Golpo কাজরী

কাজরী পর্ব ২১


কাজরী-২১

সাবিকুননাহারনিপা

ইশান আবারও সেই বেপরোয়া জীবন যাপনে ফিরে গেছে। রাত জেগে পার্টি, ক্লাব কয়েকদিন বাড়িতে না আসা এটাই যেন রোজকার রুটিনে পরিনত হয়েছে। কাজরী নিজের বাইরে এই প্রথম কাউকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হচ্ছে। অন্যদিকে ইশান কাজরীর সঙ্গেও তেমন আচরণ করছে যেমনটা পরিবারের অন্য সবার সঙ্গে করে।

শিরিন ইশান কে নিয়ে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখালো না। ইশানের বেয়াদবি আচরণ নিয়ে কিছুটা হতাশ হলেও পুরোদমে নেমে পড়লেন নিশানকে গুছিয়ে দেবার জন্য। ওয়াজেদ চৌধুরীর পাকাপোক্ত জায়গায় নিশানকে বসিয়ে দিতে পারলেই তিনি খুশি। ইশান সবকিছু থেকে দূরে সরে গিয়ে সেই কাজটাও যেন সহজ করে দিচ্ছে।

দর্শনা অনেক দিন ধরেই নিয়ম করে প্যালেসে আসছে কিন্তু তেমন কোনো কাজ নেই। ঠিকঠাক সময়ে একাউন্টে স্যালারিও পেয়ে যাচ্ছে। ইশান স্যারের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েও সুযোগ পায় নি। শেষমেস কাজরীর সঙ্গে দেখা করতে হলো।

কাজরী দর্শনাকে প্রশ্ন করলো,

“বলো আমি তোমাকে কী সাহায্য করতে পারি?”

দর্শনা ইতস্তত করলো। ও’কে যে কাজরীর দিকে নজরদারি করার জন্য এপোয়েন্ট করা হয়েছিল এই বিষয় টা বলা উচিত হবে কী না সেটা নিয়ে ভাবলো। ইশান স্যার ও’কে বলেছিল কাজরী ওর সিক্রেট প্রজেক্ট। এখন যদি সেই বিষয়টা শেয়ার করে চাকরি খুইয়ে ফেলে!

কাজরী তাকিয়ে আছে জিজ্ঞাসু চোখে। মেয়েটা কী ভাবছে সেটা নিয়ে ওর আগ্রহ নেই। অপেক্ষা করছে ওর কথা শোনার জন্য।

“আসলে ম্যাম আমার একটু স্যারের সঙ্গে দেখা করবার দরকার ছিলো। “

“তাহলে করো। “

“সুযোগ পাচ্ছি না। ইরফান স্যারকেও বলেছিলাম কিন্তু উনি কোনো আপডেট দেয় নি। “

“আচ্ছা।”

কাজরী সময় দেখলো। ওর এখন বেরোনোর সময়। তবুও মেয়েটাকে সময় দিলো কারণ ভেবেছিল জরুরী কিছু। কাজরী নিজেও ইশানের সময় পাচ্ছে না। আলাদা রুমে থাকছে, কখন আসছে কখন যাচ্ছে সেটারও ঠিক ঠিকানা নেই। একজন স্টাফের সামনে সেটা প্রকাশ করে নিজের দূর্বলতা দেখানোর মানেই হয় না। এমনিতেই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পর্কে একটা মিথ আছে। তাদের নাকি দুটো জীবন থাকে, একটা ঘরে আরেকটা বাইরে। ঘরের বউ থাকে পুতুলের মতো। আর বাইরের জীবন হয় এডভেঞ্চারের মতো। কাজরী যদি বলে ইশানকে আমিও তোমার মতো পাচ্ছি না তাহলেই অন্য ব্যাপার রটে যাবে। তাই মুখে আলগা হাসি ঝুলিয়ে বলল,

“আমি তোমার কথা বলব ইশান কে। এখন তুমি যেতে পারো। “

“থ্যাংক ইউ ম্যাম। “

দর্শনা উঠে চলে যাবার জন্য ঘরের বাইরে পা রাখবে এমন সময় ওর পাশ দিয়ে ঝড়ের গতিতে নিশান ঢুকলো।

“কাজরী তুমি কোথায় যাচ্ছ?”

কাজরী শাড়ির অবাধ্য আঁচল টা গোছাতে গোছাতে স্বাভাবিক গলায় প্রশ্ন করলো,

“কেন?”

“ড্রাইভার কে গাড়ি বের করতে বলেছ নাকি? মা জানে?”

কাজরীর ভ্রু কুঞ্চিত হলো। জিজ্ঞেস করলো,

“তাকে কেন জানাতে হবে? আমি যেখানে খুশি যেতে পারি। “

“উঁহু পারো না। মা সবাইকে বারণ করে দিয়েছে। মিডিয়া পেছনে পড়ে আছে, প্রতিটা মুভমেন্টের খবর রাখছে। আরও কিছুদিন সবার বাইরে যাওয়া বন্ধ। “

কাজরী ভাবলেশহীন গলায় বলল,

“আমি তো যাব। “

নিশানের চোয়াল শক্ত হলো। বলল,

“এখন কোথাও যাবার প্রয়োজন নেই। “

কাজরী এতক্ষন স্বাভাবিক গলায় কথা বললেও এবার ওর গলার স্বর রুক্ষ হলো। বলল,

“এক্সকিউজ মি! তুমি ঠিক করে দিবে আমি কোথায় যাব কী যাব না?”

নিশান কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকালো। পরবর্তীতে নিজের পাওয়ার জাহির করার জন্য বলল,

“একটু আগে বললাম না যে বাইরে গেলে কী সমস্যা হতে পারে…!

“ডোন্ট টক টু মি লাইক দ্যাট! তোমার বাবাও এই টোনে আমার সঙ্গে কথা বলে নি। তুমি তো তার সস্তা কপি হবার চেষ্টা করছ, এই ব্যাপার টা মাথায় ঢুকিয়ে নাও। নরমালি কথা বললে বুঝতে পারো না তোমরা?”

নিশান থেমে গেল। পরবর্তী শব্দগুলো কী বলবে সেটা নিয়ে ভাববার অবকাশ পেল না। কাজরী কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে বলল,

“এমনিতে তো সব ঠিক আছে…. তোমার মাকে কেন বিকেলের আড্ডা বন্ধ করতে বলছ না কেন? ওপস সরি! মিডিয়া তো প্যালেসের বাইরে। ভেতরের আড্ডাবাজি তো টের পায় না। “

দর্শনার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল কাজরীর। আড়ি পেতে কথাগুলো শুনছিলো, ভেবেছিল চলে যাবে কিন্তু তার আগেই কাজরীর সামনে পড়ে গেল। সেই সঙ্গে নিশানের নজরেও পড়লো। কাজরী হাসি দিয়ে দর্শনাকে বলল,

“সামনে বিয়ে আছে। তুমি অনেক কাজের সুযোগ পাবে। ইশান স্যারের সঙ্গে কথা বলার দরকার নেই। আমি ই তোমার কাজ খুঁজে দিলাম। “

দর্শনা চোখ নামিয়ে নিলো। বুক ঢিপঢিপ করছে। নিশান কে ওর নিপাট ভদ্রলোক মনে হয়েছিল। একটু আগের কনভার্সেশন আর নিশানের কথা বলার ধরনে সেই ধারণা পাল্টে গেল।


কাজরী গন্তব্য হলো আখতারউজ্জামান এর বাসা। সচেতন ভাবে আখতারউজ্জামানকে বাবা বলা ও এড়িয়ে যায়। ইদানীং ওর টেনশনের অন্যতম কারণ হলো ইশান। দিন দিন উচ্ছন্নে গিয়ে নিজের ভয়ানক ক্ষতি করছে। সেই টেনশন ওর না করলেও চলে, কারণ ওর মাথায় সবচেয়ে বড় টেনশন এখন দুর্জয়। সমানে থ্রেট দিচ্ছে। দেখা না করলে আল্পনার সঙ্গে ওর প্রাইভেট ফটো, ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিবে। আল্পনার সঙ্গে সঙ্গে ওর মান, সম্মানও যাবে। কাজরী তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত নয়। কিন্তু বিচলিত করছে ইশান। ওর নিজস্ব লাইফস্টাইল যে ও’কে ডুবিয়ে দিবে সেটা বুঝতে পেরেও কেন যে ডুবতে চাইছে!

দুর্জয়ের সঙ্গে কাজরীর দেখা হয়েছিলো মেলবোর্ন এর কফিশপে। দেখা হওয়া, ক্যাজুয়াল কথাবার্তা হওয়া ছাড়া তেমন কিছু না। ফটোগ্রাফি ওর প্যাশন ছিলো। কাজরীর সুন্দর কিছু ছবি ও তুলে দিয়েছিল। ক্যামেরার লেন্সেও যে শিল্প ধরা পড়ে সেটা দুর্জয়ের ফটোগ্রাফি দেখে বুঝেছিল। দুজনের মধ্যে কনভার্সেশন এগিয়েছে। দেখা করা, এক্সিবিশনে যাওয়া এসব ব্যাপার এনজয় করেছে কাজরীও। সত্যি বলতে কাজরীর ও’কে ভালো লেগেছে তবে ও নিজের বাউন্ডারি ক্রস করে নি। যখন সাধারণ ভালোলাগাটা অন্য মাত্রায় পৌছাতে যাচ্ছিলো তখনই কাজরী দুজনের মাঝখানে বলয় তৈরী করে দিলো। সরাসরি জানিয়েছিলো যে ওর বিয়ে ঠিক আছে পারিবারিক ভাবে। ওদের মধ্যে ফ্রেন্ডশিপ ছাড়া আর কিছু হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু দুর্জয় ও’কে অবাক করলো। শান্ত, ভদ্র প্রকৃতির দেখতে হলেও সে যেন নাছোড়বান্দা। কাজরীকে তার জীবনে চাই। প্রথমে অনুনয়, পরবর্তীতে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল। কাজরী পুরোনো কথা ভেবে আপনমনে হাসে।

দুর্জয়ের কোনো মেসেজ, কলের রেসপন্স ও করে নি। ওর সিক্সথ সেন্স বলছে ফোনটা ইশান ট্র‍্যাক করছে। ইশান ও’কে একবিন্দুও বিশ্বাস করে না। নিজের জীবনের গল্প ও ইশানকে বিশ্বাস করাতে পারলেও মানুষ কাজরীকে ইশান বিশ্বাস করতে পারে নি।

সেদিন যে চুমু খেল জোর করে। এক ঘন্টার মধ্যে ফিরেও এসেছিল। কাজরী তখন ঘুমের ভান করে শুয়ে ছিলো। ইশান ওর উপর ঝুঁকে তাকিয়ে ছিলো। তারপর হঠাৎ ই বলে উঠলো,

“কী নিখুঁত অভিনয়! বোঝার উপায় নেই যে তুমি ঘুমাও নি। এতো নিখুঁত ভাবে অভিনয় যে করতে পারে সে চাইলে খু*নও করতে পারবে! “

কাজরী চোখ খুলে নি। সেদিন ই বুঝতে পেরেছিল যে ওর মনে সন্দেহের বীজ ভালোভাবেই বাড়ছে।

কাজরী গন্তব্যে পৌছে গেল। ড্রাইভারকে বলে দিলো যেন দুইঘন্টা পর আসে। ভেতরে ঢুকতেই দেখলো আখতারউজ্জামান দাঁড়িয়ে আছেন।

“কেমন আছ তুমি? সব ঠিক আছে? “

“আমি ঠিক আছি।”

কাজরী আখতারউজ্জামান এর মুখের অভিব্যক্তি পড়ার চেষ্টা করলো। ওর বাবা নন উনি, তবুও এই মুহুর্তে ওনার অস্থিরতা, টেনশন আপনজনের মতো।

আখতারউজ্জামান মেয়েকে বসতে দিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করলেন। বললেন,

“ওদিকের অবস্থা কী?”

“ওদের সবসময় ই কোনো না কোনো নাটক চলে। সেই নাটকে টুইস্টও থাকে। মিস্টার চৌধুরীর ডেথ ন্যাচারাল হলেও তার দুই ছেলেমেয়ের সূক্ষ্ম ধারণা হলো তাদের মা কিছু করেছে। “

আখতারউজ্জামান এর কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়লো।

“আমিও ভাবতে পারছি না যে উনি এভাবে মারা যাবেন। “

কাজরী নিজের মনোভাব প্রকাশ করলো না। এই মানুষটার সামনেও প্রকাশ করতে চাইলো না যে ও কতটা ভেঙে পড়েছিল। “

“তুমি সুবর্ননগর না গিয়ে ভালো করেছিলে। আমি একটু বিরক্ত হয়েছিলাম অবশ্য….

কাজরী হেসে বলল,

“আপনি অনেক ব্যাপার ই কম বোঝেন। সেই কারণে কিছু ভুল সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেন। যেমন নিয়েছিলেন আমার বিয়ের সিদ্ধান্তটা। “

আখতারউজ্জামান এই প্রসঙ্গে চুপ থাকতে চাইলেন। তিনি একটা গোলকধাঁধায় আটকে গেছেন। তরফদারের ছেলেকে তিনি মারেন নি, অথচ তরফদার ধরে নিয়েছেন তিনিই আসল কালপ্রিট। অবশ্য তার একটা দোষ ছিলো। তিনি ওয়াজেদ চৌধুরী কে ঠান্ডা হুমকি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন যে আমার মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলেই আমি সব সত্যিটা সামনে আনব। আপনার অনেক ক্ষমতা আছে জানি, তবুও সবাই জেনে যাবে যে আপনার পরিবার কেমন ছিলো। আর সেটা জানার পর সুবর্ননগর থেকে আপনার রাজনীতি করা মুশকিল হয়ে যাবে।

তিনি এই হুমকি সিরিয়াসলি নিয়েছিলেন। রাজনীতির জন্য নয়, বরং নিজের কেচ্ছা কাহিনী সামনে যেন না আসে সেজন্য। তরফদারের ছেলেকে শেষও করিয়েছিলেন তিনি। এরপর নাটকীয় ভাবে আখতারউজ্জামান এর শর্তও মেনে নেন। পুরো ঘটনায় কৌশলে তাকেই ফাঁসিয়ে যান।

“আপনি মনে হয় কিছু ভাবছেন! আমি আল্পনার সঙ্গে দেখা করে আসি। “

আখতারউজ্জামান অন্যমনস্ক ছিলেন। বললেন,

“আচ্ছা। “

তার মনে রইলো না যে কাজরীর কাছে জানতে চাইবেন কেন আল্পনার দিকে নজর রাখতে বলা হয়েছে।


“কেমন আছ কাজরী?”

কাজরী আপদামস্তক আল্পনাকে দেখে বলল,

“যখন ছোট ছিলাম তখন আমার প্রায় ই মনে হতো যে আমাদের মা আসলে অসুস্থ নন, তিনি নাটক করছেন অসুস্থ হবার। “

আল্পনা বুঝতে পারলো না কাজরীর কথা। এটা কাজরীর স্বভাব। হেয়ালি করে কথা বলা। আল্পনা স্বাভাবিক গলায় বলল,

“তুমি আমার পিছনে স্পাই লাগিয়েছ কাজরী? কেন? আমি তো তোমার লাইফে ইন্টারফেয়ার করি না, তুমি কেন করছ?”

কাজরী অবাক হলো না। স্বাভাবিক গলায় বলল,

“আমি ততক্ষণই ভালো, যতক্ষণ আমার সঙ্গে কেউ ভালো থাকে। আর যখন খারাপ হয়, তখন আমাকেও সেই রুপ ধারণ করতে হয়। আমার রিসিপশনের দিন যে স্ক্রিপ্টে অভিনয় করেছ তুমি! হ্যাটস অফ আল্পনা। আমার ভাগ্য এখনো পর্যন্ত ভালো যে শ্বশুর বাড়িতে নিত্য নতুন নাটক হয় বলে এই ব্যাপার টা নিয়ে কিছু আগায় নি। “

আল্পনা মাথানিচু করে ফেলল। চুপ থাকা মানে পরাজয় স্বীকার করা হবে ভেবে সাহস করে আবারও মিথ্যে বলল।

“আমি তোমার ভালোর জন্যই করেছি যা করার। কিন্তু তুমি আমার লাইফে ইন্টারফেয়ার করছ। বাবাকে কী বলেছ! আমাকে বাইরে কেন যেতে দিচ্ছে না?”

কাজরী ফোন থেকে সেই ভিডিও টা প্লে করে দেখালো। আল্পনা চোখে পলক ফেলা ভুলে গেছে। পুরো ভিডিও টা দেখার সাহস পেল না, অথচ ভিডিওটা ওরই। কী লজ্জা! আল্পনা মুখ ডেকে ফেলল।

কাজরী স্বাভাবিক গলায় বলল,

“হোটেল রেডিসনে আমার স্পাই ছিলো না। তবুও ভিডিও টা আমার কাছে এসেছে! কিভাবে বলোতো?”

আল্পনার কাছে সব জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। পায়ের তলায় মেঝে থাকা স্বত্তেও মনে হলো ও শূন্যে ভাসছে। চোখ তুলে বলার চেষ্টা করলো,

“কাজরী আমি……

আল্পনা কিছু বলার সুযোগ পেল না। কাজরী গায়ের সমস্ত জোর খাটিয়ে ওর গালে থা*প্পড় মারলো। আখতারউজ্জামান এসেছিলেন মেয়েকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে। তিনি দৃশ্যটা দেখে হতভম্ব হলেন। ছোট বোন বড় বোনকে এভাবে মারছে….. কেন?…..

চলবে……

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply