চৌধুরী গ্রুপের মালিকানায় নিজের নাম চাইলে ইশানকে খুনী হতে হবে। খুন করতে হবে তার স্ত্রী কাজরীকে।
ইশান চৌধুরী তার বাবার ব্যক্তিগত ডায়েরি টা হাতে পেল। সেখানে এমন কিছু লেখা দেখে ও বিচলিত হলো। এতো বয়স অবধি ইশান কোনো কিছুতে বিচলিত হয় নি। ডায়েরি টা যে ওর বাবার না সেটাও অস্বীকার যায় না, তার হাতের লেখা, সিগনেচার কোনো কিছুই মিথ্যে নয়। তাছাড়া ডায়েরিটা উদ্ধার করা হয়েছে ব্যক্তিগত লকার থেকে। যেটার পাসওয়ার্ড এক সপ্তাহ আগে ওয়াজেদ চৌধুরী ইশান কে দিয়েছিল।
ছয় মাস আগে
মেয়ের কপাল দেখো। ঘন্টা তিনেক আগেও কী কেউ ভাবতে পারছে এমন কিছু হবে! এখন এটাকে আর বিয়ে বাড়ি লাগে, সানাই নাই আনন্দ নাই। এই মেয়ের কপালে বিয়ে নাই।
ময়না চাচীর চাপা গলায় বলা কথাগুলো কানে এলো আল্পনার। হাতের তালু দেখলো। সুন্দর মেহেদীর রঙ ফুটেছে। আল্পনার পরনে মিষ্টি গোলাপি শাড়ি, সাজগোছও আছে এখনো। কী করবে ও! শাড়ি খুলে ফেলে ঘরের পোশাক পরবে, মুখটাও ধুয়ে ফেলবে!
“কে ওখানে? আল্পনা? “
পান্না ফুপুর কথায় সম্বিত ফিরে এলো আল্পনার। ও কেঁপে উঠলো।
“ওমা এইটুকুতে ভয় পেয়ে কেঁপে উঠলি। আর আজকে যা হলো….!
আল্পনা তাকিয়ে আছে পায়ের দিকে। সবাই জোর করেছিলো বলে পায়ে আলতাও পরেছিল। আলতার রঙটা দেখে শিউরে উঠলো। এতো লাল! ঠিক যেন রক্তের মতো। আল্পনার পুরো শরীর কাঁপছে। পান্না ফুপু দরজায় দাঁড়িয়ে আরও কীসব বলে গেল! ও শুনতে পেল না ঠিকঠাক। বাড়িতে এমন কেউ নেই যে ওর পাশে থাকবে। খুব ভয় করছে! আল্পনা দরজার দিকে তাকালো। কাউকে দেখতে পাচ্ছে না।
হঠাৎ ঘরে কিছু একটা পড়ে যাবার শব্দ হলো। সিড়ির কাছ থেকে দৌড়ে এলো কয়েকজন। আল্পনা মেঝেতে পড়ে আছে। চাপা গুঞ্জন
“কাজরীকে ডাকো কেউ। আল্পনা বেহুশ হয়ে গেছে। “
“চুয়াল্লিশ টা কোপ দিলে কেউ বাইচ্যা থাকে। মরাই ছিলো, হাসপাতালে নেবার পর ম*রে নাই। “
ময়না চাচী দু:সম্পর্কের চাচী। বাড়ির বড় মেয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে কয়েকদিন ধরে এখানেই আছে। এই বাড়ির মেয়েদের মা নেই। তারা ঢাকায় থাকে, সুবর্ননগরে এসেছে বিয়ে উপলক্ষ্যে। চাচী, ফুপু, খালাদের ই তো সব সামলাতে হয়। মেয়ের নানাবাড়ির পক্ষের কেউ আসে নি। সেই বাড়ির সাথে সম্পর্ক চুকেছে আরও কয়েক বছর আগে।
বাড়িতে সব আয়োজন থেমে গেছে। বরযাত্রীদের আসার কথা ছিলো সন্ধ্যেনাগাদ। যশোর থেকে আসবেন তারা। বিয়ে হবে কাল দুপুর নাগাদ। বিকেলের দিকে খবর আসে বরযাত্রীর গাড়ির উপর হা*মলা হয়েছে। বরকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর যা খবর আসে তাতে রীতিমতো গায়ে কাঁটা দেবার মতো।
বাড়ির নাম পাথর বাড়ি। এই বাড়ির নাম পাথর বাড়ি কেন সেটার উল্লেখযোগ্য কোনো গল্প নেই। বহু বছরের পুরোনো বাড়ি। ধারণা করা হয় যে মার্বেল পাথর দিয়ে বাড়ি বানানোর কারণে লোকমুখে বাড়িটার নাম পাথর বাড়ি হয়েছে। বাড়ির কর্তার নাম আখতারুজ্জামান । তিনি সুবর্ন নগরের উপজেলা চেয়ারম্যান। পর পর তিনবার পাবলিক ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। শহরে তার অনেক ধরনের ব্যবসা আছে, তবুও কেন সুবর্ননগরে এসে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন তা অনেকের অজানা। তার স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে আট বছর আগে। সেই মৃত্যুকে ঘিরেও লোকমুখে নানান কথা শোনা যায়।
সুবর্ন নগরের চেয়ারম্যান মানুষ হিসেবে কারো কাছে খুব ভালো, কারো কাছে আবার খারাপ। রাজ*নৈতিক নেতারা পুরোপুরি ভালো আসলে সবার সঙ্গে হতেও পারে না।
আখতারউজ্জামান কে তেমন বিচলিত মনে হচ্ছে না। তার সঙ্গে থাকা রাকিব ভালো করে তাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। রাকিব আখতারউজ্জামান এর সঙ্গে আছে বছর পাঁচেক ধরে। এর আগে তার ভাই মুজাহিদ আখতারুজ্জামান এর বিশ্বস্ত সহচর ছিলো। মুজাহিদ বেশ কয়েবছর ক্যান্সারে ভুগে মা*রা গেছে। ভাইয়ের জায়গা টা তাই সে পেয়ে গেছে সহজেই। রাকিব আখতারউজ্জামান কে জিজ্ঞেস করলো,
“সবাই কে চলে যেতে বলি চাচাজান। ক্যাটারিং এর লোকজন যারা আছে তারা জিজ্ঞেস করছিল যাবে কী না?”
আখতারউজ্জামান গম্ভীর গলায় বললেন,
“না। সবাই সবার কাজ করুক। “
রাকিব দ্বিতীয় বার আর কোনো প্রশ্ন করলো না। ঘড়িতে সময় এখন আট টা। চাচাজান কী করতে চাচ্ছেন সেটা ওর বোধগম্য হচ্ছে না। তিনি কী এরমধ্যে পাত্র যোগাড় করে ফেলেছেন। যোগাড় করলেও বিয়ে দেয়া কী ঠিক হবে! একটা বিবেক বলেও তো বিষয় আছে।
আখতারউজ্জামান অন্দরমহলে প্রবেশ করলেন। তাকে দেখা মাত্রই সকলের আলাপ আলোচনা বন্ধ হলো। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন,
“তোমাদের সাত পাঁচ ভাবা বন্ধ হলে প্রস্তুত হয়ে নাও। আজ রাতেই আমার মেয়ের বিয়ে হবে। “
সকলে একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেও কেউ প্রশ্ন করার সাহস পেল না। ময়না জানালেন, আল্পনা তো এখনো অজ্ঞান, ও’কে আগে সুস্থ করতে হবে। তারপর না বিয়ের কথা ভাবা যাবে।
“আল্পনা, আল্পনা তুমি কী ঠিক আছ? “
আল্পনা মিষ্টি কন্ঠস্বর শুনতে পেল। চোখ না খুলেও বুঝতে পারলো ওর খুব কাছেই বসে আছে মিষ্টি কন্ঠস্বরের মালিক। আল্পনা চোখ খুলল, এদিক ওদিক তাকিয়ে ঘরটাকে দেখলো, ও এখন সুবর্ননগরে আছে। আজ ওর বিয়ে হবার কথা ছিলো, সব মনে পড়ছে। আল্পনা উঠে বসতে গেলে নরম একটা হাত ও’কে স্পর্শ করলো।
“কাজরী!”
আল্পনা মৃদু স্বরে বোনের নাম ধরে ডাকলো। কাজরী ওর একমাত্র ছোট বোন। দুজনের বয়সের তফাৎ দুই বছরের মতো। সম্পর্ক বন্ধুর মতো হওয়া উচিত, কিন্তু দুজনের সম্পর্ক তেমন নয়। কাজরী মায়া মাখানো গলায় প্রশ্ন করলো,
“শরীর ভালো লাগছে এখন? “
আল্পনা জবাব দিলো না৷ কাজরী ও’কে বালিশ উঁচু করে বসিয়ে দিলো। ওষুধের বক্স খুঁজে একটা ওষুধের পাতা বের করলো।
“খাবার আসছে, চুপচাপ খাবার টা খেয়ে ও*ষুধ খাবে। “
এবার আর কাজরীর কন্ঠস্বরে নমনীয়তা নেই, খানিকটা রুক্ষই শুনালো। আল্পনা ডাকলো ও’কে
“কাজরী, উনি কী মা*রা গেছেন? “
কাজরী থমকে যায়। কপালে বিরক্তির সূক্ষ্ম ভাজ। আল্পনা বুঝতে পারলো না ওর প্রশ্নে কাজরী কেন বিরক্ত হলো! তবে গলার স্বরে তেমন বিরক্ত প্রকাশ করলো না কাজরী। বলল,
“তুমি বিশ্রাম নাও আল্পনা। তোমার তো এসবে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া উচিত। আমরা এমন একজন ব্যক্তির সন্তান যার শ*ত্রুর অভাব নেই। “
আল্পনা শান্ত হতে পারে না। ওর শ্বাস প্রশ্বাসের গতি বাড়তে থাকে। কাজরী আবারও পাশে বসে দূরত্ব বজায় রেখে। দরজায় খটখট শব্দ হয়। দুই বোনই উৎসুক দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকায়। ওদের বাবা এসেছেন।
আখতারউজ্জামান বিছানার পাশের সোফায় বসে গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“এখন শরীর কেমন? “
প্রশ্নটা আল্পনা কিংবা কাজরী যে কারো উদ্দেশ্যে হতে পারে। আল্পনা মৃদু স্বরে বলল,
“ভালো। “
আখতারউজ্জামান সরাসরি মেয়েদের দিকে তাকালেন। আল্পনার অবনত মুখ, কাজরী তাকিয়ে আছে তীক্ষ্ণ চোখে। আখতারউজ্জামান চোখ আল্পনার দিকে দৃষ্টি সরিয়ে অত্যন্ত নির্লিপ্ত গলায় বললেন,
“তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো। এই বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান হবে। আজ না হলেও কাল হবে। “
দুই বোন ই চমকে উঠলো। কাজরীর কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়লো। ও প্রশ্ন করলো,
“আচ্ছা! পাত্র পেয়ে গেছেন? “
আখতারউজ্জামান ছোট মেয়ের দিকে না তাকিয়েই জবাব দিলো,
“সময় মতো সব জানবে৷ তুমি একবার আমার ঘরে এসো, কথা আছে। “
আখতারউজ্জামান চলে যেতেই কাজরী আক্রোশে ফেটে পড়লো।
“আচ্ছা আল্পনা, তোমার নিজের কোনো সিদ্ধান্ত, মতামত কিছু নেই? আজ এই বাড়িতে বিয়ে হবে এই কথার মানে কী? যে কাউকে ধরে এনে তার সঙ্গে তোমার বিয়ে দিবে এই তো! আর তুমি! এতোটা স্পাইনলেস!”
আল্পনা ভীত চোখে দেখলো বোন কে। ওর খারাপ লাগছে, কাজরী তো জানে ও কেমন। তবুও এভাবে কেন বলছে!
ওরা দুই বোন সবকিছুতে আলাদা। কাজরী শক্ত, স্পষ্টভাষী, জেদি স্বভাবের। নিজের জীবনের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে৷ ও কাউকে ভয় পায় না, ওর মধ্যে মায়া মমতাও কম। যদিও এটা আল্পনার ভুল মনে হয়৷ কাজরীর মধ্যে মায়া আছে, তবে শক্ত আবরনে নিজেকে আড়াল করে রাখে। কাজরীর শৈশব ভালো কাটে নি, ওরা দুই বোন ছোটবেলায় একসঙ্গে ছিলো। মায়ের একটা অদ্ভুত অসুখ ছিলো। মাসের অল্প কিছু দিন তিনি সুস্থ স্বাভাবিক থাকতেন। বাকী দিনগুলো অস্বাভাবিক আচরণ করতেন। তিনি কাউকে চিনতে পারতেন না। আল্পনাকে নিজের মেয়ে মনে করলেও কাজরীকে মেয়ে হিসেবে মানতে চাইতেন না। মায়ের স্নেহ আদর অল্প হলেও আল্পনা পেয়েছে, কাজরী পায় নি। তিনি সবসময় ও’কে দূরে সরিয়ে রাখতেন। প্রায়ই বলতেন, ওরে দূরে যেতে বল, ওরে দেখলে আমার ঘেন্না লাগে বমি পায়। অথচ কাজরী কী সুন্দর পুতুলের মতো একটা বাচ্চা ছিলো। চোখ দুটো কী সুন্দর।
কাজল পরা চোখ বলে ওর নাম রাখা হয়েছিল কাজরী। সেই নামও মায়ের রাখা। তার নাম ছিলো কল্পনা। বড় মেয়ের নাম রেখেছিলেন আল্পনা। ছোটজনের নাম কাজরী৷ ওদের শৈশব, কৈশোর ভালো কাটে নি। একটু বড় হতেই বাবা দুই বোন কে আলাদা করে দিলেন। কাজরীকে পাঠিয়ে দিলেন জার্মানে, আর আল্পনা রয়ে গেল মায়ের কাছে। বাবা সপ্তাহের অর্ধেক সময় সুবর্ন নগর, বাকী অর্ধেক সময় ঢাকায় ওদের সঙ্গে থাকতেন। সেটাও না থাকার মতন। আল্পনা ছটফট করতো কাজরীর জন্য, বাবাকে খুব নি*ষ্ঠুর ভাবতো। কেন বোনের থেকে ও’কে আলাদা করেছিল। একসঙ্গে থাকলে তাহলে হয়তো ও আরেকটু ভালো থাকতো। ওর একটা ভরসার জায়গা তৈরী হতো।
লাউড মিউজিক, ঝলমলে আলো, মদের গ্লাসে পার্টি জমে উঠেছে। আজ ইশানকে পার্টি ম্যুডে দেখা যাচ্ছে না। অন্যান্য দিন সে স্বতস্ফুর্ত থাকে। নাইট ক্লাব গুলোতে অন্যরকম এক ইশান চৌধুরীকে দেখা যায়। আজ একটু বিচলিত লাগছে। বন্ধু সৌমিক একবার এসে ইশানের খোঁজ নিলো।
“ব্রো, এনিথিং রং?”
ইশান মাথা নেড়ে না বলল। এতোক্ষন মনোযোগী দৃষ্টিতে ফোন দেখছিল। এবার সেটা রেখে দিলো।
সৌমিকের গার্লফ্রেন্ড এর বার্থডে আজ। এটা সৌমিকের কত তম গার্লফ্রেন্ড সেটা বোধহয় নিজেও জানেনা। মেয়েটার নাম নিকি। নিকির পরনের ড্রেস টা যথেষ্ট খোলামেলা। শরীরের স্পর্শ কাতর জায়গা গুলো দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট চোখে। আরেক বন্ধু রাহুল লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে একটু পর পর নিকির দিকে। ব্যাপার টা অস্বস্তিকর। ইশানের উচিত এই পার্টি থেকে এখন বেরিয়ে যাওয়া। কারণ দেড়টা বেজে গেছে অলরেডি। রাত যত বাড়বে তত এদের লিমিট ক্রস হবে। এর আগে একবার এমন করে ইশান ফেসেছিল। টিভি নিউজ, অনলাইন পোর্টাল গুলো বেশ রসিয়ে নিউজ বানিয়েছিল যে ইশান চৌধুরী ক্লাবে মাতলামি করছে। অথচ ও সেদিন মাত্র দুই পেগ খেয়েছিল। দুই পেগে কখনো নে*শা হয় ই না।
“কী ব্যাপার ডার্লিং ? তোমার হাতে সফট ড্রিংক*স কেন? হার্ড কিছু কেন নিচ্ছো না?”
ইশান নির্লিপ্ত চোখে ত্বরিতার দিকে তাকালো। ত্বরিতা ওর গার্লফ্রেন্ড ছিলো। এখন ওদের রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস বেশ কমপ্লিকেটেড। ত্বরিতা চাইছে এই কমপ্লিকেটেড রিলেশনশিপ থেকে বেরিয়ে হ্যাপিলি ম্যারিড স্ট্যাটাসে ফিরে যেতে। কিন্তু ইশান কে কনভিন্স করা যাচ্ছে না। ত্বরিতা বড়লোক বাবার একমাত্র মেয়ে। বড় ভাই আমেরিকায় থাকে। বাবার হোটেল, রিসোর্ট এর বিজনেস। তবুও ইশান দের কাছাকাছি নয় বলে বেশ ইনসিকিউর ফিল করে। ইশান কে জীবন থেকে হারাতে চাইছে না কিছুতেই। ইশান কে যে খুব ভালোবাসে কিংবা ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট খুব বেশী তেমন নয়। ওদের প্রভাব প্রতিপত্তি নিয়ে একটু বেশীই আগ্রহ। ইশান দের বাড়িতে গেছে। চলচ্চিত্রে যেমন বড়লোক দের বাড়ি হয় ঠিক তেমন। এতো চমৎকার এতো সুন্দর বাড়ি থেকে ফেরার পর গুলশানে ওদের চার বেডরুমের ফ্ল্যাট টা কে ছোট এবং নিজেদের যথেষ্ট গরীব মনে হয়েছিল। ওর জন্মদিনে ইশানের মা এক জোড়া হিরের দুল পাঠিয়েছিল। এতো সুন্দর দুল দেখে মনে আপনা আপনিই লালসা চলে এসেছে মনে। আরও আরও চাই। গর্জিয়াস শাড়ি জুয়েলারি পরে প্যালেসের সিড়ি দিয়ে নামছে এই কল্পনা ও প্রায় ই করে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ইশান ইদানীং ও’কে এড়িয়ে যাচ্ছে খুব। ও যদি দক্ষিণে চলতে চায় ইশান উত্তরেও যাবে না। সোজা পূর্ব দিকে চলতে শুরু করবে। ত্বরিতা তাল মিলাতে চাইছে। ইশান যেমন চায় তেমন হবার চেষ্টা করছে। নিজের ইমেজ টাকে সুন্দরমতো খোলসে ঢুকিয়ে এখন ইশানের মন পছন্দ হবার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবুও ইশান ধরা দিচ্ছে না। বরং আজ সকালে টেক্সট করে জানিয়েছে যে ও আর এই রিলেশনশিপ টা ক্যারি করতে চাইছে না। আনঅফিশিয়ালি ব্রেকাপ হলেও ত্বরিতা সেটা মানতে নারাজ। ইশান ওর পাশে থাকলে নিজেকে স্পেশাল লাগে। হ্যান্ডসাম, সুপুরুষ একজন বয়ফ্রেন্ড দেখে অনেকের চোখ চকচক করে। ত্বরিতাকে কতো লাকি ভাবে! ত্বরিতা তাকিয়ে আছে ওয়াইনের গ্লাস হাতে দাঁড়ানো মোস্ট এলিজেবল হ্যান্ডসাম হ্যাঙ্ক ইশান চৌধুরীর দিকে। চেহারায় আভিজাত্য ভাব বংশীয় কিংবা জিনগত। ইশান যেখানে যায় সেখানে ছেলে মেয়ে সবাই ই ওর এটেনশন পেতে চায়। ফর্সা গায়ের রং, মাথাভর্তি চুল, বড় চোখ পুরু ঠোঁট, ট্রিম করা দাঁড়িতে কোনো বিদেশী রাজপুত্র যেন।
ইশান ত্বরিতার দিকে ফিরেও তাকালো না। ম্যাজেন্টা কালারের ড্রেসে যে ত্বরিতাকে এই মুহুর্তে ভীষণ আকর্ষনীয় লাগছে সেটা ইশানের খেয়ালেও নেই। ত্বরিতা আদুরে গলায় প্রশ্ন করলো,
“এনি প্রবলেম ডার্লিং?”
“ইয়েস। মাই ফাদার কনস্ট্যান্টলি কলিং মি। “
ত্বরিতা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকালো। ইশানের মোবাইলে নাম্বার টা ফাদার নামে সেভ করা। বাবার সঙ্গে ইশানের একটা জটিল সম্পর্কের কথা শুনেছে। বেশী কিছু ও জানে না। জানার আগ্রহও হয়নি, বড়লোকদের মধ্যে এসব হয়। বাবা, ছেলে মা মেয়ে সম্পর্ক গুলো বেশ জটিল ধরনের।
“রিসিভ দ্য কল। জরুরি কিছুও হতে পারে। “
ইশান নির্লিপ্ত চোখে ত্বরিতাকে দেখলো। এই মুহুর্তে ত্বরিতাকে দেখতে ওর চোখে খুব বাজে লাগছে। মুখে যতই দামী প্র*সাধনী মাখুক, যত দামী পোশাক ই পরুক মেয়েটাকে দেখতে অসহ্য লাগছে। এটা অবশ্য ইশানের সমস্যা। সব রিলেশনশিপেই ও সেইম জিনিস ফেস করেছে। একটা পর্যায়ের পর অকারণে সবাই কে অসহ্য লাগে।
ইশান পার্টি ছাড়লো দুইটার দিকে। এরমধ্যে পনেরো বার কল করেছেন ওয়াজেদ চৌধুরী। তিনি কখনো ও’কে জরুরী দরকার ছাড়া কল করেন না। সবসময় ম্যানেজার কে দিয়ে কল করান।
“বাবা কথা বলবে ইশান। “
প্যালেসে ঢুকতেই মায়ের সঙ্গে দেখা হলো ইশানের। ইশান নির্লিপ্ত চোখে একবার দেখে হাটতে শুরু করলো। মা আবারও বললেন,
“ড্রিং*ক করেছ তুমি? ফ্রেশ হয়ে যেও তবে। “
“তোমার হাজবেন্ড আমার সাথে কী কথা বলতে চাইছেন? “
“আমি জানিনা ইশান। “
ইশান মায়ের দিকে তাকিয়ে তীর্যক হেসে বলল,
“তুমি সেই ধরনের টিপিক্যাল মা না যে দরজায় দাঁড়িয়ে ছেলের জন্য অপেক্ষা করে, টেনশন করে স্কিন খারাপ করে ফেলবে। “
ইশানের মায়ের নাম শিরিন চৌধুরী। মেডিকেল ব্যাকগ্রাউন্ডে পড়াশোনা করলেও এখন মিসেস চৌধুরী পরিচয় বহন করতেই স্বচ্ছন্দবোধ করেন। শিরিন শক্ত চোখে ইশান কে দেখলেন। ইশানের ঠোঁটে ঈষৎ হাসি। হালকা গলায় বলল,
“অবশ্য আমার ভাইয়ের ক্ষেত্রে তোমার নিয়ম ভিন্ন। “
শিরিন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ইশান দিন কে দিন বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে৷ তিনি যত চেষ্টাই করুক, ইশানের মন যুগিয়ে চলতে পারছেন না। একটা না একটা নেতিবাচক দিক ইশান নিশ্চয়ই খুঁজে বের করবে।
ইশানের সিড়ির দিকে গেল। শিরিন ডেকে বললেন,
“ইশান তুমি কী দুই মিনিট আমার কথা শুনবে? “
ইশান ফিরে এসে মায়ের মুখোমুখি দাঁড়ালো। জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো।
“এটা নতুন কোনো বিষয় না ইশান, তোমার বাবা পলিটিক্স ছাড়া জীবনে আর কোনো কিছুই বোঝে না। তিনি একটা ডার্টি গেম খেলতে চাইছেন তোমার সঙ্গে। তুমি হ্যান্ডেল করতে পারবে জানি। কিন্তু তোমাকে জানিয়ে রাখলাম যে তুমি কোনোভাবেই একা নও। আমি তোমার সঙ্গে আছি। নিশান তোমার সঙ্গে আছে। “
ইশান হাই তুলে বলল,
“থ্যাংকস ফর ইউর কনসার্ন। বাট সুইট মাদার হবার এক্টিং টায় আরেকটু রিহার্সাল প্রয়োজন ছিলো। “
শিরিন স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে আছেন। তিনি ঘড়ির নিয়মে চলেন সবসময়। ইশানের প্রতি কনসার্ন থেকে এতো রাত অবধি জেগে আছেন। অথচ ছেলের কাছে সেটা অভিনয় মনে হলো!
ইশান ফ্রেশ হয়ে বাবার রুমে গেল। বাবা, মা আলাদা রুমে থাকেন। এই বিশাল প্যালেসে বাবার দুটো রুম। একটা রুম তার কাজের জন্য, আরেকটা আরাম করার জন্য। সেটাকে বেড রুম বলা যায় না। কারণ বাবা বেডে ঘুমান না। ইশান এই ঘরে এসেছে হাতে গোনা কয়েকবার। বাবা বসে আছেন মেঝেতে। তিনি ইশান কে দেখে উঠে দাঁড়ালেন। ইশান অবাক হলো অবশ্য। শান্ত গলায় বললেন,
“কেউ যখন অনেক বার কল করে তখন বুঝে নিতে হয় যে ব্যাপার টা জরুরী। “
ইশান জবাব দিলো না। নত মস্তকে মেঝে দেখতে লাগলো।
“ইশান বসো। কথা আছে তোমার সাথে। “
ইশান বসলো সোফায়। বাবার সামনে ইচ্ছেকৃত ভাবে পা তুলে বসে বলল,
“আপনার পছন্দের পাত্রীকে বিয়ে করতে আমি রাজি। কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে, আপনার সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকার আমাকে বানাতে হবে। আপনি আমার শর্ত মানলে আমিও আপনার শর্ত খুশিমনে মানব। “
ওয়াজেদ চৌধুরী ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে আছেন ভাবলেশহীন বসে থাকা ইশান চৌধুরীর দিকে।
রাতের ঠিক একই সময়ে সুবর্ন নগরের চেয়ারম্যান আখতারউজ্জামান তার ছোট মেয়ে কাজরী কে বললেন,
“আগামীকাল এই বাড়িতে বিয়ে ঠিকই হবে। কিন্তু সেটা আল্পনার নয়, তোমার।”
চলবে…..
কাজরী
পর্ব-১
সাবিকুন নাহার নিপা
(সকলের রেসপন্স চাই।)
Share On:
TAGS: কাজরী, সাবিকুন নাহার নিপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাজরী পর্ব ৮+৯
-
কাজরী পর্ব ৫
-
কাজরী গল্পের লিংক
-
কাজরী পর্ব ২
-
কাজরী পর্ব ৭
-
কাজরী পর্ব ১০
-
কাজরী পর্ব ৬
-
কাজরী পর্ব ৩
-
কাজরী পর্ব ৪