Golpo কাজরী

কাজরী পর্ব ১৫


কাজরী-১৫

সাবিকুননাহারনিপা

১৯৯৮ সালের ১৪ ই নভেম্বর রাতের ঘটনা। সুবর্ননগর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে একটি গাড়ি রওনা হয়েছে। গাড়িতে লোক ছয় জন। একজন ড্রাইভার ছাড়া বাকী চারজনের মধ্যে দুজন পুরুষ, দুজন মহিলা আর দেড়, দুবছরের একটা বাচ্চা । গাড়িটা নিরিবিলি জায়গায় থেমে গিয়েছিল। একদল লোক সুনশান, নিরিবিলি জায়গায় গাড়িটাকে আটকে ফেলেছিলো। তারা ছিলেন ডাকাতদল। ড্রাইভারসহ বাকী দুজন পুরুষের সামনে থেকে মহিলা দুজন কে নামানো হলো গাড়ি থেকে। তিনজন শক্ত, সামর্থ্য বলিষ্ঠ পুরুষ চুপচাপ দাঁড়িয়ে বর্বর দৃশ্যটি করুন চোখে দেখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারলেন না। কারণ ছোট বাচ্চা মেয়েটি ডাকাতদের কবলে আছে।

ডাকাত দল একজন মহিলাকে তুলে নিয়ে গেলেন, অন্যজন কে জঙ্গলে ছেড়ে দিলেন ভোরের আলো ফোঁটার পর।

ঘটনাটা ভাবতে গেলে অত্যন্ত স্বাভাবিক কোনো ডাকাতির ঘটনা। ধনাঢ্য পরিবারের বউদের গা ভর্তি গয়না থাকবে সেগুলো দখল করা তাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু বিষয় টা তেমন ছিলো না। ডাকাতদল একজনকে তুলে নিয়ে গেলেন, যাকে জঙ্গলে অচেতন অবস্থায় ফেলে রেখে যাওয়া হয় তার শরীরে প্রতিটি গয়না সুরক্ষিত থাকে। তাহলে কী দাঁড়ায়! স্বর্নালংকার, ক্যাশ টাকা ডাকাতি করা ওদের উদ্দেশ্য নয়। তবে উদ্দেশ্য কী ছিলো! নির্মম কিছু সত্য। সুন্দরী, রূপবতী বউটিকে তুলে নিয়ে যাবার অর্থ লজ্জা ও বিভৎসতার।

কিন্তু তারা ভুল করলেন। যাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি ছিলেন ভুল মানুষ। এবার আসি মহিলা দুজনের পরিচয়ে। একজনের নাম ছিলো আয়েশা আহমেদ। শিল্পপতি জয়নাল আহমেদের মেয়ে এবং অ্যাডভোকেট আখতারউজ্জামান এর স্ত্রী। একটি ফুটফুটে সরল, নিষ্পাপ কন্যা সন্তানের মা। আর অন্যজন! তার ডাকনাম ছিলো কোমল। শুনেছি খানদানী বংশের মেয়ে ছিলেন। রুপবতী মেয়েরা নাকি সাধারণত বুদ্ধিমতি হয় না, তবে তিনি ছিলেন সর্বগুনসম্পন্না। খুব ছোট থাকতে মা’কে হারিয়েছিলেন বলে তার বাবা চেয়েছিলেন এমন কোনো বাড়িতে তার বিয়ে হোক যেখানে সুখ, শান্তির আশ্রয় ছাড়া ভালোবাসা, মায়ার আশ্রয়ও থাকবে। বাবার পছন্দ মেনে তিনি বিয়ে করেন এক রাজপুত্রকে। কিন্তু রাজমহলে অপেক্ষা করছিলো কুচক্রী কিছু মানুষ। রাজপুত্রের নাম ছিলো ইফতেখার উদ্দীন চৌধুরী। তার বড় ভাই তোমার বাবা ওয়াজেদ চৌধুরী।

ইশান চমকে উঠলো। কাজরী ওর এক হাত দূরত্বে বসে গল্পটা বলছে। ইশানের মনে অজস্র প্রশ্ন জমা হয়েছে। কাজরী ও’কে ইশারায় প্রশ্ন করতে বারণ করলো।

গতকাল পার্টি থেকে দুজন আলাদাভাবে ফিরেছে। এরপর যে যার ঘরে। কেউ কারোর সঙ্গে কথা বলে নি। সারারাত নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করে কাজরী সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও ইশানকে সত্যি টা জানাবে। বাবা আখতারউজ্জামান ওর সিদ্ধান্তে একমত হবেন না, তবে কাজরী নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল। প্রথম দিন শিরিন ওর চোখে চোখ রেখে যে এক্সপ্রেশন দিয়েছিলেন তাতে স্পষ্ট বোঝা গেছে তিনি কাজরীর পরিচয় সম্পর্কে জানেন। অস্বস্তি তৈরী হলো যখন মন্যুজান খাতুন ও’কে দেখে প্রতিক্রিয়া দেখালেন। কাজরী নিজেও বিস্মিত হয়েছিল বটে। জন্মদাত্রী সম্পর্কে অল্প কিছু কথা শুনলেও তার ছবি দেখার সৌভাগ্য ওর হয় নি। সত্যিই কী ওর চেহারার সঙ্গে এতো মিল! নাহলে বৃদ্ধা মন্যুজান খাতুন কোমল কোমল বলে মূর্ছা গেলেন কেন!

এই ঘটনার পর কাজরী নিশ্চিত হয় যে শুধু ওয়াজেদ চৌধুরী নয়, শিরিন চৌধুরীও ওর পরিচয় জানেন। তিনি ছেলের বউ হিসেবে ও’কে মেনে নিতে না পারলেও সহ্য করা সম্ভব না। তাই তিনি ইশানকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন কাজরীকে চৌধুরী প্যালেস থেকে বের করার জন্য। পরোক্ষভাবে হলেও ওয়াজেদ চৌধুরীও এটাই চাইছেন।

ইশান বাকরুদ্ধ হলো। কাজরীর বলা গল্পটা ও’কে সত্যিই চমকে দিয়েছে। এই গল্পের সত্যতা নিয়ে এই মুহুর্তে ওর মনে কোনো প্রশ্ন আসছে না। কাজরী যতক্ষন কথা বলছিল ইশান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো চোখের দিকে। সাধারণত যারা মিথ্যে বলে তাদের চোখের অভিব্যক্তিতে মিথ্যেটা স্পষ্টমান হয়। বাবার এক ভাই আছেন এতটুকুই জানে ইশান। খুব ছোটবেলায় দেখেছে কী না সেটা নিয়েও সন্দিহান। দাদীর কাছে তার গল্প শুনেছে। অত্যন্ত সুপুরুষ, বিচক্ষন একজন লোক ছিলেন। তার অকাল মৃত্যুতে মন্যুজান খাতুন আজও আবেগে দু:খে কেঁদে ভাসান। একখানা ছবি ফটোফ্রেমে বন্দী করে আটকে রাখে নিজের সিন্দুকে। মন্যুজান খাতুন ছেলের গল্প করার পাশাপাশি পুত্রবধূর গল্পও করেন। কিন্তু তিনি বিস্তারিত কিছু বলেন না।

কাজরী কাঁচের দেয়াল থেকে তাকিয়ে দেখছে লেকের স্বচ্ছ নীল জল। ইশান নি:শব্দে এসে দাঁড়িয়েছে পেছনে। এখনো রাতের পোশাকেই আছে কাজরী। চুলগুলো পিঠময় ছড়ানো। চলনে পরিপাটি ভাব নেই যেন। মনের অস্থিরতা যেন শরীরি ভাষায়ও জানান দিচ্ছে। ইশান সম্ভবত প্রথমবার গভীর গলায় ডাকলো,

“কাজরী!”

কাজরী তাকালো। বুদ্ধিদীপ্ত, তেজী চোখে কী নিদারুণ অসহায়ত্ব! ইশানের বুকের ভেতর ধাক্কা লাগলো। কেন কে জানে! আদুরে গলায় বলল,

“লাঞ্চ তো স্কিপ করেছ, এখন লাইট কিছু খাবে চলো। “

কাজরী জবাব দিলো না। তাকালো নীল জলের দিকে। চোখ বন্ধ করে ফেলল, কয়েক ফোঁটা অশ্রুজল গাল বেয়ে নামলো। ইশানকে দেখতে দিতে চায় না, তবুও আড়ালে থেকেও ইশান যেন ওই ব্যথার জলের অনুভব পেল।


তরফদার সাহেবের প্রস্তাব শোনার পর আখতারউজ্জামান চিন্তায় পড়ে গেলেন। তরফদাররা মানতে চায় না যে তাদের ছেলের মর্মান্তিক ঘটনায় আখতারউজ্জামান এর হাত নেই। তিনি যতই আত্মপক্ষ সমর্থনে কথা বলতে যায় ততবারই প্রশ্নবিদ্ধ হয় নিজের ক্ষমতা নিয়ে, অমনোযোগী, বেখেয়ালি আচরণ এর জন্য। এবং সেই সঙ্গে নিজের শত্রুতার জেরে তাদের সন্তান হারিয়েছেন বলে কাঠগড়ায় তুলতেও দ্বিধাবোধ করছেন না। তরফদার সাহেব শীতল গলায় আখতারউজ্জামান কে বললেন,

“আমরা এই কয় মাস শোকতাপে জর্জরিত ছিলাম জামান সাহেব। কিন্তু আপনার তো কোনো শোকতাপ নাই, যখন আমাদের ছেলের কাটাছে*ড়া হচ্ছে তখন আপনার ছোট মেয়ের বাসর সাজানোর প্রস্তুতি পরিকল্পনা নিয়ে ফেলছেন। রাজনীতিবিদ দের নীতির ঘাটতি থাকে সেটা আপনি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। “

আখতারউজ্জামান যথোপযুক্ত জবাব দিতে পারেন নি। এই একই কথা কাজরীও তাকে বলেছিল। বিয়ের সময়ক্ষণ জেনে কাজরী বিরুপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল, বলেছিল আপনি ভুল করছেন। এখন সেই সময় নয়, আল্পনার বিয়ের আসরে আমার বিয়ে হতে পারে না। আখতারউজ্জামান মেয়ের কথা শুনেন নি। কাজরী নিজের যুক্তি খণ্ডানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে মেনে নিয়েছিল।

আখতারউজ্জামান বিষয় টা নিয়ে চিন্তিত। সরাসরি তরফদারের মুখের উপর না বলা যাচ্ছে না। কারণ তিনি গুছিয়ে এসেছেন। তেমনি আল্পনার মতো শান্ত, সরল মেয়েটিকে জেনেবুঝে আ*গুনে নিক্ষেপ করাও কোনোভাবে সম্ভব নয়। তিনি ঠিক করলেন কাজরীর সঙ্গে এই বিষয়ে আলাপ করবেন। পরামর্শ চাইবেন। যে চক্রব্যুহের জাল তিনি ছড়িয়েছেন সেখানে নিজে আটকে যাচ্ছেন এখন। তবুও তার ক্ষতি হলে বিশেষ সমস্যা নেই, কিন্তু আল্পনা! মেয়েটা তো সরল, নিষ্পাপ।


চৌধুরী প্যালেসে বসেই কয়েক হাজার মাইল দূরের খবর সময়মতো পেয়ে যাচ্ছেন শিরিন। পার্টিতে বউয়ের হাতে ছেলে নাস্তানাবুদ হয়েছে সেই খবরেও বেশ আপ্লুত। তিনি এমনই তো চেয়েছেন। নিজেকে বিরাট কিছু ভাবতে থাকা মেয়েটা যেদিন পায়ের তলার আলগা মাটিটুকুও হারিয়ে ফেলবেন সেদিন তার থেকে বেশী খুশি কেউ হবেন না।

“মাম্মা তুমি বিজি?”

শিরিনের ধ্যান ভাঙলো। তিনি ল্যাপটপ টা বন্ধ করে মেয়ের দিকে তাকালেন। এশনা তার একমাত্র মেয়ে। দেখতে দেখতে কেমন বড় হয়ে গেল। এশনা নিউইয়র্ক ফিরে যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে আছে। কিন্তু শিরিন যেতে দিচ্ছে না। তিনি বলেছেন,

“আর ক’টা দিন থেকে যাও। আমার সিক্সথ সেন্স বলছে, এই মুহুর্তে গেলে তোমাকে আবার ফিরে আসতে হবে। “

এশনা মা’কে প্রশ্ন করে নি, তবে বিরক্ত হয়েছে। এবার একুশে পড়লো বয়স। নিজের গন্ডিটুকু ব্যক্তিগত করে নিয়েছে। এই জেনারেশন মাই লাইফ, মাই রুলস ফলো করতে ভালোবাসে বলে বাবা, মায়ের শাসনটুকু বাড়াবাড়ি মনে হয়।

“কিছু বলবে তুমি? “

“দাদুমনি একবার ডেকেছে তোমাকে তার ঘরে। “

“ওনার জ্ঞান ফিরেছে?”

“হ্যাঁ। স্যুপ খেল কিছুটা। “

শিরিন খেয়াল করলেন এশনা দাদীকে নিয়ে ভালোই উদ্বিগ্ন। ইশানকেও এমন দেখেছেন। এখনো সুযোগ পেলে ইশান ওই ঘরে ঢুকে সুপুরি কাটার দৃশ্যটা গভীর মনোযোগে দেখে। মন্যুজান খাতুনও ইশানকে একচোখা স্নেহ করেন। ইশান সেই স্নেহ সানন্দে গ্রহণ করে। এশনাকে তিনি পছন্দ করেন না তেমন, নিশানকে আরও কম। তবুও এশনার দাদীর প্রতি মায়া আছে ভালোই। নিশান অবশ্য তেমন নয়। শিরিন মাঝেমধ্যে সবকিছু দেখে ভাবেন নিশান কী আসলে একটু স্বার্থপর গোছের হলো তবে। ওর কী সত্যিই নিজস্ব কোনো নীতিবোধ তৈরী হয় নি।

মন্যুজান খাতুন কে দেখার জন্য সার্বক্ষণিক দুজন নার্স ও স্টাফ আছে। ডাক্তার নিয়ম করে খোঁজ নিচ্ছেন। তিনি হঠাৎ দুদিন আগে রাতে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তার আবার হাসপাতাল ভিতি আছে। হাসপাতালে যাবেন না বলে প্যালেসে ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শিরিন শাশুড়ীর ঘরে ঢুকে সবাই কে বাইরে যেতে বললেন। কারণ ভদ্রমহিলাকে বিশ্বাস করা যায় না, তিনি যেকোনো সময় উল্টাপাল্টা কথা বলতে পারেন।

“আম্মা আপনি আমাকে ডেকেছেন?”

মন্যুজান খাতুন চোখ খুলে তাকালেন। ক্লান্ত গলায় বললেন,

“আজগুবি স্বপ্ন দেখি বুঝছ। খুব ভয়ের স্বপ্ন। আমার ইশান কে আসতে বলো।”

“ইশান তো হানিমুনে আছে আম্মা। আপনার পছন্দের নাতবউ এর সঙ্গে ভালো সময় কাটাচ্ছে। আপনার এইটুকু অসুখের খবরে তাকে বিচলিত করা ঠিক হবে না। “

মন্যুজান খাতুন বুঝলেন কী না কে জানে! তবে শিরিনের গলার স্বর ভারী নিষ্ঠুর শোনালো। মন্যুজান খাতুন আবারও বললেন,

“আমি এখন মরব না। মরার আগে মানুষের মধ্যে কিছু চিহ্ন আসে। সেগুলা আসেনাই আমার। কিন্তু যে স্বপ্ন দেখছি তা খুব ভয়ের। সেই স্বপ্নের অর্থ আমি জানি, ইশানের তাড়াতাড়ি আসার দরকার। আমি না মরলেও অন্যকেউ মরবে। “

শিরিন তীর্যক হেসে বললেন,

“আচ্ছা! কে মরবে? “

মন্যুজান খাতুনের চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। তিনি হিসহিস করে বললেন,

“একটা স্বপ্ন দেখলাম নতুন ঘর তুলতেছে কারা জানি। তুমি নতুন শাড়ি পরে ঘরের মধ্যে ঢুকতেছ। পোলাপান সব আশেপাশে রাখো, তুমি মারা যাবা শিগগিরই। “

শিরিনের মুখটা ভোতা হয়ে গেল। এই মহিলা অসুস্থ অবস্থায়ও একটু শান্তি দিবে না তাকে।

চলবে…..

(বেশী বেশী করে লাইক, কমেন্ট করুন। পরবর্তী পর্ব জলদি পোস্ট করা হবে।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply