Golpo romantic golpo কাছে আসার মৌসুম

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬৭


কাছেআসারমৌসুম!_(৬৭)

নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি

(৬৭)

প্রস্থে চওড়া বুকটা রক্তে ভিজে গেছে। ব্যান্ডেজও চুপচুপে প্রায়। দাঁত-মুখ খিচে আঠালো ব্যান্ডেজের কাপড়টা এক টানে ক্ষত থেকে খুলে আনল সার্থ। বুকের লোমে একেক টান লেগে ব্যথায় যেন নীল হলো সারা দেহ।
সার্থ ঢোক গিলে জিভে ঠোঁট ভেজায়। নীরবে সয় সবটা। লাল রঙের বায়োডিন তুলোয় ভিজিয়ে ছোঁয়ায় একেক স্থানে!
ক্ষত দেখতে খুব দৃষ্টিকটু,ব্যথাতুর, অথচ ওর মনে হলো এমন ভয়ানক যন্ত্রণাও ধীরে ধীরে যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। তখন ঘরে আলো কম,বড়ো রড লাইটের বদলে একটা ছোট্ট সাদা বাল্ব জ্বলছিল। সেই আলোয় চকচক করে উঠল সার্থর তীক্ষ্ণ দুই চোখ। মূহুর্তে কোটরের চারপাশ জলে ভরে গেল।
একটু আগে বসার ঘরে ঘটে যাওয়া কাহিনী গুলো যখন মানস্পটে ভাসে,বুকখানা মোচড় দেয় আরেকবার। সার্থ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিভন্ত ল্যাম্পশেডের পাশে রাখা ছোট্ট ফ্রেমটায় চুপ করে চেয়ে রইল শুধু। কিশোর বয়সে ওদের তিন ভাইয়ের তোলা শেষ ছবি এটা! তিনজন হাস্যোজ্জ্বল কিশোরের ছবি। ও মাঝে,আর দুপাশে সায়ন,অয়ন দাঁড়িয়ে…
তিন ভাইয়ের মুখের আদলে কী আশ্চর্য রকম মিল ছিল সেসময়। নামগুলোও তো যত্ন নিয়ে রেখেছিল দিদুন –
বড়ো ভাই সৈয়দ সায়ন আহলাল,
মেজো ভাই, সৈয়দ সার্থ আবরার,
আর ছোট ভাই সৈয়দ অয়ন আবসার…
দেখতে-শুনতে চলনে-বলনে, রক্তে ওরা তো একই। তাহলে আজ,আজ এরকম বিরোধ লাগল কেন? যে অয়ন ওর দিকে চোখ তুলেও কোনোদিন চায়নি, সে আজ গায়ে হাত তুলে ফেলল। তুই করে বলল? বলল ও সেলফিশ?
অথচ, এই পরিবারের সুখের জন্যে সার্থ কত কী করেছে! প্রত্যেকটা প্রহর ও গুমড়ে গুমড়ে মরেছে,তাও কাউকে ওই যন্ত্রনার ভার দেয়নি। কতবার চেয়েছে বাবার সাথে এক ছাদের নিচে থাকবে না। শুধুমাত্র মা আর ভাইয়ের জন্যে পারেনি। ওদের জন্যে রয়ে গেল,আর প্রতিদিন দেখতে হলো বাবার কলঙ্কিত মুখ। এক নীরব ঘাতক,যার একটা ভুলে ধ্বংস হয়েছে তিনটি প্রাণ,নষ্ট হয়েছে তিনটি জীবন। শেষ হয়েছে একটা ছোট্ট শিশুর শৈশব।
একইসাথে দেখতে হয়েছে মায়ের শুকনো আনন,মলিন চোখ। দেখতে হয়েছে ভাইয়ের কবর,ছোটো মায়ের হাহাকার,চাচ্চুর নিস্পন্দ চেহারা। তবুও সার্থ কিচ্ছু করতে পারেনি। আচ্ছাও অপরাধী, তাইত? হ্যাঁ তাই। কিন্তু কী নিয়ে ওর অপরাধ? কাউকে এক ঝটকায় ভালো না বাসা,একটা ফ্রড বিয়েকে সত্যি ভেবে সংসার না পাতাই অপরাধ? যে মেয়েটা একদিন পকেট কাটতে এসে ধরা পড়ল,জেল খাটল এক দুপুর, বিয়ে করল টাকার লোভে সার্থর জন্যে তাকে বউ মেনে নেয়া এতই সহজ হতো?
হতো,যদি এখানে অনুভূতি থাকে। যদি ও মেয়েটাকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করতো, হতো ওসব। কিন্তু সার্থ তো তা পারেনি। সংসার নিয়ে ওর আগ্রহই আসেনি কখনো। সার্থ চাইছিল তুশিকে দূরে রাখতে, ওকে ভালো থাকতে দিতে। কিন্তু যখনই মেয়েটা কোনো পুরুষের আশেপাশে দাঁড়ায়, এক অজ্ঞাত,দূর্বোধ্য হিংসেয় সার্থর বুক ছলকে ওঠে। কেমন চিনচিন করে বাজে,ও তোমার বউ সার্থ! ও কেন অন্য পুরুষের সাথে থাকবে?
আর এই এক ছলকে ওঠা বারুদ দ্বিগুণ হতে হতে সার্থ কখন যে মেয়েটাকে ভালোবেসে ফেলল, টেরই পায়নি। অয়ন যে তুশিকে পছন্দ করে, সেটা যদি সার্থ আগে বুঝতো সরে যেত না? যেতো নিশ্চয়ই।
কিংবা যদি ,তুশিও অয়নকে ভালোবাসতো এই দিন সার্থ আসতেই দিতো না। ও বিনাদ্বিধায় সরে যেতো তখন। কিন্তু হয়নি এমন। উলটে সব এলোমেলো হয়ে গেছে। যা ঠিক করার আর কোনো পথ নেই। সার্থ মরণ শ্বাস টানল। শেষমেশ গোটা পরিবার চুরমার হয়ে গেছে। আর তার পেছনেও ওই দ্বায়ী। ভাইয়ে ভাইয়ে নেমে আসা এক চোট লড়াইটাও ওর জন্যে হলো। এই লড়াই কখনো শেষ হবে না। ও চাইলেও অয়ন শেষ করবে না। তাহলে সব কিছুর জন্যে ও নিজেই দোষী না! কেন যে ও শুরু থেকে তুশিকে ভালোবাসতে পারেনি। কেন যে পারেনি মেয়েটাকে মেনে নিতে! কেন ছিল ইগো নিয়ে? কেন!
এই কেন-র উত্তর এলো না। সার্থর অনুতাপ,পরিতাপ, আফসোস সব একাকার হয়ে কোথাও উবে গেল আজও। তবে দোর হতে ভেসে এলো নারীকণ্ঠে,
“ আসব?”
চট করে চোখের জল ছিটকে দিয়ে,ফিরে চাইল সার্থ। বলল,
“ এসো।”
জয়নব আঁতকে বললেন,
“ এ কী,হায় হায় খোদা বুকের কী অবস্থা! তোমার, তোমার ঘা এখনো শুকায়নি? ওষুধ খাওনি নাকি?”
“ কদিনের ঝামেলায় হয়নি। সমস্যা নেই,বোসো।”
বৃদ্ধা উতলা হয়ে বললেন,
“ আমি বরং ডাক্তারকে একটা ফোন করে দিই।”
“ না, রাত হয়েছে। এর চেয়ে আমি কাল একবার গিয়ে চেক আপ করে আসব।”
“ সত্যি তো? কথার কথা বোলো না আবার।”
একটু হাসল সার্থ।
“ বোসো তুমি ।”
জয়নব লাঠি নামিয়ে মুখোমুখি বসলেন । দুপল চেয়ে রইলেন নাতির দিকে। সার্থ জিজ্ঞেস করল,
“ কিছু বলবে?”
“ দেখছি।”
“ কী?”
“ এই বুড়ো মানুষটার সাথে বাজি ধরে,লেজেগোবরে হেরে যাওয়া একজন পুলিশ অফিসারকে।”
সার্থ চোখ সরিয়ে ফেলল। জয়নব বললেন,
“ রিগ্রেইট হচ্ছে না দাদুভাই?”
“ হুম?”
“ অনুতাপ হচ্ছে না?”
সার্থ চুপ, বলল না কিছু। বৃদ্ধা হাসলেন,বললেন,
“ এর মানে হচ্ছে। তাহলে কেন করলে এরকম বলো তো?”
সার্থর মুখটা শক্ত রইলেও,কণ্ঠস্বর কেমন অসহায় শোনাল,
“ জানি না। মন যা বলেছিল তাই শুনেছি, তাই করেছি। বুঝতে পারিনি অয়ন তুশিতে এতটা ডুবে গেছে।”
“ কিন্তু বসার ঘরে তোমার চেহারার কোথাও কোনো আফসোস আমি দেখিনি। বরং একটা দৃঢ় পাহাড় দেখেছি,যাকে কিছুতেই টলানো যায় না।”
“ কারণ সেটা আমি দেখাতে চেয়েছি। আমি যদি আমার খারাপ লাগা প্রকাশ করতাম,অয়ন আরো প্রশ্রয় পেয়ে যেত৷ ও আমার পরিতাপকে আমার দূর্বলতা ভাবতো। সেটা আমি চাইনি !”

“ তুমি শেষ মূহুর্তে এসে নিজের ভুল শুধরাতে চেয়েছে, দাদুভাই। এ নিয়ে কী বলবে?”

“ মানুষ নিজেকে কখনো জাস্টিফাই করতে পারে না,দিদুন। তার পারস্পেক্টিভ থেকে নিজেকে সব সময় ঠিক মনে হয়। মনে হয় সে যা করছে,যা বলছে তাই ঠিক তাই উচিত। আমারো এমন হয়েছিল।”
“ তো আমাদের কারো কাছে বলতে পারতে! শেয়ার করতে পারতে।”
“ কার কাছে করব? কে বোঝে আমায়?”
জয়নবের চেহারা টানটান হয়ে গেল। এই পর্যায়ে এসে খারাপ লাগল । ভীষণ মায়া হলো সামনে বসা শক্তপোক্ত গড়নের ছেলেটার ওপর। একটা মানুষ, যার সবাই আছে,
বাবা-মা ভাইবোন,দাদি থেকে শুরু করে একটা ভরা পরিবার আছে । অথচ থেকেও তার কেউ নেই? সে চাইলেই নিজের মনের কথা কারো কাছে শেয়ার করতে পারে না? কারো থেকে শুনতে পারে না,সে যা করছে ঠিক কিনা!
প্রৌঢ়া দীর্ঘশ্বাস লুকোলেন। একটু চুপ থেকে বললেন,
“ তুশি এখন কী চায়?”
“ অয়নকে চায় না,এটুকু জানি।”
“ বলেছে? সবার সামনে যা বলেছিল,তা কি আদৌ সত্যি?”

“ বিয়ের দিন ও পালিয়ে যাচ্ছিল। আমি ওকে কমলাপুরের রাস্তা থেকে আমার সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম।”
জয়নব অবাক হয়ে বললেন,
“ সে কী! তুমি কী করে জানলে?”
“ আমি শিয়র ছিলাম,তুশি বিয়ে করবে না।”
জয়নবের চোখে প্রশ্ন ছুটে এলো। ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“ তুমি তাহলে এখন ওকে ভালোবাসো?”
“ তোমার কী মনে হয়?”
“ আমি তোমাকে বুঝতে পারি না। তুশিকে বোঝা যায়,কারণ মেয়েটা কাগজের মতো সাদা। কিন্তু একটা ব্যাপার আমার মাথায় এখনো ঢুকছে না,অয়নকে ভালো না বাসলে ও বিয়েতে হ্যাঁ বলেছিল কেন? এত রং-তামাশার কীই বা দরকার ছিল?”
প্রশ্নটার উত্তর সার্থ দেয় না। চুপ করে থাকে। জয়নব ভাবলেন,হয়ত জানে না সেও। পরপরই শুধালেন,
“ আচ্ছা অয়নের প্রতি অন্যায় করেছো,এরকম মনে হচ্ছে?”
“ ফিফটি-ফিফটি……”
“ কীরকম?”
সার্থ বলল,
“ কখনো মনে হচ্ছে করেছি। কখনো মনে হচ্ছে করিনি। সব কথার মাঝে একটা কথা সত্যি, তুশি তো ওকে ভালোবাসে না দিদুন। যদি বাসতো আমি কখনো ওদের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি হতে যেতাম না। তুশির চোখেমুখে,দৃষ্টিতে আমি শুধু আমার প্রতি আকর্ষণ দেখেছি। আমার প্রতি অনুভূতি দেখেছি।”
জয়নব চেয়ে রইলেন, যেন শুনতে চাইলেন আরো কিছু। নিশ্চিত ছিলেন সার্থ আজ খোলা বই হবে।
ছেলেটা জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“সায়নের মৃত্যু বার্ষিকীতে আমি যখন পাঞ্জাবি পরে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলাম মেয়েটা আমার দিকে হাঁ করে চেয়েছিল। সেই প্রথম আমি খেয়াল করেছি,তুশির চোখে অন্যকিছু! যতবার আমি সামনে গিয়ে দাঁড়াই, ও দুনিয়া ভুলে যেতো। আমি কখন ফিরছি,কখন বের হচ্ছি নিজের রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখতো এসব। বুঝে গিয়েছিলাম,তুশি আমাকে চাইছে। চাইছে এই মিথ্যে বিয়ে সত্যি বানিয়ে নিতে। কিন্তু আমি চাইনি এসব বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যাক। তাই মানা করে দিলাম। সরাসরি বলেছিলাম আমাকে নিয়ে কোনো আশা না রাখতে। কিন্তু, এরপর থেকে ও যতবার অয়নের সাথে কথা বলতো,হাসতো,মজা করতো আমি নিতে পারিনি। আমার বারবার মনে হতো,আমি রিজেক্ট করতেই ও হয়ত অয়নের প্রতি ডাইভার্ট হচ্ছে। আমি কেন যেন এটা সহ্যই করতে পারিনি দিদুন। অয়নও যে ওর প্রতি একইরকম দূর্বল ছিল,তুশিকে নিয়ে ভাবতে বসে খেয়ালই করিনি আমি। আমার মনোযোগ ছিল তুশির ওপর,ও কী করছে কার সাথে কীভাবে কথা বলছে,আমাকে ইগ্নোর করছে আমি প্রচণ্ড বাজে ভাবে এগুলোর প্রতি কনসেনট্রেশান দিয়ে ফেলেছিলাম। থানার দুটো কেসে সেজন্যে অনেক ভুলও করেছি জানো? কাজে ঠিক করে মন দিতে পারিনি। কতগুলো দিন যাইনি ডিউটিতে।
আস্তেধীরে আমি টের পেলাম, পকেটমার তুশি এ এসপি সার্থ আবরারের পকেট কাটতে এসে হদয় কেটে বহু গভীরে ঢুকে গেছে।
আর সেদিনই যখন দেখলাম তুশি অয়নের দিকে চেয়ে হাসল,আমি হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়লাম দিদুন! যা মুখে এলো তাই বললাম ওকে। শুধুমাত্র ওকে কষ্ট দিতে,জ্বালাতে আইরিনের সাথে একটা বিয়ের চাল চেলেছিলাম। আমার বিবেকে বাধ দিয়ে,সাথ দিলাম ইগোর। অথচ সেই ইগোর ক্ষমতা তুশির প্রেমের কাছে মাত্রাতিরিক্ত তুচ্ছ! দেখলে,কেমন করে ভেঙে গুড়িয়ে দিলো আমায়?

“ কিন্তু, আমার উত্তর যে এখনো মেলেনি দাদুভাই। তুশি তোমার প্রতি এত অবসেসড, তাহলে অয়নকে হ্যাঁ বলল কেন? শুধুমাত্র তোমায় জেলাস করতে অয়নকে ব্যবহার করেছে এমন কিছু কী?”
“ না।”
“ তাহলে?”
“ জেলাস ফিল করার জন্যে কেউ এতটা দূর আসে না! বিয়ে করবে না বলে,এত বছর পর যে বাবা মা পরিবার পেয়েছে,বিলাসিতা পেয়েছে সেসব ছেড়ে সহজে পালিয়েও যায় না। ও তুশির মনে অন্য কিছু ছিল! ও চাইছিল ওর একটু নাটকে কারো জীবন সাজিয়ে দিতে। আসলে, এই একটা ঘটনায় আমরা সবাই গোলকধাঁধার মতো জড়িয়ে ছিলাম। এখানে কাউকে না কাউকে কষ্ট পেতেই হতো। তফাত শুধু,অয়নের সাথে তুশির বিয়ে হলে অয়ন একা খুশি হতো, আর গুমড়ে মরতো বাকি দুজন। সরি,দিস ইজন’ট
এবাউট অফ টু পিপল,ইটস আ স্টোরি অফ থ্রি..”
জয়নব ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“ আইরিনের কথা বলছো?’’
“ না।”
“ তাহলে?”
সার্থ থেমে যায়,ভাবে বলবে কিনা।
জয়নব তাগিদ দিলেন,
“ বলো দাদুভাই,আর একজন কে?”
ও দু পল সময় নিয়ে জানাল,
“ ইউশা!”
“ ইউশা? ইউশা আবার এর মাঝে কোত্থেকে এলো?”
“ তুশি বিয়েতে নিজের ইচ্ছেয় রাজি হয়নি।”
জয়নব অস্থির চোখে বললেন,
“ আমাকে একটু খুলে বলবে সব? কিছু বুঝতে পারছি না। সব এলোমেলো লাগছে।”

সার্থ নিচের ঠোঁট চেপে কপালে দু আঙুল ঘষল। চেহারায় বিস্তর দোটানা। জয়নব নরম গলায় বললেন,
“ দাদুভাই,আমাকে বিশ্বাস করতে পারো।”
ছেলেটা আশ্বাস পেলো বোধ হয়। ফোস করে শ্বাস ফেলে, হাতে ফোন তুলে সোজা সাউন্ড রেকর্ডার অপশনে গেল । পরপর দুটো গলার স্বর বাজতেই,জয়নব চোখ ছোট করে মনোযোগ দিলেন। প্রথম দিকে আইরিন আর ওর কথাবার্তা আসে।
জয়নব স্তম্ভিত হয়ে মুখখানা তুললেন সহসা।
“ ডিল? তুমি আর আইরিন বিয়ে নিয়ে ডিল করেছিলে? এর মানে,এর মানে আইরিন সেজন্যেই তোমার বিয়ে হতে দেখেও আজকে ওভাবে চুপ করেছিল?”
“ পরেরটা শোনো।”
এরপর কিছু সময় গেল। ঠিক দশ-বারো মিনিট কাটে। পরপর স্ক্রিন জুড়ে ছুটে এলো তুশির ব্যতিব্যস্ত কাঁপা, ভেজা কণ্ঠটা। খুব অবাক হয়ে বলছিল,
” ইউশা,অয়ন ভাই আমাকে পছন্দ করেন মানে? তুমি আর অয়ন ভাই না দুজন দুজনকে ভালোবাসো? তাহলে আমি ওনাকে কেন বিয়ে করব?”
জয়নব হতভম্ব হয়ে বললেন,
“ এসব কী?”
সার্থ ভ্রুয়ের ইশারায় পুরা কথায় মন দিতে বোঝাল। জয়নবের হাত-পা এক চোট কাঁপল তাতে। বাকরুদ্ধ বনে গেলেন তিনি। থেমে থেমে বললেন,
“ ইউশা,ইউশার জন্যে…. ইউশা কবে থেকে অয়নকে ভালোবাসলো? হচ্ছে কি এ বাড়িতে?
আর তুমি, তুমি এটা কোত্থেকে পেলে!”
সার্থ অডিও পজ করে বলল,
“ এটা আমার ফোনে রেকর্ড হয়েছিল। আইরিনের সাথে ডিল করলেও,ওর ওপর তো আমার বিশ্বাস-ভরসা শূন্যের ঘরে। তাই পরবর্তীতে যাতে আইরিন এই ডিল নিয়ে উল্টোপাল্টা কিছু না করতে পারে, সেজন্যে ওর সাথে কথা বলার আগেই আমি রেকর্ডার অন করে রেখেছিলাম। মোস্ট প্রোবাবলি ওঠার সময় পকেট থেকে কাউচের ওপর আমার ফোন পড়ে যায়। কিন্তু রেকর্ডার অন ছিল। ইউশাকে নিয়ে তুশি ওই ঘরেই এসেছিল সেদিন। আর তাতেই ওদের কথাগুলো রেকর্ড হয়ে থাকে। অথচ মজার ব্যাপার দিদুন আমি নিজেও এই পুরো রেকর্ডিংটা শুনেছি পার্টির আগের দিন। তাই বারবার চাইছিলাম তুশি যেন ভুল সিদ্ধান্ত না নেয়৷ কাউকে কথা দিতে,কিংবা আমার ওপর প্রতিশোধ নিতে অনীচ্ছায় বিয়ে না করে। কিন্তু মেয়েটা অভিমানে এমন আগুন হয়ে ছিল, আমাকে কোনো সুযোগই দেয়নি।”
জয়নব দিশাহারা হয়ে বললেন,
“ আমার মাথা ঘুরছে,দাদুভাই। তুমি এসব এতদিন বলোনি কেন কাউকে?”
“ দেখতে চেয়েছিলাম তুশি কী করে!”
“ সব কেমন ঘেটে গেল! মনে হচ্ছে তোমাদের চারজনকে ঘিরে একটা অসহ্যকর সিনেমা দেখছি আমি। যেখানে কিছু ভালো হচ্ছে না,তাও আমার কিছু করার নেই। তাও আমি একটা কথা বলি, সরাসরিই বলি…এই গোটা ব্যাপারটায় না অয়নের খুব বেশি দোষ আমি দেব না। ওর বয়স কম,তাগড়া যোয়ান ছেলে! আগুন আর বরফ পাশাপাশি রাখলে এমন তো হবেই। তারওপর তুশি সুন্দরী! বউ তুমি ছেড়েই রেখেছিলে। সম্পর্কে থাকার বাধ্যবাধকতা ছিল না। এখানে একশো ভাগের পঞ্চাশ ভাগ দোষ ওদের তিনজনের হলে,বাকি পঞ্চাশ ভাগ দোষী কিন্তু তুমি!”
সার্থ ছোটো কণ্ঠে বলল,
“ সেটা আমি মানি।”
“ তুশির কাছে কখনো ক্ষমা চেয়েছ?”
“ না।”
“ চাইবে না?”
সার্থ নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে কামড়ে গেল। বলল না কিছু। জয়নব মৃদূ হেসে বললেন,
“ এটুকু অবশ্য তোমার ওপরেই থাকুক। ক্ষমা তো মনের ব্যাপার! ভাবো কী করবে। আমি এখন আসি।”
সার্থ একইরকম চুপ করে রইল। জয়নব বেরিয়ে গেলেন। ও কাজে মন দেয়। বুকে ওষুধ লাগাতে পারলেও,পিঠে হাত যায়নি। সেখানেও জ্বলছিল । সার্থ চেষ্টা করল,তার লম্বা হাত দুটো দিয়ে ক্ষতটা ছোঁয়ার, হলো না! হাল ছাড়ল ও।
মেজাজ খারাপ করে কাঁধের ওপর দিয়ে পেছন দিকে ছুড়ে ফেলে দেয় তুলোটা। ঠিক তার ক সেকেন্ড পর টের পায়,পিঠের ওপর দুটো আঙুলের আলতো ছোঁয়া বসেছে। তুলোর মতো স্পর্শ তার! চকিতে ঘুরে চাইল সার্থ। বিভ্রান্ত, শান্ত নজর চমকে গেল অমনি।
অবাক হয়ে ডাকল – তুশিইই!
তুশির মুখে হাসি নেই। চোখে ঝলক নেই আগের মতো। তার দুরন্ত চাউনিরাও গায়েব।
শুধু রোবটের ন্যায় বলল,
“ ঘুরে বসুন!”
সার্থ কথা বাড়ায় না। ভদ্র ছেলের মতো বসে থাকে। তুশি নিজেই তুলোতে ওষুধ নিয়ে ক্ষততে চেপে চেপে দেয়। নতুন ভাবে ব্যাণ্ডেজ করে! আর সেই পুরোটা সময় অদূরের ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় চেয়ে থাকে সার্থ। তুশির পরনে চুরিদার,গলায় ওরনা, বেনুনিটা এক পাশে ঝুলছে। মলিন একটা মুখ! পাথর তার মেয়েলি শরীর। তবে বাল্বের আলোর তোড়ে আয়নার মধ্যেও নাকের নাকফুলটা জ্বলছিল খুব!
সার্থ চেয়ে থাকার মাঝেই ওষুধপত্র গুছিয়ে ও টেবিলে রেখে দিলো। একটা কথাও না বলে,বেরিয়ে গেল আবার। সার্থ ডাকতে চেয়েও,থেমে গেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলল ক্লান্ত মনে। আর ভালো লাগছে না, আর না! এসব ঠিক হবে কবে? কবে সব ভালো হবে?
হঠাৎ শব্দ হলো তখনই। মুখ তুলে চাইল ও। তনিমা ভাতের থালা সহ ট্রেটা টেবিলে রাখলেন। ও সাথে সাথে বলল,
“ অয়নের এখন কী অবস্থা?”
ভদ্রমহিলা দুই ভ্রু উঁচিয়ে বললেন,
“ বাবাহ,তোর ওকে নিয়ে চিন্তাও হয়?”
সার্থ হেসে বলে,
“ তাই তো, হু ইজ হি? আমার কেন চিন্তা হবে?”
“ আমি সেরকম বোঝাইনি। যাক গে,
আম্মা বলল তোর ব্যথা এখনো কমেনি! কী শুরু করেছিস বল তো। কতদিকে নজর রাখব আমি? কতদিক সামলাব? আমিও তো একটা মানুষ সার্থ! না নিজে এসে কিছু বলিস,না আমাকে বলার সুযোগ দিস।
একটু তো নিজের খেয়াল রাখ। কাল একবার দয়া করে চেক আপটা করিয়ে নিস। ঘাড়ত্যাড়ামি করিস না, দোহাই।”
ও বলল,
“ বলেছি তো যাব। তুমি অয়নের কাছে গিয়েছিলে?”
“ না,শক্তি পাইনি। কী বলব গিয়ে? যত কপাল আমার, এদিকে দুইদিকে দুই ছেলে। ওদিকে রোকসানা মেয়ে নিয়ে দোর আটকে দিয়েছে। ছোটোর দিকে তো তাকাতেই পারছি না। আবার ঘরেরজনেরও একই অবস্থা। হ্যাঁ রে, তোর কী দরকার ছিল বাবাকে ওভাবে খোচানোর?”
সার্থ ভ্রু নাঁচাল,
“ কেন, কষ্ট হয়েছে তোমার?”
“ হয়েছে। খারাপও লেগেছে। সবার সামনে এসব বলার তো কোনো মানে হয় না। অতীতে ওসব করলেও, লোকটা তো এখন নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। মানলাম তুই তোর ভাই হারিয়েছিস,কিন্তু ওইই লোকটাও তার ছেলে হারিয়েছে সার্থ। এবার অন্তত সব ভুলে যা!”
সার্থ বলল,
“ তার তো আরো দুটো ছেলে আছে, মা। যাদের দিকে তাকালে এক ছেলের শোক সে ভুলে যেতে পারবে। কিন্তু, আমার যে আর বড়ো ভাই নেই! সায়ন তো একা যায়নি,আমার সব থেকে ভালো বন্ধুটাকেও নিজের সাথে নিয়ে গিয়েছে। আজ ও থাকলে আমার হয়ত কাউকে এত এক্সপ্লেইনেশান দিতেই হতো না। ও ঠিক বুঝতো আমায়! তখন আমাকে আর অয়নকে একসাথে বসিয়ে বড়ো ভাইয়ের মতো সব মিটিয়ে দিতো। কোনো ঝামেলা হতোই না তখন। তুমি পতিব্রতা স্ত্রীর মতো স্বামীর সব ভুলে সংসার করতে পারো,কিন্তু আমি পারব না। আমি যতবার ওনার দিকে তাকাই,আমার সায়নের মুখটা মনে পড়ে। মনে পড়ে ওই লোকটা আমার মায়ের বুকে লাথি মেরে,আমাদের সবাইকে ফেলে চলে গিয়েছিল শুধুমাত্র আরেক নারীর সাথে সংসার পাতবে বলে। মনে পড়ে যায়, সেই রাতে একটা গলা-কাটা মুরগীর মতো আমার ভাই আমার দুহাতের ওপর ছটফট করতে করতে মরে গেছিল,মা। আর আমি,আমি কিচ্ছু করতে পারিনি। আমার মা পাগলের মতো এদিক-ওদিক ছুটছিল ছেলের চিকিৎসার জন্যে। একটা বেডে সায়নকে শোয়ানোর জন্যে। আমার ভাইটা দম ছাড়ার আগেও বারবার বলছিল,বাবা,বাবা কোথায়? বাবাকে দেখব সার্থ,বাবা আসবে না?
সো আই হেইট দিস কাওয়ার্ড! আই হেইট হিম,হেইট হিম আই হেইট হিম!”

সার্থর এক চোখের অশ্রুনালী বেয়ে জলের মতো একটা বেয়ে নামছিল,অথচ পুরো কথাগুলো চিবিয়ে চিবিয়ে বলল ও। তনিমা তাড়াহুড়ো করে ছেলের মাথাটা বুকে নিয়ে এলেন।
গায়ে-পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন,
“ শান্ত হ বাবা,শান্ত হ‌!”
সার্থ আর শব্দ করল না! তপ্ত চোখে দৃঢ় মুখখানা তার। অথচ ভেতর ভেতর ধ্বসের চিহ্নটা তনিমা টের পেলেন তখন,যখন ছেলেটা চুপচাপ হয়ে কোলে মাথা রাখল। ঘরে দুজন মানুষ থাকলেও আর আওয়াজ এলো না। মা-ছেলের বিদীর্ণ নীরবতা হাহাকার ছেপে দিলো সবেতে।
তনিমা বসে বসে একদৃষ্টে সার্থর মুখখানা দেখলেন কিছুক্ষণ। সার্থর নির্লিপ্ত নজর তখন ছাদের বুকে। ভদ্রমহিলার বুক মুচড়ে ওঠে। জলে চোখ ছেঁয়ে যায়। এই ছেলেটা যাই করুক, কেবল একটা কারণে তিনি চাইলেও রাগ দেখাতে পারেন না। পারেন না কিছু বলতে। ওইটুকু সময় কত বয়স ছিল ওর? ১২/১৩ হয়ত। সেসময় ওর কুটিকুটি হাতদুটোর ওপর সায়ন শেষ নিঃশ্বাস নিয়েছিল। ওর কোলেই কাতরে কাতরে মরেছিল ছেলেটা। পরপর বাবার ব্যাভিচার,ছোটো মায়ের এক মেয়ে হারিয়ে যাওয়া সব মিলিয়ে সার্থর ট্রমা আরো গাঢ় হয়ে বসল। হুট করে কেমন নীরব হয়ে গেল ছেলেটা। পুরোপুরি ঘরবন্দী যেন! টানা ১৪ দিন পর সাইফুল বুঝিয়ে-শুনিয়ে কত কী বলে ওকে বাইরে এনেছিলেন! সেদিন গাট্টাগোট্টা সার্থর টিঙটিঙে রোগা চেহারাটা ভালো করে দেখতে পেয়ে আঁতকে উঠল প্রত্যেকে! এরপরেও সার্থ স্কুলে যেতে চাইত না,টিউশনে পড়তে বসতো না, খেলতে যেতো না, দিনের অর্ধেকটা সময় বাড়ির পেছনের উঠোনে বসে থাকতো। চুপ করে চেয়ে থাকতো সুইমিংপুলের দিকে। কতদিন তনিমা দেখেছেন টেবিলে খাবারের প্লেট একইরকম পড়ে আছে ওর। শওকত কথা বলতে গেলেই,চিৎকার করে উঠতো। ভদ্রলোক এরপর ছেলের কাছে যাওয়াই বাদ দিয়ে দিলেন। সেবারের পরীক্ষায় সার্থ ফেইল করল। একদম সব সাব্জেক্টে ০ এলো নম্বর! শিক্ষকরা জানালেন, কোনো খাতাতেই সার্থ কিছু লেখেনি। একটা শব্দও না। সায়নের মৃত্যু শোক,তুশির হারিয়ে যাওয়া সেইসব ভুলে বাড়ির সবাই চিন্তায় পড়ল ওকে নিয়ে। তনিমা কত মানত করলেন,আল্লাহর নাম জপলেন সারাক্ষণ। সাইফুল নিজের কাজ বাজ তুঙ্গে তুলে ওকে পড়াতে বসাতেন। নিজে স্কুলে দিয়ে আসতেন,নিয়ে আসতেন। রাতে ঘুমোতেন ওর সাথে। তারপর হঠাৎ আবার সার্থর কী যেন হলো! নিজে থেকে স্কুলে যায়,খেতে আসে তবে বাবার সাথে বসে না,খেলতে যায় নিজেই। কিন্তু অতদিনে ছেলেটা যে পুরোপুরি পাথর হয়ে গেছে,তনিমা বুঝতে পারলেন পরে। যখন সার্থ আর আঁচল ধরে ঘুরল না,আর দুষ্টুমি করতো না,আর জ্বালাতো না কাউকে। আর না ওর ব্যাটে লেগে বলটা এসে বাড়ির জানলার কাচ ভেঙে দিতো!


আমাবস্যার কালো অন্ধকার আজ এই ঘরে নেমে এসেছে। কোথাও কোনো আলো নেই। পর্দার আড়াল দিয়ে আসা রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আবছা প্রভা সুবিধে করতে নারাজ। অয়ন খুব ধীরুজ পায়ে ঢুকল ভেতরে! তার খসখসে পদচারণ মেঝেও টের পায় না যেন। ফ্যাকাশে মুখটা দেখে মনে হলো এত বিধ্বস্ত বোধ হয় এই মূহুর্তে আর কেউ নেই! শরীরে জোর নেই যার,না আছে পা চালানোর শক্তি। অন্ধকার মাথায় বইতে বইতে টালমাটাল কদমে এসে খাট ঘেঁষে ফ্লোরে বসল অয়ন। এক পা লম্বা ছড়িয়ে,আরেক পা একটু ভাঁজ করে চওড়া পিঠ মেশাল কাঠের সঙ্গে।
আস্তেধীরে বিষণ্ণ চোখ থেকে তিঁমিরের ছটা কমল। অল্পস্বল্প বোঝা গেল ঘরের আসবাব কোথায় কী আছে! তাতেই যেন স্পষ্ট হলো সামনে রাখা জিনিসগুলো!
বিয়ের জিনিসপত্র বিছানায় রাখা। ওর শেরওয়ানি,তুশির বেনারসি সব পাশাপাশি পড়ে আছে এখনো। একটা বউয়ের যা যা লাগে,বড়ো যত্ন নিয়ে কিনেছিল অয়ন। তুশির জন্যে,তুশিকে পরানোর জন্যে ওকে মন ভরে দেখার জন্যে। অথচ,অথচ কিচ্ছু হলো না? উলটে তুশি ওর সব ভালোবাসা পা দিয়ে পিষে সার্থর দেয়া বেনারসি পরে সামনে এসে দাঁড়াল? অয়নের বুক কামড়ে ধরল সেসব অবশ যন্ত্রনারা। হাঁসফাঁস করে উঠল আরেকবার।
দরজার কপাট সরানোর শব্দ হলো তক্ষুনি। একটা ছায়ামূর্তি এসেছে!
অথচ ফিরল না অয়ন,দেখতে চাইল না কাউকে। বুকের ভেতর থেকে হৃদয়টা কেউ জ্যান্ত উপড়ে নিচ্ছে যে,সেই পীড়াই যে সইতে পারছে না। তুশি যখন বলল ‘আমি তো আপনাকে চাই না অয়ন ভাই! আমি আপনার ছিলাম না,আপনার হবোও না!’
ফের তীরের ফলার মতোন তেড়ে এসে অয়নের বুকটা দুই খণ্ড করে দেয়! পোঁকার মত কিলবিল করে মস্তিষ্কে। ছেলেটা দুই হাতে কপালের দুপাশ খামচে ধরে। আর এই বিধ্বস্ত সাম্রাজ্যের পরাজিত রাজার সামনে আচমকা ঝড়ের মতো ছুটে এসে হাঁটুগেড়ে বসে পড়ল ইউশা।
অস্থির হয়ে ডাকল,
“ অয়ন ভাই!”
অয়ন চাইল আস্তেধীরে। হাত দুটো কাঁপছে ওর। খুব কোমলভাবে নিজের ছোট্ট হাতটা তার কাঁধে রাখল ইউশা। এই স্পর্শ অয়নের যন্ত্রণার সাগরে খড়কুটো যেন। ভেজা গলায় বলল,
“ ওরা আমার সাথে এমন কেন করল ইউশা? আমি তো তুশির জন্য সব করতে পারতাম,বল। কত ভালোবাসি আমি ওকে। অথচ ও আমাকে বেছে নিলো না। আর যে মানুষটা ওকে শুরু থেকে অবহেলা করল, অসম্মান করল,বাড়ির কাজের মেয়ের মতো ট্রিট করল,তুশি তাকেই পছন্দ করল ইউশা? আমি কি এতটাই অযোগ্য?”
​ইউশার সব দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ভীষণ কান্নায় ভেঙে আসে ঠোঁট। চোখের পানিটা গালে গড়াতে গড়াতে বলল,
“ তুশির দোষ নেই অয়ন ভাই,সব দোষ আমা…”
অয়ন বলতে দেয় না, কথা কেড়ে নেয়। ছটফট করে বলে,
“ বোকা মেয়ে তুশি, বুঝলোই না ও যে একটা কাচের প্রতি ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে গেছে। ভাইয়া তো ধারালো কাচ! যাকে ছুঁলে শুধু কেটে যায়,রক্ত আসে,এর বাইরে কিচ্ছু পাওয়া যায় না।”
ইউশা হাহাকার করে বলল,
“ আমি যে কেন তুশিকে জোর করতে গেলাম! সব আমার জন্যে হলো! আমি তোমাদের সুখী দেখতে চেয়ে উল্টে তোমার দুঃখ বাড়িয়ে দিলাম অয়ন ভাই। তুমি বরং আমাকে শাস্তি দাও। আমাকে মারো। আমাকে কথা শোনাও!
আমি, আমি তুশিকে জোর করেছিলাম তোমাকে বিয়ে করতে। কেন করলাম আমি, কেন?”
অয়ন চুপ করে রইল। দেখে বোঝা গেল না,ইউশার কান্না বা কথাগুলো কানে পৌঁছাল কিনা! নিথরের মতো চেয়ে রইল কোথাও। ইউশা এই দৃশ্যে আঁতকে ওঠে। পাগল হয়ে ওর গাল চাপড়ে বলে,
“অয়ন ভাই, এভাবে ভেঙে যেও না। ভালোবাসা তো জোর করে পাওয়া যায় না বলো! সামলাও নিজেকে,সামলাও তুমি।”
ছেলেটার কী যেন হলো হঠাৎ করে! ধড়ফড় করে দুটো হাত বাড়িয়ে ইউশার ক্ষুদ্র শরীরটা জাপটে নিজের কাছে নিয়ে এলো। যেমন অসহায় ছোট্ট শিশু নিজের সব হারিয়ে আশ্রয়ের কাছে ছুটে এসেছে। অয়নই অমন করে ইউশার বুকে ঢুকে গেল। মরিয়া হয়ে বলল,
“ আমি ওকে ভালোবাসি ইউশা! ভীষণ ভালোবাসি! ওরা কেন আমার সাথে এমন করল? কেন? আমি সব শুনেই এগিয়েছিলাম। তাহলে আমার সাথে এটা কেন হলো?”
ইউশা শক্ত হয়ে যায়। বুক কাঁপলেও, চোখের কোণ ছুঁয়ে একটা জল নেমে গলায় গিয়ে লাগে। যে মানুষটাকে ও মনে প্রাণে চায়, আজ সেই মানুষটাই ওকে জড়িয়ে ধরে অন্য নারীর জন্য আহাজারি করছে? একেই কি ভাগ্যের পরিহাস বলে?
​অয়ন বলেই গেল নিজের মতো,
“ আমি মরে যাব ইউশা, তুশিকে ছাড়া আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। ও কেন এমন করল? ও একবার অন্তত আমার দিকে চেয়ে বলতে পারত আমার কমতি কোথায়?
​ইউশা মনের রাশ টানল। বুকটা চিরে গেলেও শান্ত রইল সে। ঢোক গিলতে গিলতে গিলে নিলো নিজের দুঃখদের। কাঁপা হাত দুটো তুলে অয়নের পিঠে হাত রাখল ইউশা। চোখের জল অয়নের চুলে ছুঁয়ে দিচ্ছে। মানুষটার মাথাটা নিজের বুকের কাছে আরো শক্ত করে চেপে ধরল ও। অয়নও আজ মিশে থাকে সেখানে। নিজের সব বিষাদ আহাজারিতে বের করে দেয়। ইউশা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রাখে নিজেকে আটকাতে। কণ্ঠ ছিঁড়ে কান্না ঠেলে আসছে। আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে তার ভেজা চোখের মনি। অথচ ঠোঁটের কোণে এক টুকরো বিবর্ণ হাসি ঝুলিয়ে ভাবল,
‘ আমরা দুজনেই কাঁদছি অয়ন ভাই। দুজন দুজনকে ধরে কাঁদছি। তফাত শুধু,
তুমি তুশির জন্য কাঁদছো , আর আমি তোমার জন্য। কিন্তু আমাদের কার কষ্ট বেশি? আমারই বোধ হয়। তুমি তো তাও তোমার ভালোবাসার কথা চিৎকার করে বলতে পারছ, শোনাতে পারছো আমাকে। আমি যে তাও পারছি না! আমার ভেতরে ঝড় বইলেও আমি কাউকে দেখাতে পারি না,শোনাতে পারি না। আমার মতো অভাগী আর দুটো হয় বলো তো? তুমি আমাকে দেখে শেখো,দুঃখদের কীভাবে কবর দিতে হয়!

চলবে,
পরবর্তী পর্ব দেরিতে আসবে। আর ইদেরর আগেও যেহেতু আর গল্প দেবো না,তাই সবাইকে অগ্রীম ইদের শুভেচ্ছা জানিয়ে গেলাম। ইদ মোবারক।❤️

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply