কাছেআসারমৌসুম__(৫৯)
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
মলের পরিবেশ বদলাল। রক্তের উৎক গন্ধে আরো ভারি হলো বাতাস। কেউ ছুটে এলো, কেউ ভয়ে দাঁড়িয়ে রইল দূরে। চারপাশ মেখে গেল হৈচৈ, চিৎকারের শব্দে। বাচ্চাদের হাত ধরে নিরাপদ দুরুত্বে ছুটলেন বাবা-মায়েরা। সার্থর ধড়ফড়িয়ে কোলে তুলল তুশিকে।
উদ্ভ্রান্তের ন্যায় গাড়ির দিকে যেতে যেতে বলল,
“ তুশি,তোমার কিছু হবে না। কিছু হবে না তোমার। চোখ বন্ধ করো না তুশি,চোখ খুলে রাখো!”
এত অসহনীয় ব্যথা সওয়ার পরে তুশি আর তা পারল না। আপনা-আপনি পানিতে টইটম্বুর চোখ বুজে যাচ্ছে ওর। সার্থর কোলে ঝুলতে থাকা মাথার পাশ বেয়ে তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে। এক ভদ্রলোক তাড়াহুড়ো করে গাড়ির দরজা খুলে দিলেন। অন্যজন পড়ে থাকা সব প্যাকেটগুলো কুড়িয়ে তুললেন ব্যাক সীটে। ব্যস্ত ভাবে বললেন,
“ তাড়াতাড়ি করুন,স্যার। এখানেই তো হাসপাতাল,সময় মতো নিলে বাঁচতেও পারে।”
‘বাঁচতেও পারে’ বাক্য দুটো সার্থর বুক চিড়ে দুভাগ করে দিলো। আঁতকে তুশির নিস্পন্দ চেহারায় দেখল সে। বাঁচতেও পারে মানে কী? তুশিকে বাঁচতেই হবে। বাঁচতে হবে তার স্যানোরিটাকে… শশকের ন্যায় ত্রস্ত বেগে তুশিকে সামনের সীটে বসায় সার্থ। নিজেও ছুটে এসে ড্রাইভিং-এ বসে। তার বলিষ্ঠ শরীর শক্ত রইলেও,বুক কাঁপছে ধড়ফড় করে। ফাঁকা হয়ে বসেছে মাথার কোষ। ও গাড়িতে টান দিতেই তুশির ঘাড় পড়ে গেল । রক্তে ভাসছে তার বুক। চোখের কোণের জল শুকিয়ে যাচ্ছে এখন। দেহের শ্বাস নিভু নিভু প্রায়। সার্থর এতটা অসহায় নিজেকে কখনো লাগেনি, যতটা লাগল আজ। আহত বাঘ যেমন ছোটে? অমন করে উড়ন্ত ঘূর্নির ন্যায় গাড়ি ছোটাল সে। ভাগ্য প্রসন্ন থাকায় হাসপাতাল কাছেই ছিল। পৌঁছাতে বেশি সময় লাগেনি। তবে ততক্ষণে অবস্থা আরো শোচনীয় তুশির। ছোট্ট প্রান যায় যায় বুঝি! সার্থ খেয়াল করল মেয়েটার পিঠ দিয়েও রক্ত পড়ছে। সীট মেখে গেছে পুরো। তুশির খোলা চুল ভিজে প্রায় শক্ত আঠা হয়ে আছে। উন্মত্ত শ্বাস নিতে নিতে গাড়ি থেকে ওকে নিয়ে নামল সার্থ। একটা রক্তমাখা গুলিবিদ্ধ মানুষ দেখে ভীড় করা লোকেদের উৎকণ্ঠা বাড়ল। ওয়ার্ড ভয় ছুটলেন স্ট্রেচার আনতে। সার্থ ওই নরম শরীরটা বুকে মিশিয়ে দাঁড়িয়ে রয়। চ্যাঁচায় গলা ফাটিয়ে
“ ডাক্তার আনুন, ফাস্ট ফাস্ট!”
ওর বুকের কাছটায় রক্ত,বাকি গোটা শরীর ঘামে ভিজে গায়ে মিশে গেছে। স্ট্রেচার এলো তখনই। খুব তাড়াহুড়ো করে তুশিকে শুইয়ে দিলো সার্থ। স্ট্রেচার যখন চার চাকা নিয়ে ছুটল,আস্তেধীরে দুরুত্ব বাড়ছিল ওদের,সার্থর মনে হলো ওর হৃদপিণ্ডের একটা অলিন্দ খসে পড়ে যাচ্ছে কোথাও। ও দৌড়ে এলো মরিয়া হয়ে। উৎকণ্ঠায় নিঃশ্বাস মিশিয়ে ডাকল,
“ দাঁ দাঁড়ান দাঁড়ান।”
থামল স্ট্রেচার। নার্স,ওয়ার্ড-বয় ফিরল চকিতে। সার্থ কাপা স্বরে বলল,
“ আমিও ভেতরে যাই, প্লিজ!”
চিকিৎসক সার্থকে চেনেন। পিঠে চাপড় কেটে বললেন,
“ নিজেকে শক্ত করুন অফিসার। দোয়া রাখুন,যাতে ভালো কিছু হয়!”
সার্থ তাও তুশির হাত ধরে রাখল। মেয়েটা নিথর লাশের নায় পড়ে আছে। কোনো স্পন্দন নেই,শব্দ নেই। কথা বলছে না,রাগ করছে না,দেখছে না ওকে। সার্থর বুক পুড়ে যায় তাতে। মাথা রুদ্ধ হয়। এই চঞ্চল মেয়েটার নিস্তব্ধতা মেনে নেয়া যায় না। ও হাসবে,কথা বলবে,ভুলভাল ইংরেজি বলে জ্বালাবে ওকে। ছিন্নভিন্ন হয়ে আসা দম নিতে নিতে, স্ট্রেচারে টান পড়ল ফের। সার্থর মুঠো থেকে আস্তেধীরে হাতটা ছুটে গেল তুশির। দুরুত্ব বেড়ে বেড়ে এক সময় ওকে সমেত ওটির দরজা বন্ধ হলো। সার্থর ভেতরটা চৌচির হয়ে যায়। মনে হয়,এই ঝড় কেন ওর ওপর এলো না? কেন ওই ক্ষুদ্র মেয়েটার ওপর পড়ল? অন্তত নিজের আঘাত সওয়ার শক্তি ওর ছিল। কিন্তু এখন? এখন সইবে কী করে!
সেসময় একজন নার্স এসে দাঁড়ালেন। বললেন,
“ স্যার, এডমিশান ফর্মটা যদি ফিল-আপ করে দিতেন!”
সার্থ নিজেকে সামলাল। তার ভেতর ধ্বস হোক,যাই হোক সে ভেঙে পড়ে না। সৈয়দ সার্থ আবরার, নিজেকে কঠিন রাখতে জানে। কিন্তু মন কি তা মানে? চোখ, শরীর সামলে নিলেও মন শোনে না এসব। সে বারবার ফিরে চায় ওটির জ্বলজ্বলে লাল আলোর দিকে।
সার্থ রিসেপশনে এসে দাঁড়াল। মেয়েটি পুরু কাগজের ফর্ম বাড়িয়ে দিলেন। শুধালেন,
“ আপনার পেশেন্ট,স্যার?”
“ হু।”
“ আচ্ছা, এগুলো ফিল করে দিন।”
সার্থ ফর্মে চোখ রাখল। জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে একে একে লিখল :
নাম: মেহরিন রহমান তুশি
জন্মতারিখ : ২৮/০৪/ ২০০৫ইং
উচ্চতা – ৫’৩”
একে একে ফোন নম্বর থেকে শুরু করে সব লেখার পর এক জায়গায় এসে হাতটা থেমে গেল ওর।
রোগীর সাথে সম্পর্ক…
সার্থর মুখটা কাঠ হয়। শ্বাস টানে ফের। পরপর একদমে লিখে দেয় – “স্বামী”
অপারেশন থিয়েটারের বাইরের আলোটা জ্বলছে এখনো। সারা করিডোরে কেবল কান্নার শব্দ। চোখের জল,হাহাকার আর একেকটি প্রার্থনায় গোটা কক্ষ যেন দ্বিগুণ ভারি আজ।
রেহণুমা ফোঁপাচ্ছেন। তনিমার বুকে মাথাটা মিশে গেছে। গুনগুন করে কাঁদছেন হাসনাও। ইউশা মাকে সামলাবে, না নিজেকে গুলিয়ে ফেলছে সব। কারো চোখের জলের কোনো বিশ্রাম নেই। সাইফুল নির্বাক হয়ে মাথা নুইয়ে বসে আছেন। শওকত অস্থির চিত্তে হাঁটছেন, আর কারো সাথে ফোনে কথা বলছেন। স্বীয় আর্মি জীবনে যত বড়ো বড়ো মানুষের সাথে তার আলাপ ছিল সকলকে ফোন করে বলছেন,গুলি করতে আসা ক্রিমিনালদের ধরার জন্যে, প্রশাসনকে বিশেষ ভাবে চাপ প্রয়োগ করতে। ওপাশ থেকে কী কী বলা হলো কেউ শোনেনি। শওকত ফোনের লাইন কেটে শ্বাস ফেললেন দুবার। পরপর ঘাড় ঘুরিয়ে চাইলেন অদূরের দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সার্থর দিকে। সোজা কাঁধ,কপালে ভাঁজ,শক্ত পিঠ, মেঝেতে আনত দুই চোখ ফেলে থমকে আছে সে। শওকতের মন চাইছে টেনে দুটো চড় মেরে আসতে। কেন এভাবে অয়নের ওপর দিয়ে মেয়েটাকে নিয়ে বের হতে হবে? এতই যদি অধিকারবোধ তাহলে আবার ঘটা করে আইরিনের সাথে বিয়ের কথা বলেছিল কেন?
তুশিটার যত ভোগান্তি সব এই কুলাঙ্গারের জন্যে। কিন্তু তিনি কিছু বললেন না। হাঁ করলেই সার্থ বেয়াদবি করে। বাঁকা উত্তর দেয়। খোচায় তার অতীত নিয়ে। এসব আর ভালো লাগে না এখন।
তক্ষুনি করিডোরে ক-টা পায়ের শব্দ শোনা গেলো। কয়েকজন পুলিশের লোক সহ শরীফ আলগোছে পাশে এসে দাঁড়ালেন। ডাকলেন ধীরে,
“ স্যার।”
মলিন চোখে ঘুরিয়ে ফিরল সার্থ। কপালের ভাঁজ হাওয়া হলো অমনি।
“ কোনো খবর?”
শরীফের হাতে ল্যাপটপ। চাপা স্বরে বললেন,
“ এদিকে একটু আসুন।”
ওরা এসে থামল একটা নিরিবিলি কোণে। চার-পাঁচজন মিলে গোল হয়ে দাঁড়াল।
শরীফ ল্যাপটপ মেলে দেখাল,
“ এটা মলের বাইরের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ।”
তারপর ব্যস্ত হাতে প্লে করল সে।
একটা নীল-কালো বাইকে দুজন হেলমেট পরা ছেলে। হাওয়ার মতো এলো,থামল, তারপর একটা বুলেট ছুড়ে শাই বেগে পালাল কোথাও। সার্থ তৎক্ষণাৎ বলল,
“ পজ পজ!”
তড়িঘড়ি হাতে বাটন টিপল শরীফ।
“ প্লে ব্যাক এন্ড স্লো।”
শরীর টেনে পেছনে নেয়। ভিডিও চালু হয় ফের। বন্দুক তাক হয়, সার্থ চাবি তুলতে ঝুঁকল,আর সাথে সাথে গুলিটা গিয়ে লাগল তুশির বুকে। ও তাজ্জব হয়ে বলল,
“ এর মানে গুলির নিশানা আমি ছিলাম।”
শরীফের চোখ বড়ো হয়ে গেছে। ব্যাপারটা তিনি খেয়াল করেননি। দেখা দরকার,দেখেছিলেন। খুব আশ্চর্য হয়ে বললেন,
“ কিন্তু স্যার, এমন কে করতে পারে? রিসেন্ট কেসগুলোয় তো ওরকম কাউকে…”
শরীফ ভাবতে ভাবতেই চটক কাটার ন্যায় নড়ে উঠল হঠাৎ। সার্থও একইসময় চাইল ওর দিকে।
“ স্যার…”
“ রুহান!”
“ মাই গড স্যার,ওই শুয়োরটা জেল থেকে পালিয়ে তাহলে এসব প্যাঁচ কষছে।”
“ আস্তে শরীফ। কাকপক্ষীকেও বুঝতে দেয়া যাবে না,আমরা রুহানকে সন্দেহ করছি। আপাতত বাইক ট্রেস করো। কান টানলেই মাথা ঠিক হাতে আসবে।”
শরীফ এবার বুক ফুলিয়ে বলল,
“ স্যার আমি জানতাম আপনি এটা বলবেন,সেজন্যে আগেভাগেই বলে দিয়েছি।”
“ গুড। আপনাদের আর এখানে আসতে হবে না,কিছু জানলে আমাকে ফোন করবেন।”
বলতে বলতে সার্থ পিছু ফিরল, অমনি চিতার বেগে গায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল কেউ। ক্ষুব্ধ চিত্তে দুহাত দিয়ে ওর শার্টের কলার টেনে ধরল অয়ন। হিঁসহিঁসিয়ে চ্যাঁচাল,
“ হাউ ডেয়ার ইউ ভাইয়া,হাউ ডেয়ার ইউ!”
সার্থ হকচকাল প্রথম দফায়। ভড়কে গেল বাকিরাও। শরীফের চোখ রীতিমতো ছিটকে এলো বাইরে। ইই, এটা স্যারের ছোট ভাই না?
সার্থ শান্ত চোখে এক পল কলারের দিকে দেখল,পরপর অয়নের মুখের দিকে। শরীফকে
বলল,
“ আপনি এখন যান।”
“ ওকে স্যার।”
শরীর মাথা নুইয়ে চলে গেল। পিছু নিলো বাকি পুলিশের লোকেরা। সার্থ খুব ঠান্ডা চোখে ভাইয়ের দিকে ফিরল এবার। সেভাবেই বলল,
“ এটা হসপিটাল!”
অয়ন চিড়বিড় করে বলল,
“ হসপিটাল মাই ফুট। আমি জানতে চাই তুমি কেন তুশিকে ওভাবে নিয়ে গেছিলে?
ওর আজ আমার সাথে বের হওয়ার কথা ছিল। তাহলে মিন্তুকে দিয়ে ওরকম একটা নোংরা খেলা খেলতে তোমার একটুও বাঁধল না?”
সার্থ উত্তর দিলো না। অয়নের হাত দুটো কলার থেকে ছাড়িয়ে দিলো। নিশ্চুপ পাশ কাটাতে গেলেই,বাহু টেনে ধরল অয়ন। তেড়ে এসে পথরোধ করল ফের।
“ কোথায় পালাচ্ছ তুমি? যা করেছ তা নিয়ে মুখ দেখানোর ক্ষমতা নেই তাই না!”
“ অয়ন, এখন এসব বলার সময় নয়। তুশি সুস্থ হোক,তারপর কথা হবে।”
অয়ন আরো রেগে গেল এতে,
“ তোমার তুশির সুস্থতা নিয়ে ভাবতে হবে না। সেজন্যে আমি আছি। তোমার কী মনে হয় না,ওর আজকের এই অবস্থার জন্যে তুমি দ্বায়ী? তুমি ওকে সাথে না নিয়ে বের হলে ওর নিশ্চয়ই আজ গুলি লাগতো না।”
সার্থর মুখটা থম ধরে গেল। সূক্ষ্ম ব্যথারা কামড়ে ধরল বুক। কথাটা ঠিক,গুলিটা ওর ভাগের ছিল। তুশিকে এভাবে না নিয়ে এলে,মেয়েটা তো সুস্থ থাকতো আজ।
অয়ন তেজে আগুন হয়ে বলল,
“ চুপ করে আছো কেন? এখন তোমার ওসব বড়ো বড়ো বুলি কোথায় ভাইয়া?
আচ্ছা, নিজেকে কী ভেবে বসেছ তুমি? যখন যা মন চাইবে তাই করবে? সব তোমার ইচ্ছে মাফিক হবে? অন্য একটা মেয়ের সাথে বিয়ে ঠিক হওয়া সত্ত্বেও আমার উড-বি ওয়াইফ নিয়ে টানাটানি করতে তোমার লজ্জা করে না!”
সার্থ ক্লান্ত শ্বাস ফেলল। আবার পাশ কাটাতে গেলে অয়ন পেছন থেকে হুঙ্কার দিয়ে বলল,
“ তুশির থেকে একশো হাত দূরে থাকবে ভাইয়া।”
ফিরল সে। কপাল কুঁচকে বলল,
“ তোর কথায়?”
“ হ্যাঁ, আমার কথায়। আমি ওর হবু স্বামী।”
“ আর আমি ওর বর্তমান।”
অয়ন স্পষ্ট গলায় বলল,
“ সে বিয়ে মিথ্যে, অবৈধ৷ তুমিই তো বলেছিলে,তুমি তুশিকে মানো না।”
“ সেটা আমার আর তুশির ব্যাপার।”
“ না। তোমাদের কোনো ব্যাপার নেই৷ ইউ যাস্ট লিভ হার এওয়ে…”
হাসপাতালের বাকি লোকজন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। সার্থর ধীর স্বর কানে না গেলেও,অয়নের চ্যাঁচামেচিতে ব্যাপারটা নিয়ে উৎসুক তারা।
শওকত ছুটে এসে বললেন,
“ কী হচ্ছে কী? এটা কি ঝগড়ার জায়গা অয়ন?”
“ বাবা তোমার বড়ো ছেলেকে বোঝাও। সে কেন আমার আর তুশির মাঝে আসছে? ওকে তুমি তুশির থেকে দূরে থাকতে বলো।”
শওকত নাক ফুলিয়ে ছেলের দিকে চাইলেন। কিছু বলতে গেলে সার্থ শুনল না। চলে গেল তেজি পায়ে। অয়ন রেগেমেগে বলল,
“ দেখলে,ওর ব্যবহার দেখলে? ওর এই জেদের জন্যেই আমার তুশির আজ এই অবস্থা।”
“ শান্ত হও। এসব পরে দেখব। চলো, বসবে।”
জামিল এলো কিছু সময় পর। হাঁপাতে হাঁপাতে গিয়ে দাঁড়াল বন্ধুর পাশে। উদ্বীগ্ন হয়ে শুধাল,
“ কী অবস্থা রে সার্থ?”
জবাব দিলেন শওকত,
“ এখনো কিছু বলেনি।”
“ কোত্থেকে কী হয়ে গেল! খবরটা শোনার পর আমার মাথাই কাজ করছিল না। এইত পরশু মেয়েটা পার্টিতে কী সুন্দর হেসেখেলে বেড়াল দেখলাম।”
সার্থর চোখে অমনি সেদিনের ছবিগুলো একে একে ভাসল। একটা শুভ্র পরীর মতো তুশি যখন তার সামনে এসে থামল,চোখে চোখ রাখল, মূহুর্তের জন্য নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস খুইয়ে বসেছিল সে। পিঠ বেয়ে নেমে যাওয়া দুধ-সাদা সফেদ স্রোতটা স্পষ্ট টের পেয়েছিল সেদিন।
সার্থ ঢোক গিলল। মরা মানুষের মতো শুধু নয়ন জোড়া ফেলে রাখল ওটির দিকে।
জামিল বাড়ির সবার দিকে তাকাল। ইস, কী অবস্থা! জয়নবের চেহারার বার্ধক্য যেন ক ঘন্টায় আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছে। রোকসানা- নাসীর বিপদ শুনে থাকতে পারেননি। রাগারাগি ভুলে এসেছেন এই কিছুক্ষণ হবে। ভাবি,মা পরিজনদের সামলাতে চাইছেন তারাও।
জামিল ইউশার দিকে চাইল। জর্জেটের ওরনাটা গলার সাথে মাথায় তুলে প্যাঁচানো। কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলে গেছে। নাকটা টকটকে লাল। আস্তে করে পাশে গিয়ে দাঁড়াল সে। ইউশা তাকায় না। চিবুক গলায় মিশিয়ে ইচ্ছে মতো কাঁদে। পকেট থেকে রুমাল বের করে এগিয়ে দিলো জামিল। ইউশা অমন নুইয়ে থেকেই মাথা নাড়ল দুপাশে। নিঃশব্দে বোঝাল – লাগবে না।
সবুজ এপ্রোন পরা সার্জন বাইরে এলেন তখনই। হাতের গ্লাভস রক্তে একাকার। মাস্ক খুলতেই দেখলেন কতগুলো চোখ উদগ্রীব হয়ে চেয়ে তার পানে।
সার্থ এগোতে নিলে অয়ন বাধা দেয়। নিজের পেটানো শরীরটা নিয়ে মুখের সামনে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সার্থকে পেছনে ফেলে বোঝায়- তুশির খবর জানাতেও ওর অধিকার সবার আগে।
সাইফুল উতলা হয়ে বললেন,
“ আমার মেয়ে,আমার মেয়ে?”
“ অবস্থা ভালো নয়।”
আঁতকে উঠল সকলে। মুখগুলো শুকিয়ে গেল রক্ত শুষে নেয়ার মতোন।
সার্থ অয়নের থেকে লম্বা। তাই ও সামনে এসে দাঁড়ানোয় তার খুব বেশি অসুবিধে হলো না। অয়নের মাথা ছাপিয়ে ওর দিকেই তাকালেন সার্জন। সরাসরি বললেন,
“ অফিসার, আপনি পুলিশের লোক, আপনি বুঝবেন। থ্রো এন্ড থ্রো বুলেট। খুব কাছ থেকে গান-শট। বুলেট একদম বুকে ঢুকে পিঠ ছিঁড়ে বেরিয়ে গেছে। বুঝতেই পারছেন এরকম কেসে বাঁচার সম্ভাবনা ২০%- ৪০%।”
সার্থর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। শক্ত পিঠটা ছেড়ে দিলো দেওয়ালের সাথে। রেহণুমা ‘আল্লাহ’ বলে এক চিৎকারে স্বামীর গায়ে ঢলে পড়লেন। জ্ঞান হারালেন চোখের পলকে। সবাই ওনাকে সামলাতে ব্যতিব্যস্ত হলো। হাসনা কাঁদলেন বুক চাপড়ে। হাহাকার করে জড়ানো ভাষায় কেবল,
“তুশি,তুশি রে,আমার বুরে…”
বলে বলে চিৎকার করে গেলেন!”
শওকত উদ্বীগ্ন হয়ে বললেন,
“ তাহলে, তাহলে আমাদের মেয়েটা বাঁচবে না?”
“ দেখুন, ভেতরের ক্ষতি কতটুকু তা এখনো পরিষ্কার নয়। আপাতত আইসিউতে শিফট হবে,৪৮ ঘন্টা অবজারভেশানে রাখব তারপর বুঝব ভালো-মন্দ কতটা। তবে, একটা কথাই বলব খুব বেশি আশা রাখবেন না। এক্সকিউমি!“
পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন তিনি। রেখে গেলেন কতগুলো আহত প্রাণ।
অয়ন কার্নিশের জল কব্জি উলটে মুছল। তারপর টগবগে চোখে দেখল ভাইকে। সবার মাঝে আঙুল তুলে গর্জে বলল,
“ আমার তুশির যদি কিছু হয়,আমি ভুলে যাব তুমি আমার বড়ো ভাই!”
জয়নব ভেজা স্বরে ধমকালেন,
“ আহ দাদুভাই,চুপ করো।”
অথচ সার্থকে দেখে মনে হলো, কথাটা ও শুনতেই পায়নি। কেমন জড়বস্তু বনে চুপ করে মেঝেতে চেয়ে রইল সে।
তুশিকে আইসিইউতে নেয়ার সময় গেল ঘন্টাখানেক হবে। রেহনূমা জ্ঞান হারাতেই তাকে নিয়ে বাড়ি ছুটেছেন তনিমা আর সাইফুল। জয়নব,হাসনা বেশ মুষড়ে পড়ায় ওনাদেরও পাঠিয়ে দিলেন শওকত। রোকসানা-নাসীর দুজনেই মায়ের সাথে গিয়েছেন। কিন্তু শতবার বলার পরেও ইউশা কোনোভাবেই নড়ল না। শওকত একবার ধমকালেনও,চাইলেন মেয়েটা বাড়ি গিয়ে একটু ঘুমাক অন্তত; সেই কখন থেকে একইরকম বসে আছে,জিরোক চোখজোড়া। কিন্তু আজ ধমকেও কাজে দিলো না। ইউশা পণ করল যাবে না, গেল না তাই।
শওকত নিজেই দু মিনিট হাঁটতে গেলেন বাইরে। হাসপাতালে দমবন্ধ হয়ে আসছে তার। এই জীবন নিয়ে অতীষ্ঠ তিনি। একটা না একটা ঝামেলা লেগেই আছে।
কবে যে ঠিক হবে এসব! কবে যে একটু শান্তি পাবেন! তার ওই এক পাপেই বোধ হয় ধরেছে সবাইকে। কবে মুক্তি মিলবে আর কে জানে!
অয়ন ছটফট করে পায়চারি করছে। চোখমুখ ডলছে অশান্ত হাতে। ইউশা হেচকি তুলে কাঁদছিল। জামিলের এই মায়া কান্নার সুর ভালো লাগছে না। বাচ্চা মেয়ে,এত কাঁদলে শরীর খারাপ করবে না? ও এক পা এগোলো কাছে যেতে, তক্ষুনি ইউশার কাছে গিয়ে দাঁড়াল অয়ন। থেমে গেল জামিল। ফোস করে শ্বাস ফেলল। মাথা ঘুরিয়ে চাইল সেদিকে, যেখানে এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল সার্থ। কিন্তু এ কী, কই সে?
মাথায় একটা নিবিড় হাতের ছোঁয়ায় বিমর্ষ মুখ তুলে চাইল ইউশা। অয়ন ঢোক গিলে বলল,
“ এত কাঁদিস না। শরীর খারাপ হবে।”
ইউশার ঠোঁট ভেঙে যায়। আরো ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে অমনি। পরপর দুহাতে অয়নের কোমর প্যাঁচিয়ে ধরে । অয়নও ঝুঁকে যায়। একটা আদুরে ছানার মতো মেয়েটার মাথা বুকে চেপে রাখে। হাত বুলিয়ে বলে,
“ তুশির কিছু হবে না,ইউশা। ভরসা রাখ, কিছু হবে না ওর।”
সার্থ অবশ পায়ে আইসিউয়ের সামনে এসে থামল। দরজার স্বচ্ছ কাচ হতে চেয়ে রইল ভেতরে। চারপাশে অসংখ্য মেশিন আর যন্ত্রপাতির মাঝের বেডটায় একটা নিস্তেজ, শীর্ন শরীর পড়ে আছে । মুখে বড়োসড়ো অক্সিজেন মাস্ক, হাতে ক্যানোলা। মাথার পাশে টিকটিক করছে ইটিটির কাঁটা। বুক অবধি ঢাকা নরম চাদরে। গলার শিরা ওঠানামা করছে হুহু বাতাসের মতো। নিঃশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে বুঝি? স্বার্থর বুক ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ক্ষতবিক্ষত চোখ মেলে চেয়ে রইল সে। ঢোক গিলতে গিলতে বাম চোখের ধার ছুঁয়ে একটা জল নামল তখনই। যা শক্তপোক্ত চিবুক গড়িয়ে গলায় মিশে বলল,
“ ফিরে এসো তুশি। আগের মতো হয়ে এসো। আমার যে তোমাকে অনেক কথা বলার বাকি! একটা সরি বলা বাকি। সব কিছু মিটিয়ে নেয়া বাকি। এই রণক্ষেত্রে আমাকে একা করে যেও না!”
কাছেপিঠের মসজিদে এশার আযান পড়ল তখনই। নড়ে উঠল সার্থ। চোখ মুছেই চটপট লিফটের পথ ধরল সে।
ক্লিনিকের প্রেয়ার রুম চার তলায়। সার্থ ওযু করে, নামাজে দাঁড়িয়েছে। ফাঁকা নামাজরুমে আস্তেধীরে আরো কয়েকজন ভিড়লেন। সার্থ মন দিয়ে নামাজ আদায় করল। বাম দিকে সালাম ফেরানোর সময় হঠাৎ চোখ পড়ল ওর ঠিক এক সাড়ি পেছনের একদম কোনার দিকটায়। সিজদাহ দিচ্ছে অয়ন। সার্থ নজর ফিরিয়ে আনল। দুহাত তুলল সৃষ্টিকর্তার দরবারে। জীবনের সমস্ত বিষাদ শক্তপোক্ত খোলস ফুঁড়ে বাইরে ছড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ হে আল্লাহ, আর কেউ জানুক না জানুক আপনি জানেন আপনার বান্দা কী চায়,কী চেয়েছে! আমি পৃথিবীর কারো কাছে নিজের কথা না বলতে পারলেও, কাউকে বোঝাতে না পারলেও আপনি জানেন আমি কেমন। ছোটো থেকে নিজের বাবা-মায়ের জোরাতালি দেয়া সংসার দেখেছি। বাবার সব অন্যায়,সব পাপ জেনেবুঝেও চেপে রেখেছি কেবল পরিবারের জন্যে। নিজের প্রিয় ভাই,প্রিয় বন্ধুর শেষ নিঃশ্বাসের সাক্ষী ছিলাম ওই অতটুকু বয়সে। সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে একজন নারীকে দেখেছি অনিচ্ছায় স্বামীর সাথে জীবন কাটিয়ে দিতে। এত কাঁটাছেড়া, আর এত যন্ত্রণা নিতে নিতে, গুমড়ে গুমড়ে একটা পাথর হয়ে গিয়েছিলাম আমি। যার মাঝে সংসার,জীবন নিয়ে কোনো সুন্দর মানে ছিল না। যার বেঁচে থাকার জন্যে আলাদা কোনো স্বপ্ন ছিল না। আমি চাইনি ভালোবাসা ছাড়া তুশির সাথে সংসার পাতাতে। চাইনি সের্ফ বিয়ে হয়েছে বলে,সেই দোহাই দিয়ে ওকে আমার জীবনে আটকাতে। আমি চেয়েছিলাম ও ভালো থাকুক,ওর মতো চঞ্চল পাখি মুক্ত থাকুক আমার মতো পাথরের থেকে। ও আমাকে পছন্দ করলেও,আমার পক্ষ থেকে তো কিছু ছিল না। তাহলে কেন আমি শুধু শুধু ওর জীবন নষ্ট করতাম? তুশির যে ভালোলাগা আমার প্রতি তৈরি হয়েছিল, তা নিশ্চয়ই একদিন ঠিক হবে ভেবেছি। আমার তো কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না। আমি শুধু চেয়েছি সবাই ভালো থাকুক,শান্তিতে থাকুক। অথচ সেদিনও যদি বুঝতাম, আমি কী চাই,এই ভুল আমি করতাম না। আপনার পরিকল্পনার কাছে আমি তুচ্ছ! আমি পারিনি, সৈয়দ সার্থ আবরার তুশিকে দূরে রাখতে চাইলেও নিজে দূরে থাকতে পারেনি। আপনি তো জানেন, একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে সারাজীবন আমি ন্যায়ের পথে চলেছি। কোনোদিন কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দিইনি। অপরাধীকে ছাড় দিইনি কখনও। কখনো কারো ওপর জুলুম করিনি। নিজের রক্ত ঝরিয়ে হলেও, চেষ্টা করেছি প্রতিটা মানুষকে ন্যায় পাইয়ে দিতে। সারাজীবন আপনার কাছে আমার মায়ের সুখ চেয়েছি। ছোটো মায়ের মেয়েকে খুঁজে পেতে দোয়া করেছি। আর চেয়েছি আমার বাবার হেদায়েত । আপনি সব দিয়েছেন। কিন্তু এই প্রথম বার আপনার কাছে আমি নিজের জন্যে চাই, সম্পূর্ণ আমার জন্যে চাই। আমার তুশিকে ফিরিয়ে দিন। আমার আয়ু ওকে দিন। তাও ওকে আমার কাছে দিন।”
অয়নও সালাম শেষ করে মোনাজাত ধরল।
দুচোখ বুজে মনে মনে বলল,
“ আল্লাহ আপনি জানেন,সবাই তুশির পরিচিতি, তুশির অবস্থান জেনে ভালোবাসলেও আমি শুধু তুশিকে তুশির মতো করে ভালোবেসেছি। ও যেমন, তেমন ভাবে আমি ওকে আমার মনে জায়গা দিয়েছি। ওর পড়াশোনা,ওর নাম পরিচয় কিচ্ছু দেখিনি,কিচ্ছু না। আপনি তো জানেন, আমি কোনোদিন কারো ক্ষতি করিনি,কারো খারাপ চাইনি। সব সময় বিনা পয়সায় অসহায় মানুষের চিকিৎসা করেছি। কখনো একটা হক নষ্ট করিনি কারো। আমি জানি তুশির মনে ভাইয়ার জন্য সফটকর্ণার আছে। কিন্তু বিয়ের পর কি সেসব ঠিক হবে না? এমন তো কত হয়, একজনকে ভালোবেসে আরেকজনকে বিয়ের পর সেই দুজনই খুব সুখে থাকে। তাছাড়া আপনি তো জানেন,ভাইয়া ওকে মন থেকে ভালোবাসে না। কেবল আমার থেকে কেড়ে নিতে এমন করছে। যাকে ও অবহেলায় ছুড়ে ফেলেছিল,কেউ একজন তাকে আগলে রাখতে চাইছে বলে ইগোতে লেগেছে ওর। আমার উদ্দেশ্য খারাপ নয়। আমি তুশিকে নিয়ে ভালো থাকতে চাই। আমাকে ফেরাবেন না আপনি। আমার তুশিকে সুস্থ করে দিন।”
নামাজ শেষ করে দুই ভাই একইসাথে বাইরে এলো। দেখা হলো জুতো পরতে গিয়ে। মুখোমুখি তাকাল ওরা। অয়ন বিদ্রুপ করে বলল,
“ কী চাইলে? তুশিকে বুঝি!”
সার্থ খুব ঠান্ডা চোখে বলল,
“ যে শুরু থেকেই আমার,তাকে আর নতুন করে চাইব কেন!”
অয়নের ব্যাঙ্গাত্মক হাসিটা দপ করে নিভে গেল অমনি। সার্থ আর দাঁড়াল না,চলে গেল করিডোরের দিকে। সেই পথে ক্ষুব্ধ চোখে চেয়ে রইল সে।
রাত তখন অনেক। আইসিইউএর সামনে বেশি মানুষ নেই। হঠাৎ ফোন বাজল সার্থর। শরীফ কল করেছে। সঙ্গে সঙ্গে ধরল ও। সরে এলো এপাশে।
“ বলো।”
“ স্যার,স্যার বাইক পেয়েছি। আয়সাল নামে এক লোকের স্যার। সিরিয়াল কিলার। খবর নিলাম এইসময় ও পাবে থাকে।”
সার্থর মুখটা শক্ত হলো অমনি।
“ আমি আসছি। জিপ রেডি করো।”
“ ওকে স্যার।”
সার্থ ফোনের লাইন কেটে আইসিইউ এর দিকে চাইল এক পল। অনুমতি ছাড়া ভেতরে ঢোকা বারণ। তাও সতর্ক চোখে আশপাশ দেখল সে। হসপিটাল কর্তৃপক্ষের কেউ নেই এখন। অমনি ও চট করে দরজা ঠেলে ঢুকে গেল ভেতরে।
জামিল দেখল ব্যাপারটা। সহসা চোখ বড়ো করে ফেলল । পরপর তাকাল অয়নের দিকে। দরজা নড়ছে। অয়ন যেই ওদিকে ফিরতে যাবে,ও তাড়াহুড়ো করে ওর ঘাড় ধরে সামনে ঘুরিয়ে বলল,
“ অয়ন, ওই ওই দেখো…”
সামনের দেওয়ালে ইশারা করল জামিল। অয়ন দেখল,বুঝতে না পেরে বলল,
“ কী?”
“ দেওয়ালের রং-টা। আমি আসলে ফ্ল্যাট কিনছি তো। সেম রং।”
অয়নের মেজাজ চটে গেল। রেগে রেগে বলল,
“ হ্যাভ ইউ লস্ট ইয়র মাইন্ড জামিল ভাই? এতটাও সিলি হতে নেই।”
তারপর সে মূর্তির মতো বসে থাকা ইউশার দিকে চায়। বলে,
“ চল,হাত মুখ ধুবি। কী অবস্থা চেহারার?”
“ লাগবে না।”
“ চুপ,আয়।”
অয়ন নিজেই ইউশার হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল। মেয়েটাও আর গাইগুই করল না! চলল সাথে সাথে।
জামিল ঠোঁট উল্টে,মাথা চুলকে বলল
“ রাগ করো আর যাই করো,আমার কাজ তো হয়েছে।”
হাসপাতালের ফ্লোর জুড়ে জ্বলতে থাকা আলোর ভিড়ে আইসিইউয়ের নিয়ন আলো বড্ড কোমল। তবে একেকটি মেশিনের মাথা ধরা শব্দে সার্থর ভেতরের ভূমিকম্প আরো কয়েকগুণ বাড়ল। তুশি নড়ছে না। ফেলে রাখা পুতুলের মতো পড়ে আছে বেডে। এত বড়ো মাস্ক,স্যালাইন,ক্যানোলার ভার আর ওর কাঁধের পাশের ঐ ব্যান্ডেজ সব দেখে সার্থর বুক মুচড়ে ওঠে। আচ্ছা,মেয়েটা না ইঞ্জেকশানে ভয় পেতো? সেই যে একবার টিটেনাস দিতে গিয়ে ওর হাত খামচে ধরেছিল! তাহলে আজ,আজ এত বড়ো বড়ো কাঁটাছেড়া,এত বড়ো বড়ো ক্ষত তুশি সইল কেমন করে? আজ তো পাশে সার্থ ছিল না। ভয়ের তোড়ে কার হাত ধরল তুশি?
সার্থ এক পা এক পা করে হেঁটে আসে। সেই পায়ের শব্দ মেঝেটাও টের পায় না। তার বুকের ধার সহ চোখ দুটোও টলমল করে খুব। হৃদয়ের চার প্রকোষ্ঠে গোপন সুরে বিরহ নিয়ে বাজে,
“ যায়, নিভে যায়,
এ মনের আশা জোঁনাকি
আয়, ফিরে আয়,সে কথা বলা যে বাকি!
নিভে যাওয়া দিনগুলো তোর স্মৃতি জ্বেলে দিলো,
কী করে যে নিভিয়ে আঁখি! ওওওওও….ওহোহো…”
ধীরুজ কদমে মেয়েটার পাশে এসে বসল সার্থ। ঐ পাংশুটে মোমের মতো মুখটায় চেয়ে রইল কিছু পল। তারপর আস্তে, খুব আস্তে তুশির ক্যানোলা পরা হাতটা তুলল মুঠোতে। সার্থর স্পষ্ট মনে আছে সেদিনের কথা, যেদিন তুশির সাথে ওর প্রথম দেখা হয়। যেদিন প্রথম এই হাত ধরে ও। একটা কোকড়া চুলের ফরসা মেয়ে, শার্ট প্যান্ট পরে পকেট কাটতে এসেছিল। মাঝপথেই খপ করে তার হাতটা চেপে ধরেছিল সে। তারপর থানায় নিতেই মেয়েটা ভুলভাল ইংলিশে বলেছিল,
“ লম্বা সার, গো মি স্যার পিলিচ!”
অতীত ভেবে একটু হাসল সার্থ। পরপর মুখশ্রী ডুবে গেল আঁধারে। জিজ্ঞেস করল ধরা স্বরে,
“ খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না তুশি? খুব ব্যথা করছে? অবশ্য এর চেয়েও বেশি ব্যথা তো আমি তোমায় দিয়েছি। তুমি ভেবো না, এবার ফিরে এলে আমি আমার সব ভুল শুধরে নেবো।”
পরপরই ওর চিবুক কঠিন হয়ে গেল। চোখের খাজে আগুনের ফুলকি নিয়ে বলল,
“ তার আগে যারা এর জন্য দ্বায়ী, আমাকে তাদের মুখোমুখি হতে হবে।
খোদার কসম করে বলছি,ওদের না ধরা অবধি আমি তোমার এই রক্তমাখা শার্ট শরীর থেকে আলাদা করব না।”
সার্থ উঠে দাঁড়াল। তুশির এক হাত মুঠোয় রেখেই ঝুঁকে গিয়ে নিবিড় ছোঁয়ায় হাত বোলাল ওর মাথায়। পরপর আরো নিচু হয়ে দুটো নরম ঠোঁটের স্পর্শ রাখল কপালে। সরে আসতে চেয়েও থামল, মেয়েলি অসুস্থ মুখটায় চেয়ে রইল কিছু পল।
পরপর এক নিঃশ্বাসে আওড়াল,
“ স্যানোরিটা,
আই লাভ ইউ!”
চলবে…
কাছেআসারমৌসুম!_(৫৯-খ)
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
রাত আনুমানিক শেষের পথে। ফজরের আযান পড়বে যে কোনো সময়। এখনো জ্বলজ্বল করছে সরব থানার আলো।
আয়সাল নামের লোককে ধরার জন্যে সাই সাই বেগ নিয়ে পুলিশের দুটো জিপ ছুটেছিল মাঝরাতের দিকে। কিন্তু বিশেষ লাভের লাভ হয়নি। শরিফ ভুল খবর পেয়েছিলেন। কারণ বাইকের নেমপ্লেট ভুয়া। জানা গেছে,আয়সালই তার বাইক সাড়তে দিয়েছিল গ্যারেজে। সেখান থেকে কদিন আগে বাইক চুরি হয়ে গিয়েছে। এজন্যে গ্যারেজের মালিক একটা ভালো অঙ্কের ক্ষতিপূরণও দিয়েছিল তাকে। সব প্রমাণ পেয়ে সার্থ বুঝে ফেলল,যে বাইকে খুনী গুলি করে ছুটেছে সেটাই ওই চুরি করা বাইক। এ নিয়ে গোটা টিমের মাথাই এলোমেলো হয়ে গেল এবার। এখন কোত্থেকে খুনীকে খোঁজা শুরু করবে,প্রশ্নের একটা আস্ত গোলকধাঁধায় তলিয়ে গেল সবাই। নির্ঘুম কাটল সেই রাত। সার্থ
ল্যাবে বুলেট এনালাইসিস করতে পাঠিয়েছিল আগেই। আর সেই থেকেই হাতে প্রথম ক্লু-টা আসে।
হুট করে নিজের কক্ষে মাস ছয়েক আগের একটা ফাইল নিয়ে বসে পড়ল সে। সকাল আটটা বাজে তখন। গোটা রাত ছোটাছুটি করায়,শরিফ দিশেহারা ঘুমে। বেশ অনেকদিন পর কোনো কেস নিয়ে এরকম দৌড়াদৌড়ি যাচ্ছে। ভদ্রলোক চুপ করে পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। সার্থ এ পাতা – ওপাতা উলটে দেখল কিছুক্ষণ। আচমকা মোটা ফাইলে হাতের উল্টো পিঠের বাড়ি দিয়ে বলল,
“ ইয়েস!”
তটস্থ চোখে চাইলেন শরিফ- কিছু পেলেন স্যার?”
“ একই ক্যালিবারের বুলেট। থ্রো এন্ড থ্রো, যাতে না বাঁচে। একই মডেল দুটোই। এর মানে মাস ছয়েক আগে যে খুনের কেসটা এসেছিল, সেটা এই খুনীরই করা।”
শরিফ মনে করে বললেন,
“ ওই কেসটা তো মাহফুজ স্যার দেখছিলেন। প্রমাণ টোমান পায়নি দেখে ফাইল ক্লোজ হয়ে যায়।”
সার্থ ব্যস্ত স্বরে বলল,
“ কল হিম, কুইক।”
শরিফ সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোনের রিসিভার তুললেন। এই ভোর ভোর ফোনের ক্রিং ক্রিং শব্দে বিরক্ত হলেন মাহফুজ। কোনোরকম ধরলেন মুখ কুঁচকে,
“ হ্যাঁ, কে?”
“ এ এস পি সার্থ আবরার বলছিলাম।”
“ ওহ, অফিসার। মিস্টার শফিকের কাছে শুনলাম আপনার ফ্যামিলি মেম্বরের ওপর অ্যট্যাক হয়েছে?”
“ আমি সেই কেস নিয়েই বসেছি। ছ মাস আগের সেই অস্ত্র প্রচারের কেস তো আপনি দেখেছেন। খুনী ধরা পড়েনি কেন?”
মাহফুজ হতাশ সুরে বললেন,
“ কী আর বলব! পুলিশি হাল সম্পর্কে তো জানেনই। আমি একা আর কী করব? রোজ নতুন কেস জমা হয়। কিলারের চেহারা দেখা যায়নি,কোনো শক্ত প্রমাণ নেই। ব্যস, কেস ক্লোজড।”
“ ওখেই।”
সার্থ ফোন রেখে দিলো। দুই ভ্রুয়ের মাঝখানে আঙুল দিয়ে ডলল কিছু সময়। হুট করে বলল,
“ শরিফ, এক কাজ করো। ওই গ্যারেজ, যেখান থেকে আয়সালের বাইক চুরি হয়েছে, তার আশেপাশের সব রুটের সিসি ক্যামেরা কালেক্ট করো। বাইক নিয়ে কোনো না কোনো রুটে তো কিলার গিয়েছেই।”
“ ইয়েস স্যার। এক্ষুনি করছি।”
শরিফ চলে গেলেন দলবল নিয়ে।
সার্থ ফোস করে শ্বাস ফেলল। এক পল চাইল নিজের শার্টের দিকে। রক্ত শুকিয়ে আঠা হয়ে আছে। উঠে দাঁড়াল ও। ওয়াশরুমে ঢুকল ফ্রেশ হতে। একটা লম্বা শাওয়ার নিয়ে আবার ওই একই শার্ট পরল। ফোন তুলে কল দিলো ইউশার নম্বরে। মেয়েটা ধরছে না। ফোন কি সাথে নেই? এবার জামিলকে কল দিলো ও। জামিল হাসপাতাল থেকে রাতে বাড়ি ফিরেছে। ঘুমোচ্ছিল। আধো ঘুম জড়ানো স্বরে বলল,
“ হ্যাঁ বল। কোথায় তুই?”
“ ওর কী অবস্থা?”
“ আমি রাতে চলে এসেছি। এখন আবার যাব। খবর তো কিছু পাইনি। অয়ন জানাবে বলেছিল। কিন্তু তুই কোথায় গেলি অত রাতে?”
“ জামিল আমি কাজে আছি। তুই খেয়াল রাখিস সবার। আমি কবে বাড়ি ফিরব জানি না।”
জামিল আর্তনাদ করে বলল – সে কী! এ..”
বাকিটা বলার আগেই লাইন কেটে দিলো সার্থ। পরপর কল দিলো হাসপাতালে ওর চেনা সেই ডাক্তারকে।
“ আমি সার্থ বলছিলাম।”
“ ওহ অফিসার! আপনার পেশেন্টের ইয়েট নো রেসপন্স। অবস্থার কোনো উন্নতি নেই।”
সার্থ নরম চোখে ঢোক গিলল। বলল,
“ ডক্টর,আমি জানি। আপনি প্লিজ সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। আর ওর একটা আঙুলও যদি নড়ে,খবরটা সবার আগে আমাকে দেবেন,আই রিকোয়েস্ট ইউ!”
“ জি জি নিশ্চয়ই। আপনার কাজিন তো?”
“ না।”
“ তাহলে?”
“ শী ইজ মাই ওয়াইফ!”
সার্থ ফোন রেখে টেবিলে দুহাত ভর দিয়ে শরীর ছেড়ে দিলো। ঝুঁকে থেকে মাথা নুইয়ে রইল কিছু ক্ষণ। যতক্ষণ না রুহানকে না ধরবে,তুশির সামনে ও দাঁড়াবে না। কোন মুখে দাঁড়াবে? কী বলবে গিয়ে? যখন তুশির প্রতি ওর কোনো অনুভূতি ছিল না,তখনও মেয়েটাকে কেউ একটা বাঁকা কথা বললে সহ্য হয়নি ওর। সেখানে আজ সার্থর রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে তুশি,তাহলে আজ ওর ওপর এত বড়ো আঘাতটা সার্থ মানবে কী করে?
কিন্তু কীভাবে ধরবে রুহানকে? কোত্থেকে শুরু করবে? এতগুলো দিন খুঁজেও ওকে পায়নি। রুস্তম দেশ ছেড়েছেন ছেলে জেল থেকে পালানোর দশদিন আগে। এসব যে একটা ছক,বোঝে ও। কিন্তু এখন কার মাধ্যমে কোথায় পৌঁছোবে? যেখানে দিক নেই,সেখানে দিকভ্রান্ত না হয়ে উপায় আছে আর?
সময়টা বড়ো তাড়াতাড়ি চলছে। সকাল থেকে দুপুর গড়াল,দুপুর থেকে বিকেল। গ্যারেজ থেকে আশেপাশে যত মোড়,গলি গিয়েছে সব জায়গার সিসি ফুটেজ কালেক্ট করতে করতে রাত নেমে এলো। এক একজন, এক এক কম্পিউটারের সামনে বসল ভিডিও চেইক করতে। সন্দেহভাজন কাউকে দেখলেই ওই ভিডিওতে ডাক পড়ার নির্দেশ জারি করা। বেশ অনেকটা সময় পর সহকারী এস আই সাগর চ্যাঁচালেন,
“ স্যার স্যার…”
সার্থ তড়িঘড়ি করে ওই মনিটরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ভিড়ল বাকিরাও। সাগর ভিডিও পেছনে টানলেন। একটা ভাঙা বাড়ির সামনে এক যুবক বাইক থামিয়েছে। এদিক ওদিক দেখে তারপর পাতা, খড় আর ডালে ঢেকে দিয়েছে সেটা। রাতের ফুটেজ কিন্তু স্পষ্ট বোঝা গেল ওসব। সঙ্গে সঙ্গে বাটন টিপে পজ করল সার্থ। জুম করতেই পুরো স্ক্রিনজুড়ে ভেসে রইল সেই যুবকের সাবলীল চেহারা। শরিফ বললেন,
“ এই ছেলেই কী স্যার? ফিটনেস আর বাইক তো একই দেখতে লাগছে।”
সার্থ বুক চিতিয়ে দাঁড়াল। ঠোঁটে বিজয়ের সূক্ষ্ণ ছাপ পড়ল সহসা।
কিড়মিড় করে বলল,
“ ক্যাচ দ্যাট বাস্টার্ড এনি ওয়ে…”
খুনীর নাম ফরহাদ মোল্লা। বয়স আনুমানিক ৩৪ এর মতো হবে। কমলাপুর রেলস্টেশনের পাশে পুরোনো পোড়া বাড়ি থেকে পুলিশ অস্ত্র সমেত ধরল ওকে । আনুমানিক রাত ১টা বাজে তখন। কিন্তু ছেলেটার মুখে ভয়ডরের চিহ্ন মাত্র নেই। শরিফ ওকে গারদের ভেতর ধাক্কা দিয়ে ঢোকালেন। সেন্ট্রি তালা দিতে যাবেন,ও তক্ষুনি গা দুলিয়ে বলল,
“ আমারে আটকাইয়া লাভ নাই স্যার। একটা কল দিলে রাইত পোহানোর মইধ্যে জামিন আসলো বইলা! আমাগো থানায় রাখা যায় না।”
সার্থ সবে নিজের কেবিনের দরজা অবধি গিয়েছিল, কথাটা শুনেই পায়ের রক্ত মাথায় উঠল ওর। অমনি হনহন করে এসেই সেন্ট্রিকে ঠেলে সরিয়ে নিজে ভেতরে ঢুকে গেল। শরিফ বিড়বিড় করে বললেন,
“ ব্যস,হয়ে গেল।
ব্যাটা তোর কপালে দুঃখ আছে।”
সার্থকে এমন দানবের মতো সামনে এসে দাঁড়াতে দেখে ছেলেটা ঘাবড়ে গেল একটু। শ্বাস ফেলতেও পারল না, একেবারে ওর বুকের হাড় বরাবর দড় এক লাথি মারল সার্থ । ঐ এক লাথিতেই ফরহাদের মুখ থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে এলো৷ প্রকট চোখে চাইতেই
সার্থ থাবা মেরে কলার ধরে কাছে টেনে আনল, পরপর ওর আস্ত শরীরটা ছুড়ে মারল দেওয়ালে। সিমেন্ট ঘষা ওই শক্ত দেওয়ালে থুবড়ে পড়ে,ফরহাদ প্রচণ্ড এক বাড়ি খেলো মাথায়। মনে হলো এক্ষুনি ভেতরের কোষ ফেটে বাইরে ঠিকড়ে আসবে। এক ঘায়ের পর ফরহাদের শরীর বলের মতো ছিটকে এলো আবার। সার্থ চিড়বিড় করে বলল ,
“ শুয়ারেরবাচ্চা, মানুষ মেরে আবার দাঁত কেলাস? তাও আমার সামনে!
ভেবেছিলাম তোকে দু মিনিট বিশ্রাম নিতে দেব। কিন্তু দিলি মেজাজ চড়িয়ে। এখন বাপের নাম বলবি,নাকি…”
ফরহাদ হড়বড়িয়ে বলল,
“ আমি বলতে পারমু না। আমাগো নিয়ম নেই।”
“ জানতাম এটাই শুনব। শরিফ…”
“ জি স্যার।”
“ এটাকে আন্ডারগ্রাউন্ড সেলে নেয়ার ব্যবস্থা করো। ওখানেই ওর খাতির-যত্ন করব।”
ফরহাদ ভড়কে বলল,
“ আন্ডারগ্র্যাউন্ড সেল?”
শরিফ হেসে হেসে ফিসফিস করে বললেন,
“ টর্চার সেল৷ আসলে এখানে তো কাউকে মন ভরে পেটানো যায় না। তাই আমাদের যাদের পেটাতে ইচ্ছে হয় সেখানে নিয়ে যাই। সিক্রেট সেল তো! শুধু লাঠির বাড়িও না,
ইলেক্ট্রিক শকও দেয়া হয়। সেবার তো সার্থ স্যার,একজনের আঙুলের নখই উপড়ে দিয়েছিল।”
ফরহাদের চোখ বাইরে ছিটকে এলো। ত্রাসে জবুথবু হয়ে চাইল সার্থর পানে। এদিকে
সার্থ নিজেই হতভম্ব হয়ে ভাবল,
“ ও আবার কখন কার আঙুলের নখ তুলল? শরিফ শেখানো বুলি আওড়াতে গিয়ে একটু বেশিই বলে ফেলল না?”
কিন্তু ব্যাপার সে বুঝতে দিলো না। উলটে ক্রুর হেসে বলল,
“ ওখানে নিলে তোকে তো আর থানায় খুঁজে পাবে না। জামিনটা করাবে কে হুঁ?”
ফরহাদকে দেখেই বোঝা গেল ও ভয় পেয়েছে। একে এই মার, ব্যথা-যন্ত্রনায় সারামুখ জ্বলছে। পেট টনটন করছে। সিনেমা-টিনেমায় আয়রন সেল তো দেখেছে অনেক। এর মানে এসব সত্যি হয়?
ছেলেটা ঢোক গিলে বলল,
“ দেখেন স্যার,
আমি আসলে সাতে-পাঁচে থাকি না। টাকা পাইলে কাম করি। আপনারে মারতে ফোন আইছিল। কইছিল করতে পারলে ৫ লাখ দিবো। আমি রাজি হইছি। তারপর এডভান্স দুই লাখ দিছে। বাকিটা কাম শেষে পাওয়ার কথা, কিন্তু টার্গেট মিস হওয়ায় আমি নিজেই ওগো ফোন ধরিনাই।”
সার্থ সরু চোখে বলল,
“ ফোন করেছিল যে,তার নাম কী?”
“ ওসব কয়নাই। আমি অত জিগাইওনাই। টাকা দিয়া আমাগো লেনদেন,পাইলেই হইল। আর ফিরতি ফোন দিলে ওই নাম্বারও বন্ধ কইতো।”
সার্থ ঠোঁট কামড়ে ভাবল,
বলল,
“ আর টাকা? সেটা কীভাবে নিয়েছিস?”
“ আমার আস্তানার সামনের রোডে একটা পোড়া দোকান আছে। ওইখানে গর্ত খুড়ছিলাম। রাইখা যাইতে বলছিলাম রাতের দিকে। তারপর ওগো এক লোক আইসা রাইখা গেছে।”
সার্থ শরিফের দিকে চেয়ে ইশারা করল কিছু। সাথে সাথে তিনি চললেন কোথাও।
সার্থ বেরিয়ে আসতে নিলেই ফরহাদ চ্যাঁচাল,
“ আমারে তাইলে আর ওইখানে নেবেন না তো?”
উত্তর দিলো না ও। বেরিয়ে এলো। ফরহাদ বলল,
“ আমারে তাইলে একটা কল করতে দেন।”
সার্থ যেতে নিয়েও থামল। ঘাড় ভেঙে তাকাল টেবিলে। সাদা রুমালের ওপর ফরহাদের মোবাইল,পিস্তল, বাইকের চাবি রাখা। গিয়ে মোবাইল ফোনটা তুলল ও। ফরহাদ ভাবল ওকে দেবে। অথচ ওকে চমকে দিয়ে সার্থ ফোনটা নিজের পকেটে ভরে ফেলল। ছেলেটা উদ্বীগ্ন হয়ে বলল,
“ ও স্যার,ফোনটা দেন স্যার…ফোন না দিলে জামিন হইব ক্যামনে হায়হায়।”
সার্থ যেতে যেতে গোটা থানায় ঘোষণা দিলো,
“ আমরা যে একে ধরেছি,এর একটু শব্দও যেন বাইরে না যায়।”
সবাই মাথা নাড়ল একইসাথে,
“ ওকে স্যার।”
ফরহাদ যে পোড়া দোকান আর গর্তের কথা বলেছিল, মিলেছে সেটা। কিন্তু সেখানকার কাছাকাছি কোনো সিসিক্যামেরা না থাকায়, সুরাহা পাওয়া গেল না।
এদিকে ঘড়িতে সময় কাটছে । মাঝে বারবার জামিলকে ফোন করে খবর নিলো সার্থ। তুশির এখনো কোনো রেসপন্স নেই। যন্ত্রপাতির সবগুলো কাঁটা ঐ একই জায়গায় স্থির।
দ্বিতীয় রাত পার হলো,
কিন্তু এক ফোঁটা ক্লু পেলো না সার্থ। হঠাৎ ম্যাসেজ এলো ফোনে।
জামিল পাঠিয়েছে :
“ডাক্তার বললেন,আজকের দিনটা দেখবে। তারপর ভালো-মন্দ বলবে। দোয়া করিস!
আর তোর হবু বউ এসেছে তোর এক্স বউকে দেখতে।”
সার্থর গলা সুদ্ধ তেতো হয়ে গেল। দুম করে ফোন ছুড়ে রাখল টেবিলে। জামিল,বকের মতো লম্বা একটা ছেলে; কিন্তু কখন কোন সিচুয়েশনে কী বলতে হয় এখনো বুঝলো না।
ও চেয়ারে বসে রইল দুহাতের মুঠোয় কপাল নুইয়ে। চিন্তায় মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে।
শরিফ এসে দাঁড়ালেন তখনই। ডাকলেন আস্তে,
“ স্যার!”
সার্থ মাথা তুলল না। চুপ রইল। উনি নিজেই বললেন,
“ বাড়ি যাবেন না, স্যার? দুটোদিন থানাতেই আছেন।”
“ তুমি চাইলে যাও।”
“ না না স্যার,আপনাকে রেখে আমি যাই কী করে? স্যার তাহলে কিছু খাবার আনাব?”
সার্থ মুখ তুলে চাইল। কপালটা বেঁকে বসল আচমকা। তেমন ঝট করেই বলল,
“ শরিফ… ফরহাদকে এখানে নিয়ে এসো তো।”
ভদ্রলোক একটু ভীমড়ি খেলেও,রওনা করলেন ত্রস্ত। ফরহাদ এলো ভয়ে ভয়ে। ওর কপাল ছুলে গেছে কাল দেওয়ালে এক বাড়ি খেয়ে। থানা থেকে ফাস্টএইড দিয়েছে আপাতত। জড়সড় হয়ে দাঁড়াতেই সার্থ ভ্রুয়ের ইশারায় চেয়ার দেখাল,
“ বোস।”
এক পল বিভ্রান্ত চোখে শরিফের দিকে দেখল ছেলেটা। অমনি পিঠে ধাক্কা মারলেন তিনি,
“ বস শালারপুত,আমার মুখের দিকে কী দেখোস?”
চেয়ার থেকে পড়ে যেতে যেতেও, নিজেকে সামলে বসল ফরহাদ৷ সার্থ ওপাশ থেকে উঠে এলো। ফরহাদের চেয়ারটা ঘুরিয়ে ফেরাল নিজের দিকে। ভীষণ ডরে মিইয়ে গেল ছেলেটা।
ওর পাশের চেয়ারের হাতলে বসল সার্থ।
ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“ এর আগে কটা খুন করেছিস?”
“ ছ-ছয়টা।”
“ কাকে কাকে?”
“ অন্য জেলায় স্যার। ঢাকায় করছি এইটা সহ তিনটা। প্রথমটায় এক রাইতেই জামিন হইছিল। আর পরেরটায় ধরতে পারেনাই।”
শরিফ দাঁত খিচিয়ে বললেন,
“ একদম পাছার মধ্যে দিতে হয়। মানুষ মারোস ক্যামনে,দুনিয়ায় আর কাম নাই?”
ফরহাদ চুপ করে রইল। সার্থ বলল,
” তুই বললি ওদের সাথে নিজে যোগাযোগ করতে পারিসনি। কারণ ফোন বন্ধ থাকতো। তাইত?”
“ জ-জি।”
“ এর মানে ওরাই তোকে কল করেছে। আর সেটা নিশ্চয়ই একটা নির্দিষ্ট সময়? কখন সেটা?”
ফরহাদ হতবাক হয়ে চাইল। বাপ্রে,কী মাথা!
বলল থেমে থেমে,
“ ন-নয়টায়।”
“ রাত?”
মাথা নাড়ল ও। সার্থ আড়চোখে দেওয়াল ঘড়িতে তাকায়। আটটা বাজে এখন।
বলল,
“ আমাকে গুলি করতে আসার পর ওদের সাথে তোর আর কোনো কথা হয়নি?”
“ না স্যার। মারতে গেছি আপনারে,মরছে এক মাইয়া। তাও আপনার সাথের। পাব্লিক ধরলে ধোলাই খাইতাম,আর আপনেরা ধরলে তো… আমাগো নিয়ম আছে মার্ডারের দুইদিন লুকাই থাকতে হয়। ফোন-টোন বন্ধ রাখতে হয়। এরপর হাওয়া ঠান্ডা হইলে আবার আগের মতো।”
অমনি শরিফ পেছন থেকে ওর মাথায় থাপ্পড় মেরে বললেন,
“ হারামির বাচ্চা আবার মুখ নাইড়া কয় এইগুলা। করে খুন,তাতে আবার নিয়ম!”
সার্থ বলল – “ শান্ত হও। শোন ফরহাদ,
এর মানে তুই ওদের খোঁজ দিসনি যখন, ওরাই তোর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করবে।
তাহলে হিসেব মতো আজ রাত নয়টায় ওরা তোকে আবার কল করবে।”
“ করতে পারে স্যার।”
সার্থ বিড়বিড় করে বলল,
“ পারে না,করবেই…”
এক ঘন্টা কাটল চোখের পলকে। গোটা কক্ষ নিস্তব্ধ এখন। মাথার ওপর একটা মাত্র টিউবলাইট জ্বলছে। যাতে স্পষ্ট ভেসে আছে ফরহাদের ফ্যাকাশে চেহারা। বারবার হাত তুলে কপালের ঘাম মুছছে সে। হাতে ফোন,ঠকঠক করছে আঙুল। মাঝে এক পল চোখের কোণ তুলে সার্থর নিরেট চিবুকে চাইল। স্থির নজর ঘুরিয়ে দেওয়ালঘড়ি দেখছে সে। পাশের টেবিলে কয়েকটা মনিটর চলছে। গ্রাফ,টাইমার আর ম্যাপের ছবি। মাঝে শান্ত হয়ে থমকে আছে লাল এক চিহ্ন। সবার চোখে অপেক্ষা। নয়টা পেরিয়েছে ঘড়িতে। ঠিক নয়টা পনের নাগাদ ফরহাদের ফোন বেজে উঠল। অমনি নড়েচড়ে বসল সবাই। ও রিসিভ করতে গেলেই সার্থ শান্ত স্বরে হুশিয়ারি দিলো,
“ যতক্ষণ আমি না বলব,লাইন যেন না কাটে।”
ঘাড় নাড়ল ফরহাদ। ধরল ফোনটা। ওপাশ থেকে এক পুরুষ কণ্ঠ বলল,
“ কী রে ভাই,তোমার খবর কী? ফোন ধরো না ক্যান?”
ফরহাদ সার্থর দিকে চাইল। ভ্রুয়ের ইশারায় কথা এগোতে বোঝাল সে।
ও বলল,
“ ঘুমে ছিলাম। আর আমি কইছি না,এক দুইদিন ফোনে না জ্বালাইতে!”
“ হোপ শালা,আমাগো টেনশনে রাইখা ঘুমাইতেছিলা? ওদিকের কী খবর কও?”
“ ক্যান আপনেরা খোঁজ নেননাই?”
“ পাগল! ভাই সাফ সাফ কইছে থানার আশেপাশে না থাকতে। কারো সন্দেহ যেন নাহয়। কিন্তু পাব্লিক প্লেসে মারলে তো টিভিতে দেখায়,ফুটেজ মুটেজ থাকে। কোথাও কিছু পাইলাম না ক্যান? ওই
পুলিশ মরছে, না হাসপাতালে মরতাছে?”
সার্থর রাগ হওয়ার কথা ছিল,কিন্তু ঠোঁটের কোণ তুলে হাসল ও। শরিফের দিকে তাকাল এক পল। তার মুখেও হাসি। মলের আশেপাশের যত সিসিক্যামেরা ছিল সব ফুটেজ ওরা আগেই সরিয়ে ফেলেছিল,যাতে মিডিয়ার হাতে না পরে। তাহলে খুনীকে পাওয়া কঠিন হতো! আরো
সজাগ হয়ে পড়তো সে।
ফরহাদ মিনমিনিয়ে বলল,
“ খবর ভালো না। পুলিশরে গুলি করতে গিয়া এক মাইয়ার গায়ে লাগছে।”
“ কীইইই? শালা কুত্তারবাচ্চা, তুই বালের কিলার! এই জন্যে তোরে দুই লাখ অগ্রীম দিসি? অহন আমি ভাইরে কী কমু! কাম নেয়ার সময় ফাপর নিলি কত। এই তোর কাম? তোর বাপ ওই খয়রুলরে ধরমু আগে। তোরে নিয়ে এত চাপা মারল, তোর দৌড় তো দেখলাম।”
“ দেখেন, বাপ নিয়া কথা কইবেন না। আমি তো পুলিশরে নজরে রাইখাই শ্যুট করছি। ওয় নিচু হইলে আমার কী দোষ?”
“ খানকির পোলা তর্ক করিস না। অহন কই আছোস?”
ফরহাদ সার্থর দিক চাইল। সার্থ আঙুল দিয়ে দেখাল কিছু।
ও বুঝতে পেরে বলল – আছি আমার আস্তানায়।”
“ আইচ্ছা, আন্ডারগ্রাউন্ড হইয়া থাক। বেশি বাইর-টাইর হইস না।”
“ আপনে কই আছেন?”
“ আমি কই তাতে তোর কাম কী? আমি আমার জায়গায় আছি।”
“ ওহ,আমার বাকি টাকা দেবেন না?”
তেতে উঠল সে,
“ আবার টাকা চাস? কোন মুখে চাস? রাখ শালা মুডটাই খারাপ কইরা দিছে। কাম তো পারলই না আবার টাকা মারায়।”
ফোনটা কেটে গেল। টেক অফিসার সাথে সাথে বললেন,
“ গট ইট স্যার। নারায়নগঞ্জ থেকে ফোন করেছে। টাওয়ার এ থেকে সি-য়ের দিকে গিয়েছে। তবে ফোন বন্ধ করে দিয়েছে আবার।”
সার্থ ফরহাদের হাত থেকে ফোন নিয়ে নিলো। বাকিদের দিক চেয়ে বলল,
“ এটাকে ভেতরের সেলে রাখো। যেন চ্যাঁচালেও আমার কানে না আসে।”
ফরহাদ বলল,
“ কিন্তু স্যার আমি তো সাহায্যই করলাম, আমারে ছাইড়া দেন না?”
দুজন পুলিশের লোক তাও টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেল ওকে। শরিফ এগিয়ে এসে বললেন,
“ স্যার, এবার কী করব?”
“ ওরা জেনেছে আমি মরিনি।
মানে এটাও বুঝব আমি এখন ওদের খ্যাপাটে ষাড়ের মতো খুঁজব। ওরা তো লুকোবে শরিফ। যেহেতু রুহানের ছবি দিয়ে আগেই ওয়ান্টেড জারি করা,ও শহর ছাড়বে না। এক কাজ করো,
যে এলাকায় এই লোকেশন ট্রাক হলো,আশেপাশের সব সেইফ হাউস,হোটেলের খবর নাও। ইঁদুর গর্তে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। আমি আজ রাতের মধ্যেই ওকে ধরব।”
সৈয়দ ভবন থেকে আপাতত আনন্দ গায়েব হয়ে গিয়েছে। দুটোদিন কেউ-ই ঠিক করে খাবার মুখে তোলেনি। তাও তনিমা নিয়ম করে রান্নাবান্না করলেন। বাটি ভরে হাসপাতালে পাঠালেন। আজকেও সকাল সকাল বাড়ির দুই কর্তা হাসপাতালে ছুটেছেন। এদিকে রেহণূমা মুষড়ে গেছেন অনেকটা। নামাজে বসলেই কাঁদছেন। হাসনাও তসবি ছাড়ছেন না। বাড়ির সব থেকে ছোটো সদস্য মিন্তু, সেও বারবার আল্লাহর নাম জপছে।
কতবার হাসপাতালে যাওয়ার বায়না ধরল, কেউ নিলোই না ওকে। তনিমা বড়ো টিফিন ক্যারিয়ারে সবার জন্যে খাবার দিলেন আজও। হাসপাতালে ইউশা,জামিল,শওকত,সাইফুল নাসীর আছেন আজ। রোকসানাও সেখানে।
অয়নের আজকে পেশেন্ট এ্যাপোয়েন্টমেন্ট ছিল। ও বাড়ি ফিরল ভোর বেলা। ফ্রেশ হয়ে বের হতেই ফোন এলো। তনিমা এসে দাঁড়ালেন তখনই। শুনতে পেলেন অয়ন সব এপোয়েন্টমেন্ট ক্যান্সেল করে দিচ্ছে। লাইন কাটতেই বললেন রমণী,
“ বাদ দিলি কেন? তুশির তো জ্ঞানই ফেরেনি। দেখে আসতি না-হয়।”
“ এই মেজাজ নিয়ে পারব না। আমি তো আর তোমার বড়ো ছেলে নই। এই অবস্থায়ও তার থানায় নাকি খুব ব্যস্ততা। বাড়িও তো আসেনি,তাই না?”
তনিমা নিশ্চুপ। ও নিজেই বলল,
“ দুদিন ধরে তুশি আইসিউতে পড়ে আছে। কার জন্যে ওর এই অবস্থা? অথচ তাকে
হাসপাতালের সীমানায়ও দেখলাম না। কোনোরকম ভর্তি করিয়ে দিয়েই কাজে বেরিয়ে গেল। দেশকে খুব উদ্ধার করা হচ্ছে।”
“ কী আশ্চর্য, তুই ওকে টানছিস কেন? ও থেকেও বা করবেও কী? তুশি তো ওর কেউ না। তুশির সাথে কি ওর এখন কোনো সম্পর্ক আছে?”
অয়ন কিছু বলতে গিয়েও থামল। তার ভাইয়ের যে তুশির প্রতি হুট করে এত প্রেম জন্মেছে সেটা মাকে জানানো যাবে না। তাহলে ওই পুরোনো বিয়ের দোহাই দিয়ে মা আবার সব উল্টেপাল্টে দেবেন। কথা না বাড়িয়ে কাবার্ড খুলে শার্ট বের করল ও। তনিমা টিফিন ক্যারিয়ার টেবিলে রাখলেন,
“ খাবারটা নিয়ে যাস। ইউশা ওরা সবাই তো না খেয়ে আছে।”
“ আচ্ছা।”
“ পারলে সাথে করে মেয়েটাকে নিয়ে আসিস।”
“ বলেছি অনেকবার। শুনছে না। তুশিকে অনেক ভালোবাসে তো!
তনিমার চোখ ছলছল করে উঠল,
“ ভালো তো ওকে আমিও খুব বাসি। কিন্তু মা ছোটো,হাসনা খালাকে এভাবে রেখে নড়তেও পারছি না।”
অয়ন ফোস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ কষ্ট পেও না মামুনি। এত মানুষের ভালোবাসা রেখে তুশি যেতে পারে না। ও ঠিক ফিরবে দেখো।”
তারপর মারবেল মেঝেতে চেয়ে ভাবল,
“ তুশিকে তো ফিরতে হবেই মামুনি। প্রথম বার কাউকে চেয়ে, আমি এইভাবে হেরে যেতে পারি না!”
চলবে…
২৮০০ শব্দ। আমি এখন থেকে পর্ব আরো ছোটো করব। সাড়ে তিন হাজার শব্দ এক পর্বে না লিখে,এটাই তিন ভাগ করে পোস্ট করব। তাহলে দুদিন পরপর গল্প পাবেন। হলাম না নিয়মিত?🤌#কাছেআসারমৌসুম
Share On:
TAGS: কাছে আসার মৌসুম, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৮
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৬
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৫
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
সমুদ্রকথন পর্ব ১
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৭
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৫