কাছে আসার মৌসুম!_(৬৬)
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
সৈয়দ বাড়ির ভোর- সন্ধ্যে সব একই রকম হয়। গতানুগতিক,হইচই-হীন! তবে ব্যস্ততা থাকে পুরোদস্তুর। কিন্তু আজ এর তাল, গতি থিতিয়ে বসল সকলের চিন্তা আর উদ্বেগের কাছে। বাড়ি থেকে কেউ বের হয়নি। সাইফুল বা শওকত কেউই যেতে পারেননি কাজে। মিন্তু,ইউশাও নিজেদের ক্লাস মিস করে গেল! তনিমা-রেহণূমা দুজনের দশাই একইরকম বলা যায়। গোটা বাড়ির অবস্থাই ভালো নয় আজ! তবে এখন অবধি একটা ব্যাপার নিশ্চিত সকলে, সার্থ-তুশি বোধ হয় একইসাথে আছে। বোধ হয় অয়নই ঠিক বলছে কাল থেকে । নাহলে দুজনের কেউই বাড়িতে ওই একটা সময় ধরেই নেই। কেউ ফেরেনি গতকাল। কারো খোঁজ নেই। এতটা কাকতালীয় হতে পারে কখনো?
আসমা খাবার টেবিলের এঁটো বাসন-কোসন গোছাচ্ছে। সন্ধ্যে এখন। একটা হালকা পাতলা নাস্তার পাঠ চুকেছে কিছু সময় হলো। বাড়িতে অতিথিরা কেউ নেই। সবাই নিজেদের লোক। তবে রোকসানা শ্বশুর বাড়ি যাননি। গতকাল নাসীরের সাথে একটা তর্কযুদ্ধের পর জেদ করে মেয়ে সহ রয়ে গেছেন এখানে। ভেতর ভেতর দুশ্চিন্তা তার নিজেরও কম কিছু নেই। সার্থ যদি সত্যিই তুশিকে নিয়ে থাকে,আইরিনের কী হবে? মেয়েটা তো বিধ্বস্ত হয়ে যাবে।
যতই রাগ করে বলুক বিয়ে দেবেন না,সার্থ একবার ক্ষমা চাইলেই তো সব ঠিক করা যেত। কিন্তু এখন যদি হাতে আর উপায় না থাকে? আইরিনকে সামলাবেন কী করে তিনি? ভদ্রমহিলা একবার বড়ো ভাইকে দেখলেন। শওকত গতকাল থেকেই চুপচাপ হয়ে আছেন। এই প্রসঙ্গে একটা বাড়তি কথা তার মুখে নেই। অবশ্য সার্থর যে কোনো ব্যাপারেই কম জড়ান তিনি। হয়ত তুশি জড়িত না থাকলে, এটুকুও কথা বলতেন না।
আপাতত সব কিছু থমথমে,নীরব এখানে। সবাই প্রতিদিনকার মতো চা নিয়ে বসলেও নির্বাক সকলে। ইউশার মুখটা শুকনো খুব! বিষণ্ণ চোখের পানে তাকানো যাচ্ছে না। ভেতর ভেতর সাংঘাতিক মুষড়ে গেছে বেচারি। একে তো নিজেকে সব কিছুর জন্যে দ্বায়ী মনে হচ্ছে, তার ওপর অয়নের এই ছটফট করে মরা! এসব দেখে বুকটা ধ্বসে যায় ওর। কষ্ট হয়,পৃথিবী কেমন শূন্য শূন্য লাগে।
গতকাল তুশিকে খুঁজতে জামিলের সাথে বের হওয়ার পর, অনেক রাত করে ফিরেছিল অয়ন। টলমল পায়ে সোজা ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। সেজন্যে ইউশা কাছে যেতে পারেনি। দুটো কথাও হয়নি। আর তারপর, সকাল হতেই আবার বেরিয়ে গেল অয়ন। ফিরল দুপুর নাগাদ। এখন ঘড়িতে ছুঁইছুঁই করছে ছয়টার কাঁটা অথচ এখনো নিচে নামেনি সে। কতবার কতজন গিয়ে ডাকল,দরজা ধাক্কাল, খোলেইনি। ইউশা চা খেতে খেতে কয়েকবার ব্যাকুল চোখে সিঁড়ির ওপরের দিকটা দেখল। অয়ন ভাই কী করছে? ঠিক আছে তো? দরজার ওপাড়ে আবার ছটফট করছে না তো তুশির জন্যে! সেটাই স্বাভাবিক যদিও।
ভালোবাসা না পাওয়ার জ্বালা ওর থেকে ভালো কে জানে! অয়ন ভাই এমন কষ্ট পাক ইউশা চায়নি। তুশিকে নিয়ে সুখে থাকুক খুব করে চেয়েছিল মেয়েটা। মেজো ভাইয়া তুশিকে অবহেলা করছিল বলেই তো স্বেচ্ছায় নিজের ভালোবাসার মানুষকে ও তার হাতে তুলে দিতে চাইছিল। তাহলে কোত্থেকে কী ঘটে গেল এখন? কেন এরকম করল তুশি?
এদিকে হাসনার গলা দিয়েও খাবার নামছে না। দূর্ভাবনার তোড়ে বুক শুকিয়ে গেছে। স্টেশনে যেতে পারেননি কাল। বাড়ির ঝুট ঝামেলার জন্যে ফাঁকই পাননি। আবার জয়নবও সারাক্ষণ ওনাকে সঙ্গে সঙ্গে রেখেছেন। ঘুমিয়েছেনও ওনার সাথে। হাসনা পালাবেন যে, কপালে সেই ফুরসতটাও জোটেনি। সদর দরজা রাতে লক করা থাকে। চাবিও ছিল না। নাতনির দুশ্চিন্তায় চোখে অন্ধকার দেখছেন তিনি।
তুশি বলে গেছিল ও স্টেশনে বসবে। আবার অপেক্ষা করতে করতে একা হয়ে পড়েনি তো? বিপদ-আপদ হলো না তো!
নাকি বাকিদের কথাই ঠিক,নাত জামাইয়ের সাথেই আছে তুশি? এসব সম্ভব কিনা হাসনা জানেন না। তবে বৃদ্ধা আজ ফজরের নামাজেও এক চোট চেয়েছেন, তুশি থাকলে যেন সার্থর সাথেই থাকে। মেয়েটা যে কী মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসে ওর পুলিশকে,হাসনা জানেন। জানবেন না? নিজের এই দুইহাতে যে মানুষ করেছেন ওকে।
বৃদ্ধার ধ্যান ভাঙল রোকসানার কণ্ঠ শুনে। রয়েসয়ে বললেন,
“ তাহলে ছোটো ভাইজান,কী করবে এখন? মেয়ে খুঁজতে বের হবে না?”
সাইফুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বড়ো ভাইয়ের দিকে তাকালেন। যেন শুনতে চাইলেন সে কী বলে! শওকত তখনো চুপ। যতই হোক, ছেলে তো ওনার। কথা বলার মুখ কই? সাইফুল নিজেই মিনমিন করলেন,
“ ভাবছি আরেকবার থানায় যাব।”
রোকসানা বললেন,
“ গিয়ে আর কী করবে, ভালোই আছে তোমার মেয়ে। এখন আমারও মনে হচ্ছে অয়নই ঠিক,তুশি সার্থর সাথেই পালিয়েছে।”
রেহণূমা বললেন,
“ তাহলে দারোয়ান তো সার্থকে যেতে দেখতো। দেখেনি বলছে। আর ওরা একসাথেও তো বের হয়নি। আমার মনে হচ্ছে না সার্থ এরকম কিছু করবে। তাহলে অন্তত আমাদের জানাতো। তাই না,বলুন আম্মা? আমরা যে চিন্তা করব,সার্থ বুঝবে না? বুঝবে তো। আপা,তাই না বলো?”
তনিমা থমথমে গলায় বললেন,
“ আমি কিছু জানি না। আজব একটা ছেলে জন্ম দিয়েছি। কখন মাথায় কী চেপে বসে নিজেও বোঝে না,মা হয়ে আমিও বুঝি না। করুক যা ইচ্ছে, করুক। আমি এখন শুধু অয়নটাকে নিয়ে ভাবছি। যদি সত্যি সার্থ এরকম কিছু করে,দুই ভাইয়ের মধ্যে যে ফাটল ধরবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বাড়িতে আবার নতুন অশান্তি হবে,উফ!
রোকসানা বিদ্রুপ করে বললেন,
“ ছেলেমেয়ে ঠিক করে মানুষ না করলে এরকমই হয়, ভাবি। আমার আইরিনকে দেখেছ,আমার মুখের ওপর কখনো কথা বলে? সেখানে তোমাদের ছেলেমেয়ে তোমাদের পাত্তাই দেয় না।”
জয়নব ধমকালেন আস্তে করে,
“ আহ,আবার শুরু করেছ?”
“ আমি কিছু বললেই খারাপ শোনায়, মা? আর এ বাড়িতে যা হচ্ছে তা কী? সার্থ যে একটা জঘন্য কাজ করল, সে নিয়ে কাউকে কিচ্ছু বলতে দেখলাম না। ওর জন্যে আমি এখন আমার শ্বশুর বাড়ি মুখ দেখাব কী করে? নাহয় রাগ করে বলেছিলাম বিয়ে দেবো না,তাই বলে একবারে তো সব শেষ করে দিইনি। আর সার্থও বা কী করল,আমার মেয়েকে বিয়ের আশা দেখিয়ে আরেকজন নিয়ে পালিয়ে গেল? ছিহ!”
আইরিনের চোখমুখ আরো মলিন হয়ে গেল। চুপ করে টেবিলের দিকে চেয়ে রইল সে। মেয়ের মুখের দশায় রোকসানার বুকের চাপ বাড়ল আরো।
শওকত বললেন,
“ এবার এই আলোচনাগুলো এখানেই থামাও। কাল থেকে শুনে শুনে অতীষ্ঠ আমি। আগে দেখি কে কী করেছে! দুটোতে যেখানেই যাক,বাড়িতেই তো ফিরবে। তখন না হয় সবাই মিলে আবার শুরু করো। আর ভালো লাগছে না।”
ইউশা খুব নিচু গলায় বলল,
“ বড়ো মা,অয়ন ভাইকে আরেকবার ডাকলে হতো না? কিছু খেলো না সারাদিন।”
“ হ্যাঁ তাইত, ও আপা যাব আমি? আমার যে কী ভয় লাগছে!
উফ…অশান্তির শেষ নেই।”
রেহণূমা এগোতে নিলেন,হাতটা টেনে ধরলেন তনিমা। সাথে ভ্রু দিয়ে ওপরের দিকে ইশারা করলেন তিনি। ইউশা চকিতে ফিরল পেছনে। অয়ন গায়ে শার্ট পরতে পরতে দ্রুত পায়ে নামছে। চুলগুলো অগোছালো,লাল হয়ে মুখখানা ফুলেছে একটু। বোঝাই যাচ্ছে,অনিদ্রার একটা বিদীর্ণ রজনী কাল পার করেছে ছেলেটা।
কাছাকাছি আসতেই তনিমা বললেন,
“ অয়ন,এখন আবার কোথায় যাচ্ছিস? এইত একটু আগে এলি।”
ও ব্যতিব্যস্ত বলল,
“ তুশিদের বস্তিতে।”
“ কিছু খেয়ে….”
অয়ন পুরো কথা শুনল না, এগোলো লম্বা লম্বা পায়ে। শওকত চাপা শ্বাস টানলেন। সকলেই বুঝলেন,অয়ন আবারো তুশিকে খুঁজতে যাচ্ছে। কিন্তু হাসনার ভীষণ মায়া হলো। কাল থেকেই তো অবস্থা দেখছেন অয়নের। এইবার আর চুপ থাকতে পারলেন না। তড়িঘড়ি করে বললেন,
“ তুশি ওইখানে নাই। যাইও না তুমি।”
অয়ন দোর অবধি গিয়েছিল,থামল সহসা। ফিরে চেয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ এর মানে আপনি জানেন ও কোথায়?”
হাসনা থতমত খেয়ে গেলেন। আমতাআমতা করে বললেন,
“ আমি? না না আমি জানি না। আমি ক্যামনে জানমু?”
কিন্তু সাত তাড়াতাড়ি চেহারার মিইয়ে যাওয়া ভাব লুকোতে পারেননি তিনি। অয়নের সন্দেহ হলো। ভূতের ন্যায় এসে দাঁড়াল ওনার সামনে। চড়া কণ্ঠে বলল,
“ তাহলে আপনি জানেন। আম ড্যাম শিয়র আপনিই জানেন। বলুন দাদি,বলুন তুশি কোথায়?”
রেহণূমা-তনিমাও অবাক হয়ে বললেন,
“ খালা, আপনি সত্যিই জানেন?”
ইউশা বলল,
“ জানলে বলে দিন দাদি। সবাই তো চিন্তায় আছে। তুশি কি মেজো ভাইয়ার সাথে গিয়েছে,নাকি নিজের ইচ্ছেতে কোথাও গিয়েছে?”
জয়নব থেকে শুরু করে প্রত্যেকেই একেক প্রশ্ন করল। একটা মোক্ষম জেরার কবলে পড়ে হাসনার মাথা ভনভন করে ওঠে। হাত-পা ঘেমে যায়। কী বলবেন, কী করবেন দিশা হারিয়ে ফেলেন।
বারবার ঢোক গিলতে দেখে অয়ন চোখ লাল করে বলল,
“ আপনি কাল থেকে আমাদের মিথ্যে বলেছিলেন তাই না? তুশি কোথায় আপনি বলবেন,নাকি…”
সেসময় সদর দোর খোলা ছিল। রাত নেমেছে,অন্ধকারও বসেছে অল্পস্বল্প। করিডোরে জ্বালানো বাল্বের আলো ঠিকড়ে পড়েছে চৌকাঠের বুকে। সেই আলোয় একটা দীর্ঘদেহী কালো ছায়া ভেসে উঠল মেঝেতে।
খুব নিচু স্বরে ডাকল – মা!
কথাবার্তা থামল সেখানেই। ডাক শুনে তুরন্ত ফিরে চাইল সকলে। অতগুলো দৃষ্টি, অতগুলো মানুষ চমকে উঠল অমনি। শেরওয়ানি পরা সার্থ নিস্পন্দ চোখদুটো ঘুরিয়ে প্রত্যেককে দেখল একবার। তনিমা ফ্যালফ্যাল করে ছেলের আপাদমস্তক দেখে বললেন,
“ সার্থ,তুই এই, এই সাজে কেন!”
সাইফুল হড়বড় করে বললেন,
“ ,তুই কই ছিলি সারারাত? তুই কি জানিস তুশি কোথায়?”
প্রশ্ন শেষ হয়,উত্তরের আশায় থাকে সকলে। এক-দু সেকেন্ড বাদে সার্থর চওড়া পিঠের আড়াল থেকে মাথা নিচু করে বেরিয়ে আসে তুশি। চোখ পায়ের পাতায় রেখে দাঁড়ায় ওর পাশে। পরনে বউয়ের শাড়ি, মাথায় ঘোমটা এক হাত। মুঠোর ভেতর সার্থর খসখসে হাত ঢুকে আছে। ওই বাঁধন গলে বাতাস যাতায়াতেরও জায়গা বন্ধ যেন। দুজনকে পাশাপাশি এমন বর-কনের বেশে দেখে,কার কী হলো জানা নেই, তবে প্রকাণ্ড শব্দে একটা দূর্নিবার বাঁজ এসে অয়নের মাথার ওপর পড়ল। দাউদাউ আগুনের শিখায় যেন ঝলসে গেল সে। কিংকর্তব্যবিমুঢ় নয়নে দু পা পিছিয়ে গেল ছেলেটা। কাঁপা কাঁপা বুক নিয়ে একবার সার্থকে,পাশে দাঁড়ানো তুশি আর তারপর দুজনের হাতের বাঁধনকে দেখল অয়ন।
রোকসানা আর্তনাদ করে উঠলেন,
“ একী! এ কী একী,তোমাদের দুজনের সাজসজ্জা এরকম কেন?”
সার্থ টের পেল ওর হাতের ভেতর থাকা তুশির হাতটা থরথর করে কাঁপছে। ভয় পাচ্ছে মেয়েটা!
সার্থ আরো শক্ত করে ঐ পেলব মুঠো চেপে ধরে সহসা। আশ্বাস দেয় নীরবে। তক্ষুনি ওপাশ থেকে পাগলের মতো ছুটে এসে দাঁড়াল অয়ন। অস্থির হয়ে বলল,
“ তুশি! তুশি,তোমার পরনে বেনারসি কেন? বউ সেজেছ কেন তুমি? এটা, এটা তো আমার কিনে দেয়া বেনারসি নয়। ভাইয়ার হাত ধরেছ কেন তুশি? হাত ছাড়ো ওর,হাত ছাড়ো।”
তুশির হাত টানতে ধড়ফড়িয়ে নিজের হাত বাড়াল অয়ন,সঙ্গে সঙ্গে ওর কব্জিটা চেপে ধরল সার্থ। ছুড়ে মারল।
শান্ত অথচ স্থুল স্বরে বলল,
“ ও আমার স্ত্রী অয়ন।
এভাবে ওকে ছুঁবি না।”
অয়ন শ্বাস নেয়,গলার শিরা ফুলিয়ে বলে,
“ আবার,আবার স্ত্রী স্ত্রী করছো ভাইয়া? কীসের,কীসের স্ত্রী!”
“ কাল আমাদের বিয়ে হয়েছে। কোর্ট,কাবিন দুই ভাবেই আমি তুশিকে বিয়ে করেছি।”
এই একটা কথা,আর একটা মিসাইল… আজ প্রথমবার দুটোর আঘাত একই হলো বোধ হয়। গোটা সৈয়দ বাড়ি থমকে গেল মূহুর্তে। দুহাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল আইরিন। কান্নায় টইটম্বুর হয়ে উঠল চোখ।
অয়নের পায়ের জমিন সরে যায়। টালমাটাল দুনিয়া নিয়ে কিছু পল বাকরুদ্ধের ন্যায় চেয়ে রয় সে। ভীতসন্ত্রস্ত চোখে ঢোক গিলল ইউশা! কী হবে এখন, অয়ন ভাই কী করবে ভাবলেই ওর মাথা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।
জয়নব কপাল কুঁচকে বললেন,
“ বিয়ে করেছ? কেন,কীসের জন্যে? ছোটো ভাইয়ের হবু স্ত্রীকে এভাবে লুকিয়ে নিয়ে বিয়ে করা কি তোমার শোভা পায় দাদুভাই? এ তুমি কোন তুমি?”
সার্থ বুক চিতিয়ে বলল,
“ আমি আমিই দিদুন। আমি সার্থ,সৈয়দ সার্থ আবরার। আর তোমার একটা ছোট্ট ভুল হচ্ছে,
আমি আমার ছোট ভাইয়ের হবু স্ত্রীকে বিয়ে করিনি। বরং অয়ন তার বড়ো ভাইয়ের স্ত্রীকে বিয়ে করতে যাচ্ছিল।”
শওকত খেপে বললেন,
“ ইয়ার্কি হচ্ছে এটা? ফাজলামো হচ্ছে এখন! প্রথম দিকে মানি না মানিনা বলে,সবার কান ঝালাপালা করে,বাড়ির পরিবেশ অতীষ্ঠ করে,এখন স্ত্রী স্ত্রী ফ্যানা তোলা হচ্ছে। অয়নের সাথে তুশির বিয়ে হওয়ার কথা তুমি জানতে না? ঢং করছো? এতই স্ত্রী স্ত্রী করবে তাহলে এই পরিস্থিতি অবধি ব্যাপারটা এনেছ কেন? তোমার জন্যেই তো আজকের এই সিচুয়েশন তৈরি হয়েছে। তুমি শুরু থেকে তুশিকে মেনে নিলে,আজ এরকম কিছু হতো?”
সার্থ শক্ত গলায় বলল,
“ আমি আপনার সাথে কথা বলছি না।”
“ বেয়াদব!”
তুশি ভেতর ভেতর ছটফট করছিল। একবার ইউশাকে দেখছে,পরেরবার অয়নকে দেখছে ও। ওদের বিয়ে কি হয়নি? ইউশার জামাকাপড় তো একইরকম,নতুন বউ তো এসব পরবে না। ও তড়িৎ দাদির দিকে চাইল। দাদির চেহারায় অন্ধকার। চোখাচোখি হতেই তুশি ভ্রু উঁচাল। মুখ কালো করে দুপাশে মাথা নাড়লেন তিনি। বোঝালেন, কাজ হয়নি। তুশির বুক ভেঙে গেল। হতাশার লম্বা ছাপ ভেসে উঠল মুখে। এতকিছু করল যেজন্যে, তাই হলো না? কিন্তু চিঠিটা,অয়ন ভাই চিঠি পেয়েছে কি?
রোকসানা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বললেন,
“ ছি ছি, ভাইজান এই সার্থকে নিয়ে গর্ব করতাম আমরা? আম্মা,এই তোমার নাতি!
ছিহ!”
সার্থ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ আমায় নিয়ে গর্ব করতে আপনাকে কেউ বলেছে? খুব বেশি খারাপ লাগলে চলে যান।”
রোকসানা তাজ্জব হয়ে বললেন,
“ আমি যাব? এই তুমি কে আমাকে যেতে বলার! এটা আমার বাবার বাড়ি।”
“ তাহলে বাবার বাড়িতে বাবাকে নিয়ে কথা বলবেন। আমি আমার ব্যাপারে সবার নাক গলানো পছন্দ করি না।”
“ তুমি সার্থ একটা আস্ত বেয়াদব হচ্ছো দিন দিন।”
“ সার্থ লোক বুঝে আদব হয়। এটুকু বুঝতে আপনার এতদিন লেগে গেল?”
মাঝখানে চ্যাঁচিয়ে উঠল অয়ন,
“ সবাই চুপ করো। চুপ,সবাই একদম চুপ। কেউ কথা বলবে না এখানে। কেউ না!”
পরপর অয়নের কণ্ঠ ভিজে গেল কোনো ব্যথার তোড়ে। মোলায়েম স্বরে বলল,
“ তুশি, আমার দিকে তাকাও তুশি। ভাইয়া তোমাকে উল্টোপাল্টা বুঝিয়েছে তাই না? ম্যানিউপুলেট করেছে তোমায়?
জানতাম আমি। এই ইগোবাজটা সব পারে। তুশি আমার সাথে এসো তো। আমরা আলাদা কথা বলি…”
অয়ন তুশির হাতটা যেই আবার ধরতে গেল,আবার সেই হাত চেপে ধরল সার্থ। শীতল চোখে বলল,
“ আমি কী বলেছি তোর কানে যায়নি?
তুশি এখন পর-স্ত্রী! ও তোর বড়ো ভাবি,এখন থেকে ওকে ছুঁতে হাজারবার ভাববি।”
তার ছুড়ির ফলার মতো কথা সোজাসুজি অয়নের বুকে গিয়ে লাগে। দুই চোখে দপ করে জ্বলে ওঠে আগুন। বিগড়ে গেল মাথাটা। সঙ্গে সঙ্গে দুইহাতে ভাইয়ের বুকে রেখে এক ধাক্কা মারল সে। অপ্রস্তুতিতে সার্থ পিছিয়ে যায়। পিঠ দেওয়ালে গিয়ে লাগে। দুদিন আগে আহত হয়েছিল,ধারালো দায়ের কোপ শুকায়নি,ঠিকঠাক ওষুধ খায়নি,সব মিলিয়ে তাজা ক্ষতয় একেরপর এক আঘাত সীমা ছাড়িয়ে ফেলল এবার। ব্যান্ডেজ সরে যায়, এক ছটা রক্ত নিমিষে ভেসে ওঠে বুকে। শেরওয়ানির পুরু আস্তরণে দেখা না গেলেও,টাল হারিয়ে ফেলল ও। অথচ, অথচ তাও তুশির হাত সার্থ ছাড়ল না। একটা আঙুলও নড়ল না তার মুঠো থেকে। ঠিক ওইভাবেই পোক্ত বেড়ি দিয়ে ধরে রাখল সে। এদিকে বিস্ময়ে যেন মুখ থুবড়ে পড়ল বাকিরা। এমন দৃশ্য আজ প্রথম দেখা তাদের। অয়ন,বড়ো ভাইয়ের গায়ে হাত তুলছে? এই বাড়িতে বড়োদের দিকে যেখানে কেউ মাথা তুলে তাকায় না, সেখানে হাতাহাতি? তনিমা-শওকতের চোখ ঘোলা হয়ে আসে। বাবা-মা তো,নিজের দুই সন্তানের মাঝে এইরকম দ্বন্দ্ব কারো প্রাণে সয়?
তুশি নিজেও আঁতকে উঠল। হাহাকার করে সার্থর গায়ে-বুকে হাত দিয়ে বলল,
“ আপনি, আপনি ঠিক আছেন? আপনি ঠিক আছেন?”
অয়নের মাথা জ্বলে যায় তুশির এত আহ্লাদ দেখে। হিঁসহিঁসিয়ে এসেই ভাইয়ের কলার চেপে ধরে সে। আরেক দফা হকচকায় সকলে। জয়নব চ্যাঁচিয়ে ওঠেন,
“ অয়ন!”
অয়নের কানে দাদুর ডাক যায় না। সে দাঁত-মুখ খিচে বলল,
“ ব্লাডি চিটার! কেন করলে আমার সাথে এরকম? তোমাকে তো আমি ভালোবাসতাম তাই না? কোনোদিন তোমার কোনো ক্ষতি করেছি? তাহলে আমার এত বড়ো ক্ষতিটা করলে কী করে?”
সার্থ চোখ বুজে দম টানল। রক্তলাল কোটর মেলে চাইল ধীরে ধীরে। তুশি কী করবে দিকদিশা পেলো না। ফ্যাসফ্যাসে দম নিতে নিতে অস্থির হয়ে বলল,
“ আপনি ছাড়ুন ওনাকে। দেখতে পাচ্ছেন না উনি অসুস্থ? ছাড়ুন অয়ন ভাই।”
অয়ন কাতর চোখে চাইল ওর দিকে। অনুনয় করল,
“ তুশি, তুমি ওর হয়ে দরদ দেখিও না প্লিজ! প্লিজ তুশি,আমার কষ্ট হয়। ওর হাতটা ছাড়ো।”
অয়ন হাত ছাড়াতে আসে এই নিয়ে তৃতীয় বারের মতো, এবার আর সার্থ শান্ত থাকতে পারল না। প্রকাণ্ড এক থাপ্পড় মারল ভাইয়ের গালে। তার রোদে পোড়া ট্রেইনিং নেয়া পুলিশি শরীরের প্রহার সামলাতে অয়নের একটু বেগ পোহাতে হয়। ঐ এক থাপ্পড়ে কয়েক কদম হড়কে যায় সে। আরেক চোট আকাশ ভেঙে মাটির বুকে লুটিয়ে পড়ে সবাই। এ কী শুরু হয়েছে বাড়িতে? ভাইয়ে ভাইয়ে এমন দাঙ্গা কি স্বপ্নেও আনা যায়?
ইউশা ছুটে ধরতে আসে,
“ অয়ন ভাই!”
পূর্বেই ওকে ঠেলে সামনে থেকে সরিয়ে দিলো প্যন । যেন উচ্ছিষ্ট হটাল রাস্তা দিয়ে। মেয়েটা থুবড়ে পড়ল সোফার ওপর। অয়ন ভাইয়ের দিকে তেড়ে যেতে নিলেই, তনিমা পথরোধ করে দাঁড়ালেন।
ধমকে বললেন,
“ অয়ন থাম,ও তোর বড়ো ভাই। এত অসভ্য তো আমার ছেলেরা নয়।”
জয়নব বললেন,
“ দাদুভাই,বড়ো ভাইয়ের গায়ে হাত তোলে কেউ? পাগল হয়েছ তুমি?”
অয়ন চিড়বিড় করে বলল,
“ বড়ো ভাই,মাই ফুট!
কোন বড়ো ভাই ছোটো ভাইয়ের বিয়ের দিন তার বউ নিয়ে পালিয়ে যায়? নিজে বিয়ে করে এক রাত কাটিয়ে আসে, কোন বড়ো ভাই?”
তুশি চিবুক নুইয়ে বলল,
“ উনি আমাকে নিয়ে যাননি। আমি নিজে গিয়েছিলাম।”
অয়ন চোখ রাঙিয়ে বলল,
“ তুমি চুপ করো। আমি জানি তুমি ওর হয়েই কথা বলবে। ও তোমাকে ব্রেইন ওয়াশ করেছে না? তুমি তো, তুমিতো ছোট্ট একটা পুতুল তুশি, তুমি বুঝবে কীভাবে কে ভালো কে খারাপ! ওকে তুমি এখনো চেনোইনি। ও চায়নি তুমি ভালো থাকো। কারণ ও তোমাকে পায়ের জুতো বানাতে চেয়েছে। সেখানে আমি তোমাকে মাথার তাজ বানাতে চেয়েছি তুশি,ও কি সেটা সহ্য করবে বলো?”
তুশি বিরক্ত মুখে অতীষ্ঠ শ্বাস ফেলল। ঘুরে চাইল সার্থর দিকে। বুকের জায়গাটায় হাত বুলিয়ে বলল,
“ লেগেছে তাই না? কাল থেকে শুধু ব্যথাই পাচ্ছেন। একটু ওষুধ যদি…”
এত ঝড়-ঝঞ্ঝার ভেতরেও স্ত্রীর দুচোখ ছাপানো আকুলতা দেখে সার্থর প্রাণ জুড়িয়ে যায়। ঠোঁটের কোণে এক ফালি তৃপ্তি ভেসে উঠলেও, ফোস করে শ্বাস ফেলল সে। ব্যান্ডেজটা বোধ হয় রক্তে ভিজে উঠছে। শেরওয়ানিটা ভেজা ভেজা তরলে লেগে যাচ্ছে অল্প। কিন্তু সব সার্থ মাথা থেকে ঝেরে ফেলল। তাকাল ভাইয়ের দিকে। কোমল গলায় বলল,
“ অয়ন, পাগলামো না করে কথা শোন। তুই আমার ছোটো ভাই, আমার আদরের। সায়ন চলে যাওয়ার পর আমি আমার সবটুকু দিয়ে তোকেই যত্ন করেছি। আমি চাইনি এভাবে কিছু করতে। আমি তোকে বারবার বুঝিয়েছিলাম, মানা করেছিলাম,তুই শুনিসনি। আর সেজন্যেই…”
অয়ন বিদ্রুপ করে হাসল,কথা কেড়ে নিয়ে বলল,
“ এটা তোমার যত্ন, এটা তোমার আদর ভাইয়া? ছোটো ভাইয়ের হবু বউকে নিজের বউ বানানো তোমার আদর? আর তোমার মনে তুশিকে নিয়ে যদি এতই প্রেম ছিল, তাহলে সেদিন তুমি আমাকে কেন বলেছিলে যে ওর প্রতি তোমার কিছু নেই? কেন বলেছিলে ওকে তুমি ডিভোর্স দেবে? তুমি ওসব না বললে আমি তো এগোতাম না। তারপর মামুনি যখন তোমাকে আমার ঘরে বসে,তোমাদের দ্বিতীয় বার বিয়ে দেয়ার কথা বলছিলেন, তখন মানা করেছিলে কেন? চ্যাঁচিয়ে চ্যাঁচিয়ে কেন বলেছিলে,তুশিকে আমি চাই না। কী,নাকি এখন সেটাও অস্বীকার করবে? অস্বীকার করবে,তুমি আমাকে বলোনি ওসব?”
সার্থ কাঠখোট্টা জবাব দিলো,
“ বলেছিলাম,
কিন্তু তোকে ওর প্রেমে পড়তে বলিনি। বলিনি,আমি ওকে চাই না মানেই, তুই ওর প্রেমে অন্ধ হয়ে যা।”
“ তোর নিজের সেন্স নেই? যার সাথে তোর বড়ো ভাইয়ের বিয়ে হয়েছিল,তাকে তুই অন্য চোখে কীভাবে দেখিস?
তুই একবারও জিজ্ঞেস করেছিলি তুশি আদৌ তোকে ভালোবাসে কিনা? তুই একবারও শুনতে চেয়েছিলি তুশি কী চায়? এত তুশি তুশি করছিস অথচ জানিসই না ও কাকে ভালোবাসে? বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল বলেই ও তোকে ভালোবাসে ব্যাপারটা কিন্তু এমন ছিল না।”
“ ছিল,আলবাত ছিল। তুশি আমাকেই ভালোবাসে।”
অয়ন ছুটন্ত ঘোড়ার বেগে ফের তুশির সামনে এসে দাঁড়াল। ঠিক তুশির মুখোমুখি!
আকুল হয়ে বলল,
“ তুশি, তুমি বলো ভাইয়া তোমাকে বিয়েতে জোর করেছে? করেছে না? বলো তুশি,সবাইকে বলে দাও।”
তুশির চোখ নিচে। অয়ন অধৈর্য হলো আরো,
“ বলো না তুশি! একবার বলো। ও জোর করলে আজ আমি সব ভুলে যাব। ভুলে যাব ও আমার ভাই। তুমি শুধ…”
“ না!”
অয়ন থমকায় মাঝপথে ভেসে আসা উত্তরে।
“ কীহ?”
তুশি মিহি গলায় বলল,
“ উনি আমাকে জোর করেননি।”
হেসে ফেলল ও,
“ এটাও ভাইয়া শিখিয়ে দিয়েছে তাই তো? শেখানো বুলি আওড়াচ্ছ মেয়ে!
দেখেছ তোমরা? তুশির কথাবার্তায় বুঝতে পারছো? ভাইয়া শিখিয়ে দিয়েছে, সব শিখিয়ে দিয়েছে।
তুশির কণ্ঠ আরো নমনীয় হলো।
বলল,
“ উনি আমাকে কিছু শিখিয়ে দেননি অয়ন ভাই। আমি ওনাকে বিয়ে করতাম কিনা জানি না,তবে আপনাকে আমি কখনো বিয়ে করতে চাইনি। আপনাকে আমি ঐ চোখে দেখিনি কোনোদিন। সত্যি এটাই, এই বিয়েতে মন থেকে আমি রাজি ছিলাম না। যদি ওনার সাথে আমার বিয়ে নাও হতো,আমি পালিয়ে যেতাম।”
অয়ন স্তম্ভিত হয়ে বলল,
“ তুশি! তুমি পালিয়ে যেতে চাইছিলে?”
মাথা নাড়ল মেয়েটা,
“হু!”
“ তাহলে,তাহলে বিয়েতে হ্যাঁ বলেছিলে কেন?”
তুশি চোখের কোণ তুলে ফের ইউশাকে দেখল। এইটুকু অন্তত নিশ্চিত হয়েছে, অয়ন চিঠি পায়নি এখনো।
জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“ কারণ ছিল।”
তুরন্ত ওর কাঁধ টেনে নিজের দিকে ফেরালেন রেহণূমা। মেয়েটা তাকানোর সাথে সাথে,একটা ঠাস করে চড় মারলেন গালে। অপ্রস্তুতিতে তুশি ছিটকে গিয়ে সার্থর বুকের ওপর পড়ল। তনিমা আর্তনাদ করে বললেন,
“ আহ ছোটো,কী করলি!”
রেহণূমা গজগজিয়ে বললেন,
“ অসভ্য মেয়ে! ওকে বিয়ে করতে চাসনি, তাহলে এত নাটক করেছিলি কেন? এত আয়োজন, এত অতিথি এলো বাড়িতে। কী বাজে ভাবে সম্মান নষ্ট হলো আমাদের। বিয়েতে মত নেই,তাহলে এত রং-তামাশা কীসের তোর? তোর জন্যে ওদের দুই ভাইয়ের মধ্যে ঝামেলা লেগেছে। একটা না একটা অশান্তি লেগেই থাকে এই মেয়ের জন্যে। শান্তি নেই আমার। এক ফোঁটা শান্তি নেই।”
ইউশা বলল,
“ মা ওকে বকছো কেন? ওর কী দোষ? ও কি বলেছে ভাইয়াদের মারামারি করতে?”
“ তুই থাম। পেটে ধরেছি না, সব দ্বায় তো আমারই হবে। আস্তে আস্তে সংসারটাও শেষ করে দিচ্ছিস তুশি। যে অয়ন কোনোদিন বড়ো ভাইয়ের মুখের ওপর একটা শব্দ করেনি,সে আজ ভাইয়ের গায়ে হাত দিচ্ছে! এসব কার জন্যে? সব ঝামেলার মূল ও। প্রথম থেকে ছেলেটাকে আশা দিয়ে দিয়ে,ও নাকি পালিয়ে যাচ্ছিল। নাটুকে মেয়ে একটা! ইচ্ছে করছে মেরে চাপার দাঁত ফেলে দিই।”
তুশি সার্থর বুকের সাথে মিশে রয়। মুখ গুজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। রেহনূমা আরো কিছু বলতেই যাচ্ছিলেন, সার্থ তপ্ত চোখে চিবুক কঠিন করে বলল,
“ উহু, আমার স্ত্রীকে কিছু বলা যাবে না,ছোটো মা। যা বলার আমাকে বলো,শুনছি। কিন্তু ওকে কিছু বলা যাবে না মানে, যাবে না।
তাহলে আমি কিন্তু এই পুরো সৈয়দ বাড়িই জ্বালিয়ে দেবো আজ।”
শওকত বললেন,
“ হ্যাঁ তাইত,এটাই তো পারো তুমি। বেয়াদবের বেয়াদব। বাড়িময় ঝামেলা বাড়িয়ে মানইজ্জত খুইয়ে এখন স্ত্রী স্ত্রী করে রঙ্গ করছে।”
সার্থ মুখের ওপর বলল,
“ সে যাই করি, নিজের বউ নিয়েই করছি। অন্তত আপনার মতো ঘরে একজনকে রেখে, বাইরে আরেকজনের কাছে যাইনি।”
শওকত থমকে গেলেন, চ্যাঁচিয়ে উঠলেন
আক্রোশে,
“ সার্থ!”
সার্থ দাঁত কপাটি খিচে বলল,
“ আমার মুখ খোলাবেন না।”
তনিমা অতীষ্ঠ হয়ে বললেন,
“ চুপ কর। সবার সামনে এসব কী? এভাবে কেউ বাবার সাথে কথা বলে?”
“ উনি আমার বাবা নন।
উনি আমার ভাইয়ের খুনী…
আমার মায়ের দূর্ভোগের কারণ,
আমার তুশি….”
বাকিটুকু বলার আগেই শেরওয়ানি খামচে ধরে বাধ সাধল তুশি। সার্থ বলল না। ঢোক গেলার সাথে আজকেও গিলে ফেলল সব। শওকত এরপর আর দাঁড়ালেন না এখানে। অপমানে চুর হওয়া মন নিয়ে হনহনে পায়ে ঘরের পথ ধরলেন। তারপরপরই কান্নায় মুখে চেপে ছুটল আইরিন। রোকসানা দিশাহারা হয়ে মেয়ের পিছু নিলেন। ডাকলেন বারেবার,
“ কিউটি শোনো, দাঁড়াও।”
জয়নব বসে পড়লেন সোফায়। ক্লান্ত গলায় বললেন,
“ আর নিতে পারছি না এসব। এইবার অন্তত অশান্তির শেষ হোক। তোমরা দুজন বিয়ে করেছ? সম্মতি আছে না দুজনের? যখন সব সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিয়েছ,আমাদের আর কী? আচ্ছা বেশ, মেনে নিলাম। এবার শেষ করো৷ শেষ করো এগুলো।”
অয়ন গর্জে বলল,
“ না, মেনে নিলাম মানে? কীসের মেনে নিলাম? আমি এই বিয়ে মানি না, মানি না, মানি না। তুশি আমার আমার আমার।”
বলতে বলতে টেবিলের কোণে লাথি মারল সে। ওপরের সব কাচের জিনিসপত্র মূহুর্তে ছিটকে নিচে পড়ে গেল।
সাইফুল বললেন,
“ শান্ত হ অয়ন,কী করছিস? মাথা ঠান্ডা কর। এখানে বড়ো রা আছে তো।”
অয়ন নিষেধ শোনে না। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় বলে,
“ তুশি, তুমি ভাইয়াকে আবার ডিভোর্স দিয়ে দাও। ও একটা মাথা খারাপ ছেলে। দেখোনি ওর ইগো? ওর বদমেজাজি স্বভাব দেখেছ? বাবাকেও আজেবাজে কথা বলে। তোমাকেও বলবে। ও তোমাকে ভালোবাসে না তুশি। ও তোমাকে একটুও ভালো রাখবে না। আমি,আমি ( বুক থাবড়ে) আমি তোমাকে ভালো রাখব আমি। তুমি যা বলবে যেভাবে বলবে আমি সেভাবে চলব।”
তুশির সারা শরীর অস্বস্তিতে ছিন্নভিন্ন হয়। এত এত গুরুজনের সামনে এসব কথাবার্তায় বিব্রত লাগে। সব থেকে বেশি বিব্রত লাগছে ইউশার জন্যে। ও অদূরের ইউশার দিকে তাকাল ফের। একটা পাথরের তৈরি মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে সে। চোখে জল নেই, তবে মুখখানায় রক্তের অভাব। শ্রান্ত নয়ন নিষ্প্রাণ খুব! সইতে সইতে আর বোধ হয় কান্না-টান্না পায় না। সার্থর মায়া হয় ভাইয়ের পাগলামি দেখে।
এক কাঁধে হাত রেখে বলে,
“ অয়ন,শোন আমা..…”
তুরন্ত হাতটা ছিটকে সরিয়ে দিলো অয়ন। কথায় যেন বিস্ফোরণ ছুটে বেড়াল,
“ তুই আমার সাথে কথা বলবি না। তুই আমার কেউ না। তুই একটা সার্থপর। ইউ আর আ সেলফিশ!”
সার্থ বিহ্বল হয়ে বলল,
“ তুই আমাকে তুই তোকারি করছিস?”
“ হ্যাঁ করছি। কী করবি? তুই নিজে নিজের সম্মান হারিয়েছিস আজকে। আর কোনোদিন আমি তোকে বড়ো ভাইয়ের চোখে দেখব না। কোনোদিন না।”
সার্থ নিস্তব্ধ বনে চেয়ে রয়। তারপর হেসে ফেলে হঠাৎ। বলে,
“ আচ্ছা,দেখতে হবে না। তুশিকে ভাবির চোখে দেখিস তাহলেই হবে।”
অয়ন কটমটিয়ে ওঠে। কিছু বলতে গেলে কথা কেড়ে নিলো ও।
হুঙ্কার ছুড়ল সিংহের ন্যায়।
আঙুল তুলে বলল,
“ ব্যস! আর একটাও কথা না। অনেকক্ষণ ধরে তোর অসভ্যতা দেখছি আমি। আমি এখানে তোকে মানাতে আসিনি। ইনফ্যাক্ট তোকে কেন,কাউকেই মানাতে আসিনি। যার মানার হয় মানুক,না মানার না মানুক। আমার কিচ্ছু এসে যায় না। তুশি আমার স্ত্রী! আমার…আমার,সার্থ আবরারের। আবার বলছি,তুশি আমাআয়ায়ার স্ত্রী। কথাটা যত তাড়াতাড়ি তোর মাথায় ঢুকবে তত ভালো,অয়ন। আজ বড়ো ভাই হয়ে বোঝালাম,পরেরবার এ এসপি সার্থ আবরার হয়ে বোঝাব। হজম করতে পারবি না।”
অয়ন উগ্র ষাড়ের ন্যায় তেড়ে উঠতে যায়, সাইফুল বাধ সাধলেন মাঝে। দুহাতে ওকে আগলে ধরে বললেন,
“ অয়ন, ঘরে চল।”
“ চাচ্চু আমি,আমি এই বিয়ে….”
“ তুই চল এখান থেকে।”
ও চিৎকার করে বলল,
“ আমি যাব না। বিয়ে মানি না আমি। চাচ্চু… আমার তুশিকে লাগবে।”
তুশির চোখ মেঝেতে। টলমল করছে জল। অবসন্ন গলায় বলল,
“ কিন্তু আমি তো আপনাকে চাই না, অয়ন ভাই।”
অয়নের ছটফটানি থামল। নিষ্প্রভ চোখে চাইল সে। আর্দ্র স্বরে বলল,
“ কেন তুশি? আমি দেখতে খারাপ?আমার ইনকাম ভালো না? নাকি আমার যোগ্যতা নেই? ভাইয়ার থেকে আমার কম কী আছে তুশি?”
তুশি অসহায় মুখে বলল,
“ আপনার সব আছে। সব থেকে বড়ো কথা, আপনি খুব ভালো ছেলে অয়ন ভাই। কিন্তু, কিন্তু আমি তো আপনাকে ভালোবাসি না। ভালোবাসা ছাড়া সংসার হয়?”
অয়ন নিস্তেজ গলায় বলল,
“ তাহলে কি ভাইয়াকে ভালোবাসো তুমি?”
তুশি মাথা নুইয়ে রইল।
একটু সময় নিয়ে বলল,
“ আপনাকে ভালোবাসি না আমি এটাই মূল কথা। আপনি আমার চোখে বড়ো ভাইয়ের মতো। এর বেশি আমাদের মাঝে কোনোদিন কিচ্ছু হওয়ার কথা আমি ভাবিনি। এখন আপনি যত বাড়াবাড়ি করবেন,আমার চোখে আপনি তত নেমে যাবেন অয়ন ভাই। হাত জোড় করছি,সব ভুলে যান। আমি আপনার ছিলাম না,হবোও না।”
অয়নের বুকের পাঁজর ছিঁড়ে গেল। আহত নয়ন মেলে চেয়ে রইল দু পল। ফাঁকা কার্নিশে আস্তেধীরে জল ভেসে উঠল। কী যেন হলো হঠাৎ করে! এক পা,এক পা করে পিছিয়ে যায় সে। শরীরটা দূর্বলের ন্যায় টেবিলের সাথে লাগে। পড়ে যেতে নেয়,ইউশা ধরল ফের। অয়ন সোজা হয়ে হাত তুলে বোঝাল,ঠিক আছে ও। তারপর চট করে কনুই ভাঁজ করে চোখটা মুছে,হাঁটা ধরল ওপরে।
সাইফুল নিরাশ গলায় বললেন,
“তোর থেকে আমি এটা আশা করিনি,তুশি। বড্ড আঘাত দিয়ে ফেললি ছেলেটাকে।”
তুশি মাথা নিচু করে রাখল। চোখের জল টুপ করে পড়ল পায়ের কাছে। নীরব কান্নায় ভেঙে এলো ঠোঁট। ইউশা চেয়ে রইল অয়নের যাওয়ার পথে। স্রোতে ভাসা নয়ন জোড়া সমেত, এলোমেলো পায়ে ছুটল পরপর।
মিন্তু, হাসনা,জয়নব সবাই নিশ্চুপ হয়ে রইলেন। তবে স্বস্তির শ্বাস টানলেন হাসনা। তুশির বিয়ে সার্থর সাথে হওয়ায় মনে মনে খুশি হয়েছেন তিনি।
রেহণুমা-সাইফুলের যেন লজ্জায় মাথা কাটা যায়। তাদের মেয়ের জন্যেই এত কিছু, ভাইজান-ভাবিকে আর মুখ দেখাতে পারবেন এখন? এমন বিস্তীর্ণ নীরবতা ভেঙে
সার্থ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তুশির হাত টেনে বলল,
“ চলো।”
তুশি নড়ল না। চিবুক কঠিন করে পাথর হয়ে রইল সে।
সার্থ মোলায়েম কণ্ঠে বলল,
“ বেশি লেগেছে?”
বলতে বলতে ওর গাল ছুঁতে যায়,তুশি তেজ নিয়ে ঠেলে দেয় হাতটা। পরপর ঝাড়া মেরে ছাড়ায় নিজেকে। কিছু বোঝার আগেই, এক ছুটে স্টোর রুমে গিয়ে দোর আটকে দিলো তুশি। সার্থকে দেখে মনে হলো,মহামূল্যবাণ জিনিস ওর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল কেউ। ত্রস্ত এগোতে নিলেই বাধা দিলেন হাসনা।
“ এহন যাইও না দাদা। ওরে একটু একলা থাকতে দেও।”
সার্থর ব্যাকুল চোখ দরজায় লেগে।
অধৈর্য হয়ে বলল,
“ পরে আসবে?”
“ হ, আইব। আমি বুঝাইয়া পাডামুনে। মাইর খাইল তো। সবসময় মানু্ষরে মারছে, সেইখানে অহন নিজে মাইর খাইতাছে। একটু হজম হইতে দাও।”
সার্থকে দেখে মনে হলো না, ও মেনে নিতে পারছে। তুশি আলাদা ঘরে ঢুকল,রাতে আবার ওখানেই না ঘুমায়! তাও শব্দ না করে নিজের ঘরে চলল সে। বুকের ব্যান্ডেজটা বোধ হয় নড়েচড়ে গেছে। কতটা রক্ত বের হয়েছে কে জানে! একেরপর এক ব্যথায় বিবশ সারা শরীর। এবার ক্ষততেই না পচন ধরে যায়!
সার্থ রুমে এলো ফ্রেশ হতে।
তনিমাও ছেলের পেছনে এসেছিলেন। হনহনে পায়ে ঘরে ঢুকে বললেন,
“ তুই কাজটা একদম ঠিক করলি না।”
সার্থ ফিরে চাইল পেছনে।
অবিলম্বে বলল,
“ সবাই যদি ঠিক কাজ করে,ভুল কে করবে? ওর প্রতি তো অন্যায় হচ্ছিল।”
তনিমা তব্দা খেয়ে বললেন,
“ তোর ফাজলামো লাগছে, সার্থ? অয়নের অবস্থা দেখেছিস?”
“ দেখেছি। ওকে ডাক্তার দেখানো দরকার৷ হু নোস ও আমার বউয়ের মধ্যে কী পেয়েছে? গিয়ে বলো, আমি ওকে একটা সুন্দর মেয়ে খুঁজে দেব। যার চেহারার সাথে তুশির কোনো মিল থাকবে না। আর তাতেও সন্তুষ্ট নাহলে, ওদের বস্তিতে গিয়ে বসে থাকতে বলো। যদি কোনো মেয়ে পকেটমার পায় বিয়ে করে আনুক।”
তনিমা হাঁ করে চেয়ে রইলেন। সার্থ মজা নিচ্ছে? তাও এমন সিরিয়াস একটা ইস্যু নিয়ে? যে ছেলে তার সাথে হ্যাঁ-না, আচ্ছা,ঠিক আছের, বাইরে কথা বলে না তার হঠাৎ ফাজলামোতে তনিমার সব আউলে গেল। বড়ো আশ্চর্য চোখে বললেন,
“ তুই কি আমার সেই সার্থ, আমি তো তোকে চিনতেই পারছি না।”
সার্থ বলল,
“ আমিও না। আমার কী যেন হয়েছে! মাথার মধ্যে শুধু তুশি ঘুরে বেড়াচ্ছে, মা। তুমি গিয়ে ওকে স্টোর রুম থেকে নিয়ে এসো। স্বামী-স্ত্রী এভাবে আলাদা ঘরে থাকবে,ব্যাপারটা দৃষ্টি কটু না?”
তনিমা আর শুনতে পারলেন না। দুকান চেপে, মাথা নেড়ে হাহুতাশ করতে করতে বেরিয়ে গেলেন দ্রুত।
চলবে…
Share On:
TAGS: কাছে আসার মৌসুম, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৯
-
হেই সুইটহার্ট গল্পের লিংক
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬০
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৫(প্রথমাংশ + শেষাংশ)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৪ খ
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৮