Golpo কাজরী

কাজরী পর্ব ১৭


কাজরী-১৭

সাবিকুননাহারনিপা

আল্পনার নার্ভাস লাগছে। হোটেল রেডিসনে যখন ঢুকলো তখন কেমন ভয় পাচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো কেউ বুঝি ও’কে অনুসরণ করছে। গন্তব্যে পৌছানোর আগেই এখান থেকে নিয়ে যাবে। ফোনে আবারও টুং শব্দ করে মেসেজ এর আওয়াজ এলো। আল্পনা লিফটে ঢুকে গেল। বুক দুরুদুরু করছে। পার্স থেকে আয়না বের করে এক লহমায় নিজের মুখটা দেখে নিলো। না, ঠিক আছে। সোনালী ব্লাউজের সঙ্গে মানানসই কালো জর্জেট শাড়ি পরেছে। আয়নায় নিজেকে দেখেছে মুগ্ধ নয়নে। এতো ভালো করে অনেকদিন নিজেকে খেয়াল করে না।

আল্পনা লিফট থেকে বেরিয়ে এগিয়ে গেল কয়েক পা। নাম্বার মিলিয়ে রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। এমন অনুভূতির সঙ্গে ওর নতুন পরিচয়। ভয়ের সঙ্গে মিশে আছে শিহরন। দরজায় মৃদু টোকা দিলো দু’বার। দরজা খুলে গেল। আল্পনা যেন জমে গেছে। জুতোর তলায় আঠা লেগে শক্ত হয়ে আছে যেন। ও পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছে। ভরাট কন্ঠস্বরে একজন বলল,

“ভেতরে আসো আল্পনা। “

আল্পনা পা বাড়াতে গিয়ে থমকে গেল। একবারও মনে হলো না ভুল কিছু করছে। তবে বেখেয়ালে পা হড়কে পড়ে যাবার প্রবল সম্ভাবনা তো ছিলোই। শক্ত, পুরুষালি হাতটা ও’কে সামলে নিলো।


ইশান খবর টা পেল সকালে। সব গুছিয়ে সন্ধ্যের ফ্লাইট ধরতে হলো। দীর্ঘ জার্নি, ইশানের অস্থিরতা স্পষ্ট। কাজরী পাশে বসে সবটা পর্যবেক্ষণ করলো। জিজ্ঞেস করলো,

“কী হয়েছে এক্সাক্টলি জানো?”

“শরীর খারাপ। হার্ট অ্যাটাক মনে করা হচ্ছে। “

কাজরী অস্ফুটস্বরে আচ্ছা বলল। ইশানকে টেনশনে দেখে ওর খারাপ যেমন লাগছে না, তেমন ভালোও লাগছে না। কাজরী ওর হাত ধরে বলল,

“রিলাক্স ইশান। টেনশন করে তুমি কিছু করতে পারবে না। “

ইশান কাজরীর চোখের দিকে তাকালো। এই মুহুর্তে ও খুব ভয় পাচ্ছে, কাজরী যেটাকে টেনশন ভাবছে সেটা আসলে প্রচন্ড ভয়। এই ভয় অমূলক যেন হয়! কাজরী ওর হাত ছেড়ে দেয় নি, শক্ত করে ধরে রেখেছে।

কাজরীর ভাবনা জুড়ে অন্যকিছু। হুমাইরার কাছে আল্পনার কথা শুনে মনে হচ্ছে ও কোনো বিপদে জড়িয়ে যাচ্ছে। বোকা মানুষ হঠাৎ নিজেকে চালাক মনে করলে সেটা বিপদ হয়। অবশ্য আল্পনা যে বোকা সেটা কাজরীর একান্ত ভাবনা। তবে কাজরী জানেনা যে ও যাকে বোকা ভেবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে সে কাজরীর অন্যতম প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারে।


“বউমা…. শিরিন…”

“শরীর খারাপ লাগছে? পানি খাবেন?”

মন্যুজান খাতুন চোখ পিটপিট করে তাকালেন।

“দাদী আমি কাজরী। “

“তোমরা না বিদাশ ছিলা?”

“আজই এলাম দাদী। আপনি এখন কেমন আছেন? “

মন্যুজান খাতুন কাজরীকে ভালো করে দেখলেন। শাড়ি পরা যখন থাকে তখন একদম কোমলের মতো দেখতে লাগে। রোগা পাতলা গড়ন, মিষ্টি মুখটা সব যেন কোমলের আদলে গড়া। শুধু এই মেয়ের চোখের ভেতর আগুন আছে। আর কোমল ছিলো শান্ত চোখের মেয়ে। তার ভাইয়ের একমাত্র মেয়ে ছিলো কোমল। আদরের ছোট ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে এনেছিলেন তার ঘরে। ভেবেছিলেন জীবনের শেষ অবধি কোমল তার সঙ্গে থাকবেন। শেষবেলায় মুখে অন্ন তুলে দিবে পরম যত্নে। মন্যুজান খাতুন বিশ্বাস করতে চান এই মেয়েটি কোমলের। যদি তা হয়ে থাকেও তবুও তো তার কিছু না। আখতারউজ্জামান এর সঙ্গে কোমল…. ছি: ছি:!

মন্যুজান খাতুন এর মন টা বিতৃষ্ণায় ভরে উঠলো। রুক্ষ স্বরে বললেন,

“তুমি যাও এখান থিকা। যাও যাও। “

কাজরী শান্ত স্বরে বলল,

“আপনার কাছে একটু বসি।”

মন্যুজান খাতুন এবারে আর কিছু বললেন না। কাজরীর জন্য তিনি আলাদা টান অনুভব করেন। এই মুহুর্তে তার মন মমতায় ভরে উঠলো। ইচ্ছে করছে সিন্দুকের চাবি তুলে দিয়ে বলতে,

“যা আছে সব নিয়ে যাও। এতদিন তোমার জন্য আগলায়ে রাখছি। এখন সব তোমার। “

কাজরী আবারও ডাকলো,

“দাদী একটু ফল কেটে দেব আপনাকে?”

মন্যুজান খাতুন আবারও তাকালেন। নরম গলায় বললেন,

“সিথানের কাছে সিন্দুকের চাবিটা আছে। ওইটা তোমার কাছে রাখো। “

কাজরী নিশ্চুপে হেসে ফেলল।


“তুমি আমাকে কেন খুঁজছিলে আল্পনা?”

আল্পনা আড়ষ্ট হয়ে গেল। জবাব দেবার বদলে মৃদু হাসলো। সামনের মানুষটা ওর দিকে তাকিয়ে আছে পলকহীন দৃষ্টিতে। সেই দৃষ্টির ভাষা আল্পনার জানা নেই। তবে ও শিহরিত হচ্ছে, লজ্জা পাচ্ছে।

“আমাকে কোনো প্রশ্ন করতে চাও? “

আল্পনা মাথা নেড়ে না বলল।

“কেন সেদিন তোমাকে আটকে রেখেছিলাম সেটা জানতে চাও?”

আল্পনা এবারও মাথা নেড়ে না বলল।

লোকটির মৃদু হাসির শব্দে আল্পনা চোখ তুলে একবার তাকালো। অনেকক্ষন তাকিয়ে দেখার ইচ্ছে থাকা সত্যেও সেটা দমন করতে হলো। লোকটা এবার আরেকটু এগিয়ে ওর কাছে এসে বসলো। শরীরের পুরুষালী গন্ধের সঙ্গে পারফিউমের কড়া সুবাস যেন মাদকতা সৃষ্টি করেছে। আল্পনা বুক ভরে নি:শ্বাস নিলো। লোকটা গভীর গলায় বলল,

“আল্পনা তুমি ভীষণ সুন্দর। “

আল্পনার গালে রক্তিম আভা, যেটা স্বচক্ষে দেখতে না পেলেও অনুভব করতে পারলো। ওর পাশে যে বসে আছে সে তাকিয়েও আছে গভীর দৃষ্টিতে। আল্পনা আটকে রাখা নি:শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“আমি এখন আসি। “

দ্রুতপায়ে প্রস্থান করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। ওর হাত পেছন থেকে ধরে এক ধাক্কায় নিজের সঙ্গে মিলিয়ে নিলো লোকটা। আল্পনা চোখ বন্ধ করে রাখলো শক্ত করে, চোখের পাতা কাঁপছে। ওর সুন্দর মসৃন চুলগুলো সরিয়ে লোকটা ওর গালে গাল ঘষলো। আল্পনা আরও আড়ষ্ট হয়ে গেল যেন। অদৃশ্য ছটফটানি মনে চললেও শরীর যেন নিথর। লোকটা মাদকীয় গলায় বলল,

“আমার নাম টা জানতে চাও না?”

আল্পনা জবাব দেয়ার মতো পরিস্থিতিতে নেই। জীবনে প্রথম কোনো পুরুষ এর সান্নিধ্যে এসেছে ও।

“আল্পনা আমার নাম দুর্জয়। “

দুর্জয়! দুর্জয় নামটা দুইবার আওড়ালো মনে মনে। হঠাৎ আল্পনাকে ভীষণ রকম চমকে দিয়ে দুর্জয় ওর ঠোঁটে ঠোঁট রাখলো।


শিরিন বসে আছে কঠিন মুখে। তিনি জানেন আজকের ডেট টা তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিন হতে যাচ্ছে। মনকে শক্ত করে ফেলেছে৷ ইশান, নিশান দুজনে যে যার মতো ছোটাছুটি করলেও তিনি শক্ত হয়ে আছেন। তাকে শক্ত হয়ে থাকতে হবে। এশনা তার পাশে বসে কাঁদছে। এতো বাবা অন্ত:প্রাণ কী করে হলো কে জানে!

শিরিন এখনো ইশানের মুখোমুখি হন নি। ইশান বাবাকে দেশের বাইরে ট্রিটমেন্ট এর জন্য নিয়ে যেতে চাইছে৷ ডাক্তার এখনো সাহস করে উঠতে পারছেন না, শিরিন নিজেও চৌধুরীর শারীরিক অবস্থা দেখে বুঝতে পারছেন যে চিকিৎসায় তার আর কাজ হবে না।

রাতে তিনি সবার সঙ্গে বসে ডিনার করলেন। মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে খানিকক্ষণ তার পাশে বসে রইলেন। এরপর নিজের ঘরে গেলেন ঘুমাতে। অনেক বেলায়ও যখন তার ঘুম ভাঙে নি, তখন ম্যানেজার ইরফান নিশান কে জানালো ব্যাপার টা। নিশানই বাবাকে অচেতন অবস্থায় পেল। অতিদ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। ডাক্তার জানালেন মাল্টিপল অর্গান ফেইলিউর।

শিরিন ভাবছেন মন্যুজান খাতুন এর কথা। তিনি দু:স্বপ্ন দেখেছিলেন। ধারণা করেছিলেন একজন মারা যাবে। তবে তার ধারণা ছিলো সেই একজন হবেন শিরিন। এশনা হঠাৎ মা’কে ডাকলো,

“মাম্মা!”

শিরিন তাকালেন। কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে মেয়েটা। মুখটা শুকনো লাগছে। শিরিন নরম গলায় বললেন,

“বলো। “

“তোমার সিক্সথ সেন্স কী এটাই বলছিল?”

শিরিন বিস্মিত নয়নে তাকিয়ে রইলেন এশনার দিকে।


কাজরী আন্দাজ করতে পারে নি একই সঙ্গে দুটো দু:সংবাদ ঝড়ের গতিতে ছুটে আসবে ওর জীবনে। ফোনের পজ করা ভিডিওটি প্লে করার সাহস পাচ্ছে না আর! আল্পনা দুর্জয়ের সঙ্গে। দুর্জয় ওর জীবনের ছেড়ে আসা অসমাপ্ত একটা অধ্যায়। কোনো ক্ষতি ও করে নি দুর্জয়ের। শুধু ওর পথ চলার সঙ্গী হতে চাওয়ার ব্যাপার টি ভদ্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল।

কাজরী গুঞ্জন শুনে সিড়ির কাছে এসে দাঁড়ালো। স্টাফরা অস্থির হয়ে কথা বলছে, আইরিন কাঁদছেন। রোদেলা পাশে বসে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। হ্যাঁ, এই তো কিছুক্ষন আগে বিশিষ্ট শিল্পপতি, সমাজসেবী ও চৌধুরী গ্রুপের কর্নধার ওয়াজেদ চৌধুরী হাসপাতালের আইসিউতে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেছেন।

চলবে…….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply