Golpo romantic golpo কাছে আসার মৌসুম

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬৩.১


কাছেআসারমৌসুম!__(৬৩.১)

নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি

গাড়ি চলছে দ্বিগবিদিক উড়িয়ে। প্রচণ্ড বাতাসে কান-মাথা ধরে যাচ্ছে তুশির। সার্থ জানলার গ্লাস লাগাতে দিচ্ছে না। তার চেয়েও বড়ো কথা লাগাতে পারছে না ও। একটা হাত সার্থ ধরে রেখেছে,একেবারে আঙুলে আঙুল ডুবিয়ে এমন শক্ত করে ধরা,গোটা হাত নাড়ানোই দুষ্কর এখন!
তবে তুশির এসবে আগ্রহ কম। ওর বুকটা ধুকধুক করছে ভীষণ ভয়,আর চিন্তার তোড়ে। বিটকেলটা নিশ্চয়ই ওকে নিয়ে বাড়ি যাচ্ছে,ওখানে গিয়ে তুশি কী কী দেখবে কে জানে! আচ্ছা,অয়ন-ইউশার বিয়ে হয়েছে কি? দাদি কি স্টেশনে বসে আছে ওর জন্যে? আর বাড়ির সবাই; সবাই যখন জানবে ওর আর সার্থর বিয়ে হয়ে গেছে,কী বলবে; কী করবে? ভাবতে গিয়েই তুশির মাথা ফাঁকা হয়ে যায়। চিন্তায় হাঁসফাঁস করে। অথচ যার জন্যে এত কিছু তার এসবের উদ্বেগ আছে? নেই। সব মনোযোগ তার গাড়িতে,রাস্তায়,আর তুশির অবলা নরম হাতটার ওপর।
এক ফোঁটা নড়তেও দিচ্ছে না। তুশি বল খাটিয়ে ফের কব্জি মোচড়াল। অমনি চোখ রাঙিয়ে পাশ ফিরল সার্থ। চড়া কণ্ঠে বলল,
“ আর একবার হাতটা নড়লে,টেনে সোজা কোলে বসাব।”
তুশির চোখ বিকট হলো। ঘনঘন পাতা পড়ল তাতে। সার্থ বিস্ময়ে পাত্তা যখন দিলো না,অসহায়ের মতো মাথাটা ঘুরিয়ে নিলো জানলার বাইরে। হঠাৎ খেয়াল করল,রাস্তা ভিন্ন- অচেনা। এই রাস্তায় তো ও কোনোদিন যায়নি। সাগ্রহে জানলার ওপর আরো ঝুঁকে গেল মেয়েটা। এদিক-ওদিক চেয়ে দেখল ভালো করে। সাইনবোর্ড গুলো এত দ্রুত চলে যাচ্ছে,ভেঙে ভেঙে পড়তেও পারছে না।
শেষে অধৈর্য হয়ে বলল,
“ এটা তো বাড়ির রাস্তা নয়।”
“ বাড়িতে যাচ্ছি না।”
তুশি আকাশ থেকে পড়ল,
“ কোথায় যাচ্ছি তাহলে?”
সার্থ গাড়ির হুইল ঘুরিয়ে বলল,
“ হানিমুনে….
আঁতকে উঠল তুশি। হানিমুন মানে ও জানে…এ কথা তো ছোট বাচ্চাও বুঝবে। অমনি আর্তনাদ করে বলল,
“ কীইইইইই! কী বলছেন কী…. আপনার কি মাথা গেছে? পেয়েছেন টা কী আমাকে?……”
তুশি এত চ্যাঁচানো শুরু করল! সার্থ দুম করে স্টেরিও চালিয়ে দিলো গাড়ির। ইংরেজি ভাষার গানে, বাঁজ পড়ার মতো একেকটা শব্দে
তুশির চিৎকারটাও হারিয়ে গেল কোথাও!

হাসনা বসে আছেন চুপটি করে। চোখের সামনে সৈয়দ বাড়ির সবগুলো মানুষ হুটোপুটি করছে,ঘুরছে ছটফটে পায়ে। চিন্তায়,উৎকণ্ঠায়,হতাশায় দিশাহারা সবাই। কতক আত্মীয় স্বজন এসেছেন,অনেকে এসে পৌঁছাননি এখনো। তবে এমন গুরুতর পরিবেশের ফাঁক গলে বের হবার পথ পাচ্ছেন না তিনি। সাথে তুশি এত বড়ো একটা দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছে,ওটাও সাড়তে হবে।
ওদিকে রেহণূমা কেঁদেকেটে অস্থির। সকাল থেকে মেয়েকে খুঁজে পাচ্ছেন না কোথাও। দারোয়ান চাচা দেখেছেন তুশিকে একটা ব্যাগ নিয়ে বের হতে। কিন্তু কোথায় গেল মেয়েটা? হাসনাও নাকি কিছুই জানেন না। ব্যাপারটা নিয়ে দিকদিশা হারিয়েছে বাড়ির প্রতিটি মানুষ। শওকত, সাইফুল যেন কোথায় কোথায় ছুটেছেন। সাথে গিয়েছেন নাসীরও। রোকসানা মেয়ে নিয়ে বসে আছেন মায়ের পাশে। আইরিনের মুখে বিশেষ শব্দ নেই ঠিকই,কিন্তু ভেতর ভেতর বিরক্তিতে চৌচির সে। তুশির বিয়েটা আজ হয়ে গেলে ভালো হতো! সার্থ উপায় না পেয়ে অন্তত বেছে নিতো ওকেই। কিন্তু এই মেয়ে মনে হয় মরেও শান্তি দেবে না।
সবাই যখন উতলা- মরিয়া একেক রকম ভাবনায়, সেসময় সিঁড়ির নিচু ধাপটায় মাথা ঝুঁকিয়ে চুপ করে বসে আছে অয়ন। একটা কথাও মুখে নেই,নড়চড় নেই শরীরে। অয়ন জানে,তুশি এমনি এমনি হারায়নি। এর পেছন কেউ আছে! বিশেষ কেউ।
ও লাল টকটকে চোখদুটো তুলে ওপরের ঘরের দিকে চাইল আরেকবার। বাইরে থেকে মিন্তু ছুটে এলো তখন-ই। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“ মেজো ভাইয়া তো ঘরে নেই!”
এই কাছেপিঠে কোথাও একটা বাঁজ পড়ল বোধ হয়। প্রত্যেকেই বিস্ময়ে কেমন নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল। রেহণূমার কান্না থামল সাথে সাথে।
তনিমা বললেন,
“ ভালো করে দেখেছিস? দারোয়ান যে বলল, ও যায়নি কোথাও?”

“ হ্যাঁ। অয়ন ভাই যেভাবে বলল,আমি তো সেভাবেই সানসেট বেয়ে উঠলাম। জানলা থেকে দেখলাম। ঘর ফাঁকাই।”
জয়নব চোখ বুজে চ সূচক শব্দ করলেন। এবার নিশ্চিত দাঙ্গা বাঁধবে বাড়িতে। অথচ
দুপাশে মাথা নেড়ে হেসে ফেলল অয়ন। বলল,
“ বাহ! তাহলে মিলল আমার কথা? এবার কী বলবে তোমরা?”
জয়নবের মুখটা ছোটো হয়ে এলো। অয়নের সাথে একটু আগেই একটা তর্ক যুদ্ধ শেষ হয়েছে ওনার। তুশির এই বাড়ি থেকে গায়েব হওয়া নিয়ে অয়ন প্রথম তির ছুড়েছিল সার্থর দিকে। উনিই এতক্ষণ নাতির পক্ষ নিয়ে কথা বলেছিলেন। ওদিকে সার্থর ঘরের দরজা বন্ধ। লক করা! দেখে বোঝার উপায় নেই, ও ভেতরে না বাইরে। কেউ বের হতে দেখেনি। দারোয়ান নাকি সকাল থেকেই গেটে ছিলেন,অথচ দেখেননি তিনিও।
অনেকক্ষণ দরজা ধাক্কানোর পরেও যখন সার্থর সাড়া পাওয়া যায়নি,তখন বাইরে থেকে মই দিয়ে সানসেটে দাঁড়িয়ে দেখে এলো মিন্তু। সবার সব প্রশ্নের উত্তর এখানেই মিলল । রোকসানার মুখটা চুপসে গেল বেশি। এক পল আড়চোখে শাশুড়ী আর ননাশকে দেখলেন তিনি। শ্বশুর বাড়ি নিয়ে এলেন বিয়ে খেতে,কিন্তু আজ মান সম্মান তার ধূলোয় না মিশে থামবে না। প্রত্যেকের এই নীরবতা অয়নের সহ্য হয় না। উঠে দাঁড়ায়, চিৎকার করে বলে,
“ এখন সবাই বোবা হয়ে গেছ তাই না? কারো মুখে এখন আর কথা নেই কেন!’’
জয়নব বললেন,
“ আহ আস্তে,বাড়িতে মেহমান আছে দাদুভাই।”
“ থাকুক। দেখুক এ বাড়ির সো কল্ড বড়ো ছেলে কী করেছে। ছোটো ভাইয়ের হবু স্ত্রী নিয়ে ভেগে গেছে,দেখুক সবাই।”
আচমকা গুটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে থাকা ইউশার কনুইতে টান মেরে নিজের দিকে ফেরাল অয়ন। ছ্যাৎ করে উঠল মেয়েটার বুক। অয়ন ওর দুই হাতের মাংস খাবলে ধরে বলল,
“ অ্যাই, তুই সারাদিন তুশির সাথে থাকিস না? তাহলে ও কোথায় গেল দেখিসনি কেন? কেন ওকে চোখে চোখে রাখিস নি?”
“ আমি- আমি তো..”
“ কী আমি আমি? কী আমি আমি ইউশা? তোকে আমি বলিনি ওর খেয়াল রাখতে? বলিনি ইউশা? নাকি তুইও বাড়ির বাকিদের মতো আমাকে গোণায় ধরিস না। নাকি তুইও চাস তুশি ভাইয়ার হোক, তাই চাস তুই?”
ইউশার বুকের পাঁজর টনটন করে উঠল। টলমলে চোখে বলল,
“ অয়ন ভাই আমি…”
অয়ন শুনল না। ইউশার দুবাহু ছুড়ল সজোরে। কোটরে টইটম্বুর জল নয়ে পিছয়ে গেল মেয়েটা। আরো ভীষণ অনুতাপে পুড়ল তার বুক। এই সব কিছুর জন্যে ও দ্বায়ী। কেন ও তুশিকে জোর করেছিল বিয়ে করতে! তুশি নিশ্চয়ই পালিয়ে গেছে। মেজো ভাইয়ার বিরহ নিয়ে বাঁচবে,কিন্তু অন্য কারো হবে না বলে নিজেকে বরাবরের মতো লুকিয়ে নিয়েছে সে। ও জোর না করলে এসব কিছু হতো না। এখানে সব দোষ ওর,একমাত্র ওর।
রেহণুমা হাহাকার করে বললেন,
“ একবার মেয়েটাকে হারিয়েছিলাম,পেয়েছি কত বছর পরে। মেয়েটা আমার আবার হারালো? কোথায় গেল? সার্থর সাথে থাকলে জানাক আমাদের। আপা,ও আপা,সার্থকে আরেকটা ফোন করে দেখো না,যদি ফোনটা খোলে এখন। মেয়েটা ওর সাথে কিনা একটু শুনতাম আমি।”
মিন্তু বলল,
“ ভাইয়ার ফোনটা তো বিছানার ওপর দেখলাম, মা।” রেহণূমার কান্না বাড়ল আবার।
অয়ন ফোসফোস করে বলল,
“ আজ এখানে একটা রক্তারক্তি হবে। তুশিকে না পেলে আমি কাউকে ছাড়ব না।”
নাসীরের আম্মা বিরক্ত হলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করলেন,
“ কী বাড়িতে ছেলের বিয়ে করালাম! দুই ভাই এক মেয়ে নিয়ে কীসব করছে!”
রোকসানার মাথা নুইয়ে পড়ল লজ্জায়। মিনমিন করে বললেন,
“ এখনো তো কিছু প্রমাণ হয়নি মা। অয়ন বউ না পেয়ে একটু বেশি বেশি ভাবছে। সার্থ এরকম করবে না আমরা জানি। আপনি আগে ভাগে এরকম নিন্দে করলে হবে?”
নাসীরের বোন বললেন – আর যদি করে? তখন!”
রোকসানা মিইয়ে গেলেন। সত্যিই তো,যদি সার্থই কিছু করে থাকে তখন কাউকে মুখ দেখাবেন কী করে উনি? ধুর, দেশে আসাই ভুল হয়েছে।

“ কী ব্যাপার, বিয়ে বাড়ির এই অবস্থা কেন?”
হঠাৎ কথাটায় এক যোগে সদরের চৌকাঠ পানে ফিরে চাইল সবাই। স্যুট-প্যান্ট পরে রেডিশেডি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জামিল।
কপালে ভাঁজ নিয়ে বলল,
“ আমি কি একইরকম দেখতে কোনো ভুল বাড়িতে চলে এলাম? আজ না এখানে বিয়ে? আমাকে তো দাওয়াত দিয়েছিল।
কিন্তু সবার তো একই চেহারা। তাহলে এটাকে বিয়ে বাড়ি বিয়ে বাড়ি মনে হচ্ছে না কেন? মনে হচ্ছে শোকসভা চলছে। ওমা অয়ন,তোমার তো শেরওয়ানি পরে টিপটপ হয়ে বসে থাকার কথা। তোমার এমন পাগল পাগল চেহারা কেন ভাই?”
তনিমা উদ্বেগ নিয়ে বললেন,
“ জামিল,তুমি জানো সার্থ কোথায়?”
ও অবাক হয়ে বলল,
“ সার্থ! কেন আন্টি,ঘরে নেই?”
“ না। কখন যে বের হলো কেউ দেখিনি। ফোনটাও বন্ধ করে ঘরে রেখে গেছে।”
“ কী বলছেন!”
অয়ন হনহনে পা চালিয়ে জামিলের সামনে এসে দাঁড়াল। শক্ত গলায় শুধাল,
“ জামিল ভাই, সত্যি করে বলো,ভাইয়া কোথায়?”
“ কী তাজ্জব ব্যাপার! আমি এলাম বিয়ে খেতে,আর তোমরা দেখছি আমাকেই জেরা করছো। ”
“ তুমি আমার কথার উত্তর দাও।”
“ কী বলি বলো তো! ও আজ দুইদিন যাবত আমার সাথে যোগাযোগই তো করেনি। ফোন দিলেই, ব্যস্ত আছি বলে কেটে দিয়েছে। আঙ্কেল দাওয়াত না করলে,আমিত তোমার বিয়েও মিস করে ফেলতাম। কিন্তু ওর খোঁজ কেন অয়ন? আচ্ছা, বিয়ে কি শেষ? আমার কি আসতে দেরি হলো?”
মিন্তু মুখ কালো করে বলল,
“ আমার তুশিপুকে পাওয়া যাচ্ছে না।”
মাথায় যেন বাঁজ পড়ল জামিলের। আর্তনাদ করে বলল,
“ সে কী! সর্বনাশ। থানায় ডায়েরি করেছেন আন্টি? ওর ফোন নেই? কল করেছেন?’’
“ তোমার আঙ্কেল গিয়েছেন। জানি না কী হবে? কোথায় পাব মেয়েটাকে? ছোটোর দিকে তো তাকানোও যাচ্ছে না।”
জামিলের চোখমুখ শুকিয়ে গেল দুশ্চিন্তায়। তার এই কেমন কেমন করা দেখে অয়নের ভ্রু গুছিয়ে এলো একটু। ভাইয়া তুশিকে নিয়ে কোথাও গেলে,জামিল ভাই জানতো! জানতোই। কিন্তু ওনার মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে না কিছু জানে!
মহাদ্বন্দ্বে ভুগল ছেলেটা।
জামিল তখনই বলল,
“ অয়ন,চলো বসে না থেকে আমরা বরং খুঁজতে বের হই। বিপদ আপদের কথা বলা যায় না।”

অয়ন পুরোপুরি নিশ্চিত হলো জামিল কিছু জানে না। এর মানে তুশি কি স্বেচ্ছায় পালাল? ওর ভেতরটা নড়বড়ে হলো আরো। উদ্বীগ্ন চিত্তে বলল,
“ আমি আমার ফোন নিয়ে আসছি।”
“ গাড়িতে আছি আমি,তুমি এসো।”
অয়ন ছুটল দোতলার দিকে। ইউশার মলিন,বিষণ্ণ মুখটায় এক পল চেয়ে বেরিয়ে এলো জামিল। নিরাপদ দুরুত্বে এসে তাড়াহুড়ো করে পকেট হাতিয়ে ফোন বের করল।

লনে গাড়ি ভিড়েছে অনেকক্ষণ। কিন্তু তুশি নামছে না। তুলোর মত নরম শরীর সিটের সাথে শক্ত হয়ে আছে। সার্থ বুঝল ওর ব্যাপারটা। হাসল ঠোঁট কামড়ে। জানলায় ঝুঁকে এসে বলল,
“ নামবে না?”
“ কোথায় এনেছেন আমাকে?”
“ ভয় পাচ্ছো?”
“ ভয় পাব কেন?”
“ তাহলে নামছো না কেন?”
ভাবের সম্মান বাঁচাতে নামল তুশি। অসহায় চোখে একবার দেখল চারিপাশ। এই জায়গা ও বাপের জন্মেও দেখেনি। জিজ্ঞেস করল,
“ এটা কোথায়? কার বাসা এটা?”
“ জামিলের নতুন ফ্ল্যাট। আমরা এখানে কিছু দিন থাকব।”
তুশির চোখ বেরিয়ে এলো,
“ কিছু দিন! আমি আর আপনি একা?”
“ দুজন একা হয়?”
“ এখানে থাকব কেন? বাড়িতে কেন যাব না?”
সার্থ সোজাসুজি বলে,
“ বাড়িতে অনেক লোক। রোমান্সে অসুবিধে হবে।”
তুশির কানদুটো গরম হয়ে গেল। এক চোট লজ্জায় পাক খেল মাথাটা। ওপাশ থেকে অচেনা ভদ্রলোক ছুটে এলেন তখনই। জিজ্ঞেস করলেন,
“ মিস্টার সার্থ আবরার?”
“ হ্যাঁ।”
“ আসুন। লিফট এদিকে…”
“ পেছনে ব্যাগ আছে।”
“জি, রুমে পৌঁছে দিচ্ছি। আপনারা এগোন। এটা দরজার চাবি।”
সার্থ তুশির হাত ধরে লিফটে উঠে গেল। দরজা বন্ধ হতেই স্ক্রিনে লাল রঙে ভেসে থাকা 12 লেখার দিকে একবার দেখল তুশি। পরপর মাথায় এলো,এই বদ্ধ জায়গায় ও আর সার্থ ছাড়া কেউ নেই। চারদিক গুমোট,আটকানো। নিঃশ্বাসও শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। তুশি গুটিয়ে দাঁড়াল এক কোণে। দুরুত্ব রাখল দুজনের। রীতিমতো এক পাশ হয়ে পিঠটা ফিরিয়ে দিলো সার্থর দিকে।
লিফটের দরজা খুলল সেসময়। সার্থ বের হতে হতে বলল,
“ সার্থ আবরার প্লেস বুঝে কাজ করে,তুশি। যেখানে সেখানে শুরু হয়ে যায় না। চিইল!”
তুশি লজ্জায় চৌচির হয়ে গেল। মিনমিন করে বলল,
“ আমি কিছু বলেছি?”
“ আসামির চোখ দেখে বুঝতে পারি! সেখানে তুমি আমার বউ, তোমারটা বুঝব না?”
সার্থ ব্যস্ত হলো তালা খুলতে। অথচ তুশির পিঠ বেয়ে ভীষণ ঠান্ডা একটা স্রোত নেমে গেল। তুলতুলে ভালো লাগায় ভিজল তার বুক।
যেদিন সার্থ বাড়ির সবার সামনে প্রথম বলেছিল , তুশি আমার স্ত্রী! ঠিক তেমনই এক অনুভূতির তোড়ে আজকেও অন্তঃপটে একটা গাঢ় বুদবুদ টের পেলো ও।
কিন্তু পরপরই চিবুক কঠিন করল মেয়েটা। না,এত সহজে ও গলবে না। কিছু ভুলবে না, কিছু না।
ফ্ল্যাটের দরজা ঠেলতেই ভেতর থেকে ফ্রেশনারের সুবাস ছুটে এলো নাকে। খুব গোছানো,ছিমছাম সব। জামিল লোক দিয়ে গোটা ফ্ল্যাটই চকচকে করে রেখেছে। সার্থ ভেতরে ঢুকল আগে। তারপর এক টান মেরে নিয়ে গেল ওকেও। ধড়াম করে দোর চাপাল,সাথে চট করে মেয়েটার এক হাত মাথার ওপরে চেপে পিঠ সহ আস্ত শরীরটা ঠেসে ধরল ওই বন্ধ দরজার কাঠে। দ্রুততম ব্যাপারটায় তুশি হকচকাল খুব! স্পষ্ট করে তাকানোর আগেই সার্থর মুখটা নেমে এলো ওর কপালের কাছে। হুটহাট এই নৈকট্যের তোপে শ্বাসনালীতে দম আটকে গেল তুশির।
সার্থ একবার চোখ ঘুরিয়ে তুশির সারামুখ দেখল। দেখলই শুধু! ঘোর ঐ চোখে। কেবলই নেশার বৃষ্টি। দৃষ্টি ছাপানো অপরূপ ধাধিয়ে যাওয়া মোহ নিয়ে বলল,
“ আল্লাহর সৃষ্টি কত সুন্দর, জানো?”
তুশির গলা শুকনো। জড়িয়ে এলো শব্দরা,
“ ক-কী দেখে ব-বললেন!”
সার্থ চাউনি আরো ধারালো হলো। খাদে নামল কণ্ঠস্বর,
“ এই যে,আমার ব্যক্তিগত চোর।”
প্রশংসায় খুশি হওয়ার কথা ছিল বোধ হয়, অথচ ঠোঁট টেনে হেসে ফেলল তুশি। বিদ্রুপ করে বলল,
“ হঠাৎ আমার প্রতি এত গলে যাওয়ার কারণ?”
প্রশ্নের উত্তর এলো না। তুশি রেগেমেগে বলল,
“ এখন কথা বলছেন না কেন? ঠিক জায়গায় খোঁচা লাগলেই চুপ করে যাচ্ছেন।”
“ রাগ হচ্ছে?”
“ রাগ! আমি রাগ করার কে? যে আমাকে বোঝেই না তার ওপর রাগ মানে তো সময় নষ্ট।”
“ আমি তোমাকে বুঝি না?”
সার্থর স্বর ছোটো।
তুশি বলল,
“ নাহ!”
“ এজন্যেই অয়নকে বিয়ে করবে বলেছিলে?”
তুশি খিটখিটে গলায় বলল,
“ আমার মন চেয়েছিল, তাই বলেছিলাম।”
“ তাহলে পালাচ্ছিলে কেন? কার জন্যে?”
তুশি জবাব দিতে পারল না। অন্য কোথাও দৃষ্টি ফেলে রাখল। সার্থ নিজেই বলল,
“ আমি কী বুঝি না, তুশি? কীভাবে বুঝি না?
আমার তো মনে হয়, আমার মতো করে তোমাকে কেউ বুঝবেই না! তোমার এই ঠোঁট দুটো নড়লেও আমি বলতে পারব ,তুমি কী চাইছো! তোমার তাকানো দেখলে আমি বুঝব, তোমার কী ভালো লাগছে!
তোমার চুপ হয়ে থাকা,তোমার দীর্ঘশ্বাস সব আমার চেনা তুশি। তোমার অনুভূতি,তোমার রাগ,আনন্দ,হাসি,তোমার চাউনি সব আমার পরিচিত। আমি সব বুঝি তুশি, আমি বুঝি তোমাকে!”
“ আর অপেক্ষা? আপনি আমার অপেক্ষা বোঝেন? তীব্র অভিমানে আমার মুখ ফিরিয়ে নেয়ার পরেও, ভেতর ভেতর কারো জন্যে আমার চোখ ভরতি প্রতীক্ষা কেমন হয় জানেন আপনি?”
“ জানি না?”
তুশির কণ্ঠ ভিজে এলো,
“ না। কিচ্ছু জানেন না।
আচ্ছা, অতীতের সব নাহয় ভুলে গেলাম,কিন্তু মানুষ তো বাড়িতে একটা কুকুর পুষলেও সে যখন অসুস্থ হয়,তাকে নিয়ে ভাবে,কষ্ট পায়,যত্ন করে। আর আমি? আমি তার চেয়েও অধম বলেই আমার অসুস্থতায়ও আপনার কিছু যায় এলো না। কী করে পারলেন,আমাকে হাসপাতালে ফেলে চলে যেতে? একবার দেখতেও এলেন না। আমি বেঁচে থাকি,মরে যাই তাতে আপনার কী? কিছু জানতেও চাইলেন না, খোঁজ নিলেন না আমার। তাহলে এখন এত ভালোবাসা কেন? কীসের এত প্রেম!”
সার্থ নিঃশব্দে চেয়ে রইল দু পল। পরপর মুচকি হেসে দীর্ঘশ্বাস ফেলল একটা। খুব আস্তে বলল,
“ ওহ!”
তুশির মেজাজ চটে যায়। সার্থর বুকে দুহাত রেখে ধাক্কা দেয় জোরে।
ক্রোধে নিঃশেষ হয়ে বলে,
“ সরুন আমার থেকে।”
ছেলেটার বুকের ক্ষত-য় হাত পড়ল। প্রচণ্ড ব্যথায় চোখ-মুখ খিচে নিলো অমনি। ‘’ উফ” বলে ছোট্ট একটু আর্তনাদ করতেই হকচকিয়ে গেল তুশি। ভড়কে বলল,
“ ক-কী হলো?”
শান্ত চোখ মেলে চাইল মানুষটা। মৃদূ হেসে
মাথা নাড়ল দুপাশে। বোঝাল- কিছু না।
তুশি উদগ্রীব হয়ে চেয়ে রইল তাও। তক্ষুনি শরীরের খুব কাছে চলে এলো সার্থ। বন্ধ হলো বাতাস যাওয়ার জায়গা। তুশির পিঠ দরজায় লেগে যায়। মাথাটা শক্ত হয় সহসা।
ছোট্ট দেহ পুরুষালি দুই-হাতের মাঝে আটকে যেতেই,হাঁসফাঁস করে তাকাল সে।
সার্থ খুব স্বাভাবিক চোখে বলল,
“ তোমার কথা শেষ নিশ্চয়ই? শোনো,
আমাকে যা বলার বলো,শুনব সব। তোমার বকবক শোনার জন্যে যতটা ধৈর্য দরকার,সব আমি রপ্ত করে ফেলেছি। কিন্তু ওসব মান অভিমানের পাল্লায় আমি আর পড়ছি না। ইগো দেখিয়ে,জেদ করে রেগেমেগে দূরেও যাচ্ছি না। বরং আমি এখন থেকে তোমার খুব কাছে থাকব! এতটা কাছে, যতটা তোমার গায়ের ওরনাও নেই! যতটা কাছে তোমার শরীরের লোমকূপও নেই।”
তুশি হতভম্ব হয়ে বলল,
“ কীহ!”
“ ইয়েস… বিশ্বাস হচ্ছে না? প্রুফ দেবো?”
তুশি কিছু বলার আগেই,সার্থর হাতটা চট করে ওর ঘাড়ের বাঁকে ঢুকল। চুলের ভাঁজ ছুঁয়ে শক্ত করে ধরল সেখানটা। পরপর মুখটা টেনে আনল নিজের কাছে। গরম শ্বাসের ছোঁয়ায় তুশি চোখ বুজে ফেলল। বুকের ভেতর সেই বাঁজ পড়ার ধুক ধুক শব্দটা শুরু হলো আবার। সার্থ কেমন ফিসফিস করে ডাকে,
“ তুশিইইইই!”
মেয়েটার সমস্ত শরীর শিউরে ওঠে। এলোমেলো হয় সব। প্রিয় পুরুষ এত কাছাকাছি আসাতে, থিতিয়ে যায় বুকের তাল।
সার্থ ফের ডাকল আদুরে গলায়,
“ তুশিইইইইইই….”
তুশির পায়ের তলা অবধি শিরশির করছে। চোখটা বন্ধ। কোনোরকম বলল – “ক-কী?”
সার্থ আরো কাছে আসে,আরো। মেয়েলি শরীরে মেশায় স্বীয় শরীর। ডাকে ফের মাদকের সুরে,
“ আমার তুশিইইইই…”
তুশির বুকের বা পাশে একটা কোপ পড়ল ঐ ডাকে। খুইয়ে গেল,খেই হারাল সে। ঠোঁট আর গলার নরম ভাঁজে আছড়ে পড়া শ্বাস,বলিষ্ঠ দেহের উত্তাপ মিলিয়ে মরে যাচ্ছে যেন। সার্থর নরম ঠোঁটে তার ঠোঁটে মিশে যাওয়ার বোধ হয় আর বেশি দেরি নেই। এইতো,ভীষণ ছুঁইছুঁই ভাব। মানুষটা ওকে চুমু খাবে? সেদিনের মতো করে! তুশি কী স্বায় দেবে,নাকি ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেবে? দোটানায় ভুগতে থাকা মেয়েটা সিদ্ধান্তে যেতে পারল না। পূর্বেই কানে এলো সেই সেতারের ধ্বনি ; ডাকছে ফের,
“ তুশিইইইইইই….”
“ হ-হু?”
“ কফি বানাতে পারো?”
তুশি ভ্যাবাচেকা খায়,তড়াক করে চোখ মেলে বলে,
“ হ্যাঁ?”
সার্থ ছেড়ে দেয় ঘাড়। সরে যায় অমনি। উল্টোঘুরে ইউনিফর্মের বোতাম খুলতে খুলতে বলল, “ আমার জন্যে এক কাপ কফি,এক চামচ চিনি দিয়ে। যাও…”
তুশি আশ্চর্য হয়ে চেয়ে রইল। পরপর লজ্জায় নুইয়ে পড়ল দুনিয়া। ইস,ও কী ভাবছিল! ইস ইস ইস….
সার্থ ইউনিফর্ম পুরোপুরি খুলেছে৷ খালি গায়ে তুশির চোখ পড়ল সরাসরি ওর ব্যান্ডেজের ওপর। সফেদ রঙে এখনো রক্ত ভেসে আছে। আঁতকে উঠল মেয়েটা। চিৎকার ছুড়ল সজোরে,
“ আল্লাহ,এ কী! কী হয়েছে?”
হঠাৎ নিনাদে ভড়কে ফিরে চাইল সার্থ। বুকের ব্যান্ডেজটাও এবার দেখল তুশি। মাথায় আকাশ ভাঙল যেন। মরিয়া হয়ে ছুটে এলো কাছে। অস্থির হয়ে বলল,
“ আল্লাহ! আল্লাহ, এ কী বুকেও তো।”
বুকের ব্যান্ডেজে আঙুল ছোঁয়ায় সে। উৎকণ্ঠিত হয়ে বলে,
“ কী হয়েছে আপনার? কেটেছে কীভাবে?”
সার্থ অবাক হয় একটু।
“ তুমি জানতে না?”
“ কী জানব?”
“ কেউ বলেনি কিছু?”
“ কী বলবে?”
সার্থ জিভে ঠোঁট ভেজাল। শ্বাস ফেলল ছোট্ট। বলল,
“ আমার মাথাটা ব্যথা করছে। কফি খাই?”
তুশির মনোযোগ এই কাটাছেঁড়ার ওপর। অল্পতেই চোখ ভিজে গেল জলে। উতলা হয়ে বলল,
“ আগে বলুন এসব কী করে হল? এভাবে কাটল,রক্ত কেন? আল্লাহ,ব্যথা করছে না?”
“ করছে।”
“ তাহলে তো কষ্ট হচ্ছে আপনার! কী করলে কমবে?
“ তুমি কি ব্যথা কমাতে চাও?”
“ চাই,চাই তো। কী করলে কমবে বলুন? কী ওষুধ লাগাব? ”
“ ওষুধ দরকার নেই।
শুধু আমি কাছে গেলে ছটফট করবে না। তাহলে তোমাকে জোর করতে হয়, আরো বেশি ব্যথা লাগে।”
তুশির মুখটা কাঠ হয়ে গেল। টলটলে দৃষ্টি নিয়ে বলল,
“ আপনি ইয়ার্কি করছেন?”
“ হ্যাঁ। কাঁদছো কেন? আমি তো এখন ঠিক আছি।”
“ কে বলল আপনার জন্যে কাঁদছি?”
“ তবে,অয়নের জন্য?”
তুশির নাক ফুঁসে ওঠে,
“ আবার?
আমি ভালো কফি বানাতে পারি না। সেজন্যে কাঁদছি।”
হেসে ফেলল সার্থ।
বলল না কিছু। ইউনিফর্ম পালটে শার্ট পরল গায়ে। পুরোটা সময় চেয়ে রইল তুশি। মায়ায় বুক খসে যাচ্ছে তার। সকাল থেকে ওকে সামলাতে সার্থর কম খাটতে হয়নি। এই শরীর নিয়ে আবার ওকে সমেত সিঁড়ি বেয়েও উঠেছিল? একটু আগে অত জোরে ধাক্কা দিয়েছে। এজন্যেই উনি অমন করেছিলেন? ইস!
সার্থ ঘাড় ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ চেঞ্জ করবে না? ব্যাগে তোমার কাপড় আছে,দেখো কোনটা পরবে!”
“ আমার কাপড়?”
“ জামিলকে দিয়ে কিনিয়েছিলাম।”
“ আবার?”
সার্থ আর উত্তর দিলো না। তুশি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পরনের জামা পালটানো দরকার। কাল থেকেই তো এটা পরে আছে। ও লাগেজ খুলল বাধ্য হয়ে। হাতের কাছে যা পেলো, তুলল তাই। ওয়াশরুমের দিকে যেতে নিলেই সার্থ বলল,
“ ওখানে লাইট নেই। রুমে চেঞ্জ করো।”
তুশি দাঁড়িয়ে রইল চুপ করে।
ও বলল,
“ কী? চেঞ্জ করো।”
মেয়েটা তাজ্জব হয়ে বলল
“ তো আপনি বাইরে যাবেন না?”
সার্থ অবাক হয়ে বলল,
“ বাইরে! আমি কেন বাইরে যাব?
চেঞ্জ আমার সামনেই করো।”
তুশি চিৎকার করে ওঠে,
“ কীইই?”
“ উফ! চ্যাঁচাচ্ছো কেন?
আমরা স্বামী-স্ত্রী না? তুমি চেঞ্জ করলে আমি দেখব,আমি চেঞ্জ করলে তুমি দেখবে একেই তো ইকুইলিটি বলে!”
তুশির সারামুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। চোখ দুটো খিচে দুম করে কাপড় গুলো সোফায় ছুড়ে মারল সোফায়। ছুটে বের হতে নিল,ভূতের মতো এসে পথরোধ করে দাঁড়াল সার্থ। একটু চমকে গেল মেয়েটা।
ও ভ্রু নাঁচিয়ে বলল –
“ কোথায় যাওয়া হচ্ছে!”
“ রা-রান্নাঘরে।”
“ উহু,এই রুম থেকে তো বের হওয়া যাবে না।”
তুশি নির্বোধ বনে বলল,
“ কেন?”
সার্থ কী যেন ভাবল। তুশির হাতটা খপ করে ধরল এক হাতে। আরেক হাতে চাবি নিয়ে বাইরের ঘরে এলো। ফ্ল্যাটের সদর দোর লক করল আগে। একবার টেনে দেখল খোলা যাবে কিনা। বলল,
“ এটা সেফ। কিন্তু তাও তোমাকে বিশ্বাস নেই। জানলা ভেঙে পালাতে পারো।”
তুশি মেজাজ খারাপ করে বলল ,
“ আমি কি ডাকাত? জানলা ভেঙে পালাব কেন?”
“ এত কথার দরকার নেই। যা লাগবে,রুমে। যা হবে,রুমে। যা করব,রুমে। আপাতত রুমের বাইরে যাবে না। বারান্দাতেও না। পালানোর ফন্দি করে লাভ নেই তুশি। আমি যখন ধরেছি,এই ধরা ছাই দিয়ে মাছ ধরার মতো। আমি যতক্ষণ না মরব, তুমি রেহাই পাওয়ার কথা ভুলে যাও।”
তুশি বুঝতে পারল না ও কী বলবে! ক্লান্ত চোখ মেলে চেয়ে রইল শুধু। আজ প্রতি মূহুর্তে একটা নতুন সার্থকে দেখছে ও। আবিষ্কার করছে একজন নতুন মানুষ। কিন্তু ছাড়া পেতে কে চায়? তুশি তো চায়নি। ও তো থাকতে চেয়েছিল। বরং সার্থ নিজেই ছেড়েছিল ওকে। তাহলে এই হঠাৎ উদয় হওয়া প্রেম এলো কেন?
সার্থ ঘরে এসে দরজা আটকে দিলো। দুটো ছিটকিনিই তুলল,আবার লকটাও টিপল সাথে। তুশি ফোস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ এখন কফিটা কী দিয়ে বানাব শুনি?”
রুমের কর্ণারের দিকে ভ্রু দিয়ে ইশারা করল সার্থ। তুশি চেয়ে দেখল ওখানে একটা টেবিল,কেতলি আর চা-কফির সব জিনিসপত্র রাখা। অথচ সে এতক্ষণ খেয়ালই করেনি? মেয়েটা ভদ্রের ন্যায় এগোলো সেদিকে।
সার্থ ঘরের সব জানলা বন্ধ করে দেয়। আটকে দেয় বারান্দার দরজাটাও। মোটা,ভারি পর্দাগুলোও মেলে মেলে রাখে। এমনিই সন্ধ্যের শেষ , ঘর আরো অন্ধকার হয়ে গেল এতে। তুশি বলল,
“ এমা,অন্ধকারে কাজ করব কী করে?”
সার্থ কোথায় বোঝা গেল না। উত্তর দিলো সাথে সাথে,
“ পৃথিবীর সবথেকে জরুরি কাজ,অন্ধকারেই হয়!”
তুশি রেগেমেগে বলল,
“ আপনি আলো জ্বালাবেন?”
আলো জ্বলেনি। তবে চট আগুন ধরল লাইটারে। সেই আলোয় ভেসে উঠল সার্থর পোক্ত হলদে মুখটা। তুশির ভেতর সুদ্ধ নড়ে ওঠে। দোলে ভীষণ শব্দে। চট করে মাথা নুইয়ে নেয় সে। বড়ো থাই গ্লাসের জানলার দুপাশের কর্ণারে বসানো দুটো টেবিলে, বড়ো বড়ো দুখানা ক্যান্ডেল সেট ছিল। প্রত্যেকটাতে ৬টা রঙিন মোম বসানো। সার্থ লাইটার দিয়ে সুনিপুন হাতে প্রত্যেকটা মোম এক এক করে জ্বালায়। একেকটি মোমের আলো যেন তুশির গায়ে উড়ে এসে লাগা একেকটি কুণ্ঠার খোঁচা। ঘরে আর অন্ধকার নেই। মোমের আলোয় চারিপাশ ছেঁয়ে গেছে। সার্থ শেষ মোম ধরানোর সময় ঘাড় বাঁকা করে এক পল চাইল তুশির পানে। ঐ ক্ষুরধার দৃষ্টিতে মেয়েটার পিঠের হাড় ছুঁয়ে কিছু একটা নেমে গেল অমনি। ঢোক গিলে ফের চিবুক নামিয়ে নিলো গলায়। কী করতে চাইছেন উনি? তুশি রেগে আছে বুঝেও, জোর করবে বুঝি?
মেয়েটা খুব টেনেহিঁচড়ে মনোযোগ চায়ের কাপে ফেলল। হাতগুলো কাঁপছে। সার্থ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কাউচে বসে টেলিভিশন ছাড়ল। ঘরে থাকা টেলিফোনটা বাজল তক্ষুনি। টেবিল পাশে হওয়ায় হাত বাড়িয়ে রিসিভার তুলে এনে কানে ধরল সার্থ।
“ হ্যাঁ বল।”
“ কী করে বুঝলি, আমি ফোন করেছি!”
“ এখানে তুই ছাড়া আমাকে কে খুঁজবে?”
“ তাও ঠিক। শোন না, অয়ন তো তোকে সন্দেহ করছে।”
“ আমার ভাই, একটু বুদ্ধি তো থাকা উচিত।”
“ আমি এখন ওকে নিয়ে তুশিকে খুঁজতে যাচ্ছি।”
“ কোথায় যাবি?”
“ ভাবছি মাওয়া টাওয়া ঘুরে আসব। যদি ভুলিয়ে ভালিয়ে ইলিশ খাইয়ে দিই, মাছের ডিম খেয়ে তুশিকে ভুলে যেতেও পারে। ভালো বুদ্ধি না?”
“ বাকিদের কী অবস্থা?”
“ আঙ্কেলরা কেউ নেই। তুশির মা কাঁদছে,আর তোর মা তোর জন্যে খুন্তি রেডি করছে। এলেই পেছনে সপাৎ সপাৎ বাড়ি মারবে।”
“ যত্তসব বাজে কথা!”
জামিল হাসল। পরপরই,
ফিসফিস করে বলল,
“ তুশি কি নরমাল হয়েছে?”
“ এখনো না।”
“ শোন, তুই কিন্তু এখন ওর কাছে সিনেমার ভিলেন। বিয়েতে জোর করলেও,আর কিছুতে জোর করিস না। পরে সংলাপ শুনিয়ে দেবে,শয়তান তুই আমার দেহ পাবি কিন্তু মন পাবি না।”
সার্থ রিসিভার বাম কান থেকে ডান কানে আনল। ঠান্ডা চোখ ফেলে রাখল অদূরের কাজে ব্যস্ত তুশির দিকে।
বলল,
“ মন তো আরো আগে দিয়েছে। এখন যা বাকি,সেটা আমি নিজেই নিয়ে নেব।”

জিভ কাটল জামিল। হতভম্ব সে। সার্থ লাইন কেটে দিয়েছে। ও ফোনের দিকে চেয়ে হতাশ গলায় বলল,
“ বিয়ে হতেই ছেলেটার মাথা খারাপ হয়ে গেল?”

চলবে…
শব্দসংখ্যা এক পর্বে কূলাতে পারিনি। তাই ভেঙে ভেঙে দিলাম। আর,
আমি এমনিই অনিয়মিত জানি। কিন্তু রমজানে আরো অনিয়মিতই থাকব। আমার শরীর-মাথা স্বায় দিচ্ছে না। আগের মত নিজেকে প্রেসারও দিই না। এটুকুই! এর পেছনে আর কোনো ব্যাখা নেই,যুক্তি নেই। সবার রমজান সুন্দর কাটুক! ভালোবাসা❤️

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply