কাছেআসারমৌসুম!
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
( ৫৪)
রোকসানা নিষ্পলক চেয়ে চেয়ে মেয়ের হাস্যোজ্জ্বল মুখখানা দেখছিলেন। এই তো সেদিনও বদ্ধরুমে, সার্থকে চাই,সার্থকে চাই বলে কেমন কান্নাকাটি করল! আর আজ পাওয়ার পরে দেখো, কী সুন্দর হাসছে! তক্ষুনি
জামিল কানের কাছে এসে বড়ো মধুর সুরে ডাকল,
“ আন্টিইইই।”
রোকসানা নড়ে উঠলেন,তাকালেন ফিরে,
“ জি?”
“ পার্টি খুব বোরিং লাগছে। এই সাউন্ডসিস্টেমের মিউজেকে পোষাচ্ছে না। তারওপর দুটো বিয়ের এনাউন্সমেন্ট হলো,একটা কাপল ডান্স হবে না?”
“ কেন হবে না বেটা? অফকোর্স হবে। আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি দাঁড়াও। একচুয়েলি আমার ননাশ খুব ব্যাকডেটেড তো। ওরা এসব পছন্দ করে না। বাট নো ওরিস,আমি কিন্তু একদম ওরকম নই । দাঁড়াও তুমি দাঁড়াও একটু।”
রোকসানা তড়িঘড়ি করে পা চালালেন।
কাপল ডান্সের কথা উঠতেই পার্টিতে শোরগোল পড়ে গেল। চোখের পলকে পালটে গেল লাইটের রং।
শওকত বললেন,
“ বড়োরা তাহলে বসি কোথাও। আমরা আমাদের কথা বলি,বাচ্চারা এঞ্জয় করুক।”
বাকিরা তাল মেলাল।
নাসীর ডাকলেন,” সবাই এদিকটায় আমার সাথে আসুন।”
জামিল গলা তুলে বলল,
“ কোন কোন কাপল ডান্স করবেন,কাইন্ডলি ফোকাস পয়েন্টে পার্টনার নিয়ে আসবেন। ”
আইরিন সাথে সাথে সার্থর দিকে হাত বাড়াল। বলল,
“ প্লিজ?”
সার্থ আড়চোখে তুশিকে দেখল তখন। মেয়েটার ব্যাকুল চোখে এদিকে। উৎকণ্ঠায় গলার শিরা ভেসে আছে। ও
দূর্বোধ্য হেসে ধরল হাতটা,
“ ইয়াহ, শিয়র।”
ততক্ষণে ডান্স ফ্লোরে আরো কজন কাপল ভিড়েছে। আইরিন- সার্থ সেখানে এসেই দাঁড়াল। ইউশা রেগে রেগে বলল,
“ ভাইয়ার রং তামাশা দেখলে গা জ্বলে যায়। বিয়ে করছে, করছে। আবার তোমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে নাচছেও। তোমারও উচিত অয়ন ভাইকে নিয়ে নাচা।”
“ তোমার অয়ন ভাইকে নিয়ে তুমি নাচো।”
ইউশা কাষ্ঠ হেসে বলল,
“ সেই ভাগ্য যদি আমার হতো,আমি কি তোমায় বলতাম?”
“ ভাগ্য মাঝে মাঝে নিজেরও বদলাতে হয়।”
“ তাহলে তুমি কেন পারলে না তুশি?”
তুশির চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মলিন
হেসে বলল,
“ কিন্তু আমি তোমার মতো নিজের ভালোবাসা অন্যকে জোর করে দিতে যাইনি। আমারটা নিজেই চলে গেছে।”
“ তাও আমাদের অনেক মিল। এই যে ভাইয়াও তোমাকে ভালোবাসে না,অয়ন ভাইও আমাকে ভালোবাসে না।
একটা মেয়ের জন্যে এই ব্যাপারটা বোধ হয় সব চেয়ে অসম্মানের। কিন্তু আমাদের জন্যে সম্মানের কী জানো? সেই ভালোবাসার প্রস্থান আমরা হাসিমুখে দেখছি,অন্তত পাওয়ার জন্যে ভিক্ষে চাইতে যাচ্ছি না।”
তুশি ঢোক গিলল। বিরস মুখে ভাবল,
“ আমি কি আদৌ হাসিমুখে পারছি মেনে নিতে? পারছি না। আমার এই চোখ দুটো,আর শূন্য বুকটা জানে প্রতিনিয়ত আমি কতখানি হাহাকারে মরি। কতটা কষ্টে আমার হৃদয় ছিঁড়ে যায়। আমি ওনাকে আইরিনের পাশে মেনে নিতে পারি না। এখনো পারছি না। কিন্তু আমাকে চেয়ে থাকতে হবে। দেখতে হবে ওদের। নাহলে উনি ভাববেন আমি দূর্বল। আমি ওনার কাছে দূর্বল হতে চাই না ইউশা। তাতে ভেতর ভেতর মরে গেলেও, না।”
জামিল এসে অয়নের কাঁধে হাত রাখল।
“ অয়ন ভাই!”
ফোন তাড়াতাড়ি পকেটে ভরে তাকাল সে,
“ জি?”
“ এখানে এসে এত কী কথা ফোনে?”
“ ডাক্তার হলে যা হয়। যখন তখন ইমার্জেন্সি।”
মাথা নাড়ল জামিল,
“ ওখেই। তা তোমার হবু বউ নিয়ে নাচবে না?”
অয়ন ফোস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ ও বোধ হয় এসব পছন্দ করে না।”
“ আরে বোকা,পছন্দ দিয়ে কী করবে? টেনে নিয়ে যেতে হয়। এই সুযোগ, এসব গান- ফান বাদ দিয়ে নিজে গাও আর তালা তালে দোলাও। ইমপ্রেস না হয়ে যাবে কোথায়?”
“ চেষ্টা করব বলছেন?”
“ অফকোর্স। যাও যাও…”
অয়নকে ঠেলে পাঠিয়ে, জামিল ক্রুর হেসে জুসে চুমুক দিলো। বিড়বিড় করে বলল,
“ সার্থরে, তোর পেছনে পেট্রোল ঢেলে দিলাম। এবার শুধু আগুন লেগে তোর ইগোর লেজটা পুড়ে যাওয়ার পালা।”
অয়ন এলো ঠিকই,কিন্তু উশখুশ করে পাশে দাঁড়িয়ে রইল। ডান্সের কথা বললে তুশি আবার রেগেমেগে কিছু বলে দেয় কিনা! মাথা চুলকাল ছেলেটা। তক্ষুনি জামিল এসে বলল,
“ তুশি, আমার সাথে ডান্স করবে?”
“ আমি? না না। আমি এসব পারি না।”
জামিল সাথে সাথে হাতটা ঘুরিয়ে দিলো ইউশার দিকে।
“ তাহলে তুমি?”
“ আমি তো…”
জামিল পুরোটা বলতে দেয় না। খুব অধিকার বোধ নিয়ে হাতে টান মারে,
“ আরে এসো তো…”.
ইউশা কিছু বলতেই পারল না। হিমশীম খেলেও চলল সাথে সাথে।
ব্যাপারটায় বুকে বল পেলো অয়ন। এসে দাঁড়াল ওর সামনে। মৃদূ স্বরে বলল “ তুশি,উইল ইউ?”
তুশি এক পল ওর পেতে রাখা হাতটায় তাকাল,পরপর তাকাল অদূরের সার্থদের দিকে। মেয়ে নিয়ে নাচলেও সার্থর সূক্ষ্ণ চাউনি বারবার এদিকেই ঘুরছে।।
এবার তুশি মানা করল না। মুচকি হেসে হাত ধরল। অয়নের মনে হলো পৃথিবী জিতে গেছে সে। চটপট ওকে নিয়ে ডান্স ফ্লোরে ছুটে এলো ছেলেটা। অমনি সার্থ মাথা সোজা করে ফেলল । অয়ন তুশিকে কাছে আনল। অস্বস্তির ছোবলে নীল হয়ে গেল মেয়েটা। অয়ন নিজের কাঁধে ওর হাত রেখে বলল,
“ তুমি শুধু আমার চোখের দিকে তাকাও। তাহলেই হবে।”
“ চোখের দিকে তাকালে নাচতে পারা যায়?”
হাসল অয়ন,
“ দেখোই না, যেতেও পারে।”
“ কী কথা বলছে ওরা?”
আইরিন কপাল কুঁচকে বলল,
“ কারা?”
সার্থর ছটফটে চাউনি নেমে এলো। ঘাড় শিথিল করে গম্ভীরমুখে বলল,
“ কিছু না।”
“ আপনি ডান্সে কনসেনট্রেশান দিচ্ছেন না।”
“ যতটুকু দিচ্ছি, তোমার জন্যে এটাই যথেষ্ট।”
আইরিন আর কিছু বলল না। পুরো জায়গা জুড়ে মোট দশটা কাপল নাচছে। চারপাশের সব আলো নিভিয়ে শুধু আলো জ্বলছে এখানে। আইরিনের হঠাৎ খেয়াল পড়ল ওদের পাশেই নাচছে তুশি। অমনি ইচ্ছে করে সার্থর বুকের আরো ঘনিষ্ঠ হলো সে। যাক তুশি এখানে আসায় অন্তত ওর সুবিধে হয়েছে। এবার যতবার ও সার্থকে ছোঁবে,জ্বলেপুড়ে খাক হবে বেচারি। কাউকে দেখিয়ে দেখিয়ে কিছু নিয়ে জ্বালানোর কী যে আনন্দ!
ইউশা হঠাৎ খেয়াল করল,ওর মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে জামিল। দু চোখ ছাপানো অদ্ভুত মুগ্ধতা সেখানে। মেয়েটা বিব্রত হয়। গলা ঝেরে বলে,
“ এভাবে কী দেখছেন ভাইয়া?”
মুচকি হাসল জামিল। বলল,
“ তোমাকে!”
“ জী?”
“ না মানে,লাস্ট যখন তোমাকে দেখি তুমি সম্ভবত এস এসসি ফাইনাল দিচ্ছিলে। কটা বছরের মধ্যে কত বড়ো হয়ে গেছ! সেই শিশুসুলভ মুখটা এখন এক পূর্ণাঙ্গ মেয়ের মতো হয়ে গেছে।”
“ এটা স্বাভাবিক। আপনিও তো কত বদলে গেছেন।”
“ ইউশা…”
“ জি!”
“ তুমি কাউকে পছন্দ করো?”
মেয়েটার বুক ধক করে উঠল। তাকাল গুরুতর চোখে,
“ ককেন?”
“ এমনি। জানতে চাইতে পারি না?”
ইউশা মাথা নুইয়ে রুদ্ধ শ্বাস ফেলল। যাক,জামিল ভাই তাহলে কিছু জানে না। উনি জানলে মেজো ভাইয়াকে বলে দেবেন,তারপর এক এক করে কথা ঘুরতে ঘুরতে নিশ্চয়ই অয়ন ভাইয়েরও কানে চলে যাবে! ইউশা তা চায় না। কক্ষনো না।
“ বললে না তো!”
“ কী বলব?”
“ কেউ পছন্দের আছে?”
ইউশা নিষ্প্রাণ নয়নে এক বার পাশের অয়নকে দেখল। আগাগোড়া তুশিতেই মগ্ন যে পুরুষ।
হেসে বলল,
“ নাহ, তেমন কিছু না।”
সাথে সাথে ঠোঁট ভরে হাসল জামিল।
এদিকে,
আইরিন আর অয়ন পিঠ বরাবর থাকায়, সার্থ- তুশি ঠিক মুখোমুখি পড়েছে। বারবার নাচের ফাঁকে ফাঁকে একে-অন্যেকে দেখছে দুজনে। তুশির আঙুলের ভাঁজে অয়নের আঙুল,ওদের চারটে চোখের ওই কাছাকাছি থাকা সব মিলিয়ে সার্থ কেমন অস্থির হয়ে পড়ল। নিজের নাচ ফেলে গলা উঁচিয়ে উঁচিয়ে দেখে গেল ওদের।
অয়নের বাহু যখনই তুশির পিঠে নামবে,
সজোরে আইরিনের হাত খামচে ধরল সার্থ। ব্যথায় মেয়েটা আর্তনাদ করে ওঠে,
“ আহ।”
সার্থ হুশে এলো। তড়িঘড়ি করে সরিয়ে নিলো হাতটা । ছোটো করে বলল,
“ আমি দেখিনি।”
অয়নের মুগ্ধ চোখ তখন তুশির ওপর লেগে। এই প্রথম সে মেয়েটার এত কাছাকাছি এলো । এত ঘনিষ্ঠে থেকে দেখল ওর মুখ। কাছ থেকে তুশি আরো বেশি সুন্দর। এই যে দুই চোখে ময়ূরের পেখমের মতো ঘন-কালো পাপড়ি, দূর থেকে বোঝা যায় না এদের। এই যে এসির হাওয়ায় ভরে থাকা ক্লাবেও তুশির নাকের ডগায় ফোটা ফোটা ঘাম,এসবও তো কাছে না এলে দেখতে পারতো না অয়ন। আজকের এই মিলনমেলার তোড়ে বিমোহের খেই হারিয়ে ফেলল ছেলেটা। বাম হাতটা তুলে তুশির গালে রাখতে গেল,মেয়েটা ঝট করে ঠেলে দিয়ে বলল,
“ কী করছেন?”
অয়নের কণ্ঠে মাদকতার সুর,
“ তোমাকে আজ কী যে সুন্দর লাগছে তুশি। মনে হচ্ছে আকাশ থেকে সাদা পরী নেমে এলো!”
তুশি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার এই নিষ্প্রভতায় হতাশ হলো অয়ন। বলল,
“ মনে হচ্ছে আমি যত রোমান্টিক হবো, তুমি তত আনরোমান্টিক হবে।” তুশি জবাব দিলো না। অয়নের কাঁধ ছাপিয়ে আরেকবার তাকাল ওপাশে ক্ষিপ্ত চোখে চেয়ে থাকা সার্থর পানে। কেন যে না চাইতেও বারবার মনোযোগ চলে যাচ্ছে ওদিকে!
অয়ন ডাকল তখনই,
“ তুশি?”
ফিরল ও,
“ হু?”
“ একটা কথা বলব?”
“ কী?”
দু পল সময় নিলো অয়ন। হুট করে মিউজিকের টোনের সাথেই গলা মিলিয়ে গাইল,
“ Main toh bas teri chahat mein,
Chahoon rehna sada.
Main toh bas teri qurbat mein,
Chahoon rehna sada.
Saya bhi tera, main hone na doon judaa..
Maine tay kar liyaaaa…”
গানের সাথে নাচের তাল মেলাতে তুশিকে ঘুরিয়ে দিলো সে। মেয়েটা অপ্রস্তুত থাকায় হাত ছুটে গেল। তুরন্ত আইরিনকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েই, চিলের মতো ছো মেরে ওকে টেনে কাছে নিয়ে এলো সার্থ। সঙ্গে সঙ্গে বেজে উঠল তার দরাজ গলার সুর,
Tere ishq pe,
Tere waqt pe,
Bas haq hai ik mera,
Teri rooh pe, tere jism pe,
Bas haq hai ik mera,
Bas haq hai ik mera
Bas haq hai ik mera….” দ্বিকদিশার সাথে সাথে নাচের খেই হারিয়ে ফেলল আইরিন। ওদিকে স্টেপ ফলো করে বাকিরাও নিজেদের পার্টনার ছেড়ে দিলো। পাল্টাপাল্টি হতে হতে আইরিন গিয়ে পড়ল জামিলের হাতে,ইউশা এসে পড়ল অয়নের কাছে। অপ্রস্তুতিতে মেয়েটা থুবড়ে পড়তে গেলেই, ধড়ফড় করে বুকের সাথে আকড়ে ধরল অয়ন। নিস্তব্ধ চোখ তুলে চাইল ইউশা। অয়নের কাছে তার এই আগমন অপ্রত্যাশিত খুব। তবে দেখল অয়ন ভাইয়ের নজর আজকেও ওর ওপর নেই। সেই যে তুশি গিয়ে সার্থর কাছে পৌঁছেছে, সজাগ চোখে ওদিকেই চেয়ে আছে ছেলেটা।
এদিকে তুশি নিজেই হকচকিয়ে গেল। চোখ বড়ো বড়ো করে সার্থর চতুরের ন্যায় হাসিমুখের পানে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। দু সেকেন্ডের মধ্যে কী থেকে কী ঘটে গেছে,ও কিচ্ছু বুঝতেই পারেনি।
পরপর খেয়াল হলো, ওর হাত কোথায়? সার্থর বুক থেকে তড়িৎ হাতটা নামিয়ে ফেলল তুশি। মুখ ঘুরিয়ে যেতে নিল,সহসা বাধ সাধল সে পুরুষ। কনুইয়ে হ্যাচকা এক টান মেরে ফের বুকে এনে ফেলল। এত জোরে, তুশির লিপস্টিক পরা ঠোঁট দুটো একদম শার্ট পেরিয়ে সার্থর নগ্ন বক্ষভাগে ঠুকে গেল অমনি। টকটকে আস্ত ঠোঁটের ছাপ বসে গেল সেখানে। সার্থ খোলা বুকের দিকে দেখল এক বার। রেড ওয়াইন শেডের একটা হার্টশেপ লিপস্টিকের চিহ্ন,তার ফরসা ত্বকে দাগ তুলে আছে। তারপর দেখল তুশির ভড়কে যাওয়া মুখ। ভ্রু নাঁচিয়ে বলল,
“ কিস মার্ক,তাও এখানে?”
আইরিন যেই আসতে নেবে জামিল হাত লম্বা করে আটকায়,
“ উহু মিস আয়োডিন, ওদিকে এখন যাওয়া যাবে না। আপনি আমার সাথে নাচুন।”
“ আমার নাম আইরিন।”
“ হোয়াট এভার, যাওয়া যাবে না এটাই মেন পয়েন্ট।”
“ কেন যাওয়া যাবে না?”
“ পার্টনার চেঞ্জ হওয়া নাচের রুলস। আপনি ফলো করতে বাধ্য। এখন ঠিকঠাক স্টেপ রাখুন। এত বাজে পার্টনার আমি কোনোদিন দেখিনি।”
আইরিন আঙুল তুলে বলল,
“ শুনুন, আমি অনেক ভালো নাচি ওকে?”
“ তাহলে স্টেপ মেলাচ্ছেন না কেন?”
আইরিন অনীচ্ছায় নাচে মনোযোগ দিলো। ইচ্ছে ঠেসেঠুসে ঘুরল জামিলের সাথে।
“ নাচে মন না থাকলে আমার হাতটা ছাড়ো অয়ন ভাই।”
নড়ে উঠল অয়ন,
“ হু? না আমি ঠিক আছি।”
“ সেটা আমি দেখতেই পাচ্ছি।”
“ ইউশা, তুই আজকাল বড়োদের মতো হাবভাব করছিস। চুপচাপ নাচ।”
অয়ন কপাল কুঁচকে ইউশাকে ঘোরাল। তারপর নিয়ে এলো কাছে। অথচ মেয়েটার ভেতর তোলপাড় উঠে গেল অয়নের এত কাছাকাছি আসায়। সেই চেপে রাখা বুকের ব্যথা, ঢেকে থাকা অনুভূতি বর্ষার ন্যায় মেঘ বেয়ে ঝরে পড়ল আবার। অয়নের তপ্ত শ্বাস মুখে এসে লাগছে, বুকের সাথে কখনো শরীর মিশছে, কখনো বা পিঠ! এত কিছুর পরেও আগের মতো ও নিজেকে সামলাতে পারবে তো!
তুশি নিজের হাত মোচড়ায়। ছটফটিয়ে বলে,
“ আমি আপনার সাথে নাচব না।”
সার্থ কাঁধ উঁচিয়ে বলল,
“ নেচো না।”
“ হাতটা ছাড়ুন।”
“ ছাড়তে হবে?”
বলতে বলতে তুশির ঘাড় থেকে চুলের গোছা সরিয়ে দিলো সে। শিরশিরে অনুভূতিতে মেয়েটার সব জড়িয়ে গেল।
কথাগুলো বেজে বেজে এলো,
“ এখানে হাত, হাত দেবেন না।”
সার্থ ঠোঁটের কোণ তুলে হেসে বলল,
“ যেহেতু আমার কাছে এসেছ, এখন হাত ঘাড়ে দেব, না কোমরে দেবো, না অন্য কোথাও দেবো,আমার ব্যাপার না?”
তুশি কড়া চোখে তাকাল। অন্য কোথাও হাত দেবো, এসব কী কথা!
সার্থ বলল,
“ এটা কাপল ডান্স,এখানে
রোমান্টিক ভাবে তাকাতে হয়। এরকম খেয়ে ফেলার মতো করে কাকে দেখছো তুমি?”
তুশি মুখ ফিরিয়ে নিলো। সার্থ বিদ্রুপ করে বলল,
“ সেই ঘুরেফিরে আমার বুকে এসে পড়েছ। তোমার উড বি তোমাকে ধরে রাখতে পারল না কেন? ওর শরীরে ইম্যিউনিটি কম?”
“ আপনিও তো আপনার আইরিনকে ধরে রাখতে পারলেন না। সেও তো গিয়ে আরেক ছেলের কাছে পড়েছে।”
“ তাই?”
“ দেখেননি মনে হয়?”.
“ সময় পেলাম কোথায়? এর মাঝেই তুমি এমন ভাবে গায়ে এসে পড়লে।”
“ আমি পড়িনি। আমার কোনো ইচ্ছে নেই আপনার গায়ে পড়ার।”
“ আচ্ছা?” বলতে বলতে তুশির কোমরের বাঁকে হাত রাখল সার্থ। মেয়েটার পৃথিবী সুদ্ধ টলে উঠল তাতে। কথা এঁকেবেঁকে গেল, বলল কোনোরকম,
“ হহ্যা ততাই..”
ঠোঁটের কোণ বেঁকিয়ে ক্রুর হাসল সার্থ। কোমরের পেছনে আঙুলের জোড় বাড়াতেই তুশির শরীরটা এসে ঢুকে এলো বুকে। হতভম্ব হয়ে বলল,
“ কী, কী এসব?”
সার্থ জবাব দিলো না। ঝট করে তুশিকে ঘুরিয়ে দিতেই,মেয়েটার শীর্ণ পিঠ ধড়াম করে বুকে লাগল তার। সার্থ একটা হাতে তুশির কোমর থেকে সামনের দিকে প্যাঁচাল,আরেক হাতে গলার নিচ প্যাঁচিয়ে ধরল। পরপর ঘাড় থেকে চুলের গোছা সরিয়ে রাখল অন্য পাশে। তুশির শরীরে ঘূর্ণিঝড় বয়ে যায়। দ্রুত শ্বাস নেমে আসে বুকে।
সার্থ লম্বা দেহ একটু নামিয়ে এনে নাকটা ঠিক ওর গলার ভাঁজে থামাল। স্পর্শ করল না। শুধু চুলের ঝাপটায় বড়ো করে শ্বাস টেনে বলল,
“ ইউ স্মেল লাইক অ্যান অ্যাডিকশন, তুশি।
ইউ স্মাইল লাইক, ইউ আর মাইন…..”
সার্থ ফিসফিস করে এত দ্রুত বলেছে, অনুভূতিতে বেখেয়ালি তুশি ইংরেজির কিচ্ছু বুঝতে পারেনি। তবে মানুষটার অচেনা এই হাবভাবেই গা শিউরে উঠল তার। ফিরল, আইঢাই করে বলল,
“ কী,কী বললেন? গালাগালি দিয়েছেন?”
সার্থ হেসে ফেলল। গম্ভীরমুখো মানুষটার আজকের হাসি অন্যরকম। রীতিমতো ঝিনুকের খোলশ হতে ছিটকে আসা মুক্তোর মতো বেরিয়ে এলো দন্তপাটি। তুশির চোখ থমকে গেল। বুকের ভেতর কোপ পড়ল সজোরে। বিমোহ,মুগ্ধতা আর অন্তরঙ্গ হওয়ার এই দিশাহারা ভরাডুবিতে ফের তলিয়ে গেল সে। পরপরই মনে পড়ল আজকের সব নিষ্ঠুর সত্যি। মনে পড়ল একটু আগেই আইরিনের সাথে সার্থর বিয়ের ঘোষণা, ওর সামনেই তার বলা,
আমি বিয়েতে রাজি।
তারপর সেদিন ওর চোখে চোখ রেখে উগড়ে দেয়া সেই নিষ্ঠুর বাক্য- তোমার প্রতি আমার সহানুভূতি আছে,কিন্তু অনুভূতির ছিঁটেফোঁটাও নেই।
তুশির সব মোহ মুছে গেল। অন্ধকার,হাহাকার মিলেমিশে এসে ঘিরে বসল হৃদয়ে। চোখ দুটো ভিজে,ছেঁয়ে গেল জলে। কার্নিশের উপচে আসা লুকোতে তুরন্ত ধাক্কা দিয়ে সার্থকে সরিয়ে দিলো সে। ছেলেটা কিছু চমকে যায়। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাউনের দু মাথা দুই হাতে ধরে ছুটে যায় তুশি। বাকিদের নাচ থেমে গেল অমনি।
সবাই বিভ্রান্ত নজরে চেয়ে চেয়ে দেখল ওদের।
জামিল ইশারায় ভ্রু উঁচাল।
জানতে চাইল, কী হয়েছে? উত্তরে চোখ বুজে ঠোঁট ফুলিয়ে শ্বাস ফেলল সার্থ। বলল না কিছু।
অয়ন যেতে নিলেই টেনে ধরল ইউশা।
“ যেও না।”
“ কেন?”
ইউশা মনে মনে বলল,
“ আমরা দুজনেই তো একই ব্যথায় মরছি অয়ন ভাই। তোমার কাছে এসে যেমন আমি ঝলসে গেলাম,তুশিও ভাইয়ার কাছে যাওয়ায় একই ভাবে পুড়ছিল। সেসব সইতে না পেরেই পালিয়ে গেছে হয়ত।”
মুখে বলল,
“ বোধ হয় ভাইয়া কিছু বলেছেন। তাতে রেগে গেছে। এখন তুমি গেলে হিতে-বিপরীত হতে পারে।”
অয়ন বিড়বিড় করে কিছু একটা বলল। ইউশা স্পষ্ট না শুনলেও মনে হলো বলেছে,
“ ভাইয়ার একটা ব্যবস্থা করতে হবে।”
তুশিকে দেখা গেল সুইমিংপুলের কাছে। মুখ ভার করে একদম পাড়ের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে সে। রেহণুমা আসতে চাইলেও তনিমা থামালেন। বললেন, কিছুক্ষণ একা থাকুক। তুশি চোখের জল বারবার মুছলেও, আবার গাল ভিজে যাচ্ছে। আজ একটু বেশিই অবাধ্য হচ্ছে এরা। এত কাঁদাচ্ছে কেন ওকে?
তুশি খোলা আসমানের দিকে বিমর্ষ মুখ তুলে চাইল। অভিযোগ করল এক রাশ অভিমান নিয়ে,
“ আপনি কী চাইছেন বলুন তো। এমন করছেন কেন আমার সাথে?
যখনই ভাবি ওনার দিকে তাকাব না, ওনাকে নিয়ে ভাবব না তখনই আপনি আমার সব উলটে পালটে দিচ্ছেন। আজ আমি ওনার কাছে প্রচণ্ড বেহায়া হয়ে গেলাম! কিন্তু আমি যে এসব চাইনি। এতকাল মানুষের কাছে চোর- ছ্যাচর বলে গালি খেয়েও আমার এতটা সম্মানহানি হয়নি, যতটা ওনার এসব হাসি- ঠাট্টায় আর নিজের এই বেহায়াপনায় হলো। নিজের ওপর রাগে গা রিরি করছে আমার। মনে হচ্ছে জামাটা টেনে ছিঁড়ে ফেলতে। আপনি আমার সাথে কেন এমন করেন? সেই প্রথম থেকে আমার প্রতিই আপনার কেন এত অসন্তুষ্টি? আমি বুঝি মানুষ হিসেবে খুব খারাপ! এতই খারাপ যাকে এক ফোঁটাও সুখ দেয়া যায় না।”
ওপাশ থেকে উত্তর এলো না। সৃষ্টিকর্তা জানালেন না কিছু। তারপর অনেকটা সময় কাটল। পার্টি আবার ফিরল তার নিজের আয়োজনে। চারপাশে আগের মতো হৈহল্লায় ছড়িয়ে গেল সবাই। যে যার মতো ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
একবার সতর্ক চোখে আশেপাশে তাকাল আইরিন। সার্থ, জামিলের সাথে কথা বলছে। অয়নও বাপ-চাচাদের সাথে ব্যস্ত। এদিকে কারোরই তেমন কোনো খেয়াল নেই। মূহুর্তে ঠোঁট টিপে এক বিশেষ উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেল সে। সন্তর্পণে এসে তুশির পেছনে দাঁড়াল। ফের চারপাশটা দেখে হেঁটে যাওয়ার ভান করে কাঁধ দিয়ে এক ধাক্কা মারল সজোরে। তুশির অন্যমনস্ক শরীরটা টাল রাখতে পারল না। ঝুঁপ করে পরনের ভারি গাউন,আর দু ইঞ্চি হিল সমেত পুলের ভেতর তলিয়ে গেল সে। ঢেউ খেলার মতো ছলকে উঠল স্বচ্ছ জল। ঝপাৎ শব্দ,আর তুশির অল্প চিৎকারে সবার নজর চকিতে ঘুরে গেল এদিকে। ইউশা আর্তনাদ করে বলল,
“ তুশিইই,তুশি পানিতে পড়ে গেছে। বাবা,তুশি পড়ে গেছে।”
প্রত্যেকে হাহাকার করে ছুটে এলেন। মিনিটেই সরে পড়ল আইরিন। অথচ ঠোঁটে বিজয়ের হাসি টানতেও পারল না, দুপাশ থেকে দু দুটো বলিষ্ঠ যুবক দৌড়ে এসেই ঝাঁপ দিলো পানিতে। হাসিটা অমনি মুছে গেল তার।
তুশি সাঁতার জানতো,কিন্তু হুট করে পড়ায় নাকে-মুখে পানি ঢুকে গেছে। ছটফটিয়ে হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে কোনোরকম মাথাটা একটু তুলল ওপরে। রেহণূমা আর্তচিৎকার ছুড়লেন,
“ ওইত, ওইত আমার তুশি।”
তুশি যে সাঁতার জানে তাতো আর কেউ জানে না। সেজন্যেই ভয়ে-ডরে কেঁদে ফেললেন তারা।
অয়ন আর সার্থ একইসময় পানিতে নামলেও, তুশি সার্থর কাছাকাছি ছিল। বড়ো বড়ো
বাহু ফেলে সাঁতার কেটে অয়নের আগে তুশির কাছে পৌঁছাল সে। একেবারে থাবার মতো করে মেয়েটার ক্ষুদ্র শরীর টেনে কাছে নিয়ে এলো। তুশি পানি খেয়েছে,নাকমুখ বুজে আসছে কাশিতে,তারওপর উচ্চতায় পানি অনেক গভীর হওয়ায় প্রায় মরমর দশা। খুঁটির মতো একটা আশ্রয় পেতেই ধড়ফড়িয়ে সার্থর গলা দুহাতে জড়িয়ে ধরল সে।
চোখেমুখে এত ভয় দেখে সার্থ মোলায়েম কণ্ঠে বলল,
“ আমি আছি তুশি,কিছু হবে না তোমার। আমি আছি।”
মেয়েটাকে পাজাকোলা করে পুল থেকে ওপরে উঠে এলো সে। সাথে সাথে সবাই ছুটে গেলেন। সার্থ তুশিকে নিয়ে ফ্লোরে বসল। মেয়েটা কাশতে কাশতে নাজেহাল প্রায় । রেহণূমা কেঁদে ফেলেছেন। বাকিদেরও অস্থিরতা- চিন্তায় একশা দশা। শওকত নেই এখানে। নাসীরের সাথে কোথাও একটা গিয়েছেন। সাইফুল উৎকণ্ঠিত হয়ে বললেন,
“ তুই পানিতে কী করে পড়লি,মা? এইত দেখলাম এখানে দাঁড়িয়েছিলি ।”
তুশি বুকে হাত দিয়ে শ্বাস নিতে নিতে কোনোরকম বসল। একটু সময়ের জন্যে চোখে অন্ধকার দেখেছে, দম আটকে গিয়েছে,মনে হয়েছে এক্ষুনি যেন মরে যাচ্ছে সে। দূর্বলের মতো মাথাটা মায়ের বুকে রেখে বলল,
“ জানি না। মনে হলো কেউ ধাক্কা দিয়েছে।”
একটা চাপা শোরগোল শুরু হলো। কে ধাক্কা দিয়েছে প্রশ্ন সবার। তবে কথাটা শোনা মাত্রই সার্থর কৌতূহলী মুখচোখ ঝিম ধরে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে এক পল ফিরে দেখল নিজের পেছনে। যেখানে দাঁত খিচে দাঁড়িয়ে ছিল আইরিন। সার্থ তাকাতেই, ফটাফট শিরদাঁড়া সোজা করল সে।
রোকসানা বললেন,
“ এখানে তোমাকে কে ধাক্কা মারবে,আজব। পা পিছলে পড়েছ কিনা সেটা বলো! এমনিই পড়েছ তো হিল,এসব সামলনো কি তোমার কম্ম?”
সাইফুল গমগমে গলায় বললেন,
“ তুই কি ভালো কথা জানিস না রোকসানা? দেখছিস মেয়েটার এই অবস্থা। যাক গে রেহণুমা,চলো আমরা বাড়ি যাই। আমি ভাইজানকে বলে আসছি।”
তুশি মায়ের বুকে লেপ্টে ছিল। ভদ্রমহিলা মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন,
“ মেয়েটা এখনো কেমন করে শ্বাস নিচ্ছে। দূর্বল লাগছে মনে হয়। এই অবস্থায় হেঁটে যেতে পারবে?”
সার্থ বলল,
“ আমি নিয়ে যাচ্ছি।”
তুশিকে কোলে তুলতে দুহাত বাড়াল সে,কোত্থেকে এসেই খপ করে সেই হাত চেপে ধরল অয়ন। ভ্রু কুঁচকে ফিরে চাইল সার্থ। ও ঠিক চোখের দিকে চেয়ে কঠোর স্বরে বলল,
“ তুশি তো আমার হবু স্ত্রী, তাহলে আমাকেই বুঝতে দাও?”
তারপর সার্থর হাত দুটো ঝট করে ঠেলে সরিয়ে দিলো অয়ন। ছেলেটা চমকায়, স্তব্ধ হয় বিস্ময়ের ঘায়ে। অয়ন আজ কোনো কিছুর কোনো তোয়াক্কা করল না। তুশির ক্লান্ত, নিস্তেজ শরীরটা তুলে নিলো দুহাতে । ভাইয়ের চোখের সামনে দিয়েই বুক চিতিয়ে উঠে দাঁড়াল। একটা বিজয়ের সূক্ষ্ম হাসি ঠোঁটে মেখে পা বাড়াল সদরের দিকে।
কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে সেই প্রস্থান পথে চেয়ে রইল সার্থ। ইউশা,রেহণূমা,তনিমা,মিন্তু সকলেই চললেন তুশির পেছনে। চেনা-জানা আরো কয়েকজন সাথে সাথে গেলেন। জটলা শেষ হলো, অথচ ওই একই জায়গায় মূর্তির মতো ঠায় বসে রইল সার্থ। কানের পাশে বারবার বেজে গেল,
“ আমার হবু স্ত্রী,আমাকেই বুঝতে দাও?”
সার্থর স্তম্ভিত চোখ দপ করে ওঠে। ভেসে থাকে চোয়ালের হাড়। কপালের শিরা ফুলিয়ে
হুট করে উঠে দাঁড়াল সে। লম্বা পায়ে হেঁটে গিয়ে জুসবারের টুল টেনে বসল। ওয়েটার শুধালেন,
“ কী দেবো, স্যার?”
সার্থ থম ধরে একটা শেল্ফের ওপর থাকা চকচকে বোতলের দিকে চেয়ে রইল দু সেকেন্ড। পার্টিতে নাসীরের কিছু ফরেইনার বন্ধুরা এসেছেন। যাদের জন্যেই এই বিশেষ ব্যবস্থা করা আজ।
ও বলল,
“ হুইস্কি। কিছু মেশাবেন না,বরফও না।”
লোকটি ঘাড় নাড়লেন। বোতলের ছিপি খুলে উৎক গন্ধের ওই তরল সার্ভ করলেন গ্লাসে। এগিয়ে দিতেই সার্থ হাতের মুঠোয় তুলল। মাথার ভেতর গণগণে রাগে বেজে বেজে গেল,
“ আমার হবু স্ত্রী তো,আমাকেই বুঝতে দাও।”
পরপর তুশিকে ওইভাবে ছিনিয়ে নেয়ার দৃশ্যে দাঁত পিষে ধরল ছেলেটা। চট করে গোটা হুইস্কির ঝাঁঝালো তরলটুকু গলায় ঢেলে দিলো সার্থ। না কাশল , না একটুখানি বিকৃত হলো চেহারা। খুব স্থির চোখ মেঝেতে রেখে বলল,
“ আরেক গ্লাস।”
জামিল ওয়াশরুমে গিয়েছিল। শিষ বাজাতে বাজাতে এসে দেখল পার্টি আর পার্টি নেই। চেনাজানা লোকেরা কোথায়? এর মাঝেই যে এত সব কাণ্ড ঘটে গেছে,বেচারা জানে না কিছু।
হঠাৎ ওর নজর পড়ল জুসবারের দিকে। চোখ ফেটে বেরিয়ে এলো অমনি। হুড়মুড় করে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেল ছেলেটা। সার্থর হাত থেকে বোতলটা টেনে ধরে বলল,
“ আরে আরে, তুই ড্রিংক করছিস কেন? এই সার্থ এই?”
নিচু মাথাটা তুলে চাইল সার্থ। চোখ দুটো অস্বাভাবিক, অক্ষিকূটে ভেসে থাকা লাল রক্ত দেখে ভড়কে গেল জামিল।
“ কী হয়েছে তোর?”
সার্থর দৃষ্টি আরো কঠিন হয়ে গেল। টানটান হলো শক্ত চিবুক। জামিলের চোখ গেল টেবিলের খালি গ্লাস গুলোয়। আঁতকে বলল,
“ তুই তুই এতগুলো… ও মাই গড। কী করেছিস ভাই!”
ওয়েটার ছেলেটা পেছন থেকে বললেন,
“ স্যার, আমি কখন থেকে বারণ করছি। উনি শুনছেনই না। এত কড়া ভাবে খাচ্ছেন,তাও এত বেশি, মানে বুঝতেই পারছেন।”
“ আমি, আমি দেখছি।” পাথর হয়ে বসে থাকা সার্থর কাঁধ ধরে ঝাকাল জামিল,
“ এই সার্থ, কী হয়েছে বলবি তো? এত রেগে আছিস কেন? আর অয়ন ওরা…”
সার্থ কাঁধ থেকে হাতটা ঝাড়া মেরে সরাল। উঠে দাঁড়াল তড়াক করে। হেলে পড়তে নিলেই,ধরতে এগিয়ে এলো জামিল। ও হাত তুলে থামায়,কড়া চোখে বলে,
“ আমি পারব।”
পরপর এলোমেলো পা টেনেটুনে হাঁটা ধরে সে। পুলের পাশ থেকে সদরের দিকে যেতে দেখেই রোকসানা এগিয়ে এলেন। উদ্বেগ নিয়ে বললেন,
“ কোথায় যাচ্ছো বেটা? ডিনার করবে না?”
সার্থ উত্তর দিলো না। পাশ কাটাল এমন ভাবে,যেন কানেই শোনেনি। আইরিন মায়ের পেছনে ছিল। ব্যাপারটায় বেজায় চটে গেল সে। ছুটে এসেই পথরোধ করে দাঁড়াল ওর। ভীষণ রেগে বলল,
“ আপনি এভাবে মাঝপথে চলে যেতে পারেন না। এটা কিন্তু কথা ছিল না সার্থ ভাই।”
সার্থ কানে নেয় না। উলটে উচ্ছিষ্টের ন্যায় পথ থেকে ঠেলে সরিয়ে দিলো ওকে । কিন্তু সেই সরানোর তোড় এত জোরাল, একেবারে উড়োপাতার মতো পাশের ঐ পুলের ভেতর ছিটকে পড়ে গেল আইরিন। রোকসানা ‘’ ও মাই গড’’ বলে চিৎকার করে উঠলেন। জামিলের জিভ বেরিয়ে এলো দুহাত। আরেক চোট বিস্ময়ে ভড়কে গেল সবাই। অথচ
কোনোদিকে না চেয়েই সোজা বেরিয়ে গেল সার্থ। ফুঁসতে ফুঁসয়ে গিয়ে বসল গাড়িতে। ইঞ্জিন চালু করার মাঝেই জামিল ছুটে আসে। জানলায় ঝুঁকে শুধায়,
“ তুই এভাবে যাচ্ছিসটা কোথায়?”
ছেলেটা গাড়ি ছোটাল। হুইল ঘোরাতে ঘোরাতে দুটো বাক্য ছুড়ে দিলো,
“ বোঝাপড়া করতে।”
তারপর চোখের সামনে থেকে সাপের গতিতে ধেঁয়ে গেল গাড়িটা। জামিল বিড়বিড় করে বলল,
“ বোঝাপড়া! এই রাগ নিয়ে? গেল,সব গেল আজ।”
চলবে..
Share On:
TAGS: কাছে আসার মৌসুম, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩০
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২৮(ক+খ)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬০
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৬
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৫
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪০
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬০.১