কাজরী-২৭
সাবিকুননাহারনিপা
শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ। পাটোয়ারী সাহেব নিজেও এই দলীল তৈরী করার সময় স্তব্ধ হয়েছিলেন। তিনি চৌধুরী সাহেবের অনেক পুরোনো উকিল। এই কারণে তিনি এই ঘরে বাইরের কাউকে এমনকি চৌধুরী সাহেবের বিশ্বস্ত ম্যানেজার ইরফানকেও রাখতে বারণ করেছে। সেলিম পাটোয়ারী আবারও বললেন,
“উইলের বাকী অংশ টা শুনুন সবাই দয়া করে। এশনা চৌধুরী যতদিন পর্যন্ত মানসিক ভাবে সম্পত্তি সামলাতে পরিনত হতে পারবেন না ততদিন তার ভাগের অংশ ভাই ইশান ওয়াজেদ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে থাকবে। এই মর্মে আরও উল্লেখ করা হলো যে, শিরিন চৌধুরী শুধু স্থাবর সম্পত্তির পনেরো শতাংশের দাবিদার, চৌধুরী গ্রুপ, চৌধুরী প্যালেসে তার কোনো দাবি থাকবে না। উক্ত দলিল না মেনে যদি শিরিন চৌধুরী কিংবা এশনা চৌধুরী কোনোরুপ বিরোধিতা করে তবে আইনী পদক্ষেপে তাদের অংশের সম্পত্তি জনকল্যানে ব্যয়ে ব্যবহারে জন্য ধার্য করা হবে।”
পাটোয়ারী সাহেব কাগজটা ইশানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আপনাদের তিনজনের ই সিগনেচার লাগবে! “
নিশান এখনো যন্ত্রের মতো বসে আছে। ওর তো এখানে কোনো কাজ নেই। কাঁধের উপরে যার হাত আছে তিনি ওর জন্মদাত্রী মা, ঠোঁট চেপে ধরে কান্না আটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলো। নিশান উঠে দাঁড়ালো। ওর সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন শিরিন চৌধুরী নিজেও। তিনি ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। ফিসফিস করে বললেন,
“বাবা আমার সব কথা আগে শুনবি। আমি মা, এক বর্ন মিথ্যে তোকে বলব না। “
পাটোয়ারী সাহেব উশখুশ করছেন। হৃদয়বিদারক ফ্যামিলি ড্রামায় তার থাকা উচিত না। ইশান উইলটা ফিরিয়ে দিয়ে বলল,
“আঙ্কেল আপনি আজ চলে যান। নেক্সট যেদিন আসবেন সেদিন সিগনেচার নিবেন। “
পাটোয়ারী সাহেব স্বস্তি পেলেন। বড়লোকদের ফ্যামিলিতে কেচ্ছা, কাহিনী কম থাকে না। এসব বিষয় তার জানার আগ্রহ নেই। তিনি নিশানকে দেখলেন, পিওর জেন্টলম্যান একটা ছেলে। চৌধুরী সাহেবের দিলে দয়া আছে বলতে হবে। কোকীলের বাসায় কাকের বাচ্চাকে বড় করেছেন, বড় হৃদয়ের একজন মানুষ।
নিশান মায়ের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় প্রশ্ন করলো,
“আমি কে?”
শিরিন চৌধুরীর চোখ ছলছল করছে। তিনি ভেজা গলায় বললেন,
“তুমি, ইশান, এশনা তিনজনই আমার সন্তান বাবা। “
নিশান গর্জন করে উঠলো,
“আমার পিতৃপরিচয় কী? কে আমি?”
শিরিনের চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগলো। তিনি ভেজা কন্ঠে বললেন,
“তোমার বাবা ওয়াজেদ চৌধুরী। আমাকে বিশ্বাস করো তুমি! “
নিশান অপ্রকৃতস্থের মতো আচরণ শুরু করলো,
“আমার আইডেন্টিটি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যাকে আমি বাবা বলে জানি তিনি পিতৃপরিচয় দিতে অস্বীকার করে গেছেন সরাসরি। আর কতো মিথ্যে নাটক করবে তুমি শিরিন চৌধুরী? আর কতো? “
নিশান এবার সরাসরি শিরিন চৌধুরীর গলা চে*পে ধরলো আক্রোশে। কাজরী, এশনা ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। নিশানের গায়ে যেন পশুর শক্তি ভর করেছে। শিরিন নি:শ্বাস নিতে পারছেন না। কাজরী ডাকলো,
“ইশান, ইশান প্লিজ ডু সামথিং। “
ইশান নিজের ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে মা’য়ের প্রাণ বাঁচাতে এগিয়ে এলো। তার প্রিয় সন্তানের মাথা ঠিক নেই, আরেকটু হলেই খু*ন করে ফেলতে পারবে মা’কে। ইশান সফল হলো সামলাতে। কঠিন গলায় বলল,
“ইডিয়ট, বিহাভ ইওরসেল্ফ। “
নিশানের চোখ রক্তবর্ন। জান্তব চিৎকার করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো। শিরিনের চোখ বেয়ে জল পড়ছে অনবরত। কাজরী পানির গ্লাস মুখের সামনে ধরে জিজ্ঞেস করলো,
“বুক ভরে শ্বাস নিয়ে একটু পানি খান। “
শিরিন তাকিয়ে আছে নিশানের দিকে। স্টাফদের এই ঘরে আসার পারমিশন নেই। নিশানের চিৎকার অনেকের মনে কৌতূহল তৈরী করেছে। ইশান ভাইকে ধরে উঠিয়ে জোর করে ওর ঘরের দিকে নিয়ে গেল। এশনাও অনুসরণ করলো। ইশান ঘরে ঢুকিয়ে নিশানকে চাপা স্বরে বলল,
“বোকামি করে এই কথা প্যালেসের লোকজন কে জানিও না। কন্ট্রোল ইওরসেল্ফ। “
নিশান কাঁদছে হাউমাউ করে। ইশান করিঢোরে এসে স্টাফদের জানালো সবাই যেন এখন প্যালেস ছেড়ে যায়। একজনও যেন না থাকে এখানে। আইরিন খালামনি, তার ছেলে আশফাক এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন,
“নিশানের কী হইছে? কিছু করছিস তুই?”
ইশান রক্তচক্ষু নিয়ে তাকালো। আইরিন খালামনি ভরকে গেলেন। তিনি বোনের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। সেখানে যে দৃশ্যটা দেখলেন সেটাও হতভম্ব হবার মতো। শিরিন কাঁদছেন, কাজরীর কাঁধে মাথা রেখে। কাজরী এক হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছেন।
“তুই এখন এই ঘরে থাক। বাইরের কেউ এসে থাকুক, সেটা আমি চাই না। “
এশনা মাথা নেড়ে আচ্ছা বলল। ইশান সতর্ক গলায় বলল,
“ডোর যেন লক না করে, করলেই কিন্তু বিপদ।”
এশনা ভাইকে জড়িয়ে ধরলো। ইশান ওর মাথায় হাত রেখে বলল,
“রিলাক্স এশনা। শক্ত হতে হবে। কেউ প্রশ্ন করলেও এই ব্যাপারে কিছু বলবি না। “
“সবাই জানবে ভাইয়া, এইসব বিষয় এখন আর চাপা থাকবে না। “
“জানি এশনা। এখন যেন কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে সেজন্য কেয়ারফুল থাকতে হবে। “
“মাম্মাকে এখন কোনো প্রশ্ন করবে? “
ইশান দৃঢ় গলায় বলল,
“না। “
নিশান চোখ বন্ধ করে আছে। কড়া ডোজের স্লিপিং পিল দেয়া হয়েছে ও’কে। কিছুক্ষনের মধ্যেই ঘুমিয়ে যাবে। দুই হাতে ব্যান্ডেজ করা, পাগলের মতো নিজেকে আঘাত করেছে। ইশান আরেকবার তাকালো! সোশ্যাল স্ট্যাটাস মেইনটেইন করা ওয়াজেদ চৌধুরী নিজের যোগ্য উত্তরসুরী হিসেবে নিশানকে যত্নে গড়েছেন। তার মতো পার্সোনালিটি ক্যারি করার চেষ্টা করেছে নিশান সবসময়। যাকে নিজের আইডল হিসেবে মেনে এসেছে সবসময় সেই মানুষটা ও’কে করুনা করেছে। শুধুই করুনা। শিরিন চৌধুরী স্বীকার না করলেও ওদের বুঝতে বাকী নেই যে নিশানের বাবা অন্যকেউ।
ইশান বেরিয়ে গেল। এশনা নিশানের গায়ে পাতলা কম্বল জড়িয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। ঝাপসা আয়নাটা পরিস্কার হয়ে যাবার পর শিরিন চৌধুরীর জন্য পুরোপুরি ঘৃনা অনুভব করছে। এশনার খুব মায়া হলো। দুই ভাইয়ের মধ্যে ইশানের জন্য ওর প্রবল মায়া ছিলো কারণ ইশানকে ওর নেগলেক্টেড মনে হতো। মাম্মা প্রোপার কেয়ার করছে না, বাবা সময় দিতে পারেন নি বলে ইশান নিজেকে সরিয়ে অন্য জগৎ তৈরী করেছে। তবে সেখানে নিশানের দোষ ছিলো না। ও’কে তো যেমন করে শিরিন চৌধুরী গড়েছেন ও তেমন ই হয়েছে। আজ বড্ড মায়া হচ্ছে। অর্ধেক রাজত্ব যার ভোগ করার কথা সে আজ অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।
ইশান ঘরে ঢুকতেই কাজরীর মুখোমুখি হলো।
“নিশানের কী অবস্থা? “
“স্লিপিং পিল দেয়া হয়েছে। “
“খুব বাজে একটা ব্যাপার হলো ইশান। “
ইশান আনমনে বলল,
“হু। “
“তোমার মায়ের সঙ্গে কথা বলবে? “
“উনি শক্ত ধাচে গড়া কাজরী। ওনার সিম্প্যাথির প্রয়োজন নেই। তাছাড়া ভিক্টিম নিশান, উনিতো ক্রিমিনা*ল। “
ইশান ওয়াশরুমে চলে গেল শাওয়ার নিতে। আজ যে ঘটনা সামনে এলো সেটা একদিকে যেমন শকিং অন্যদিকে হৃদয়বিদারকও। শিরিন চৌধুরী ভেঙে পড়েছেন। তিনি বাচ্চাদের মতো কাঁদলেন। কাজরী ওনার জন্য মায়া অনুভব করে নি সত্যি তবে অবাক হয়েছে। ওনাকে দেখে মনে হয়েছে অনেক অব্যক্ত কথা আছে যেটা ওনাকে প্রচন্ড হার্ট করছে।
ইশান আজ দ্রুত শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে এলো। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজেকে দেখছে। এই তো কিছুদিন আগে ইশান অনুভব করলো যে বাবা ও’কে আসলে অবহেলা করেন নি, বরং পূর্ন স্বাধীনতা দিয়ে নিজের মতো থাকতে দিয়েছেন। ওর একটা বোল্ড পার্সোনালিটি তৈরী করেছেন। আজ ইশান নিশ্চিত হলো। তিনি নিজেও চেয়েছিলেন যেন ইশান এমনই বেপরোয়া, শক্ত, দৃঢ় স্বভাবের হোক। আয়নায় নিজেকে দেখে ইশান, নিজের জন্য গর্ব হয়। এই প্যালেস, কোটি টাকার সম্পদের মোহ ওর ছিলো না। ক্ষমতার লোভে কখনো পাপেটও হয় নি। টাকা, পয়সা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবার ভয়ও হয় নি। কিন্তু ভাগ্যের কী লীলাখেলা! সবকিছু ওর হাতের মুঠোয়। ছয় মাস আগে ওয়াজেদ চৌধুরীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ও চৌধুরী গ্রুপের আধিপত্য দাবি করেছিল শুধু মিস্টার চৌধুরীর অহং ভেঙে দেবার জন্য। কিন্তু তিনি ও’কে অবাক করে দিয়েছিলেন। ইশান তখন ভেবেছিল কাজরী চৌধুরী সাহেবের জন্য একটা বিশেষ ডিল। নাহলে তার সাম্রাজ্য ইশানের মতো অপাত্রে দান করার কথা না। অথচ তিনি দাবার গুটির সবচেয়ে সহজ চাল দিয়েছিলেন। তার সাম্রাজ্য তো আসলে তার পরে তার ছেলের ই। রাজার পুত্রই রাজা হয়। হোক সে অযোগ্য কিংবা দূর্বল।
“ইশান! “
ইশান কাজরীর দিকে তাকায়। কাজরী বলে,
“নিশান তোমার বাবার সন্তান নন, অন্তত তোমার বাবার দলিলে তার যে স্টেটমেন্ট আছে তাতে এটুকু প্রমাণ হয়। “
“হ্যাঁ। কী মিন করছ?”
ইশান প্রশ্নটা করে কাজরীর মুখোমুখি বসলো।
“তিনি নিশানকে পারফেক্ট লাইফ দিয়েছেন। যোগ্য উত্তরসুরী হবার জন্য যে গুন থাকা দরকার সেভাবে গড়েছেন। একটু গভীরভাবে ভাবতে গেলে নিশানকে তিনি অথর্ব হিসেবে তৈরী করে রেখে গেছেন। কারণ ওর নিজের কিছু করার ক্ষমতা নেই, ও’কে যদি চৌধুরী পদবী বহন করতেও হয় তবে পুরো লাইফ তোমার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে। আর তোমাকে গড়ে গেছে ঠিক উল্টো। আত্মবিশ্বাসী, সাহসী, বেপরোয়া, জেদি। তোমার বাবা মাইন্ডগেম খেলেছেন তার স্ত্রীর সঙ্গে। তোমাকে সবকিছু থেকে পিছিয়ে রাখা, নিশানের সঙ্গে কম্পেয়ার করা সবকিছুই তার গেমের অংশ। আজকের সবকিছু দেখে, শুনে মনে হলো নিজের মৃত্যু নিয়েও তিনি আগেই পরিকল্পনা করেছেন। “
“হোয়াট ডু ইউ মিন?”
“তার মৃত্যুটাও পূর্ব পরিকল্পিত। তিনি ইচ্ছেমৃত্যু বেছে নিয়েছেন। নিশানকে প্রজা, আর তোমাকে রাজা বানাতেই তিনি মৃত্যু বেছে নিয়েছেন। “
ইশান স্থির চোখে তাকিয়ে আছে। কাজরী যদিও সম্ভাব্য ধারণা প্রকাশ করেছে, তবে ভ্যালিড পয়েন্টে কথা বলছে।
“নিজের জীবনের চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ তার বংশ, মর্যাদা স্ট্যাটাস। “
ইশানের কপালে সূক্ষ্ম ভাজ। কাজরী আবারও বলল,
“একটা সা*পের বাচ্চাকে যত্ন করে বড় করে, ছোবল মারা শিখিয়ে বিষ দাঁত ভেঙে ফেললে তার আর কোনো শক্তি থাকে না। নিশান এখন সেইরকম। “
“এক্সাক্টলি। “
কাজরীর মাথায় আরেকটা কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। আখতারউজ্জামান এর চাওয়া ছিলো নিশানের সঙ্গে বিয়ে হোক। ওয়াজেদ চৌধুরী সেটা চায় নি, উনি স্বেচ্ছায় কাজরীকে নিজের ছেলের বউ বানিয়েছেন। কিন্তু কেন? উনি তো এতো সহজ চিন্তার মানুষ ছিলেন না।
“তুমি যা ভাবছ আমিও তাই ভাবছি কাজরী। “
কাজরী চমকে উঠে প্রশ্ন করলো,
“কী?”
“আমার দাদী মন্যুজান খাতুন এর দুইজন স্বামী ছিলেন। প্রথম জন মারা যাবার পর তার ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়। বাবা ছিলেন প্রথম পক্ষের ছেলে। আর দ্বিতীয় পক্ষের ছেলে ছিলো তোমার বাবা। যদিও আমি শিওর না তুমি আসলেই তার মেয়ে কী না। “
কাজরী দৃঢ় গলায় বলল,
“আমি তার ই মেয়ে। “
“তাহলে তোমার জন্যও কিছু সারপ্রাইজ অপেক্ষা করে থাকতে পারে। যদিও তিনি আমার বাবা, তবুও স্বীকার করতে আপত্তি নেই যে তিনি তোমাকে সহজভাবে মেনে নেবার মতো লোক ছিলেন না। “
কাজরীর চোখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ। ইশানকেও চিন্তিত দেখালো।
চলবে……..
Share On:
TAGS: কাজরী, সাবিকুন নাহার নিপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাজরী পর্ব ৪
-
কাজরী পর্ব ২০
-
কাজরী পর্ব ১১
-
কাজরী পর্ব ১০
-
কাজরী পর্ব ২
-
কাজরী পর্ব ১২
-
কাজরী পর্ব ২১
-
কাজরী পর্ব ১৬
-
কাজরী পর্ব ৬
-
কাজরী পর্ব ২৫