিছু ঘটছে তাতে ইশান বিন্দুমাত্র বিচলিত নয়। মা, ভাইয়ের জন্য উদার হয়ে নিজের অধিকার ছাড়তে রাজিও নয়। অবশ্য হবার কথাও নয়, শিরিন চৌধুরী তার বড় ছেলেকে এগিয়ে রাখার জন্য ছোট ছেলেকে পিছিয়ে দিয়েছেন। তার বেপরোয়া, বেহিসেবী জীবন নিয়ে একটুও চিন্তিত ছিলেন না, বরং ছেলের উচ্ছৃঙ্খল জীবনকে তিনি সানন্দে মেনে নিয়েছেন। মা হিসেবে উনি অনেস্ট ছিলেন না। এতো বড় ধাক্কা তিনি খাবেন সেটা কল্পনায়ও ভাবে নি। এদিকে ইশান না চাইতেও প্রত্যাশার চেয়ে বেশী কিছু পাচ্ছে।
“কিছু বলবে?”
“আমি একবার বাবার কাছে যাব আজ?”
“বাবা?”
“আল্পনার বাবা। “
“ওহ আচ্ছা। তুমি তো ওনাকে বাবা বলে ডাকো না তাই বুঝতে অসুবিধা হলো। “
কাজরী অস্পষ্ট স্বরে কিছু বলল। ইশান আবারও বলল,
“যাও। তুমি অকারণে আপসেট হচ্ছো মনে হচ্ছে। কনফিডেন্ট হারিয়ে ফেললে হঠাৎ? “
“না তেমন কিছু না। এমনিই বাবা একটু সমস্যায় আছেন আল্পনাকে নিয়ে। আমার মনে হলো তার কাছে যাওয়া প্রয়োজন। “
“আচ্ছা। “
ইশান বেরিয়ে যাবার জন্য পা বাড়িয়েও এগিয়ে এসে বলল,
“ডোন্ট ওরি, যতক্ষন তুমি এই প্যালেসে আর আমার জীবনে আছ ততক্ষন তুমি সেইফ। যদি আমার লাইফ থেকে বেরিয়ে যাও তখন তোমার সেইফটির গ্যারান্টি দিতে পারব না। “
কাজরী অন্যমনস্ক গলায় বলল,
“থ্যাংকস এ লট। “
ইশান অন্যমনস্ক কাজরীকে লক্ষ্য করলো। হাসলোও অকারণে। ইশানের জীবনে এখন যা কিছু ঘটছে সব পজিটিভ, সুন্দর। প্রত্যাশার চেয়েও বেশী কিছু লাইফে যুক্ত হচ্ছে। এখন যদি ও নিজের ফিলিংস কে প্রশ্রয় দিয়ে কাজরীকে বউ হিসেবে মেনে নেয় সেটাও বোধহয় খারাপ কিছু হবে না।
কাজরী যখন বাসায় আসলো তখন প্রায় দুপুর। আখতারউজ্জামান অপেক্ষা করলেন, মেয়ে আসলে দুপুরের খাবার খেতে বসবেন। আল্পনাকে থাকতে বললেন না। তিনি এখন আল্পনার সঙ্গে কথা বলেন না। আশ্চর্য হলেও সত্যি তিনি পুরোপুরি বিশ্বাস করে উঠতে পারেন না যে আল্পনা এমন ঘৃন্য কাজ করেছে। কাজরী এসে পড়লো। মেয়েকে দেখে আখতারউজ্জামান চমকে উঠলেন,
“একি অবস্থা তোমার? কী হয়েছে? “
কাজরী এক গ্লাস পানি এক নি:শ্বাসে শেষ করে বলল,
“আপনার ঘরে চলুন বাবা। আমার কিছু কথা আছে। “
“তুমি শান্ত হও আগে। টেবিলে খাবার দেয়া হয়েছে। খেয়ে কথা বলি। “
কাজরী না বলতে গিয়েও পারলো না। মন দূর্বল বলেই হয়তো পারলো না। তাছাড়া কিছু মুহুর্ত আছে, যখন মানুষ মায়ার কাঙাল হয়, ভালোবাসার কাঙাল হয়। এই সমগ্র পৃথিবীতে ওর আপনজন তো কেউ নেই। এতো মায়া গলায় ঢেলে যে ও’কে ভাত খাবার জন্য বলল তার সঙ্গে ওর রক্তের সম্পর্ক নেই। কাজরী কখনো তার প্রতি শ্রদ্ধা ছাড়া আর কিছু দেখায়ও নি। আজ নিজেকে বড্ড একা লাগছে ওর। যেই মুহুর্তে আখতারউজ্জামান ও’কে প্রশ্ন করলো তুমি ঠিক আছ! সেই মুহুর্তে ওর মন কেমন করে উঠলো। এই মানুষটা যখন পৃথিবীতে থাকবে না তখন তো এইভাবে বলার জন্য ওর আর কেউ থাকবে না৷
কাজরী খেতে পারলো না ঠিক করে। অল্প একটু খেয়েই উঠে পড়লো। অথচ টেবিল ভর্তি সব ওর পছন্দের খাবার।
“কী বলতে চাও তুমি? আর এতো ভেঙে পড়েছ হঠাৎ? “
“নিশান মিস্টার চৌধুরীর ছেলে না। এটা কী আপনি জানতেন? “
আখতারউজ্জামান হতভম্ব গলায় বললেন,
“না। এসব কিভাবে জানলে?”
কাজরী সব খুলে বলল। আখতারউজ্জামান বিস্মিত হলেন চৌধুরীর ভাবনায়। একটা মানুষ এতোটা গভীর চিন্তাভাবনা কিভাবে করেছেন! ঘূনাক্ষরেও তিনি টের পেতে দেন নি নিজের পরিবারের কালো অধ্যায়।
“বাবা, আপনি কখনো আমাকে পরিষ্কার করে এই পরিবারের ব্যাপারে কিছু বলেন নি। আমি নিজেও তেমন কিছু জানতে পারি নি। একটু কী আমাকে ইফতেখার চৌধুরীর ব্যাপারে বলবেন। আগে যতবার প্রশ্ন করেছি আপনি বলেছেন সময়মতো বলবেন। আজ আমি বিপর্যস্ত। আমার ধারণা নিশান তার ই ছেলে। “
কাজরী কথাটা বলেই মুখ ঢেকে ফেলল। আখতারউজ্জামান বললেন,
“তুমি শান্ত হও। নিশানের পিতৃপরিচয় আমি জানিনা তবে এটুকু নিশ্চিত বলতে পারি যে নিশান ইফতেখার চৌধুরীর ছেলে না। তার একটি মাত্র মেয়ে। “
কাজরীর চেহারায় স্বস্তির ছাপ। এই কথাটা ভেবে ওর রাতগুলো যে কী অস্থির কেটেছে।
“আপনি নিশ্চিত কী করে?”
“ওয়াজেদ চৌধুরী তার বিয়ের বছর খানেক পর সুইডেন গিয়েছিলেন। কারণ তখন তার নামে দেশে একটা মামলা চলছিল। তার এক বিজনেস পার্টনার ট্রাক চাপা পড়ে মা*রা যায়। তিনি চার বছর সুইডেনে ফ্যামিলিসহ ছিলেন। না নিজে একবারও এসেছেন দেশে, না ইফতেখার কিংবা তার মা গেছে। নিশানের বাবা অন্যকেউ। “
কাজরী নিশ্চিন্ত হলো। এতো স্বস্তি পেল কথাটা শুনে।
অফিসের লকারের চাবিটা ইশানের হাতে। চাবি দিয়ে খুললেও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে লকার খুলতে হবে৷ পাসওয়ার্ডও ওর হাতে আছে। এমন কিছু গুপ্তধন এখানে থাকার কথা না, তবুও চাবি হাতে পেয়ে ইশানের কৌতূহল বেড়ে গেল।
পাসওয়ার্ড হিসেবে যে সংখ্যাগুলো ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো ইশানের কেমন চেনা মনে হলো। তবে অতো মাথা ঘামালো না, লকার খোলা হয়ে গেছে। ভেতরে দুটো ফাইল পেল। একটা ফাইলে সম্পত্তির পরিমাণ আর কোথায় কী আছে সেগুলো সহ সিগনেচার করা কিছু কাগজপত্র। ইশান চোখ বুলিয়ে যতটুকু যা দেখলো তাতে বুঝলো যে ওর কাজ যতটা সহজ করা যায় তিনি করে গেছেন। মনটা স্যাতস্যাতে হয়ে উঠলো। একবার যদি তাকে সামনাসামনি বাবা ডাকার সুযোগ পেত!
লাল রঙের ফাইলটা খুলতেই ইশানের কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়লো। বড় হরফে ওর নাম লেখা। চোখের সামনে এনে পড়ার চেষ্টা করলো।
ইশান,
“তুমি বাবার কাছে যা চাও তা পেতে তোমাকে পরিশ্রম করতে হবে না, যুদ্ধও করতে হবে না। আমি সবকিছু সহজভাবে সমাধান করে দিয়েছি। আমার কষ্ট, শ্রম, ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত সবকিছু তোমার। এগুলো একমাত্র তোমারই প্রাপ্য। তুমি প্রচুর পড়াশোনা করার স্বভাব পেয়েছ আমার কাছ থেকে। নিশ্চয়ই জেনে থাকবে এই পৃথিবীতে সহজভাবে অর্জিত কিছুর মূল্য গুরুত্বহীন হয়। আমার অর্জিত সবকিছু তোমার ই তবে তার জন্য তোমাকে মূল্য দিতে হবে। আমি তোমাকে বাধ্য করছি না এই মূল্য দিতে। তবে যদি না দাও অদূর ভবিষ্যতে তুমি বিপদে পড়বে। সবকিছু পাবার বিনিময়ে তোমাকে যুদ্ধ না করতে হলেও র*ক্ত ঝরাতে হবে। ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াইয়ে এই হিসাব খুব স্বাভাবিক। একটা প্রাণ পৃথিবী থেকে কৌশলে মুছে দিবে। সে আর কেউ নয়, তোমার স্ত্রী কাজরী। আমার অসমাপ্ত কাজের দায়িত্বটুকু মাথা পেতে নিও। আমার সবকিছু তো তোমারই। অসমাপ্ত কাজের ভারও তোমাকে দিলাম।
ইশানের শিড়দাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।
চলবে…..
Share On:
TAGS: কাজরী, সাবিকুন নাহার নিপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাজরী পর্ব ৫
-
কাজরী পর্ব ১২
-
কাজরী পর্ব ২২
-
কাজরী পর্ব ১৮
-
কাজরী পর্ব ১৬
-
কাজরী পর্ব ৮+৯
-
কাজরী পর্ব ৬
-
কাজরী গল্পের লিংক
-
কাজরী পর্ব ২০
-
কাজরী পর্ব ১০