ওরা মনের গোপন চেনে না
পর্ব সংখ্যা __[৫]
আজকাল রাস্তায় বের হওয়া যায় না। অলিগলি থেকে বখাটে ছেলেপেলে ছুটে এসে ভাবি ডেকে ডেকে মুখে ফ্যানা তুলে ফেলে। ওরা এমন ভাবে মৃত্তিকাকে গাইড করে যেন সে কোনো নেতার বউ। ওইদিন বখাটেদের হাত থেকে বাঁচার জন্য মিথ্যে বলেছিল মৃত্তিকা। আফিমের হবু বউ বলে নিজের পরিচয় দিয়েছিল। এই এক ভুল তাকে প্রতি মিনিটে মিনিটে ভোগাচ্ছে। আফিমের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না মৃত্তিকা। তবে এটুকু বুঝেছিল যে সে বখাটেদের দলের মাথা। তার কথামতোই কাজবাজ করে বাকিরা। তাই তো ওই পরিস্থিতিতে মিথ্যে বলেছিল। তখনো বোঝেনি এই একটা কথা ওরা এতটা সিরিয়াস ভাবে নেবে। এভাবে পিছু লেগে থাকবে কস্মিনকালেও কল্পনা করেনি।
মৃত্তিকা আজ যাবে শ্যামলিতে। মৃত্তিকার বাবার দোকান শ্যামলীর আশেপাশে। মুদি দোকান বলে অনেকেই বাকিতে পন্য কেনে। মৃত্তিকার বাবা সহজ-সরল মানুষ। অভাব-অনটনের গল্প শুনে আর বিশ্বাস করে বাকিতে দোকানের মালামাল বিক্রি করেন। পরে মাসের পর মাস হাত পেতে টাকা চেয়ে চেয়ে বেড়ান। দুর্বলদের সাথে এমনই হয়। মৃত্তিকার বাবা সাদামাটা মানুষ, ঝগড়াঝাঁটির আশেপাশে নেই তিনি। কাস্টমারদের সাথে উঁচু গলায় কথা বলতেও তিনি সংকোচ বোধ করেন। ফলে ক্রেতারা আরো ছাড় পেয়ে যায়। বাকিতে প্রচুর পন্য কিনে টাকা দেয়ার সময় গড়িমসি করে। মজিদ নামের এক খদ্দের প্রায় ৭ হাজার টাকার জিনিস কিনেছে। তিন মাস হয়ে গেছে টাকা পরিশোধ করছে না, দোকানের আশেপাশেও তাকে দেখা যায় না। দোকানের এই লোকসান দেখে প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে আতিকুর রহমানের। আজকাল প্রেশার হাই হয়ে যায়, মাথা ঘোরায়।
মৃত্তিকা ঠিক করেছে সে নিজে মজিদের বাড়িতে যাবে। গিয়ে টাকা আদায় করে নিয়ে আসবে। টাকা যদি নিয়ে আসতে নাও পারে, একটা ফয়সালা সে ঠিকই করে ফিরবে। যেই ভাবা সেই কাজ। বিকেলের দিকে মৃত্তিকা বেরিয়ে পরে বাড়ি থেকে। কিছুদূর হেঁটে যেতেই পেছন থেকে ডাকে কেউ। ডাকটি কর্ণকুহরে পৌঁছানো মাত্র ঘাড় ঘুরিয়ে পিছু তাকায় মৃত্তিকা। আফিমকে দেখে চোখ বড় বড় হয়ে যায় মেয়েটার। বিস্ফেরিত চোখে তাকায় আফিমের দিকে। এক কাঁধে ঝুলিয়ে রাখা টোট ব্যাগ ভালো করে চেপে ধরে দ্রুত হাঁটতে থাকে সে। যেন সে শুনতেই পায়নি আফিমের ডাক, দেখতেই পায়নি মানুষটাকে।
মৃত্তিকার হাঁটার গতি বাড়ে। আফিম চটে যায় ভীষণ। নিজেও হাঁটার গতি বাড়িয়ে মৃত্তিকার পিছু নেয়। তাকে দ্রুত এগোতে দেখে মৃত্তিকা এবার ছুট লাগায়। দৌঁড়াতে থাকে সে ফুটপাত ধরে। এই বখাটেদের চক্করে পরে তার জীবন জাহান্নাম হয়ে গেছে। আর কোনো ঝামেলা সে চায় না। আফিম নামের বখাটের সাথে কথা তো দূর, দেখাও করতে চায় না। মৃত্তিকা ছুটতে থাকে। আফিম রেগেমেগে অস্থির। মৃত্তিকার এই ধীর কদমে ছুটে যাওয়া দেখে হাসে সে। মৃত্তিকার চাইতে দ্বিগুন গতিতে আফিম দৌঁড়ে আসে মৃত্তিকার নিকট। ছলকে ওঠে মৃত্তিকার বুক। খুব কাছে এসে আফিম ডাক দেয়,
“- এই মেয়ে, দাঁড়াও। ধরতে পারলে এক আছাড় দেবো”।
মৃত্তিকা থমকায়। না চাইতেও পা জোড়া থেমে যায়। আফিম সাথে সাথে মৃত্তিকার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। দু হাঁটুতে হাত রেখে উপুড় হয়ে কিছুক্ষণ দম নিয়ে বলে,
“- পালাচ্ছিলে কোন সাহসে? মার খাওয়ার শখ হয়েছে”?
ভড়কায় মৃত্তিকা। অপরিচিত একটা ছেলে, বখাটে, বেপরোয়া, অসভ্য স্বভাবের। মৃত্তিকাকে দেখলেই ডাকবে কেন? মারতেই বা চাইবে কেন? জেনেবুঝে তার তো কোনো ক্ষতি করেনি মৃত্তিকা। তবে কিসের এত দম্ভ ছেলেটার? কিসের এত তেজ? একটু ভয়ডর নেই মাস্তানটার। মৃত্তিকা যদি আফিমের নামে মামলা করে, কি হবে ভেবে দেখেছে? এভাবে দিন রাত তটস্থ হয়ে থাকা যায় নাকি?
“- আপনার সাহস তো কম নয়। আমাকে মারবেন, মেয়েদের গায়ে হাত দিতে লজ্জা করবে না? কে আপনি? আপনাকে ভয় পাবো কেন”?
ঠোঁট বাঁকায় আফিম। তার পরনে রয়েছে ডেনিমের শার্ট আর সাদা প্যান্ট। বরাবরের মতো উষ্কখুষ্ক চুল, হাতে ঘড়ি, আঙুলে আংটি, শার্টের দুটো বোতাম খুলে রেখেছে। জিম করা শক্তপোক্ত দেহ উন্মুক্ত। মৃত্তিকার উক্ত কথার বিপরীতে ছেলেটা কটাক্ষ করে বলে,
“-, চেনো না? কি দিনকাল পরেছে, স্ত্রী তার স্বামীকে চিনতে পারছে না”।
হতভম্ব মৃত্তিকা। বুঝে উঠতে পারে না তার বিদ্রুপাত্মক চাহনি। বলে,
“- ফাউল কথা বলবেন না”।
আফিম রেগে ওঠে। ললাটে ভাঁজ ফুটে ওঠে। দপদপ করে ওঠে স্নায়ু। তেজী স্বরে বলে,
“-, এই সবাইকে কি বলে বেড়িয়েছিস? বলেছিস তুই আমার বউ। মিথ্যে বলেছিস কেন? দুদণ্ড কথা বলেছি, তাতেই স্বামী ভেবে ফেলেছিস? এজন্য মেয়ে মানুষ দেখতে পারি না। আমার গায়ে কলঙ্ক লাগিয়ে আবার আমার উপরেই চোটপাট করিস? মেরে গাল লাল করে দিবো”।
মৃত্তিকা বিরক্ত হয় প্রচণ্ড। বলে,
“- নাটক কম করেন। আপনার বউ হওয়ার জন্য আমি মরে যাচ্ছি না। আপনার চ্যালাপ্যালারা বাজারে গিয়ে চাঁদাবাজি করে, অসহায়দের সম্বল কেড়ে নেয়। আমার ফোন আর ব্যাগটাও কেড়ে নিয়েছিল ওরা। না পেরে নিজেকে আপনার বউ বলে দাবি করেছি”।
আফিম ভেংচি কেটে বলে,
“-, তোর নাটক হয় না। সুন্দর ছেলে দেখে পটে গিয়েছিস আবার মুখে বড় বড় বাতেলা মারিস”।
মৃত্তিকা বেজায় চটে যায়। আঙুল উঁচিয়ে বলে,
“- খবরদার, ফালতু কথা বলতে আসবেন না। আপনার মতো বখাটের বউ হওয়ার কোনো শখ নেই আমার। বিপদে পরে শুধু বলেছিলাম”।
শেষের কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ নিচু হয় মৃত্তিকার। আফিন জোরালো স্বরে বলে,
“- আমার নামে যে বদনাম হলো, এ দায় কে নেবে”?
“- বদনাম”?
“- কলঙ্ক। যে দেখছে সেই বলছে আফিম মির্জার বিয়ে ঠিক হয়েছে, বউ মারাত্মক সুন্দরী সবাইকে জানাইনি কেন এ নিয়ে কোন্দল শুরু করেছে। আফিমকে তো পছন্দ না, তার নাম ভাঙিয়ে বিপদ থেকে উদ্ধার হলি কেন?”
মৃত্তিকা মাথা চেপে ধরে দু হাতে। কেন যে ওইদিন আফিমের নামটা সে নিতে গেল?, ব্যাগ আর মোবাইলটা ওরা নিয়ে যেত, টাকা দিয়ে আবার ওসব কেনা যেত। কেন আফিমের নামটা উচ্চারণ করল? এখন প্রতিটি পদে পদে পস্তাতে হবে।
“- আমি সবাইকে বলে দেবো আপনি আমার কেউ নন। আপনি দয়া করে তুইতোকারি করবেন না। খুব বিশ্রী শোনায়”।
আফিম প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে গম্ভীর হয়ে বলে,
“- বদনাম ঘোচানোর আরেকটা উপায় আছে। চলো বিয়ে করে ফেলি। বদনাম মুছে সুনাম ছড়িয়ে যাবে”।
মৃত্তিকা স্কুল-কলেজে অনেক প্রপোজাল পেয়েছে। সেসবে কখনো আগ্রহ প্রকাশ করেনি সে। ভার্সিটিতো উঠে ইয়াসিনের প্রেমে পরেছিল। তাও ইয়াসিনকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল মৃত্তিকাকে প্রস্তাবে রাজি করাতে। আফিম মির্জার এহেন প্রস্তাব মৃত্তিকাকে ঘাবড়ে দেয়। আফিম আর যাই হোক, ভালো মানুষ সে নয়। তাকে যত এড়িয়ে চলা যায় ততই মঙ্গল। মৃত্তিকা তাড়াহুড়ো করে নরম হয়ে বলে,
“- আপনার ব্লেজার আমি পৌঁছে দেবো। দয়া করে আমার পিছু নেবেন না। মানুষ খারাপ বলবে”।
থমকায় আফিম। মৃত্তিকা ঘামছে। ফর্সা কপোল রক্তিম হয়ে উঠেছে। কখনো কোনো নারীর দিকে দ্বিতীয়বার না তাকানো ছেলেটি মৃত্তিকার দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়। মায়া লাগে মেয়েটার উপর। দম্ভ সরিয়ে আলতো স্বরে বলে,
“- কোথায় যাচ্ছো এখন”?
“- শ্যামলিতে”।
“- কেন”?
“- আব্বু একজনের থেকে টাকা পায়। অনেকদিন ধরে আব্বুকে ঘুরাচ্ছে। তাই যাচ্ছিলাম টাকাটা তুলতে”।
আফিমের মুখ কাঠিন্যতায় ভরে ওঠে। ভ্রু কুঁচকে বলে,
“- মেয়ে মানুষ কেন টাকা তুলতে যাবে? ওই লোকের ডিটেইলস দাও। আমি নিয়ে আসছি টাকা”।
মৃত্তিকা চমকায়। ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে,
“- না না। আমি নিয়ে আসবো”।
আফিম নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে দৃঢ় স্বরে বলে,
“- ঘাড়ত্যাড়া, বেহায়া মানুষরাই টাকা ফেরত দিতে বাহানা বানায়। তোমার কি মনে হয়? তুমি যাবে আর ওই শালা নাচতে নাচতে তোমাকে টাকা ফেরত দেবে? দেখি দাও, আমি টাকা আদায় করে আনছি”।
মৃত্তিকা শোনে না আফিমের কথা। আফিমও ছাড়ার পাত্র না। শেষে বাধ্য হয়ে মজিদের নাম, ঠিকানা, নাম্বার লেখা কাগজটা আফিমকে দিয়ে দিতে বাধ্য হয় মৃত্তিকা। কাগজের দিকে এক নজর চেয়ে আফিম বলে,
“- বাড়ি ফিরে যাও মৃত্তিকা।”
মৃত্তিকা ওখান থেকে ফিরে ভার্সিটিতে যাবে ভেবেছিল। আফিম তার হয়ে চলে যাওয়ায় সে চলে আসে ভার্সিটিতে। কয়েকদিন পরই নবীন বরণ অনুষ্ঠান। ভার্সিটির প্রতিটি হল, ক্যাম্পাস সেজে উঠবে নিজের ছন্দে। আনন্দের শেষ নেই কারো। স্টেজ আর গেট সাজানো হবে দুদিন পর থেকে। মৃত্তিকার আনন্দ ফিকে হয়ে গেছে। ভেবেছিল এ বছর স্টেজে উঠে গান গাইবে প্রতিবারের মতো। তার এই আনন্দ কেড়ে নিল ওরা। চাইলেও এখন গলা দিয়ে সুর বের হবে না মৃত্তিকার।
ক্যাম্পাসে ঢোকার পর মৃত্তিকা আশপাশে তাকায়। তার বান্ধবীরা এসেছে কিনা খোঁজ চালায়। এদিক ওদিক তাকাতেই রাস্তার দিকে চোখ পরে মৃত্তিকার। রুবিকে ভার্সিটিতে পৌঁছে দিতে এসেছে ইয়াসিন। দুজনের চোখ মুখ উজ্জ্বল। যেন ভালোবাসায় মুখরিত চারপাশ। স্বাচ্ছন্দ্যে একে অপরের হাত ধরে ক্যাম্পাসে ঢোকে ওরা। মৃত্তিকাকে দেখে রুবি হাত নাড়ে। ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয় মৃত্তিকা। চলে আসতে নিলেই রুবি দৌড়ে আসে তার দিকে। বলে,
“- কিরে, ডাকলাম। শুনতে পেলি না”?
মৃত্তিকার গা জ্বলে যাচ্ছে রুবির কথায়। মেয়েটা এমন ভাবে কথা বলছে যেন মৃত্তিকার সাথে তার সম্পর্ক খুব সুন্দর, মিষ্টি। যেন অপ্রীতিকর কিছুই ঘটেনি। ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করে মৃত্তিকা বলে,
“- স্যরি, আপনার মতো নোংরা মেয়েদের সাথে কথা বলতে আমি ইচ্ছুক নই। প্লিজ স্টে এওয়ে ফ্রম মি”।
মৃত্তিকা গটগট করে হেঁটে চলে যায় সেখান থেকে। রাগে দাঁত খিঁচে রুবি। ইয়াসিন তার কাছে এলেই সে বলে,
“- দেখেছো, তোমার এক্সের কি অহংকার? সেধে কথা বলতে গিয়েছি বলে কি ভাবটাই না দেখাল”।
ইয়াসিন বলে,
“- ওর সাথে কথা বলতে যাচ্ছো কেন? আমি যাই এখন, মৃত্তিকাকে জ্বালিও না”।
তেতে ওঠে রুবি। বলে,
“- মৃত্তিকার জন্য তোমার প্রাণ ছটফট করে তাই না? এক মেয়ে দিয়ে হচ্ছে না তোমার”?
“- রাগ বাড়াবে না রুবি। তুমি আমার বউ। তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকে নিয়ে ভাববো কেন আমি”?
ইয়াসিন চলে যায় বাইরে। রুবি ক্লাসে ঢুকে পরে। মৃত্তিকার চোখ ছেপে অশ্রুকণা গড়িয়ে পরে। কি নিদারুণ যন্ত্রণা। বুক পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে, অথচ তা দেখার কেউ নেই, বোঝার কেউ নেই। এত বড় মেয়ে ক্যাম্পাসে বসে কান্নাকাটি করছে, দেখতে ভিষণ দৃষ্টিকটু লাগে। কিন্তু চোখ যে মানে না, শোনে না দুর্বল কণ্ঠের বারণ। রুবি আর ইয়াসিন বারবার মৃত্তিকার সামনে এসে মৃত্তিকাকে ভেঙে দিচ্ছে, দুর্বল করে দিচ্ছে তাকে। নিজেদের সুখকর মুহুর্ত গুলো যেন মৃত্তিকাকে দেখানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। মৃত্তিকা ছুটে ওয়াশরুমে যায়। চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে হলে ঢোকে। আজ তাদের শেষ পরীক্ষা। ভাগ্যবশত এবারে রুবির সিট কেটে অন্য রুমে পরেছে। তাই পরীক্ষার সময় রুবির সাথে মৃত্তিকার সাক্ষাৎ হবে না। পরীক্ষা শেষ হলে আর রুবির মুখোমুখি হতে হবে না তাকে। এতেই যেন শান্তি মৃত্তিকার।
মজিদের থেকে টাকা আদায় করতে কসরত করতে হয়েছে আফিমের। মৃত্তিকার মতো ভীতু মেয়ে টাকাটা আদায় করতে পারতো না। মজিদ প্রথমে নানান বাহানা দিয়ে তাড়াতে চাইছিল আফিমকে। বোধহয় সে চিনতে পারেনি আফিমকে। যেই আফিম লোকটার উপর চড়াও হয়েছে, শার্টের কলার চেপে ধরে নিজের পরিচয় দিয়েছে, অমনি লুঙ্গির কোমরে গুঁজে রাখা টিস্যুর খাম থেকে টাকাটা বের করে দিয়ে দিয়েছে মজিদ।
মজিদের বাড়ি থেকে বের হতেই রায়ানের ফোন আসে। আজ ক্লাবে যেতে হবে। ক্যারাম খেলা আর আড্ডা হবে। কখন এলাকার সব ছেলেরা ক্লাবে বসবে তা জানতেই আফিমকে ফোন করে রায়ান। আফিম কি ভেবে যেন ওকে বলে,
“- মৃত্তিকা নামের মেয়েটার কথা মনে আছে”?
রায়ান তব্দা খেয়ে বলে,
“- হ্যাঁ, কি হয়েছে”?
“- ওর সমস্ত ইনফরমেশন আগামী চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে আমার চাই। পুরো নাম কি, বাড়িতে কে কে আছে, বিয়েটিয়ে হয়েছে কিনা? সব জানাবি আমাকে”।
“- শালা তুই ওই মেয়ের পিছনে পরলি ক্যান? ওর ইনফরমেশন দিয়ে তুই কি করবি”?
আফিম একটু ভেবে বলে,
“- দেয়ার’স সামথিং ইন্টারেস্টিং এবাউট হার।”
“- প্রেমে পরলি নাকি”?
“- আরেহ্ ধুর। আমাকে দিয়ে প্রেমটেম হবে না। ওই মেয়ে আমার নামে বদনাম রটিয়েছে না? ওকে আমি মাথা থেকে সরাতেই পারছি না”।
আফিমের বাবা ভীষণ ভদ্র গোছের লোক। তার এ জীবনে তিনি কোথাও সরাসরি সমালোচিত হননি। আফিমের যখন দশ-এগারো বছর বয়স, তখন একটা বয়স্ক, ধনী লোকের সাথে আফিমের আম্মু পালিয়ে যায়। তখন অবশ্য আশরাফ মির্জার এত অর্থ-সম্পত্তি ছিল না। থাকার মধ্যে ছিল এক তলা বাড়ি, আর সাভারের ছোটখাটো রেস্টুরেন্টটা। তার স্ত্রী রুমা চলে যাবার পর আশরাফ মির্জা দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। বিয়ে করার কথা ভাবেননি এখনো পর্যন্ত। ছেলেকে নিয়ে পুরো জীবনটা কাটিয়ে দেয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তিনি। রুমার সাথে আশরাফ মির্জার প্রেমের বিয়ে ছিল। তিন মাসের প্রেম আর বারো বছরের বৈবাহিক সম্পর্ককে পায়ে পিষে রুমা পালিয়ে গিয়েছে স্বামী-সন্তান ছেড়ে। শোকে, তাপে ভেঙে পড়েছিলেন আশরাফ মির্জা। ছেলের কথা ভেবে সব দুঃখ ভুলে কাজে মন দিয়েছিলেন তিনি। রাত-দিন পরিশ্রম করে আজ এ জায়গায় পৌঁছোতে পেরেছেন। তবে কয়েক বছরের কর্ম ব্যস্ততায় ছেলে তার বখে গিয়েছে। বাজে আড্ডায় মিশে নষ্ট করেছে শিক্ষাজীবন। তার সাথে এখন কথাও বলা যায় না। কখন বাড়িতে আসে, কখন যায় বাড়ির পরিচারিকারাও জানে না। ছেলেটা উদভ্রান্ত, ছন্নছাড়া হয়ে ঘুরে বেড়ায় এদিক-ওদিক। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়। তাকে বারন করলেও সে শোনে না। কোনো কথাই তার কর্ণকুহরে পৌঁছায় না। মায়ের মতো বদমেজাজি, একরোখা স্বভাবের হয়ে গিয়েছে আফিম। তার সাথে কথা বলতে হয় মেপে মেপে।
রাত বারোটার পর আফিম বাড়ি ফিরল ধীর পায়ে। ড্রয়িংরুমেের সিঁড়ি বেয়ে ধীর পায়ো তটস্থ ভঙিতে উঠতে নিলেই তার দেখা হয়ে যায় আশরাফ মির্জার সাথে। চোখে চোখ পরতেই আফিম একটু ভড়কে যায়। ভীত সত্তাকে উড়িয়ে দিয়ে সাহস সঞ্চয় করে বলে,
“- এখনো ঘুমাননি”?
আশরাফ মির্জা বুকে দু হাত গুঁজে বলেন,
“- যার ছেলে রাত একটা পর্যন্ত বাহিরে থাকে, ভবঘুরের মতো জীবন কাটায়। তার কি চোখে ঘুম আসে”?
আফিম রসিকতা করে বলে,
“- কেন? আমি কি আপনার চোখের উপর দিয়ে হাঁটি? যে আমার ঘুরাঘুরির কারণে আপনার চোখ বন্ধ হচ্ছে না”।
আশরাফ মির্জা রেগে যায় ভীষণ। গর্জে উঠে বলেন,
“- চুপ করো বেয়াদব। একদিন বাড়িতেই ফেরো না, আরেকদিন রাত বারোটার পর বাড়ি ফেরো। কি পেয়েছো তুমি? আদর পেয়ে বাঁদর হয়েছো।”
আফিম ফিক করে হেসে বাবার সম্মুখে এসে দাঁড়ায়। বলে,
“- এবার বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা পড়ানোর ব্যবস্থা করুন”।
আশরাফ মির্জা ভ্রু কুঁচকে ফেলেন। থতমত খেয়ে থমথমে সুরে বলে,
“-, প্রেম করছো নাকি”?
আফিম হাত পা নাড়িয়ে ব্যায়াম করতে করতে বলে,
“- না প্রেম করছি না। কিন্তু বিয়ে অবশ্যই করবো।”
“- মেয়ে ঠিক করে ফেলেছো? তোমার মতো বখাটে, ভবঘুরে ছেলেকে কোন মেয়ে বিয়ে করবে”?
“- নিউজপেপারে এড দেন, দেখবেন বাসার সামনে মেয়েদের লাইন লেগে আছে। কাজবাজ করি না, তাতেই যেই ফেমাস আমি, কাজবাজ করলে বাড়ি থেকে মেয়েরা আমাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যেত। বলতো আফিম মির্জা, তোমাকে আমি ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি”।
আশরাফ মির্জা ছেলের দুষ্টুমি, তামাশা ধরে ফেলেন। বলেন,
“- কষে দুটো চড় লাগাবো। বাবার সাথে ইয়ার্কি করো? মেয়ের নাম বলো, দেখি সে কেমন”?
“- আপনি বরং নিজের জন্য মেয়ে দেখেন। নয়স বাড়ছে, দুদিন পর আর মেয়ে পাবেন না।”
আশরাফ মির্জা দমে যান। বলেন,
“- এক কথা তোমাকে আর কতবার বোঝাবো”?
আফিমের চোখ মুখের হাসি উবে যায়। কঠোরতা ভর করে মুখে। গম্ভীর স্বরে বলে,
“- আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি। আপনি যদি নতুন করে জীবন শুরু না করেন, আমি আফিম আপনার কোনো কথাই শুনবো না”।
“- পাগলামো করবে না একদম। আমি তোমার খেয়াল রাখি না? কেন এ বয়সে এসে আমাকে বিয়ে দিতে তুমি মরিয়া হয়ে উঠেছো”?
“- ওই মহিলার জন্য আপনি কেন সারাজীবন একা কাটাবেন বলুন আমায়? যার জন্য আপনি রোজ ধুঁকে ধুঁকে মরেন, সে আপনার কথা ভাবে? আরেকজনের সাথে দিব্যি সংসার করে যাচ্ছে, বাচ্চা পয়দা দিচ্ছে। আপনি কেন থেমে থাকবেন? কোন দিক থেকে কম আছে আপনার?”
“- সামান্য একটা বিষয়ের জন্য তুমি আমায় এড়িয়ে চলো, সম্মানটুকুও দাও না আমাকে”।
“- আমার কথা মেনে নিন, আমি আপনার সব কথা মানবো।”
খটখটে বুটের শব্দ তুলে ঘরের দিকে চলে যায় আফিম। আশরাফ মির্জা কপালে হাত ঠেকিয়ে দাঁড়ায় সিঁড়ির দেয়াল ঘেঁষে। এই একটা বিষয় নিয়ে তাদের বাপ-ছেলের মাঝে বনিবনা হচ্ছে না। দু বছর ধরে আফিম তাকে দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য চাপ দিচ্ছে। এসবে মোটেও আগ্রহ নেই আশরাফ মির্জার। বয়স তার পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই, চুলে পাক ধরেছে। এই বয়সে বিয়ে সে কিভাবে করবে? সমাজে তার একটা সুন্দর ইমেজ আছে। স্ত্রী চলে যাবার পরও তিনি বিয়ে করেননি বলে অনেকেই তাকে নিয়ে প্রশংসা করে, আলোচনা করে। এতদিন ধরে ব্যক্তিত্ববান, এক নারীতে আসক্ত পুরুষের তকমা পেয়ে এখন দ্বিতীয় বিয়ে করাটা কতটা অশোভন দেখায় তা আফিম বুঝবে কি করে? ছেলেটা অসম্ভব জেদী। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকে সর্বদা। কারো কথা, কারো মতামতের তোয়াক্কা করে না আফিম। নিজের যা ঠিক মনে হয়, সে তাই-ই করে।
গতকাল আফিমের সাথে আর দেখা হয়নি মৃত্তিকার। আফিমের ব্লেজারটা সে ধুয়ে আয়রণ করে রেখে দিয়েছে। আজ আফিমের সাথে তার দেখা করার কথা। গত রাতে একটি রং নাম্বার থেকে কল আসে মৃত্তিকার ফোনে। ধরবে না ধরবে না করেও কলটা উঠায় সে। ওপাশের রাশভারী কণ্ঠ শুনেই চিনে ফেলে সে মানুষটিকে । আফিম মজিদের থেকে টাকাটা আদায় করেছে। টাকা দিতে আর ব্লেজারটা ফেরত নিতে সে সকালে আসবে বলে জানিয়েছে। মৃত্তিকার পরীক্ষা শেষ বাড়ি থেকে বের হওয়ার কোনো ইচ্ছেই ছিল না তার। এলাকায় আফিমের সাথে দেখা করাটা মোটেই ভালো হবে না মৃত্তিকার জন্য। এতদিন ধরে এ এলাকায় রয়েছে তারা, কেউ তাকে বখাটে আফিমের সাথে দেখে ফেললে নির্ঘাত কুৎসা রটাবে। বদনাম লেগে যেতে পারে। তাই দূরের একটি জায়গায় তাকে দাঁড়াতে বলেছে মৃত্তিকা। আজ আবারও ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পরছে। শুধু বৃষ্টি নয়, প্রচণ্ড হাওয়াও বইছে। বৃষ্টির কণা উড়ে এঁকেবেঁকে যাচ্ছে। গাছগুলো হেলে পরছে বাতাসের তোপে। এই বৃষ্টিতেও ছাতা সমেত বেরিয়ে আসে মৃত্তিকা। সে সাদামাটা স্বভাবের মেয়ে। কেবল মাথায় ওড়না আর পরিষ্কার পোশাক পড়েই যেখানে সেখানে চলে যেতে সংকোচ বোধ করে না সে। নীল রঙের চুড়িদার পরে সে নির্ধারিত স্থানটিতে আসে। জায়গাটার নাম ধানমন্ডি লেক। এটা একটা কোলাহল পূর্ণ, প্রাকৃতিক পরিবেশের সৌন্দর্য আলোকিত একটি স্থান।
ধানমন্ডি লেক যেন শহরের বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা একটুখানি শান্তি। চারপাশে ব্যস্ত রাস্তা, গাড়ির শব্দ, মানুষের ভিড় সবকিছুর মাঝখানে এই লেকটা দাঁড়িয়ে আছে। লেকের জল সব সময় একরকম থাকে না। কখনো গাঢ় সবুজ, কখনো আকাশের রঙ মেখে নীলচে রঙ ধারণ করে। লেকের দু’পাশ ঘেঁষে লম্বা হাঁটার পথ। ইটের রাস্তা, মাঝে মাঝে ছোট ব্রিজ, ওপরে ছায়া দেওয়া বড় বড় গাছ। বিকেলের দিকে রোদের আলো গাছের ফাঁক দিয়ে পড়ে মাটিতে। লেকের চারপাশে বেঞ্চ পেতে রাখা থাকে। পথচারীরা এখানে এসে জিরিয়ে নেয়, কপোত-কপোতী এখানে এসে সময় কাটায়।
মৃত্তিকার ঝুম বৃষ্টিতেও লেকের কাছে আসে। একটি বিশাল কড়ই গাছের ছায়ায় এসে দাঁড়ায় ছাতা সমেত। আফিম আসেনি। মৃত্তিকা পুরো জায়গায় চোখ বুলায়। পাক্কা পাঁচ মিনিট পর আফিমকে দেখা যায়। বাইক ফেলে ছেলেটা দৌড়ে আসছে। বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো সরঞ্জাম নেই তার কাছে। বাইকের চাবিটা নিয়ে ছুটতে ছুটতে সে আসে মৃত্তিকার নিকট। এসেই সে চট করে ঢুকে পরে মৃত্তিকার ছাতার নিচে। মৃত্তিকার বাহুর সাথে আফিমের শক্ত-পোক্ত বাহু ঘষা লাগে। সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে মৃত্তিকার। ব্যস্ত হয়ে দুরত্ব বাড়ায় আফিমের থেকে। তাকে এভাবে ভয় পেতে দেখে গা গুলিয়ে হাসে আফিম। আফিমের হাসির শব্দ চমৎকার। ছেলেটা যখন হাসে, তার চোখ জোড়া গভীর হয়ে হাসে। হাসলে গা দুলে ওঠে ছেলেটার, চকচকে দন্ত বেরিয়ে আসে। নির্দ্বিধায় বলা যায় যুবকটি সুন্দর। তার দেহের গড়ন বড়ই আকর্ষণীয়।
আফিম আড়চোখে তাকায় ভীতু মেয়েটির দিকে। মৃত্তিকা নীল রঙের চুড়িদার পরেছে। মেয়েটার গলায় চিকন চেইন, হাতে ব্রেসলেট। মাথায় বরাবরের মতো ওড়না টেনে দেওয়া। কপালের উপরের সিঁথি দেখা যাচ্ছে কেবল। বিনুনি করা চুলগুলো কোমর ছাড়িয়েছে। ঠোঁটের লিপবাম চিকচিক করছে মেয়েটার। হুট করে মৃত্তিতাকে একটি নাম দিয়ে ফেলে আফিম। নামটি হলো নীলাঞ্জনা। নীল রঙ গায়ে জড়ানো ছোট্ট দেহের মেয়েটিকে তার অসম্ভব রূপবতী মনে হয়। চোখ জুরিয়ে আসে। মৃত্তিকা বলে,
“- আপনি ছাতা আনেন নাই”?
আফিম ভেজা চুল গুলো ঝেরে বলে,
“- আমি রাস্তায় ছিলাম, হুট করে বৃষ্টি এলো।”
মৃত্তিকা শপিং ব্যাগে রাখা ব্লেজারটি আফিমের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
“- আমি ধুয়ে, আয়রন করে দিয়েছি”।
আফিম তার পকেট থেকে সাত হাজার টাকা বের করে। টাকা গুলো বৃষ্টির পানিতে কিছুটা ভিজে গেছে। ফ্যানের নিচে রেখে দিলেই শুকিয়ে যাবে। মৃত্তিকার হাতে টাকাগুলো গুঁজে দিয়ে আফিম বলে,
“- আমি তো বেকার, তোমার বাবাকে বলবে বাকিতে মাল বিক্রি করার পর ক্রেতা টাকা দিতে টালবাহানা করলে আমাকে ডাক দিতে”।
মৃত্তিকা ফিক করে হেসে ফেলে আফিমের বলার ভঙ্গি দেখে। হাসতে হাসতে বলে,
“- আপনি এখন মারপিট করাটাকে প্রফেশন হিসেবে নিতে চাইছেন”?
“- তোমার জন্য এটুকু করাই যায়”।
বিস্মিত হয় মৃত্তিকা। প্রশ্ন করে,
“- আমার জন্য”?
“- হু, সুন্দরী মেয়েদের জন্য আমি সব করতে পারি”।
মৃত্তিকা ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ে। লোকটা আস্ত একটা ফাজিল। তাকে ভালো ভেবে ভালো ব্যবহার করাটাই ভুল হয়েছে মৃত্তিকার। বলে,
“- ভালো হতে পারেন না? মাস্তানি করেন কেন?”
“- শোনো, আমি বেকার। আমাকে তো কিছু একটা করে টাইমপাস করতে হবে, নাকি?”
মৃত্তিকা হতাশ চোখে তাকায় আফিমের দিকে। আফিম বাতাসের ঝাপটায় ভিজে যাচ্ছে। মৃত্তিকা ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে,
“- আপনি ভিজে যাচ্ছেন। দয়া করে অন্য কোথাও গিয়ে দাঁড়ান। আমি বাড়ি ফিরবো”।
আফিম স্থির হয়ে তাকায় মৃত্তিকার দিকে। ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলে,
“- আমার জন্য এত চিন্তা করতে হবে না। যাও বাড়ি যাও, কেউ দেখে ফেললে তোমার ক্ষতি হবে”।
মৃত্তিকা অবাক হয় ছেলেটার নরম সুরে। বলে,
“- আপনি নিজেকে যতটা খারাপ ভাবে উপস্থাপন করেন, ততটা খারাপ আপনি নন”।
ছাতাটা আফিমের হাতে ধরিয়ে দিয়ে মৃত্তিকা বলে,
“- টাকাটা এনে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ। আপনি এই ছাতাটা রাখুন, নইলে পুরোপুরি ভিজে যাবেন”।
বিস্ফোরিত হয়ে তাকায় আফিম। মৃত্তিকার এহেন সহানুভূতি দেখে সে অপ্রস্তুত হয় ভীষণ। নারীর এহেন কোমলতা সহ্য হয় না ছেলেটার। উদাস চোখে চেয়ে মৃত্তিকার হাতেই ফের ধরিয়ে দেয় ছাতার লম্বা দণ্ড। বলে,
“- মৃত্তিকা, আমার সাথে কোমল হয়ো না। নারীর নরম স্বভাব আমার সহ্য হয় না”।
মৃত্তিকা বোঝে না আফিমের কথার মানে। সে উল্টো ফিরে চলে আসে পথে। অটো ধরে বাড়ি ফিরতে হবে তাকে। পথে ফেরার পর মৃত্তিকা পুনরায় পিছু ফিরে তাকায়। আফিম কোমরে হাত রেখে বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় আছে। মৃত্তিকার মনটা বড্ড নরম। আফিম তাকে সাহায্য করেছে, ওইদিন জ্ঞান হারানোর সময় তাকে আগলে ধরেছে। মৃত্তিকার কি উচিত তাকে ফেলে চলে যাওয়া?
মৃত্তিকা আবারও আফিমের দিকে এগিয়ে আসে। তাকে এগিয়ে আসতে দেখে আফিম ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে থাকে। প্রচণ্ড দ্বিধা, সংকোচে মোড়া কণ্ঠে মৃত্তিকা বলে ওঠে,
“- আপনি এখানে দাঁড়িয়ে থাকবেন”?
আফিম ঠোঁট কামড়ে হাসে। বলে,
“- ফিরে এলে এ কারণে”?
মৃত্তিকার স্বর নিচু হয়। ছাতার অর্ধেকাংশ আফিমের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
“- রাস্তা অবধি আপনি আমার সাথে চলুন। অটোয় উঠে গেলে আমার আর ছাতার প্রয়োজন হবে না। আপনি ছাতাটা নিয়ে যেতে পারবেন”।
বিস্ময়ে মুখ হা হয়ে যায় আফিমের। তার দেখা মতে মেয়েটা খুব কঠিন, রাগী। মৃত্তিকার সম্পর্কে সবটা জেনে গেছে আফিম। বলতে দ্বিধা নেই সবটা জানার পর মেয়েটার প্রতি তার আগ্রহ সামান্য হলেও বেড়েছে। আর তার এই সাহায্য টুকুও নিতে ইচ্ছে করছে আফিমের। সরল হৃদয়ের মেয়েটির গভীর অনুনয় ফেলতে পারে না আফিম। দুরু দুরু বুক কাঁপে ছেলেটার। মৃত্তিকার ছাতার নিচে এসে দাঁড়ায় সে। আফিম যেহেতু মৃত্তিকার চেয়ে উচ্চতায় অনেক বড় তাই মৃত্তিকাকে ছাতা আরো উঁচু করে ধরতে হলো। তার এই কাণ্ডে আফিম কেঁড়ে নিল ছাতার হাতল। বলল,
“- চলো”।
ধানমন্ডি লেকে কতই না জুটি আসে। তাদের দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে লেকটি। আজ মৃত্তিকা আর আফিমকে দেখে লেকও বুঝি তার সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিল কয়েক গুন। ঝুম বৃষ্টিতে ইট বিছিয়ে রাখা রাস্তায় দুজনের জুতোর খসখসে আওয়াজ শোনা গেল। একই ছাতার নিচে দুজন ভিন্ন মনোভাব, ভিন্ন আচরনের মানুষ একত্রিত হয়ে গন্তব্যে রওনা দিল। আড়চোখে মৃত্তিকাকে দেখে নিল আফিম। তার নাম আফিম বটে কিন্তু এই সময়টায় তার মনে হলো মৃত্তিকা একটি আফিম। তার শরীর থেকে আসা মেয়েলি ঘ্রাণ শুষে নিতে ইচ্ছে হলো আফিমের। শুঁকে এর ঘনত্ব আরো বাড়িয়ে দিতে ইচ্ছে হলো। রমনীটির গায়ের সাথে সেঁটে যেতেও ইচ্ছে করল বেশ কয়েকবার। আফিম গাঢ় শ্বাস টানল। বাম কাঁধে তিনবার ফু দিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“- হুশ শয়তান এভাবে ধোঁকা দিবি না। চলে যা। অসভ্য, ইতর। সাধাসিধে ছেলেটাকে আর কত অভদ্র বানাবি?”
চলবে?
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি_শেখ
[নোটঃ প্রায় লাখের কাছাকাছি মানুষ গল্পটা পড়ে। আমি চাইবো এই মিষ্টি পর্বটা ২ হাজার রিয়্যাক্ট পাক। আশা করি আপনারা সাহায্য করবেন। হ্যাপি রিডিং❤️]
Share On:
TAGS: ওরা মনের গোপন চেনে না, বৃষ্টি শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২
-
ওরা মনের গোপন চেনে না গল্পের লিংক
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৪
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৭+৮
-
ওরা মনের গোপন চেনেনা পর্ব ৬
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১১
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১০
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৯
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩