কাজরী-২০
সাবিকুননাহারনিপা
এক মাস ধরে কাজরী সবাইকে নিজের ভিন্ন রুপ দেখাচ্ছে। শান্ত, নম্র, বিনয়ী রুপ। ঠিক যেভাবে আখতারউজ্জামান এর মেয়েকে সবাই ভেবেছিল। এর কারণ তো নিশ্চয়ই আছে। প্যালেসের সবাই ভাবছে কাজরী ভয় পাচ্ছে। ভয় পাচ্ছে শাশুড়ী শিরিন চৌধুরী কে। কোনো এক কারণে ওয়াজেদ চৌধুরীর আখতারউজ্জামান কে হাতে রাখা দরকার ছিলো। রাজনীতিতে শক্ত পদক্ষেপ রাখার জন্যই বোধহয় আখতারউজ্জামান কে দরকার, কাজরীও তাই অহংকারের পাখনায় উড়ছিল। এখন ওয়াজেদ চৌধুরী নেই, ইশানকে হাতের মুঠোয় করতে তো পারে নি, তাই চৌধুরী প্যালেসে ওর দিন অল্পকদিনের। শিরিন তার লোকেদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কাজরীকে বেশী বিরক্ত করার দরকার নেই। আমার প্যালেসে মেহমানদের যেমন খাতির যত্ন করা হয় তাকেও তেমন ট্রিট করা হোক। তাই বাকীরাও কাজরীকে এক রকম অগ্রাহ্য করছে রীতিমতো।
কাজরী শান্ত, চুপচাপ অন্য কারণে আছে। সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে। দুর্জয় অসংখ্যবার ওর সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলতে চাইলেও ও রেসপন্স করেনি। এমনকি আল্পনাকেও কিছু বলে নি। আখতারউজ্জামান কে বলেছে শুধু আল্পনার দিকে নজর রাখতে। ও’কে যেন কোথাও একা যেতে না দেয়। আখতারউজ্জামানও মরিয়া হয়ে আছেন কাজরীর সঙ্গে কথা বলার জন্য। সরাসরি কথা বলার প্রয়োজন। কাজরী তাকেও ধৈর্য্য ধরতে বলেছে। এমনকি প্যালেস থেকেও ও কোথাও যাচ্ছে না।
ওয়াজেদ চৌধুরীর এর অনুপস্থিতিতে প্যালেসে বেশ পরিবর্তন এসেছে। ইশানকে একটু বেশীই ডিপ্রেসড লাগছে। কিন্তু ঠিক উল্টোটা হচ্ছে নিশান। বেশ ফুরফুরে মেজাজে তাকে দেখা যাচ্ছে। যেন অলিখিত নিয়ম অনুযায়ী ও হতে যাচ্ছে পরবর্তী রাজা।
ডিনারে আজ সবাইকে ডাকা হয়েছে। সবাই অপেক্ষা করছে শিরিনের জন্য। আজ কাজরীর পাশের চেয়ারে বসেছে এশনা। এই মেয়েটিকে দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে প্রিয়জন হারানোর বেদনা কতোটা গভীর। ফ্যাশন সচেতন এশনাকে দেখলে হঠাৎ অদ্ভুত লাগে। অথচ তার মায়ের তেমন ভ্রুক্ষেপ নেই। কাজরী জিজ্ঞেস করলো,
“এশনা তোমার কী শরীর খারাপ? “
এশনা চমকে উঠে তাকালো। এমনভাবে তাকালো যেন চিনতে পারছে না ও’কে। প্রশ্নের জবাব না দেয়ায় কাজরীও আর কথা বাড়ালো না। শিরিন এসে মিস্টার চৌধুরীর চেয়ারে বসলেন। কাজরী মুখোমুখি বসা ইশানের দিকে তাকালো। ইশানের ঠোঁটে মুচকি হাসি। ঠিক ধরেছে, আজ এখানে শিরিন চৌধুরী যা কিছু বলবেন ইশান অবশ্যই সেটার বিরোধিতা করবে।
শিরিন স্বাভাবিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে সহজেই। একেক মানুষের শোক প্রকাশের ধরন আলাদা হবে স্বাভাবিক। তবে কাজরীর পর্যবেক্ষণ বলছে শিরিনের তেমন শোকতাপ নেই। বরং এরকম একটা পরিস্থিতির জন্য তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
শিরিনের পরনে লাইট পার্পল কালার এর জর্জেট শাড়ি। গলায়, কানে হিরের নেকলেস। সন্ধেবেলা কিটি পার্টিতে যাবার সময় তাকে এমন সাজে দেখা যায়। ডিনারে ম্যাক্সিমাম সময় ই তাকে দেখা যায় রাত পোশাকে।
শিরিন গম্ভীর গলায় বললেন,
“চৌধুরী সাহেবের অবর্তমানেও তার নিয়ম গুলো আগের মতোই চলবে। খাবার টেবিলে সবাই একইরকম এটেন্ড করবে।”
ইশান হাই তুলে বলল,
“চৌধুরী সাহেবের অবর্তমানে ওনার নিয়ম তো অলরেডি তুলে দেয়া হলো। আগে সবাই ব্রেকফাস্ট এর টেবিলে এটেন্ড করতো, এখন ডিনারে। কারণ তোমার ঘুম ভাঙে এখন মিড মর্নিং এ। এটা তো তোমার নিয়ম। “
শিরিন বিরক্ত হলেও সেটা প্রকাশ করতে চাইলেন না। বললেন,
“তোমার কী কোনো অসুবিধা হচ্ছে? “
ইশান সরাসরি মায়ের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলল,
“হ্যাঁ হচ্ছে। নিজের নিয়ম গুলো মৃত স্বামীর নামে চালিয়ে নিজেকে কুইন প্রমাণ এর যে হাস্যকর চেষ্টা করছ তাতে আমার আপত্তি আছে। আজ ই শেষ দিন, এরপর আর আমাকে কোনো ডিনার, লাঞ্চ কিছুতে ডাকবে না। “
শিরিন স্তব্ধ হলেন যেন। ইশান তার সঙ্গে খোঁচামূলক কথাবার্তা কখনো বাড়ির অন্য সদস্যের সামনে করে না, আজ সরাসরি অপমান করছে। ইশান মায়ের প্রতিক্রিয়া দেখার অপেক্ষা না করেই উঠে চলে গেল। নিশান বাঁজখাই গলায় ডাকলো,
“ইশান মায়ের কথা শেষ হয় নি। বসো তুমি! “
কাজরী কৌতুকবোধ করলো। নিশানের মিনমিনে গলার স্বরের পরিবর্তে গম্ভীর গলা রীতিমতো হাস্যকর লাগছে। ইশান অপ্রিয় বড় ভাইয়ের উদ্দেশ্যে মিডল ফিঙ্গার প্রদর্শন করে সিড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল। শিরিন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন। তাকে আরও বেশী হতভম্ব করে এশনা বলল,
“আমাকেও এসবে ডাকবে না। তোমাদের ড্রামায় আমার কোনো ইন্টেরেস্ট নেই। “
বাকী রইলো রোদেলা, আশফাক, আইরিন, ম্যানেজার ইরফান, কাজরী ও নিশান। শিরিন আজ পারিবারিক মিটিং এ ম্যানেজার ইরফানকেও ডেকেছিল। কী বিশ্রী অপমানের মুখোমুখি দাঁড় করালো ইশান তাকে। শিরিন অপমানে লাল হয়ে আছে, নিজেকে সংবরন করে বললেন,
“তোমরা খেতে শুরু করো। “
কাজরী নিশানের দিকে তাকিয়ে দেখছিল। চোখাচোখিও হয়ে গেল দুজনের। আগে মনে হতো ইশান সব ব্যাপারে একটু বাড়াবাড়ি করে এটেনশনের জন্য। আজ নিশানকে মনে হচ্ছে তেমন। বেচারা নিজেকে কী যে ভাবছিল! ছোট ভাই তাকে এক সেকেন্ডে নিজের অবস্থান বুঝিয়ে দিয়ে গেছে।
ডাইনিং টেবিলে থমথমে পরিবেশ। রোদেলার স্বামী আশফাক উশখুশ করছে। বেচারা খাওয়া শুরু করবে কী না বুঝতে পারছে না। ও’কে অস্বস্তি থেকে বাঁচাতে কাজরী প্লেটে খাবার তুলে নিলো। দেখাদেখি আশফাকও তুলে নিলো। শিরিন বসে আছেন থমথমে মুখে। মনে হচ্ছে ইশান নয়, এশনার অপমানেও তিনি বিব্রতবোধ করছে। নিশান চেষ্টা করছে মায়ের ম্যুড ঠিক করার। নিচু গলায় বোধহয় দুই, একটা শান্তনা দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করলো। কাজরী কানখাড়া করে শোনার চেষ্টা করেও তেমন কিছু শুনতে পারলো না। হঠাৎ চোখ গেল রোদেলার দিকে। ও অদ্ভুত চোখে কাজরীর দিকে তাকিয়ে আছে। চোখাচোখি হতেই ভ্রু নাচিয়ে কাজরী জানতে চাইলো রহস্য কী! রোদেলা চোখে পলক ফেলে খাবার প্লেটে নজর দিলো। আবার যখন তাকালো তখন কাজরী স্পুন নড়াচড়া করছে। রোদেলার সম্পূর্ণ মনোযোগ এখন খাবার প্লেটে।
কাজরী হঠাৎ থমথমে পরিবেশে প্রশ্ন করলো,
“আন্টি আপনি মেবি কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চাইছিলেন?”
শিরিন চকিতে তাকালেন কাজরীর দিকে। সঙ্গে সঙ্গে চোখও নামিয়ে নিলেন। নিশান চোখ পাকিয়ে তাকালো কাজরীর দিকে। শিরিন গলা পরিস্কার করে বলল,
“তেমন কিছু না… সবার সঙ্গে বসে রাতের খাবার খাওয়ার ইচ্ছে আর কী!”
কাজরী এরপর তাকালো ইরফান সাহেবের দিকে। পারিবারিক এমন নাটক বোধহয় তিনি অনেক দিন ধরে দেখে এসেছেন তাই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে খাবার খাচ্ছেন। রোদেলা ভুলেও আর তাকাচ্ছে না কাজরীর দিকে।
শিরিনের প্লেটে খাবার যেমন ছিলো তেমন ই আছে। তিনি খাবার নাড়াচাড়া করছিলেন। তাকে গভীর দৃষ্টিতে দেখছে কাজরী। নিজেকে ধাতস্থ করে শিরিন উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন,
“আমার হয়ে গেছে, আমি উঠছি। আর নিশান, অনামিকা নিউইয়র্ক থেকে আসছে ফ্যামিলিসহ। ও’কে রিসিভ করার ব্যবস্থা করতে বলে দিও ইরফান কে। আর অনামিকা খুব তাড়াতাড়ি ফ্যামিলি মেম্বার হতে যাচ্ছে। এই ইনফরমেশন টা সকলের জানা থাকুক।”
কাজরী ঠোঁট উল্টালো। অবশেষে আজকের ডিনারের উদ্দেশ্য জানা গেল। নিশানের বিয়ে! অনামিকা বলে একজনের এন্ট্রি হবে প্যালেসে। ইশানের উচিত ছিলো শেষ অবধি থাকা! নিশানের বিয়ের খবরে ওর প্রতিক্রিয়া কী সেটা দেখা যেত।
ইশান তৈরী হচ্ছে। ডেনিম জ্যাকেট গায়ে জড়িয়ে যখন বের হবে তখন কাজরী উপস্থিত হলো। দুজনের মধ্যে একটা দূরত্ব এসেছে এখন। দূরত্ব টা ইশানের তরফ থেকে। নিজেই আলাদা ঘরে থাকছে, কখন বাইরে যাচ্ছে কখন আসছে তার কোনো সময় জ্ঞান নেই। কাজরী একদিন ভোর অবধি ইশানের জন্য অপেক্ষা করলো সেদিন বেলা এগারোটায় ইশান ফিরেছে।
এই দূরত্ব কাজরীর জন্য সুখকর হওয়া উচিত ছিলো। কোনো ঝামেলা নেই, অস্বস্তি নেই। তবুও ও ইশানের প্রতিক্ষায় থাকে। রাতে ঘুম ভেঙে গেলে সময় দেখে, ফোন হাতে নিয়ে কল দিতে গেলেও থেমে যায়।
“কী হলো? পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছ কেন?”
“কোথায় যাচ্ছ ইশান?”
“কৈফিয়ত দিতে হবে? তোমাকে? “
কাজরী দমে গেল। ইশান কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কাজরী যখনই ওর সঙ্গে কথা বলতে আসে তখনই ওর কপালে ভাজ থাকে। দেখেই বোঝা যেত প্রচন্ড বিরক্ত। আজ নরম গলায় প্রশ্ন করছে। ইশান মনে মনে হাসে। এই মেয়েকে নিয়ে পজিটিভ ভাবনা! নো ওয়ে, ওর মনে প্রতিনিয়ত প্রতিশোধের ভাবনা, চিন্তা চলে।
“প্রশ্ন কেন করছ ডার্লিং? একজন স্পাই লাগিয়ে দিলেই তো পারো। “
“অনামিকা কে ইশান?”
কাজরী প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করলো।
ইশান হাতের ঘড়িটা ঠিক করতে করতে বলল,
“আমার কোনো গার্লফ্রেন্ড ছিলো কী না মনে করতে পারছি না। “
“নিউইয়র্ক থেকে অনামিকা আসছে ফ্যামিলিসহ। মোস্ট প্রবাবলি তোমাদের নিউ ফ্যামিলি মেম্বার হতে যাচ্ছে অফিশিয়ালি। “
ইশান তীর্যক হেসে বলল,
“মামীর বোনের মেয়ে। ভাসুরের বিয়ের খবরে তুমি তো দারুণ এক্সাইটেড! বাহ!”
“তুমি এক্সাইটেড না?”
ইশান ব্যাঙ্গাত্মক সুরে বলল,
“অফ কোর্স। “
কাজরীকে কথা বাড়াতে না দিয়ে ইশান বেরিয়ে গেল। ওর ভালো লাগছে না। কোনো কারণ ছাড়া এই অস্বস্তির জন্য নিজের উপর রাগ লাগছে। ইশান ফিরে এলো এক মিনিটের মধ্যে। কাজরী যেমন দাঁড়িয়ে কথা বলছিলো তেমন ই দাঁড়িয়েছিলো।
ইশান কাজরীর হাত ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে বলল,
“তোমার মাথায় কী চলছে কাজরী?”
কাজরী তাকিয়ে রইলো। ইশানের প্রশ্নটা খুব সিরিয়াসলি নিয়ে ভাবতে লাগলো। কী চলছে ওর মাথায় এখন! আল্পনার ভাবনা, দুর্জয়ের থ্রেট, শিরিন চৌধুরীর পরিবর্তিত রুপ, এশনার ডিপ্রেসড হওয়া, সিন্দুক থেকে উদ্ধার হওয়া চিঠির লেখাগুলো উদ্ধার করার চিন্তা। “
ইশান প্রশ্নের জবাব না পেয়ে আবারও প্রশ্ন করলো,
“আমাকে নিয়ে তোমার প্ল্যান কী?”
কাজরী অন্যমনস্ক আছে। এতোসব জটিল ভাবনা, চিন্তার মধ্যে ইশান নেই। ইশান কে নিয়ে ওর স্বচ্ছ চিন্তা ভাবনা।
ইশান এবারও প্রশ্নের জবাব পেল না। নি:শব্দে হেসে একটা কাজ করে ফেলল। আচমকা কাজরীর ঠোঁটে চুমু খেতে লাগলো। কাজরী বুঝে উঠে যখন প্রতিরোধ করতে গেল তখন ইশান ওর হাত চেপে ধরলো শক্ত করে।
ইশান সুইট রিভেঞ্জ নেয়া শেষ হলে গভীর গলায় বলল,
“ভেবো না যে আমি সুইজারল্যান্ডের সুইমিং পুলের ঘটনা ভুলে গেছি, টমাসের বার্থডে পার্টির ঘটনাও মনে আছে। সব শোধ নেয়া হবে। আমার এবসেন্ট মাইন্ড এর সুযোগে চিল থাকার কিছু নেই। “
কাজরী রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
চলবে……..
Share On:
TAGS: কাজরী, সাবিকুন নাহার নিপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাজরী পর্ব ৬
-
কাজরী পর্ব ১৮
-
কাজরী পর্ব ১০
-
কাজরী পর্ব ১৭
-
কাজরী পর্ব ১
-
কাজরী পর্ব ২
-
কাজরী গল্পের লিংক
-
কাজরী পর্ব ৪
-
কাজরী পর্ব ১২
-
কাজরী পর্ব ৩