Golpo কাজরী

কাজরী পর্ব ১৩


কাজরী-১৩

সাবিকুননাহারনিপা

কাজরী এখন শান্ত হয়ে আছে। বেশ অনেকটা সময় ছটফট করে এখন আর পারছে না। ইশান পুরোটা সময় কাজরীর অস্থিরতা উপভোগ করলো। ইশান এতক্ষন বসে ছিলো পায়ের দিকের সোফায়। হাতে ছিলো কফিমগ। মধ্যদুপুরেও কফিটা উপভোগ করছিলো ভালোই। এরপর উঠে এসে কাজরীর পাশে বসলো। কপালের পাশে অবিন্যস্ত চুলগুলো সরিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“কফি খাবে?”

কাজরী রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হাত খোলা অবস্থায় থাকলে ও হয়তো ইশানের গালে একটা থা*প্পড় মারতো। কাজরী কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“এটা কী হচ্ছে?”

“থ্রিল ভাইব পাওয়া যাচ্ছে। দেখি তো হার্টবিট কেমন! “

ইশান ঝুকে এসে কাজরীর বুকের বা পাশে মাথা রাখলো। কাজরী যেন জমে গেল। নিশ্বাসও আটকে আছে। ইশান প্রায় এক মিনিটের মতো ওভাবে ছিলো। তারপর মাথা তুলে আফসোসের সুরে বলল,

“বুঝতে পারছি না। একটা শক দিয়ে দেখব?”

কাজরীর মুখটা রক্তশূণ্য দেখালো। ইশানের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটালো একটা তরল রিংটোনের আওয়াজ। কাজরীর ফোন বাজছে। ও ফোনটা হাতে তুলে নিলো। কাজরী বারণ করতে গিয়ে টের পেল ওর গলা শুকিয়ে গেছে। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। ইশান কল রিসিভ করলো। ফোনের ওপাশে হুমাইরা হড়বড় করে বলল,

“ম্যাম আল্পনা আপু ভোরের দিকে আসছে। তাকে জিজ্ঞেস করলেও জবাব দেয় নি। আমি কী স্যার কে জানাব?”

কাজরী সব শুনতে পেল। এই মুহুর্তে সমস্ত রাগ টা গিয়ে পড়লো হুমাইরার উপর। ফাজিল মেয়ে ফোনের ওপাশে কেউ হ্যালো অবধি বলে নি, অথচ গড়গড় করে কথা বলে যাচ্ছে। ইশান কল কেটে কাজরীর দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল,

“ভেরি গুড ডিয়ার ওয়াইফ। তুমি তো কাউকে বাদ দিচ্ছো না। সেদিন বোনের শোকে কান্নাকাটি করা তাহলে নাটকের একটা অংশ ছিলো? রিসিপশনের অনুষ্ঠান টা নষ্ট করাই ছিলো প্রধান উদ্দেশ্য? “

কাজরী নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। হাতের বাধন এতো শক্ত যে এখন ব্যথা অনুভব করছে। ইশান ওর মেন্টাল ড্যামেজ এর জন্য এসব করছে সেটা বোঝা যাচ্ছে। কাজরী রুক্ষ গলায় প্রশ্ন করলো,

“তোমার সার্কাস খেলা বন্ধ হবে কখন? আমার ফ্রেশ হওয়া দরকার। “

ইশান কে একটু নরম হতে দেখা গেল। পায়ের বাধন আলগা করে প্রশ্ন করলো,

“তুমি কে কাজরী?”

“তোমার সস্তা ড্রামায় আমার পরিচয় বদলে যাবে নাকি? মানে আমি কী অন্য পরিচয় দেব?”

ইশান ওর পায়ের বাধন খুলে দিলো। কাজরী বসার চেষ্টা করতেই হাতে ব্যথা পেয়ে উফ শব্দ টা উচ্চারণ করলো। ইশান গম্ভীর গলায় বলল,

“আমাকে বিয়ে কেন করেছ?”

“সাহস থাকে তো নিজের বাবাকে প্রশ্ন করো। আখতারউজ্জামান এর সঙ্গে তার অন্তর্দ্বন্দ সকলেই জানে। তবুও আমাকে কেন পুত্রবধূ বানানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলেন। “

ইশান হাত খুলে দিলো। ফর্সা হাত, পা লাল হয়ে গেছে। ইশান নিজেও সেই ব্যথার দিকে তাকিয়ে রইলো। কাজরী রক্তচক্ষু নিয়ে তাকালো ইশানের দিকে। ইশান নরম গলায় বলল,

“তোমার ওয়াশরুমে যাওয়া দরকার না?”

কাজরী উঠতে গিয়ে মাথা ঘুরে প্রায় পড়ে যাচ্ছিলো। ইশান ধরে ফেলল। কাজরী ধাক্কা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ওয়াশরুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো।


আখতারউজ্জামান তড়িঘড়ি করে ঢাকায় ফিরলেন। আল্পনা পুরো একদিন বাসার বাইরে ছিলো। তিনি কল করেছেন কিন্তু সেটা রিসিভ করে নি। আখতারউজ্জামান কে খবর টা হুমাইরা দিয়েছে। যদিও কাজরীর তরফ থেকে এরকম কোনো আদেশ ও পায় নি, তবুও আগ বাড়িয়ে কাজটা করেছে নিজেকে ভালো প্রমাণ করার জন্য। আখতারউজ্জামান বাসায় এসেই আল্পনার দেখা পেলেন। তিনি মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন,

“কোথায় গিয়েছিলে তুমি? “

আল্পনা স্বাভাবিক গলায় বলল,

“ডাক্তারের কাছে। “

“কার সঙ্গে গিয়েছিলে? এরপর কোথায় ছিলে?”

“গাড়িতে করে গিয়েছি, আবার ফিরেও এসেছি। “

আখতারউজ্জামান হুমাইরার দিকে তাকালো। মেয়েটা ভারী বিস্মিত হলো। ও আল্পনাকে এর আগে এমন অবলীলায় মিথ্যে বলতে দেখে নি। হুমাইরা বলল,

“স্যার আপু বাসায় ছিলেন না, মিথ্যে বলছেন।”

আল্পনা হুমাইরার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নির্লিপ্ত গলায় প্রশ্ন করলো,

“তাহলে কোথায় ছিলাম আমি?”

আখতারউজ্জামান জানেন আল্পনা মিথ্যে বলে না, তবুও কাজরীর সতর্কবানী মনে পড়ে। কিন্তু এভাবে চোখে চোখ রেখে আল্পনার তো মিথ্যে বলার কথা না।

“বাবা আপনি ড্রাইভার কে জিজ্ঞেস করুন। আমি ওনার গাড়িতে বাইরে গিয়েছি, এসেছি। মাঝখানে কফিশপে কফি খেয়েছি। “

হুমাইরার চোখ কপালে উঠলো। আল্পনা তাকিয়ে দেখলো সেটা। তারপর বাবার উদ্দেশ্যে বলল,

“এই মেয়েটাকে আর আমার আশেপাশে দেখতে চাই না। ও আমার সাথে অস*ভ্যের মতো আচরণ করছে। আজকের পর ও এই বাড়িতে থাকলে আমাকে অন্য কোথাও রাখার ব্যবস্থা করুন। “

এবার শুধু হুমাইরা নয়, আখতারউজ্জামান নিজেও খানিকটা অবাক হলেন।

আল্পনা ঘরে ঢুকে পানি খেয়ে শান্ত হয়ে বিছানায় বসলো। প্রচন্ড ভয় ছিলো কথা বলবার সময়, তবুও নিজেকে শান্ত রেখেছে। ঢাকার বাইরে পা রাখার আগে ভেবেছিল কিভাবে পরিস্থিতি সামলাবে। তখন মনে হয়েছিল কাজরী যেভাবে সামলে নেয়, ও সেভাবেই করবে। বাবা তো জানেন আল্পনা সহজ, মিথ্যে বলতে পারে না। তাকে বিশ্বাস করানো কঠিন হবে না। মরিয়ম খালার ছেলেকে নগদ টাকা দেয়া হয়েছে মুখ বন্ধ রাখার জন্য। সেই সঙ্গে ড্রাইভার, ওয়াচম্যান, স্টাফ সবাই কে। প্রথমবার এমন পরিস্থিতিতে আল্পনা ভয় পেলেও শেষ অবধি সব টা সামলানো গেল।


শিরিন কাঁটাচামচে এক টুকরো আপেল তুলে মুখে দিলো। শাশুড়ীর সঙ্গে সেই অশান্তির পর আর খোঁজ, খবর নেয়া হয় নি। এই মহিলা শিরিন কে একদম পছন্দ করেন না, তাতে শিরিনের মাথাব্যথাও নেই। স্বামীর মা হিসেবে যতটুকু সম্মান করা দরকার ততটুকুই করেন। সেই আন্তরিকতা মেকি, মন থেকে আসেও না।

“প্লিজ আমাকে একটু বলবে এই বাড়িতে ঠিক কী হচ্ছে? ইশান আমার লাইফ কন্ট্রোল করবে? আমার ছোট ভাইয়ের কথায় উঠতে বসতে হবে? “

“যদি তাই করতে হয় তাতে ক্ষতির তো কিছু নেই নিশান। ইশানকে তো সেই পাওয়ার তোমার বাবাই দিয়েছেন। “

“কাজের ক্ষেত্রে সেটা মানা যায়, তবে আমার ম্যানেজার কে হবে সেটা ইশান ঠিক করে দিতে পারে না।”

শিরিন মনে মনে হাসলেন। তিনি অদৃশ্যভাবে ইশান কে কন্ট্রোল করছেন। তার বোকা, রাগী ছেলে সেটা বুঝতেও পারছেন না। ইশান কে তিনি বলেছিলেন,

“তোমার বাবা কাজরীর ব্যাপারে একটু বেশীই নরম তাই না? ও যা খুশি বলে, যা খুশি করে কিন্তু তোমার বাবা নির্বিকার। এমন তো ওনার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যায় না। “

ইশান ব্যাঙ্গাত্মক সুরে বলল,

“কাম অন মা, তুমিও তোমার শাশুড়ীর মতো কথা বলছ। কাজরীকে নিয়ে এতোটা জেলাস! শেম অন ইউ। “

“আমি তোমার কথায় রাগ করছি না ইশান। কারণ আমার মন বলছে কাজরী তোমার বাবার অতীতের সঙ্গে কোনোভাবে কানেক্টেড। কাজরীর প্রতি তার সফট কর্ণার আছে। “

ইশানের চোয়াল মুহুর্তেই শক্ত হয়ে যায়। মেইল ইগোতে হার্ট হয়। শিরিন এটাই চেয়েছিলেন।

“নিশান শোনো, তোমাকে আরও ধৈর্য্যশীল হতে হবে। এমনও তো হতে পারে ইশান যা করছে সেটা আসলে তোমার বাবাই করাচ্ছে। তাছাড়া বিজনেস, প্রোপার্টি এসব ইশানের জন্য না। কিছুদিন গেলেই বোর হয়ে যাবে। তখন ফিরে যাবে ওর আগের লাইফে। পার্টি, হই হুল্লোড়, নতুন গার্লফ্রেন্ড। “

মায়ের কথা নিশানের মন:পুত হলো না। ও’কে বারবার অপমান করা হচ্ছে। বাবা করছেন, এখন মা’ও করছেন। নিশানের মনের ভাবনা যেন পড়ে ফেললেন শিরিন। বললেন,

“শান্ত থাকো নিশান। সবকিছু তোমার হাতে যখন যাবে তখন সপাটে অপমানের চড় টা ইশানের গালেই পড়বে। তুমি শুধু সময়ের অপেক্ষা করো। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা, আমি তোমার বিয়ে দেব। আমার পছন্দে ভরসা আছে তো?”

নিশানের কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়লো। বিয়ে শব্দটা শুনে মানসপটে কাজরীর ছবিটা ভেসে উঠলো হঠাৎ! কেন?


কাজরী ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে আছে। খাবার নিয়ে এসেও স্টাফরা ফিরে গেছে। ব্যথায় লাল হয়ে যাওয়া হাত টা দেখলো আবারও। ইশান অয়েন্টমেন্ট লাগিয়ে দিয়েছিল জোর করে। ওর সিক্সথ সেন্স বলছে কিছু একটা ঘটবে। ইশান যতবার ই মায়ের সঙ্গে কথা বলতে যায়, ততবারই কিছু না কিছু অপ্রত্যাশিত ব্যাপার ঘটে। কাজরীর মনে হলো শিরিন অন্যকিছু প্ল্যান করছে। সেই প্ল্যান এর একটা অংশ হলো সুইজারল্যান্ড ট্রিপ। কাজরীকে সামনে রেখে তিনি ইশানের সঙ্গে মাইন্ড গেম খেলার চেষ্টা করছেন।

কাজরী সিদ্ধান্ত নিলো ও সবকিছু ইশানকে জানাবে। বিয়েতে রাজি হওয়া, চৌধুরীদের সঙ্গে ওর কানেকশন সবকিছু।

চলবে….

(আপনারা বেশী করে রিচ দিয়েন পোস্টে। পরের পর্ব তবে তাড়াতাড়ি পোস্ট করব ইনশাআল্লাহ।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply