Golpo romantic golpo কাছে আসার মৌসুম

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬৫


কাছেআসারমৌসুম__(৬৫)

নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি

দুটো ফর্সা,মসৃণ পা টকটক করছে আলতার রঙে। হয়ত খুব নিঁখুত ভাবে পরানো হয়নি,একটু এব্রোথেব্রো লাইনগুলো, কিন্তু সৌন্দর্য বা যত্ন যে কম নেই এখানে!
আজ সার্থকে দেখে মনে হচ্ছে স্কুলের ফার্স্ট বেঞ্চে বসা সেই মনোযোগী ছাত্র। যার মন-চোখ, যোগ ব্লাকবোর্ডের লেখা থেকে এক চুল এধার ওধার হয় না। আলতার রং ক ফোঁটা ওর শেরওয়ানিতে লেগেছে। লেগেছে হাতের তালুতেও। তাও কোলের ওপর রাখা স্ত্রীর পেলব পায়ে সবটুকু নিবেশন তার। কপালে দুটো ভাঁজ, দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণতা, নিচের ঠোঁটটা গিয়ে বসেছে ওপরের ঠোঁটের তলায়। সামনে বসা তুশির দুচোখ ছাপানো অবিশ্বাসও দিব্যি এসব তল মাড়িয়ে নিলো। সেই কখন থেকে বিস্ময়াভিভূত চোখে চেয়ে আছে তুশি। বুঝতেই পারছে না এগুলো সত্যি, বা স্বপ্ন কিনা!
ও কি ঘুমোচ্ছে? এমন আশ্চর্য সুন্দর কিছু মূহুর্ত কি আদৌ জেগে দেখা সম্ভব? ঘটা সম্ভব বাস্তবে? চোখ মেলে চাইতেই এই সুন্দর ঘুমটাও ভেঙে যাবে নিশ্চিত!
নাহলে এসব কী করে সত্যি হয়? তুশি দোটানায় ভুগলেও, হৃদয়ের চারপাশ ওসব মানল না। কেমন যন্ত্রণার কবলে মুচড়ে উঠল সব। না চাইতেও পেয়ে যাওয়া এই অপ্রত্যাশিত সুখের তোড়ে চোখদুটো প্রচণ্ড জলে ভরে গেল। ঠোঁট ভেঙে ফুঁপিয়ে উঠল সে। সেই
শব্দ শুনে চকিতে পাশ ফিরল সার্থ। তুশি মাথা নুইয়ে দৃষ্টি লুকাতে চায়। লুকোতে চায় তার নীরব কান্নাদের। সার্থর চিবুক শিথিল হলো অমনি। খুব নিবিড় গলায় বলল,
“ আমি ছুঁলে কি খুব বেশি খারাপ লাগছে,তুশি?”
টলমলে চোখে চাইল মেয়েটা।
“ কখন বললাম?”
“ তাহলে কাঁদছো কেন?”
তুশি কব্জি দিয়ে চোখ ডলে মুছল। নাক টেনে বলল,
“ মন চাইছে তাই কাঁদছি। আপনার মন যা চাইবে সব সময় কি শুধু তাই হবে? আমার মন নেই? এই যে এখন,এসব হাবিজাবি পাগলামো করছেন কেন? এই আলতা,শাড়ি-চুড়ি এসব পরে কোথায় যাব আমি!”
উত্তরের পিঠে নিঃশব্দে হাসল সার্থ। অমন নিচু স্বরেই বলল,
“ আমার পাগলামির তুমি এখনো কিছুই দেখোনি। কিচ্ছু না,
এক ফোঁটাও না। একটা ছেলে বউয়ের জন্যে কী মাত্রাতিরিক্ত পাগল হতে পারে,সেটা আমি এবার সবাইকে দেখাব।”
তুশি হতবাক হয়ে বলল,
“ মানে!”
“ কীসের মানে?”
“ আপনি, আপনি আমার জন্যে পাগল কেন হবেন? আমার প্রতি না আপনার অনুভূতি নেই?”
সার্থ কাঁধ উঁচিয়ে বলল,
“ এখন আর কী করার! বিয়ে যখন হয়েইছে,মেনে নিতে হবে না?”
তুশির মেজাজ চটে যায়। এক টানে পা নিয়ে আসে নিজের। ফোলা গাল দুটো দেখে সার্থ দুষ্টু হাসল। বলল,
“ রাগ হচ্ছে?”
“ আপনি আমার সাথে কথা বলবেন না তো! আপনাকে আমার সহ্যই হচ্ছে না।”
“ ওহ!”
“ কী ওহ? ওহ মানে কী?”
“ ওহ মানে অয়ন….”
তুশি বিস্ফোরিত চোখে বলল
“ কীইইইইই? আবার!
আপনি বারবার অয়ন অয়ন করেন কেন? আমি কি একবারও আইরিনের নাম বলেছি?”
“ বলবে কেন? আমিত আর আইরিনকে বিয়ে করার জন্যে লাফাইনি।”
“ বিয়ের জন্যে লাফাবেন কীভাবে,যা লাফানোর তাতো পার্টিতেই লাফিয়েছিলেন।”
সার্থ বিড়বিড় করে বলল,
“ পার্টিতে শুধু লাফাই-ইনি,ঠেলে পানিতে ফেলেও দিয়েছিলাম।”
তুশি সতর্ক চোখে চাইল অমনি। এই ঘটনা ও জানে, ইউশার মুখে শুনেছে। কিন্তু আজ সার্থর থেকে শোনার লোভ সামলাতে পারল না। জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“ কেন ফেলেছিলেন? আপনার তো হবু বউ। তার সাথে কেউ এমন করে?”
সার্থ বাঁকা হেসে ভ্রু উঁচাল,
“ কী শুনতে চাইছ? তোমাকে ফেলেছিল বলে,আমিও ওকে ফেলেছি?”
মেয়েটা থতমত খেয়ে বলল,
“ তা কখন বললাম!”
সার্থ আর কথা এগোলো না। উঠে বিছানার জিনিসপত্র ফের ভরে রাখল ব্যাগে। গোটা রুমেই এক চক্কর দেখল ওদের কী কী পড়ে আছে! সব গুছিয়ে, চেইন টেনে লাগেজ দাঁড় করিয়ে দম ফেলল আস্তে। পরপর ঘাড় ভেঙে
ফিরে চাইল পেছনে। তুশি তখন একটা জড়বস্তুর মতো চুপ করে বসে আছে। দু হাঁটু বুকে চেপে জড়োসড়ো হয়ে বসা এক পুতুল যেন। একটা লাল টুকটুকে শাড়ির সাথে চিকণ নেকলেস গলায়,মাথায় ঘোমটা,হাতে চুড়ি,কপালে টিপ,চোখের কোণে কাজল,ঠোঁটে অল্প লিপস্টিকের এই সুরূপা কি সার্থর বুকের বা পাশটায় জং ধরিয়ে দিতে যথেষ্ট না?
হঠাৎ শান্ত পায়ে এগিয়ে এলো সে। তুশির নিচু থুতনিটা এক আঙুলে উঁচু করে তুলল। চোখে-চোখ পড়তেই,ভেতর ভেতর মিইয়ে গেল তুশি। কিছু বলার আগেই,হুট করে তার চোখের কোণ থেকে একটু কাজল নিয়ে সার্থ কানের পেছনে ছুঁয়ে দেয়। তুশি হতভম্ব হয় কিছুটা। প্রশ্ন নিয়ে চাইতেই সার্থ নিঃসংকোচে বলল,
“ সুন্দর লাগছে, নজর না লাগুক!”
তুশি বিদ্রুপ করে হাসল।
জিজ্ঞেস করল,
“ আমার আবার কার নজর লাগবে?”
“ আমার!”
বিমুঢ় নয়ন মেলে চাইল মেয়েটা। বুক কাঁপল ধক করে। এক চোট লজ্জায় লাল হলো মুখ । মেদুর গাল জোড়ার ফেঁপে ওঠা,কুণ্ঠার বেড়িতে ছেঁয়ে থাকা চেহারা,আর অচপল চোখগুলো দেখে সার্থর কী যেন হলো! কিছুক্ষণ এক ধ্যানে চেয়ে রইল সে। আস্তে ধীরে বদলাল সেই তাকানোর ধরণ। এক বার জোরে শ্বাস ফেলে ঝট করে সামনে এসে বসল সার্থ। তুশি কিছু চমকাল তাতে। নরম গদি নড়ে ওঠায় বড়ো বড়ো চোখে মুখ তুলে চাইল। সার্থর হাতটা চট করে ওর ঘাড়ের ভাঁজে ঢুকল। টেনে আনল মাথাটা। তারপর কথা নেই বার্তা নেই, তুরন্ত গতিতে একটা চুমু খেয়ে ফেলল ঠোঁটে। চোখটা তুশির আরো প্রকট হয়। শ্বাস আটকে যায় গলার কাছে। ছটফট করবে ভাবল,পূর্বেই ছেড়ে দিলো সার্থ। তুশি হকচকিয়ে চেয়ে রইলেও,নির্লজ্জের মতো ঠোঁট কামড়ে হাসল ছেলেটা। যেন এই ছোঁয়া তার অধিকার,তার একান্ত দাবি।

ডোরবেল বাজল তখনই। সার্থ ব্যস্ত ভাবে উঠে গেল খুলতে। যেন কে না কে এসেছে!
তুশি কিছু বলতেই পারল না। বোকার মতো চোখের পাতা ঝাপটে ঝাপটে চেয়ে রইল চওড়া পিঠের ঐ মানুষটার দিকে।

শোবার ঘরের দরজা খোলা থাকলে সোজা সদরও দেখতে পাওয়া যায়। খাটে বসে একটু মাথা ঝুঁকিয়েই তুশি দেখল সার্থ ছিটকিনি নামিয়েছে। লক ঘোরাতেই ওইপাশে চেনা একটা মুখ দেখা গেল। দুহাত ভরতি প্যাকেট স্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জামিল। অমন বাহু বাড়িয়ে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরল সে। টেনে টেনে বলল,
“ হ্যাপিইইই হানিমুন মাই পা..
না না,ভালো হয়ে গেছিস ওসব ডাকা যাবে না।”
সার্থ বন্ধুকে এক হাতে ধরল জড়িয়ে,তবে ওর নজর পড়ল পেছনে থাকা আরো একটি মানুষে। পিঠে কালো বড়ো ব্যাগ,হাতে ক্যামেরা। চোখে চোখ পড়তেই ছেলেটা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল – “ হ্যালো স্যার,আমি শান্ত।”
“ আসুন।”
জামিল বলল,
“ আমার কাজিনের বিয়ে হলো না কদিন আগে? সব ছবি ও তুলেছিল। নিঁখুত হাত! তুই ফটোগ্রাফারের কথা বলতেই ওকে ডিরেক্ট ওর বাসা থেকে তুলে এনেছি।”
সার্থ বলল,
“ বসুন।”
বসল শান্ত। এদিক ওদিক তাকাল একবার।
জামিল প্যাকেটগুলো বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ সকাল থেকে তো খাসনি। কত কী আনিয়ে রাখলাম এখানে,কিছুই তোদের কাজে লাগল না। যাক গে,তোকে শেরওয়ানিতে কী লাগছে ভাই, অস্থির! উম,
তুশি কোথায়?”
“ রুমে।”
“ নরমাল?”
“ আমার বউ কি এ্যাবনরমাল?”
জামিল হোহো করে হেসে উঠল। বন্ধুর কাঁধ চাপড়ে বলল,
“ দুদিনে ভালোই প্রেমে মজেছিস দেখি।
ভালো,ভালো! কিন্তু ও বাড়ির অবস্থা… “
সার্থ কণ্ঠ চেপে বলল – শশশ… এসব পরে শুনব।”
জামিলও ফিসফিস করে বলল,
“ ওকে ওকে। তা আগে খাবি, না ছবি তুলবি?”
“ বোস, আসছি।”
দুটো প্যাকেট হাতে নিয়ে রুমে ঢুকল সে। দোর চাপাল আলগা করে,যাতে শোবার ঘর ওখান থেকে দেখা না যায়। তুশি তুরন্ত উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ উনি কে?”
“ জামিল।”
“ উনি না,সাথের লোকটা।”
“ ফটোগ্রাফার।”
“ কী করবেন?”
সার্থ ক্লান্ত গলায় বলল,
“ ছবি তুলবে।”
তুশির কণ্ঠ শৃঙ্গে,
“ আমাদের?”
“ যাক, একটা ব্যাপার অন্তত নিজে নিজে বুঝলে!”

তুশি যেন হিসেব মিলিয়ে ফেলল,এতক্ষণ সার্থ ওকে সাজিয়েছে কেন! কেনই বা নিজে এমন বর বর রূপ ধরেছে। কী ভীষণ তেজে তেতে উঠল অমনি।
চড়া কণ্ঠে বলল,
“ আপনার সাথে আমি কোনো ছবি তুলব না।”
সার্থ খাবারের প্যাকেট খুলছিল। দুটো অন টাইম প্লেটে ঢেলেছেও সেসব। চিকেন স্যান্ডউইচ, সেদ্ধ ডিম এগুলোই। পানিও ছিল সাথে। ফিরে চাইল এবার,
জিজ্ঞেস করল,
“ কী?”
“ আপনার সাথে ছবি তুলব না।”
“ আগে খাবে,না ছবি তুলবে?”
তুশি খিটখিটে গলায় বলল,
“ আমি বললাম আমি ছবি তুলব না।”
মাথা নাড়ল ও।
“ আচ্ছা,
জামিল!”
উচ্চশব্দের ডাকে তুশি ভড়কে যায়,সেই সাথে বাইরে থেকে ছুটে আসে জামিল। দরজা সরিয়ে বলে,
“ হ্যাঁ বল, কী? আরে হ্যালো তুশি। কী সুন্দর লাগছে তোমাদের পাশাপাশি। মেইড ফর ইচ আদার!”
তুশি নাক ফুলিয়ে মেঝেতে চেয়ে রইল। জামিল বুঝল মেয়ে চটে আছে। ভ্রু উঁচিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করল সার্থকে – ব্যাপার কী?
সে বলল,
“ শান্তকে ক্যামেরা সেট করতে বল। আমরা এখনই ছবি তুলব।”
তুশি হতবিহ্বল! মুখখানা ফের হাঁ হয়ে গেল৷
জামিল ‘ওখেই’ বলে বেরিয়ে যায়,তুরন্ত ঝড়ের মতো এগিয়ে এলো মেয়েটা। সার্থর মুখের সামনে এক আঙুল তুলে বলল,
“ আমি না বললাম আমি ছবি….”
সঙ্গে সঙ্গে আঙুলটা খপ করে চেপে ধরে তুশির পুরো শরীরটা ঘুরিয়ে ফেলল সার্থ। মেয়েটার পিঠ এসে দুম করে লাগল তার বুকের ওপর। ঘাড়ের খাঁজে সার্থর ঠান্ডা থুত্নি পড়তেই, বরফের মতো জমে গেল তুশি। হকচকানো মাথায় যেন তীক্ষ্ণ বাঁজ পড়ল। ততক্ষণে
বলিষ্ঠ দুই হাতের মধ্যে আষ্ঠেপৃষ্ঠে প্যাঁচিয়ে ধরেছে সার্থ। সামনে থেকে খোলা চুলের গোছা কানের পিঠে সরাতে সরাতে বলল,
“ তোমার বয়স কত, মাত্র বিশ পাড় করেছ। আমার বয়স জানো? তোমার থেকে গুণে গুণে ১২ বছরের বড়ো আমি। সেখানে আমার সামনে আঙুল দেখাচ্ছ? একে তো স্বামী হই,তারওপর গুরুজন,আবার সম্পর্কে তোমার বাবার বড়ো ভাইয়ের ছেলে। এত এত রেসপেক্টফুল সম্পর্কের মাঝে এই চিকণ আঙুল তুলতে নেই। তুললে….”
তুশির অবস্থা করুণ। সার্থ এমন শ্বাস ফেলে ফেলে কথা বলছে,ফিসফিস করছে এমন… গোটা শরীর গলে যাচ্ছে ওর। তাও কোনোরকম তোতলাল,
“ ককী করবেন?”
সার্থ নিজের গাল ঘষল তুশির গালে। ট্রিম করা খোচা দাঁড়ির স্পর্শে তুশি চোখ বুজে ফেলল। কানের পাশে একটা শীতল স্বর বলল,
“ চুমু খেতে খেতে শেষ করে ফেলব।”
চোখ বেরিয়ে এলো ওর। বিহ্বল হয়ে ঘাড় ফেরাতেই,সার্থ প্রমাণ ছুড়ে দেয়। সত্যি সত্যিই ঝট করে গালে চুমু খেয়ে ফেলে। তুশির মাথা ভনভন করে উঠল। বেজে বেজে শ্বাস নিয়ে বলল
“ আপনি, আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? না-নাকি আবার নেশা করেছেন?”
উত্তর দেয়ার আগেই,হাক ছুড়ল জামিল। ডাকছে সে – কইরে,নতুন বর-বউ,বের হ তোরা। এদিকে সব রেডি।”
সার্থ ছাড়ল তুশিকে। তবে দমও নিতে দিলো না,কব্জি টেনে একদম নিয়ে চলল বাইরে।

ক্যামেরা একটা স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে। সাথে রিং লাইট জ্বলছে এখানে। অন্ধকার যাতায়াতের কোনো জায়গাই নেই। জামিল সোফা দেখিয়ে বলল,
“ বোসো তুশি বোসো। ফ্ল্যাটটা নিয়েছিলাম,বিয়ের পর বউ নিয়ে মাঝেমধ্যে এসে থাকব বলে। বউ তো নিজের মনে হয় না এ জন্মে হবে,বন্ধুর বউদেরই আপ্যায়ন করি! কী আর করার।”
শান্ত কেমন নিরীহ চোখে চাইল। জামিল খেয়াল করে বলল,
“ কিছু বলবে নাকি?”
“ না মানে ভাইয়া,আসলে আমারো বিয়ে টিয়ে হয়নি। তাই আপনার কষ্ট অনুভব করতে পারলাম।”
জামিল খ্যাক করে বলল,
“ কীহ! এ ভাই তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে ঠিক করে মুসলমানিও হয়নি। এত জলদি কেউ বিয়ের আশা করে?”
তুশির কান গরম হয়ে গেল। চোখমুখ কুঁচকে বসে রইল মেয়েটা। শান্তও লজ্জা পেলো খুব। জিভ কেটে মুখটা ছোট করে ফেলল। সার্থ চার আঙুল দিয়ে নিজের চুল ব্যাকব্রাশ করতে করতে বলল,
“ আপনি এসব বাদ দিয়ে, ছবি তুলুন!”
তারপর তুশির কাঁধ প্যাঁচিয়ে হাত রাখল বাহুতে। মেয়েটা বোম হয়ে রইল তখনো। শান্ত লেন্সে চোখ রেখেও সরে এলো আবার। বলল,
“ ম্যাম একটু হাসুন।”
তুশি মুখ গোমড়া করে রাখে। বিরক্ত সে।
সার্থ কণ্ঠ চেপে বলল,
“ হাসো বাবু! নাহলে ছেলেমেয়েরা এসব ছবি দেখলে বুঝে ফেলবে,ওদের মাকে আমি জোর করেছিলাম।”
তুশির কণ্ঠ শৃঙ্গে!
“ ছেলেমেয়ে!”
“ হ্যাঁ, প্রতি বছর একটা! কম হবে?”
তুশির মাথা চক্কর কাটল। নির্বাক বনে,ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল সে।
শান্ত অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে। এরা তো ঠিকঠাকই হচ্ছে না,ছবি তুলবে কার?
জামিল বলল,
“ আরে ভাই,তুমি ওদের পোজের আশা করো না। তুলতে থাকো। যা হয় হবে!”
নিরূপায় ছেলেটা ফোস করে শ্বাস ফেলে ফের লেন্সে চোখ রাখল। পরপর ফ্ল্যাশের ঝিলিকে দুজন ক্যামেরায় ফিরল এইবার। সার্থ হঠাৎ বলল,
“ ওয়েইট আ মিনিট, পোজ চেঞ্জ হবে।”
তারপর ফট করে বলল,
“ তুশি,আমার কোলে বসো।”
আর্তনাদ করে উঠল তুশি,
“ কীইইই?”
“ উফ, বউটা এত কথা বলে!”
এক হ্যাচকা টানে ছোট্ট খাট্টো মেয়েটাকে নিজের কোলে এনে ফেলল সার্থ। কোমরে এক হাত প্যাঁচিয়ে শান্তকে বলল,
“ এবার তুলুন।”
লজ্জায় তুশির ধরণী দ্বিধা হয়ে যায়। কী করবে,ছুটবে, কীভাবে পালাবে, কোথায় যাবে, জায়গা খুঁজল যেন।
দুদিকে মাথা নাড়তে নাড়তে হাসল জামিল। শান্তর ঠোঁটেও মিটিমিটি হাসি।
সে ক্যামেরায় পটাপট ক্লিক করলেও, সার্থর মনোযোগ আর রইল না সেখানে। বারবার ছুটে গেল,কোনো এক মাদকের গন্ধ পেয়ে।
তুশির চুলে কিছু একটা মেশানো। শ্যাম্পুর ঘ্রাণ এত কড়া হয়! আর গায়ের মেয়েলি গন্ধটা এত মিষ্টি কী করে? এমন নেশা নেশা তো সেদিন হুইস্কির গন্ধও লাগেনি। সার্থর মাথা ধরে যাচ্ছে। গলা শুকিয়ে আসছে খুব। কেমন টলমলে চিত্তে ওইভাবেই মেয়েটার খোলা চুলের ভাঁজে নাক ডুবিয়ে চোখ বুজল সে। শান্ত জামিলের দিকে চেয়ে ফিসফিস করে বলল,
“ ভাই দেখি সেই রোমান্টিক!’’
সেও পালটা ফিসফিসিয়ে বলল,
“ আগে ছিল না। বউ মনে হয় কালোজাদু করেছে।”
হেসে ফেলল ছেলেটা।
কিন্তু তুশি তাকাতেই পারছে না। কুণ্ঠায়,জড়োতায়, অস্বস্তিতে মরে যাচ্ছে যেন। হঠাৎ এক ভিন্ন ছোঁয়ায় শিরদাঁড়া সোজা করে ফেলল সে। টের পেলো সবার চোখ এড়িয়ে সার্থর হাতের আঙুল সেই পেট ছুতে যাচ্ছে। কেমন একটু একটু করে শাড়ির পাড় ভেদ করে প্রবেশ করছে ওরা। ঠোঁটটা ক্রমে ক্রমে আরো গাঢ় হচ্ছে ঘাড়ে। এক টালমাটাল অনুভূতি সামলাতে, অমনি নায়ায়ায়া বলে আর্তনাদ করে উঠল ও। ভড়কে ফিরে চাইল সকলে।
জামিল বলল,
“ কী হলো তুশি?”
সার্থর হাতের বাঁধন আলগা হতেই,কোল থেকে তড়াক করে উঠে দাঁড়াল তুশি। এলোমেলো কণ্ঠে বলল,
“ কিছু না। আমি আর, আমি আর ছবি তুলব না।”
তারপর অস্থির পায়ে রুমে ছুটে গেল মেয়েটা। শান্ত বোঝেনি,একবার ওদের দেখল আরেকবার জামিলকে।
তবে বউ এইভাবে চলে যাওয়ায় সার্থর চোখমুখের পরিবর্তন দেখা গেল না। বরং সোফায় দুইহাত ছড়িয়ে পায়ের ওপর পা তুলে বসল সে। গালের ভেতর জিভ ঠেলে হাসতে হাসতে আঙুল ঘষল থুতনিতে।
এবার যেন সব হিসেব মিলিয়ে ফেলল জামিল। বিড়বিড় করে বলল,
“ শালা, ইমরান হাশমী! মানুষ খারাপ থেকে ভালো হয়,আর এটা ভালো থেকে লুচ্চা হয়ে যাচ্ছে।”

বেশ সময় নিয়ে ছবি-টবির পাঠ চুকেছে। কিছু ছবি এত সুন্দর এসেছে,সার্থ ‘র’ কপি গুলোই নিজের ফোনে নিয়ে নিলো। বাকি ফাইল পরে পাঠিয়ে দেয়ার কথা বলে বিদেয় নিলো শান্ত।
এরপর খেতে বসল ওরা। তুশি লজ্জায় তখনো ধাতস্ত হতে পারেনি। কী এক মুসিবত যে খাড়া হলো ঘাড়ে। যাকে চেয়েছে,নিজের সবটুকু দিয়েই চেয়েছে সে এখন কাছে আসতে চাইলে ও নিতে পারছে না কেন? একটুখানি ছুঁলেও কেন এমন দমবন্ধ হয়ে যায়? তুশি সেই যে চেয়ারে বসেছে,এখনো মাথা তোলেনি। কিন্তু প্লেটে শুকনো স্যান্ডউইচ দেখে ঠোঁট উলটে গেল। মিনমিন করে বলল,
“ আর কিছু নেই? না মানে,এমন শুকনো শুকনো খাবার খেতে পারি না।”
জামিল মায়া মায়া মুখ করে বলল,
“ আহারে। থাক আজ একটু কষ্ট করে খাও তুশি। এখান থেকে খাবারের দোকান অনেক দূরে। অর্ডার করলেও আসতে সময় নেবে। খেয়ে নাও। এরপর কয় বেলা যে না খেয়ে থাকতে হয় কে জানে!”
ও বুঝতে না পেরে বলল,
“ কেন?”
“ বাড়ি যেতেই একের পর এক যা বোম পড়বে মাথায়,সামলে উঠতে সময় লাগবে না?”
তুশি আশ্চর্য হয়ে সার্থর দিকে ফিরল।
“ কবে যাব বাড়িতে?”
সে বলল,
“ এক্ষুনি।”
আরো বিস্মিত হলো তুশি,
“ কিন্তু, আপনি যে বলেছিলেন এখানে থাকব কদিন! ”
সার্থ প্লেট থেকে চোখ তুলে চাইল,
“ তুমি চাইছ থাকতে?
জামিল, ওদিকে তাকা তো।”
ভদ্র ছেলের মতো জামিল পেছন দিকে ফিরল। সার্থ সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁটটা তুশির কানের পাশে এগিয়ে এনে বলল,
“ এখানে যত থাকব,তত তোমার বিপদ। আমার থেকে বাঁচতে চাইলে তোমার এই মূহুর্তে বাড়ি যাওয়া উচিত!”

বিকট চোখে ঢোক গিলল তুশি। জামিল বলল,
“ হয়েছে? ফিরব?”
সার্থ বলল, “ হু!”
ও ঘুরে বসলেও ঠোঁটের চাপা হাসি কমেনি। বোকা তো আর নয়! কিন্তু তুশির গলা দিয়ে আর খাবার নামল না। ভীষণ চিন্তায় রুহু অবধি ছটফট করে উঠল। এখন বাড়ি গিয়ে কী কী পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে,কে জানে!
জামিল তখনই বলল,
“ সার্থর বুদ্ধি দেখেছ,তুশি? বিয়ে করে এক রাত বাইরে থেকে এখন আবার বর-বউ সেজে ফিরে যাচ্ছে। তোমাদের এই রূপ দেখে অয়নটা ‘আমেনার মা’ বলে চিৎকার করে না উঠলেই হয়!”
অয়নের নাম শুনতেই তুশি হাঁসফাঁস করে ওঠে। বাড়িতে কী কী হয়েছে? ইউশার সাথে বিয়েটা হলো তো? দাদি করতে পারল কাজটা? সে আবার স্টেশনেই বসে নেই তো! নাকি ওকে
না পেয়ে কান্না জুড়ে দিয়েছে? এত এত প্রশ্ন তুশি মনে চেপে বসতে পারল না। যদি জামিল কিছু জানে,সেই আশায় রয়েসয়ে বলল,
“ বাড়ির ব্যাপারে আপনি কিছু জানেন জামিল ভাইয়া?”
ও মাথা নেড়ে নিষ্পাপ মুখে বলল,
“ না তো। কাল তোমাদের বিয়ের পর আমি বাড়ি চলে গেছিলাম। আর বের হইনি। আজ সার্থ টেলিফোন করতেই, সোজা এখানে চলে এলাম। কেন বলো তো?”
“ উহু,এমনি।”
সার্থ খোঁচা মেরে বলল,
“ অয়নের জন্যে চিন্তা হচ্ছে?”
ক্লান্ত চোখে চাইল তুশি।
তবে চটাং চটাং করে বলল,
“ না, আপনার আইরিনের জন্যে হচ্ছে! সে তো আপনার জন্যে উন্মাদ, কী কীই না করল আপনাকে পেতে। এখন যদি জানতে পারে আপনার বিয়ে হয়ে গেছে,তাও আবার একটা বস্তির মেয়ের সাথে। যাকে ও দুচোখে দেখতে পারে না। কী হবে? মনে হয় ওখানেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাবে তাই না?
জামিল ঘাড় নাড়ল। কথাটায় সহমত সে। সার্থ থমথমে গলায় বলল,
“ আইরিনকে জড়িয়ে আমাকে কিছু বলবে না।”
“ তাহলে আপনিও অয়ন ভাইকে জড়িয়ে আমায় কিছু বলবেন না। উনি অন্তত ভালো মানুষ!”

সার্থ কিছুক্ষণ ঠান্ডা চোখে চেয়ে রইল। পরপর খাবারের প্লেটটা ঠেলে দিয়ে,উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ আমি জানি,ও ভালো। কিন্তু ওর কোনো প্রশংসা আমি তোমার থেকে শুনতে চাই না। শুধু ও কেন,পৃথিবীর কোনো পুরুষের প্রশংসাই তুমি আর করবে না তুশি। দিস ইজ দ্য ফার্স্ট,এন্ড লাস্ট ওয়ার্নিং।”

সার্থ চলে গেল। তুশি আহাম্মক বনে বলল,
“ এত রেগে গেলেন কেন?”
জামিল হাসে,ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলে,
“ জেলাসি ওভারলোডেড। এই জেলাসি থেকেই ব্যাটা প্রেমে পড়েছে,বিয়ে করেছে। সাবধান!”

পাক্কা দু ঘন্টা লাগল ওদের উত্তরা পৌঁছাতে। জামিল আসেনি। আসার কথাও নয়! অন্যের পারিবারিক ব্যাপার-স্যাপারে যত কম জড়ানো যায়,তত ভালো। তবে,জামিলের গাড়িতেই তুশিকে নিয়ে বাড়ির সদরে এসে থেমেছে সার্থ। জানলা থেকে বের হওয়া তার মুখটা দেখে দারোয়ান অতি সত্ত্বর গেইট খুলে দিলেন।
হড়বড়িয়ে বললেন,
“ মেজো বাপে কই আছিলেন কাইলকা?”
“ কাজে ছিলাম।”
লনের দিকে গাড়ি নিতে নিতে দুটো শব্দ বলে গেল সে। কিন্তু, হুইল থেকে হাতটা ফস্কে যাচ্ছিল বারেবার। কেমন অস্থির লাগছিল সব কিছু। গাড়ি থেকে নামার পর যার রেশ আরো বাড়ল। মরুর মতো খরখরে লাগল বুকের ভেতরটা। এক পল আর্ত চোখে পাশে দাঁড়ানো তুশির দিকে দেখল সার্থ। মেয়েটার মুখ দ্বিগুণ ফ্যাকাশে হয়ে আছে। আর ক পা এগোলেই বাড়ির মূল দরজা ছোঁবে ওরা। ভেতরে কী অপেক্ষা করছে কে জানে!
হঠাৎ হাতের আঙুলে একটা শক্ত-খসখসে হাতের ছোঁয়ায় নড়ে উঠল তুশি। তাকাল পাশ ফিরে। সার্থর চেহারায় উদ্বেগ, অশান্ত দৃষ্টিতে এলোমেলো শ্বাস। তুশির নরম হাতের আঙুলে নিজের আঙুল গুজে খুব পোক্ত করে ধরল সে। ডাকল থেমে থেমে,
“ তু-তুশিইই!”
গলার স্বর অন্যরকম শোনাল,
কেমন যেন লাগল তুশির। উত্তর দিলো সহসা,
“ জি!”
সার্থ দুজনের মিশে থাকা হাতের দিকে চাইল এক পল। বলল,
“ ভেতরে যাই হয়ে যাক, হাত ছেড়ো না।”
তুশি ঢোক গিলে মলিন চোখে বলল,
“ তুশি কাউকে ছাড়ে না,উলটে সবাই ওকে ছেড়ে যায়!”
সার্থর দৃষ্টি আর্ত! অথচ কী দৃঢ় গলায় বলল,
“ জান কোরবান করে দেবো,
তাও তোমাকে ছাড়ব না।
এই জন্মের দ্বায়ভার আমি নিলাম। তুমি শুধু আমাকে নিও,তোমার সাথে বেঁচে থাকার জন্যে…!”

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply