ওরা মনের গোপন চেনে না
পর্ব সংখ্যা [২]
আকাশে সূর্যের তাপ প্রখর। শাই শাই করে ছুটে চলেছে যানবাহন। মৃত্তিকার গা কাঁপছে। হাঁটতে গিয়ে বারবার থামছে সে। ভেতরের যন্ত্রণা গুলো উগড়ে দিতে ইচ্ছে করছে। জীবন এত নিষ্ঠুর কেন? কেন এটুকু জীবনকে এত বেদনাদায়ক হতে হবে? ইয়াসিনের সাথে মৃত্তিকার সম্পর্ক দু বছর ধরে। তাদের প্রেমটা হয়েছিল অস্বাভাবিক ভাবে। কুয়াশার প্রকোপে তখন রাস্তাঘাট ঘোলাটে, ঝাপসা। ডিসেম্বরের শুরুর দিকে শীতটা চেপে ধরেছিল। মৃত্তিকা ট্রেনে চড়ে খালামনির বাড়ি শরীয়তপুরে যাচ্ছিল। প্রথম কামরায় বসেছিল মেয়েটা। একই ট্রেনে বন্ধুদের সাথে দিনাজপুর যাচ্ছিল ইয়াসিন। তার সিট পরেছিল মৃত্তিকার পাশে। ইয়াসিনের সব বন্ধুরা একসাথে বসলেও তাকে বসতে হয়েছিল অপরিচিত এক রমনীর সাথে। বন্ধুদের ছেড়ে ইয়াসিন বসেনি মৃত্তিকার সাথে৷ পেছনের কামরায় বন্ধুদের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে আড্ডা দিতে দিতে যাচ্ছিল সে। মৃত্তিকার পরণে ছিল শাল। শীতে জুবুথুবু হয়ে বসে সমরেশ মজুমদারের একটি বই পড়ছিল সে। আশপাশের কোনো কিছুতেই তার আগ্রহ নেই। তার সমস্ত মনোযোগ বইয়ের পাতায় বন্দী। সহসা ইয়াসিন এগিয়ে আসে তার দ্বারে। অতিশয় ভদ্রলোক দেখাচ্ছিল তাকে। পরনের পোশাকআশাক ছিল চাকচিক্যময়। মৃত্তিকার কাছে এসে ইয়াসিন জিজ্ঞেস করে,
“- আপনার কাছে এক্সট্রা শীতের পোশাক হবে”?
বই পড়ায় মনোযোগী মৃত্তিকা চমকে ওঠে পুরুষালি কণ্ঠে। গভীর নয়নে দেখে সম্মুখের ছেলেটিকে। মৃদু স্বরে বলে,
“- কেন বলুন তো”?
মৃত্তিকা খেয়াল করে অপরিচিত ছেলেটির গায়ে শীতের উষ্ণ, আরামদায়ক পোশাক নেই। একটি সাদাকালো পাতলা চেক শার্ট গায়ে জড়িয়ে আছে সে। শীতে কাঁপছে কিছুটা। মৃত্তিকা কিছুটা গম্ভীর হয়ে ফের বলে ওঠে,
“- শীতকালে জার্নি করছেন, অথচ শীতের পোশাক ক্যারি করছেন না?”
ইয়াসিন আলতো হাসে। গভীর চোখে মৃত্তিকার রাগান্বিত মুখশ্রী পরখ করে ছেলেটা। সহজ কণ্ঠে বলে,,
“- আমি জ্যাকেট এনেছিলাম। ওইযে পেছনের কামরার ছেলেটাকে দেখছেন, ওর পরনের জ্যাকেটটা আমার”।
ইয়াসিন আঙুল উঁচিয়ে কিছুটা দূরে বসে থাকা আট-নয় বছরের একটি ছেলেকে দেখায়। মৃত্তিকার ললাটে ভাঁজের দেখা মেলে। সে কৌতুহলী হয়ে দেখে ছোট ছেলেটিকে। দূরের ছেলেটির গায়ে থাকা জ্যাকেটটি তার আকৃতির তুলনায় বেশ বড়। ছেলেটার হাঁটু ঢেকে গেছে জ্যাকেটে। বোঝা যাচ্ছে পোশাকটি তার নয়। মৃত্তিকাকে ওদিকে তাকাতে দেখে ইয়াসিন বলে,
“- ওই ছেলেটা তার সোয়েটার ব্যাগে ভরতে ভুলে গিয়েছে। তাই ওর মা ওকে খুব গালমন্দ করছে। আমার ভালো লাগেনি, আমি আমার জ্যাকেটটা ওকে দিয়ে দিয়েছি”।
মৃত্তিকা বিস্মিত হয় বেশ। সচক্ষে প্রথমবার মানবতার ফেরিওয়ালাকে দেখে সে। এত এত অমানবিক মানুষের ভিড়ে বিবেকবান মানুষটাকে দেখে শিথিল হয় মৃত্তিকার আঁখি। উঠে দাঁড়িয়ে ট্রেনের উপরের লাগেজ র্যাক থেকে টেনে নামায় নিজের ব্যাগটি। ব্যাগ হাতড়ে একটি মখমলি কাপড়ের মেয়েলী সোয়েটার বের করে সে। গায়ে জড়ানো শালটা খুলে ইয়াসিনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
“- এটা নিতে পারেন”।
মৃত্তিকা ভেবেছিল ছেলেটি তার গায়ের শালটা নিতে অস্বস্তি বোধ করবে। হয়তো অগ্রাহ্য করে ফিরিয়ে দেবে শালটা। কিন্তু ইয়াসিন সেসব কিছুই করেনি। বরং সে হাসিমুখে শালটি গ্রহণ করে। পিঠের দিক থেকে পেঁচিয়ে বুকে টেনে নেয় সুঘ্রাণযুক্ত শাল। পরমুহূর্তেই ইয়াসিন বন্ধুদের বিদায় জানিয়ে এসে বসে মৃত্তিকার পাশে। ফ্ল্যাক্স থেকে চা ঢেলে এক কাপ চা মৃত্তিকার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
“- এটা খান, ভালো লাগবে”।
মৃত্তিকার মনে হয় ছেলেটা ভীষণ আন্তরিক এবং সাদামাটা। নিজেকে জাহির করার মতো মানুষ সে নয়। উপকারের দায় হিসেবে উপকার করেই বা কজন? মৃত্তিকা হাত বাড়িয়ে নেয় চায়ের কাপটি। একসাথে চুমুক দেয় নিজ নিজ কাপে। এরপর আস্তে ধীরে তাদের মাঝে স্বাভাবিক কথাবার্তা চলে আসে। মৃত্তিকা জানতে পারে লোকটির নাম ইয়াসিন খন্দকার। জিওগ্রাফি এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সাইন্স নিয়ে অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়াশোনা করছে। এক বন্ধুর বিয়ের দাওয়াত খেতে দিনাজপুরে যাচ্ছে সকলে মিলে। দুদিন পরেই ঢাকায় ব্যাক করবে। মৃত্তিকা নিজেও জানায় সে এইচএসসি দিয়েছে। খালামনির সাথে দেখা করতে যাচ্ছে শরীয়তপুরে। সপ্তাহ খানেক ওখানে থাকবে।
তাদের মাঝে বেশি ঘনিষ্ঠ কথাবার্তা হয়নি সেদিন। নিজেদের জীবনচক্র নিয়েই খোলামেলা কথা হয়েছিল৷ মৃত্তিকা ঘুমে ঢলে পরে কথার মাঝেই। ভোর রাতে গন্তব্যে পৌঁছাতেই তাকে ডেকে তোলে ইয়াসিন। ঘুমের মাঝেই মৃত্তিকা বুঝে ফেলে সামনের ছেলেটি তাকে মুগ্ধ হয়ে দেখছ। তার আচরণে দায়িত্ববোধ প্রগাঢ় হয়ে ধরা দিচ্ছে। গন্তব্যে পৌঁছানো মাত্র ইয়াসিন নিজ তাগিদে মৃত্তিকার ব্যাগ বের করে তার হাতে গুঁজে দেয়। তখনো অব্দি মৃত্তিকা জানতো না ইয়াসিনের সাথে তার হৃদয় বিনিময় হবে, সে জানতো না সাদামাটা গোছের আন্তরিক লোকটার সাথে পুনরায় তার দেখা মিলবে ঢাকা শহরে। পড়াশোনায় মৃত্তিকা বরাবরই ভালো। এইচএসসি তে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায় সে। তখন থেকেই টিউশনি খুঁজতে থাকে মৃত্তিকা। সৌভাগ্যক্রমে দুটো টিউশন পেয়েও যায়। লিফলেট দেখে আরো একটি বাড়িতে পড়ানোর কথাবার্তা বলতে গিয়ে তার সাক্ষাৎ হয় ইয়াসিনের সাথে। মৃত্তিকা চমকায় ভীষণ। দুজনের কেউই হয়তো ভাবতে পারেনি আবারো দেখা হবে তাদের। ইয়াসিন তাকে দেখে যে খুব খুশি হয় তা তার অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট বোঝা যায়। নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ইয়াসিনের ছোট বোন তানভিকে পড়ানোর দায়িত্ব পেয়ে যায় মৃত্তিকা। সপ্তাহে তিনদিন ইয়াসিনের বাড়িতে যেতে হয় তার। সে সুবাদেই ইয়াসিনের সাথে দেখা হয়ে যায় বারবার। ইয়াসিন নিজ আগ্রহেই এগিয়ে এসে গল্প করে, মৃত্তিকাকে রিকশায় তুলে দেয়, কখনো আবার বাড়ির সামনে এসে মৃত্তিকাকে রিসিভ করে। ইয়াসিন বড্ড সহজ-সরল ধারার মানুষ, হাসি-ঠাট্টা করতে ভালোবাসে। পাশাপাশি দায়িত্ববান একটি ছেলে, বাবা-মার বাধ্য যাকে বলে। এক দফায় ইয়াসিনকে ভালোবেসে ফেলা যায়। কিন্তু মৃত্তিকা তাকে ভালোবাসতে খানিকটা সময় নিয়েছিল। খুব ভালো করে পরখ করেছিল ইয়াসিনকে। তার সাথে কাটানো মুহুর্ত গুলো খুব সূক্ষ্ম নজরে দেখে, ভেবেচিন্তে তবেই পা বাড়িয়েছিল নতুন সম্পর্কে। কিন্তু অতিরিক্ত ভালো মানুষটা হুট করে কিভাবে বদলে গেল?মানুষ বদলায় একথা সত্য, তাই বলে এত দ্রুত, এত নিষ্ঠুর ভাবে কেউ বদলে যায়? পুরোনো স্মৃতি, আবেগ, মোহ ভুলে কেউ নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে যায় কি করে? তাদের একটুও খারাপ লাগে না? বিবেকে বাঁধা দেয় না?
অটোতে করে বাড়ি ফেরে মৃত্তিকা। দুদিনে চোখ দেবে গেছে মেয়েটার, ফ্যাকাশে হয়ে গেছে মুখ। মৃত্তিকাকে দেখেই মৃত্তিকার ভাগ্নে ইরহাম এগিয়ে আসে তার দিকে। মৃত্তিকা আগলে নেয় তাকে। কিছুক্ষণ বাচ্চাটার সাথে সময় কাটিয়ে ঘরে ফেরে সে। মৃত্তিকার বড় ভাই মেহমেত একটি কর্পোরেট কোম্পানিতে ভালো পদে চাকরি করে। তার ছোট্ট ছেলেটার বয়স চারের কাছাকাছি। মেহমেতের স্ত্রী জাহানারা এখব ছয় মাসের গর্ভবতী। ছোট্ট ইরফানকে সামলানো তো দূরের কথা, রান্নাঘরের আগুনের কাছেও সে যায় না। মেহমেতের কড়া হুকুম, বউ যেন তার কোনো কাজ না করে। অগত্যা বাড়ির সব কাজ করতে হয় মৃত্তিকাকে। মৃত্তিকার মা হাঁপানির রোগী। বেশিক্ষণ কোনো কাজ করতে পারেন না তিনি। ঔষধ খেয়েও অবস্থার কোনো উন্নতি নেই, বয়সটাও বেড়েছে। মৃত্তিকার বাবার মুদির দোকান তেমন চলে না। বাড়ির প্রতিটি সদস্যর দায়ভার এসে পরেছে মেহমেতের উপর। মৃত্তিকার ভাবি মৃত্তিকাকে খুব একটা ভালো চোখে দেখে না। তাকে সহ্য করতে না পারার মতো কোনো কারণ খুঁজে পায় না মৃত্তিকা। যুগের পর যুগ ধরে বয়ে চলা বৈশিষ্ট্যের রেশেই হয়তো মৃত্তিকাকে পছন্দ করে না জাহানারা। হয় ভাবিরা ননদকে দেখতে পারে না, নয়তো ননদ ভাবিকে সমীহ করে না৷ দুজনের একজন ভিন্ন মানসিকতার হয় বলেই এ ধরণের মানসিক সমস্যা বেড়ে চলেছে। এছাড়া মৃত্তিকার আয়ই বা কতটুকু? ও টাকায় নিজেরই খাওয়া-পরা হয় না ঠিক মতো। বাবা-মাকে আর্থিক দিক থেকে সহযোগীতা করবে কি করে? দিনের পর দিন স্বামী তার বোনের পেছনে টাকা ওড়াচ্ছে, এটাই হয়তো মেনে নিতে পারে না জাহানারা। সরাসরি কিছু বলে না সে, তবে কথার টোনে খোঁটা করতে ছাড়ে না। কিন্তু কিছুদিন ধরে তার আচরণ পরিবর্তন লক্ষ্য করেছে মৃত্তিকা। এখন আর আগের মতো খাটায় না ওকে, খোঁটা দিয়ে হাসি-মজাও করে না। এর কারণটা যদিও মৃত্তিকা ধরে ফেলেছে। একমাস আগে ইয়াসিন ও তার পরিবার মৃত্তিকার বাড়িতে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। মৃত্তিকার টেস্ট পরীক্ষা শেষ হলেই বিয়ে নিয়ে কথা উঠবে দু পরিবারে। মৃত্তিকার প্রবল বিশ্বাস সে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে বলেই জাহানারা বদলে গেছে। যখন জাহানারা জানবে মৃত্তিকা ইয়াসিনকে বিয়ে করছে না, তখন আবার সে আগের রূপে ফিরে আসবে নিশ্চিত। মৃত্তিকা ঝামেলা এড়িয়ে চলতেই পছন্দ করে। তার বাবা-মা ছেলের বউয়ের সাথে রাগারাগি করবে, সম্পর্ক নষ্ট হবে এসব মৃত্তিকা চায় না। তাই কোনোরকম প্রতিবাদ করে না সে। নিজের কাজ নিজেই করে।
মৃত্তিকা রান্না বসায় চুলায়। দুদিন ধরে ফোন বন্ধ করে রেখেছে সে। ইয়াসিন ফোন করে যাচ্ছে বারবার। কিছুতেই ফোন অন করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে মৃত্তিকা। ভুল করেও ইয়াসিনের দিকে তাকানোর ইচ্ছ তার নেই। বাবা-মাকে এ কথা সে বলবেই বা কোন মুখে? একসময় ইয়াসিনের জন্য পাগল ছিল সে। ইয়াসিন যেভাবে পাগলামী করতো, সেও ঠিক সেভাবে তাকে সমর্থন করতো। ইয়াসিন বড় ঘরের ছেলে। প্রথমে মৃত্তিকার মা এ সম্পর্ক মানতে চায়নি। মৃত্তিকার পাগলামি, জেদ আর ভালোবাসার ধ্বনিতে হার মেনে তারা বিয়েটায় রাজি হয়েছে। এখন যদি সে বলে ইয়াসিন বদলে গেছে, তাকে রুবির সাথে চুম্বনরত অবস্থায় ধরে ফেলেছে মৃত্তিকা, কি হবে তখন? এ কথা তার মর্যাদাকে কতটুকু ক্ষুন্ন করবে? আদৌ বিষয়টা ভালো ভাবে নেবে কিনা কে জানে?
মৃত্তিকার মা মনোয়ারা ইরহামের সাথে খেলাধুলা করে। এ সুযোগে রান্নাবান্না শেষ করে ফেলে মৃত্তিকা। নইলে ছেলেটা ফুপিকে ছাড়তেই চায় না, গায়ে গা ঘেঁষে বসে থাকে। ইয়াসিনের বাড়িতে আজ পড়াতে যাবার কথা। তানভি কলেজে উঠেছে, গত দু বছর ধরে তাকে পড়িয়ে আসছে মৃত্তিকা। ইয়াসিনের মা ফোন করে জানতে চেয়েছেন আজ মৃত্তিকা যাবে কিনা। মৃত্তিকা হ্যাঁ বলেছে। অর্থাৎ শেষবারের মতো ও বাসায় তাকে পা রাখতে হবে তাকে। সাটামাটা থ্রি-পিস পরে মাথায় ওড়না টেনে মৃত্তিকা বেরিয়ে আসে বাইরে। এ এলাকার সকলে তাকে চেনে। মৃত্তিকার জন্ম, বেড়ে ওঠা সব এখানেই। এলাকার সবচাইতে সুন্দরী, নম্র ভদ্র মেয়ে হিসেবে তাকে আখ্যায়িত করা হয়। মৃত্তিকা বেরিয়ে স্ট্যান্ডের দিকে এগোতে থাকে। পাঁচ মিনিট হাঁটলেই অটো স্ট্যান্ড। সেখান থেকে অটো নিয়ে যাবে ইয়াসিনদের বাড়িতে। মৃত্তিকা দ্রুত হাঁটতে থাকে। সহসা সে থমকে তাকায় সম্মুখে। রাস্তার পাশে বাইক থামিয়ে কয়েকটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকটা ছেলেকে একসাথে দেখলে মৃত্তিকার ভয় হয়। মনে হয় ওরা খুব খারাপ নজরে দেখবে ওকে, হাসাহাসি করবে, কটু কথাও বলবে।
দ্বিধা আর সংকোচে আড়ষ্ট হয়ে মৃত্তিকা এগিয়ে যায়। যা ভেবেছে ঠিক তাই, তাকে দেখে ছেলেগুলো শিস বাজিয়ে ওঠে, বিশ্রী গান গেয়ে ওঠে। পা থেমে যায় মৃত্তিকার। কান ঝা ঝা করে ওঠে। হাঁটার গতি বাড়ে তার। তা দেখে ছেলেগুলো বিশ্রী হাসে। একটি ছেলে আচমকা পিছন থেকে টেনে ধরে মৃত্তিকার ওড়নার এক প্রান্ত। স্তব্ধ হয়ে যায় মৃত্তিকা। মেরুদণ্ড বেঁকে আসে মেয়েটার। ভয়কে আড়াল করে সে দৃঢ় কণ্ঠে বলে ওঠে,
“- ওড়না ধরছেন কেন? ছাড়ুন”।
ছেলেটি হাসে। তার ঠোঁট বড্ড কালো। সিগারেটের দুর্গন্ধ পুরো শরীর জুড়ে। গা গুলিয়ে আসে মৃত্তিকার। ফের বলে ওঠে,
“- ছাড়ুন, নইলে আমি পুলিশ ডাকবো”।
অন্য একটি ছেলে তেজ দেখিয়ে বলে ওঠে,
“- ডাক দেখি কোন বাপরে ডাকবি?”
মৃত্তিকা ভয়ে সেঁটে যায়। এ ছেলে গুলোকে আগে কখনো এ পাড়ায় দেখেনি সে। এলাকায় হয়তো তারা নতুন। নতুন হয়েও এমন অভদ্রতা করার সাহস কিভাবে পায় বুঝতে পারে না মৃত্তিকা। শরীর জ্বলে ওঠে মেয়েটার। সে কিছু না ভেবেই রাগের বশে কষিয়ে চড় মারে ওড়না টেনে ধরা ছেলেটির গালে। বিস্ময়ে হা হয়ে যায় সকলে। হিংস্র হয়ে মৃত্তিকার দিকে বাকি দুজন ছেলে এগিয়ে আসে। মৃত্তিকা পিছিয়ে যায় দু কদম। দৌঁড়ানোর জন্য পা বাড়াতেই গতকালকের ছেলেটিকে দেখতে পায়। নাম যেন কি? আফিম। মৃত্তিকা ছলছল চোখে আফিমের দিকে তাকায়। ছেলেটার মাথায় ক্যাপ। হাতে সিগারেটের প্যাকেট, গলায় বখাটেদের মতো চেইন ঝোলানো। তবুও ছেলেটা সুন্দর, মাত্রাতিরিক্ত সুন্দর। সবচে আকর্ষণীয় হলো তার চোখ। চোখ ধাঁধিয়ে দেয় মাঝে মাঝে। তার পরনের শার্টটি কালো রঙের। ফর্সা গায়ে মানিয়েছে বেশ।
আফিমকে দেখেই ছেলেটা বলে ওঠে,
“- এই মেয়ে আমার গালে চড় দিয়েছে। ভাবতে পারছিস আফিম? কত বড় সাহস ওর”।
আফিম ভ্রু কুঁচকে ফেলে। পরখ করে মৃত্তিকাকে। বাইকের কাছে এসে হেলান দিয়ে বসে। মৃত্তিকার নড়চড় বন্ধ হয়ে যায়। ভয়ে আঁটসাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। পা জোড়া অবশ হয়ে আসে মেয়েটার। আফিম তেজ মেশানো কণ্ঠে শুধোয়,
“- নাম কি”?
মৃত্তিকা মিইয়ে আসা কণ্ঠে বলে,
“- মৃত্তিকা”।
“- পড়াশোনা করিস কোথায়”?
মৃত্তিকা নিচ থেকে মাথা তোলে। আফিম গতকাল তাকে ভার্সিটিতে ছেড়ে দিয়েছিল, অথচ আজ কথায় বুঝিয়ে দিচ্ছে সে মৃত্তিকাকে তেমন চেনেই না। আফিমের কথার ধরণও আজ ভিন্ন শোনাচ্ছে। সেদিন ওকে আফিম তুমি বলে সম্বোধন করেছিল, কণ্ঠ নরম ছিল। এখন তার কণ্ঠ ভীষণ রূঢ় শোনাচ্ছে। মৃত্তিকা ইতিমধ্যে বুঝে গিয়েছে আফিম ওদেরই একজন। বখাটে, মাস্তান ছেলে। গতদিন তার সাথে যারা ছিল, আজ তারা নেই। আজ অন্যদের সাথে বসে আছে আফিম। ওদের মতোই আফিম মাস্তানি করে বেড়ায়, বিরক্ত করে মানুষদের। প্রথম দেখায় তাকে যতটা ভালো মনে হয়েছিল, সে ততটা ভালো নয়। বরং সে উগ্র আর বখাটে। চরম অভদ্র আর অসভ্য গোছের। তার এই সম্বোধনে মুখ কুঁচকে ফেলে মৃত্তিকা। কটমটে হয়ে বলে,
“- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে”।
“- কোন ক্লাস”?
“- অনার্স থার্ড ইয়ার”।
“- কোন ডিপার্টমেন্ট”?
“- রাষ্ট্রবিজ্ঞান”।
আফিম একটু থামে৷ ঘেমে একাকার হওয়া মৃত্তিকার ফ্যাকাশে মুখ খানায় নজর বুলায়। তার গাঢ় দৃষ্টিতে জমে যায় মৃত্তিকা। আড়ষ্টতায় নুইয়ে যায় মেয়েটা। আফিমের কি হয় কে জানে? মেয়েটাকে এত সংকোচ, এত কাচুমাচু ভঙ্গিতে দেখে পৈশাচিক আনন্দ পায় সে। ভারিক্কি স্বরে চড় খাওয়া ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে মৃত্তিকাকে বলে,
“- ওকে চড় মেরেছিস”?
ভয় গাঢ় হয় মৃত্তিকার। নিঃশ্বাস আটকে রেখে উপর-নিচ মাথা নাড়ে সে। আফিম রেগে বলে,
“- কেন মেরেছিস”?
“- আমার ওড়না ধরে টেনেছে ও”।
“- সুন্দরী মেয়ে দেখলে ওড়না ধরে টানবে না তো কি ধরে টানবে? মেয়েরা তো ওড়নাই পরে”।
ভ্যাবাচ্যাকা খায় মৃত্তিকা। গাল জোড়া জ্বলে ওঠে আফিমের ভাবনা চিন্তা দেখে। একটু সাহস জুগিয়ে বলে,
“- ওড়না মেয়েদের শালীনতা বজায় রাখে। ছেলে হয়ে মেয়েদের দিকে হাত বাড়াবে কেন? অন্যের শালীনতায় হস্তক্ষেপ করবে কেন”?
আফিম ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলে,
“- ছেলে হয়ে মেয়েদের দিকে হাত বাড়াবে না তো ছেলেদের দিকে হাত বাড়াবে? ওরা কি গে নাকি? ছ্যা! বোকা মেয়ে! পড়াশোনা করেও দেখছি কিছুই শিখিসনি”।
“- পাঠ্যপুস্তকে অন্যকে অসম্মান করার শিক্ষা দেওয়া হয় না”।
থতমত খায় আফিম। চড় খেয়ে মুখ ফুলিয়ে থাকা ছেলেটিকে বলে,
“- শিস বাজাবি, গান গাইবি ঠিক আছে, ওড়না টানলি কেন”?
বেচারা থতমত খেয়ে যায় আফিমের কণ্ঠে। আফিম নিজেও তো এমন। মেয়েদের দেখলে সেও এমন করেই তাকায়, শিস বাজায়, গান গায়। তবে ছেলেটা কোনো মেয়ের গায়ে হাত দেয় না কখনো এ কথা সত্য। আফিম ওদের তেমন বাঁধা দেয়না, কোনোকিছুতে নিষেধ করে না। দলের লিডার হয়েও সে খুব আন্তরিক। আজ কিছুটা কঠোর হওয়ায় ছেলেটা চমকে ওঠে। মন খারাপ করে নিতান্তই অনিচ্ছায় বলে,
“- আর হবে না”।
আফিম মৃত্তিকার দিকে চেয়ে বলে,
“- নে, আজ থেকে শুধু শিস বাজাবে, টিজ করবে। ওড়না টানবে না”।
বিরক্তিতে ছেয়ে যায় মৃত্তিকার হৃদয়। খুব কঠোর হতে ইচ্ছে করে, কয়েকটা কথা শোনাতে গিয়েও থেমে যায় সে। নিচু কণ্ঠে বলে,
“- গানই বা গাইবে কেন? মেয়েদের দেখলে এমন অসভ্যতা না করলে হয় না”?
আফিম বিরক্তিতে উঠে দাঁড়ায়। মুখ দিয়ে “চ” সূচক শব্দ করে বিরক্তি প্রকাশ করে। মৃত্তিকার কাছে এগিয়ে এসে বলে,
“- মুখ আছে গান গাবে, ঠোঁট আছে তাই শিস বাজাবে। তোর সমস্যা কি? বেশি লাই দিচ্ছি তাই তেজ দেখাচ্ছিস”?
ঘাবড়ে যায় মৃত্তিকা। কোনরকম কথা না বলেই পা বাড়িয়ে চলে যেতে চায়। আফিম রেগে ওঠে তৎক্ষনাৎ। বলে,
“- এই মেয়ে, কথার উত্তর দিয়ে যা”।
মৃত্তিকা পিছু ফিরে বলে,
“- আপনার বাড়িতে মা বোন নেই? তাদের জিজ্ঞেস করবেন কেন মেয়েদের দেখে গান গাওয়া, শিস বাজিয়ে টিজ করা অপরাধ”।
আফিম ফিক করে হেসে ফেলে। হাসলে তার গাঢ়, অন্তর্ভেদী চোখ গুলোও সমান তালে হেসে ওঠে। চমৎকার গড়ন ছেলেটার। সুঠাম, পেটানো দেহ, পেশিবহুল ইস্পাত-দৃঢ় শরীর। এরকম সুন্দর মানুষের মানসিকতা এমন হয়?
আফিম হাসতে হাসতে হেলে পরে বাইকের দিকে। হাসতে হাসতেই বলে,
“- আমার মা, বোন, বউ কিছুই নেই। বাবার একমাত্র ছেলে আমি। আর আমার মা? আমার মা অন্য এক ছেলের সাথে পালিয়ে গেছে বহু বছর আগে। তুই আমার বউ হবি? চল তোকে বিয়ে করে ঘরের বউ করে নিয়ে যাই। বাইরের কাউকে আর টিজ করবো না প্রমিস”।
চলবে?
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি_শেখ
[ অন্যের ফোন দিয়ে এতটুকুই লিখতে পেরেছি গতকাল থেকে। গত পর্বে বলেছিলাম মৃত্তিকার বাবা অসুস্থ। কাহিনীর স্বার্থে ওর মাকে অসুস্থ বানিয়েছি। সবাই পড়ে মন্তব্য জানাবেন।
Share On:
TAGS: ওরা মনের গোপন চেনে না, বৃষ্টি শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৯
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩
-
ওরা মনের গোপন চেনে না গল্পের লিংক
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৪
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৫
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১০
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১
-
ওরা মনের গোপন চেনেনা পর্ব ৬
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৭+৮
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১১