Golpo কাজরী

কাজরী পর্ব ১১


কাজরী-১১

সাবিকুননাহারনিপা

“কারে খুঁজেন?”

আল্পনা চমকে উঠলো। ধানমন্ডির এই বাসায় ও এসেছিল। যাবার সময় ও বাড়ির নামফলক ও নাম্বার দেখেছিল। আল্পনা শুকনো ঢোক গিলে বলল,

“এই বিল্ডিং এ কে থাকে? “

বিল্ডিং এর ওয়াচম্যান আল্পনাকে আপদামস্তক লক্ষ্য করে বলল,

“আপনি কার কাছে আসছেন নাম বলেন? এইটা তো অফিস। “

আল্পনা বিড়বিড় করে বলল,

“অফিস?”

“হ্যাঁ। চাকরির জন্য আসছেন?”

আল্পনা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে বিল্ডিং টার দিকে তাকালো। ওর দেখায় কী ভুল ছিলো! কিন্তু ও স্পষ্ট দেখেছিল। অনেকক্ষন ধরে বিল্ডিং এর নাম এ নাম্বার উচ্চারণ করেছিল যেন স্মৃতিতে থেকে যায়।

আল্পনা বেরিয়ে গেল। নিজেকে অবিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। অল্প পরিচিত সেই মানুষটির খোঁজে ও এখানে এসেছিল। চায় আরেকবার দেখা হোক, কেন চায় সেই প্রশ্নের উত্তর ও নিজেও মিলাতে পারছে না। আল্পনা কাজরীকে মিথ্যে বলেছে। জেনেশুনে ঠান্ডা মাথায় ও কাজটা করেছে। বোনের চোখে খারাপ হবার কষ্ট টা ওর কম নয়, তবুও সেই মানুষটির নিরাপত্তা নিয়ে ও খুব সচেতন। ও চায় না সে বিপদে পড়ুক।

ধানমন্ডিতে একটা রুফটপ রেস্টুরেন্টে ঢুকলো। ওর একটা বিশেষ কাজ আছে যেটা বাইরে থেকে সেরে যেতে হবে। বাবার স্টোর রুম থেকে মরিয়ম খালার নাম্বার টা ও সংগ্রহ করেছে। মরিয়ম খালা ওদের বাড়িতে থাকতেন। ছোটবেলায় তিনি ওদের দুই বোনকে দেখাশোনা করতেন। মায়ের মৃত্যুর পর তিনি চলে যান। তিনি আসলেই চলে গিয়েছিলেন নাকি বাবা তাকে যেতে বাধ্য করেছেন সেটা আল্পনা জানে না। তবে বাবা দুই ঈদে তাকে টাকা, জামাকাপড় পাঠান। মরিয়ম খালার সঙ্গে কথা বললে ওর কাজরীর বলা গল্পটা সম্পর্কে বুঝতে পারবে।

কাজরীর বলা গল্পটা ও ভেবেছে। পুরোপুরি মায়ের সঙ্গে মিলে যায়। মায়ের অদ্ভুত রোগ ছিলো, তিনি একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর বাকীসব ঘটনা ভুলে গেছেন। বাবার সঙ্গে বিয়ে, বিয়ের পর সংসার এরপর অনেক কিছু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে তার একটিই মেয়ে। কাজরী তার মেয়ে নয়।

আল্পনা প্রাইভেট কর্নারে গিয়ে মরিয়ম খালার নাম্বারে ডায়াল করলো। প্রথম বারেই কল টা রিসিভ হলো। ফোনের ওপাশে কর্কশ গলায় পুরুষ কন্ঠটি বলে উঠলো,

“হ্যালো কে?”

আল্পনা গলার স্বরে স্বাভাবিকতা আনার চেষ্টা করে বলল,

“মরিয়ম খালার নাম্বার এটা?”

ফোনের ওপাশে একটু নীরবতা।

“আপনি কে?”

“আমি… আমি ঢাকা থেকে কল করেছি। একটু পাওয়া যাবে খালাকে। “

“আগে পরিচয় বলেন। “

আল্পনা কল কেটে দিলো। নিজের পরিচয় দিতে চায় না। একটু বাদে আবারও কল এলো। আল্পনা রিসিভ করতেই বলল,

“পরিচয় না দিয়ে কল কাটলেন ক্যান? আম্মারে কিসের দরকার? “

আল্পনা শুকনো ঢোক গিলে বলল,

“আমি আখতারউজ্জামান এর বাসা থেকে বলছিলাম। ওনার বাসার সহকারী। কিছুদিন আগে তার ছোট মেয়ের বিয়ে হয়েছে তো তাই খালাকে সালামী পাঠাতে বলা হয়েছে। এজন্য… খালাকে…

পুরুষ কন্ঠস্বরটি এবার বেশ নরম হলো। বলল,

“ওহ তা বলবেন না! ঠিকানা দেয়া লাগবে? “

“জি বলুন। “

আল্পনা ঠিকানাটা লিখে নিলো। এক নাগাড়ে বিরতিহীনভাবে এতোগুলো মিথ্যে বলে ক্লান্তবোধ করছে। নিজের আচরণে যথেষ্ট বিস্মিত হচ্ছে ও।

আল্পনা বাসায় ফিরে এলো। বাসায় নতুন কাজের লোক রাখা হয়েছে। যার কাজ হচ্ছে সার্বক্ষণিক আল্পনার খোঁজ রাখা। মেয়েটার নাম হুমাইরা। আল্পনার খোঁজ খবর রাখা বিষয়টাকে এখন সে রীতিমতো খবরদারির পর্যায়ে নিয়ে গেছে। কাজরী বাবাকে সম্ভবত কিছু বলেছে, তারপর ই এই হুমাইরা মেয়েটির আগমন ঘটেছে।

“কোথায় গেছিলেন আপনি?”

আল্পনা নিজের ঘরে যাবার আগে হুমাইরার কন্ঠস্বর শুনতে পেল। গলায় বিরক্তি নাকি উদ্বিগ্নতা আছে সেটা বোঝার চেষ্টা করে জিজ্ঞেস করলো,

“কেন?”

“আপনি তো কলও ধরেন নাই। কই ছিলেন?”

আল্পনা সবসময় নরম গলায় কথা বলে। কারোর সঙ্গে কঠিন গলায় কথা বলতে পারে না, রাগ হতে পারে না। রাগলে ওর শরীর খারাপ হয় বলে চেষ্টা করে স্বাভাবিক থাকার। তবে এতে একটা বিষয় লক্ষ্য করেছে। ইচ্ছে হলেই কেউ এসে ওর সঙ্গে কঠিন আচরণ করতে পারে। দু:সম্পর্কের চাচী, খালা, ফুপু ও’কে ঠেস দিয়ে কথা বলতে দ্বিতীয়বার ভাবেন না। অথচ ওর জায়গায় কাজরী থাকলে তারা সতর্ক হয়ে যান। মুখ ফসকেও বেঁফাস কিছু বলেন না, জানেন পরের রিয়েকশন টা ভালো কিছু আসবে না। বাসার হেল্পিং হ্যান্ডদেরও একই অবস্থা। আল্পনাকে একই পরিমাণ সম্মান তারা দেয় না, যেটা কাজরীকে দেয়। এই মুহুর্তে ওর হুমাইরা নামের মেয়েটার সঙ্গে কঠিন আচরণ করতে ইচ্ছে করছে। মেয়েটার চোখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। কেন ও’কে দেখে একজন বিরক্ত হবে যে কীনা ওর ই বাবার বেতনভুক্ত একজন কর্মচারী। আল্পনা কাজরীর মতো না পারলেও ঠান্ডা গলায় বলল,

“তোমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করিনি বলি কল রিসিভ করি নি। “

হুমাইরা সাধারণ একটা মেয়ে। সালোয়ার কামিজ পরনে হলেও চলাফেরায় একটা নিজস্ব স্টাইল আছে। চট করে দেখে তাকে কাজের লোক বলা যায় না। পড়াশোনা কলেজ পর্যন্ত, কিন্তু কথাবার্তায় আঞ্চলিক টান নেই। গলার স্বর স্বাভাবিক রেখে হুমাইরা বলল,

“স্যার জিজ্ঞেস করলে কী উত্তর দেব?”

আল্পনার রাগ হলো। রাগ হলে পায়ের পাতায় কাঁপুনি সৃষ্টি হয়। গলা শুকিয়ে আসে। তবুও ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,

“তোমার স্যার কে বলবে আমার সাথে কথা বলতে। আমি তাকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য, তোমাকে নয়। “

হুমাইরার মুখটা থমথমে হয়ে গেল। আল্পনা নিজের ঘরে গেল। যে দুটো কাজে বেরিয়েছিল তার একটাও সফল হয় নি। আল্পনা এবার আর হাল ছেড়ে দিবে না। যতক্ষন পর্যন্ত সফল না হতে পারছে ততক্ষন পর্যন্ত লেগে থাকবে।


কাজরী ভেবেছিল হানিমুন প্ল্যান ভেস্তে যাবে। কারণ ইশান রাজি হবে না, কিন্তু ইশান ও’কে অবাক করে দিয়ে বলল ভালো করে প্যাক করে নাও, হানিমুন বলে কথা, সেটা তো এড়ানো যায় না।

কাজরী নিশ্চুপে ভাবতে লাগলো। ইশান ও তার মা দুজনেই ওর পিছে হাত ধুয়ে লেগেছে। এদের চালে বাজিমাত করতে হলে ও’কে ভিন্ন কিছু ভাবতে হবে। শিরিন কে তবুও হালকা ভাবে নেয়া যায়, কিন্তু ইশান খুব ধুরন্ধর। বউ বউ করে কাছে আসা, ছোঁয়াছুয়ির যে ভান করছে সেটা কাজরীকে অস্বস্তিতে ফেলার জন্য। এটা বুঝতে ওর আরেকটা মাথার প্রয়োজন নেই। কাজরীর ভাবনায় অনেক কিছু আসে, বাবা বলেছিলেন ইশানের সঙ্গে বিয়ে হলে তেমন সমস্যা হবে না। বরং স্পেস পাওয়া যাবে, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশী সমস্যা ইশানকে নিয়েই।

সুইজারল্যান্ডে যাবার পূর্বে ওয়াজেদ চৌধুরী পুত্রবধূকে নিজের ঘরে ডাকলেন। কাজরী শ্বশুরের ডাক পেয়ে কেমন বিচলিত বোধ করলো। তিনি কী বলতে চাইছেন সেটা ভেবে বেশ অস্বস্তিতে ভুগলো। কিন্তু তিনি স্বাভাবিক গলায় পুত্রবধূকে জিজ্ঞেস করলেন,

“কেমন আছ মা?”

“আমি ভালো আছি। আপনি? “

“আলহামদুলিল্লাহ। বুড়ো বাপের খোঁজ খবর তো নাও না তুমি। “

কাজরী স্মিত হাসলো। ওয়াজেদ চৌধুরীর রিডিং রুমে তার মুখোমুখি বসে কাজরী মনে মনে ভাবছে, একটা মুখোশের আড়ালে কী করে নিজের আসল চেহারা লোকটা লুকিয়ে রাখে।

“শুনলাম তোমার নাকি এখানে একটু সমস্যা হচ্ছে? “

কাজরী ভাবলো, সমস্যা বলতে কী উনি রোদেলার ব্যাপার টা বলছেন!

“একটু সমস্যা হলেও আমি চেষ্টা করছি সামলে নিতে। এতো মানুষজনের মধ্যে থেকে তো অভ্যাস নেই। একটু ভুল হয়ে যাচ্ছে হয়তো….

“ভুল! তা হোক। তোমার বয়স কম, একটু মাথা গরমও আছে। আস্তেধীরে ঠিক হয়ে যাবে। “

কাজরী মৃদু হেসে বলল,

“জি। “

“ইশান যেমন একটা বড় দায়িত্ব পেয়েছে, তেমনি তোমাকেও আমি একটা দায়িত্ব দিতে চাই। “

কাজরী প্রশ্ন না করে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রইলো। ওয়াজেদ চৌধুরী রিডিং গ্লাস খুলে রেখে বললেন,

“ইশানের দায়িত্ব। “

“ইশানের দায়িত্ব? “

কাজরীর কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়লো। ওয়াজেদ চৌধুরী বললেন,

“হ্যাঁ। ইশানকে দায়িত্ববান পুরুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব আমি তোমাকে দিলাম। কারো কথা না শুনে ওর অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে। তুমি বুদ্ধিমতি মেয়ে, তোমাকেই তো সব সামলাতে হবে। যে দায়িত্ব টা ইশানকে দেয়া হয়েছে সেটা যদি ও যথাযথ ভাবে না পালন করতে পারে তবে সেটা তো নিশানের হাতে চলে যাবে। “

কাজরী চুপ করে রইলো। বুঝতে পারছে না এখানে ওর কী বলার আছে।

ওয়াজেদ চৌধুরী কাজরীর দিকে তাকিয়ে বললেন,

“ইশান যদি তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয় তবে কিন্তু তোমার ই ক্ষতি। “

কাজরী মুখ হাসি হাসি রেখে মাথা নাড়লেও মনে মনে বলল,

“আমার লাভ লোকসানের হিসাব টা তো এতো সহজে আপনি করতে পারেন না মিস্টার চৌধুরী। আমার যা কিছু প্রাপ্য তা তো কড়ায় গন্ডায় বুঝে নেবই। “

কাজরী শ্বশুরের ঘর থেকে বেরোনোর সময় রোদেলাকে দেখলো প্যালেসের করিডোরে। রোদেলা চোখ নামিয়ে দ্রুত পায়ে অন্যদিকে পা চালালো।


ইশানের সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমানো নিয়ে কাজরী এখন ঝামেলা করা বন্ধ করে দিয়েছে। বিছানা ছেড়ে ডিভানে কিংবা সোফায় ঘুমালেও লাভ কিছু হয় না, ইশান ও’কে কোলে করে এনে বিছানায় শুইয়ে দেয়৷ মুখে না বলেও অনুভব করায় যে এই ঘরে থাকতে হবে এবং ওর ইচ্ছেমতোই থাকতে হবে। কাজরী মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।

ইশান ঘরে ঢুকেই দেখলো কাজরী বিছানায় নিজের আশেপাশে অসংখ্য কুশন, বালিশ রেখে প্রতিরোধ্য দেয়াল তুলে দিয়েছে। ইশান শব্দ করে হেসে ফেলে বলল,

“মিসেস চৌধুরী, তুমি চাইলে কিন্তু অপ্রতিরোধ্য দেয়াল তুলে দেয়া যাবে। ডোন্ট ওরি। “

কাজরী ইশানের কথায় গুরুত্ব দিলো না। ও ঘুমাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইশানের সবচেয়ে অপছন্দ ও রাগের ব্যাপার হলো যখন ও কথা বলে তখন যদি কেউ গুরুত্ব না দেয়। ইশান কালো জ্যাকেট টা খুলে ফেলে কাজরীকে কঠিন গলায় বলল,

“আজ তুমি আমাকে ডিনার সার্ভ করবে কাজরী। “

কাজরী তীর্যক হেসে বলল,

“প্রতিদিন এক ডায়লগ শুনতে তোমার এতো ভালো লাগে! আমি তোমার সার্ভেন্ট নই। “

“আই নো ডিয়ার ওয়াইফ। তোমার আনসোশ্যাল, চিপ ডায়লগ আমারও একদম শুনতে ইচ্ছে করছে না। তুমি যদি দশ মিনিটে আমাকে ডিনার সার্ভ না করো তাহলে আমি তোমার শ্বশুর কে গিয়ে জানাবো যে এখনো পর্যন্ত আমাদের মধ্যে কোনো সুইট মোমেন্ট তৈরী হয় নি। তার পছন্দ করা আনা পুত্রবধূ ফিজিক্যালি ফিট নয় বলে আমাকে দূরে দূরে রাখছে। “

কাজরী ইশানের দিকে ভালো করে খেয়াল করলো। অন্যান্য দিনের মতো কৌতুক স্বরে খোঁচামূলক কথা বলার পরিবর্তে গলার স্বরে বেশ গাম্ভির্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইশান কে যেমন মনে হচ্ছে তাতে ও যা বলছে তা করে ফেলা অসম্ভব কিছু না। কাজরী ঝামেলা এড়াতেই বিনা বাক্যে উঠে গেল। ইশানের ঠোঁটের কোনে মুচকি হাসি দেখা গেল। শিরিন চৌধুরীকে ভুল প্রমাণ করতে হবে। তিনি বলেন কাজরীকে নিয়ন্ত্রণ করা ইশানের পক্ষে সম্ভব না, কিন্তু ইশান ই পারবে কাজরীকে নিয়ন্ত্রণ করতে।

চলবে…..

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply