কাছেআসারমৌসুম!
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
(২৯-ক)
সূর্য তখন আকাশের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। হালকা কমলা আলোয় পরিষ্কার চারিপাশ । নরম রোদের তাপ গিয়ে ঠিকড়েছে বস্তির টিনের চালে। সাতটা বাজতে না বাজতেই নিত্যদিনের মতো কলপাড়ে একটা লম্বা লাইন আজও লেগে গেল। একটু পর বড়ো কলসীটা কোমরে নিয়ে আস্তেধীরে এসে দাঁড়ালেন হাসনা। গত দু-তিন মাসে বেশ শুকিয়েছেন প্রৌঢ়া। চেহারার অবস্থা করুণ। আগের চেয়েও শীর্ণ হয়েছে শরীর। অবসন্ন চোখমুখ দেখে বোঝা যায়, কত রাত যেন ঘুমোননি তিনি। হাসনাকে দেখেই সবাই এক যোগে তাকাল। সিরিয়াল দিতে দিতে বিরক্ত হওয়া মুখগুলোয় বদল এলো অমনি। মাহফুজা বেগম সবার সামনে ছিলেন লাইনের। বালতিটা প্রায় অর্ধেক ভরেছে। অথচ সেটাকে টেনে সরিয়ে দিয়ে বললেন,
“ লন খালা,আপনে আগে পানি লন।”
হাসনা কিছু বলতে গিয়েও পারলেন না। কেশে উঠলেন খুকখুক করে। রীতিমতো মাথা-বুক ধরিয়ে দেয়া কাশি। তিন্নির মা বলল,
“ আপনের জ্বর অহনো কমেনাই চাচি?”
আঁচলে মুখ চেপেই দুপাশে মাথা নাড়লেন হাসনা। উত্তর না!
রহিমা বেগম এগিয়ে এলেন সহসা। হাসনার কপালে হাত পড়তেই আঁতকে উঠলেন। আর্তনাদ করে বললেন,
“ ও আল্লাহ! কী জ্বর। এই শইলে পানি নিতে আইছেন ক্যান?”
হাসনা রুগ্ন, ভাঙা গলায় বললেন,
“ তয় কেডা নিবো? আমার তুশিতো আর নাই এইহানে।”
বাকিদের চোখমুখে পরিবর্তন এলো। থমথমে জায়গা ভরল গম্ভীরতায়। তুশি যাওয়ার পর হাসনার আহাজারি,একাকীত্ব, আর প্রতিটা দিন ওকে হন্য হয়ে খোঁজার চাক্ষুষ প্রমাণ তারা। মেয়েটা ওদের অপছন্দের হলেও,হারিয়ে যাক চায়নি। তারওপর হাসনা ভালো মানুষ। বস্তির কেউ বিপদে পড়েছে,অসুস্থ হয়েছে আর হাসনা পাশে থাকেননি এমন ঘটনা বিরল। বৃদ্ধার এই দুঃখে তাই ওরাও পাশে থাকছে। যে যেভাবে পারছে সাহায্য করছে টুকটাক। কিন্তু নাতনি অন্তঃপ্রাণ মানুষটার শোক একটুও তাতে লাঘব হচ্ছে কী?
প্রত্যেকে চুপ রইলেও তিন্নির মায়ের জিভ তেতে উঠল। খুব রুক্ষ ভাষায় বললেন,
“ নাই, আর আইবোও না। আপনে বেহুদা ওরে খুঁইজ্জা মরতাছেন,আর নিজের শইলডাও খারাপ বানাইতাছেন। আরে বাপ,গেলেন তো টিনটিন গো কতা হুইনা থানায়,লাভ কিছু হইল? তুশির মতো মাইয়ারে কি কোনোদিন থানার বড় বাবু বিয়ে করতে পারে? এইডা কি কোনোদিন সম্ভব?”
হাসনার চোখ ভিজে যায়। অসহায় কণ্ঠে বলেন,
“ তাইলে আমার নাতিন ডায় কই গেল কও! ও তো আমারে ছাইড়া কোতাও কুনোদিন থাহে না।”
“ ওই দিন কি আর আছে, চাচি? মাইয়া মানুষ বড়ো হইলে পাকনা গজায়৷ তুশিরও গজাইছে। শোনেন, হয় ওই মাইয়া কারোর লগে ভাগছে,আর নাইলে কোনো মাইনষের পকেট কাটতে গিয়া ধরা খাইয়া হাজত খাটতাছে। আপনে ওর আশা ছাইরা দেন তো।”
হাসনার বুক কেঁপে উঠল জেলের কথা শুনে। একবার তো থানায় দিন পার করে এসেছিল মেয়েটা। আবার কী? কিন্তু কোন থানায়! আর কতদিন কোথায় কোথায় খুঁজবেন ওকে! দূর্বলতা আর চিন্তায় বৃদ্ধার মাথা চক্কর কাটে। ঢলে পড়তে গেলেই ধড়ফর ধরে ফেললেন রহিমা।
“ কী হইল খালা,শইল খারাপ লাগে?”
তিন্নির মা দুপাশে মাথা নাড়লেন। হতাশ কণ্ঠে বললেন,
“ আপনেরে দেখলে আমার খারাপ লাগে চাচি। নাতনির লইগা দিন-দুনিয়া চুলায় উঠাইয়া কই কই ঘোরেন! সারাদিন কাম কাইজ ফালাইয়া রাস্তাগাট খোঁজেন। আরে বাপ, ও আইলে এই দুই মাসেই আইতো। আর কিছু না হইলেও মোবাইল করতো। ওর কাছে তো মোবাইল আছে। কিন্তু করে তো নাই। অহন ওর চিন্তা থুইয়া নিজের এট্টু যত্ন লন।”
রহিমা ধমকালেন,
“ আহা,তুমি থামবা? দেখতাছো অসুস্থ মানুষ, তার মইধ্যে এইসব বাইক্কা প্যাচাল। তুমি তোমার বালতি ভইরা যাও এন্তে।”
তিন্নির মা মুক বাঁকালেন।
“ হ যাইতাছি। তোমার আলগা দরদ এট্টু বেশিই। আমার বাপ অত পিরিত নাই!”
কল পাড়ের এক পাশে কেটেকুটে, ছেচে রাখা গাছ ছিল। রহিমা, আছিয়া আরো একজন মিলে হাসনাকে ধরে ধরে বসালেন সেখানে। আছিয়া মাথার তালুতে পানি দিলেন। কাপড় দিয়ে বাতাস করতে করতে বললেন,
“ খালা,হুনতে খারাপ লাগকেও তিন্নির মার কতায় কিন্তু ভুল নাই। একবার ভাইবা দেখেন,তুশিতো হারাই যাওয়ার মাইয়া না। রাস্তাঘাটে ও যেমনে চলে,যেই ব্যাডা মাইনষের মতো চাইল চলন ওর, ওরে কাবু করা সহজ কাম না। আমার মনে হয় ও নিজ থেইকাই পলাইছে।”
রহিমা বললেন,
“ কী যে কও তুমি! ও কার লগে পলাইব? পোলাগো লগে প্রেম কইরা ভাগার মাইয়া কি ওয়? ওয় এসবের আশপাশ দিয়াও যায়? ওরে কিছু কইলে ও উলটা দশটা গালি দিতো। আমার মনে হয় ওর কোনো বিপদ হইছে। নাইলে হইতে পারে তিন্নির মার পরের কতা ঠিক। ও কোনো হাজতে আছে।”
তৃতীয় জন বললেন,
“ তাইলে কি তুশি আর কুনোদিন আইব না?”
হাসনার নিঃশ্বাস থেমে আসে এ কথায়। সবেগে হাতটা চেপে ধরে বললেন,
“ ও কতা কইও না। আমার বুরে আমি চিনি। ও আমারে থুইয়া যাইবে না। আমার মন বলতাছে ও আইব। আবার আইব আমার কাছে।”
বলতে বলতে চোখের জল ছেড়ে দিলেন বৃদ্ধা। ভেতরটা ব্যথায় মুচড়াচ্ছে। আজ তুশির জন্মদিন। পুরোপুরি বিশের কোঠায় পা রাখতো মেয়েটা। ইস,কোথায় গেল ও? বাপ মা ছাড়া বড়ো হওয়া মেয়েটা,যার পাতে কোনোদিন হাসনা নিজের যোগ্যতায় একটু মাংসও দিতে পারেননি! না কখনো ওকে একটা ভালো জামা পরাতে পেরেছেন। যখন যা দিয়েছেন,মেয়েটা সোনামুখ করে নিয়েছে। কখনো বলেনি,দাদি আমার এটা চাই, ওটা চাই। হায় রে,
আজকের এই দিনে মেয়েটা ভালো কিছু কি পাচ্ছে? ওর মুখে একটু পায়েস দেয়ার মতো কেউ আছে তো?
সকালে তুশির যখন ঘুম ভাঙল বাড়িময় তখন বিরিয়ানির কড়া ঘ্রাণ ম ম করে ঘুরছে। ও তড়াক করে উঠে বসল। নাক টেনে বড়ো শ্বাস নিয়ে ভাবল,
“ বিরিয়ানি! হু কুক? কী গন্ধ মাইরি! খিদে একেবারে হেড অবধি কাম করে যাচ্ছে।”
“ আবার উল্টোপাল্টা ইংরেজি শুরু করলে তুশি!”
তুশি চট করে পাশ ফিরল। ইউশা এ কাত থেকে ও কাত ফিরে শুয়েছে। অমনি সতর্ক চোখে গোটা ঘর দেখল সে। এ বাবা,ও কি রাতে ইউশার ঘরেই ঘুমিয়ে পড়েছিল? হায় রে সর্বনাশ! ওই খচ্চুরে মহিলা দেখলে তো বাড়ি মাথায় তুলবে। শুধু শুধু বকা খাবে ইউশা। তুশি তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে নামল। এক পা বাড়ানোর আগেই ঘরে ঢুকলেন রেহনূমা,
“ ইউশা উঠে…”
তুশি সামনে পড়তেই থমকালেন তিনি। কথাটুকু অসম্পূর্ণ রইল। মসৃণ কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন,
“ এ কী, তুমি এ ঘরে কী কোরছো?”
ইউশার ঘুম শেষ। মায়ের কণ্ঠ শুনে ধড়ফড় করে উঠে বসল অমনি।
রেহনূমা ওকেই শুধালেন,
“ ও কি কাল এখানে ঘুমিয়েছিল?”
ইউশা মাথা নাড়ল। রেহনূমা কিছু বলবেন, পূর্বেই দাপুটে গলায় জবাব দিলো তুশি,
“ হ্যাঁ, ঘুমিয়েছি। কেন, কী হয়েছে তাতে?”
বিস্ফোরিত চোখে তাকালেন তিনি।
“ তোমাকে আমি জিজ্ঞেস করিনি। বেয়াদব মেয়ে! এক ফোঁটা আদব কায়দা নেই।”
“ ওসব আদব কায়দা বড়োলোকদের জিনিস। আমি দিয়ে কী করব?”
ইউশা মিনমিন করে বলল,
“ মা,ওকে কাল আমিই বলেছিলাম এখানে থেকে যেতে। অনেক রা…”
মাঝপথেই ধমকালেন রেহনূমা,
“ তুই চুপ কর। তোকে আমি বারণ করেছিলাম না ওর সাথে এত না মিশতে? পড়াচ্ছিস, পড়াবি ব্যস ওইটুকু। বিছানায় তুলবি কেন? এই মেয়ে বিছানায় ওঠার যোগ্য নাকি!”
“ মা!”
ইউশার চ্যাঁচানোটা রেহণুমা গায়ে নিলেন না। সামান্যতম বদলাল না মুখচোখ। কিন্তু আজকে হয়ত তুশির ভ্রুক্ষেপ এলো না এসবে। ঠোঁটটা একদিকে নিয়ে কেমন বিদ্রুপ করে হাসল একটু। তেজি পায়ে বেরিয়ে গেল তারপর। রেহনূমার মাথা জ্বলে উঠল রাগে। খেকিয়ে বললেন,
“ দেখলি, ওর হাঁটার অবস্থা দেখলি! যেন আমার রাগ ওর পায়ের ওপর ঝাড়ল। অসভ্য!”
“ তোমারই বা কী দরকার ছিল ওকে এসব বলার? সব সময় ওর সাথে এমন করো কেন তুমি?”
“ তোকে এত কথা বলতে হবে না। চুপচাপ তৈরি হয়ে নিচে আয়। সবাই অপেক্ষা করছে।”
ইউশা ঠোঁট টিপে বসে রইল। মেয়ের ফোলাফোলা মুখটা দেখে এতক্ষণে হাসলেন রেহণুমা। কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“ আজ আমার মেয়ের জন্মদিন। দেখতে দেখতে কত বড়ো হয়ে গেলি রে, মা। এইত সেদিন ওটি রুমে একটা তোয়ালে মোড়ানো বাবু নার্স আমার চোখের সামনে ধরে বললেন,
‘ আপনার মেয়ে।’
দিন কত তাড়াতাড়ি যায়।”
পরপরই মেয়ের মাথায় চুমু খেয়ে বুকে টেনে নিলেন রেহনূমা। ইউশা চুপটি করে মিশে রইল সেখানে। ও জানে, মা এখন কাঁদবে। এই যে শেষ দিকে মায়ের গলা ধরে এসেছে,ওইটুকু লুকোতেই মা ওকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। ইউশার ভেতরটা ককিয়ে উঠল নীরব এক বেদনায়। দুহাত দিয়ে মায়ের কোমর জড়িয়ে রাখল। কারো মুখে কথা নেই,শুধু চোখের কোণে নিস্তব্ধ এক ব্যথা। যা চাইলেও কাউকে দেখানো যায় না।
ঘরের ভেতরে মা-মেয়ের মমতাভরা ওই দৃশ্যটা, পর্দার ফাঁক গলে চেয়ে চেয়ে দেখল তুশি। ইউশা কী সুন্দর মায়ের আদর খাচ্ছে। ওকে বুকে নিয়ে নিরন্তর মাথায়, পিঠে হাত বোলাচ্ছেন রেহনূমা। বিমর্ষ চিত্তে ঢোক গিলল তুশি। নিজের হাতটা তুলে মাথায় রাখল। নিজেই চুলে বোলাল দুবার। বিড়বিড় করে বলল,
“ শুভ জন্মদিন, তুশি। দেখতে দেখতে কত বড়ো হয়ে গেলি তুই। এই তো সেদিন জন্মালি, দুনিয়ায় এলি। কিন্তু আমাকে পেলি না। আজ আমি থাকলে তোর জীবনটা তো অন্যরকম হতো বল! কপালটা এত পোড়া কেন তোর?”
তুশির নীরস মন নিচে এসে ভালো হয়ে গেল। গোটা বাড়ি ফুল দিয়ে সাজানো হচ্ছে দেখে। বসার ঘরে একটাও ফার্নিচার নেই। সব সরিয়ে বিশাল এক জায়গা বের করা হয়েছে। সদর গেটটাও ইউ শেইপ করে ফুল দিয়ে সাজাচ্ছে কয়েকজন। সাইফুল আজ অফিসে যাননি। শওকতও বসে থাকলেন না ঘরে। দু ভাই মিলে এটা-ওটা নিয়ে ছোটাছুটি করছেন। রান্নাঘর থেকে শব্দ আসছে অনেক! ওখানেও নিশ্চয়ই আয়োজনের কমতি নেই। তুশি নিজে থেকেই এসবের কারণ বুঝে নিলো। আজ ইউশার জন্মদিন তো,তাই। কিন্তু বেহায়া চোখজোড়া ঘুরিয়ে ভিন্ন কাউকে খুঁজল সে। খুব ফরসা,শক্ত একটা মুখ। যেখানে মিষ্টি কথা নেই। এক ফোঁটা নম্রতা নেই। তাও তুশি খুঁজল। বুকের কোষগুলোও ছটফট করে উঠল তাকে দেখার আশায়। অথচ ওর তো একটু হলেও রাগ করার কথা। কাল যেভাবে নিষ্ঠুরের মতো বিটকেলটা ওকে ঘর থেকে বার করে দিলো, তুশির তো এসবই করা উচিত! কিন্তু পারছে না কেন? প্রেমে পড়লে বুঝি মানুষ নির্লজ্জও হয়? তার ভাবনার মাঝেই কোত্থেকে ছুটে এলো মিন্তু। একটা শক্ত কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ ভা.. সরি সরি!”
তারপর সতর্ক চোখে আশপাশটা দেখল মিন্তু। ভুল করে মুখ থেকে ভাবি বেরিয়ে যাচ্ছিল। না, মেজো ভাইয়া নেই৷ হাঁপ ছাড়ল সে। বলল,
“ বাঁচলাম। এই তুশিপু, দেখো তো কার্ডটা কেমন হয়েছে! ইউশার জন্যে বানিয়েছি।”
তুশি সাগ্রহে হাতে নেয়। কার্ডের ভেতরে একটা কার্টুন আঁকা। মেয়েটার মাথায় ছ-সাতটা চুল। কুড়ালের মতো দাঁতকপাটি ঠোঁট থেকে বেরিয়ে এসেছে। নিচে লেখা – হ্যাপি বার্থডে রাক্ষসী!
তুশি হেসে ফেলল। জিজ্ঞেস করল,
“ এটা কি ইউশা?”
উচ্ছ্বসিত চোখে মাথা নাড়ল মিন্তু। বলল,
“ ওকে আমার চোখে এমনই দেখতে। কেমন হয়েছে বলো!”
তুশি ঠোঁট চেপে হাসছে। বলল তাও,
“ সুন্দর। ইউ আর টোলেন বয়!”
“ আরে ওটা ট্যালেন্ট। আর কথাটা ট্যালেন্টেড।”
“ এত শক্ত কথা আমার মুখে আসে না।”
“ আচ্ছা যাক গে। আমি এখন যাই। লুকিয়ে রাখি। ও যখন গিফট চেয়ে চেয়ে পাগল হয়ে যাবে তখন দেবো। তারপর যা একটা লুক দেবে না আমাকে। তাড়াও করতে পারে। মজা হবে না?”
উত্তরের অপেক্ষাও ছেলেটা করল না। দুরন্ত পায়ে চলে গেল দৌড়ে। ছোটোখাটো ছেলেটার দিকে চেয়ে চেয়ে তুশির হাসিটা মুছে গেল হঠাৎ। বিদীর্ণ দীর্ঘশ্বাসের ঝুলি ঠিকড়ে এলো বুক হতে। ইস,আজ যদি ওরও একটা ভাই থাকতো! ভাই তো দূর,ওর জন্যে সৃষ্টিকর্তা কাউকেই রাখলেন না। কিন্তু আজকাল তুশির মন একদিকে খেই হারিয়ে ফেলছে। ভুল করে স্বপ্নের রাজ্যে এনে বসিয়েছে একজনকে। ইয়াসির! কিন্তু মেয়েটা জানে ইয়াসিরের মনের কোথাও ও নেই। ইয়াসির ভাবেও না ওকে নিয়ে। ভাববেই বা কেন? কোথায় সে আকাশের চাঁদ,আর তুশি মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা সামান্য বামুন। ওদিকে হাত বাড়ানোর সাধ্য ওর আছে? মন কীভাবে চলে গেল ও জানে না। তুশি চেয়েও মনের রাশ টানতে পারেনি। কিন্তু সে বোঝে,একটা বস্তির মেয়ে যে কিনা এর-ওর পকেট থেকে টাকা চুরি করতো তার ইয়াসিরকে চাওয়ার যোগ্যতা নেই। তুশি তো পেতেও চাইছে না। ইয়াসির ভালোবাসুক, না বাসুক ও বাসবে। এইভাবে নীরবে,চুপিচুপি সারাজীবন ভালোবাসবে। মেয়েটার ধ্যানের সুতো ছিঁড়ল অয়নের ডাকে।
“ এই তুশি,এদিকে এসো।”
নড়েচড়ে, চপল পায়ে এগোলো সে। অয়ন একটা টুলের ওপর দাঁড়িয়ে। পায়ের কাছে কতগুলো ফুল। সেসব দেখিয়ে বলল,
“ এখন থেকে একটা একটা করে ফুল দাও আমাকে। মিন্তুটা এত ফাঁকিবাজ না! কাজের কথা বলতেই পালিয়েছে।”
“ আচ্ছা, আমি দিচ্ছি।”
ফুলগুলো ভীষণ সতেজ। টসটসে লাল গোলাপগুলো দেখেই তুশির মন ভালো হয়ে গেল। এক থোকা হাতে নিয়ে বলল,
“ এগুলো কি আপনাদের বাগান থেকে আনা?”
“ না তো, কেনা। কেন?”
“ খুব সুন্দর! এখনো গায়ে শিশির লেগে আছে। আমার গোলাপ যে কী ভালো লাগে!
ফুলের ওই স্নিগ্ধ পাপড়িতে তুশির মুগ্ধ নজরজোড়া অয়ন মন দিয়ে দেখল৷ পরপরই তাড়া দিয়ে বলল,
“ আচ্ছা, এখন তাড়াতাড়ি দাও। আ’ম অলরেডি গেটিং লেইট।”
তুশি তৎপর থোকা ভরতি গোলাপ বাড়িয়ে দেয়। ঠিক তক্ষুনি চৌকাঠ মাড়িয়ে বাড়ি ঢুকল ইয়াসির। একদম নাক বরাবরের ওই চিত্রটায় চোখ যেতেই পা জোড়া আপনা আপনি থামল তার। স্বভাবসুলভ ভাঁজ বসল ভ্রুতে। মাথায় এলো গতকাল সকালের কথা। বাগানে অয়ন তুশিকে ফুল দিচ্ছিল,আর আজ তুশি। ইয়াসির নিচের ঠোঁট দাঁতে পিষে চেয়ে রইল কিছু পল। পরপরই মাথা নাড়ল দুপাশে। যেন উড়িয়ে দিলো এসব। বরাবরের মতো ভারি স্বরে ডাকল,
“ অয়ন!”
ঘাড় ঘুরিয়ে চাইল সে। ফিরল তুশিও। সাথে সাথে শিরদাঁড়া সোজা করে ফেলল। ইয়াসির এগিয়ে এলো। অয়ন বলল,
“ এনেছো? চাচ্চু কতবার যে তোমার কথা জিজ্ঞেস করলেন!”
“ হ্যাঁ৷ লিস্ট মিলিয়ে দ্যাখ।”
অর্কিড সহ সাজগোজের কিছু জিনিসপত্র কম পড়েছিল। সেসবই আনতে গেছিল ইয়াসির। সব কিছু টেবিলে নামিয়ে রাখার পরেও,আরও একটা প্যাকেট দেখা গেল হাতে। অয়ন কৌতূহলে শুধাল,
“ ওটাতে কী?”
ইয়াসির হাতের দিকে দেখল৷ তারপর ঠান্ডা, আড়চোখে একপল তুশির পানে চাইল। মেয়েটার বিমোহিত চাউনী তটস্থ হলো সহসা। থতমত খেয়ে সরে গেল আরেকদিক।
দু শব্দে জবাব দিল ইয়াসির,
“ কেক।”
“ কেক? বাইরে থেকে আনা কেক? ছোটো মা তো ইউশার জন্যে নিজের হাতে কেক বানায়, ভাইয়া। তুমি আবার আনলে যে!”
“ এমনি। তুই তোর কাজ কর।”
ইয়াসির চলে গেল। একদম সোজা গিয়ে ঢুকল রান্নাঘরে। পুরোটা পথ চেয়ে রইল তুশি। অয়ন ফের ডাকল,
“ তুশি?”
নড়ে উঠল ও,
“ হু?”
“ দাও। থোকা না, একটা একটা করে দাও। লাগাতে সুবিধে হবে।”
ইউশা হাজির হলো কিছু সময় পর। গায়ে টুকটুকে লাল জামা। সাজগোজ শূন্য। তুশি-অয়নকে দেখে সোজা এখানে এসে দাঁড়াল ও। অয়ন ওকে দেখেনি। ইউশা ফিসফিস করে বলল,
“ আমি দিই?”
তুশি মুচকি হেসে মাথা নাড়ল। ফুলগুলো ওর হাতে দিয়ে বিদেয় নিল আস্তে করে।
অয়ন কাজে ব্যস্ত। ওভাবেই বলল,
“ বাড়িতে তো আজ অনুষ্ঠান। তুমি এখনো তৈরি হওনি যে!”
ইউশার নিভু স্বর,
“ কী পরব?”
অয়ন বলল,
“ শাড়ি পরবে। শাড়ির মতো সুন্দর পোশাক আর আছে?”
তারপর ওপাশ ফিরেই মাথা নুইয়ে হাসল অয়ন। চোখের পর্দায় ভেসে উঠল সেদিনের সেই মূহুর্ত। প্রথম বার তুশির শাড়ি পরে ওর সামনে এসে থামা।
কিন্তু অধৈর্য চিত্তে প্রশ্ন করল ইউশা,
“ তোমার শাড়ি অনেক পছন্দ অয়ন ভাই?”
চমকে পিছু ফিরল ছেলেটা। হোচট খেল ইউশাকে দেখে। তাড়াহুড়ো করে তাকাল চারিদিক। ইউশা বলল,
“ কাকে খুঁজছো?”
অয়ন নিজেকে সামলায়। হেসে মাথা নাড়ে দুপাশে। ইউশার অত-শত ভাবার ইচ্ছে নেই। অয়ন কাছে থাকলে বিশ্ব ভুলে যায় সে। হেসে ফুল বাড়িয়ে দিলো মেয়েটা। অয়ন নিষ্প্রভ চিত্তে নিলো, টানেলে লাগাতে লাগাতে আরেকবার দেখল আশপাশ। দু মিনিটেই কোথায় গেল তুশি?
তুশি রান্নাঘরের দরজার এক কোণে এসে দাঁড়িয়েছে। মাথাটা নুইয়ে উঁকি দিয়ে দেখছে ভেতরে। এ বাসায় নতুন বুয়া রাখা হয়েছে একজন। রেশমীর মতোই কম বয়সি মেয়ে,নাম আসমা। রেশমীর মা অসুস্থ! মাস কয়েকেও তার ফেরার সম্ভাবনা নেই। আসমার সাথেই কথা বলছিল ইয়াসির। ভীষণ গুরুতর ভঙ্গিতে বোঝাচ্ছে কিছু। তুশি শুনতে না পেলেও,ওর মনোযোগ তাতে নেই। উঁকিঝুঁকি দিয়ে মেয়েটা কেবল ইয়াসির কেই দেখছে। পরনে সাদা শার্ট! খোচা খোচা দাঁড়িগুলো নতুন করে ট্রিম করিয়েছে বোধ হয়। উফ! তারওপর জিম করা শরীর। একেবারে তুশির স্বপ্নের সালমান খান। মেয়েটা দুহাত বাড়িয়ে বিড়বিড় করল,
“ সারকি যো সারসে বো ধীরে-ধীরে,
পাগাল হুয়া রে ম্যায় ধীরেধীরে…
আচমকা দেখল ইয়াসির আসছে। সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে রোবটের মতো দাঁড়াল মেয়েটা। যেন ও কিছু জানেই না। পৃথিবীতে ওর মতো ভদ্র দুটো নেই। ইয়াসিরের মুখভঙ্গি একই। তুশিকে দেখেছে,কিন্তু চেহারায় প্রভাব পড়েনি। পাশ কাটাতে গিয়েও, থামল হঠাৎ। ফিরে চেয়ে বলল,
“ শোনো?”
তুশির কাছে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ডাক। তড়িৎ চোখ তুলল মেয়েটা। ইয়াসির পকেটে দু হাত গুঁযে দাঁড়াল। একটু হলেও মুগ্ধতার তোড়ে অন্তঃপটে ধাক্কা লাগল তুশির। অথচ ইয়াসির বলল,
“ তোমার মুক্তির দিন আসছে। লেট স্টার্ট দ্য কাউন্টডাউন।”
তারপর চলে গেল সে। তুশি আগামাথা কিছুই বোঝেনি। হতবুদ্ধি বনে চেয়ে চেয়ে ভাবল, কীসের মুক্তি? কোনোভাবে কি ইয়াসির ওকে তালাক দেয়ার কথা বোঝাল?
চলবে..
লেখা শেষ করতে পারিনি। বেশি বড়ো হয়ে যাচ্ছিল। পর্ব খ শীঘ্রই পাবেন❤️
কাছেআসারমৌসুম!
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি!
(২৯-খ)
ইউশার আজকের জন্মদিন বিগত বছরগুলোর সীমায় আটকে থাকতে পারল না। আর না হলো, ওর সাদামাটা সেজে কেক কাটাকাটি। মায়ের আলমারি থেকে বেছে বেছে সবচেয়ে সুন্দর শাড়িটা পরল সে। রেশমের মতো নরম চুলগুলো খুলে রাখল পেছনে। দুহাত ভরতি চুড়ি জানান দিলো,এসব কারো নিবেশন পাওয়ার চেষ্টা। যেখানে অয়ন ভাই নিজে মুখ ফুটে বলেছেন,শাড়ি ওনার পছন্দ! সেখানে ইউশা না পরে থাকবে কী করে? ফোলা গালদুটোয় এক প্রস্থ লজ্জা,আর চোখজোড়ায় দূর্দান্ত আশা নিয়ে মন ভরে সাজল সে। কপালে টিপ পরে ভালো করে দেখল আয়নায়। সুন্দর লাগছে? অয়ন ভাই পছন্দ করবেন তো! ওনার ওই আশ্চর্য সুতনু মুখটা আদৌ হাঁ হবে একটুও? ইউশা মাথা নামিয়ে হাসল। কুণ্ঠায় নুইয়ে পড়া কলমী লতার মতো হাসি। আচমকা, ঘাড়ের ওপর তপ্ত কিছু শ্বাস ঠিকড়ে পড়ল তক্ষুনি। দেহ শিরশির করা অনুভূতি নিয়ে চমকে চোখ তুলল মেয়েটা। অয়ন দাঁড়িয়ে আছে। আয়নায় ঠিক ওর পেছনে,শরীরের খুব কাছে এই থাকা। বিস্ময়ে আকাশ থেকে মাটিতে থুবড়ে পড়ল ইউশা। ঠোঁট চিড়ে বেরিয়ে এলো অস্ফূটে,
“ অয়ন ভাই!”
মানুষটা হাসল একটু। প্রেমিকার মনে কাঁপন ধরানোর মতো আলোড়ন তোলা হাসি। তরুণীর বিস্মিত দৃষ্টির পানে চেয়ে গান ধরল হঠাৎ,
“ আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন,
কপালের কালো তিল পড়বে চোখে,
ফুটবে যখন ফুল বকুল শাখে,
ভ্রমর যে এসেছিল জানবে লোকে।”
বলতে বলতে তার বলিষ্ঠ দুই হাত শীর্ণ শরীরটা পেছন থেকে জড়িয়ে নিলো বুকে। সেই ছোঁয়ায় পৃথিবীটাও এক চোট কেঁপে উঠল ইউশার। হতবাক, নিস্তব্ধ হয় মেয়েটা! এসব সত্যি? এই স্পর্শ, এই ঘনিষ্ঠতা এমনট সত্যিই ঘটছে? এসব যে ভীষণ কাঙ্ক্ষিত হলেও এক্ষুনি অপ্রত্যাশিত ওর কাছে। অয়ন ভাই কবে থেকে ওকে….”
বিভ্রান্ত চোখদুটো ফের আয়নায় ফেলল ইউশা। অয়নের ওই মুগ্ধ চাউনি যেন লজ্জার বান। তারওপর ঠোঁট ফুড়ে বেরিয়ে আসা গানে প্রখর লজ্জায় বুঁদ হলো সে। বুকের ধুকপুক গতির সাথে চিবুক নামিয়ে নিলো গলায়। অয়নের হাতের বাঁধন আরো শক্ত হলো। যেন কবুতরের মতো ক্ষুদ্র মেয়েটাকে গায়ের সাথে ঢুকিয়ে ফেলতে চাইছে। পুরুষালি লম্বা দেহ নামিয়ে এনে ইউশার কাঁধে থুতনি রাখল অয়ন। মেয়েটার শ্বাসরুদ্ধকর দশা হলো এবার। রক্তস্পন্দন অবধি থেমে এলো বোধ হয়! শিউরে উঠল অনুভূতির সবটুকুনি। অয়ন তখনও গাইছে,
“ জানি না এখন তুমি কার কথা ভাবছো!
আনমনে কার ছবি চুপিচুপি আঁকছো!
তুমি কি তারে ভালোবাসবে?
ধরা যদি দেয় সে একপলকে?
দেখবে যখন তারে অবাক চোখে,দু’হাতে নয়ন কি গো রাখবে ঢেকে!
আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন!”
তারপর নিশ্চুপ সব কিছু। ইউশার ঘন নিঃশ্বাস ছাড়া কোথাও আর কিচ্ছুটি নেই। মেয়েটা ঐ মাদক চোখে-চোখ রাখতে পারল না। একবার নামাল, ফের তুলল। মিনিট কয়েকের এই সুখের সাথে হিমশিম খেতে এমনই করল শুধু। ফের নিচু মুখটা তুলল ইউশা। দর্পণে ফেলে দেখতে চাইল,ওর সেই প্রিয় সুতনু আদলের মালিককে। নিভু দৃষ্টি চমকে উঠল অমনি। চট করে পিছু ফিরল ইউশা। গোটা ঘর ফাঁকা পড়ে আছে। কোথায় অয়ন,কীসের অয়ন! এসব তাহলে কল্পনা? ইউশা চোখ খিচে জিভ কাটল সবেগে। মাথায় চাটি মেরে হাসল নিজেই। লজ্জায় হাঁসফাঁস করে বলল,
“ ছি রে ইউশা ছিহ! অয়ন ভাই এখনো ঠিকঠাক করে সিগন্যালই দিলেন না,আর তুই কোথায় চলে গেলি!”
ইউশার এখন কুণ্ঠায় মরমর দশা। সেই তোড়ে আয়নায় তাকাতেও কষ্ট। ওটাও নিশ্চয়ই ওকে নিয়ে মজা নেবে এখন! ইস,কী বাজে একটা ব্যাপার হয়ে গেল৷ বিকেল বেলা জ্বলজ্যান্ত মানুষ নিয়ে এমন উদ্ভট স্বপ্ন দেখে ফেলল সে? ইউশার বুকের দুরুদুরু ভাবটা ফিরে এলো ফের। ওর এই শাড়ি আর সাজগোজ অয়ন ভাইয়ের হৃদয় ছোঁবে তো? দেখবেন তো ওকে মুগ্ধ হয়ে?
নিশ্চয়ই দেখবেন। অয়ন ভাই ওকে ছাড়া আর কাউকে দেখতেই পারেন না। মেয়েটা স্বতঃস্ফূর্ত চিত্তে তৈরি হলো। উড়ো পাখির মতো ডানা মেলে নামল নিচে। বসার ঘর তখন আলোয় আলোয় সাজানো। টেবিলে দুটো কেক পাশাপাশি রাখা হয়েছে। এই দুটোই ইউশা কাটবে। একটা ওর আরেকটা ওর বোনের। সেদিক চেয়ে বুক ফুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। মেয়ে থাকুক বা না থাকুক দুটো কেক বানাতে মায়ের কখনো ভুল হয়নি।
বাড়িতে অল্পবিস্তর অতিথি আসা শুরু হয়েছে। সময় তখন সন্ধ্যে হওয়ার পথে। বাকিরাও তৈরি প্রায়। ইউশা চারপাশে চেয়ে অয়নকে খুঁজল। চোখ পড়ল আইরিনের দিকে। সোফায় পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে সে। পরনে ওয়েস্টার্ন, হাতে ফোন। দিন-দুনিয়ার কোনো কিছুতেই মনোযোগ নেই। উপায়ন্তর না পেয়ে ওর কাছেই এসে দাঁড়াল ইউশা। জিজ্ঞেস করল ব্যস্ত স্বরে,
“ অয়ন ভাইকে দেখেছ?”
আইরিনের চোখেমুখে বিরক্তি। ফোন থেকে মুখখানাও তুলল না। জবাব দিলো দ্বায়সারা,
“ না।”
বলার ধরণ শুনেই ইউশার মেজাজ চড়ে আয়। কেন যে জিজ্ঞেস করতে গেল! ভাব খানা দেখো,যেন প্রিন্সেস ডায়না। লাগছে তো ডাইনি মেড্যুসার মতো। উফ,ফুপিদের ফ্লাইট ক্যান্সেল হওয়ার আর সময় পায়নি? নাহলে গতকালই ওনারা পৌঁছাতেন। আর এই যন্ত্রণাটা বিদেয় হয়ে যেত! ধ্যাত।
তুশি হাজির হলো তখনই। যেমন ছিল, তেমনই আছে। সাদা চুরিদার, ওড়নাটা গলায় ঝুলছে কোনোরকম। লম্বা চুলে বেনুনি। ও এসে দাঁড়াতেই ইউশা বলল,
“ এ কী, তোমাকে না তৈরি হতে পাঠালাম?”
“ হয়েছি তো। তোমার দেয়া সবথেকে সুন্দর জামাটা পরেছি।”
“ আরে, এটা তো পুরোনো। আমি না তোমাকে নতুন একটা দিলাম!”
“ ওটাতে গা কুটকুট করছে।”
ইউশা অতীষ্ঠ হয়ে বলল,
“উফ তুশি,জামায় ভারি কাজ থাকলে ওরকম একটু হয়। এক ফোঁটা সাজোওনি দেখছি। একটা টিপ অন্তত পরতে!”
তুশির কণ্ঠে অনীহা,
“ ওসব আমার ভালো লাগে না। সেজে কী করব? আমাকে কে দেখবে?”
তারপর বিড়বিড় করল মনে মনে,
“ বিটকেলটা তো তাকায়ই না। আমাকে দেখলে যদি কানা হয়ে যায় সেই ভয়ে।”
ইউশা বলল
“ আচ্ছা ছাড়ো। অয়ন ভাইকে দেখেছ?”
তুশির নজর ইউশার মাথার পেছনে। উত্তর না দিয়ে মিটিমিটি হাসল। ভ্রু ইশারা করতেই, ঝট করে পিছু ফিরল ইউশা। বিশালাকার টেডিবিয়ারটা দুম করে ওর হাতে ধরিয়ে দিলো অয়ন। গাল টেনে বলল,
“ হ্যাপি বার্থডে এগেইন।”
ইউশা ভড়কে গেলেও,বিস্ময়ের এই ধাত তার ভালো লাগার কাছে কিচ্ছুটি নয়। বুকখানা ভরে এলো মেয়ের। রাতের ওসব দুঃখ-কষ্ট কখন ভুলে গেছে। হাসল গাল ভরে। আহ্লাদী স্বরে বলল,
“ থ্যাংকিউ! এটা খুব সুন্দর।”
অয়ন হাসে। পরপর চোখজোড়া ঘুরে আসে ইউশা বেশভূষার ওপর। অবাক হয়ে বলল,
“ শাড়ি পরেছিস? মাই গুডনেস, সুন্দর লাগছে তো।”
ইউশার স্বর আনমনা। কেমন করে শুধাল,
“ কতটা সুন্দর?”
“ বুড়িদের মতো সুন্দর!”
“ এটা কেমন প্রশংসা?”
ইউশা ঠোঁট ফোলাল। দুজনের খুঁনসুটিতে মাথা নুইয়ে হাসল তুশি। শাড়ি পরা ইউশাকে অয়নের পাশে কী দারুণ লাগছে! মনে হচ্ছে দুজন যেন দুজনের জন্যেই তৈরি। আচ্ছা,বিটকেলটার পাশে দাঁড়ালে ওকেও কি এতটা দারুণ লাগে?
উদাস মেয়েটার দিকে হুট করে এক প্রশ্ন তেড়ে এলো তখনই। কোত্থেকে হন্তদন্ত পায়ে এসে দাঁড়ালেন তনিমা। শশকের ন্যায় ব্যস্ত গতিতে শুধালেন,
“ তুশি,আজ কি তোমার জন্মদিন?”
ব্যস,কথাবার্তা থেমে গেল সবার। ইউশা,অয়নের সাথে সাথে অবাক হলো মেয়েটাও। যেন হতভম্বতার তোড়ে গড়িয়ে পড়ল মাটিতে। মৃদূ স্বরে শুধাল,
“ আপনি কী করে জানলেন!”
“ ফ্রিজে কেক দেখলাম। ওপরে ‘হ্যাপি বার্থডে তুশি’ লেখা। বুয়াকে জিজ্ঞেস করতেই বলল,সার্থ নাকি এনেছে!”
তুশির চোখ শৃঙ্গে। অবিশ্বাসের তোপে ঠোঁট ফাঁকা হয়ে গেল। ইয়াসির ওর জন্যে কেক এনেছে? এর মানে তখন হাতের ওই কেকটা ওর জন্যেই ছিল! হৃদয়ের গভীরে এক অন্যরকম দোলায় নড়ে উঠল মেয়েটা। একটা কেক পৃথিবীর সেরা উপহার নাহলেও,তুশির মনে হলো এটাই ওর শূন্য জীবনে ছুড়ে দেয়া এক টুকরো নরম-কোমল আলো। মানুষটার তবে মনে ছিল ওর জন্মদিনের কথা! আচমকা কেমন অবান্তর স্বপ্ন আর প্রশ্নের ছটায় ভেতরটা ছেঁয়ে গেল তুশির। ইয়াসির কেন জন্মদিন মনে রেখেছে? কেন কেক এনেছে? কেন এত আগ্রহ তার! শুধু কি এসব দায়িত্ব বোধ! কোনোভাবে ওই পাথুরে মনের খোলশ চিড়ে নিলে,ভেতরে তুশি নিজেকে দেখতে পাবে না তো!
মেয়েটার ধ্যান ছুটল ইউশার বাহু ধরে ঝাঁকানোতে। কেমন অধৈর্য গলায় জিজ্ঞেস করছে,
“ এই তুশি,কী হলো? তোমার আজ সত্যিই জন্মদিন!”
অয়নেরও একই প্রশ্ন,বিমূর্ত সে নিজেও।
“ তোমার জন্মদিন,বলোনি কেন আমাদের?”
তনিমা বললেন,
“ সেটাই তো। কেন বলোনি?”
ইউশা বলল,
“ আমাকে অন্তত একবার জানাতে পারতে। কাল রাতে যখন ঘরে এলে তখনো বললে না।”
তুশির জবাব এলো নিভু স্বরে,
“ কাল রাতে তোমাকে বলতেই গিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি কাঁদছিলে দেখে…”
ইউশা খুব আক্ষেপ করে বলল,
“ ইস! কেন কাঁদলাম আমি?
আমি না কাঁদলে তুমি জানাতে। আজকে
তাহলে আমরা সেম সেম জামা পরতাম!”
টেবিলের ওখানে তোমার নামও লেখা হতো।”
তুশি কিছু বলতেই যাচ্ছিল,কথা শুরুর আগেই চট করে জড়িয়ে ধরল ইউশা,
“ শুভ জন্মদিন তুশিরানী! আমাদের কত মিল দেখেছ? তিলও একই জায়গায়,আবার জন্মদিনটাও একই তারিখে। ২৮ এপ্রিল!”
তুশি হাসল। ততক্ষণে রান্নাঘর থেকে পায়েস নিয়ে ছুটে এসেছেন তনিমা। উদ্বেগ নিয়ে বললেন,
“ নাও দেখি হাঁ করো, হাঁ করো।”
তুশির অপেক্ষায় না থেকেই জোর করে এক চামচ পায়েস মুখে তুলে দিলেন তিনি। আইরিন আর টিকতে পারল না এখানে। বিরক্তিতে গা জ্বলে যাচ্ছে। নাকমুখ কুঁচকে ঘরে চলে গেল।
তুশি পায়েস খেতে খেতে মুগ্ধ চোখে হাসল। কাল রাত থেকে করে আসা ওর সকল মন খারাপ একটা ফানুসের মতো উড়ে গেল সূদূরে। কে বলল ওর কেউ নেই? এই যে এরা,তনিমা,ইউশা এরা ওর কত আপন! অয়ন জিজ্ঞেস করল,
“ আচ্ছা তুশি, ভাইয়া তোমার জন্মদিনের কথা কী করে জানল? আর জানলেও আমাদের কাউকে জানায়নি কেন?”
তুশির মাথায়ও একই কথা। হঠাৎ মনে পড়ল,সেদিন রাতে ইয়াসির ভর্তির জন্যে ওর জন্মতারিখ জিজ্ঞেস করেছিল। কী আশ্চর্য, অত দিন আগের কথাই তবে উনি মনে রেখেছিলেন? তুশির সদ্য গজিয়ে ওঠা সন্দেহ যেন বিশ্বাসে রূপ নিলো এবার। তবে কি বিটকেলটাও ওকে ভালোবাসতে শুরু করেছে? তাহলে কীসের মুক্তির কথা বলে গেল তখন!
ইউশা বলল,
“ ভাইয়ার কিন্তু কেক আনার কোনো দরকারই ছিল না। মা তো দুটো করে কেক বানিয়েই রাখে। ও থেকেই নাহয় তুশি একটা কাটতো!”
রেহনূমা পাশ থেকে যাচ্ছিলেন। মেয়ের কথায় পা জোড়া থামল৷ ধমকে উঠলেন অমনি,
“ ইউশা! তোর মুখ কিন্তু আজকাল বেশি চলছে। । ও আমার মেয়ের কেক কাটবে কেন?”
তনিমা বললেন,
“ আহ ছোটো, এভাবে বলছিস কেন? ও তো তোর মেয়ের মতোই!”
ভদ্রমহিলা কড়া কণ্ঠে বললেন,
“ না আপা। এসব চোর-ছ্যাচর আমার হতে যাবে কেন? দয়া করে এসব বলো না।”
তারপর দুমদাম পায়ে চলে গেলেন তিনি। মেজাজ খারাপ হলো অয়নের। কপাল কুঁচকে ওনার যাওয়ার পথে চেয়ে রইল সে। তিতিবিরক্ত আওড়াল,
“ ছোটো মায়ের তুশিকে নিয়ে এক্সাক্ট সমস্যাটা কী?”
তনিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রইলেন। শুকনো মুখে তুশির পানে এক পল দেখল ইউশা। হাতটা ধরে বলল,
“ মায়ের কথায় কষ্ট পেও না প্লিজ!”
মলিন হাসল তুশি। বলল,
“ বোকা,গরিবরা কখনো এত সহজে কষ্ট পায় না।”
তনিমা প্রসঙ্গ কাটাতে হাত বাড়িয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন ওকে। উচ্ছ্বসিত আওড়ালেন,
“ শুভ জন্মদিন তুশি। অনেক সুখী হও মা। দীর্ঘজীবী হও।”
শওকত বাইরে থেকে ঢুকলেন তখনই। কথাটা শুনতে পেয়েই অবাক চোখে বললেন,
“ সে কী,আজ তুশির জন্মদিন নাকি! আমার মেয়ের জন্মদিন আর আমি জানি না?”
ভদ্রলোক চটপটে পায়ে এগিয়ে এলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“ শুভ জন্মদিন, শুভ জন্মদিন। অনেক বড়ো হও জীবনে।”
তুশি হাসল।
শওকত পরপরই পরনের পাজামার পকেট হাতালেন। জিভ কেটে বললেন,
“ যাহ,মানিব্যাগ তো ওপরে। এখন হাতে অনেক কাজ! তোর গিফট পরে দেবো কেমন?
ইউশা বলল,
“ চাচ্চু,আর আমার গিফট?”
“ হ্যাঁ হ্যাঁ মা তোমাকেও দেবো।”
সবার কথার মধ্যে অয়নের নজর তুশির ওপর আটকে। মেয়েটা হাসছে। চঞ্চল কার্নিশ, ঠোঁটের কোণে উজ্জ্বলতা তার। যেখানে সাজানো কোনো সৌন্দর্য নেই,না আছে কৃত্রিম কোনো কিছু। অথচ প্রতিবার অয়ন খেই হারায়,খুইয়ে ফেলে নিজেকে। এই হাসিটা সারাজীবনের জন্যে নিজের কাছে গচ্ছিত রাখা জরুরি নয় কি! পরপর মেঝের দিকে চোখ ফেলল অয়ন। ইয়াসির বলেছিল,তুশিকে ডিভোর্স দেবে শীঘ্রই। উকিলের সাথে কথাবার্তা চলছে। ওসব কতদূর কী এগোলো জানতে হবে। ভাইয়া আজ ফিরুক,সময় করে জিজ্ঞেস করবে অয়ন! মনের ভাবনা দমিয়ে চোখমুখ স্বাভাবিক করল সে। বলল,
“ তুশি,তোমার তো আমার কাছেও একটা গিফটা পাওনা আছে। বলো,কী চাই!”
শওকত বললেন,
“ হ্যাঁ বল,তোর কী চাই! তুই আজ যা চাইবি আমি তোকে সেটাই দেবো।”
নিস্পন্দ চোখজোড়া ঝট করে তুলল তুশি।
“ সত্যি দেবেন?”
অয়ন বলল,
“ অবশ্যই,বলেই দেখো না।”
তুশি জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“ আমি মানে,একবার দাদিকে দেখতে চাই!
কতদিন দেখিনি! যদি একটু দেখা করার ব্যবস্থা হতো!”
তনিমা বললেন,
“ কিন্তু তুশি, সার্থ যদি শোনে খুব রাগ করবে। শত হলেও তুমি ওর স্ত্রী,ওর ওপর দিয়ে আমরা এত বড়ো সিদ্ধান্ত নিই কী করে!”
অয়ন শক্ত গলায় বলল,
“ কীসের সিদ্ধান্ত মামুনি? ভাইয়া তো আর এই সম্পর্কটা মানে না। তাহলে এসবে ওকে টানছো কেন? ও তুশিকে এ বাড়িতে এনেছে, রেখেছে, পড়াচ্ছে ব্যস ওর দায়িত্ব এই অবধি। এখানে ওসব স্বামী-স্ত্রী শব্দ আসছে কেন? তুশি যখন চাইছে,তখন ওর দাদির সাথে ওকে আমি দেখা করাব।”
তুশি বলল,
“ কিন্তু উনি যে আমাকে বাইরে যেতে মানা করেছেন। ওনার কথা অগ্রাহ্য করে আমি যাই কী করে?”
অয়ন ধরে নিলো এটা তুশির কৃতজ্ঞতাবোধ, আর ইয়াসিরের প্রতি ভয়। তাছাড়া বড়ো ভাইয়ের কথা অমান্য করা তারও উচিত হবে না। একটু ভেবে বলল,
“ তাহলে এক কাজ করি,তোমার দাদিকে এখানে নিয়ে আসি। তুমি আমাকে তোমাদের বস্তির ঠিকানা দাও। বাবা,তুমি কী বলো?”
শওকত একটু ভেবে বললেন,
“ এটা করা যায়। তোমার ভাই তো বাড়িতে নেই এখন। ইউনিফর্ম পরে বের হলো দেখলাম। ফিরতে তাহলে সময় লাগবে। ততক্ষণে ওর দাদির সাথে ওকে দেখা করিয়ে আবার নাহয় ফেরত পাঠানো যাবে।”
তনিমা শঙ্কিত কণ্ঠে বললেন,
“ কিন্তু সার্থ জানতে পেরে যদি রাগারাগি করে? বাড়িতে আমি আর কোনো নতুন অশান্তি চাই না। অন্তত আজকের দিনে তো নয়ই। এমনিই ছোটো আর সাইফুলের মনের অবস্থা ভালো না। মায়েরও মন-মেজাজ খারাপ রোকসানার আসা ক্যান্সেল হয়ে যাওয়াতে। এর মধ্যে তুশিকে নিয়ে আবার…”
অয়ন বলল,
“ কিচ্ছু হবে না মামুনি। ভাইয়া এনাফ মাচিউর্ড। আমার মনে হয় না এত সামান্য ব্যাপার নিয়ে রাগারাগি করার মতো কাজ করবে। তুশি, তুমি আমাকে ঠিকানা দাও,আমি যাচ্ছি।”
তুশির মনে ভয়। ইয়াসির যদি সত্যিই রাগ করে? আবার এতদিন পর দাদিকে দেখার লোভটাও সামলে রাখতে পারল না। দোনামনা করে বলে দিলো,
“ কারওয়ান বাজারের ওভার ব্রিজের ডান পাশ দিয়ে যে গলি গিয়েছে? ওখান থেকে দু মিনিট হাঁটলেই বস্তি পড়বে। ২৭ নম্বর ঘরটা আমাদের।”
অয়ন মাথা নাড়ল। তারপর দাঁড়াল না আর। যুদ্ধ জিততে যাবার মতো করে বাড়ি ছাড়ল তাড়াহুড়ো পায়ে। ইউশা শুকনো মুখে চেয়ে রইল সেদিকে। তার ভেতরেও একই আশঙ্কা। মেজো ভাইয়া যদি রেগে যান! তুশির জন্যে অয়ন ভাই অশান্তি করতে এমন মেতে উঠলেন কেন?
চলবে…
Share On:
TAGS: কাছে আসার মৌসুম, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১১
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৭
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫
-
সমুদ্রকথন গল্পের লিংক
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৫
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৪
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২৭
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৯