বড় আপার মৃত্যুর পাঁচ মিনিট না যেতেই তার স্বামীর দ্বিতীয় বউ যে আমাকেই হতে হবে তা কখনো কল্পনাও করিনি। মৃত্যুর আগে, পরিবারের সবার সামনে, আপা আমার দু’হাত আলতো করে চেপে ধরে শুধু একবার বলেছিল “আমার স্বামীর বউ হতে পারবি? আমার সন্তানের মা হতে পারবি না?” চারপাশে থাকা মানুষগুলোর চোখে তখন একরাশ প্রত্যাশা। অথচ আমি তখন নিজেই দিশেহারা, নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে গভীর দ্বন্দ্বে আবদ্ধ।
শেষ পর্যন্ত আমি সরে দাঁড়াই। নিজের পথ বেছে নিয়ে বার্সেলোনার উদ্দেশে দেশ ছাড়ি। কেউ আমাকে আটকাতে পারেনি। হয়তো আটকানোর অধিকারও তাদের ছিল না। আমি তূর্যা কারাভান। এই পৃথিবীতে আমি সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কারো কাছে দায়বদ্ধ নই। কোনটা আমার করা উচিত, আর কোনটা নয় সে বিচারবোধ আমি নিজের ভেতরেই বহন করি। যে মানুষ বড় স্বপ্ন দেখে, তাকে চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। তবু আক্ষেপ রয়ে যায়, আমার জন্ম এমন এক সমাজে, যেখানে প্রতিভা প্রায়ই অবহেলিত, শিল্পের কদর সীমিত। এমন বাস্তবতায় একজন ফ্যাশন ডিজাইনার, একজন শিল্পমনস্ক মানুষের পথচলা সহজ নয়। তাই হয়তো দূরে গিয়েই আমাকে নিজের জায়গা খুঁজে নিতে হয়েছে।
–
বার্সেলোনার এয়ারপোর্ট থেকে সবে মাত্র বেরিয়েছে তূর্যা। গায়ে কালো লেদারের জ্যাকেট, সঙ্গে জিন্স। কানে এয়ারপডস, গানের তালে তালে সে বাইরের দিকে পা বাড়ায়। বাইরে পা দিয়েই চারপাশে চোখ বোলায়।
কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে সবকিছু। আজ এয়ারপোর্টটা অন্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি নিরিবিলি। স্বাভাবিক কোলাহল নেই, মানুষের ভিড় নেই। একটা অস্বস্তিকর শান্তি চারদিকে ছড়িয়ে আছে। হাউ স্ট্রেঞ্জ… মনে মনে ভাবে তূর্যা। ওভারকোটটা একটু গুছিয়ে নিয়ে সে বাইরে রাখা চেয়ারে বসে পড়ে। বসতেই হঠাৎ মনে হলো এই জায়গাটায় কিছু একটা ঠিক নেই। অনুভূতিটা ক্ষণিকের হলেও বেশ তীক্ষ্ণ ছিল। তবু সে গুরুত্ব না দিয়ে হাতের ফোনটার দিকে তাকায়। ওভার কল করেছে সে। এই রাতের বেলায় গাড়ি পাওয়াটা এইখানে বেশ দুষ্কর।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে ফোনের স্ক্রিনে ডুবে যায়।
এই শহর নতুন নয় তার কাছে। এইচএসসিতে স্কলারশিপ পেয়ে প্রথমবার যখন বার্সেলোনায় পড়তে এসেছিল, সেই দিনগুলোর কথা এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে। বাবার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ছিল। সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল তূর্যার স্বপ্ন দেখার সাহস। ফ্যাশনের প্রতি তূর্যার ভালোবাসা কোনো হঠাৎ পাওয়া অনুভূতি নয়। বাবার হাত ধরেই এই জগতের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয়। কাপড়, রং, নকশা সবকিছুর ভেতরেই বাবার স্বপ্ন আর শ্রম জড়িয়ে ছিল। দিনগুলো তখন বেশ ভালোই কাটছিল। তারপর একদিন সব ভেঙে পড়ে।
একটি রাজনৈতিক চাঁদাবাজি নিয়ে বাবার সঙ্গে একটি দলের কিছু লোকের বিরোধ বাধে। ঠিক সেই রাতেই, কোটি টাকার একটি প্রজেক্ট বাবার স্পেনে যাওয়ার কথা ছিল। সাফল্য প্রায় হাতের নাগালে। কিন্তু তার আগেই সব শেষ। ওই লোকগুলো কারখানায় আগুন লাগিয়ে দেয়। কোটি টাকার মাল, অগণিত পোশাক সবকিছু মুহূর্তে ছাই হয়ে যায়। এই ধাক্কা বাবা নিতে পারেননি। স্ট্রোক করেন। ধীরে ধীরে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন৷ শরীর ভেঙে পড়ে, ব্যবসা ভেঙে পড়ে, আত্মসম্মান ভেঙে পড়ে। দেউলিয়া হয়ে বেকারত্ব আর অসহায়তা নিয়ে তিনি বিছানায় পড়ে ছিলেন। তখন বাবার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল মাকে। কিন্তু সেই সময়েই মা নিজের প্রকৃত রূপটি প্রকাশ করেন।
বাবার এক বন্ধুর ছেলের সঙ্গে তার গোপন সম্পর্ক ছিল। সেই বন্ধু তখন আর বেঁচে নেই, তার সমস্ত সম্পত্তির মালিক হয় সেই ছেলে। লোভ আর মোহ দুটোই মাকে গ্রাস করে। এক রাতে, চোখের সামনেই বাবাকে হত্যা করা হয়। পরে সেটিকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। মায়ের পরকীয়া প্রেমিকই হয়ে ওঠে তার স্বামী।
এরপর শুরু হয় অন্য এক নরকের গল্প। লোকটির আচরণ ছিল অসহনীয়। আমরা, আমি আর বড় আপাকতবার মাকে বলেছি, “ওই লোকটা আমাদের গায়ে হাত দেয়। ভালো লাগে না। খুব নোংরা লাগে।”
কিন্তু মা বিশ্বাস করেছিলেন তাকে, আমাদের নয়।
বড় আপা ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে। সহ্য করাই যেন তার অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়। আমি পারিনি। এক রাতে, লোকটা মাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে আমার ঘরে আসে। সেই রাতে আমি তার উরুতে পেন্সিল-কম্পাস বসিয়ে দিই। এর ফল হিসেবে পরের দুই রাত আমাকে থাকতে হয় অনাহারে। জল ছাড়া কিছুই জোটেনি।
ওই বাড়িটা আমার জন্য ছিল এক জীবন্ত জাহান্নাম। যেই জাহান্নামের সৃষ্টি হয় নিষ্পাপ গোলাপ পুড়িয়ে।
লোকটার কথা অমান্য করার কারণেই হয়তো ছোটবেলা থেকেই আমার ওপর সে এমন পাষবিক হিংস্রতা চালানোর সুযোগ পেয়েছিল। চোখের সামনে বছরের পর বছর বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা দেখে আমরা বড় হয়েছি। আজ আমি যে মানুষটা হয়েছি, তার পেছনে এই রক্তাক্ত বাস্তবতাও দায়ী। তবে মা যাকে সারাজীবন নিজের করে রাখার নেশায় নিজের বড় মেয়েকেও বলি দিয়েছিল, সেই লোকটাও একদিন তাকে লাথি মেরে ছেড়ে চলে যায়। কিছুদিন পর বড় আপার বিয়ে হয়। একজন বিত্তবান পরিবারের ছেলের সঙ্গে। ছেলেটিকে মা নিজেই কোথা থেকে যেন জোগাড় করেছিল। সম্ভবত কোনো ক্লাব থেকেই। বড় আপার স্বামীর মধ্যেও আমি সেই পুরোনো নোংরামির আরেকটি রূপ দেখতে পেতাম।
আপা মুখ বুজে সব সহ্য করত। কিছু বললে শুধু বলত,
“স্বামীর ভাত খাওয়া সহজ না। স্বামীর ভাত খেতে হলে সব সহ্য করতে হয়।” এই কথাটা আমি কখনো মেনে নিতে পারিনি। কেন কেবল মেয়েরাই সমাজের নোংরা খেলার সাক্ষী হবে? এই সমাজ নারীর বেলায় এত কঠোর কেন? মানিয়ে নেওয়া আমার আপার অদ্ভুত এক গুন ছিল। সেই গুনটাই তার রুহুটা শেষ অবধি কেড়ে নিলো। কতবার তূর্যা বড় বোন তনিমাকে বলেছিল সব ছেড়ে তার সঙ্গে বার্সেলনায় চলে আসতে। যদি তূর্যার কথা একবার মেনে নিতো হয়তো কখনোই এত কঠিন মৃত্যু তার হতো না।
সেই সময়টার কথা আজও স্পষ্ট মনে পড়ে। আপার তখন সবে বিয়ে হয়েছে, আর আমি এইচএসসি দেওয়ার প্রস্তুতিতে। আপার স্বামীর সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার মুহূর্তেই আমি তার ভেতরের নোংরামিটা টের পেয়েছিলাম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটিই সত্য ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল। এই পৃথিবীতে তুমি যতটা দুর্বল হবে, তোমার শত্রুরা ততটাই নিষ্ঠুর হয়ে উঠবে।
আপার স্বামী আমার সঙ্গে সরাসরি কিছু করতে না পারলেও, তার চোখেমুখে লুকোনো লালসাটা আমি সবসময়ই অনুভব করতাম। সেই দৃষ্টি ছিল অস্বস্তিকর।
এই তো বাংলাদেশ থেকে সবে ফিরেছি আমি। চারপাশের সবার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে,কেন ফিরেছি? কেন এতটা নির্দয় হয়ে কেবল নিজের কথাই ভেবেছি? কেন দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম?
কিন্তু ছোটবেলা থেকে নিজের কথা ভাবার সুযোগ কি কোনোদিন পেয়েছি? ওই দেশে থেকে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে, একটি নোংরা বাস্তবতার সঙ্গে আপস করে সংসার করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
ওরা ভালোবাসা বোঝে না। ওরা একজন মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে জানে না। তাহলে আমি কেন নিজের সমস্ত সম্ভাবনা ধ্বংস করে তাদের পেছনে দৌড়াব?
এইচএসসি শেষে স্কলারশিপ পেয়ে আমি তূর্যা কারাভান স্পেনের বার্সেলোনায় চলে আসি, নিজের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে। এখানে এসে দিন-রাত পরিশ্রম করেছি, ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেছি। আমার ইউনিভার্সিটি—ইস্তিতুতো ইউরোপেও দি ডিজাইন—এ আমার দিনগুলো এখন বেশ ভালোই কাটছে।
ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত এই শহরটা আমাকে অদ্ভুতভাবে নিজের দিকে টানে। কখনো কখনো মনে হয়, আমি যেন এই সমুদ্রতটের কোথাও হারিয়ে যাওয়া এক টুকরো কালো মুক্তো। যার মূল্য সবাই দিতে পারে না, আর পেলেও তার কদর বোঝে না। হঠাৎ তূর্যার চোখের সামনে বড় বোনের এক ঝলক দৃশ্য ভেসে উঠল। “আপা ওই মানুষরূপী জানোয়ারগুলো তোমার জীবনটা শেষ করে দিল। মরতে মরতেও তুমি কেবল তাদের কথাই ভেবেছ। একবারও নিজের কথা ভাবোনি।” তূর্যার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“আমায় স্বার্থপর বলো, যা খুশি বলো তবু আমি নিজের জন্যই বাঁচব, আপা। চোখের সামনে এত প্রতারণা, এত ভাঙন দেখার পর ভালোবাসার ওপর থেকে আমার ভরসা উঠে গেছে। ভালোবাসা পাপ বুঝলে তো? তুমি ভালোবেসে হেরেছ, আপা। আর আমি ভালো না বেসেই জিতে যাব। এই দুনিয়া নিষ্ঠুর। ভয়ংকরভাবে নিষ্ঠুর।
আর এই নিষ্ঠুরতার ভেতরে বেঁচে থাকতে হলে ,
নিষ্ঠুরের সঙ্গে নিষ্ঠুর না হতে পারলে, জীবন আরও বেশি নির্মম হয়ে ওঠে।”
তূর্যা চোখের জল মুছে ফেলল। তাকে শক্ত থাকতে হবে কারণ নারী দুর্বল হলে সমাজ তাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে সময় নেয় না। সে আবারও ওভারকে কল দিল। কতক্ষণ হয়ে গেল, লোকটার এখনো কোনো হদিস নেই। এবার সত্যিই রাগ জমছে। চারপাশে কোনো দোকান খোলা নেই, অথচ কফির তীব্র ক্রেভিং মাথার ভেতর কিলবিল করছে। টানা বসে থাকতে থাকতে কোমরটাও ব্যথায় শক্ত হয়ে গেছে। এখান থেকে তার বাসা অনেক দূর। নইলে এতক্ষণে হাঁটা শুরু করে দিত।
হালকা বাতাসে তূর্যার কার্ল করা কালো-বাদামির সংমিশ্রণে গড়া চুল দুলছে। তার চোখের রঙ অদ্ভুত রকমের। হ্যাজেল সবুজাভ বাদামি। পুরো সবুজও নয়, আবার পুরো বাদামিও না। সবুজ, হলুদ আর হালকা বাদামির মিশেলে গড়া ভয়ংকর সুন্দর, নেকড়ের মতো টানা চোখ। আলো পড়লে কখনো সবুজ, কখনো আবার সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়ে। অদ্ভুত না?
তূর্যা তার দাদিকে কখনো দেখেনি। তবে বাবার মুখে শোনা ঠিক এমন চোখ নাকি তার দাদিরও ছিল।
ব্যাগটা পাশে রেখে, ফোন হাতে চারপাশটা একটু দেখে নেওয়ার জন্য সে উঠে দাঁড়াতেই হঠাৎ কানে এলো গোলাগুলির শব্দ। মুহূর্তের মধ্যে দৃশ্যপট বদলে গেল। সামনের দিক থেকে একটি মেয়ে দৌড়ে আসছে। সারা শরীর রক্তে ভেজা। বাঁচার জন্য প্রাণপণে ছুটছে সে, ঠিক তূর্যার দিকেই। তূর্যার মনে হলো, এখানে দাঁড়িয়ে থাকা একদমই ঠিক হবে না। এই জায়গা মুহূর্তে মৃত্যুকূপে পরিণত হতে পারে। পাপ করলে হয়তো কখনো রেহাই মেলে, কিন্তু দেখে ফেললেও যে রেহাই নেই সে কথা তার ভালোই জানা। আগে এখান থেকে সরে যেতে হবে, লাগেজটা পরে নেওয়া যাবে। পরিস্থিতি ভয়াবহ। আর সেই মেয়েটি সাহায্যের আশায় তার দিকেই ছুটে আসছে। পেছনে মাস্ক পরা তিন-চারজন পুরুষ। হাতে অস্ত্র। ওদিক থেকে একটি বুলেট ছুটে এসে বুকে লাগলেই সব শেষ। নিশ্চিত মৃত্যু।
গুলির শব্দটা এবার আরও কাছে। তূর্যার বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দনটা এমন জোরে ধাক্কা দিচ্ছে, মনে হলো বুক ফেটে বেরিয়ে আসবে। মাথার ভেতর এক সেকেন্ডে হাজারটা হিসাব। দৌড়াবে? লুকোবে? নাকি কিছুই না করে দাঁড়িয়ে থাকবে? তূর্যা দৌড়ানো শুরু করল। এমতবস্থায় পেছনে ফিরে একবার দেখল। মেয়েটার গায়ে গুলি লাগেনি। নিশ্চিত লোকগুলোর উদ্দেশ্য ভিন্ন, হয়তো মেয়েটি এমন কিছু জানে তাই তাকে সুযোগ পেয়েও মারছে না। একেবারে জীবন্ত চাই। তূর্যার মাথা কাজ করছে না। মানুষের মৃত্যু সে কাগজে পড়েছে, গল্পে পড়েছে কিন্তু চোখের সামনে এমনভাবে কোনো কিছু দেখতে হবে ভাবেনি। হঠাৎ গুলির শব্দ থেমে যায়। দৌড়াতে দৌড়াতে তূর্যা ভাবল, ওই মেয়ে মরুক, বাঁচুক তার কিছু আসে যায় না। হঠাৎ দূর থেকে মেয়েটির কাঁপতে থাকা গলা কানে পৌঁছায় তূর্যার। “বোন… আমাকে বাঁচাও…”এই একটিমাত্র শব্দেই তূর্যার বুকের ভেতর কিছু ভেঙে পড়ল। চোখের সামনে ভেসে উঠল আরেকটা মুখ। তার বড় আপার মুখটা।শেষবারের মতো যে হাতটা ভালো করে ধরতে পারেনি তূর্যা। আপাকে সে বাঁচাতে পারেনি। সেই অপরাধবোধ এখন তার ভেতরটা খুবলে খাচ্ছে। হঠাৎ তূর্যার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। নিজের বোনকে সে বাঁচাতে পারেনি
কিন্তু এই মেয়েটাকে মরতে দেওয়া যাবে না। সে পেছন ফিরে দেখল মেয়েটা পড়ে গেছে। পুনরায় সামনে তাকালো সে। সামনে একটা বিরাট অন্ধকার জঙ্গল। ওই জঙ্গলে একবার ঢুকলে সে বেঁচে যাবে আর যদি না ঢুকে এই মেয়েকে বাঁচাতে যায় তাহলে আজকে সে লাশ হয়ে এই বার্সেলনার মাটিতেও পড়ে থাকতে পারে। হঠাৎ তূর্যা তার বিবেকের মুখোমুখি হলো। না মেয়েটাকেও বাঁচানো দরকার। তূর্যা থেমে গেল। পায়ের হিল জুতো গুলো সেই কবেই এয়ারপোর্টে ফেলে এসেছে। এই টুকু আসতে না আসতেই পায়ের অবস্থা নাজেহাল। তূর্যা দৌড়ে গেল মেয়েটির দিকে। লোকগুলো তাদের খুব কাছে। একবার জঙ্গলে প্রবেশ করতে পারলেই চলে। সে
হাত বাড়িয়ে ধরল মেয়েটার কাঁধ। “দৌড়াও, একদম শব্দ কোরো না।” মেয়েটা পড়ে গিয়েছিল। কোনোমতে উঠল। রক্ত ঝরছে পা থেকে। তূর্যা তাকে টেনে নিয়ে ঢুকে পড়ল জঙ্গলের অন্ধকারে। ভেতরে ঢুকেই পৃথিবী বদলে গেল। আলো নেই। রাস্তা নেই।
শুধু শুকনো পাতা, আর স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধ। পেছনে পুরুষদের কণ্ঠ ভেসে এলো। “দুইদিকে ভাগ হও। এখানেই আছে ওরা। পালাতে পারবে না।”
তিনজন তিনদিকে ছড়িয়ে পড়ল। তূর্যা মেয়েটাকে একটা ঝোপের আড়ালে বসিয়ে দিল। হিসহিসিয়ে বলল, “চুপ থাকবে। নিজের মুখ নিজে চেপে রাখো। আমি আসছি, এখানেই আছি। ভয় নেই।” তূর্যা নিজে একটু এগিয়ে গেল। হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরল একটা ভারী পাথর। হৃদপিণ্ড এবার আর দৌড়াচ্ছে না।
পাতা মাড়িয়ে কারও পা এগিয়ে আসছে।
খুব কাছে। এত কাছে যে নিঃশ্বাসের গন্ধ পাওয়া যায়।
লোকটা টর্চ জ্বালাল। আলোটা ঘুরে এল তূর্যার মুখে।
এক সেকেন্ডের চোখাচোখি।
“পেয়েছি” বাকিটা শেষ হওয়ার আগেই তূর্যার হাতের পাথরটা সোজা গিয়ে পড়ল তার মুখে। চিৎকার বেরোবার আগেই আরেকটা আঘাত। পরপর আরো অনেকগুলো। লোকটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
নড়ছে না একদমই। তূর্যার হাত কাঁপছে।
পাথরে লেগে থাকা উষ্ণ কিছু গড়িয়ে পড়ছে আঙুল বেয়ে। হ্যাঁ এগুলো তো রক্ত। এই প্রথম।
এই প্রথম কোনো মানুষের রক্ত তার হাতে। বমি আসতে চাইল। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। কিন্তু সে পড়ে গেল না।
ঝোপের আড়াল থেকে মেয়েটা তাকিয়ে আছে। তূর্যা ধীরে মাথা ঘোরাল। নেকড়ের মতো টানা চোখে এখন আর শুধু ভয় নেই, আছে বেঁচে থাকার হিংস্র ইচ্ছে, কাউকে বাঁচানোর হিংস্র ইচ্ছে। এখানে দাঁড়িয়ে থাকার মতো সময় নেই তার। সে জলদি মেয়েটির কাছে গিয়ে বলল,” তুমি সামনের রাস্তা ধরে চলে যাও। সামনেই সমুদ্র। কোনো না কোনো বোট কিংবা মানুষের দেখা পাবেই। সেখানে বাড়ি-ঘর আছে। কারো থেকে আশ্রয় চাইলে নিশ্চয়ই কোনো একটা ব্যবস্থা হবে। যাও বোন।”
“কিন্তু আপনি?”
তূর্যা পেছন ফিরে জঙ্গলের দিকে তাকালো। আরো কিছু পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে। সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। ওরা এই মেয়েকে ধরে নিয়ে যাবেই। ভবিষ্যৎ কী তূর্যার জানা নেই। কি করবে, কি হতে চলেছে তাও নয়। তবে আপাতত এই টুকু জানে এই মেয়েকে বাঁচাতে না পারলে আরেকবার সে বিবেকের লড়াইয়ে হেরে যাবে। সে মেয়েটির গালে হাত রেখে বলল,”আমিও তোমার পেছন পেছনই আছি। তুমি যাও।”
“সিউর?”
“হ্যাঁ।”
মেয়েটি চলে গেল। তূর্যা হাতে সেই রক্তমাখা পাথরটা পুনরায় তুলে নিলো। ভয়ে গলা কাঁপছে তার। তারা শরীরে রক্তের কটু গন্ধ। হঠাৎ কিছু বুঝবার আগেই পেছন থেকে একজোড়া শক্ত হাত শক্ত করে চেপে ধরল তার মুখ, চেপে ধরল তার গলা। হাত থেকে পাথরটা ছিটকে পড়ে গেল। ধীরে ধীরে যন্ত্রণা যেন দ্বিগুন হলো। আফসোস, এখনো তো এই তূর্যা কারাভানের কত কী করা বাকি। কিছুই করতে পারল না সে, ভ্যালুলেস একটা জীবন রেখে পালাচ্ছে তার রুহুটা। হঠাৎ লোকটি তূর্যাকে নিজের দিকে কৌশলে ঘুরিয়ে ফেলল। ফোনের ফ্লাশ লাইটটা জ্বালাতেই তূর্যা একজোড়া ভ্রমর কালো অদ্ভুত আর্কষনীয় চোখ দেখতে পেল। মুখে কালো মাক্স, কালো একটা হুডি পড়া। কেবল দু’টো চোখ দেখা যাচ্ছে। লোকটা কিছুক্ষণ চেয়ে রইল তার দিকে। তূর্যা শব্দ করার চেষ্টা করতেই মুখটা আরো ঠেসে ধরল। ফিসফিস করে তার নেশার মতো তীব্র গম্ভীর গলায় বলল, “দ্য লেস নয়েজ ইউ মেক, দ্য লঙ্গার ডেথ উইল টেক টু রিচ ইউ সুগারপ্লাম।”
লোকটি আরো শক্ত করে চেপে ধরল তূর্যার গলা। একেবারে কাছে টেনে ভালো করে অন্ধকারে খুঁটিয়ে দেখল। তূর্যার হ্যাজল চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “হেই সুগারপ্লাম, চোখে চোখ রেখে আত্মার সর্বনাশটা না করলেও পারতে।” বলেই সে দেরি করল না। ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে মুখ থেকে মাক্স নামিয়ে সরাসরি তার নিষ্প্রাণ ঠোঁট দু’টো ছুঁইয়ে দিলো তূর্যার ঠোঁটে। তূর্যার মুখে, ঠোঁটে রক্ত লেগে আছে। তাতেও হয়তো এই কালো ভ্রমরের কিছু যায় আসে না। তার চুমু শক্ত থেকে শক্ততর হতে লাগল। তূর্যার ছটফটানি বেড়েই চলছে। দেহটা আর পারছে না। ঠিক তখনই লোকটি তাকে ছেড়ে দিলো। তবে হয়তো মৃত্যুর কোলে। পকেট থেকে একটা ইনজেকশন বের করে সরাসরি বসিয়ে দিলো তূর্যার ঘাড়ে। তূর্যা সময় পেল না। তার গায়েই হেলে পড়ল। তা দেখে লোকটি হুডির আড়ালে হাসল। মাক্স পড়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,” গুড নাইট ফরএভার সুগারপ্লাম।”
কমান্ডার তনয় জেইদী
ইশরাতজাহানজেরিন
সূচনা_পর্ব
জনরাসাইকোরোমান্সডার্কথ্রিলার_রোমান্টিক
চলবে?
(কেমন ছিল এই দারুণ কিছু? এই সারপ্রাইজ? একেবারে ডার্ক প্লটের একটা ব্যতিক্রম কিছু হতে চলেছে। তবে আপনাদের পছন্দ না হলে ডিলিট দিয়ে ফেলব😭 ভাই আপনারা আমায় কাজিন রিলেটেড লিখতে বলছেন, অথচ আমার মন টানেনা, আমার মাথায় কিছু আসেও না। এত সাধারণ প্লটে আসলেই আমার মাথা কাজ করেনা। কারন মাথা ভরতি ভয়ানক থ্রিলার প্লট ঘুরঘুর করে, কোপাকোপি, সাইকো রোমান্স ছাড়া সুস্থ কিছু নিয়ে কেন জানি ভাবতেই পারতাছি না। তবুও যদি আপনারা চান #যেখানেপ্রেমনিষিদ্ধ আসুক। ওইটাও যেন দেই তাহলে মনের বিরুদ্ধে গিয়েও লেখার চেষ্টা করব🥹 কারন আমি আমার পুকি পাঠিকাদের পুকি লাভ করি💋)
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, কমান্ডার তনয় জেইদী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২৩+২৪
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৫
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৭
-
পরগাছা পর্ব ৮
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৩৩+৩৪
-
প্রেমতৃষা ৪২ ( শেষ অর্ধেক)
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ৪
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৩৯ ( প্রথম অর্ধেক+শেষ অর্ধেক)
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২৫+২৬