কাছেআসারমৌসুম!__(৬২)
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
তুশির বিস্ময় দেখার সময় সার্থর নেই। হাবভাবে বোঝা গেল, এখন ভারি ব্যস্ত সে। কেমন দুমদাম শব্দ করে গাড়ি থেকে টেনে নামাল ওকে। কোলে নিতে গেলেই ‘’ হুহুহু” করে দুপাশে মাথা ঝাঁকায় তুশি। চোখ রাঙায় সাথে। কড়া নজরে বারণ করে ছুঁতে। হ্যান্ডকাফে আটকানো হাতদুটোও টেনেহিঁচড়ে খোলার চেষ্টা করল তুশি। পিছিয়ে গেল কয়েকবার। এদিকে আশেপাশের লোকজন যারা ছিলেন,সব হাঁ করে আছে। একে পুলিশের লোক,সাথে মেয়ে একটা এমন হাত-মুখ আটকানো,এ নিয়ে ভীষণ উৎসুক তারা। সার্থ এখানে সময় নষ্ট করতে চাইল না। ওপর তলায় তার অনেক কাজ।
সে চট করে তুশির ক্ষুদ্র শরীরটা এক পাশের কাঁধে তুলে ফেলল। একটু টান পড়ল পিঠের ক্ষত-য়। কিন্তু পা জোড়া থামল না। এদিকে চমকে,থমকে মাটিতে মিশে গেল তুশি। মুখের সাথে মাথাটাও সার্থর পিঠ অবধি ঝুঁকে গেল ওর। দুটো আটকে থাকা হাত দিয়ে চেষ্টা করল সেখানে কিল-ঘুষি মারতে। পা ছুড়ল কতবার। কাজী অফিস দুই তলায়। সার্থ মেয়েটাকে কাঁধে বস্তার মতো নিয়েই আরামসে সিঁড়ি বেয়ে ওঠে। পুরোটা সময় ছাড়া পাওয়ার তাগিদে তুশু হুউউউহুউউউ করল। কিন্তু ওর আপত্তি,ছটফটানো সার্থ কানে নিলে তো!
কাজী অফিসটা বড়োসড়ো। শরিফের চেনা লোক! সব বন্দোবস্ত উনিই করেছেন। এই ভোর ভোর নাহলে কাজী পাওয়া যেত না! সার্থ তুশিকে ঘাড়ে নিয়ে ঢুকতেই ভেতরের লোকজন তব্দা খেয়ে গেল।
ঘাড় থেকে টেবিলের ওপর ব্যাগ নামালে যেমন ঝুপ করে শব্দ হয়,ঠিক অমন করে ওকে নরম সোফার ওপর ছুড়ে ফেলল সার্থ। অপ্রস্তুতিতে তুশির মাথাটা গিয়ে লাগল ফোমের সাথে। আরো হেলে পড়ল মেয়েটা।
সঙ্গে সঙ্গে আর্তনাদ করে বলল কেউ,
“ এ কীইইই! তুই বউ এনেছিস না আসামী? কী অবস্থা ওর?”
তুশির চুল খুলে একাকার অবস্থা। সব এসে মুখ ঢেকে গেছে। কে কথা বলল,দেখার জন্যে তাকালেও তেমন কিছু বোঝা গেল না। ওর পাশে কিছু প্যাকেট-স্যাকেট রাখা। ওপর থেকে বিয়ের বেনারসি মতো কিছু একটা দেখল শুধু।
সার্থ তক্ষুনি এসে বসল পাশে। নিজেই তুশির ওই এলোমেলো চুলগুলো দুহাত দিয়ে সরিয়ে দুপাশের কানে গুঁজে দিলো। অল্প শীতল স্পর্শে একটু থামল মেয়েটা। বুকখানা ধকধক শব্দ তুলল অমনি। কিন্তু সার্থকে দেখে মনে হলো,বেজায় বিরক্ত সে। ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“ কী? কী লাগবে?”
তুশি চোখ পাঁকায়,ইশারা করে হাতের দিকে। ও বলল,
“ বিয়ে হোক,তারপর। নাউ শাট আপ!”
এতক্ষণে তুশির নজর পড়ল বাকিদের দিকে। লোকজন কম নেই এখানে। কিন্তু ওর ভ্রু কপালে উঠল জামিলকে দেখে। চোখাচোখি হতেই ছেলেটা মাথা নাঁচিয়ে বলল
“ হ্যালো তুশি, ভালো আছো? ওহ সরি,পাঠাটা তোমাকে এভাবে অত্যাচার করছে ভালো থাকবেও বা কী করে! আসলে ওর অত্যাচার থেকে আমরাও মুক্ত নই। এই সাত-সকালে কেমন ঘুম থেকে ডেকে আনল দেখেছ? যাক গে,এসব দুঃখ নিয়ে আমরা পরে কথা বলব।”
তুশির মুখ বন্দি থাকায় উত্তর দিতে পারল না। মাথা ঘুরিয়ে জামিলের পাশে তাকাল। অমনি হাত তুলে সালাম দিলেন শরিফ। ভদ্রলোকের গায়ে পাঞ্জাবি। হেসে হেসে বললেন,
“ ম্যাডাম, আসসালামু আলাইকুম।”
পাশের মহিলাকে দেখিয়ে বললেন,
“ আমার ওয়াইফ,লিনা।
তারপাশের জন – আমার শালীকা।
আজকে আমরা সবাই আপনাদের বিয়েতে সাক্ষি দেব ম্যাডাম।”
সবাই তুশিকে সালাম দেয়,হাসে। কিন্তু মেয়েটা শুধু বিস্ময়ে তাজ্জব হয়ে রইল। বিটকেলটা যে আটঘাট বেঁধে নেমেছে,বুঝতে বাকি নেই।
সার্থ বলল তখনই,
“ সব রেডি জামিল?”
“ হ্যাঁ রে, ভাই। মৌলভি সাহেবকে সব বুঝিয়ে দিয়েছি। তুশির বার্থ সার্টিফিকেটটা জমা করলেই হবে। আর , ও কী এভাবে বিয়েতে বসবে নাকি! খুলে দে এসব।”
“ নাহ,ভেজাল করবে। চোরটার হাত পা চলে খুব।”
তুশি নাক ফুলিয়ে রইল। শরিফ বললেন,
“ তাহলে স্যার,শাড়ি গয়না… যা কিনলেন! ওগুলো পরবে না?”
“ বিয়ের পর।
বিয়ের আগে কোনোভাবেই এর হাত খোলা যাবে না।”
লিনা বললেন,
“ আচ্ছা অন্তত ভেতরে নিয়ে বসাই। একটু ঠিকঠাক হয়ে আসুক।”
সার্থ ঘাড় নাড়ল। বোঝাল, নিয়ে যেতে। কিন্তু তুশি নড়ল না। গোজ হয়ে বসে রইল সে। সোফায় আরো শক্ত করল শরীরটা।
চোখমুখের জোরদার আপত্তি দেখে সার্থ ক্লান্ত শ্বাস টানল। কাছে এসে বলল,
“ কী চাইছ? আবার কাঁধে উঠবে?”
ক্ষিপ্ত চোখে চাইল তুশি। মাথা নড়ায়,কপালের চুল আবার মুখে এসে পড়ল। সার্থ ফের সেটা কানের পিঠে গুজে দিয়ে বলল,
“ বরের দিকে এভাবে তাকাতে নেই। যাও,একটু বিশ্রাম নিয়ে এসো। ততক্ষণে তোমার নামে একটা এফ- আই-আর রেডি করি। কিছু কঠিন কঠিন মামলা দেবো আজ। যাতে সারাজীবনেও আমার মনের জেল থেকে তুমি চোর মুক্তি না পাও।”
তুশির চেহারায় বদল হলো না। বদলালো না ওর পাথুরে চোখ। তবে লিনা হাত ধরতেই ভদ্রের ন্যায় উঠে ভেতরে চলে গেল।
জামিল সাথে সাথে বলল,
“ ওদিকের কী খবর?”
“ জানি না!”
“ অয়ন শুনলে কী যে করবে! পাগলা কুত্তা হয়ে যাবে ও। তুশিকে যে খুব ভালোবাসে রে!”
“ শুধু নিজে ভালোবাসলেই হয় না।
উল্টোপাশ থেকে একইরকম ভালোবাসা আসছে কিনা,তা নিয়েও ভাবতে হয়। মাথায় বুদ্ধি থাকলে বাড়িতে তুশিকে না পেয়েই বুঝবে,ও ভুল করতে যাচ্ছিল।”
“ তাও ঠিক। কিন্তু অয়ন…”
সার্থ মাঝপথেই বলল,
“ তুশির পাশে আর পরপুরুষের নাম নিবি না। একটু পর আমার সাথে ওর বিয়ে হবে,তুই আমার বাচ্চাদের নাম ঠিক কর!”
জামিল চোখ কপালে নিয়ে বলল,
“ ওরেহ,বাচ্চা পর্যন্ত চলে গেলি রে?”
শরিফ উজ্জ্বল মুখ নিয়ে পাশে ভিড়লেন সেসময়। স্ফূর্ত স্বরে বললেন,
“ স্যার, আগাম অভিনন্দন আপনাকে। একই বউকে দুবার বিয়ে করছেন কী কপাল আপনার। আমরা তো ওই একবারই!”
জামিল বলল,
“ আপনি তো তাও একবার পেলেন,আমার কপাল দেখেছেন? যেই বয়সে আপনার স্যার বেবি প্ল্যানিং করছে সেই বয়সে আমি ছ্যাকা খেয়ে ঘুরছি।”
সতর্ক চোখে চাইলেন ভদ্রলোক,
“ কেন স্যার? গার্লফ্রেন্ড ছেড়ে চলে গেছে?”
সার্থ কপাল কুঁচকে বলল,
“ আবার গার্লফ্রেন্ড বানিয়েছিস?”
“ বানাতে তো চাইলাম। হলো না রে। মনে হয় আমার জন্যে সিরিয়াস প্রেমের জন্মই হয়নি। জীবনটা হয়ত ফোনে চার্জ দিতে দিতেই চলে যাবে,নিজেকে আর চার্জ দেয়া হবে না।”
পরপর ফোস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ আচ্ছা, বাদ দে এসব। একটা কথা বল,তুই আজকেও ইউনিফর্ম পরে এসছিস কেন? শরীফ সাহেবকে দ্যাখ, বিয়েতে সাক্ষি দিতে পাঞ্জাবি পরে এসেছে। মানুষ কনফিউজড হয়ে যাবে না,বিয়ে কার?”
শরিফ লজ্জা পেয়ে বললেন,
“ ইয়ে, আমি তো বিয়ে খাব ভেবে আনন্দিত হয়ে তৈরি হয়েছিলাম। কিন্তু স্যার যে বউ কিডন্যাপ করে আনবেন,তা জানতাম না।”
“ ইউনিফর্ম না পরে রাস্তা দিয়ে মেয়ে তোলা কত ঝামেলার জানিস?
এখন লোকজন ভেবেছে ক্রিমিনাল ধরেছি। আর সিভিল ড্রেসে মেয়ে তুলতে গেলে ভাবতো, রেইপ করতে নিচ্ছি। বারবার কি সবাইকে নিজের আইকার্ড ধরে ধরে দেখাতাম?”
“ তাহলে এখন পর। কত কী কেনালি আমায় দিয়ে। পরবি না?”
“ না, সময় নেই। চোরটাকে নিয়ে চিন্তায় আছি। বিয়েতে বেঁকে না বসলে হয়!”
“ এজন্যেই বলেছিলাম আগেভাগে স্বীকার করতে। শালা নিজেই নিজের লাইফ ত্যানা ত্যানা করেছিলি। যে জিনিস স্বেচ্ছায় পেতে রাখা ছিল,তা নিয়ে এখন কত কষ্ট করতে হচ্ছে।”
সার্থ উত্তর দিলো না। কারণ,কথাগুলো সত্যি। গল্পের সব জটিলতার মূল একমাত্র সে!
তবে এত কথাবার্তার মাঝে কাজী সাহেব চুপ করে বসে আছেন। একটা জোরজবরদস্তির বিয়ে হচ্ছে এখানে। কিন্তু পুলিশের লোক দেখে টু শব্দও করছেন না তিনি। তবে ব্যাপারটা অতীব আশ্চর্যের বৈকি।
পুলিশ যদি নিজেই মেয়ে তুলে এনে বিয়ে করে, তাহলে সন্ত্রাসীরা কী করবে?
ভদ্রলোক দেশের করুণ দশা ভেবে হতাশ হলেন। কয়েকবার নিঃশ্বাস ফেলে মাথা নাড়লেন দুপাশে। এর মাঝেই তুশিকে নিয়ে হাজির হলেন লিনা। চুলটা সুন্দর করে গুছিয়ে বেঁধে দিয়েছেন। মাথায় ওরনা প্যাঁচানো। কিন্তু মেয়েটার ঠোঁটে হাসি নেই। বরং ফেঁপে উঠছে চোখা নাক। সুশ্রী মুখ লালচে সীমাশূন্য রাগে। ঠিক করে দাঁড়াতেও পারল না, সার্থ হাতটা খপ করে ধরল,
“ এসো, বিয়ে করি।”
তুশি দু-হাতই ঝারা মারে। রাগ দেখায়। সার্থর যায়ই এলো না। হ্যান্ডক্যাফে আটকে রাখা পেলব দুই হাত, স্বীয় এক হাতের মুঠোয় টেনে চেয়ারে বসিয়ে দিলো ওকে। পাশেরটায় বসল নিজে। মৌলভিকে
বলল,
“ নিন, বিয়ে পড়ান।
কাজী সাহেব হতভম্ব চোখে দুজনকে একবার একবার দেখলেন। মেয়ের মুখে স্কচটেপ,হ্যান্ডকাফ হাতে। ছেলের গায়ে ইউনিফর্ম। এরা বর-বউ? না চোর-পুলিশ? অমন বিস্ময় নিয়েই খাতা খুললেন তিনি। একটা প্রশ্নও করলেন না। আগে থেকে নাম ধাম সব লিখে রেখেছেন। ভদ্রলোকের কাছে আরো একটা অবাক করা ব্যাপার হলো,ছেলেমেয়ের বংশও এক। সৈয়দ সার্থ আবরার, সৈয়দ মেহরিন রহমান তুশি। এমন অতি আজব বিয়ে দেখা যায় কোথাও? জিজ্ঞেস করলেন,
“ তাহলে বাবা শুরু করছি।”
“ হুঁ, তাড়াতাড়ি!”
“ জি।”
দুজনের বাবা মায়ের নাম থেকে দেনমোহর সব কিছু জোরে জোরে পড়লেন ভদ্রলোক। একটা শ্বাস নিয়ে বললেন,
“ বলো মা…
এ বাবা,মেয়ের মুখ বন্ধ, কবুল বলবে কী করে?”
সার্থ দুটো আঙুল ভ্রুয়ের মাঝে ঘষল। ও এক্ষুনি তুশির মুখ খুলে দিতে চাইছে না। দিলেই ফরফর করে জিভ চালাবে। বলল,
“ না খুলে বিয়ে পড়ানো যায়?”
“ কবুল বলতে হবে যে!”
উপায় না পেয়ে স্কচটেপটা ছিঁড়ে আনল সে। এতক্ষণে যেন তুশির রুদ্ধ দম ফিরল। শ্বাস নিলো একটু। পরপরই আর্তচিৎকার ছুড়ল,
“ আমি আপনাকে বিয়ে করব না।”
সার্থ দীর্ঘ শ্বাস ফেলল। জানতো এটাই শুনবে। জামিল বলল
“ কেন তুশি? মানছি পাঠা, কিন্তু মানুষটা তো ভালো।”
তুশি বলল,
“ ভালো মানুষ! ওনার মতো ইগোবাজ,খচ্চুরে, খামখেয়ালি লোক দুটো নেই। আমাকে বোঝে না,আমার খারাপ লাগছে, না ভালো লাগছে কিছুর পরোয়া নেই। সব সময় শুধু অপমান করে,কথা শোনায়। যা মুখে আসে তাই বলে দেয়। এরকম লোক আমার জীবনে কোনো দরকার নেই।”
তুশি থামল। সার্থর সাথে মৌখিক বিস্তর লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুত সে। অথচ মানুষটা মাথা নেড়ে বলল
“ হয়েছে?
এবার কবুল বলো।”
তুশি ফুঁসে উঠল,
“ দেখেছেন? দেখেছেন আপনারা?
এখনো তেজ কমেনি ওনার। আমি ওনাকে বিয়ে করব না, করব না, করব না।”
শরিফ মাথা চুলকালেন। বাকিদের মধ্যে খা খা করছে নীরবতা।
কাজী সাহেব বললেন,
“ একটু তাড়াতাড়ি করলে ভালো হতো, মা। আমার আবার একটা বিয়ে পড়াতে যেতে হবে। অনেক দূরের পথ।”
“ আমি বিয়ে করব না বললাম তো।”
সার্থ ঠান্ডা গলায় বলে,
“ তুশি কবুল বলো।”
“ বলব না।”
“ কেন বলবে না? ভালোবাসো না আমায়?”
“ না,আমি আপনাকে ঘেন্না করি!”
তুশির ঝাঁঝালো স্বর,
আগুন চোখ,পাথরের মতো মুখটা দেখে থমকে যায় সার্থ। আস্তে শুধায়,
“ কেন?”
“ আপনি জানেন না?
আপনার জন্যেই তো আমার আজ এতকিছু সহ্য করতে হচ্ছে। আপনার জন্যেই আমায় অয়ন ভাইকে ঠকাতে হয়েছে। আজ আপনার জন্যে আমাকে নিজের বাড়ি ছেড়ে পালাতে হচ্ছে। সব আপনার জন্যে! আপনি যদি শুরু থেকে আমায় না ফেরাতেন,তাহলে আজ তো এই দিন আসতো না। তুশি ভালোবেসে হাসিমুখে আপনার জন্যে জান দিতেও পারতো,কিন্তু জোর করে তার কাছ থেকে এক গ্লাস পানিও পাওয়া যাবে না। আপনি আমাকে চাননি, বারবার ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাহলে এখন আবার আশা করছেন,আমি আপনাকে ভালোবাসব? না, আমি বস্তিতে বড়ো হলেও ছ্যাচড়া নই।”
এতগুলো কথার পিঠে একটা ছোট্ট জবাব দিলো সার্থ,
“ আচ্ছা, এখন কবুল বলো।”
ক্রোধের আগুনে তুশি ভস্ম হয়ে যায়। তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে,
“ বললাম না আমি বিয়ে করব না? শুনতে পান না কানে?”
“ এমন করে না বাবু, কবুল বলে দাও।”
তুশি হতবাক হয়ে গেল। বাবু!
বাকিরা মুখ টিপে হাসে।
সার্থ চ সূচক শব্দ করে বলল,
“ বলো না। ছোটো ভাইয়ের সাথে বউ নিয়ে টানাটানি করতে ভালো লাগে না আর।”
“ কে বলেছে আপনাকে টানাটানি করতে? আমি তো আমার মতো চলেই যাচ্ছিলাম। আপনি কেন নিয়ে এলেন এখানে? আপনার মতো ছেলের কি আর মেয়ের অভাব হতো! আপনার আইরিন আছে না? গিয়ে ওকে বিয়ে করুন। ”
সার্থর মেজাজ চটে গেল।
তাও শান্তভাবে বলল,
“ তুশি এবার রাগ হচ্ছে!”
“ হ্যাঁ হবেই তো। ওটাই তো পারেন আপনি। রাগ করবেন,মেজাজ দেখাবেন,হাত চেপে ধরবেন,গাল চেপে ধরবেন। আর কী জানা আছে আপনার?”
সবাই গোল গোল চোখে একবার ওকে দেখছে একবার সার্থকে। মৌলভি মিনমিন করে শুধালেন,
“ না মানে, বিয়েটা কি হচ্ছে?”
সার্থ ঠাড় দুটো নির্লিপ্ত চোখে তুশির রাগত মুখ দেখল দু পল। জিজ্ঞেস করল সেভাবেই,
“ কবুল বলবে না?”
মেয়েটার কণ্ঠে অটল জেদ,
“ মরে গেলেও না।”
“ শিয়র?”
“ হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ।”
সার্থ মাথা নাড়ে। এক চোট বিভ্রান্তি ঠিকড়ে দিয়ে চুপ করে যায়।
পরপর দুম করে হোলস্টার থেকে রিভলবারটা টান মেরে হাতে তুলে আনল। আঁতকে উঠল সবাই। কাজীর মুখ শুকিয়ে গেল ভয়ে।
জামিল হকচকিয়ে বলল,
“ কী করছিস! মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর? ওকে সময় দে একটু। ও ঠিক কবুল বলবে।”
সার্থ শুনল না। গানের সাইড টেনে লোড করল উলটে। তুশির চেহারা কাঠ হয়ে যায়। নিথর চোখে চেয়ে রয় সে। এখন মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে কবুল বলাবে? এতটা নিচে নামবে এই লোক!
আচ্ছা,জেদ ওরও কম কিছু নেই। এই ইগোবাজের কাছে ও নত হবে না। মরার ভয় দেখাচ্ছে? তুশি দাঁত খিচে রইল। প্রস্তুত হল বন্দুকের নল তেড়ে আসার। অথচ সবাইকে চমকে দিয়ে পিস্তলের নল নিজের মাথায় ধরল সার্থ। কঠিন চোখে বলল,
“ কবুল বলো তুশি,আদারওয়াইস আই’ল স্যুট মাইসেল্ফ!”
সবাই বাকরুদ্ধ, স্তম্ভিত।
তুশির বুক কেঁপে উঠল। স্তব্ধ হয়ে বলল,
“ কীহ!”
সার্থ কণ্ঠ আরো বদলে গেল। প্রস্তর চোখে বলল,
“ হয় আজ আমাদের বিয়ে হবে,না-হয় আমার জানাজা হবে। কী চাও?”
জামিল তাড়া দিয়ে বলল,
“ তুশি কবুল বলো প্লিজ,নাহলে সার্থ যা জেদি ও সত্যিই নিজেকে গুলি করে দেবে।”
শরিফ বললেন,
“ ম্যাডাম,কবুল বলুন কবুল বলুন। স্যারের কিছু হলে দেশের লস,আপনার লস ম্যাডাম। তাড়াতাড়ি বলুন!”
তুশি নিস্পন্দ হয়ে চেয়ে রইল সার্থর শূন্য দৃষ্টিতে। তেজোদৃপ্ত চাউনি দেখে বুঝল, হার মানতেই হবে। ছোট্ট একটু
ঢোক গিলে বলল,
“ ক-কবুল।”
সার্থ বলল,
“ আরো দুবার!”
“ কবুল,কবুল।”
সাথে ঝরঝর করে ক ফোঁটা জল ওর চোখ বেয়ে নেমে গলায় গিয়ে থামল। অনুনয় করল নরম সুরে,
“ এবার তো বন্দুকটা নামান! কবুল বলেছি আমি।”
সার্থর চেহারায় যুদ্ধ জেতার আনন্দ ছুটে আসে। বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেলল,
হেসে বলল,
“ শুনেছি। কাঁদছো কেন? ভয় দেখাচ্ছিলাম। আমি মরে গেলে, বিয়ে করবে কে?”
মেয়েটা ভ্যাবাচ্যাকা খায়।
জামিল সহ বাকিরাও ভড়কে যায় কিছু। তুশি চিড়বিড় করে বলে,
“ খারাপ, ফালতু লোক! একটা বিশ্ব বিটকেল আপনি! ”
সার্থ হাসল তাও,
কাজীকে বলল,
“ এবার আমাকে কবুল বলতে বলুন।”
এতক্ষণের এত নাটকে ভদ্রলোক মূর্তি হয়েছিলেন। নড়েচড়ে বললেন,
“ জি জি, বলুন কবুল।”
“ আলহামদুলিল্লাহ, কবুল।”
জামিল মাথা নেড়ে হাসল। ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,
“ তুই একটা চিজ রে সার্থ। জানটা উড়ে গেছিল আমাদের,হারামি!”
শরিফও ঘাড় নাড়লেন। ভয় তিনিও পেয়েছিলেন আসলে। তার স্ত্রী-শালীকা এমনকি কাজিও হকচকিয়েছে।
সার্থ কাগজ ঠেলে দেয়।
“ নাও,সই করো।”
তুশি দাঁত চিবিয়ে বলল,
“ হাত না খুললে সই করব কীভাবে?”
“ উহু,হাত খোলা যাবে না।
এভাবেই করো।”
“ আপনাকে আমি দেখে নেব।”
“ রাতে,যত ইচ্ছে। নাউ সাইন ইট!”
তুশি মেজাজ খারাপ করে আঙুলে কলম তুলল। সই করতে গিয়েও থামল হঠাৎ। প্রশ্ন ছুড়ল বিদ্রুপ করে,
“ আর আপনার আইরিনের কী হবে?”
সার্থ বিরক্ত হলো। চ সূচক শব্দ করে একদমে বলল,
“ ওকে জামিলের সাথে বিয়ে দিয়ে দেব। তোমার এত ভাবতে হবে না।”
জামিল তব্দা খায়। নাক কুঁচকে বিড়বিড় করে,
“ শালেনে মুঝে কিউ তোরা?”
তুশি পরাস্ত হয়ে সই করল, এরপর সার্থ লিখল নিজের নাম। বর-কনে হিসেবে পাশাপাশি ওদের নাম দুটো জ্বলজ্বল করল বড্ড। সেদিক চেয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলল ছেলেটা। ভালোবাসা দিবস হিসেবে স্বীকৃত “১৪ ফেব্রুয়ারিতে” আজ নতুন করে এক পবিত্র বন্ধনে জড়াল ওরা। জামিল আর শরিফ ছেলেপক্ষের সাক্ষির জায়গায় সই করলেন,শরিফের স্ত্রী-শালিকা করলেন তুশির পক্ষে। এইবার মেয়েটার হ্যান্ডকাফে আটকে থাকা হাত দুটো খুলে দিলো সার্থ। তুশি কব্জি ডলতে ডলতে বিড়বিড় করল,
” জল্লাদ একটা!”
মৌলভি সাহেব কাগজ হাতে নিয়ে বললেন,
“ আজ থেকে আপনারা স্বামী-স্ত্রী! আলহামদুলিল্লাহ, আপনাদের নতুন জীবন সুখের হোক।”
সবাই সমস্বরে আলহামদুলিল্লাহ বলল। অথচ সার্থ তাকাতেই, মুখ ঘুরিয়ে নিলো তুশি। ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে এক হাতে ওর গাল চেপে ধরে নিজের দিকে ফেরায়। ভ্রু নাঁচিয়ে বলে,
“ মিসেস সার্থ আবরার… আপনার সমস্যা কী?”
তুশির কণ্ঠে নম্রতা নেই,
“ কেন করলেন এরকম?”
“ কীরকম?”
“ আপনি না আমাকে ভালোবাসেন না? তাহলে এত নাটকের মানে কী!”
সার্থ চেয়ারে পিঠ ছড়িয়ে বসল,
বলল,
“ এমনি!”
ব্রহ্মতালু জ্বলে যায় তুশির। চোখটাও ছলছল করে সাথে।
জামিল বিড়বিড় করে বলল,
“ শালা ঘাউড়া!”
ওর আর সার্থকে সহ্য হলো না। মন চাইল মেরে মাথার খুলি ভেঙে দিতে। শরিফকে বলল,
“ চলুন, আমরা গিয়ে মিষ্টি নিয়ে আসি,এরা ঝগড়া করুক।”
“ জি জি চলুন।”
বাকিরা রয়ে যায়। কাজী সাহেব কাগজপত্র গোছালেন। তুশি হঠাৎই উদাস হয়ে গেল। চেয়ারের হাতলে এক পাশ হয়ে মাথা ঠেকাল। চোখের কোণ ছুঁয়ে একটা জলের ধারা নামল তখনই। গড়িয়ে পড়ার আগেই সার্থ ব্যতিব্যস্ত হাতে মুছে দেয় সেটুকু। কিছু বলে না,নিঃশব্দে চেয়ে থাকে। ওই বরফ-শীতল দৃষ্টিতে হৃদয়ে টান পড়ল তুশির। খুব প্রত্যাশা নিয়ে আরেকবার শুধাল,
“ বলুন না,কেন বিয়ে করলেন?”
“ কেন,অয়নকে বিয়ে করতে পারোনি বলে কষ্ট পাচ্ছো?”
তেতে উঠল মেয়েটা,
“ বাজে কথা বলবেন না। আমি তো পালিয়েই যাচ্ছিলাম।”
“ গিয়ে কী হতো? সেখানেও হয়ত অন্য কাউকে বিয়ে করতে!”
“ করলে করতাম,তাতে আপনার কী?”
সার্থ সোজাসুজি বলল,
“ অনেক কিছু! যে মুখে একবার আমার জন্যে কবুল বলেছ,সেই মুখে অন্যের জন্যে কবুল বলতে দিই কী করে!”
চলবে….
Share On:
TAGS: কাছে আসার মৌসুম, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৮
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬০.১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৯(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২৯(ক+খ)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৬
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৩(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৪