ওরা মনের গোপন চেনে না
পর্ব সংখ্যা —–[৪]
বৃষ্টি শেখ
চারদিকে আলোর ছটা। তবুও মৃত্তিকার নিকট সবটা অন্ধকার মনে হচ্ছে। বমি করায় নাক, মাথা জ্বলছে। আফিম তার সামনেই দাঁড়িয়ে। ছেলেটার পরনের কুচকুচে কালো ব্লেজারটা হলুদ হয়ে গেছে। আফিমকে আজ অন্যরকম লাগছে। রাস্তার বখাটে আফিম আর এখনাকার আফিমের মাঝে আকাশ পাতাল তফাৎ। পথে টিজ করা আফিমের শার্ট হয় সাদামাটা, শার্টের প্রথম দুটো বোতাম থাকে খোলা। প্রশস্ত, রোমশহীন বুক উন্মুক্ত হয়ে ধরা দেয়। গলায় ঝুলে থাকে রুপালি চেইন, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পরে থাকে কপালে। চট করে দেখে বলে দেওয়া যায় ছেলেটা ভবঘুরে, বখাটে স্বভাবের। অথচ এই আফিমের পোশাক বেশ মার্জিত। সাদা শার্টের উপরে কালো ব্লেজার, গলায় কালো টাই আর পায়ে কালো বুট জুতো। চুলগুলো জেল দিয়ে গুছিয়ে রেখেছে ছেলেটা। সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে, চোখে শান্তি লাগছে। জিম করা সুঠাম দেহ, শক্ত-পোক্ত ফোলা বাহু বড়ই আকর্ষণীয়।
মৃত্তিকা হেলে দেয়া মাথাটা ওঠায়। ঝিমঝিম করে ওঠে দেহ। পা জোড়া অসাড় হয়ে আসে। আফিমের কাঁধ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে রূপক, রায়ান, শান্ত। আফিম এগিয়ে এসে মৃত্তিকার চেয়ারের হাতলে হাত রেখে ঝুঁকে আসে মৃত্তিকার দিকে। চট করে মুখ ফিরিয়ে মাথা নত করে মৃত্তিকা। কেঁপে ওঠে ফের। আফিম রায়ানের দিকে চেয়ে বলে,
“- এক গ্লাস পানি নিয়ে আয়”।
রায়ান দৌড়ে যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে গ্লাসে করে পানি নিয়ে আসে সে। আফিম পানির গ্লাসটা মৃত্তিকার দিকে বাড়িয়ে দেয়। পানিটুকু পান করে মৃত্তিকা গ্লাস ফিরিয়ে দিয়ে বলে,
“- আপনাদের ধন্যবাদ।”
আফিম ছ্যাঁত করে ওঠে। কটাক্ষ করে বলে,
“-, এত অসুস্থ অবস্থায় দাওয়াত খেতে এসেছো কেন? দিলে তো আমার ব্লেজারটা নষ্ট করে”।
মৃত্তিকা ভড়কায়। লাজে নুইয়ে পরে সে। বলে,
“- কিছুক্ষণ আগেও ঠিক ছিলাম। বুঝতে পারিনি এমনটা হবে”।
ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ে আফিম। রূপক তাড়া দিয়ে বলে,
“- ওদিকে বিয়ে পড়ানো শেষ হয়ে যাচ্ছে। দেখবি না তোরা”?
বিয়ে পড়ানো হচ্ছে শুনতেই মুচড়ে ওঠে মৃত্তিকার হৃদয়। হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করে মেয়েটার। জ্বলে ওঠে বক্ষস্থল। আফিমের সাথের ছেলেগুলোকে মৃত্তিকা চেনে। ওরাই সেদিন আফিমের সাথে রাস্তায় মারামারি করছিল। বিস্মিত স্বরে মৃত্তিকা জিজ্ঞেস করে,
“- বিয়ে হয়ে গেছে”?
শান্ত বলে,
“-, শুরু হয়েছে, শেষ হয়নি”।
মৃত্তিকা ধরফর করে উঠে দাঁড়ায়। শাড়ির কুঁচি গুলো মুখ থুবড়ে পরে চকচকে, পরিষ্কার মেঝেতে। উত্তেজিত হয়ে পরে মৃত্তিকা। ব্যগ্র কণ্ঠে বলে ওঠে,
“-, আমি দেখবো না ওদের, আমি বাড়ি ফিরবো। এখানে থাকতে চাই না আমি”।
আফিমের বাবা আশরাফ মির্জা ধনী মানুষ। এ শহরের সব নামি-দামি মানুষের বিয়েতে তাকে নিমন্ত্রণ জানানো হয়। ইয়াসিনের বাবা তার রেস্টুরেন্টের ১০% শেয়ার কিনেছেন। সেই সম্পর্কের খাতিরেই আশরাফ মির্জা ও তার পরিবারকে ইনভাইট করা হয়েছে ইয়াসিনের বিয়েতে। আশরাফ মির্জার পরিবার বলতে সে এবং তার ছেলে। আফিমকে সে প্রথমে কিছুতেই রাজি করাতে পারেনি বিয়েতে আসার জন্য। অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে আফিমকে এত সভ্য মানুষদের কাছে নিয়ে আসতে। ছেলে তার ছন্নছাড়া, বাঁধনহারা। যখন যা ইচ্ছে হয় তাই করে, এ জেলার, ও জেলার ছেলেদের সাথে মারপিট করে শরীরে ক্ষত বানিয়ে নিয়ে আসে, দুর্নাম রটায় নিজের। আফিমের সব আড্ডা বখাটে ছেলেদের সাথেই। সভ্য, ভদ্র মানুষদের সাথে তার অত ভাব নেই। আজ কিছুতেই আফিম সেজেগুজে আসতে চায়নি এখানে। আশরাফ মির্জা একা একা আসবে, এটা ভালো দেখায় না। সবাই বিষয়টা ভালো চোখে দেখবেও না। তাই না চাইতেও রীতিমতো জোরজবরদস্তি করে আফিমকে এখানে টেনে এনেছে সে। তবে সুযোগ বুঝে আফিম একটা শর্তও জুড়ে দিয়েছে৷ তার প্রিয় বন্ধুদেরকে সে না নিয়ে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাবে না। অগত্যা আফিমের সাথে এসেছে শান্ত, রূপক আর রায়ান। বিয়ে বাড়িতে আসার পর ওরা অনেকটা আনন্দ করেছে। খাওয়াদাওয়ার পর্ব চুকিয়ে বের হয়ে আসতেই মৃত্তিকার সাথে ধাক্কা লাগে আফিমের। এ মুহুর্তে মৃত্তিকাকে দেখে অবাক হয় ছেলেটা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গরম, নোংরা ভাতের দানা এসে পরে তার ব্লেজারে। সে মুহুর্তে প্রচণ্ড রাগ করা উচিত ছিল আফিমের। সে রাগী মানুষ। শার্টে সামান্য ধুলো লাগতে দেয় না যে ছেলে, তার বুকে কেউ বমি করে দেয়ার পরও সে এতটা শান্ত কি করে আছে কে জানে?
মৃত্তিকার ভাবগতিক সুবিধের নয়। মেয়েটার শরীর দুলছে। অস্থির, উত্তেজিত দেখাচ্ছে মৃত্তিকাকে। কিন্তু আফিমের স্বভাবে মৃত্তিকার প্রতি কোমলতা নেই, নম্রতা নেই। সে চায় ও না নরম স্বরে কথা বলতে। আফিম বিরক্তিকর কণ্ঠে বলে,
“ যাবে ভালো কথা, আমার ব্লেজার নিয়ে যাও। ধুয়ে, আয়রণ করে ফেরত পাঠাবে”।
মৃত্তিকা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে আফিমের দিকে। আফিম ব্লেজারটা খুলে এগিয়ে দেয় মৃত্তিকার দিকে। দোনামনা করে ব্লেজার হাতে নিয়ে মৃত্তিকা কুণ্ঠিত স্বরে বলে,
“- আমি ভালো করে ওয়াশ করে দেবো”।
দাঁড়াল না মৃত্তিকা। বর-কনের স্টেজের সামনে গিয়ে যাওয়ার সময় না চাইতেও স্টেজে চোখ আটকে যায় মেয়েটার। অনেক চেয়ার পেতে রাখা সেখানে, আনন্দে মুখরিত চারপাশ। সকলেই বসে বর-কনেকে দেখছে। কাজী সাহেব সূরা পাঠ করলেন। প্রথমে ইয়াসিনকে বললেন কবুল বলতে। এক মুহুর্তের জন্য মৃত্তিকার মনে হলো ইয়াসিন কবুল বলবে না, তার গলায় শব্দটা আটকে যাবে। তাদের ভালোবাসায় কোনো ছলচাতুরী ছিল না। ইয়াসিনের হয়তো বা হুঁশ ফিরবে। মৃত্তিকা প্রহর গোনে। দম আটকে রেখে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখের মণি অস্থির হয়ে ওঠে মেয়েটার, বুক ধুকধুক করতে থাকে। ইয়াসিন কি ভেবে পুরো সেন্টারে নজর বুলায়। মৃত্তিকার চোখে চোখ পরতেই ছেলেটা চোখ নামিয়ে ফেলে দ্রুত। তার চোখে অস্বস্তি বিদ্যমান। কিছুক্ষণ চুপ থেকে অতঃপর চোখ বুজে দ্রুত তিন কবুল পাঠ করে সে। সাথে সাথে চোখ বুজে ফেলে মৃত্তিকা। গালে নোনা পানি গড়িয়ে পরে। সবাই খুশিতে লাফিয়ে উঠলেও মৃত্তিকা খুশি হতে পারে না। ভেতরটা জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যায় মৃত্তিকার। ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় হৃদয়। রুবিও কবুল বলার পর বিয়েটা সম্পন্ন হয়ো যায়। মৃত্তিকা আলতো হাসে। চোখ, মুখ মুছে ফেলে সে। শাড়ির কুচি উঠিয়ে এগিয়ে যায় বর-কনের দিকে। হাতে থাকা র্যাপিং পেপারে মোড়ানো উপহারটা রুবির দিকে বাড়িয়ে দেয় সে। বলে,
“- তোর বিয়ের উপহার”।
রুবি অবাক হয়ে তাকিয়ে রয় মৃত্তিকার পানে। সে মৃত্তিকার প্রিয় বান্ধবী। তার মতো কেউ মৃত্তিকাকে চেনে না, জানে না। মৃত্তিকার সিক্রেট বক্স ছিল রুবি। সে জানে মৃত্তিকা ইয়াসিনকে কতটা ভালোবাসে, কতটা যত্নে গড়েছে সম্পর্ক। তাহলে আজ মেয়েটা খুশি কেন? কেন চোখে অশ্রু নেই মৃত্তিকার?
মৃত্তিকা ফিরে আসে স্টেজ থেকে। টলতে টলতে সেন্টারের বাহিরে চলে আসে। আর চলছে না মেয়েটার শরীর। মৃতদের ন্যায় ঘুমিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে, দাঁড়াবার জোর টুকুও পাচ্ছে না মৃত্তিকা। গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না। সে সেন্টার থেকে বের হতেই ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি পরতে আরম্ভ করে। খিলখিল করে হাসে মৃত্তিকা। তার মনে হয় আজ আকাশ ও তাকে সঙ্গ দিতে চাইছে। তার কান্না মুছে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা করতে চাইছে।
মৃত্তিকা প্রবল বৃষ্টির মাঝেও বেরিয়ে আসে বাহিরে। রাস্তার ধারে প্রচুর দোকানপাট। সকলের স্থান হয়েছে দোকানের ছাউনিতে। তাদের ব্যস্ততা উপলব্ধি করতে পারে মৃত্তিকা। ধীর গতিতে এগিয়ে যায় পিচঢালা রাস্তায়। বৃষ্টির কণা দেহে এসে লাগতেই মৃত্তিকার গাল ভিজে ওঠে তপ্ত নোনা জলে। শীতল বৃষ্টিধারার ফোঁটায় তার চোখের পানি মিশে যায়। মৃত্তিকা ধীর পায়ে হাঁটতে থাকে এক মনে। ভেজা রাস্তায় তার জুতোর খসখস শব্দ শুনতে পাওয়া যায়।
আফিম আর তার বন্ধুরা রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে বসে ছিল। বেঞ্চ গুলো ফাঁকা নেই একটিও। তাদের সমাগমে মুখরিত হয়ে আছে দোকানটি। শান্ত চা খাচ্ছে। আফিম বসে গল্প করছে রূপক আর রায়ানের সাথে। সহসা তার চোখ পরে ঝুম বৃষ্টির মাঝে নুপুর পায়ে হেঁটে যাওয়া এক তরুণীর দিকে। মিষ্টি রঙের শাড়িটি দেহে লেপ্টে আছে মেয়েটির। চুল বেয়ে টপটপ করে পানি পরছে, খাড়া নাক বেয়ে পানির কণা গড়িয়ে পরছে অবিরামভাবে। প্রসাধনী হীন অত্যাধিক আবেদনময়ী মেয়েটিকে দেখে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকায় আফিম। চোখ ঝলসে যাওয়ার উপক্রম হয়। মাত্রাতিরিক্ত লাস্যময়ী নারীটির দেহের ভাঁজে চোখ পরতেই থিতিয়ে যায় সে। বিরক্তিতে কুঁচকে ফেলে চোখ। দাঁতে দাঁত পিষে ক্রোধ নিয়ে রূপককে বলে,
“- এই মেয়েটার সমস্যা কি বল তো? ওভাবে ভিজছে কেন? একটু আগেই তো চলতে পারছিল না”।
তার কথা শুনতে পেতেই রূপক চট করে তাকায় পথের দিকে। চারপাশে মানুষের সমাগম, রাস্তা পুরো ফাঁকা। ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে মেয়েটি। শাড়ির আঁচল অবহেলায় লুটিয়ে পরছে কোমরের নিচে। রূপক উঠে এসে দোকানের সামনে ঝুলিয়ে রাখা পলিথিন থেকে কেক বের করে নেয়। কেকের উপর দাঁত বসিয়ে বলে,
“- মেয়েটাকে খুব দুঃখী মনে হচ্ছে। যাই একটু সঙ্গ দিয়ে আসি”।
রূপকের কথা শেষ হতেই রায়ান চেতে ওঠে। রূপকের কাঁধ চেপে ধরে বলে,
“- শালা হারাম খোর, তোর না সুন্দরী গার্লফ্রেন্ড আছে? তুই কোন সাহসে অন্য মেয়ের দিকে তাকাস? ছিঃ! তওবা কর। দুই গালে থাপ্পড় মেরে বল আস্তাগফিরুল্লাহ, তওবা তওবা।”
রূপক হিন্দু সম্প্রদায়ের। কিন্তু বন্ধুদের সাথে সে এমনভাবে মেশে যেন সে মুসলিম। আলহামদুলিল্লাহ্, আস্তাগফিরুল্লাহ্ বলতে ও কুণ্ঠা বোধ করে না। বরং বন্ধুদের সাথে চুটিয়ে গরুর মাংসও খেয়ে ফেলে অনায়াসে। রায়ানের কথা শোনা মাত্রই সে বলে ওঠে,
“- দুইটা গার্লফ্রেন্ড থাকা দোষের নাকি”?
রায়ান বলে,
“- অবশ্যই দোষের। আমি একটা পাচ্ছি না, তুই দুটো চাইছিস? তোর উচিত না আমাকে সুযোগটা করে দেওয়া”?
রূপক বলে,
“- দুইটা দরকার। একটা চলে গেলে আরেকটা থাকবে। বুঝিস না কেন?
ওদের কথায় বিরক্ত হয়ে গেল আফিম। চট করে উঠে দাঁড়াল সে। কোনো কথা না বলেই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ছুটে গেল মৃত্তিকার পিছু পিছু। মৃত্তিকার সেসবে যদিও ধ্যান নেই। আফিমের সাদা শার্ট ভিজে উঠল সাথে সাথে। বুকের বুক-পিঠের ভাজ স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে পেছন থেকে চেঁচিয়ে ডাকল মৃত্তিকাকে,
“- এই মেয়ে”।
প্রথম ডাকেই মৃত্তিকা পিছু ঘুরল। আফিমকে এগুতে দেখে ভয় পেল কিছুটা। আচমকা আফিম কাছে এসে তার তার এক হাত টেনে ধরল। বেকুব বনে গেল মৃত্তিকা। শীতল দেহ ঝাঁকি দিয়ে উঠল পুরুষের ছোঁয়ায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আফিম তাকে একটি বন্ধ দোকানের ছাউনির নিচে দাড় করিয়ে দিল। বেশ ক্ষীপ্র কণ্ঠে বলে উঠল,
“- এত রাতে বৃষ্টিতে ভিজছো কোন দুঃখে”?
বিস্ময়ের রেশ কেটে গেছে মৃত্তিকার। সে স্বাভাবিক ভাবে তাকায় আফিমের দিকে। নরম স্বরে বলে,
“- কেবল দুঃখে থাকলেই বৃষ্টিতে ভিজতে হয়, এ কথা কে বলেছে আপনাকে”?
ভ্রু কুঁচকে ফেলে আফিম বাজখাঁই গলায় বলে,
“- একটু আগে অসুস্থ হয়ে পরলে, এখন অসময়ের বৃষ্টিতে ভিজছো”?
আলতো হাসে মৃত্তিকা। বলে,
“- অসময়ের বৃষ্টি বলে কিছু নেই। প্রকৃতির সব কিছুই ঘটে তার নিজের নিয়মে, নিজ সময়ে। অসময় যায় আমাদের”।
মৃত্তিকার দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল আফিম। মৃত্তিকা রাস্তায় চোখ রেখে দাঁড়িয়ে রইল আফিমের পাশে। কোনো কারণ ছাড়াই আফিম সিগারেট ধরাল। এই মেয়েটাকে দেখার পর থেকেই আফিমের সব এলোমেলো লাগছে। এইযে মেয়েটি হাসল, একটা যুক্তি দাড় করিয়ে দিল। এর বিপরীতে আফিমের যে অনুভূতি ব্যক্ত করা উচিত আফিম তা করছে না। বরং মেয়েটির প্রতিটি কর্মকাণ্ডে সে বিরক্ত হচ্ছে। অথচ মেয়েটির আচরণ কিংবা অবয়ব, কোনোটাই বিরক্তির কারণ হতে পারে না।
আফিম সিগারেটের ধোঁয়া ওড়াতে থাকে। তার দিকে তাকিয়ে ভেজা আঁচল মুখে চেপে ধরে মৃত্তিকা। তার অভিব্যক্তি দেখে হাসে আফিম। মৃত্তিকার আফিমকে অসহ্য ঠেকে। পা বাড়িয়ে ছাউনি থেকে সরতেই ঝাঁঝ মেশানো কণ্ঠে শাসায় ছেলেটা। বলে,
“-, বৃষ্টি থামুক। এখন যেতে পারবে না”।
পা থামে মৃত্তিকার। বলে,
“- আপনার মর্জিতে চলবো”?
আফিম কড়া কণ্ঠে বলে,
“- তোমার পেট, পিঠ, কোমর সব দেখা যাচ্ছে। এভাবে হেঁটে যেতে পারবে না”।
অবলীলায়, দ্বিধাহীনভাবে কথাটা বলে পুনরায় আঙুলের ফাঁকের সিগারেটের অংশ ঠোঁটে গুঁজে নিল আফিম। কিন্তু তার সংকোচহীন বাচনভঙ্গিতে লাজে, অপমানে নুইয়ে গেল মৃত্তিকা। তার থুতনি ঠেকল চিবুকে। আড়ষ্টতায় মিইয়ে গেল গলার স্বর। নিজের দিকে দেখল একবার। শাড়িটির রং হালকা হওয়ায় বৃষ্টির তোপে শরীরের ভাঁজ দেখা যাচ্ছে। ফিনফিনে শাড়ির ভেতরের মসৃণ ত্বক উন্মুক্ত হয়ে আসছে। অস্বস্তি আর লজ্জায় কুঁকড়ে উঠল মৃত্তিকা। আফিমের তাতে হেলদোল নেই। স্বাভাবিক ভাবেই সিগারেট ফুঁকছে সে। তাকাচ্ছে না তার দিকে। মৃত্তিকা ফিরে আসে ছাউনির নিচে। আঁচল টেনে বুক, পিঠ ঢেকে নেয় মেয়েটা। আফিম কিছুটা সময় নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে বসে,
“- সাবধানে চলা ফেরা করবে। আমার বন্ধুরা তোমাকে নিয়ে কি বলে জানো”?
মৃত্তিকা বোঝে না লোকটার কথার মানে। জিজ্ঞাসু ভঙ্গিতে বলে,
“- কি বলে”?
“- তোমাকে ওরা সঙ্গ দিতে চায়। প্রেম করতে চায় তোমার সাথে”।
ফ্যালফ্যাল করে তাকায় মৃত্তিকা। সাথে সাথে প্রত্যুত্তর করে বলে,
“- আর আপনি”?
“- আমি লোভী মানুষ নই। মেয়েদের সাথে মেশার আগ্রহ জাগে না”।
এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে চুপ করে রইল মৃত্তিকা। আফিম ফের বলে উঠল,
“- তবে তোমার মতো সুন্দরী মেয়ে দেখলে লোভ জাগে, পছন্দও হয়”।
ভিমড়ি খেয়ে পরল মৃত্তিকা। চোখ পাকিয়ে তেজ দেখিয়ে বলল,
“- ফাজিল, বেয়াদব লোক। লোভ জাগে? এ ধরণের কথা বলতে আপনার একটুও আটকাল না”?
আফিম সিগারেটের শেষের প্রান্ত ছুঁড়ে দেয় রাস্তায়। ত্যাছড়া হেসে বলে,
“-, সত্য কথার ভাত নেই আজ বুঝলাম। এখন যদি আমি মিথ্যে বলতাম? যদি বলতাম মেয়ে মানুষ আমার অত পছন্দ না, আমি তাকাই না মেয়েদের দিকে, আমি ভদ্র-সুশীল ছেলে, ছোক ছোক স্বভাব নেই আমার, বন্ধুদের মধ্যে কেবল আমিই সুপুরুষ, তাহলে ঠিকই বিশ্বাস করতে। সত্য বললাম বলেই গায়ে লেগে গেল। তাইনা?”
মৃত্তিকার রাগ হলো খুব। এমনিতেই মেজাজ খারাপ, মন খারাপ। কোনো কিছুই ভালো লাগছে না। বৃষ্টি থামারও নাম নেই। ভাড়া চাইবে তিনগুণ বেশি। এমতাবস্থায় আফিম নামক বখাটে লোকটার কথাবার্তা শুনে বিরক্তি আকাশ ছোঁয় মৃত্তিকার। বলে,
“- আপনার নামটা কে রেখেছে জানি না”।
মৃত্তিকার ঠোঁটে হালকা হাসি আর ক্রোধ। তাচ্ছিল্য করে বলে,
“- কিন্তু যিনি রেখেছেন, একদম ঠিক নাম নির্বাচন করেছেন। আপনার নাম আর আপনার কাজকর্ম, দুটোর মধ্যেই অদ্ভুত মিল আছে।”
আফিম হেসে ওঠে। সেই হাসিতে আত্মবিশ্বাসও আছে, আবার খানিকটা দুষ্টুমিও।
সে ধীরে বলে ওঠে,
“- আমি যদি নেশাদ্রব্য হই, তবে তুমিও নেশারই সামিল।”
মৃত্তিকা ভ্রু কুঁচকে তাকায়। বুঝতে না পেরে সরল কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
“- মানে?”
আফিম এবার গম্ভীর হয়। ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে কথা গুছিয়ে বলে,
“- মৃত্তিকা নামের অর্থ কী জানো? মাটি। আর এই মাটিও তো এক ধরনের নেশা। বুঝলে না? আচ্ছা, বুঝিয়ে বলি।”
আফিম একটু থামে, যেন শব্দগুলো ঠিক জায়গায় বসাতে চায়। তারপর বলে,
— “আফিমের নেশা শরীর নষ্ট করে, আর মাটির নেশা মানুষকে উন্মাদ করে তোলে। এই মাটির জন্য মানুষ কত বেআইনি কাজ করে, কত সংগ্রাম করে তার কোনো হিসেব নেই। নিজের শহরের মাটির জন্য মানুষ প্রাণ দিতেও এক মুহূর্ত দ্বিধা করে না। পৃথিবীর প্রতিটা মানুষের কাছেই তার দেশের মাটি নেশার মতো। চাইলেও কেউ এই মাটির নেশা ছাড়তে পারে না।”
মৃত্তিকা হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। আফিমের এমন যুক্তির সামনে তার সাজানো সব প্রতিবাদ মুহূর্তে এলোমেলো হয়ে যায়। তবে আফিমের কথা মোটেও যৌক্তিক মনে হয় না মৃত্তিকার। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে রাগান্বিত ভঙ্গিতে গা ঝাড়া দিয়ে বলে ওঠে,
— “হতে পারে মৃত্তিকা এক ধরণের নেশা। তবে তা ভালো দিকটাই উন্মোচন করে। কিন্তু আফিম নামের নেশাদ্রব্য—ওটা তবুও খারাপই। কোনোমতেই এর পক্ষে সাফাই গাওয়া যায় না।”
আফিম মৃত্তিকার দিকে গভীর দৃষ্টি ফেলে। প্রতিবাদী মৃত্তিকা চোখ সরিয়ে নেয়। আফিম একটু দমে ফের সাবলীল কণ্ঠে বলে,
“- ভালো নেশা দিয়ে খারাপ নেশা কাটানো যায়। তোমার ভালো দিয়ে আমার খারাপ গুলো দূর করা যায় না? চলো ট্রায় করে দেখি”।
হতভম্ব মৃত্তিকা। কথার মর্মার্থ বুঝতে পেরে হকচকিয়ে যায় সে। ভয়টাকে গিলে রুক্ষ স্বরে বলে,
“- আপনি বলেছিলেন আপনার বন্ধুরা আমাকে নিয়ে উল্টোপাল্টা ভাবে। আপনার কি মনে হয় আমি আপনার কাছে নিরাপদ? আপনার উপস্থিতি আমাকে অস্বস্তি বোধ করায় না”?
আফিম আকস্মিক ভাবে রেগে ওঠে। কোমল স্বরে কথা বলার অভ্যেস নেই ছেলেটার। তবুও মেয়ে বলে মৃত্তিকার সাথে গলা নামিয়ে কথা বলেছে। এর বিনিময়ে নারীর রুক্ষ স্বর শুনে আফিম ক্রোধে ফেটে পরে। গলা উঁচিয়ে বলে,
“- শাফায়াত আফিম মির্জা কখনো কারো তেজের তোয়াক্কা করে না। তাকে তেজ দেখাস হ্যাঁ? তোর তেজ দেখার জন্য বসে আছি? এখানে কেন এসেছি আমি? তোকে নিরাপত্তা দিতে এসেছি। আমার বা’লের ঠ্যাকা তোর সাথে তুলুতুলু করতে আসবো”।
আফিমের গলার স্বর পরিবর্তন হতেই থমকায় মৃত্তিকা। তার আশেপাশের পুরুষ গুলো ভীষণ ভালো। কেউ তার সাথে এত বাজে ভাবে কথা বলে না। বিশেষ করে অপরিচিত একটা ছেলে, যার সাথে মৃত্তিকার সেভাবে আলাপ ও হয়নি, সে এতটা রুড হবে ভাবেনি মৃত্তিকা। তীব্র লাজে সে পা বাড়ায় পথের দিকে। পিছু ফিরে তাকায় না একটি বারও। রিকশা ডেকে তাতে চড়ে বসে মৃত্তিকা। হুড তোলা রিকশা ধরে সে তির্যক চোখে চেয়ে বলে,
“- আমাদের আর কোনোদিন দেখা না হোক”।
ভেজা কাপড়েই বাড়িতে ফেরে মৃত্তিকা। ভেজা কাপড়ে থেকে তার সর্দি লেগে গেছে। বারংবার হাঁচি দিয়ে সে ঘরে ঢুকতেই দেখে ঘরের বাতি নেভানো। কারো কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে মৃত্তিকা ভয় পায়। সুইচবোর্ড চাপতেই সমস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে মৃত্তিকার বাবা-মা, ভাই, আর ইরহাম। হকচকিয়ে ওঠে মৃত্তিকা। ছোট্ট টেবিলের উপর একটি ভ্যানিলা ফ্লেভারের কেক রাখা। কেকের আশপাশে তার বাবা-মা, ভাই, ভাবি দাঁড়িয়ে আছে। মোমবাতি জ্বলছে কেকের উপর। মৃত্তিকা জিজ্ঞেস করে,
“- এসব কি”?
মৃত্তিকার বাবা এগিয়ে আসেন মেয়ের দিকে। বলেন,
“- আমার মিষ্টি মেয়ের জন্য কেক এনেছি। কেকটা কেটে ফেলো তো”।
মৃত্তিকা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয় সবার দিকে। আজ কারো জন্মদিন নয়, অ্যানিভার্সারি কিংবা বিশেষ কিছু নেই আজকে। তাহলে এই কেক কিসের জন্য?
“-, কেক কেন আব্বু”?
মৃত্তিকার মা বলে ওঠে,
“- নতুন জীবনে পা রাখছিস। কেক কেটে মিষ্টি মুখ করে শুরু করবি”।
মৃত্তিকা অবাক হয়ে বলে,
“- নতুন জীবন”?
মৃত্তিকার বাবা হাসেন। বলেন,
“- তোমার নাম মৃত্তিকা রেখেছি কেন জানো? কারণ তুমি মাটির মতোই নরম। আর নরম মাটিতে সবাই আঁচড় কাটে। আমার মেয়ের দিকেও কেউ আঁচড় কেটেছে। প্রলেপ দিয়ে সেই আঁচড় মুছে দিতে হবে না?”
মৃত্তিকার বাবা একজন শিক্ষিত মানুষ। তিনি বাহিরের কোনো খাবার খান না। এ জীবনে কখনো এ ধরণের ক্রিম দেওয়া কেক খেয়েছেন কিনা কে জানে? কোনোদিন তিনি কেক কাটেনি। আজ প্রথমবার বাবাকে এত মুক্ত মনের হতে দেখে মৃত্তিকা কেঁদে ফেলে। বাবার বুকে মুখ গুঁজে দেয় সে। তার কান্না দেখে ভেংচি কাটে জাহানারা। মৃত্তিকার ভাবি জাহানারা তাড়া দিয়ে বলে,
“-, বাবা, আমরা ঘুমবো। একটু জলদি করেন”।
মৃত্তিকার বাবা ক্ষেপে ওঠেন। বলেন,
“-, ঘুম পেলে ঘুমাও। আমাদের বাবা-মেয়ের মাঝে ঢুকতে আসবে না।”
জাহানারা রাগ দেখিয়ে বলে,
“- এত ছোট কথায় চোটপাট করেন কেন? ঘুম পেয়েছে এ কথাও বলতে পারবো না আমি”?
মৃত্তিকার মা জাহানারাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“-, দেখতেই পাচ্ছো মেয়েটার অবস্থা ভালো না। তারপরেও এ ধরণের কথা বলো কেন? তোমার মন না চাইলে তুমি থেকো না বউ।”
বউকে কেউ উচু স্বরে কথা বলবে, এটা যেন সহ্য হয় না মেহমেতের। সে গম্ভীর স্বরে বলে,
“-, সামান্য একটা কথা নিয়ে তোমরা এমন করো কেন জাহানারার সাথে?”
মৃত্তিকা থামায় সকলকে। মৃত্তিকার মা বারবার কাপড় বদলে আসতে বললেও মৃত্তিকা ভেজা কাপড়েই কেক থাকে। কেকের উপরে লেখা “মুভ অন মৃত্তিকা”। মৃত্তিকা আনন্দের সাথে কেক কাটে। বাড়ির সবাইকে এক এক করে কেকের টুকরো খাইয়ে দেয় সে। মৃত্তিকার বাবা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
“- পিছু ফিরে তাকাবে না। যা হয়েছে তা নিয়ে ভাববে না। জেনে রাখো, যা হয় ভালোর জন্যই”।
বাজারের গলিতে ঢুকতেই মৃত্তিকার চোখ যায় একটা সুন্দর টিয়ে পাখির দিকে। পাখিটা কি সুন্দর করে কথা বলছে। মৃত্তিকা তার বাবার সাথে বাজারে এসেছে। আজ বাজারে মানুষের ভিড় অনেক বেশি। পা রাখার জায়গাটুকুও নেই। বাজারের ব্যাগটা মৃত্তিকার বাবার হাতে রাখা। তিনি মাছের বাজারে গিয়ে দরদাম করছেন। মৃত্তিকাকে ঘামতে দেখে মৃত্তিকার বাবা আতিকুর বললেন,
“- তুমি ভিড়ভাট্টায় থেকো না। খোলামেলা জায়গায় গিয়ে দাঁড়াও। আমি বাজার করে আসছি”।
মৃত্তিকা বাঁধা দেয় না। ওড়না মাথায় ভালোমতো টেনে দিয়ে খোলামেলা একটি জায়গায় এসে দাঁড়ায়। আশপাশের সব কিছু সূক্ষ্ম নজরে দেখে মৃত্তিকা। তার বাবা বলেছিল কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফিরবে। কিন্তু আধঘন্টা পার হবারও পরও তাকে ফিরতে না দেখে মৃত্তিকা এগিয়ে গিয়ে পাখির খাঁচার সামনে দাঁড়ায়। টিয়ে পাখিটা খুব সুন্দর। কথা বলে একদম স্পষ্টভাবে। মৃত্তিকা তার বাবার সাথে প্রায়ই বাজারে আসে। তার বাবার কেনা সবজি তার পছন্দ হয় না, টাটকা মনে হয় না। এজন্য নিজেই বাবার সাথে করে আসে মৃত্তিকা। ব্যাগ বয়ে নেয়ার জন্যই মূলত সে বাবার সঙ্গ দেয়।
বাজারের সামনের রাস্তায় কয়েকটি বাইক এসে থামে। এতটাই ক্ষীপ্র গতিতে বাইকের মালিক আসে আসে যে ধুলোয় ভরে ওঠে চারপাশ। অনেকগুলো ছেলে দৌড়ে ঢোকে বাজারে। তারা যেন তাণ্ডব করতে এসেছে। তাদের আচার-আচরণ স্বাভাবিক নয়। ভেতরে ঢুকেই ওরা একেক করে সবজির দোকানীদের কাছে গিয়ে চেঁচিয়ে বলে ওঠে,
“-, এ মাসের চাঁদা যারা দেয় নাই, তারা আজ না দিলে দোকান উঠাই দিমু”।
তাদের চিৎকার-চেঁচামেচিতে ভয় পায় বাচ্চারা। মহিলারা দ্রুত চলে আসে বাজার না করেই। চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় ছেলেগুলো কয়েকটা দোকানীর বাজার-সদাই তুলে ফেলে দেয় মাটিতে। মৃত্তিকা হতভম্ব। এতগুলো সবজিকে নিচে গড়াগড়ি খেতে দেখে বিস্মিত নজরে তাকায় ছেলেগুলোর দিকে। বাজারের ভিতর গোলমাল শুরু হয়ে যায়। সামান্য কিছু টাকা কম দেওয়ায় এক দোকানীর উপর হামলা করে ছেলেগুলো। বেচারা ব্যবসায়ী কেঁদে কুটে একাকার। কষ্ট করে টেনে আনা সবজির দিকে তাকিয়ে তার মাথায় হাত উঠে গেছে। মৃত্তিকা তার বাবাকে খোঁজে। এত ঝামেলায় বাবা কোথায় গেল? মনটা মানে না তার। এগিয়ে যায় বাজারের ভিতরে। তন্ন তন্ন করে এদিক ওদিক খোঁজে আতিকুর রহমানকে। গোলমাল খুব বড় আকার ধারণ করেছে। চারদিকে হইচই। বেশ কয়েকটি দোকানের সরঞ্জাম ফেলে দিয়েছে ছেলেগুলো। মৃত্তিকা এদিক ওদিক ঘুরে অবশেষে তার বাবাকে পায়। দেখে তার বাবার সাথে বখাটে ছেলেগুলো কি নিয়ে যেন তর্ক করছে। তীব্র চেঁচামিচি আসছে ওদিক থেকে। মৃত্তিকা এগিয়ে যায় বাবার কাছে। বাবার হাতটা মুঠোয় চেপে আতঙ্কিত স্বরে বলে,
“- কি হয়েছে আব্বু”?
আতিকুর রহমান মেয়েকে দেখে বলেন,
“- তুমি এলে কেন? যাও বাইরে যাও”।
মৃত্তিকা ছেলেগুলোর দিকে তাকায়। ওদের বড় হিংস্র দেখাচ্ছে। মৃত্তিকা বাবার হাতটা জড়িয়ে ধরে ছোট্ট বাচ্চাদের মতো। বলে,
“- তুমি চলো আমার সাথে।”
আতিকুর রহমান বলেন,
“- দেখো না মা, ওই ছোট ছেলেটার সব সবজি ফেলে দিয়েছে। আমি ওই ফেলে রাখা সবজি কিনতে এসেছি, এতেও ওদের সমস্যা”।
তার কথা শেষ হতেই একটি ছেলে ব্যাগ টেনে নেয় আতিকুর রহমানের হাত থেকে। টেনে হিঁচড়ে নেওয়ায় তিনি ব্যথা পান হাতে। মৃত্তিকা ব্যাগটা নিজ দিকে টেনে ধরে বলে,
“- আমাদের ব্যাগ টানছেন কেন? এতে আমাদের বাজার আছে”।
একটি ছেলে বলে ওঠে,
“- উনার পুটকিতে বেশি জ্বলে। মাটির সদাই নিতে আসে, এত সাহস। পুটকির জ্বলন কমাই দিমু”।
হাসতে থাকে ছেলেগুলো। তাদের বিশ্রী, নোংরা ভাষা শুনে গা গুলিয়ে ওঠে মৃত্তিকার। বিব্রত হন আতিকুর রহমান। বাজারের সবাই দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে। মৃত্তিকার খুব রাগ হয়। ফোন উঠিয়ে বলে,
“-, আর একটাও বাজে কথা বললে পুলিশকে কল করবো আমি। অসভ্যতার একটা সীমা থাকে।”
একটি ছেলে আচমকা মৃত্তিকার ফোন কেড়ে নেয়। মৃত্তিকা চেতে ওঠে। বলে,
“- আমার ফোন দিন”।
ছেলেটি এগিয়ে এসে বলে,
“- না দিলে”?
“- আমি আফিম মির্জাকে বলবো? বলবো আপনি মেয়েদের উত্ত্যক্ত করছেন”?
উপস্থিত বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে কথাটা বলে ওঠে মৃত্তিকা। বুঝতে পারে কথাটা কাজে দিয়েছে। আফিমের নাম শোনামাত্র ছেলেগুলো নড়েচড়ে দাঁড়ায়। একটি ছেলে নত কণ্ঠে বলে,
“- আফিম ভাই কি হয় আপনার”?
মৃত্তিকা কি বলবে ভাবতে থাকে। পরক্ষণেই একটু ভেবে ছেলেটির কানের কাছে মুখ ঠেকিয়ে বলে,
“- আমি আফিম মির্জার হবু বউ”।
কথাটা শুনেই ছেলেগুলো ব্যাগ আর ফোন মৃত্তিকার বাবার দিকে এগিয়ে দেয়। হাত জোর করে দাঁড়ায় সবাই। খুব ভুল করে ফেলেছে এমন করে বলে,
“- ক্ষমা করে দিয়েন ভাবি। আমরা বুঝি নাই। আর কোনদিন আপনারে কেউ বিরক্ত করবে না”।
চলবে?
[ কাল বড় একটা পর্ব দিবো। আজ এটুকুই।]
Share On:
TAGS: ওরা মনের গোপন চেনে না, বৃষ্টি শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৭+৮
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৯
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২
-
ওরা মনের গোপন চেনেনা পর্ব ৬
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১০
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১১
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৫
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১
-
ওরা মনের গোপন চেনে না গল্পের লিংক