Golpo romantic golpo কাছে আসার মৌসুম

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)


কাছেআসারমৌসুম!

নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি

(৩৪)
[ পেজের নাম পাল্টানোয় রিচে ঝামেলা হচ্ছে,অনুগ্রহ পূর্বক রেসপন্স করবেন সকলে!]

বাবা আর্মির উঁচু র‍্যাংকের অফিসার ছিলেন। শুনেছিলাম,মায়ের সাথে ওনার বিয়েটা পারিবারিক ভাবে হয়। দাদুভাই পছন্দ করেছিলেন মাকে। বাবাও বিয়েতে কখনো অমত করেননি। তখন আমাদের এই সৈয়দ ভবন পুরোপুরি তৈরি হয়নি। দিদুন,দাদাভাই মফস্বলে থাকতেন। শহুরে আলো-বাতাস দাদাভাই খুব একটা পছন্দ করতেন না । কিন্তু মা চেয়েছিলেন আমাদের ঢাকার ভালো স্কুলে পড়াশোনা করাতে। গ্রামে তো অমন সুযোগ সুবিধা নেই। তাই জমি কিনে বাড়ি বানানো শুরু হলো। সেসময় শুধু নিচতলা তৈরি হয়েছে। মোট তিনটে শোবার ঘরের একটাতে আমি,সায়ন,অয়ন, একটাতে বাবা -মা আরেকটা ঘর ছিল ছোটো মা আর চাচ্চুর। চাচ্চু এখানকার একটা ব্যাংকে চাকরি করতেন। বাবা বাড়ি আসতেন বছরে দুবার। কিংবা লম্বা কোনো ছুটিতে। কিন্তু আস্তে আস্তে কী হলো জানি না। বাবার ঐ আসাটা কমে যাওয়া শুরু হলো! ঈদ যেতো,কোরবানি আসতো, পূজো কাটতো আমরা ফোন করতাম!
“ বাবা আসবে না?”
শুনতাম এ মাসে অনেক ব্যস্ততা, আসা হবে না। বাবা সব থেকে বেশি আদর করতেন সায়নকে। মোস্ট পলাইট বয় ছিল ও। বাবা যা বলতেন,কোনোদিনও ওকে অবাধ্য হতে দেখিনি। অন্যদিকে আমি ছিলাম একটু বাউন্ডুলে,বেখেয়ালি আর অনেক বেশি দুরন্ত! মা আমার যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে যেতেন। সারাদিন ক্রিকেট,বন্ধু আর হৈচৈ করে বেড়াতাম। বাড়ি এলে বাবা বকতেন, ধমকাতেন! কিন্তু লাভের লাভ হতো না। অয়ন তখন আরেকটু ছোটো ছিল। আমি আর সায়ন পিঠাপিঠি, বয়সের গ্যাপ এক বছরের মতো! সায়ন এত নরম ছিল! ছেলে অথচ ওর গলার স্বর আমি কখনো উঁচু হতে শুনিনি। যেখানে ও বড়ো ভাই,সেখানে উল্টে আমি ওকে শাসাতাম,মারতাম। আবার প্রচণ্ড ভালোবাসতাম!
থামল ইয়াসির। একটু দম নিয়ে বলল,
“ ও আমার জীবনের প্রথম বন্ধু,আমার বেস্টফ্রেন্ড! যাকে মেরে রক্ত বের করে দিলেও কোনোদিন মাকে গিয়ে নালিশ দেয়নি। উলটে বলতো,পা পিছলে পড়ে গেছি।”
সেবার সায়নের খুব জ্বর হলো! বাড়িতে তখন আমি,মা আর ও। ছোটো মা তখন অন্তঃসত্ত্বা। পাঁচ মাসের পরপরই ওনার মা, ওনাকে নিজের কাছে নিয়ে গেছিলেন। এদিকে আমাদের স্কুলে ভ্যাকেশন শুরু হলো। । দিদুন ফোন করে চাচ্চুকে বললেন, আমাদের সাথে নিয়ে যেতে। কিছু দিন থেকে আসব গিয়ে। কিন্তু সায়নের শরীরের অবস্থা ভালো না। ও যেতে পারবে না দেখে, আমিও যাইনি। চাচ্চু অয়নকে নিয়ে গেলেন। ওখান থেকে ছোটো মায়েদের বাড়ি কাছাকাছি খুব।
এদিকে সায়নের জ্বর নিয়ে মা অস্থির প্রায়। কিছুতেই কমছিল না। ডাক্তার জানালেন,ওর ডেংগু পজেটিভ। খবর পেয়ে অনেক মাস পর বাবা ছুটে এলেন বাড়িতে। কিন্তু হুট করে আমি আবিষ্কার করলাম,আমাদের এই বাবা আর আগের বাবার মধ্যে কোথাও একটা বিস্তর তফাত। খুব অল্পতেই মায়ের সাথে বাবার খিটমিট শুরু হলো। সামান্য ভুল পেলে,ভাতের দানায় চুল পেলেও রাগারাগি করতেন। যা এর আগে আমি কখনো দেখিনি।
সেদিন, সন্ধ্যা বেলা হুট করে বাড়িতে চ্যাঁচামেচি শুরু হলো। বাবা-মা ঝগড়া করছেন! সায়ন আর আমি আঁতকে উঠলাম ব্যাপারটায়। ছুটে গেলাম দুজনে।
যে আমি বোধ হবার পর থেকে কোনোদিন মাকে বাবার সাথে উঁচু গলায় কথা বলতে দেখিনি,সেদিন দেখলাম মা বাবার কলার ধরে বলছেন,
“ কেন ঠকালে আমাকে? নিজের সারাটাজীবন এই সংসারের পেছনে বিলিয়ে দেয়ার প্রতিদান কী এসব ছিল?”
সাথে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন মা। আমি আর সায়ন অতশত বুঝিনি। ছোটো ছিলাম,শুধু হাঁ করে দেখছিলাম সবটা। বাবা তখন রাগে ফুঁসছেন। তর্কে তর্কে ভাঙচুর অবধি করলেন! সায়ন কাঁপছিল,ওর গরম শরীরটা দুহাতে আগলে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। এক সময় বাবা রাগে হিঁসহিঁস করতে করতে বললেন,
“ মাকে তিনি ভালোবাসেন না। মায়ের প্রতি তার মন নেই,টান নেই। ভালোবাসা পাওয়ার মতো কোনো যোগ্যতাই নেই মায়ের। যেখানে এসব থাকে না সেখানে সংসার হয়?”
কথায় কথা বাড়ছিল। এক পর্যায়ে তিনি রেগেমেগে ঘোষণা দিলেন,
“ আমি জেসমিনকে বিয়ে করব। গোল্লায় যাক এই সংসার!”
অমনি আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। বয়স কম হলেও,অতটাও ছোটো ছিলাম না যে এটুকু বুঝব না। বাবা ব্যাগ নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। একবার তাকালেনও না আমাদের দিকে। মা কাঁদতে কাঁদতে ছুটলেন পেছনে। দুটো কিশোর ছেলের সামনে সব ভুলে জাপটে ধরলেন ওনার পা। অনুনয় করলেন কেঁদে কেঁদে,
“ যেও না। আমার ভুল হয়ে গেছে। আমাদের ছেলেগুলোর কথা অন্তত ভাবো।”
কিন্তু বাবা ভাবলেন না। পা থেকে উচ্ছিষ্ট হটানোর মতো করে মাকে ছাড়ি দিয়ে,বাড়ি ছাড়লেন দ্রুত। আমি শুধু নির্বাক বনে সেই দৃশ্য দেখলাম। মেঝেতে বসে মাথায় হাত দিয়ে মা অনেকক্ষণ গুনগুন করে কাঁদলেন। কী বলে সান্ত্বনা দেবো আমি জানি না! দুভাই শুধু চুপ করে মায়ের পাশে বসে রইলাম!

রাত প্রায় অনেক। মা তখনো কাঁদছিলেন। হঠাৎ সায়নের জ্বর বেড়ে এলো। ওর গোঙানির শব্দে মা কান্না ভুলে গেলেন। ব্যস্ত হলেন জলপট্টি দিতে। আমি তেল গরম করে ওর হাত-পা মালিশ করছিলাম। আচমকা সায়ন গলগল করে বমি করে বিছানা ভাসিয়ে দিলো। বমির সাথে রক্ত দেখে আমাদের বুক কেঁপে ওঠে। তড়িঘড়ি করে রওনা করলাম হাসপাতালে। বাড়িতে তখন পার্মানেন্ট কাজের কোনো লোক ছিল না। শুধু গেইটে দারোয়ান ছিলেন। তখন আমাদের একটা গাড়ি ছিল। সেটাও বেরিয়ে যাওয়ার সময় বাবা নিয়ে গিয়েছেন সাথে। অত রাতে গাড়ি পেতে পেতে একটা যুদ্ধ গেল মায়ের। দারোয়ান চাচা না থাকলে হয়ত তাও পেতাম না! কাছের একটা ক্লিনিকে পৌঁছালাম। কিন্তু এই মাঝরাতে কোনো ভালো ডাক্তার নেই। ফোন করে ডাকতে হবে, আর তার আগে রিসেপশনে একটা ভালো অংক জমা করার কথা বলা হলো । অথচ আমার মা তখন শূন্য! হাতে যা টাকা ছিল,তাতে হবে না। মা বারবার অনুরোধ করছিলেন, অন্তত ওকে ভর্তি করার জন্য। টাকা নাহয় পরে দেবেন! কিন্তু শুনছিলেন না ওনারা। বাবার পরিচয় দিলে যেকোনো জায়গায় এক্সট্রা খাতির করা হতো। কিন্তু মা পরিচয় দিচ্ছিলেন না। হয়ত খুব অভিমানে! শেষে আমি পরিচয় দিলাম। তাও বলা হলো কোনো একটা ডকুমেন্টস দিতে যাতে প্রমাণ হবে উনিই আমার বাবা। অথচ মায়ের স্মার্টফোন ছিল না যে ছবি দেখাব। একজন আর্মি অফিসারের বউ হলেও মা খুব সাদামাটা মানুষ ছিলেন তখনো। অতিরিক্ত বিলাসিতা,বাড়তি টাকা খরচা করা এসব আমি কোনোদিন দেখিনি। মাসের জন্য বাবা যতটুকু দিতেন সব আমাদের তিন ভাইয়ের পেছনে ঢেলে দিতেন দুহাতে।

আমি মায়ের ঐ ছোট্ট ফোন থেকে বাবাকে কল করলাম। কিন্তু বাবা ধরলেন না, কেটে দিলেন। কয়েক বার কল দেয়ার পরে মুখের ওপর বন্ধ করে দিলেন ফোনটা। আমি উপায় না পেয়ে চাচ্চুকে ফোন করি। অনেক রাত, চাচ্চু ঘুমোচ্ছিলেন। তাও বিপদ শুনতেই এক কথায় বললেন,
“ আমি এক্ষুনি আসছি।”
কিন্তু নূরনগর তো আর ধারেকাছে নয়। আসতেই অনেক দেরি। মা এসে বললেন,
“ ওকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাই চল!”
তারপর আবার সেই গাড়ি পাওয়া নিয়ে যুদ্ধ। তখন তো আর এত আধুনিক ব্যবস্থা ছিল না! কোনোরকম একটা বেবিট্যাক্সি ধরে রওনা করলাম ঢাকা মেডিকেলের পথে। সায়নের শরীর আস্তেধীরে আরো খারাপ হচ্ছিল। নাকের ছিদ্রে রক্ত দেখে মা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। ওর শরীরে হাত রাখলে আমার মনে হচ্ছিল জ্বলন্ত চুলায় হাত দিয়েছি৷ গাড়ির ভেতর ও শুধু বাবাকে ডাকছিল। কখনো জিজ্ঞেস করছিল, মা, বাবা আর আসবে না?
মা জবাব দেননি। কাঁদছিলেন হুহু করে। আমরা ঢাকা মেডিকেলে গেলাম। কিন্তু ডেঙ্গুর প্রকোপে হাসপাতালে অতিরিক্ত ভিড় ছিল তখন। কোনো খালি বেড নেই। যে যেভাবে পারছে,পেশেন্টকে সেভাবে শুইয়েছে। কেউ বেঞ্চে,কেউ মেঝেতে! আইসিউতেও লম্বা সিরিয়াল। ভালো নার্স- ডাক্তার কিচ্ছু নেই। যারা ছিলেন,তারা ঠিক করে দাঁড়িয়ে দুটো কথা বলারও সময় পাচ্ছিলেন না। মা আমাকে মেঝের এক কোণে বসালেন। সায়ন আমার কোলে মাথা রেখে শুলো। ওর কাঁপুনি দেখে আমি নিজের ছোট্ট গেঞ্জিটা খুলে ওর গায়ে প্যাঁচিয়ে দিলাম। বারবার হাতের তালু ঘষছিলাম,মাথায় হাত বোলাচ্ছিলাম। অসহায়ের মতো কেঁদে কেঁদে আল্লাহকে ডাকছিলাম। মা তখন পাগলের মতো ছুটছিলেন। একটা যদি ব্যবস্থা করা যায়! হঠাৎ সায়নের শ্বাস বেড়ে গেল। বাড়ল ওর কাঁপুনি। কেমন হাঁপানির রোগীদের মতো জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে খামচে ধরল আমাকে। ওর চোখমুখ দেখে আমার বুক কেঁপে ওঠে। চিৎকার করে মাকে ডাকি। মা ছুটে আসেন। ওর হাত-পা মালিশ করেন। আচমকা চোখদুটো বড়ো বড়ো করে শরীর ছেড়ে দিলো সায়ন। এতক্ষণ আগুনের মতো গরম হাত-পা নিমিষেই কেমন বরফ হয়ে এলো। মা থমকে গেলেন। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধের ন্যায় চেয়ে থেকে ‘আল্লাহ’
বলে আছড়ে পড়লেন ওর গায়ের ওপর। আমি তখনো বোকার মতো তাকিয়ে ছিলাম। বুঝে উঠতে পারছিলাম না,আমার আমার বন্ধু, আমার ভাই, আমার সায়ন আর নেই। আমি উদ্ভ্রান্তের মতো গাল চাপড়ে ডাকলাম। রাগ দেখালাম, শাসালাম, কিন্তু সায়ন সাড়া দিলো না। একটা বারের জন্যেও না!”
ইয়াসির থামল। ডুকরে উঠল তুশি। ভেজা গলায় বলল,
“ তারপর?”
ইয়াসির ফিরে চাইল ঘাড় ঘুরিয়ে। তুশির চোখ-গাল ভিজে শেষ। অবাক হয়ে বলল,
“ কাঁদছ কেন?”
“ বলুন না,তারপর কী হলো?”
ফোস করে শ্বাস ফেলল ইয়াসির। বলতে শুরু করল,
“ বাবা পরেরদিন সকালে এলেন। সায়নের লাশ তখন বসার ঘরের মেঝেতে খাটিয়ায় বরফ দিয়ে রাখা। মায়ের জ্ঞান নেই সেই ফজর থেকে। রুমে অচেতন হয়ে পড়েছিলেন তিনি। আত্মীয়দের কয়েকজন ছিলেন ওনার কাছে। বাবা যখন সায়নকে ছুঁতে আসেন,আমি ক্ষিপ্ত বাঘের মতো ঝাপিয়ে পড়ি। ছোটো ছোটো হাতে বাবার বুকে ধাক্কা দিয়ে বলি,ওকে ধরবে না। তুমি আমাদের কেউ না। তোমার জন্যে ও মরে গেছে।
বাবা থামলেন না। আমাকে জড়িয়ে ধরেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন উলটে। পরিবারের সবাই তখন বাবার ওপর রেগে ছিল। দাদুভাই, দিদুন,এমনকি চাচ্চুও। সবাই মিলে বাবাকে অনেক কথা শোনাল। দাদুভাই তো বলেই ফেললেন,
“ সুন্দর সংসারটা এভাবে ধ্বংস করতে নেমে গেলি। কেন এসছিস তাহলে? বাকি ছেলেদুটো মরলে নাহয় আসতি।”
একেকটা বিষবাক্যে বাবা প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে পড়লেন। লাশ হয়ে শুয়ে থাকা সায়নের পা দুটো বুকের সাথে চেপে আর্তনাদ করে কাঁদলেন শুধু। ক্ষমা চাইলেন চ্যাঁচিয়ে চ্যাঁচিয়ে। কিন্তু এই ক্ষমার কী মানে,সায়ন তো আর আসবে না।

ছোটো মা তখন খুব অসুস্থ,আবার ভারি শরীর! আসতে না পারলেও ফোন করে করে কান্নাকাটি করছিলেন। দাফনের কাজে ওনার পরিবার এসেছিল অবশ্য। মায়ের জ্ঞান ফিরল বিকেলে। আমি চাইছিলাম না,আমার মায়ের কাছে বাবা কোনোভাবে যাক। কিন্তু আমার কথা শোনা হবে,ওই বয়স তখন আমার ছিল না। বাবা মায়ের কাছে গেলেন। চৈতন্য ফিরেছে বলে, মাফ চাইলেন কেঁদে কেঁদে।
এর মাঝে চাচ্চু হঠাৎ আমাকে ডেকে বললেন,কোনোভাবে বাবার ফোনটা লুকিয়ে এনে দিতে।
আমি কিছু একটা করে এনে দিলাম। আমার সামনেই জেসমিন লিখে সেভ করা নম্বরটা নিজের ফোনে তুললেন তিনি। তারপর বাবার ফোনটা আমাকে দিয়ে বললেন,আবার জায়গায় রেখে আসতে। আমি যাওয়ার নাম করে লুকিয়ে থাকি, চাচ্চুর কথাগুলো শুনব বলে। কারণ জেসমিন নামটা যে বাবার মুখে শুনেছিলাম সেদিন!
শুনতে পেলাম,খুব আজেবাজে ভাষায় চাচ্চু ওনাকে গালাগালি করছেন। হুমকি দিয়ে বলছিলেন,
“ রক্ষিতা হওয়ার এত শখ তো বাজারে যা। আমার ভাইয়ের পেছন ছেড়ে দে। আর কখনো যদি আমার পরিবারের দিকে তুই চোখ তুলেও দেখিস,আমি তোকে খুন করে ফেলব।”
আমি অবুঝ ছিলাম না। সব বুঝে গলাটা কেমন তেতো হয়ে গেল। নিজের মাকে ছেড়ে যার বাবা অন্য নারীতে মন দেয়,সেই সন্তান বোঝে তার মনের ওপর দিয়ে কী যায় তখন!
এরপর কিছু দিন কাটল। বাবা সারাদিন হত্যে দিয়ে মায়ের কাছে পড়ে রইলেন। দেখাশোনা করা থেকে সব নিজের হাতেই করছিলেন তিনি। দিদুন আমাকে আর অয়নকে গ্রামে নিয়ে যেতে চাইলেন। মায়ের এই অবস্থায় আমাদের দেখাশোনা কে করবে! কিন্তু আমি কিছুতেই মাকে রেখে যাব না। এবারেও অয়ন গেল। মা তখন চুপ করে থাকতেন। কখনো ফ্যালফ্যাল করে সায়নের ছবির দিকে চেয়ে থাকতেন শুধু। কখনো ওর জামাকাপড় নিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতেন। বাবা তখন আদর্শ স্বামী বনে গেলেন। নিজ হাতে মাকে খাওয়ানো , মাকে সময় দেয়া সব করতেন তিনি। মাঝেমধ্যে টের পেতাম বাবার ফোন বাজছে। বিশেষ করে রাতে। বাবার ফিসফিস করে কথা বলা, শুনতে পেতাম আমি। কখনো শুনতাম,
“ তুমি কেন বুঝতে চাইছ না,সম্পর্কটা আর এগিয়ে নেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমাকে যারা মাথায় করে রাখত,আমার সেই পরিবার আজ আমার দিকে আঙুল তুলছে,জেসমিন। আমি এসব নিতে পারছি না। আমার পরিবার ছাড়া আমি শূণ্য। আমি আমার সংসারটা আর নষ্ট করতে চাইছি না জেসমিন। এক ছেলেকে হারিয়েছি,আমি মনে করি আমার পাপেই ও মরেছে,আমি এই পাপ আর বাড়াতে চাই না।”

আমি বাবার কাছে কম যেতাম। তবে মনে মনে খুশি হচ্ছিলাম ব্যাপারটায়। তখন বেশিরভাগ সময় আমার চাচ্চুর সাথে কাটতো। হঠাৎ সেদিন বিকেলে চাচ্চুর কাছে খবর এলো,ছোটো মাকে ইমিডিয়েট হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। অফিস থেকে রওনা করার পথে বাবাকে ফোন করে জানিয়ে দিলেন তিনি। বাবা কী করে যাবেন,বুঝতে পারছিলেন না। মা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি,আবার আমিও আছি। যাওয়া হলো না সেজন্য। তবে বলে দিলেন,কিছু লাগলেই জানাতে।

ছোটো মায়ের যে টুইন বাবু হবে আমরা আগে থেকে জানতাম। সনোলজিস্ট যেদিন বললেন, ছোটো মা সেদিন বাড়ি এসেই আমাকে বললেন, দুই বাবুর দুটো নাম রাখার জন্যে। আমি নিজের নামের সাথে মিলিয়ে রাখলাম,
ইউসা আর ইনায়া।
তুশির ঠোঁট জোড়া কাঁপল। ভাবল,
“ ওর নাম তবে ইনায়া?”
ইয়াসির ফের বলল,
“ চাচ্চু অনেক খুশি ছিলেন সেদিন। ফোন করে বললেন, এই খুশিতে এসেই আমাকে আমার প্রিয় সাইকেল কিনে দেবেন। আমিও ভাবলাম, এক সায়নকে নিয়ে গিয়ে সৃষ্টিকর্তা হয়ত আমাদের দুটো ফুল উপহার দিয়ে গেলেন। ওরা ফিরে এলে মাও আবার আগের মতো হয়ে যাবে। কিন্তু হলো না! দীর্ঘশ্বাস ফেলল ইয়াসির। বলল,
সেই মাঝরাতে আবার একটা হাহাকার ছুটে এলো বাড়িতে। জানতে পারলাম, দুটো বাবু থেকে একজন চুরি হয়ে গেছে। হাসপাতালের কোনো এক আয়াকে সন্দেহ করছে সবাই। চাচ্চু কাঁদছিলেন,গলা কাঁপছিল। ছোটো মা তখন পোস্ট অপারেটিভ কেয়ারে। হুশ আসেনি। ভাইয়ের আহাজারিতে বাবা আর বসে থাকতে পারলেন না। আশ্চর্যের বিষয়, সন্তান হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া আমার মাও তড়িঘড়ি করে রওনা করলেন সাথে । হাসপাতালে পুলিশ এলো। চাচ্চু খুব অনুরোধ করছিলেন, ছোটো মায়ের জ্ঞান ফেরার আগে বাবুটাকে খুঁজে দেয়ার জন্যে। বাবার হাত ধরে বলছিলেন,
“ আমি কী জবাব দেবো,ভাইজান? তুমি অন্তত কিছু করো।”
ব্যাপারটা নিয়ে বাবাও খুব তৎপর হয়ে পড়লেন। আর্মির মেজরের কেস,সকলে একটু বেশিই তটস্থ। পরিবারের সবাই চিন্তায় অস্থির। আমি বাবার সাথে সাথে ছিলাম। কোনো খবর যদি পাই, সেই আশায়। হঠাৎ বাবার ফোন বাজল। লক্ষ্য করলাম, স্ক্রিন দেখে বাবার মুখভঙ্গি বদলে গেছে। লাইন কেটে দিলেন তিনি। ফোন আবার বাজল। বাবা আবার কাটলেন। পরপরই টুং করে ম্যাসেজ বাজল একটা। তাতে কী লেখা ছিল আমি জানতাম না। তবে বাবা তাড়াহুড়ো করে ফোন নিয়ে এক কোণে গিয়ে দাঁড়ালেন। এরপরই দেখলাম বাবা আর নিজের মাঝে নেই। কথাবার্তা শেষ করে কেমন নিষ্প্রাণ শরীরের মতো এসে দাঁড়িয়ে রইলেন শুধু। এতক্ষণ পুলিশকে ধমকানো,তাগিদ দেয়া, এদিকে সেদিকে কল করে লোক লাগানো মানুষটা আচমকা কেমন চুপ করে গেছে। কথা নেই,শব্দ নেই। মুখের দিকে তাকানোও যাচ্ছে না। অয়ন কাছে গিয়ে ডাকল,
“ বাবা!”
কেমন নির্জীব চোখে চাইলেন তিনি। ও কেঁদে কেঁদে জিজ্ঞেস করল,
“ বাবুটাকে পাওয়া যাবে তো?”
বাবা জবাব দিলেন না। আমার সন্দেহ গাঢ় হলো। সব গিয়ে বর্তাল বাবার ফোনে। কে ফোন করেছিল,কী এমন বলেছিল বাবাকে! জানার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলাম। ওৎ পেতে রইলাম একটা বার ফোনটা হাতে পাওয়ার জন্যে। তারপর ঐ রাত কাটল। বাচ্চাটাকে কোথাও পাওয়া গেল না। খবরটা ছোটোমাকে দেয়া হলো একদিন পরে। যা ভয় পাচ্ছিল সবাই,তাই হয়েছে। আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি। ইমিডিয়েট ঢাকায় নিয়ে আসা হলো। প্রায় বিশ দিন লেগে গেল ওনার সুস্থ হতে। মা নিজেকে,নিজের দুঃখকে ভুলে ছোটো মায়ের দেখাশোনা করছিলেন। আর ইউশা তখন ওর নানুর কাছে থাকতো।
ছোটো মা শুধু কাঁদতেন। বুক চাপড়ে চাপড়ে বলতেন আমার বাচ্চাটাকে কেউ এনে দাও। বিশেষ করে যখন ইউশাকে কোলে নিতে যেত,কান্না বাড়তো ওনার। শুধু হাহুতাশ করে বলতেন,
“ আপা,আমার ওই মেয়েটারও তো এখন খিদে পেয়েছে তাই না? ও নিশ্চয়ই কাঁদছে। ওকি ওর মাকে খুঁজছে না আপা? আমার মেয়েটাকে কোথায় পাব আপা? কে এনে দেবে,কী করলে এনে দেবে! আপা ও বেঁচে আছে তো!”
ইয়াসির ফের তুশির পানে চাইল। চিবুক গলায় নামিয়ে ফোঁপাচ্ছে মেয়েটা।
একটু থেমে বলল,
“ আমার কাছে বাবার ফোন পাওয়ার সুযোগ এলো ঘটনার এক সপ্তাহ পর। বাবা ওয়াশরুমে ছিলেন। ফোন টেবিলে। আমি ছো মেরে নিয়ে দৌড়ে নিজের রুমে চলে এলাম। ইনবক্সে ঢুকে দেখলাম,ওই তারিখের কোনো ম্যাসেজ নেই। এমনকি জেসমিন নামটাও সেভ নেই ফোনে। বুঝলাম, বাবা সব ডিলিট করে দিয়েছেন। তারপর পাগলের মতো সারা ফোন ঘাটলাম আমি। সৌভাগ্য বলব না দূর্ভাগ্য জানি না,তারপর….
ইয়াসির থেমে গেল। কৌতূহলে মুখ তুলল তুশি।
“ তারপর?”
অতীতের সেই বিদঘুটে দৃশ্য ইয়াসিরের সামনে ভেসে উঠল। কানে বাজল সেসব জঘন্য ফোনালাপ…
শওকতের ফোনে অটো কল রেকর্ডার চালু ছিল। হয়ত এটুকু ডিলিট করতে ভুলে গেছিলেন ভদ্রলোক। ইয়াসির তারিখ ঘেটেঘুটে একটা নম্বর দেখল। দশ মিনিটের কথোপকথন। কাঁপা আঙুল নেড়ে প্রেস করল সেখানে। ভেসে এলো শওকতের চাপা স্বর,
“ সমস্যা কী তোমার? কেটে দেয়ার পরেও এতবার কল করছো কেন?”
ওপাশের রিনরিনে নারী স্বর বলল,
“ ইস,খুব ব্যস্ত বুঝি?
বাচ্চাটাকে তাহলে আর খুঁজেই পেলে না।”
“ তুমি এসব কী করে জানো?”
“ সেটাতো বড়ো কথা নয়। বড়ো কথা হলো এখন তোমার কেমন লাগছে? পরিবার পরিবার করে আমাকে ছেড়ে গেলে এখন পরিবারের এই দূর্ভোগ,দূর্দশাগুলো উপভোগ করছো নিশ্চয়ই?”
শওকত রেগে বললেন,
“ বিপদের সময় এসব কেমন মজা জেসমিন? তুমি জানো সাইফুলের ওপর দিয়ে কী যাচ্ছে! ওর একটা বাচ্চা মিসিং এখনো।”
“ একটা বাচ্চা? এমা,বাচ্চা কি দুটো ছিল নাকি! ইস,ভুল হয়ে গেল তাহলে।”
“ ফোন রাখো।”
“ আরে রে শোনো তো… এত রাগ কীসের শওকত? আগে তো ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলতে,এখন দু মিনিটও দিচ্ছো না।”
“ জেসমিন ফোন রাখো। মানুষকে জ্বালানোরও একটা সীমা থাকে। আমার পরিবারের কী অবস্থা আন্দাজ আছে তোমার?”
“ থাকবে না কেন, অবশ্যই আছে। বাচ্চা হারালে সবার-ই কষ্ট হয় শওকত। সবার মনের ওপর দিয়েই ঝড় যায়। আমারো এমন হয়েছিল। যখন তুমি নিষ্ঠুরের মতো বলে দিলে আমাদের বাচ্চাটাকে অ্যাবোর্ট করে ফেলতে!”
ইয়াসিরের চোখ কেঁপে উঠল,
‘বাচ্চা!’
“ তোমার জন্যে বাবা আমাকে জোর করে নিয়ে অ্যাবোর্ট করিয়ে দিয়েছেন। আমার প্রথম সন্তান ছিল শওকত। কী ক্ষতি করেছিলাম আমি তোমার? কেন আমার সাথে এমন করলে! তোমার ভাই আমাকে ফোন করে যা নয় তাই বলেছে সেদিন। আমি তোমার রক্ষিতা? বলো, রক্ষিতা আমি? আমি তো রক্ষিতা হতে চাইনি,শওকত। আমি তোমার স্ত্রী হতে চেয়েছিলাম। স্বপ্ন দেখেছিলাম তোমাকে নিয়ে। কিন্তু তুমি সেই স্বপ্ন পায়ে পিষে দিয়েছ। ইউজ করেছ আমাকে। যদি শুরুতেই বলে দিতে, তোমার স্ত্রী জীবিত,আমাদের সম্পর্ক এতদূর গড়াতই না। তুমি ঠকিয়েছ আমাকে। তোমার স্ত্রী দুটো ছেলে রেখে মারা গেছেন তাই না! এসবই বলেছিলে তো। দিনের পর দিন আমাকে ব্যবহার করে,আমার শরীরটাকে ব্যবহার করে, পরিবারের দোহাই দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছ আমাকে। তোমার জন্যে আজ বাবাও পরিবারের কেউ আমার পাশে নেই। প্রত্যেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে,প্রত্যেকে।”

“ এই এক গান আর কত গাইবে? যা হয়েছিল সব আমাদের সম্মতিতে। আমি তো তোমাকে জোর করিনি। আর এসব কথা বলার কী আর সময় নেই? আমার বাড়ির লোকেদের এখন…”
জেসমিন হাসল,মাঝপথেই বলল,
“ খারাপ অবস্থা,তাইতো? অবস্থা তোমাদের আরো খারাপ হবে সৈয়দ শওকত ইসলাম। জেসমিন আরাকে তুমি চেনো না। আমাকে ঠকিয়ে তুমি আমার জীবন, আমার বাচ্চার জীবন নিয়ে খেলেছ, তোমার ভাই আমাকে নোংরা ভাষায় গালাগালি করেছে,তোমাদের আমি এক দণ্ড শান্তি দেবো না। সবে শুরু করলাম, এবার দেখবে কী হয়!”
শওকতের গলার স্বর বদলে গেল এবার। সতর্ক কণ্ঠে বললেন,
“ কী করেছ তুমি জেসমিন!”
জেসমিনের স্বর উৎফুল্ল,
“ উহু,প্রশ্নটা হবে কী করিনি। কারণ,আমিই তো সব করেছি। তোমার ভাই ওইদিন আমাকে খুব শাসাচ্ছিল জানো। এই করবে সেই করবে। অথচ কিছু করার আগেই বেচারাকে গুটিতে আমি মাত দিয়ে দিয়েছি। এখন নিশ্চয়ই গুনগুন করে কাঁদছে? ইস, মায়া হচ্ছে ওনার জন্যে। প্লিজ গিয়ে বলো যেন না কাঁদে। কারণ, যে ভাইয়ের জন্য অচেনা এক মহিলার সাথে উনি অত জঘন্য ভাষায় হম্বিতম্বি করল, ওনার বাচ্চা তো সেই নিয়ে গেছে। ওনার ভাইয়ের একমাত্র প্রেমিকা!”

শওকত স্তম্ভিতের ন্যায় আওড়ালেন,
“ জেসমিন,বাচ্চা তুমি চুরি করিয়েছ?”
“ শুধু চুরিই করাইনি। মারতে পাঠিয়ে দিয়েছি। এতক্ষণে বোধ হয় কাজ শেষও হয়ে গেছে। বললাম না সবে শুরু? আমার বাচ্চাটা যখন বাঁচেনি শওকত,তোমার পরিবারের একটা বাচ্চাকেও আমি বাঁচতে দেবো না। তোমার ছেলেদেরও আমি শেষ করে দেবো। আই প্রমিস ইউ,ধরে ধরে শেষ করে দেবো আমি সবাইকে…”
ইয়াসির এর বেশি শুনতে পারেনি। ঠকঠক করা হাত থেকে ফোনটা ঝুপ করে পড়ে গেল নিচে। বুক জ্বলছে,চোখের সামনে লালচে অন্ধকারে তলিয়েছে সব। তক্ষুনি ছুটে এসে দরজায় দাঁড়ালেন শওকত। ভদ্রলোকের শক্ত চোয়াল বদলাল,মেঝেতে পড়ে থাকা ফোন,আর ইয়াসিরের ছলছল চোখের আগুন দেখে। অতটুকু ছেলে, অথচ ঘাবড়ে গেলেন শওকত। পড়ে থাকা ফোনটা তখনো বাজছে। ভেসে আসা কথোপকথন শুনে ভদ্রলোকের মুখ বিবর্ণ হলো। পাংশুটে দেখাল চোখদুটো। ওপাশ থেকে ধীরুজ পায়ে হেঁটে এসে বাবার মুখোমুখি থামল ইয়াসির। শওকত হাঁ করতে গেলেন, পূর্বেই ঘৃণায় উগলে পড়ল ছেলেটা। মেঝেতে এক দলা থুথু ফেলে বলল,
“ ছিহ!”
বাড়িতে তখন সবাই আছে। ইয়াসির ছুটে বেরিয়ে যেতেই, শওকত আতঙ্কে ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন। ছেলেটা যদি গিয়ে সবাইকে সব কথা বলে দেয়! ত্রস্ত পিছু নিলেন ওর। অথচ, ইয়াসির নিচে নামেনি। ওপরের সিঁড়িগোড়ায় এসে দাঁড়িয়ে গেল হঠাৎ। তখন দুপুর বেলা একসাথে খেতে বসেছে সবাই। ইউশাকে কোলে নিয়ে চেয়ারে বসেছিলেন রেহনূমা। তনিমা পাশে দাঁড়িয়ে তাকে মুখে তুলে খাওয়াচ্ছেন । অয়নের থালায় এটা সেটা বেড়ে দিচ্ছেন সাইফুল। দাদুভাই,দিদুন প্রত্যেকে ছিল। বাড়ির দেওয়ালগুলোয় তখনো দুটো সন্তান হারিয়ে যাওয়ার বিষণ্ণতা লেগে! অথচ এসবের মাঝেও সকলের এই মিল এই ভালোবাসা,এই আন্তরিকতা থমকে রাখল কিশোরকে। নিচে আর এলো না ইয়াসির। অসহায় চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে, ফের ছুটে ঢুকে গেল কামরায়। তার দোর চাপানোর শব্দ পৌঁছে গেল খাবার ঘরে। সবার সাথে সাথে এক চোট কেঁপে উঠলেন শওকতও।

কয়েক পাঁক বেগ বদলে নেওয়া হাওয়া ইয়াসিরকে ফের বর্তমানে আনল। গৌড় বর্ণের যুবকের মুখে এখন ঘোর অমানিশা। আর্দ্র স্বরে বলল,
“ একটা ছেলের কাছে, তার বাবা আইডল, তার আদর্শ হয়। আমিও আমার বাবাকে আইডল হিসেবে জানতাম। ভাবতাম, বড়ো হয়ে বাবার মতো অফিসার হবো। দেশের সেবা করব। অথচ আমার সেই বাবা এক মেয়েকে মিথ্যে কথা বলে,আমার জীবিত মাকে মৃত বানিয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলল। যার গর্ভে বাবার অবৈধ সন্তা…
ইয়াসির চোখ খিচে থামে। ফের বলে,
“ অতটুকু বয়সে নিজের বাবার এমন কুৎসিত চরিত্রটা জানার পর,আমার সারা শরীর ঘৃণায় রিরি করছিল। যে সময়টায় ছোটো মা উদগ্রীব হয়ে প্রহর গুণতেন মেয়ের একটা খবর পাবার আশায়! চাচ্চু প্রতি সপ্তাহে নূরনগরের থানায় চক্কর কেটে আসতেন, সেখানে সব জেনেও আমি কাউকে কিচ্ছু বলতে পারিনি। কী করে বলতাম? ওই লোকটা যেমনই হোক,যাই হোক উনি তো আমার বাবা। সব জানার পর আমি যেভাবে ওনাকে থু দিয়ে এলাম,বাড়ির সবাই নিশ্চয়ই তাই করবে? যে চাচ্চু ভাই অন্তপ্রাণ,যে ছোটো মা ভাসুরকে শ্রদ্ধায় মাথায় করে রাখেন,আমার মা এতকিছুর পরে যখন স্বামীর একটু যত্ন পেতে শুরু করলেন, এসব জানলে যে প্রত্যেকে ঘৃণা করবে তাকে। সবার সম্পর্কে ভাঙন ধরবে । আমাদের এতদিনের একসাথে থাকা, আমাদের পরিবার, সব ভেঙে যাবে,সব। তাই চুপচাপ নিজের মাঝে দাফন করলাম সত্যিটা। কিন্তু
দিন যত যাচ্ছিল,এই অপরাধ বোধ, এই ঘা কুড়ে কুড়ে খেতে শুরু করল আমাকে। যখন দেখতাম ইউশার জন্মদিন এলেই ছোটো মা পাগলামো করছেন। ছোটো চাচ্চু খবর নিতে ক্লান্ত হচ্ছেন না,ভাতের থালায় আঙুল নাড়তে নাড়তে চোখের জল মুছছেন,আমার মা সায়নের শোকে রুম অন্ধকার করে গুনগুণ করে কাঁদতেন, আর আমার বাবা তার প্রেমিকার অন্যায় নিজের স্বার্থে চুপ করে গিলে ফেলেছেন,তখন আমার আমাকেই সবথেকে বড়ো কালপ্রিট মনে হতো। মনে হতো কেন আমি কাউকে কিচ্ছু বলতে পারিনি?”

তুশি ধড়ফড়িয়ে শুধাল,
“ আর জেসমিন,জেসমিনের কী হয়েছিল?”
“ জানি না। ওইটুকু বয়সে ওনার খোঁজ নেয়ার মতো ক্ষমতা আমার ছিল না। যখন একটু বড়ো হলাম সোর্স লাগিয়েছিলাম একবার। ওনার বাবা রিটায়ার্ড কমিশনার ছিলেন। পুরো পরিবারের সবাই নিউইয়র্কে সেটেল্ড। কেবল জেসমিন থাকতেন এখানে। ইঞ্জিনিয়ারিং-এর স্টুডেন্ট ছিলেন তিনি। তাই মেয়ে কী করত,কী না করতো ওনারা জানতেন না। খোঁজ নেয়ার পর জানতে পারি,শী কমিটেড সুইসাইড।”
তুশি সুইসাইড মানে বোঝে। আঁতকে বলল,
“ সে কী!”
“ হুঁ। আমাদের পরিবারকে শেষ করে দেয়াটা ওনার হুমকি ছিল। যাতে বাবা ফিরে যান। কিন্তু বাবা ফিরলেন না! উলটে ওনার সাথে যোগাযোগ করার সব রাস্তা বন্ধ করে দিলেন। হয়ত এই অবজ্ঞা নিতে পারেননি তাই…”
আর ঠিক এই কারণেই আমি আমার বাবাকে ঘৃণা করি। বউ,সন্তান থাকা সত্ত্বেও একটা মেয়েকে মিথ্যে বলে, দিনের পর দিন বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তাকে সর্বশান্ত করে দেয়া মানুষটাকে আমি নিজের সবটুকু দিয়ে ঘৃণা করি।
জেসমিনের তো দোষ নেই,সব দোষ ওনার। ওনার এই ব্যাভিচার,এই পাপের জন্য কতগুলো জীবন শেষ হয়ে গেল। একটা বাচ্চা তো পৃথিবীতে আসার সুযোগই পেলো না। কতগুলো মা তার সন্তান হারিয়েছে। কতগুলো মেয়ে তাদের বেঁচে থাকার সুখ হারিয়েছে। এরপরেও ওই লোকটাকে আমি কী করে বাবা ডাকব? আমি ওনার সন্তান ভাবলেই তো আমার নিজের প্রতি ঘৃণা হয়। তাই আমি ওনাকে কোনোদিন ক্ষমা করব না। কোনোদিন না!”

চাঁদের আলোয় তুশি স্পষ্ট দেখল,ইয়াসিরের চোখের কোণ বেয়ে একটা জলের ধারা নামছে। মেয়েটা নিজেও কাঁদছিল। অথচ প্রিয় পুরুষের চোখের পানিতে ভেতরটা কেঁপে উঠল সজোরে। অধৈর্য হাতে পানিটা মুছে দিলো তুশি। অস্থির চিত্তে বলল,
“ কাঁদবেন না,কাঁদবেন না।”
ইয়াসির সুদূর থেকে চোখ এনে পাশ ফিরে চাইল। ফেলল তুশির মেদুর মুখে। মেয়েটার নরম দৃষ্টিতে অগাধ মায়া, ভরসা অনেক। কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ চেয়ে রইল সে। তারপর কিছু একটা হয়ত হলো। আচমকা হুড়মুড় করে তুশিকে জড়িয়ে ধরল ইয়াসির । এত দ্রুত, এত জোরে, রীতিমতো তুশির শীর্ণ বুকের ভেতর তার মাথা ঢুকে যায়। অপ্রস্তুতি, আর হকচকানোয় দোলনার কাঠের গায়ে হেলে পড়ে মেয়েটা।
বলিষ্ঠ দুহাত দিয়ে তুশির পাতলা শরীরটাকে ইয়াসির এত আষ্ঠেপৃষ্ঠে ধরেছে,রীতিমতো ওর শ্বাস নেয়াও দুষ্কর হয়ে এলো। কিন্তু টু শব্দও করল না তুশি। কাঁপা কাঁপা হাতদুটো তুলে ইয়াসিরের পিঠে রাখল সে। পরপর খুব শক্ত করল বাঁধন। আজকের এই লুটপাট হওয়া জ্যোৎস্নায় প্রথম বার দুটো শরীর মিশল একে অন্যের সাথে। এরপর কী হবে,কে জানে!

চলবে…

কাছেআসারমৌসুম!

নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি

৩৪
(বর্ধিতাংশ)
রাতের মধ্যভাগ শেষের পথে। অনেকক্ষণ যাবত শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছিলেন সাইফুল। ঘুম আসার নাম নেই আজ। ভ্রু দুটো কুঁচকে একদম কপাল বরাবর বসানো সাদা বাল্বটাকে দেখলেন তিনি। তারপর ক্লান্ত চোখে চাইলেন পাশে গুম মেরে বসে থাকা স্ত্রীর পানে। চ সূচক শব্দ করে বললেন,
“ লাইটটা এবার বন্ধ করো, রেহনূমা। আলোতে ঘুম হয় না আমার। ”
রেহনূমা চুপ করে বসে রইলেন। ভার মুখ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সাইফুল।
“ হয়েছে কি তোমার? কটা বাজে,এখনো ঘুমোচ্ছো না কেন?”
ভদ্রমহিলা ছুড়ে ছুড়ে বললেন,
“ মন চাইছে না। তোমার ঘুম এসছে তুমি ঘুমাও।”
“ আমিও বা ঘুমোতে পারছি কই? মুখের সামনে একটা লাইট জ্বালিয়ে রেখেছে, কড়া আলো একেবারে চোখে এসে লাগছে।
রেহনূমা দুম করে উঠে গিয়ে সুইচ টিপে দিলেন।
“ হয়েছে শান্তি? এবার নাক ডেকে ঘুমাও।”
সাইফুল প্রসন্ন চিত্তে মাথা নেড়ে ওপাশ ফিরে শুলেন। অমনি রেহনূমার মুখ অন্ধকারে ডুবল। ভেজা গলায় থমথম করে বললেন,
“ হ্যাঁ হ্যাঁ, এখন তো ঘুম আসবেই। মনে কত আনন্দ আপনার! মেয়ে বাবা বাবা করে ডাকল সারাদিন। বুকে জড়িয়ে ধরল। সব জ্বালা তো আমার। আমি মা হয়ে একটু ছুঁতেও পারলাম না।”
সাইফুল হাসলেন। লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে,উঠে বসলেন এবার। হাত দিয়ে জায়গা দেখিয়ে বললেন,
“ এসো এখানে।”
রেহনূমা গোমড়ামুখে এসে বসলেন পাশে। কিন্তু চেহারা ঘুরিয়ে রাখলেন অন্যদিক। ভদ্রলোক বললেন,
“ এতক্ষণ না ঘুমিয়ে বসে থাকার কারণ তবে এই?”
“ তো কী করব? শুনলে না মেয়ে কী বলল! আমি ওর মা নই। ও আমার মেয়ে নয়। আমার বানানো কেকটা পর্যন্ত কাটল না। আমার বুঝি কষ্ট হয় না!”
রেহনূমার চোখ ছলছল করে উঠল। কণ্ঠ ভিজে প্রগাঢ়! সাইফুল ব্যতিব্যস্ত আওড়ালেন,
“ এই যে,একটা বাচ্চার মতো কাঁদছো রেহনূমা। আরে বাবা, মেয়েটা একটু রেগে আছে এখন। কিছুদিন সময় দাও ওকে,সব আপনা-আপনি ঠিক হয়ে যাবে।”
“ কিচ্ছু ঠিক হবে না। আমি এতদিনে ঢেড় বুঝেছি তুশি খুব ত্যারা। ও আমাকে পছন্দ করে না সাইফুল। এই অভিমান যদি ঘৃণায় বদলে যায়! ও যদি সার্থর মতো আমার সাথে আর কখনো কথা না বলে? আমি তখন কী করব সাইফুল? আমার তো ভাইজানের মতো সহ্য শক্তি নেই বলো। আমার তো বুক ফেটে যাবে।”
“ এরকম কিছু হবে না রেহনূমা। আমি বলছি তো,তুশি সব ভুলে যাবে। সার্থ একটু বেশিই স্ট্রিক্ট। তুশি তা নয়! ভাইজানের ব্যাপারটা মনে নেই? সারাদিন ওকে বকাঝকা করত,এক টেবিলে বসতেও চায়নি খেতে,তা সত্ত্বেও যখন উনি অসুস্থ হলেন মেয়েটা ভাঙা পা নিয়ে হাসপাতালে নিয়ে গেল। সেই মেয়ে কি তার মায়ের সাথে রাগ ধরে রাখতে পারবে? এও সম্ভব!”
রেহনূমার সিক্ত নয়নে একটু খানি আশা এসে ভিড়ল।
“ সত্যি বলছো?”
“ সত্যি রে বাবা। তবে ভুল এখানে তোমারও আছে রেহনূমা, কেন শুধুশুধু আজেবাজে কথা বলতে মেয়েটাকে? বস্তিতে বড়ো হয়েছে বলেই তাকে কেন ছোটো করে দেখতে হবে?”

“ সেজন্যে না। আসলে, তুমি তো জানো সার্থ,অয়ন ওদের প্রতি আমি কত দূর্বল। ওদের সাথে কেউ খারাপ কিছু করলে আমি নিতে পারি না। তযখন জানতে পারলাম মাজহার লোকটার সাথে মিলে তুশি মিথ্যে মিথ্যে বউ সেজে বসেছে,তাও আবার টাকার লোভে! ওই মূহুর্তে সার্থর অপমানের কথা ভেবে আমি রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। ইনিয়েবিনিয়ে রাগটা আমার বেরিয়ে আসতো। কতবার চেষ্টা করেছি,একটু নরম ভাবে কথা বলার, হতো না। মনে হতো মেয়েটা যোচ্চর,ঠক,আমাদের ছেলেকে ঠকিয়ে বিয়ে করেছে। তখন রাগ হতো খুব!”

“ আর যখনই জানলে ওই যোচ্চর মেয়ে তোমার নিজের,তখনই সব রাগ শেষ হয়ে গেল? তখন থেকেই ভালোবাসতে শুরু করলে,এটা তুশির কাছে গড়মিল হবে না? ওতো ভাবতেই পারে,যে আমাকে বস্তির ভেবে দূরছাই করল,নিজের মেয়ে জানতেই বুকে টানতে চাইছে। তখন ওর রাগ হওয়া কি স্বাভাবিক নয়?”
শিশুর মতো ঘাড় নাড়লেন রেহণূমা। সাইফুল বললেন,
“ তাহলে? মেয়েটাতো নিজের জায়গায় ঠিক। আমি বা তুমি হলে নিশ্চয়ই আমরাও এমন করতাম।”
রমণীর কথা বেশ অবোধ শোনাল,
“ তবে এবার আমি কী করব?”
“ কী আবার করবে,মেয়ের মান ভাঙানোর চেষ্টা ছাড়া তো উপায় নেই। আমার রাগকে তো কখনো পাত্তা দিলে না,সব সময় ঝগড়া লাগলে আমাকেই এসে ক্ষমা চাইতে হতো। এখন নাও, মেয়ের রাগ সামলাও। ওর চোখে আজ তুমি যতটা খারাপ,চেষ্টা করো তার চেয়েও বেস্ট মা হয়ে ওঠার।
রেহণুমা ভারি দুশ্চিন্তায় পড়লেন। কী যে করবেন!
এর মাঝেই দরজায় টোকা পড়ল। ভেসে এলো চাপা নারী কণ্ঠ,
“ ও ছোটো,ঘুমিয়েছিস?”
ত্রস্ত চোখ মুছলেন রেহণুমা,
“ আপা! হ্যাঁ আপা আসছি।”
উনি নেমে যেতেই সাইফুল আরাম করে শুলেন। কাল সক্কাল সক্কাল অফিস যেতে হবে। ভাইজান এখনো ঠিক করে সুস্থ নন। বেড রেস্টের দু মাস এখনো শেষ হয়নি বলে চাপটা ঘাড়ে বেশ হালকা-পাতলা পড়েছে।
রেহনূমা দরজা খুলে হাসলেন।
“ আপা,ঘুমোওনি?”
“ না। আর আমি জানতাম তুইও ঘুমোসনি। এদিকে আয়।”
তারপর হাতটা ধরে সাথে নিয়ে চললেন তনিমা। রেহনূমা যেতে যেতে শুনলেন,ইউশার ঘর থেকে খুব জোরালো গানের শব্দ আসছে। অবাক হয়ে বললেন,
“ ওমা! এই রাত-বিরেতে মেয়েটা আবার সাউন্ড সিস্টেম বাজিয়েছে কেন?”
“ আরেহ,আজ ওর জন্মদিন না? একটু তো আনন্দ করবে। তারওপর আবার দুবোন কত বছর পর এক হলো। তুই ওসব ছাড়। বোস এখানে।”
দু তলার ফাঁকা জায়গায় একটা টি কর্নার করা। ছোটো দুটো বেতের মোড়ার মাঝে আরেকটা গোল টেবিল পাতানো। তনিমা একটা টেনে বসতেই,আঁচল গুছিয়ে রেহণূমাও বসলেন। শুধালেন বড়ো কৌতূহলে,
“ কী হয়েছে, আপা?”
“ আপার কী হবে? হয়েছে তো আপনার। চোখে পানি কেন? এখনো শোক কাটেনি?”
ভদ্রমহিলা মাথা নোয়ালেন,
“ এমনিইইই!”
“ কাঁদছিস কেন বোকা? তুশির মন কত নরম জানিস না! মেয়েটা খুব ভালো। দেখবি দুটো দিন গেলে আপনা- আপনি বুকে এসে পড়বে।”
রেহনূমা ঘাড় নাড়লেন একটু করে। তনিমা হাসিহাসি মুখ করে বললেন,
“ আমি কী ভাবছি জানিস!
আমরা কেমন জা থেকে এখন বেয়ান হয়ে গেলাম। তোর মেয়ে এখন আমার ছেলের বউ। আবার আমার ছেলেটা তোর মেয়ে জামাই।”
রেহমুনা হাসলেন এতক্ষণে। প্রফুল্ল চিত্তে বললেন,
“ আরে তাই তো। এত কিছুর মাঝে কথাটা আমি ভুলেই গেছিলাম!”
তনিমা হাতটা ধরে বললেন,
“ আমি তোর ভাইজানকেও বলছিলাম। ভালোই হয়েছে, সেদিন কনে পাল্টে যাওয়ায়! এজন্যেই বলে আল্লাহ যা করেন,ভালোর জন্যেই করেন। ওইদিন ভুল করে ওদের বিয়ে নাহলে আজ আমরা তুশিকে পেতাম কোথায় বল তো!”
রেহনূমার হাসিটা মুছে গেল হঠাৎ। কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন,
“ কিন্তু আপা, বিয়েটা কী আদৌ হয়েছিল?”
“ ওমা,এ আবার কেমন কথা। কেন হবে না?”
“ আপা, হাসনা খালার কথা শুনলে না তুমি? ওনার ছেলে বিদেশেই মারা গেছে। তাহলে তো তুশির বাবা-মায়ের নাম ভুল। ওনার বানানো। মানে এমন এমন নাম, যাদের পৃথিবীতে কোনো অস্তিত্বই নেই। আর কাবিনবামায় বাবা-মায়ের ভুল নাম দেয়া থাকলে বিয়ে কী করে হলো? তারওপর ছেলে মেয়ে দুটোর কেউই তো রাজি ছিল না। বিয়ে তো বৈধ হয়নি, আপা। এতদিন এসব নিয়ে ভাবিইনি। কিন্তু এখন…!
“ তাই তো, আমার যে এসব মাথাতেই আসেনি। তাহলে এখন উপায়?”
রেহণূমা সাগ্রহে শুধালেন,
“ ওদের আবার নতুন করে বিয়ে দিয়ে দিই?”
পরপরই শঙ্কিত হয়ে বললেন,
“ কিন্তু সার্থ,ও কি রাজি হবে? তুশিকে তো ও পছন্দই করে না।”
তনিমা ভাবুক হয়ে বললেন,
“ মহাচিন্তায় ফেলে দিলি দেখছি। কী করব এখন? তুই একবার আলোচনা করে দেখবি?”
রেহণূমা মাথা পিছিয়ে দুহাত নেড়ে বললেন,
“ না না,বাবা। যা রাগ তোমার ছেলের! বিয়ে-টিয়ে নিয়ে কিছু বলতে গেলেই ইংরেজিতে কতগুলো কথা শুনিয়ে দেবে। আমি পারব না!”
তনিমা শ্বাস ফেললেন,
“ আচ্ছা,তাহলে আমিই বলব। সকাল হোক! তবে মনে হচ্ছে না এবার আর আপত্তি করবে। এখন তুশির তো পরিচয় পাল্টেছে। এইবার সার্থ এক পায়ে রাজি হবে, দেখিস!”
“ তাই যেন হয়,আপা। তাই যেন হয়!”


অন্ধকার রাতের বুক ফুড়ে ভোরের ঠান্ডা আভা সদর্পে ছুটে আসছে। পাখির কিচিরমিচির ডাকে মুখোরিত বাতায়ন। একটু একটু করে দুলতে থাকা দোলনায় এখনো ঠায় বসে আছে তুশি। মেয়েটার চেহারায় ক্লান্তি। পায়ের পাতা থেকে পিঠের হাড়টাও বিবশ ভঙ্গিতে মিশে আছে যেন। অথচ দুচোখ ছাপানো বিমোহ নিয়ে নিষ্পলক এক পুরুষ পানে চেয়ে রইল সে। কোলের ওপর মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে ইয়াসির। বড়ো গভীর ঘুম! আর সেই ঘুমন্ত মুখখানা দেখে নিজের ইহকাল ক্ষণিকের জন্য ভুলে বসল তুশি। ভুলল নিদ্রা,সামান্য একটু নড়চড় শরীরের। পাছে, ইয়াসিরের ঘুম ভেঙে যায়! নিরন্তর তার ট্রিম করা গোছানো চুলে হাত বোলাল সে। তুশির হৃদয়পটে একটা দুধ-সাদা সফেদ স্রোত কলকল করে বইছে। যার গতিবেগ আকাশের বুক হতে খসে পড়া তারার চেয়েও শতগুণ বেশি। বা-পাশের ঢিপঢিপ শব্দটাও ততোধিক ভারি। তুশি মন ভরে ইয়াসির কে দেখল আজ। একটু সময়ের জন্যেও চোখ সরাতে হয়নি। ইয়াসিরের তীক্ষ্ণ চাউনি থেকে লুকোতে হয়নি নিজেকে। পেলব আঙুল চালিয়ে মানুষটার শক্ত চিবুক ছুঁলো,ছুঁলো খোঁচা খোঁচা দাড়িভরতি গালজোড়া।
এক অবাধ্য,অশান্ত ইচ্ছে হৃদয়ে উঁকি দিলো হঠাৎ। মন চাইল, ইয়াসিরের ঠিক কপালে এক গভীর চুমু বসাতে! এই ইচ্ছে প্রেমিকার অস্থির মনের,নাকি স্ত্রী হিসেবে অধিকারের তুশি জানে না। শুধু জানে কিছু ইচ্ছেকে প্রশ্রয় দিতে হয়। মেয়েটা আস্তেধীরে ঠোঁট নামিয়ে আনল। ওষ্ঠপুটের নরম ত্বক যখনই ছুঁইছুঁই হবে,তক্ষুনি নড়ে উঠল ইয়াসির। সহসা বিদ্যুৎ বেগে সরে এলো তুশি। ইয়াসির বালিশ ভেবে দুহাতে আরেকটু আকড়ে ধরল ওর লতানো কোমর। মসৃণ পেটে মুখ গুজে দিতেই তুশির বিশীর্ণ শরীর স্তম্ভ বনে গেল। মূর্তি বনে দোলনার কাঠে লেগে গেল মেয়েটা। ধাতব হাতলগুলোতে শব্দ হলো জোরে। ইয়াসিরের ঘুম ভেঙে গেল তাতে। কুঁচকানো ভ্রুয়ের নিচে নিভু চোখ মেলে চাইল সে। তুশি ঢোক গিলল অমনি। মুখটা ছোট হয়ে গেল। মানুষটার গায়ে রাখা হাতজোড়া সরাল ঝট করে। ইয়াসির হতবুদ্ধি চোখে একপল আশেপাশে দেখল। মাথার ওপর খোলা আকাশ দেখে সেই রেশ বাড়ল আরো। যখনই চোখ দুটো পৌঁছাল তুশির শুষ্ক মুখে,চমকে গেল ছেলেটা। দু সেকেন্ড প্রকট নেত্রে চেয়ে থেকে, তড়াক করে উঠে বসল ইয়াসির। ছিটকে সরল কয়েক হাত দুরুত্বে। চেহারায় স্পষ্ট অস্বস্তি। পরপর চ সূচক শব্দ করে কপালে আঙুল ঘষল ইয়াসির। তুশি মিনমিন করে আগ বাড়িয়ে বলল,
“ রাতে মানে… হয়েছে কী…আপনি আসলে..”
পুরো কথা শুনল না সে। ঝট করে দাঁড়িয়ে,
ছুড়ে দিয়ে গেল,
“ সরি!”
তারপর তরবড় করে ছাদ থেকে নেমে গেল নিচে। তুশি সুস্থির বনে চেয়ে রইল সেদিকে। পরপরই চিবুক নামিয়ে মিটিমিটি হাসল। লাজুক লাজুক হাবভাব করে বলল,
“ আপনি সরি!
আর আমি আই লাভ ইউ।”
**
ইউশা একটা চেয়ার টেনে খাবার টেবিলে বসল। কাঁধের ব্যাগটা রাখল তার পাশের কেদারায়। ভাঙা গলা তুলে ডাকল,
“ মা, এক কাপ চা দেবে?”
রান্নাঘর থেকে মাথা নামিয়ে তাকালেন তনিমা। বললেন,
“ ইউশা চা চাইলি? তোর গলার একি অবস্থা! এত ভাঙল কী করে? সারারাত এসি ছেড়ে ঘুমিয়েছিস?”
শুকনো হাসল মেয়েটা,
“ হ্যাঁ মানে ওই আরকি। মা ওঠেনি এখনো?”
“ না। ঘুমাক একটু। আমি চা দিচ্ছি দাঁড়া।” ইউশা ঘাড় নাড়ল। চুপ করে চেয়ে রইল, খালি প্লেটের দিকে। কাল সারারাত ও কেঁদেছে। গলা ফাটিয়ে আর্তচিৎকার করেছে। সেজন্যে গলায় ব্যথা করছে খুব। ঢোক গিললেও যেন টান পড়ছে নালীতে। কিছু সময় পর স্কুলের জন্যে তৈরি হয়ে নেমে এলো মিন্তু। চুপচাপ, গুরুতর মুখে বসল ইউশার থেকে কয়েক হাত দূরে।
থমথমে কণ্ঠে বলল,
“ বড়ো মা,খাবার দাও।”
ইউশা শান্ত চোখ তুলে এক পল ভাইকে দেখল। মিন্তু এমনিতে চটপটে। আজ হলো কী? জিজ্ঞেস করল,
“ কী হয়েছে তোর?”
দুপাশে মাথা নাড়ল ছেলেটা। বোঝাল,কিছু না। ইউশা বলল,
“ উহু, কিছু তো একটা ঘটিয়েছিস। তুইত এমন চুপ থাকার ছেলে না। আবার ক্লাস টেইস্টে ফেইল করেছিস, তাই না!”
মিন্তু রেগে রেগে বলল,
“ তুই আমার সাথে কথা বলবি না। তুইও ভালো না,তোর সাথে মিশে তুশিপুও ভালো না হয়ে যাচ্ছে।”
“ কী করলাম?”
“ তোরা যে কাল এক ঘরে ঘুমোলি,গান বাজিয়ে নাচানাচি করলি,আমি যে এত দরজা ধাক্কিয়ে ডাকলাম, খুললি না কেন? আমি তোদের দুবোনের একমাত্র ভাই। কিন্তু তোরা আমাকে ছাড়া রুম পার্টি করতে পারলি? ছি!”
ইউশার কথা বন্ধ হয়ে গেল। চেয়ে রইল অসহায় চোখে। ও কাল
গান ছেড়ে নাচছিল? রুম পার্টি করছিল? তার ভাবনার মাঝেই ওপরের কোনো এক ঘর হতে পুরুষালি স্বর ছুটে এলো নিচে,
“ মামুনি,আমার চা!”
ইউশা ছলকে উঠল। কাঁটা ফোটার মতো অহেতুক কাঁপল তার সমস্ত শরীর। কিন্তু,এই কাঁপুনি তো অনুভূতির নয়! একতরফা প্রেমের তরে সবকিছু হারিয়ে ফেলার বিষণ্ণতা এ! সতেজ ফুলের নেতিয়ে মুষড়ে যাওয়ার মতো শরীর ভেঙে এলো ইউশার। মাথা নোয়ানোর মাঝেই রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন তনিমা। এক হাতের পরোটা, ডিম পোচের প্লেটটা রাখলেন মিন্তুর সামনে। আরেক কাপ চা ইউশার সামনে রেখে বড়ো ব্যস্ত গলায় বললেন,
“ অয়নকে একটু চা টা দিয়ে আয় না, মা।”
কেমন করে আঁতকে উঠল মেয়েটা,
“ আমি? আমি কেন বড়ো মা,তুমি যাও না।”
“ রান্নাঘরে অনেক কাজ! চুলায় আলু ভাজি বসিয়েছি। আসমা তো কাপড় ধুতে ঢুকেছে। একটু পরই সবাই খেতে নামবে। ছেলেটা সেই কখন চা চেয়েছে আমি ভুলেই গেছিলাম। তাড়াতাড়ি দিয়ে আয়, যা।”
ইউশার ভেতর আপত্তি। দ্বিধাদ্বন্দ্ব মুখ জুড়ে। তনিমা কপাল কুঁচকে বললেন,
“ কী হয়েছে তোর! আগে তো বলার আগেই অয়নের কাজে দৌড়ে দৌড়ে যেতিস। কিছু বলেছে ও? বকাঝকা করেছে নাকি!”
মিন্তু টেনে টেনে বলল,
“ অলস অলস। রান্নাঘর থেকে ঝাড়ুটা এনে পিঠে দুটো বাড়ি দাও,দেখবে ছুট্টে যাবে।”
কথার পিঠে ইউশা আজ চোখ পাকাল না। ধমকালও না একটুখানি। ঠোঁট টিপে চুপ করে রইল। ভেতরে সে ক্লান্ত খুব। দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল তারপর । কাপ হাতে তুলে বলল,
“ নিয়ে যাচ্ছি।”
মেয়েটার যাওয়ার পথে হাঁ করে চেয়ে রইল মিন্তু। বিস্ময় নিয়ে বলল,
“ কী ব্যাপার, বড়ো মা ও আজ আমাকে ধমকাল না যে! একটু তো তেড়েও এলো না।”
তনিমারও একই প্রশ্ন। রোজ তো এ দুটোর খুনশুঁটিতে বাড়ি মাথায় ওঠে। বিভ্রান্ত চিত্তে বললেন,
“ কিছুই বুঝতে পারছি না।”


অয়নের ঘরের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল ইউশা। বড়ো করে শ্বাস টেনে নিঃশব্দে ঢুকল ভেতরে। অয়ন তখন বারান্দায়। ঝুলন্ত হেভি ব্যাগটায় একের পর এক ঘুষি মারছে। পরনের স্যান্ডো গেঞ্জি ঘামে ভিজে লেপ্টে গেছে পিঠে। উন্মুক্ত ফরসা-ফোলা বাহু জোড়া। কোমরের কালো ট্রাউজার নিচের দিকে নেমে এসেছে কিছুটা। অথচ এই চোখ ধাধানো, আকর্ষণীয় সুতনু পুরুষ পানে ইউশা বেশিক্ষণ চাইল না । চট করে মুখ ফিরিয়ে নিলো। ডাকল হাস্যহীন,
“ অয়ন ভাই,তোমার চা।” থামল অয়ন। থামল তার হুক প্র‍্যাকটিসিং। ঘাড়ে তোয়ালে ঝুলিয়ে ঘরের ভেতরে এলো। গলার ঘাম মুছতে বলল,
“ যাক, অবশেষে চা পেলাম তবে। আমি তো ভাবলাম আজ আসবে না। মামুনি এত ভুলোমনা হচ্ছে দিনদিন।”
ইউশা কথা বাড়াল না। চুপ করে শুনে চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল টেবিলে। ফিরতে পা বাড়াতেই অয়ন বলল,
“ কোথায় যাচ্ছিস?”
“ ক্লাস আছে।”
“ মাত্র নটা বাজে। ক্লাস তো এগারটায়।”
“ কিছু কি বলবে?”
অয়ন আশ্চর্য হলো। ইউশার জবাব রোবটের মতো। মেয়েটাতো এভাবে কথা বলে না। মোলায়েম কণ্ঠে শুধাল,
“ কী হয়েছে তোর?”
“ কিছু না। যাই।”
ইউশা এক পা বাড়াল,অমনি
হাতের কব্জি টেনে ধরল অয়ন। মেয়েটার বুক খণ্ড হলো। ভেঙে এলো শরীরটা। ক্লেশে চৌচির হয়ে ভাবল,
“ আমাকে ছুঁয়ো না অয়ন ভাই। যেটুকু বেঁচে আছি সেটুকুও মেরো না আমায়।”

“ ইউশা,তাকা এদিকে। কী হলো? তাকাতে বলছি তো।”
পুরু কণ্ঠে বাধ্য হয়ে পিছু ঘুরল মেয়েটা। চেহারার ঘোর আমাবস্যা দেখে অয়ন ভ্রু গোছাল। গুরুতর ভঙ্গিতে গাল ছুঁতে হাত বাড়ানো মাত্রই,চট করে সরে গেল ইউশা। একটু থমকাল অয়ন। পৃথিবীর সব নম্রতা কণ্ঠে ঢেলে বলল,
“ তোর কি মন খারাপ,ইউশা? কিছু হয়েছে? চোখমুখ এত ফোলা কেন,শরীর খারাপ?”
ইউশা অবিলম্বে বলল,
“ না। কদিন পরে পরীক্ষা,তাই একটু চিন্তা হচ্ছে।”
এই এক কথায় মেনে নিলো অয়ন। ধরে রাখা হাত ছাড়ল সহসা।
“ এতে চিন্তার কী আছে? পরীক্ষা আগে কখনো দিসনি? গাধা!”
ইউশার সুপ্ত বিষণ্ণতা মন ছাপিয়ে ভেসে উঠল মুখে। বিমর্ষের ন্যায় চেয়ে থেকে ভাবল,
“ অয়ন ভাই মন খারাপ বুঝল,কিন্তু ওকে বুঝল না? অবশ্য যার মনেই ও নেই,সে ওর মন বুঝবে কীভাবে!”
অয়ন চায়ে চুমুক দেয়। ইউশা চেয়ে রয় তখনো। বুকের ভেতরটাসহ তুফানে হুহু করে ওঠে। এই মানুষটা ওর নয়। “যে ছিল ওর বয়ঃসন্ধির গোপন কল্পনা, কিশোরীর আরাধনা, আর তরুণী বয়সের একমাত্র ভালোবাসা, সেই অয়ন ওকে নিয়ে এক দণ্ড, এক ফোঁটাও কখনো ভাবেনি। এই হাহাকার,এই ব্যর্থতা ইউশা কী দিয়ে মেটাবে? এত শোক,এত যন্ত্রণা লুকোনোর প্রয়াসে কে সান্ত্বনা দেবে ওকে? এমন গভীর ক্ষত ও যে কাউকে দেখাতেও পারবে না। সারাজীবন এই না পাওয়ার কষ্ট নিজের ভেতর দাফন করে ভালো থাকবে ইউশা? কী আশ্চর্য ভাবে স্বীয় বুকের ভেতর ইউশা আস্ত একটা কবর খুড়ে ফেলল। যে কবরের লাশটা স্বয়ং ও-ই। ও মরল,ওর ভালোবাসা মরল,মরল ওর সব অনুভূতি আর স্বপ্নরা। অথচ কেউ জানলো না,বুঝলো না,দেখল না। আচ্ছা, একা একা বুকের মাঝে কষ্ট চেপে রাখার মতো দূর্ভোগ কী আর অন্য কিছুতে হয়?
অয়ন তাকাল তখনই। ইউশা আকুল হয়ে চেয়ে। ও ভ্রু নাঁচায়,
“ কী দেখছিস?”
ইউশার চোখ সরল না। মুখের চামড়াও নড়ল না। মূর্তির মতো শুধাল,
“ একটা কথা বলব অয়ন ভাই?”
অয়নের কণ্ঠে কৌতুক,
“ না করলে বলবি না?”
ইউশা এই দুষ্টুমিতে সঙ্গ দিতে পারল না। বুকের টালমাটাল ঘূর্ণি ছাপিয়ে বেরিয়ে এলো,
“ কখনো যদি জানতে পারো,তুশি অন্য কাউকে ভালোবাসে কী করবে তুমি?”
বিস্ফোরিত চোখে চাইল অয়ন। মাথার ওপর মিসাইল পড়েছে যেন। ইউশা জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“ না আসলে, এমন হবে বলছি না। যদি এরকম কখনো হয় আরকি। মানে ধরো হলো,কী করবে তাহলে?”
“ জ্বালিয়ে দেবো।”
স্পষ্ট, শান্ত জবাবে আঁতকে উঠল মেয়েটা। ভড়কে বলল,
“ তুশিকে?”
হেসে ফেলল অয়ন,
“ তুশিকে কেন জ্বালাব? ও যাকে ভালোবাসবে তাকে।”
ইউশা হতবাক হয়ে বলল,
“ কী বলছো তুমি!”
অয়ন কাঁধ উঁচিয়ে বলল,
“ অফকোর্স আই’ল ডু ইট। ভালোবাসায় সব সময় ত্যাগ করতে নেই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছিনিয়ে নিতে জানতে হয়৷ ভালোবাসা একটা যুদ্ধ ইউশা। এই যুদ্ধে কোনো ভুল নেই,অন্যায় নেই। যে তোর মানসিক শান্তির কারণ,সেই শান্তি কেড়ে নিতে যত প্রতিপক্ষই আসুক না কেন লড়াই করতে হবে। ভালোবাসা মানে শক্তি,অধিকার, আত্মবিশ্বাস। তাই যাকে ভালোবাসব তাকে নিজের পাশে রাখার জন্যে পৃথিবীর সাথেও যুদ্ধ করতে হলে,করব না? ডোন্ট ইউ নো, এভ্রিথিং ইজ ফেয়্যার ইন লাভ?”
অয়নের কথা বলার ভঙ্গিমা সাবলীল। যেন এটাই ঠিক,এটাই উচিত। অথচ ইউশা স্তব্ধের মতো শুনে গেল। এ কোন অয়ন ভাই! পড়াকু,শান্ত,মেধাবী,হাসিখুশি অয়ন ভাইয়ের মুখে ছিনিয়ে নেয়ার কথা! ভালোবাসা নিয়ে যুদ্ধের কথা! অয়ন ওর হাঁ হওয়া দেখে হেসে উঠল জোরে। স্বশব্দ ওই হাসি হাওয়ায় ভেসে বেড়াল। দু আঙুল দিয়ে কপালে টোকা মেরে বলল,
“ বোকা,মজা করেছি।”
কিন্তু ইউশার এটা মজা মনে হলো না। তখনো ওই এক লাইনে পড়ে রইল সে। ভালোবাসা যুদ্ধের মতো? ভালোবাসলে পৃথিবীর সাথেও যুদ্ধ করতে হবে? মনে মনে বলল,
“ ভালোবাসা যুদ্ধ হলে আমি সেই সবার সাথে তোমার জন্য যুদ্ধ করতে পারব অয়ন ভাই,যারা তোমাকে চায়। কিন্তু যাকে তুমি চাইছো,তার সাথে যুদ্ধ করব? এতটা মনের জোর তো আমার নেই!”


দুহাতে ওড়নার দুই প্রান্ত উড়িয়ে উড়িয়ে চপল পায়ে ঘরে ঢুকল তুশি। ছুটতে থাকা সহস্র প্রজাপতি তার অন্তরে। বুকে উচ্ছ্বাস,মুখে হাসি। তবে স্ফূর্ত পা জোড়া থমকাল ভেতরে ইউশাকে দেখে। তুশি থামে,চোখ ঝাপটে বলে,
“ আরে,তুমি!”
ইউশা গলার খাঁজে চিবুক মিলিয়ে বিছানায় বসেছিল। উঠে এলো এবার। হাতের ফুলগুলো বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ নাও।”
ফুলের পানে এক পল চাইল তুশি। চোখে প্রশ্ন। ও বলল,
“ অয়ন ভাই কাল দিয়েছিলেন,তোমার জন্মদিনের উপহার। রাতে তো তুমি আর আমার ঘরে এলে না, তাই সকাল হতে হতে নেতিয়ে গেছে।”
বলতে বলতে ছোট্ট একটু ঢোক গিলল ইউশা। মলিন মুখখানা টেনেটুনে উজ্জ্বল রাখল খুব!
তুশি খুশি হয়ে বলল,
“ ও তাই! কিন্তু আমি এখন ফুল দিয়ে কী করব? এগুলো বরং তুমি রেখে দাও।”
“ আমি কেন রাখব?”
“ তবে? তুমিই তো রাখবে। অয়ন ভাইও তোমার,তার দেয়া ফুলও তোমার।”
ইউশা কাষ্ঠ হাসল। ছিড়েখুঁড়ে আসা বেদনার সাথে সুর মিলিয়ে ভাবল,
“ অয়ন ভাই আর আমার নেই তুশি। নিজের সাথে সাথে আমার এতদিনের জমানো ভালোবাসাও উনি কেড়ে নিয়ে গেলেন। আমার ভেঙেচুরে যাওয়া মনটাই কেবল আমার রইল আজ।”

তুশি হঠাৎ ভ্রু গোছাল। সতর্ক কণ্ঠে বলল,
“ এই, এই, তোমার চেহারা এমন লাগছে কেন? চোখমুখ এত ফুলল কী করে?”
ইউশা গালে,মুখে হাত দিলো।
“ কই?
আসলে রাতে ঘুম বেশি হয়েছে তাই বোধ হয়?”
তুশি তাও চেয়ে রইল। চোখ সরু করে,সন্দেহী নজরে। ইউশা প্রসঙ্গ কাটাতে বলল,
“ আচ্ছা ওসব ছাড়ো। তুমি এমন নেচে নেচে ঘরে এলে যে। এত খুশি কেন আজ? মুখটা তো কেমন গ্লো করছে? ব্যাপার কী হুঁ?”
ও ভ্রু নাঁচায়। স্বতঃস্ফূর্ত কণ্ঠ। তুশি এবার নিশ্চিন্ত হয়ে হাসল। পরপর দুহাত মেলে এক পাক চক্কর কেটে বলল ,
“ আজ আমি খুব খুশি,ইউশা। জীবনের সবচেয়ে বেশি খুশি! জানো, এই অবধি এটা আমার সবথেকে সুন্দর জন্মদিন।”
ইউশা বিড়বিড় করে বলল,
“ আর এটা আমার জীবনের সবথেকে অভিশপ্ত জন্মদিন!”
কিন্তু তুশির হাস্যোজ্জ্বল,প্রানবন্ত মুখখানা মেয়েটা মন দিয়ে দেখল। মুচকি হেসে ভাবল,
“ তাও ভালো,তুমি অন্তত আনন্দে আছো তুশি। এতদিন তো সবার ভালোবাসা, সবার আদর থেকে বঞ্চিত ছিলে। এবার সৃষ্টিকর্তা তোমাকে সব ঢেলে দিক। আমার ভাগের যত সুখ, যত প্রাপ্তি সেই সবটা তোমার হোক । তুমি খুব ভালো থাকো তুশি। খুব খুব ভালো থাকো তুমি!”
তুশি উড়ে উড়ে থামল। ফিসফিস করে বলল,
“ ইউশা জানো, কাল রাতে আমি ছাদে গিয়েছিলাম।”
“ সে কী, অত রাতে? একা?”
তুশি মিটিমিটি হাসল,
“ উহু।”
“ তবে?”
হাসিটা বাড়ল ওর৷ ইউশা সচেতন কণ্ঠে বলল,
“ প্লিজ, এখন বোলো না যে মেজো ভাইয়াও তোমার সাথে ছিল।”
তুশি ফিক করে হেসে ফেলতেই চোখ কপালে উঠল তার। আশ্চর্য হয়ে ভাবল,
“ সত্যিই ভাইয়া কাল তোমার সাথে ছাদে ছিল? মাই গুডনেস,এটা কী করে সম্ভব?”

তুশির ফরসা মুখ লাল হলো। মসৃণ গাল ফেঁপে উঠল লাজে। ওড়নার সুতো আঙুলে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বলল,
“ আমরা সারারাত ছাদে ছিলাম!”
ইউশা হাঁ করে বলল,
“ কীহ!”
তুশি মাথা নাড়ে অল্প করে। লাজুক চাউনি হাতের ওপর। পরপরই সাগ্রহে শুধায়,
“ আচ্ছা ইউশা,কেউ যদি এমন কিছু তোমাকে বলে যা সে কখনো কাউকে কোনোদিন বলতে পারেনি,তাহলে তার কাছে তুমি কী?”
“ কী আবার,হয়ত খুব ভরসার আর বিশ্বস্ত মানুষ।”
তুশির কণ্ঠে উদ্বেগ,
“ আর ভালোবাসা? ভালোবাসার না?”
ইউশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসল। কানে বাজল অয়নের কথাটা,
“ আমি তোকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করি,ভরসা করি ইউশা।”
অথচ ভালো? ভালো তো বাসি না।
মেয়েটা জবাব দিলো উদাস গলায়,
“ জীবন আসলে খুব বিচিত্র রূপকথার মতো তুশি। এখানে অনেকেই তোমাকে বিশ্বাস করবে ভরসা করবে,কিন্তু ভালোবাসবে না। আবার অনেকে কিছুই করবে না। না ভরসা,না বিশ্বাস,কিন্তু ভালোবাসবে। পাগলের মতো ডেস্পারেটলি ভালোবাসবে।”
তুশি ঠোঁট উলটে বলল,
“ অনেক কঠিন কথা! মাথার ওপর দিয়ে গেল।”
মৃদূ হাসল ইউশা।
“ ছাড়ো। কিন্তু তুমি এসব কেন জিজ্ঞেস করছো? ভাইয়া কি তোমায় এমন কিছু বলেছে?”
“ হুউ। জানো, কাল উনি একদম অন্যরকম ছিলেন। পুরোপুরি আলাদা একটা মানুষ। গলার স্বর একেবারে জনসন ক্রিমের মতো নরম!
কত কথা বললেন আমার সাথে। আমার নাম ধরে ধরে ডাকলেন। আর তার… “
“ তারপর?”
লজ্জায় ওটুকু তুশি মুখে আনতে পারল না। ইউশা বুঝল কী না কে জানে। তবে
উচ্ছ্বল কণ্ঠে বলল,
“ মনে হচ্ছে ভাইয়া তোমার ওপর ফল করছে তুশি”
“ কিন্তু ফল তো খেয়ে ফেলতে হয়।”
ইউশা কপাল চাপড়ে বলল,
“ উফ রে, আমি বোঝাতে চেয়েছি ভাইয়া মনে হয় তোমার ওপর দূর্বল হচ্ছে। তুমি কি তোমার মনের কথা বলেছ?”
তুশি মাথা নেড়ে বলল,
“ উহু। বলে দেব?”
“ হ্যাঁ, বলে দিও।”
“ এক্ষুনি যাচ্ছি।”
কিছু না শুনেই ছুটে বেরিয়ে গেল তুশি। ঐ গতিবেগে রাশ টানার উপায় নেই। ব্যাপারটায় ইউশা বোকা বনে যায়। মাথায় হাত দিয়ে বলে,
“ এমা, এ মেয়ে তো চলে গেল। কিন্তু আমি তো এক্ষুনি বলতে বলিনি। হায় আল্লাহ, এবার কী হবে?”

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply