কাজরী-১৪
সাবিকুননাহারনিপা
লাউড মিউজিক, ঝলমলে আলো, একদল মানুষের নাচানাচি। এমন পার্টিতে কাজরী আগেও এটেন্ড করেছে। কিন্তু এটা স্পেশাল কারণ সঙ্গে ইশান আছে, সেই সঙ্গে আতঙ্কও আছে। কারণ ইশান মানেই তো জটিল কিছু ঘটতে পারে। অন্তত গতকালের ঘটনাটার পর কাজরী আরও সতর্ক হয়ে উঠলো। এই পার্টি এড়িয়ে যাবার সুযোগ ছিলো না, ইশান বলেছে মানে সেখানে যেতেই হবে।
কাজরীর পরনে ডার্ক রেড গাউন। হাতে ডায়মন্ডের ব্রেসলেটে আড়াল করা হয়েছে ক্ষতগুলো। পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে মাপা সাজগোজ। ইশান প্রথম যখন এই রুপে কাজরীকে দেখেছে তখন বুকের ভেতর কেমন একটা ধাক্কা লাগলো। এমন তো নয় সুন্দরী, আবেদনময়ী, মেয়ে প্রথম দেখছে। কিন্তু কাজরীর প্রতি অন্যরকম একটা ফিলিং আসছে। প্রায়ই ঘুমন্ত অবস্থায় ইশান তাকিয়ে থাকে। কেন থাকে সেটার ব্যখ্যায় যেতে চায় না। স্বীকার করতে চায় না যে কাজরীর প্রতি ওর তীব্র আকর্ষনবোধ তৈরী হয়।
ইশানকে ব্ল্যাক স্যুটে চমৎকার লাগছে। ওর ওয়ারড্রব এর সবকিছু ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট। কিন্তু ও’কে বেশীরভাগ সময় ব্ল্যাকেই দেখা যায়।
কাজরী পার্টিতে এসে বুঝলো এখানে যারা আছে তাদের অনেকেই ইশানের বন্ধু। এক সময়ের বিশেষ বন্ধু ত্বরিতাকে তো দেখেই চিনে ফেলল। ত্বরিতার পোশাক যথেষ্ট খোলামেলা। ঠিক মানাচ্ছে না, তবুও এমন ধরনের পোশাক পরিধানের অর্থ হচ্ছে নিজেকে আবেদনময়ী প্রমাণের ব্যপক চেষ্টা। ত্বরিতা ইশান কে দেখে জড়িয়ে ধরলো। ইশানকে একটু আড়ষ্ট মনে হলো। আড়চোখে কাজরীকে দেখলো। ইশানের ফ্রেন্ড রাহুল ও’কে ওয়েলকাম ড্রিংক অফার করে সূক্ষ্ম খোঁচার সুরে বলল,
“তোমার সঙ্গে তো ভালো করে কিছু হলো না। রিসিপশনের দিন তো ড্রামাটিক ইনসিডেন্ট হলো। নাহলে আমার কিন্তু তোমার বাসর অবধি পৌছে যেতাম। “
রাহুলের কথায় সৌমিক, রিয়াদ হেসে বলল,
“আরে ইশানের ওয়াইফ কিন্তু আমাদের সিস্টার ইন ল। লিমিট ক্রস করিস না। “
বন্ধুদের মধ্যে এ ধরনের ফাজলামো ধরনের কথাবার্তা হয়ে থাকে এটা কেউ কেউ স্বাভাবিক ভাবলেও কাজরী স্বাভাবিক ভাবে নিলো না। রিসিপশনের দিন ওদের সঙ্গে শুধু হ্যালো টাইপ কথাবার্তা হয়েছে। রসিকতা করার জন্য যতটুকু জানা, পরিচয় দরকার ততটুকু যেহেতু হয় নি তাই ব্যাপার টা ওর জন্য বিব্রতকর। কাজরী স্মিত হেসে বলল,
“আমাদের এই নিয়ে দুইবার দেখা হলো। তেমন আলাপ, পরিচয়হীন একজন মানুষের চিপ জোকস ডাইজেস্ট করতে পারছি না। আর আমাকে আপনি করে বললে খুশি হবো। “
তিনজনের মুখের উপর যেন সপাটে চড় পড়লো। সবচেয়ে বেশী লজ্জিত ও স্তম্ভিত হলো রাহুল। ইশানের বউকে ঘরোয়া, লাজুক মনে হয়েছিল। কিন্তু মুখের উপর এমন শক্ত জবাব দেয়া মেয়েকে এখন আর তেমন মনে হচ্ছে না। স্তম্ভিত রাহুল সরি বলার ফর্মালিটি পর্যন্ত ভুলে গেল। বাকী দুজন সরি ফিল করলো। কাজরী স্মিত হেসে ঠান্ডা গলায় হুমকির সুরে বলল,
“এটা ফার্স টাইম বলে সরি একসেপ্ট করলাম। “
তিনজন প্রস্থান করলো অতিদ্রুত। ইশানকে দেখা যাচ্ছে অন্য একটি মেয়ের সঙ্গে। ত্বরিতা ঘুরে ঘুরে কাজরীকে দেখছে। কাজরী একটা সফট ড্রিংকস নিলো। শো অফের জন্য নেয়া, এখানকার পানি পর্যন্ত ও খাবে না। ইশানকে বিন্দু পরিমাণ বিশ্বাস ও করতে পারে না। টিপিক্যাল বাঙালী চিন্তা চেতনা ওর মধ্যে না থাকলেও পারফেক্ট পার্টনারের ড্রিম সত্যিই ছিলো। চোখে চোখ রেখে রোমান্টিক লাইন বলা প্রেম, ভালোবাসাকে ওর ন্যাকামি ছাড়া কিছু মনে হয় না। তবে জীবনে একজন তো থাকবে যে সবসময় ওর হাসি, খুশির কারণ হবে। দু:খ, মন খারাপ এর দিনে পাশে থেকে ভরসা দিবে।
কাজরী ইশান কে দেখছে দূর থেকে। ঠোঁটে লেগে থাকা হাসিটা দেখে এই মুহুর্তে শ*য়তানের মতো মনে হচ্ছে না। কতো ভালো মানুষ বলে মনে হচ্ছে। অথচ গতকাল ই সে বিনা কারণে নিষ্ঠুর রুপ দেখিয়ে ফেলেছে।
ইশানের চোখে চোখ পড়লো। যার সঙ্গে কথা বলছিল তাকে কিছু একটা বলে কাজরীর কাছে এসে বলল,
“তুমি আমার ফ্রেন্ডস দের ইনসাল্ট করেছ?”
“জানোই যখন তাহলে প্রশ্ন কেন করছ। “
ইশান মৃদু হেসে বলল,
“ওরা যতটা ইম্পরট্যান্ট, তুমি ততটা নও। “
“এক্সাক্টলি এই কারণে ওরাও আমার কাছে গুরুত্ব পায় নি। “
“তুমি এক্ষুনি ওদের সরি বলবে। “
কাজরী হেসে ফেলল। দূর থেকে ত্বরিতা চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে দুজন কে। এতো সিরিয়াস আলোচনা করছে কী নিয়ে সেটা ভেবেই অস্থির। ইশান বদলে গেছে। আগের মতো পার্টিতে আসে না। কতোদিন পরে দেখা হলো, একটু জড়িয়ে ধরতেই বলল,
“উঁহু আমি এখন ম্যারিড। “
ত্বরিতা আহ্লাদী গলায় বলল,
“তুমি মানো এই বিয়ে? আমি জানি আঙ্কেল জোর করে এই বিয়ে দিয়েছে। “
“ভুল জানো। ফিল্মি কনসেপ্ট থেকে বেরিয়ে আসো। আমি না চাইলে আমাকে দিয়ে জোর করে কিছু করানো সম্ভব না। “
কথাগুলো বলে ইশান সরে গেল। এরপর যতবার ইশানের কাছে ঘেষতে গেছে ততবারই ও’কে এড়িয়ে গেছে।
ইশান কাজরীর হাত ধরে সুইমিংপুলের কাছে এলো। চারদিকে ঝলমলে আলোয় চোখ ঝলসে যাবার উপক্রম। ইশান কাজরীকে বলল,
“সরি না বললে আমি তোমাকে এই পুলে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেব। কে কী ভাববে আই ডোন্ট কেয়ার। কিন্তু আমি যেটা বলেছি সেটাই হবে। “
কাজরী স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো কিছু সময়। ইশানের চোখ দুটো উজ্জ্বল। বারবার জিতে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস তৈরী হয়েছে। সেই আত্মবিশ্বাস ভাঙা কাঁচের মতো গুড়ো হয়ে গেল মুহুর্তেই। কাজরী পেন্সিল হিলে ক্লিপ, ক্লপ শব্দ তুলে ছয় কদম এগিয়ে এসে ও’কে ধাক্কা মেরে পুলে ফেলে দিলো। এটা নিয়ে দ্বিতীয়বার পার্টিতে কাজরীর কাছে অপমানিত হলো ও।
আখতারউজ্জামান এর বসার ঘরে হাশিম তরফদার বসে আছেন। তরফদার যশোরের বাঘারপাড়ার বাসিন্দা। তিনি খানদানি লোক হলেও রাজনীতি থেকে সবসময় দূরে ছিলেন। রাজনীতিবিদ আখতারউজ্জামান এর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরী করা নিয়ে তেমন ভীতি তার ছিলো না। কিন্তু তার সঙ্গে যা ঘটেছে সেটা ভয়ংকর বললেও কম বলা হবে।
“কীভাবে যে কথা শুরু করব তরফদার সাহেব…. আসলে…
“আপনার তো এখন সুদিন। বিরাট বড়লোক বাড়িতে ছোট মেয়ের বিয়ে দিছেন। তা খু*নীর বাড়িতে মেয়ে সুখে আছে? “
আখতারউজ্জামান জবাব দিতে সময় নিলেন। তরফদার সাহেব বললেন,
“আমাদের সুখ ছিনিয়ে নিয়ে আপনি সুখে আছেন ভাবা যায়? “
“তরফদার সাহেব, আপনি যা হারিয়েছেন তার ক্ষতিপূরণ দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয় কিন্তু… আসলে আমি যা করেছি সেটা বাধ্য হয়ে করেছি। আপনি হয়তো বুঝতে পারবেন না…
তরফদার সাহেব কথার মাঝখানে বলে উঠলেন,
“হায়াত, মউত সব ই আল্লাহর হাতে। আমি ভবিতব্য মেনে নিছি। যা হয়ে গেছে তা তো আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। তবে যা হয় নি, সেটা তো হতে পারে। “
আখতারউজ্জামান বুঝতে পারলেন না। তরফদার সাহেব তরল হাসি দিয়ে বললেন,
“আমার ভাইয়ের ছেলে রাহীদের সঙ্গে আপনার বড় মেয়ের বিয়েটা হোক। সেটাই নাহয় আপনার ক্ষতিপূরণ হবে। “
আখতারউজ্জামান স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন। তরফদার সাহেবের বড় ছেলের সঙ্গে আল্পনার বিয়ে হবার কথা ছিলো। কিন্তু ছেলেটা বরযাত্রী হয়ে এসে কচুকাটা হয়ে মারা যায়। সেই পরিবার আল্পনাকে চাইছে। এতো অসম্ভব ব্যাপার।
চলবে….
(এই সপ্তাহ টা প্রচন্ড ব্যস্ততায় গেল প্রুফ দেখা ও অন্যান্য কাজে। এক বছর পর আমার বই#আকাশপ্রিয়া আসছে। সকলের কাছে দোয়া চাই। আপনাদের ভালোবাসা ও দোয়া একান্ত কাম্য)
Share On:
TAGS: কাজরী, সাবিকুন নাহার নিপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাজরী পর্ব ৪
-
কাজরী পর্ব ৭
-
কাজরী পর্ব ১৩
-
কাজরী পর্ব ৫
-
কাজরী পর্ব ১১
-
কাজরী পর্ব ২
-
কাজরী পর্ব ৩
-
কাজরী পর্ব ৮+৯
-
কাজরী পর্ব ৬
-
কাজরী পর্ব ১