Golpo romantic golpo কাছে আসার মৌসুম

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬৪


কাছে আসার মৌসুম(৬৪)

নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি

“ অ্যাই চোর! অ্যাই, অ্যাই যে, অ্যাই চোর!”
জমাট-নিরেট গলায় ফিসফিস করে ডাকছে কেউ। মাঝে গাল ধরে চাপড়াল দুবার। মুখটা ঢেকে রাখা এক গাছি চুল দু আঙুলে নিয়ে সরাল এক পাশে। ঘুমে জবুথবু তুশি টের পেল সবটা। কিন্তু চোখ খুলতে পারল না। এত ঘুম জেঁকে বসেছে কেন হঠাৎ!
তবে ওই মধুর সুরের ডাক বদলাল তখনই। মোলায়েম কণ্ঠটা মূহুর্তেই কেমন কর্কশ গলায় ডাকল,
“ অ্যাই মেয়ে!”
অমনি তড়াক করে চোখ মেলল তুশি। ভয়ার্ত,বিভ্রান্ত নয়নতারা সোজা গিয়ে বর্তাল সামনে ঝুঁকে থাকা পুরুষালি শুভ্র-সুন্দর মুখে। চমকে উঠল এক চোট! বালিশে রাখা মাথাটা শক্ত হলো আরো। সার্থ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ ঘুম হয়নি? বাজে কটা জানো? বারোটা। এত বেলা অবধি কেউ ঘুমায়? অবশ্য যদি রাতে ঘুম না হতো,বা আমি ঘুমোতে না দিতাম তখন এক ব্যাপার ছিল। তাতো হয় নি। তাহলে এত ঘুমোনোর মানে কী?”
তুশির তেলতেলে তন্দ্রা জড়ানো মুখটা গোধূলীর মতো লাল হয়ে এলো৷ লজ্জায় নুইয়ে গেল দু হাত। সার্থ সোজা হয়ে দাঁড়ায়। পুরু স্বরে বলে,
“ একজন পুলিশ অফিসারের বউ হয়ে এত আনপাংকচুয়াল হওয়া যাবে না। সাতটার মধ্যে বেড ছাড়তে হবে। আটটার মধ্যে ব্রেকফাস্ট! একটার মধ্যে শাওয়ার, দুটোর মধ্যে লাঞ্চ। আর ঠিক সন্ধ্যের আযান পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বই নিয়ে পড়তে বসতে হবে। রাত নটায় ডিনার আর বারোটা বাজলে আবার বেড। মাথায় ঢুকেছে কিছু?
তুশি ঠোঁট হাঁ করে চেয়ে রইল।
সার্থ নিজের ডান হাতের মগটা এগিয়ে দিলো সামনে।
“ নাও।”
চোখ নামিয়ে এক পল কাপের দিকে দেখল ও। ভ্রুজোড়া আকাশ ছুঁলো অমনি। কফি! এতক্ষণে খেয়াল পড়ল সার্থর দুহাতেই দুটো কফি মগ। মেয়েটা অবাক হয়ে বলল,
“ কার জন্যে?”
“ যাকে দিলাম।”
“ এটা,এটা আপনি বানিয়েছেন?”
“ হু।”
“ আমার জন্যে?”
“ তো?”
তুশির চোখমুখ শিথিল হয়ে গেল। এত ভালো লাগল ব্যাপারটা! ও এখনো গা থেকে কম্বলই সরায়নি, আর এর মাঝে বিছানায় কফি এসে গেল? তাও আবার নিজের স্বামীর হাতে বানানো? এটা কপাল,নাকি সোনায় বাঁধানো স্বর্গ! কিন্তু ঘাড়ত্যাড়ামিতে তুশিও কম যায় না! এত ভালো লাগা, আর এই নীরব উল্লাসের একটুখানিও বুঝতে দিলো না সে। চুপচাপ কাপ নিয়ে চুমুক দিলো,আর মুখটা কুঁচকে বসল অমনি।
“ উম,তেতো।
সার্থ বলল,
“ তেতো! হাফ স্পুন সুগার দিয়েছি।”
তুশি আশ্চর্য হয়ে বলল,
“ হাফ! মানে অর্ধেক চামচ? আমি এসবে চার চামচ চিনি খাই।”
“ আচ্ছা? তাহলে মুখ দিয়ে এত তেতো কথা বেরোয় কী করে? শুনলে তো মনে হয় করলা ছাড়া কিচ্ছু খাও না।”
তুশি গাল ফুলিয়ে চাইল। কিছু না বলে নামতে গেলেই বাধ সাধল সার্থ।
“ কোথায় যাচ্ছ?”
“ চিনি দিতে। এত তেতো খাব কী করে নাহলে?”
সার্থর গম্ভীর মুখটা পালটে গেল অমনি। গালের ভেতর জিভ ঘুরিয়ে হাসল,বলল,
“ যারা বরকে কাছে ঘেঁষতে দেয় না,তাদের কাছে সব তেতোই লাগে।”
তুশির কথা হারিয়ে গেল এবার। বিস্মিত হয়ে ভাবল – এর সাথে কাছে আসার কী সম্পর্ক?

সার্থ খুব গরম গরম চা-কফি খেতে পারে। এই যে, তুশির দুটো চুমুকের মাঝেই, চোখের পলকে ওর নিজের কাপ খালি হয়ে গেল। কাপ টেবিলে রেখে, ভারি লাগেজটা টেনে এনে, বিছানায় তুলল সে। ওপরের পকেট হাতিয়ে
ব্রাশ,ফেসওয়াশ, তোয়ালে এমনকি শাওয়ার জেলটা অবধি বাইরে রেখে বলল – “ ফ্রেশ হয়ে এসো। ব্রেকফাস্টে কী খাবে? তুমি কি রান্না জানো?”
তুশি কাচুমাচু করে বলল,
“ ওই, না মানে… আসলে….”
সার্থ বুঝল ব্যাপারটা। বলল,
“ এত মানে মানের কী আছে? রান্না জানতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। আমিও জানি না। খাবার অর্ডার করব,ফোন নেই। জামিলকেই বলছি কিছু নিয়ে আসতে।”
তুশি স্বায় দিতে পারল না। উলটে বেজায় মন খারাপ হলো। দাদি কত বার বলতো,বকতো,বারবার চাইত তুশি একটু রান্নাবান্না শিখুক। একটু সংসারি হোক। আজ যদি ও সব পারতো,ইউশার মতো গুড গার্ল হতো এখন কি বিটকেলটাকে বাইরে থেকে খাবার আনতে হতো! ওর হাতের তৈরি সুস্বাদু খাবার খেতে পারতো না? মেয়েটাকে ঠায় বসে থাকতে দেখে সার্থ গলার জোর বাড়াল,
“ কী? ফ্রেশ হতে বললাম না?”
“ যাচ্ছি।”
“ গো,ফাস্ট।”
হঠাৎ এত তাড়াহুড়ো কীসের,একবার জিজ্ঞেস করতে চাইছিল তুশি। কিন্তু করলেও বা,উত্তর আসবে কিনা সন্দেহ আছে। মাথা ভর্তি প্রশ্ন নিয়ে বিছানা থেকে নামল সে। জামাকাপড়, তোয়ালের সাথে বাকি সমস্ত জিনিসপত্র হাতে তুলে ওয়াশরুমে ঢুকল। এই গোটা বিল্ডিংটাই নতুন তোলা হয়েছে। সেজন্যে এখনো অনেক কাজ বাকি! ওয়াশরুমের ঝকঝকে টাইলসগুলো দেখেই বোঝা যায়,ওরাই এখানকার প্রথম মেহমান।
তুশি শাওয়ার ট্যাপ ছাড়ল, দাঁড়াল নিচে। কিন্তু যখন গোসল শেষে বন্ধ করতে গেল,তখন আর কাজ হলো না। যেদিকেই মুচড়াল,পানির বেগ সেদিকেই বাড়ছে। উলটে সাবান-শ্যাম্পুর ফ্যানায় ভরে যাচ্ছে ফ্লোরটা। উপায় না পেয়ে দরজায় ছুটে এলো তুশি। ভেজা মাথা বের করে ডাকল,
“ শুনুন!”
সার্থ রুমে নেই। ও আরো জোরে ডাকল,
“ শুনছেন? কোথায় আপনি?”
ঘরে এসে দাঁড়াল সার্থ। দরজার ফাঁক গলে উঁকি দেয়া তুশির মাথাটা দেখে অবাক হয়ে বলল,
“ কী হয়েছে?”
ও অসহায় মুখ করে বলল,
“ আমি না ট্যাপটা বন্ধ করতে পারছি না।”
সার্থ এগিয়ে আসে। বলে,
“ আচ্ছা, বের হও।”
“ আমি ভেজা।”
“ তাহলে চেঞ্জ করে বের হও।”
“ পানিতে সব ভেসে যাচ্ছে। চেঞ্জ করতে গেলেও যে জামা ভিজে যাবে।”
সার্থ ফোস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ তাহলে দরজাটা ছাড়ো। আমাকে তো ভেতরে ঢুকতে হবে। একশো মিটার দূরে দাঁড়িয়ে ট্যাপ বন্ধ করার কোনো মন্ত্র আমি জানি না। ”

তুশি কপাল কুঁচকে ঠোঁট উল্টাল। সব সময় ত্যারা কথা! কিন্তু সরে যাবে কীভাবে? পুরো ভেজা একটা শরীর তো! মেয়েটা দোনামনা করে দরজাটা বুকের সাথে চেপে রেখেই, দেওয়ালে সেঁটে দাঁড়াল কোনোরকম। সার্থ ঢুকল ভেতরে।
সারা ফ্লোর শাওয়ার জেল আর শ্যাম্পুর ফ্যানায় একাকার হয়ে আছে। জলের ওপর ভাসছে কিছু কিছু। পিচ্ছিল মেঝেতে সার্থ এক পা ফেলতেই হড়কে গেল সেটা। যেই পড়তে নিলো,উদ্বেগ নিয়ে ধরতে এলো তুশি। তুরন্ত দুটোতে একইসঙ্গে ধপাস করে আছাড় খেয়ে পড়ে গেল নিচে। সার্থর মাথার পেছন দিক দ্রিম করে বাড়ি খেল টাইলসের শক্ত গায়ের ওপর। সাথে তিরের বেগে তুশির
শীর্ন শরীরটাও দুম করে পড়ল ওর বুকে। পরপর ব্যথার তোড়ে নীল হয়ে গেল ছেলেটা। চোখমুখ খিচে নিলো নিঃশব্দে। চেহারার অবস্থা দেখেই আঁতকে উঠল তুশি। ধড়ফড়িয়ে শুধাল,
“ ব্যথা পেয়েছেন?”
সার্থর সহ্য ক্ষমতা পাহাড় সমান। এইবারেও একইরকম সামলাল নিজেকে। এক টুকরো দীর্ঘশ্বাসে ব্যথা মিটিয়ে চোখ মেলে চাইল। তৎক্ষনাৎ সোজাসুজি নজর গিয়ে বিঁধল তুশির চপচপে ভেজা শরীরের কোথাও।
চট করে চোখ সরিয়ে বলল,
“ ওঠো।”
তুশি ব্যাকুল হয়ে বলল,
“ লেগেছে আপনার?”
“ ওঠো তুমি।”
গম্ভীর কণ্ঠের ধার শুনে উঠে এলো মেয়েটা। সার্থ তাকালোই না। আগে ট্যাপ বন্ধ করল। তারপর আরেকদিক চেয়ে বলল,
“ এটা একটু ভেতরের দিকে প্রেস করে ঘোরালে বন্ধ হয়ে যাবে।”
তুশি খেয়াল করল,মানুষটার চাউনি এলোমেলো। ওর দিকে ভুল করেও না তাকানোর ইচ্ছে। হঠাৎ কী হলো মাথায় কিছু ঢুকল না। ও কি না বুঝে আবার বুকের ব্যথা জায়গায় আঘাত করে ফেলল? মেয়েটা অধৈর্য হয়ে বলল,
“ আপনার কি বুকে লেগেছে?”
“ সরো।”
তুশিকে একপাশে সরিয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে নিলো সার্থ। ও উদ্বীগ্ন হয়ে বলল,
“ এরকম করছেন কেন? কিছু তো বলুন। চিন্তা হয় আমার। বোঝেন না?”
সার্থ পা-টা বাইরে রাখতে গিয়েও থামল। চাইল ঘাড় ঘুরিয়ে। তুশির ফোলা মুখের দিকে চেয়ে বাঁকা হাসল আচমকা। মেয়েটা তব্দা খেয়ে বলল,
“ হাসছেন কেন?”
সার্থর ঐ শব্দহীন বক্র হাসি বাড়ল। কেমন ফটাফট বলল,
“ তিলটা সুন্দর!”
চোখের দীঘল কালো পল্লবগুলো বোকা বোকা ভাবে ঝাপটাল তুশি। বোঝেনি ও। বলতে গেল – কীসের তি.. আরে..”
সার্থ শুনল না,জবাবও দিলো না। বেরিয়ে গেল। কিছু পল হতবুদ্ধি চোখে চেয়ে রইল তুশি। তারপর দরজা চাপাল। তাকাল বেসিনের আয়নায়। ভীষণ লজ্জায় ওর সারা শরীর যেন ভস্ম হলো অমনি। হাঁ করে নিজের দিকে আরেকবার দেখল মেয়েটা। জামা তো ভেজা,সেইসাথে গলা নেমে এসছে বুকের অনেকটা নিচে। বাম পাশের কালো তিলটা স্পষ্ট সেখানে। তুশি হাঁসফাঁস করে চোখ খিচে ফেলল। এবার বুঝল সার্থ কী বলে গেছে। বিড়বিড় করল ছটফটিয়ে,
“ অসভ্য, জাদ্রেল, বিটকেল!”

তুশি ওয়াশরুম থেকে বের হলো সময় নিয়ে। অস্বস্তি,আর কুণ্ঠায় পুরো শরীর ক্ষয়ে যাচ্ছে। মাথা তুলতেও কষ্ট যেন। কী একটা কথা বলল তখন! ইস ছি, নির্লজ্জ লোক। তুশি অমন আনত হয়েই কয়েক পা এগোলো। ঘরে উপস্থিতি টের পেলো মানুষটার। চোখের কোণ তুলে চাইল একটু,অমনি ধক করে উঠল বুকের ধার। একটা সাদা শেরওয়ানি পরে দাঁড়িয়ে আছে সার্থ। আঁটোসাঁটো পোশাকে চওড়া কাঁধ,সুঠাম দেহ স্পষ্ট তার। বুকপকেটের কাছটায় একটা সোনালী রঙের পকেট স্কয়ার তিন কোণা করে ভাঁজ করা। নিখুঁতভাবে সেট করা চুল। হালকা ট্রিম করা দাড়ি, হাতে চকচকে ঘড়ি,পায়ে শেরওয়ানির সাথে ম্যাচিং করা নাগড়া। সব মিলিয়ে তুশির মনে হলো ওর শ্বাস আটকে গেছে। মুগ্ধতার আগুনে জ্বলে যাচ্ছে চোখ। সবিস্ময়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল ও।
পুলিশের ইউনিফর্ম,কখনো ফরমাল স্যুট কখনো বা শার্ট পরা লোকটার পরনে একটা শেরওয়ানি আজ। সাদামাটা পুরুষালি পাজামা। বর বর চেহারা তার! এর আগে একবার শেরওয়ানিতে দেখেছিল, সেই মিথ্যে বিয়ের সময়। কিন্তু সেদিন তো ভালোবাসা ছিল না,অনুভূতি ছিল না। তাই আজকের মতো বুকের তীব্র কাঁপন ধরতে পারেনি তুশি। যা এইবার পারল। এই যে হৃদয়ের গুপ্ত ঘরে ভীষণ জোরে বাঁজ পড়ল একটা, এই শব্দের নাম কী দেবে ও?
সার্থর চোখ পড়ল তখনই। নিস্তব্ধ মেয়েটার নিশ্চল চাউনি দেখে ভ্রুদুটো গোছাল একটু। তারপর এক পা দু পা করে এসে থামল সামনে। মিটিমিটি হেসে তুশির বিহ্বল চেহারা দেখল দু পল। ভ্রু নাঁচিয়ে বলল,
“ বেশি ভালো লাগছে?”
নড়ে উঠল তুশি। ভাঙল ধ্যান। নজর সরিয়ে নিলো সহসা। পরপর গলা ঝেরে বলল,
“ এটা কেন পরেছেন?”
সার্থ চেয়ে দেখল তুশির চুলের মাথা ছুঁয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে মেঝেতে। ক্লান্ত শ্বাস টেনে তোয়ালেটা নিয়ে নিলো সে। বিভ্রান্ত মেয়েটার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। ভেজা চুলে তোয়ালে ছোঁয়াতেই বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়ল তুশি। ঘুরে তাকাতে চাইলে সার্থ মাথাটা শক্ত করে চেপে রাখল। চুল মুছতে মুছতে বলল,
“ চুল ঠিক করে শুকাতে পারো না,
একটা ট্যাপ বন্ধ করতে পারো না,
পারো কী শুধু চুরি করতে?”
তুশি গাল ফুলিয়ে বলল,
“ আমি কি এখন আর চুরি করি? সব সময় এই এক খোঁটা দিচ্ছেন কেন?”
সার্থর গলায় ভীষণ তেজ,
“ আমার ইচ্ছে। দশ বাচ্চার মা হয়ে গেলেও তোমাকে আমি চোরই বলব।”

তুশি চুপ করে থাকে। পরপর মিনমিন করে বলে,
“ আপনি হঠাৎ শেরওয়ানি পরেছেন কেন?”
সার্থ কাঁধ টেনে ওকে নিজের দিকে ফেরাল। পালটা প্রশ্ন করল,
“ শাড়ি পরতে পারো?”
“ হ্যাঁ?”
“ তোমার কি কানে ব্যাঙ ঢুকেছে? সব কথা দুবার বলতে হয়।”
তুশি চোখ নামিয়ে নেয়। ও বলল,
“ ওখানে বেনারসি আছে, পরে আমাকে ডাকো। আমি বাইরে আছি।”
তুশি অবাক হয়ে বলল,
“ বেনারসি কেন পরব?”
“ আমি শেরওয়ানি পরেছি বলে।”
“ কিন্তু শেরওয়ানি কেন পরেছেন?”
“ তুমি বেনারসি পরবে বলে।”
তুশি নাক ফোলায়।
“ এসব কেমন উত্তর?”
সার্থ ব্যস্ত বেশ। নিজেই বেনারসি এনে বলল,
“ তুমি পরবে, না আমি পরাব?”
তুশি বিরক্ত চোখে চেয়ে থাকে। ঘাউড়া লোক,
একটা জবাবও দিচ্ছে না, অথচ নিজের মর্জিমাফিক হুকুম করে যাচ্ছে! সার্থর এত ধৈর্য হলো না। দুম করে হাত বাড়াল ওর গায়ের ওরনার দিকে, তুশি ছিটকে সরে গেল অমনি। হড়বড়িয়ে বলল,
“ আমি পারব, আমি পারব।”
“ গুড।”
ও বের হতে নিয়েও থামল ফের। কড়া কণ্ঠে বলল,
“ দরজা আটকে বসে থাকার চিন্তাও করো না। এরকম দরজা এক লাথিতে ভাঙার রেকর্ড আমার আছে।”

তুশি থমথমে গলায় বলল,
“ ঠিক আছে ঠিক আছে, এত হুমকি দিতে হবে না। যান আপনি।”
সার্থ নিজেই লক টিপে দেয়। তুশি তাও ছিটকিনি তুলল। লোকটাকে ও আর এক আনাও বিশ্বাস করে না। ইদানীং মাথায় ছিট উঠেছে। যদি শয়তানি করে ভেতরে চলে আসে?

তারপর সময় কাটল কিছু। সার্থ গুনে গুনে আধঘন্টা পর দরজায় টোকা দিলো।
জিজ্ঞেস করল,
“ হয়নি তোমার? তুশিই!”
ওপাশটা নীরব। উত্তর এলো না। সার্থর বুক ধুকপুক করে উঠল। জিভে ঠোঁট চুবিয়ে সতর্ক কণ্ঠে বলল
“ পালিয়েছ? এবার ধরলে কিন্তু আস্ত রাখব না।”
নাহ,জবাব এলো না। সার্থর ভয় বাড়ল। তড়িঘড়ি করে তৈরি হল দরজা ভাঙতে, ওই পাড় থেকে ছিটকিনিটা নামল তখনই। বেরিয়ে এলো তুশির কাচুমাচু চুপসে থাকা মুখটা।
সার্থ ধমকে কিছু বলতে গেল, খেয়াল পড়ল ওর বেশভূষায়। শাড়িটা দড়ির মতো গায়ে প্যাঁচিয়ে রেখে,বড়ো নিষ্পাপ গলায় বলল,
“ আমি না, শাড়ি পরতে পারি না। অনেকক্ষণ চেষ্টা করলাম,কিছুই হলো না। কোন মাথা কোনদিকে গুঁজব বলুন তো!”
ওই মিইয়ে থাকা মুখচোখ দেখে সার্থ আর হম্বিতম্বি করল না। ফোস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ আই নিউ ইট। জানতাম আমি।”
“ কীভাবে জানলেন?”
“ তুমি যে একটা আমড়া কাঠ, কে না জানে?”
তুশির মুখ কালো হয়ে গেল। সার্থ থুত্নি ঘষতে ঘষতে দেখল শাড়িটা। সচকিতে বলল,
“ ইউটিউব!”
চটপট সে টেলিভিশন ছাড়ল। শাড়ি পরানোর ভিডিওগুলো থেকে বেছে বেছে একটা ধরল সেখানে। তুশি তাজ্জব হয়ে বলল,
“ ইউটিউবে শাড়ি পরানোও শেখায়? বাবাহ!”
সার্থর মনোযোগ তখন স্ক্রিনে। মেয়েটা যেভাবে যেভাবে পরানো দেখাচ্ছে, সেভাবে তুশিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শাড়িটা পরাল সেও। কুচি সেট করতে গিয়ে এক চোট যুদ্ধ শেষ হলো।
শেষে সবগুলো কুচি যখন পেটে গুঁজতে হবে,
তুশি পিছিয়ে গিয়ে বলল,
“ আ-আমাকে দিন!”
ও কপাল কুঁচকে বলল,
“ কেন?”
“এমনি।”
সার্থ বুঝল, তুশির আপত্তি কোথায়। কিন্তু এই পর্যায়ে গতকালকের ভালোমানুষিটা আর দেখাতে পারল না। ঝট করে দাপুটে হাতে কুচিটা তুশির পেটের ভাঁজে গুজে দিলো সে। আরো ইচ্ছে করে প্রগাঢ় ভাবে আঙুল ছোঁয়াল সেখানে। ওই ভীষণ জটিল স্পর্শে স্তব্ধ চোখে তাকাল তুশি। ভড়কে বলল,
“ আমি তো বললাম আমাকে দিতে।”
“ কিন্তু আমি শুনিনি। কাল মানা করেছ,শুনেছি। নিজেকে সামলেও নিয়েছি। কিন্তু এসব হবে না তুশি। এরকম ফালতু ডিসটেন্স রাখতে পারব না আমি।”
তুশি চটে বলল,
“ এগুলো বুঝি খুব ভালো কাজ করছেন? মানা করা সত্ত্বেও যারা ছোঁয়, তাদের চরিত্রহীন বলে।”
সার্থ ভ্রু নাঁচাল,
“ আচ্ছা?”
তুরন্ত ঝট করে
মেয়েটার সরু কোমরে হাত রেখে এক টান মারল সে। তুশির শীর্ণ দেহ সহসা এসে ঠুকল ওর বুকের সাথে। মেয়েলি হকচকানো দৃষ্টিতে চেয়ে সার্থ সোজাসাপটা বলল,
“ তোমার কাছে আমি পৃথিবীর সব চেয়ে চরিত্রহীন পুরুষ হতে চাই। সবচেয়ে বাজে নজরে আমি দেখতে চাই তোমাকে। সবথেকে জঘন্য ভাবে আমি ছুঁতে চাই তোমায়। এতে তুমি যা ইচ্ছে আমাকে বলো, আমার কিচ্ছু যায় আসে না।”
তুশির বুকের গতি সরব। খুব করে চাইল কথা বলতে। কিন্তু সার্থর ভারি শ্বাস-প্রশ্বাসের তপ্ততায় ও জিভটাই নাড়তে পারল না। বরং চোখ নামাতেই এক আঙুল দিয়ে ফের ওর নিচু চিবুক উঁচুতে তুলল সার্থ। বলল,
“ তুমি আমার স্ত্রী তুশি। আমার বিয়ে করা বউ। আমি কেন তোমায় ছোঁব না?
আমার যেভাবে ইচ্ছে হবে,যেখানে ইচ্ছে হবে আমি সেখানে ছোঁব। যতক্ষণ মন চাইবে ততক্ষণ ছোঁব। তোমাকে আদরে আদরে শেষ করে দেয়ার পূর্ণ অধিকার আমার আছে!”

তুশি খুব বেগ নিয়ে কটা লাইন বলল,
“ ন-নেই। আমি কিন্তু বিয়েটা মন থেকে করিনি। আপনি যেমন প্রথমে আমাকে বউ বলে মানেননি,ঠিক তেমন করে আমিও মেনে নিইনি কিছু। আচ্ছা, আপনার কি আমায় শুধু ছুঁতেই ইচ্ছে করে? কেন,নিয়ন্ত্রণ থাকে না? মেয়ে দেখলে আপনাদের সবারই এরকম হয়, তাই না।”
সার্থর চিবুক বদলে গেল সহসা। অথচ চোয়ালের হাড় ভাসিয়েও হাসল সে। শান্ত চোখে বলল,
“ এসব বলে না বাবু। মাথা গরম হয়!”
তুশি ভ্যাবাচেকা খায়। গুলিয়ে যায় আবারও।
সার্থ বলল,
“ যাক গে, এসো। সময় খুব কম।”
মেয়েটার হাত ধরে সোজা বিছানায় এনে বসাল সে। তুশির চোখে গাঢ় বিভ্রম নামল। সার্থ লাগেজ থেকে কিছু জিনিসপত্র বের করল এবার। গোল পাউচটার চেইন খুলতেই হতবাক হয়ে গেল তুশি। সাজগোজের জিনিসপত্র, গয়না দেখে বলল,
“ এগুলো কে কিনল?”
“ শরিফের বউকে দিয়ে কিনিয়েছিলাম।”
বলতে বলতে মেয়েটার সামনে বসল সেও। তুশি আশ্চর্য হয়ে বলল,
“ কী হবে এসব দিয়ে?”
“ সাজবে।”
“ এখানে আসলে হচ্ছেটা কী?”
“ বুঝবে,একটু পর।”
সার্থ ঘাড় ডলতে ডলতে মেকয়াপের জিনিসগুলো দেখছে। কোনটা কোথায় মাখে? ও নিশ্চিত এসব তুশি নিজেও জানে না। পার্টিতে তো ঠোঁট আর ঠোঁটের লিপস্টিকই ওর চোখে লেগেছিল। কী নেশার মতো রং! যেন চ্যাঁচিয়ে চ্যাঁচিয়ে বলছিল,
“ মিস্টার সার্থ আবরার,কিস মি নাউ।”
এছাড়া আর কিছু মেখেছিল মুখে?
কোনোটাই না বুঝতে পেরে হাল ছেড়ে দিলো সার্থ। পাতা থেকে একটা ছোট্ট টিপ টেনে,তুশির কপালে পরিয়ে দিলো। তারপর দু আঙুলে গাল চেপে লিপস্টিকটাও ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মেখে দিলো ঠোঁটে। তুশির মনে হলো ও পৃথিবীতে নেই। বিস্ময়ে বিস্ময়ে মরে ভূত হয়ে যাচ্ছে। চোখদুটো বড়ো বড়ো করে সামনের মানুষটাকে কেবল দেখলই সে।
সার্থ চিরুনি নিয়ে পেছনে বসল। চুলের গোছা এপাশ-ওপাশ করে, কপাল চুলকে বলল
“ চুল কীভাবে বাঁধে?”
তুশি গোমড়ামুখে বলল,
“ থাক। এত আদিখ্যেতা দেখানোর দরকার নেই। আমারটা আমি করে নেব।”
“ কথা কম। কীভাবে করব?”
“ আপনি এরকম গদগদ করবেন না। আমি কিন্তু কিছু ভুলিনি। আপনাকে দেখলে এখনো আমার গা জ্বলে যায়।”
“ জ্বলুক। যাকে দেখে যার জ্বলবে সেই তার কাছের।”
তুশি আর কথা খুঁজে পেলো না। ঠোঁট গোজ করে রাখল। সার্থ বিফল হয়ে বলল,
“ চুল বাঁধতে হবে না। খোলা থাকুক।”
একটা ছোট্ট চিকণ নেকলেস ছিল! বেনারসির সাথে ম্যাচিং করে কেনা। তুশির পিঠ থেকে চুলগুলো সরিয়ে নেকলেসটা নিজেই পরিয়ে দেয় সার্থ। তুশি শক্ত হয়ে শ্বাস বন্ধ করে রাখল। সার্থর ঠান্ডা হাত যতবার ওর গলায়,ঘাড়ে লাগছে, যতবার মানুষটার নিঃশ্বাস ছুঁয়ে যাচ্ছে ওর শরীর, ততবার কেমন উদ্বেগের যন্ত্রণায় শেষ হচ্ছে যেন।
আর ঠিক তক্ষুনি ওই উদ্বেগ আরো শতগুণ বাড়িয়ে দিলো সার্থ। পেছন থেকে ঝুঁকে এসেই চট করে গলার খাঁজে ঠোঁট বসিয়ে দিলো। একটা গভীর চুমুর স্পর্শে তুশির বুক ছলকায়,মুঠোতে শক্ত করে খামচে ধরে শাড়ির পাড়। সার্থ এই স্পর্শের রেশ বাড়াল না। সরে গেল,কিছু হয়নি এমন ভাব করে এসে বসল ফের সামনে। দুমুঠো পাথরের চুড়ি বের করে একটা একটা করে তুশির দুই হাতে পরাল। তুশি মানুষটাকে চিনতেই পারল না। মনে হলো ওর জন্ম হলো আজকে। আর চোখ ফেটে একটা নতুন পুরুষ দেখল সে। যে ওকে ভালোবাসতে চাইছে,চাইছে ওর যত্ন করতে।
সার্থ তখনই বলল,
“ চোখ বন্ধ করো।”
“ কী?”
“ চোখটা বন্ধ করো।”
“ কেন?”
ও চ সূচক শব্দ করল। তুশি জিভে ঠোঁট চুবিয়ে চোখটা বুজল হালকা। টের পেলো সার্থ নাকের ডগা ছুঁয়েছে। কিছু একটা রেখেছে সেখানে। পরপর জোরসে কিছু একটা সূচের মত বিঁধতেই আর্তনাদ করে উঠল ও,
“ আয়ায়া,মাগো…”
সার্থ দ্রুত হাত সরিয়ে ফেলল। তুশির চোখে জল জমে গেছে। নাক লাল হয়েছে একটু। ব্যথায় জায়গাটা ও ছুঁতেই পারল না। তবে যতটুকু বুঝল,সার্থ নাকফুল বসিয়েছে এখানে। তুশি দূর্বলের মত কিছুক্ষণ মাথা এলিয়ে রাখল পেছনে। সার্থ এইবার গুরুতর হলো। গাল ছুঁয়ে বলল – “বেশি লেগেছে?”
“ আপনি কী করতে চাইছেন বলুন তো! এসব গয়না গাটি,নাকফুল এগুলো পরাচ্ছেন কেন?”
“ নাকফুল না পরলে বউ বউ লাগে না। এই তো, এখন দেখেই মনে হচ্ছে তুমি আমার বউ। একদম মিসেস সার্থ আবরারের চিহ্ন পড়ে গেল।”
তুশি একটা তর্কে যেতে চাইছিল,কিন্তু শক্তিতে পারল না। চুপ করে বসে রইল তাই। সার্থ সবশেষে পাতলা জর্জেটের ওরনাটা বসিয়ে সিঁথি অবধি ঢেকে দিলো ওর। কপাল পর্যন্ত নামিয়ে এনে, বুক ভরে শ্বাস নিলো। ঠোঁটের কোণে স্বচ্ছ,নির্ভেজাল একটা পাতলা হাসি ঝুলিয়ে বলল,
“ ইউশা যেদিন প্রথম তোমাকে একটা লাল রঙের শাড়ি পরিয়ে আমাদের সবার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছিল, সেদিন আমি শুধু একবার তাকিয়েছিলাম। অথচ ওই একটু তাকানোতেই আমি সে রাত এক ফোঁটাও ঘুমোতে পারিনি।”
তুশি বিস্মিত হয়। শুধায় মৃদূ স্বরে,
“ ক-কেন?”
“ জানি না। জানলে বলব। তবে ঐদিনের কথা ভেবে বিয়ের সমস্ত জিনিস আমি লাল রঙের কিনতে বলেছিলাম। এখনো একটা বাকি আছে জানো!”
“ কী?”
উত্তর হিসেবে আলতার কৌটো হাতে নিতে দেখে তুশি আকাশ থেকে পড়ল এবার। সার্থ ওর একটা পা টেনে নিজের কোলে নিতেই আরো চমকে গেল মেয়েটা। তাকাল হতবিহ্বল চোখে। কিছু বলার আগেই পুরোটা পা আলতা দিয়ে ভরিয়ে ফেলল সার্থ। তুশি বোকার মত ফ্যালফ্যাল করে দেখে গেল সব। বউ সাজের এক তরুণীকে,শেরওয়ানি গায়ে জড়ানো আরেক পুরুষ নিজ হাতে পায়ে আলতা পরিয়ে দিচ্ছে। এই দৃশ্য সামনা-সামনি কত সুন্দর হবে কে জানে!

চলবে..
আপনারা অয়ন কী করবে, কী ভাবে দুই ভাইয়ের মারামারি হবে এসব নিয়ে এত অধৈর্য হচ্ছেন কেন? গল্পকে গল্পের তালে এগোতে দিন। যে সীনগুলোর জন্যে এতদিন আমাকে গালাগাল দিয়ে জ্বালিয়েছেন সেসব এখন এঞ্জয় করতে থাকুন। গল্পে ঝামেলা দিলেও সমস্যা,না দিলেও আপনাদের সমস্যা! আইছে বড়ো হুহ। … 😒

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply