Golpo কাজরী

কাজরী পর্ব ১৮


কাজরী-১৮

সাবিকুননাহারনিপা

মৃত্যু অবধারিত, এটা তো চিরন্তন সত্য। কিন্তু আকস্মিক মৃত্যু মর্মান্তিক। ওয়াজেদ চৌধুরীর আকস্মিক মৃত্যুটা শুধু তার পরিবার, স্টাফ, শুভাকাঙ্ক্ষীদের জন্য নয়, কাজরীর জন্যও শকিং বটে। কাজরী জীবনে প্রথম এতো দূর্বল হলো। করিডোরে দাঁড়িয়ে যখন খবরটা শুনেছিল তখন ও কাঁপছিলো থরথর করে। নিজেকে সামলাতে না পেরে হাটুমুড়ে যখন বসে পড়লো তখন শবনম ছুটে এসে ধরলো।

কাজরী চোখ খুলে দেখলো শবনম ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

“ম্যাম এখন শরীর কেমন? ডক্টর কল করব?”

কাজরী উঠে বসে মৃদু স্বরে বলল,

“আমার ফোন টা?”

শবনম এগিয়ে দিলো। কাজরী ফোনটা হাতে নিলো। লক করা আছে, তবুও শবনম দুর্জয়ের পাঠানো ভিডিও টা দেখেছে কী না!

শবনম অরেঞ্জ জ্যুস এনে ওর সামনে রেখে অনুরোধের সুরে বলল,

“একটু খেয়ে নিন, আপনার শরীর খুব খারাপ। “

কাজরী গম্ভীর গলায় বলল,

“থ্যাংক ইউ। তুমি এখন যাও প্লিজ। “

কাজরী ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ফেলল। বুকভরে নি:শ্বাস নিলো। মুখে পানির ঝাপটা দিতে লাগলো অনবরত। ঝাপসা আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হলো প্রতিবিম্ব যেন উপহাস করছে। ওয়াজেদ চৌধুরীর সঙ্গে ওর প্রথম দেখা সুবর্ননগরে সেই বিয়ের দিনেই। দুজনের কেউই এর আগে মুখোমুখি হয় নি। কাজরী চায় নি আগ বাড়িয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে, তিনিও সরাসরি কখনো সামনে আসেন নি। দুজন যখন আলাদা করে কথা বলার সুযোগ পেল তখন তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন,

“কাকে তুমি সবচেয়ে বেশী ঘৃনা করো আমাকে নাকি তোমার বাবাকে?”

কাজরী উপহাসের সুরে প্রশ্ন করেছিল,

“বাবা! যে মানুষের অস্তিত্ব পর্যন্ত নেই তাকে কিভাবে ঘৃনা করা যায়! তবে আপনি চাইলে তার ভাগের অংশটুকু বহন করতেই পারেন। “

“সব বাড়ির কিছু নিয়ম থাকে। বংশ পরম্পরায় সেই নিয়মগুলো নীতি হয়ে যায়। তোমার মা চৌধুরী বাড়ি ছেড়েছিল কারণ সে শর্ত মানতে পারেন নি। শর্তটা মঙ্গলজনক ছিলো না। তবে সেই শর্ত চাপিয়ে দিয়েছিলেন তার স্বামী। চৌধুরী পরিবারের আর কেউ সেখানে হস্তক্ষেপ করেন নি। তোমার জেদ আমি বুঝতে পারছি, যে বাড়িতে তোমার মায়ের জায়গা হয় নি সেখানে তুমি স্ত্রীর পরিচয় চাও। বেশ মেনে নিলাম তোমার শর্ত। তবে সেটা ভয়ে নয়, ভয় আমি কোনোকালেই কাউকে পাই নি।”

“তবে আমাদের দেখা হতে এতো দেরি কেন হল?”

“কারণ তুমি প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছ। আগেও বলেছি যে তোমার মায়ের পরিনতির জন্য আমি কিংবা অন্যকেউ দায়ী নন। তোমার বাবা, মায়ের পারস্পরিক সিদ্ধান্তই একে অন্যের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু চৌধুরী প্যালেসে তুমি বউ হয়ে গেলে প্রতিহিংসায় অন্য কারো ক্ষতি হয়ে যাবে। “

“এই যে আপনি বললেন না ভয় পান না। কিন্তু এখন যে কথাগুলো বলছেন সেগুলো ভয়ের কথা। আপনি আপনার পরিবারকে নিয়ে ভয় পাচ্ছেন। তবে আমি আপনার চেয়ে রাজনীতি টা কম বুঝি। আপনার পরিবারের বউ হওয়া আমার প্রধান উদ্দেশ্য। যে অবস্থানে আমার জন্মদাত্রীর থাকার কথা সেখানে আমি থাকব। ব্যস এতটুকুই! আর কিছু না।”

ওয়াজেদ চৌধুরী কাজরীর মাথায় হাত রেখে বললেন,

“আমি মন থেকে দোয়া করি, তুমি সুখী হও। “


“কাজরী… কাজরী….

ইশানের ডাকে সম্বিৎ ফিরে পায় কাজরী। দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। আধভেজা অবস্থায় দেখেও ইশান প্রশ্ন করলো না। ফোন টা চার্জে রেখে বলল,

“তুমি কী যেতে চাও সুবর্ননগর?”

কাজরী এক সেকেন্ড সময়ও নিলো না জবাব দিতে। বলল,

“না। “

ইশান পিছু ফিরে ওর চোখের দিকে তাকালো। বোধহয় চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করলো।

“আমার যাওয়া ঠিক হবে না ইশান। কেন সেটা আমি তোমাকে পড়ে এক্সপ্লেইন করব। “

ইশান গম্ভীর গলায় বলল,

“এক্সপ্লেইন করার প্রয়োজন নেই। আমি সব জানি, সব বুঝি। “

ইশান বেরিয়ে গেল দ্রুত গতিতে। ওর গলায় কী অভিমান ছিলো! থাকতেই পারে। বাবাকে নিয়ে আক্ষেপ, বিতৃষ্ণা যা কিছুই থাকুক। ঘৃনা তো আর করতো না।


শিরিন শক্ত ধাচের মানুষ। এতো শক্ত যে চোখ দুটো ছলছল পর্যন্ত করে ওঠে নি একবারও। হাসপাতালে মৃত্যু সংবাদ টা শুনে তিন ছেলে মেয়েই ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েন নি। একটা চাপা আর্তনাদ ছিলো বুকের ভেতর। ব্যস অতোটুকুই! তার তিন সন্তানের বাবা চলে গেলেন এই সুন্দর ধরনী ছেড়ে। তার শোকে কয়েক ফোঁটা জল কী কাম্য ছিলো না! কিন্তু তিনি তো কাঁদতে পারেন নি।

প্যালেসে ফিরে শাশুড়ীর ঘরে গেলেন। বৃদ্ধা তখন নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমাচ্ছিলেন। শিরিন অপেক্ষা করলেন পাশে বসে। মন্যুজান খাতুন জেগে প্রশ্ন করলেন,

“শিরিন তুমি? কখন আসছ? ওয়াজেদ আসছে তোমার সাথে? “

শিরিন বৃদ্ধার শুকিয়ে যাওয়া হাতখানা পরম মমতায় ধরে বললেন,

“আম্মা মন শক্ত করেন। আপনি শক্ত মানুষ, আরও শক্ত হতে হবে। আমাদের মাথার উপর থেকে আপনার ছেলের ছায়া উঠে গেল। আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি চলে গেলেন। “

শিরিন এক নি:শ্বাসে কথাগুলো বলে দম ছাড়লেন। মন্যুজান খাতুন বোকার মতো তাকিয়ে রইলেন। শিরিনের কথার অর্থ বুঝতে তার সময় লাগলো। তিনি হু হু করে কাঁদতে শুরু করলেন বাচ্চাদের মতো। শিরিন তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। মন্যুজান খাতুন বিশ্বাস করতে পারছেন না। তার সুস্থ, সবল ছেলেটা এক রাতের মধ্যে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেলেন আর সেখান থেকে ফিরে এলেন না। তিনি এখনো বেঁচে আছেন অথচ সন্তানেরা তার সামনেই মেঘের ওপারে পাড়ি জমালেন! এরচেয়ে নির্মমতা বোধহয় আর কিছুই হয় না।

আখতারউজ্জামান কাজরীকে কল করলেন।

“তুমি ঠিক আছ?”

“হ্যাঁ আছি। আমি সুবর্ননগর এখন যেতে চাচ্ছি না। “

“কেন? না গেলে খারাপ দেখায় না। এটা তো ফ্যামিলি ফাংশান না যে স্কিপ করলে ক্ষতি নেই।”

“আমি ওখানে গেলেও লাভ কিছু নেই। তাছাড়া….

আখতারউজ্জামান অপেক্ষা করলেন কাজরীর বাকী কথা শোনার। কিন্তু ও বাক্য শেষ করলো না। বলল,

“আমি সামলে নেব। ইশানের মায়ের সঙ্গে কথা বলব। “

আখতারউজ্জামান হ্যাঁ, না কিছু বললেন না। তিনি কল কেটেও গম্ভীর হয়ে আছেন। এতো সহজ ভাবে ওয়াজেদ চৌধুরী মারা গেলেন! এটা কী স্বাভাবিক মৃত্যু! তিনি সকাল থেকে এটাই ভাবছিলেন।


হাসপাতালের ফর্মালিটি শেষ করে সুবর্ননগরের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে ওয়াজেদ চৌধুরীর মৃতদেহ। চৌধুরী প্যালেসে আর আনা হবে না। প্যালেসের লোকজন সবাই ই যাচ্ছে। কাজরী শিরিনের সামনে পড়লো না ইচ্ছে করেই। এখন ওনার সামনে পড়ে অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করার কোনো মানে হয় না। কাজরী কথা বলতে গেল নিশানের সঙ্গে। নিশান ওর ঘরেই ছিলো। কাজরীকে দেখে জিজ্ঞেস করলো,

“তুমি কিছু বলবে? “

“হ্যাঁ। নিশান আমার মনে হচ্ছে সুবর্নগরে যাওয়া উচিত হবে না।”

নিশানের কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়লো।

“তোমার অসুবিধে হলে যাবে না।”

“আমার সুবিধা অসুবিধার কথা ভাবছি না। যে পরিস্থিতিতে আমার আর ইশানের বিয়ে হয়েছে তাতে এই মুহুর্তে ওখানে না থাকাই সকলের জন্য মঙ্গল। “

নিশান একটু ভাবলো। কাজরীর কথাটা উড়িয়ে দেয়া যায় না। মিডিয়া, নিউজ পোর্টাল গুলো ওরা চাইলেও এড়াতে পারবে না৷ রঙচঙ মিশিয়ে অনেক কিছু লেখা হবে। এখনই সেসব শুরু করে দিয়েছে।

“আচ্ছা। “

“এই কথাটা তোমার মা’কে একটু বলবে প্লিজ। তিনি যেন আমাকে ভুল না বোঝেন। “

এই পরিস্থিতিতেও নিশান কাজরীর অসহায় হয়ে যাওয়া রুপ পর্যবেক্ষণ করলো। মাথা নেড়ে সায় দিলো।

কাজরী শিরিনের সঙ্গে দেখা করতে না গেলেও তিনি ঠিকই এলেন। তাকে দেখে কাজরী এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো। শিরিন কিছু ভাবলেন না। শোকের সময় এই আলিঙ্গন কে তিনি সাদরে গ্রহণ করলেন। কাজরীকে বললেন,

“নিশান নাকি তোমাকে যেতে বারণ করেছে শুনলাম। আসলে পরিস্থিতি অনুযায়ী না চাইতেও অনেক কিছু করতে হয়। “

কাজরী মনে মনে নিশানের কাজে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলো।

“তুমি সাবধানে থেকো। স্টাফরা থাকবে কয়েকজন। মিডিয়া ইন্টারভিউ নিতে চাইলে সেটা এড়িয়ে যাবে। আর… তুমি তো অল্প সময় শ্বশুরের সান্নিধ্য পেয়েছ, যদি তার কোনো আচরণে কষ্ট পেয়ে থাকো তাহলে বিনয়ের সাথে ক্ষমা করে দিও।”

কাজরী শিরিন কে দেখে ভারী অবাক হলো। শান্ত, সহজ হয়ে আছে। বেশভূষায় পরিবর্তন যেমন এসেছে তেমনি কথা বলার ধরনে, আচরণেও। শিরিন কী তবে এক্ষুনি প্রস্তুত করে নিলো নিজেকে ওয়াজেদ চৌধুরীর জায়গায় বসানোর। এখন সব দায়িত্ব তার কাঁধে৷ সন্তান, সংসার, বৃদ্ধা শাশুড়ী।


আল্পনা ভয়ে ভয়ে বাড়িতে ফিরলো। হোটেল রেডিসনের বন্ধ রুমে এতোটা মগ্ন ছিলো যে দিন দুনিয়ার কোনো খবর ওর কাছে নেই। বাসায় ফিরে সব শুনে খানিকটা নিশ্চিন্ত বোধ করলো যেন। কারণ এই ঘটনার কারণে ওর এতোটা সময় বাসায় না থাকার ব্যাপার টা কেউ জানতে পারলো না।

আল্পনা আয়নায় নিজেকে দেখে। ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। নিজের জগতের সবচেয়ে সুখী রাজকন্যা এই মুহুর্তে। অন্য জগতের শোকতাপ, দু:খ নিয়ে ওর তেমন কোনো ভাবনা নেই। তবে নিজেকে সুখী রাজকন্যা ভাবতে থাকা আল্পনার জগৎ তাসের ঘর হয়ে যেতে পারে যেকোনো সময়।


ইশান কে এশনা বলল,

“ভাইয়া মাম্মা আর বাবার ম্যারিড লাইফ ত্রিশ বছরের বেশী না?”

ইশান এশনার প্রশ্ন টা বুঝতে পেরেও চুপ করে ছিলো। কারণ ও এখন স্তব্ধ হয়ে আছে। এশনা ইশান কে বলল,

“মাম্মা জানতো বাবা মারা যাবেন। সেজন্য আমাকে থেকে যেতে বলেছিল। “

ইশান বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে ছিলো এশনার দিকে।

চলবে…..

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply