ওরামনেরগোপনচেনেনা
পর্ব সংখ্যা [৭+৮]
নিভু নিভু আলোয় মৃত্তিকার উজ্জ্বল মুখ দেখা যাচ্ছে। চোখ, নাক, গাল কিছুটা লালচে হয়ে উঠেছে। যদিও চোখে পানি নেই। আফিমের দৃষ্টি তার কান্নাকে উড়িয়ে দিয়েছে মুক্ত বাতাসে। মেয়েটার মাথা নত। চিবুক ঠেকেছে বুকে। ইয়াসিন চলে গিয়েছে গর্জন করতে করতে। ইয়াসিনকে দেখে নেবে বলে শান্ত কণ্ঠে হুমকিও দিয়েছে। তাতে আফিমের আদৌ যায় আসে? সে তাকিয়ে আছে মৃত্তিকার দিকে। চোখ জোড়া তার তীক্ষ্ণ, গভীর। কিছুটা রাগ ও মিশে আছে তার সত্তায়। গম্ভীর কণ্ঠে আফিম বলে,
“- ওদিকটা ছেড়ে এদিকে এসেছিলে কেন”?
মৃত্তিকা এদিক ওদিক তাকায়। কেউ নেই এদিকটায়। তার হাত পা কাঁপছে। অস্বস্তি হচ্ছে ভীষণ। আফিমের প্রশ্নটিকে উপেক্ষা করে মৃত্তিকা মিনমিনে স্বরে বলে,
“- আমি বাড়ি ফিরবো”।
ফোঁস করে দু হাতে কোমর চেপে শ্বাস ছাড়ে আফিম। বুঝতে পারে মারধোর দেখে সরল মেয়েটা ভয় পেয়েছে। তার তেজ, রাগ সব চাপা পরেছে ভয়ের আবরণে। না চাইতেও হেসে ফেলে ছেলেটা। কোমল কণ্ঠে বলে,
“- মাত্রই তো আসলে, এখনই যাবে”?
দৃষ্টি সরিয়ে মুখ তুলে মৃত্তিকা। ড্যাবড্যাব করে তাকায় আফিমের মুখ পানে। কৌতুহলী কণ্ঠে বলে,
“- আপনি কি করে জানেন আমি মাত্র এসেছি”?
আফিম ফের গা দুলিয়ে আলতো হাসে। বলে,
“- মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটলে আশপাশ দেখবে কি করে? আমি রাস্তায় ছিলাম। তোমাকে এদিকে আসতে দেখেছি”।
ইরহামকে কোলে তুলে নেয় মৃত্তিকা। আফিমের দিকে চেয়ে সংকোচ, আড়ষ্টতায় মোড়ানো কণ্ঠে বলে,
“- আপনাকে অনেক ধন্যবাদ”।
আফিম ডান ভ্রু উঁচিয়ে বলে,
“- ধন্যবাদ দিয়ে করবো কি? চলো একটা সিগারেট কিনে দাও”।
মৃত্তিকা একটু ভেবে বলে,
“- আপনি আমার উপকার করেছেন, বিনিময়ে আমারও উচিত আপনার উপকার করা। কিন্তু আপনি যা করতে বলছেন, তা আপনার কোনো উপকারে আসবে না বরং আপনারই ক্ষতি করবে।”
আফিম ফিচেল হেসে বলে,
“- তার মানে তুমি আমার ভালো চাইছো, তাই তো”?
“- জি”।
আফিম পা বাড়িয়ে বলে,
“- এসো আরেকটু ঘুরে দেখি মেলাটা।
আঁতকে ওঠে মৃত্তিকা। ব্যস্ত কণ্ঠে বলে,
“- না না। আমাদের কেউ একসাথে দেখে ফেললে খুব সমস্যা হবে। আমি বাড়ি ফিরবো। আপনি চলে যান”।
“- আমরা কি প্রেম করছি? দেখুক, যায় আসে না”।
মৃত্তিকা শক্ত কণ্ঠে জানায়,
“- আপনি প্রাপ্তবয়স্ক আর আমিও, আমাদের একসাথে ঘোরাফেরা করাটা উচিত নয়। আপনি আমার থেকে দুরত্ব বজায় রাখলেই আমার জন্য তা মঙ্গলজনক হবে”।
আফিম শোনে না কিছুই। ইরহামের হাত ধরে বলে,
“- এই পুচকু চল, খেলনা কিনে দেই”।
ইরহাম ছোট বাচ্চা। কে বখাটে, আর কে ভালো মানুষ তা বোঝার ইন্দ্রিয় তার নেই। আফিম খেলনা কিনে দেবে শুনেই লাফাতে থাকে ছেলেটা। আফিমের হাত ধরে মাঠের দিকে চলে আসে। মৃত্তিকা বারণ করে ফের।
“- আফিম, ওকে নেবেন না। বাড়ি ফিরতে হবে আমাদের”।
আফিম পাত্তা দেয় না মোটেই। ইরহামকে নিয়ে খেলনার দোকানে গিয়ে একটি খেলনা পিক আপ ভ্যান কিনে দেয়। মৃত্তিকা পিছু পিছু এলেও ওদের থেকে দুরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ায়। খেলনাটা কিনে দেওয়ায় সে একটু অপ্রস্তুত হয়। বলে,
“- আপনি খরচ করবেন না। ওকে আমি কিনে দিচ্ছি”।
শান্ত, রূপক, রায়ান ওরাও চলে আসে। ইরহামকে কোলে নিয়ে ওরা উপরে ছুঁড়ে মারে। আবার নিচে পরতে নিলে বাচ্চাটাকে ধরে নেয়। খিলখিল করে হাসে ইরহাম। ড্রাগনের পিঠে বসে দোল করার একটা খেলনা আছে। এত ভিড়ে ওদিকে মৃত্তিকারা যেতেই পারেনি। আফিমকে দেখে ভিড় কমিয়ে সবাই জায়গা করে দেয়। শান্ত আর ইরহাম অনেকগুলো ড্রাগনের মাঝে একটি ড্রাগনের উপর বসে দোল খায়। মৃত্তিকা দেখে সবটা। কিছুক্ষণ আগে জমিয়ে রাখা দুঃখ গুলো ম্লান হয়ে আসে। চেয়ে রয় ইরহামের হাস্যজ্বল মুখের দিকে। বাচ্চাটা ওদের পেয়ে কতই না খুশি। মনে হচ্ছে সবাই যেন ইরহামের বয়সী।
আজ শুক্রবার, জুম্মার দিন। মেহমেতের অফিস নেই। সকাল সকাল খবরের কাগজে মুখ গুজে বসে আছে ছেলেটা। মৃত্তিকা সকালে উঠে পরোটা আর আলুর দম রান্না করেছে। শুক্রবারে ইরহামের পরোটা খাওয়ার বায়না থাকে। জাহানারা রান্নাঘরের ধারে ঘেঁষে না। সারাদিন শুয়ে বসে দিন কাটায়। মাকে আর কষ্ট করতে দিতে চায় না বলে মৃত্তিকা নিজেই সবটা করে।
শুক্রবার দিনটা সবার জন্য সুখকর হলেও মৃত্তিকার এ দিনটা আতঙ্কে কাটে। আজ বড় ভাই বাসায়, ভাবি তার এটা-সেটা খুঁত ধরে ভাইকে কুপরামর্শ দেবে। ঝগড়া হবে, তর্ক হবে। এ ভয়ে মৃত্তিকা তার সাথে কোনো কথাই বলতে যায় না। রান্নাবান্না শেষ করে মৃত্তিকা উপরের ফ্লাটের বয়স্ক মহিলার সাথে দেখা করতে যায়। বাড়ির জামা পড়েই ছুটে যায় সিঁড়ি বেয়ে। মহিলার বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। এক নাতিকে নিয়ে তিনি বসবাস করেন। তার নাতি চাকরি করে মিরপুরে। বৃদ্ধা সারাদিন একাই থাকেন ফ্ল্যাটে। মাঝে মাঝে টিভি খুলে বসেন। তাকে একা থাকতে দেখে মৃত্তিকা মাঝে মাঝে তাদের ঘরে যায়। গল্প করে, আড্ডা দেয়, টিভি দেখে নইলে গান শোনে। আজকে যদিও বৃদ্ধা একা নন। সাহিল আজ বাড়িতেই আছে। তবুও মৃত্তিকা ছুটে যায় বৃদ্ধার কাছে আড্ডা দিতে। গিয়ে দেখে বৃদ্ধার নাতি বাড়িতে নেই। বাজার করতে গিয়েছে। মৃত্তিকা এসে বসে বৃদ্ধার পাশে। একসাথে টিভি দেখতে দেখতে কলিংবেল বেজে ওঠে। সাহিল এসেছে বাজার করে। মৃত্তিকাকে দরজা খুলতে দেখে ছেলেটা গাল ভরে হেসে বলে,
“- আপনাকে আজকাল দেখাই যায় না, থাকেন কোথায়”?
মৃত্তিকা আলতো হেসে প্রত্যুত্তরে বলে,
“- পরীক্ষা ছিল ভাইয়া। ব্যস্ত ছিলাম। দিনে তো আসি নানুর সাথে দেখা করতে”।
“- আপনি বসুন তাহলে, চা করে আনি একটু। বিস্কিট এনেছি চা দিয়ে খাবো বলে, আপনি কিন্তু খেয়ে যাবেন”।
মৃত্তিকা সম্মতি জানায়। সাহিল আর বৃদ্ধার মাঝে কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। মৃত্তিকা বৃদ্ধার কাছ থেকে শুনেছে বিয়ের প্রায় সাত বছর পর একটা মেয়ের জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। এরপর আর তার কোনো সন্তান হয়নি তার। মেয়েকে বৃদ্ধা ও তার স্বামী মিলে অনেক বড় ঘরে বিয়ে দিয়েছেন। বৃদ্ধার মেয়ে বর্তমানে সুইজারল্যান্ডে স্বামী আর তিন সন্তানের সাথে বসবাস করছে। সাহিলকে তিনি রাস্তা থেকে তুলে এনেছিলেন ২০০৬ এ। রাস্তায় রাস্তায় কাজ করে দানার জোগাড় করতো সাহিল। তখন সাহিলের বয়স ছিল মাত্র পাঁচ। মেয়েকে বিদেশে পাঠিয়ে বুড়ো-বুড়ি একা হয়ে গিয়েছিলেন। একদা পার্কে ঘুরতে গিয়ে বৃদ্ধার দেখা হয় সাহিলের কাছে। সাহিল বোতল কুড়িয়ে নিচ্ছিল পার্ক থেকে। বৃদ্ধার সাহিলকে দেখে বড় কষ্ট হয়েছিল। ছেলেটার মায়া ময় ছোট্ট মুখটা দেখে বৃদ্ধা তাকে নাতি সম্বোধন করে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। নিয়ে এসেছিলেন বুড়ো-বুড়ির ছাপোষা ঘরে। শেষ সময়ে মেয়েকে পাশে না পেলেও কৃতজ্ঞতাবশত ছেলেটি রয়ে গেছে সাথে। বৃদ্ধার দেখাশোনার জন্য সাহিল একটি লোক রেখেছিল। কাজের মেয়েটা খুব ঝামেলা করে, কাজে ফাঁকি দেয়, না বলে ঘরের জিনিস পত্র নিয়ে যায়। তাই সাহিল তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। এখন বিশ্বস্ত একটা কাজের মেয়ের সন্ধান করছে সে। কিন্তু এ সময়ে বিশস্ত মানুষ খোঁজা খুব ভোগান্তির কাজ। সাহিল এখন নিজেই রান্নাবান্না করে, নানুর কাপড় ধুয়ে দেয়, ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে।
মৃত্তিকা মাথার ওড়না টেনে এগিয়ে যায় রান্নাঘরে। সাহিল চা বসিয়েছে ছোট পাতিলে। সব কিছু গুছিয়ে চুলোর পাশে রাখছে সে। পানি গরম হলেই সব দেবে পাতিলে। মৃত্তিকা হেসে বলে,
“- সাহিল ভাই, আপনি এত গুছিয়ে কাজ করেন কিভাবে? আমি মেয়ে হয়েও আপনার মতো করে পারি না”।
সাহিল দেখতে শ্যামলা বর্ণের হলেও মুখের আদল সুন্দর। একেবারে ভদ্র সভ্য ছেলে। এ এলাকায় বিশ বছর ধরে আছে সে। বৃদ্ধা বলে সাহিলের নামে নাকি ছোট বেলায়ও কোনো বিচার আসেনি। তাকে কোনোদিন বাইরে আড্ডা দিতে দেখা যায় না। চা, পান কিংবা সিগারেট খেতে দেখা যায় না। পড়াশোনায় তেমন ভালো না হলেও নিজের কর্মক্ষমতা দিয়ে ভালো চাকরি পেয়েছে। ছেলেটি অত্যন্ত নাজুক। মাথা উঁচিয়ে কখনো কথা বলে না কারো সাথে। পোশাক সর্বদা মার্জিত থাকে তার। পাশাপাশি রসিক স্বভাবের সে। মৃত্তিকার সাথে সাহিলের বন্ডিং বেশ ভালো।
“- আপনি যা পারেন, আমিও তো তা পারি না”।
কৌতুহলি হয়ে তাকায় মৃত্তিকা। বলে,
“- আমি কি পারি”?
“- আপনি তো পড়ালেখায় অনেক ভালো মৃত্তিকা। টিউশন করান, ইরহামের খেয়াল রাখেন, পরিবারের খেয়াল রাখেন। এসব কি আমি পারি?”
মৃত্তিকা খিলখিল করে হাসে। হেসে কথা বলে সাহিল নিজেও। মৃত্তিকার মনে হয় অত্র এলাকায় সাহিলের মতো ছেলে পাওয়া দুষ্কর। তার অবসর কাটে বৃদ্ধার সাথে। ঘোরাঘুরি হয় বৃদ্ধার সাথে হাসপাতাল কিংবা পার্কে যাওয়ার সময়। নিজের বলে কিছুই নেই ছেলেটার। সব উজার করে দিয়ে বৃদ্ধাকে ভালো রাখার চেষ্টা করে ছেলেটা।
চা কাপে ঢেলে দেয় সাহিল। মৃত্তিকা গরম চা খেতে পারে না। শরবত বানিয়ে তবেই খায়। তার খাওয়ার ধরণ দেখে সাহিল নত কণ্ঠে বলে,
“- আমাকে বললে আপনাকে শরবত বানিয়ে দিতাম। চা ঠাণ্ডা করে যারা খায়, তারা অদ্ভুত। চায়ের স্বাদ নষ্ট করে চা খায়”।
“- ঠাণ্ডা করে খেলে চায়ের স্বাদ নষ্ট হয়”?
“- অবশ্যই। গরম গরম খিচুড়ি খেতে যেমন মজা, তেমন গরম চা খেতেও মজা। শরীরকে সতেজ, কর্মক্ষম করে দেয় এই চা। উষ্ণতা এদের মূল বৈশিষ্ট্য”।
চায়ের টেস্ট দারুণ। সাহিল রান্নাবান্না এবং মেয়েলি কাজে এক্সপার্ট। মৃত্তিকা অনেকক্ষণ সময় কাটিয়ে আযান দেওয়ার আগে বাড়ি ফেরে। বাড়ি ফিরতেই সে দেখে ইরহামকে জাহানারা মারছে। ছেলেটার মুখে ভাতের দলা। ঠোঁটের আশপাশে মাছের ঝোল আর দানা লেগে আছে। মায়ের হাতে দাবাং মার্কা কিল খেয়ে ছেলেটা মুখে ভাত নিয়েই ভ্যা ভ্যা করে কাঁদছে। মেহমেত ভাই ওয়াশরুম থেকে ধমক দিচ্ছে জাহানারে। তবুও জাহানারা থেমে নেই, ধমকে যাচ্ছে ছেলেকে।
“- মুখের ভাত গিল। দৌড়ালে আরো মারবো”।
কান্না করতে করতে ইরহামের নাকে সর্দি জমেছে। নোনা পানি পরছে গাল বেয়ে। মৃত্তিকার বুকটা জ্বলে ওঠে। দ্রুত গিয়ে কোলে নেয় ছেলেটাকে। বুকের সাথে ইরহামের এঁটো মুখটা চেপে ধরে জাহানারাকে বলে,
“- মারছো কেন ভাবি?”
জাহানারা রাগমিশ্রিত কণ্ঠে বলে,
“- এক ঘন্টা ধরে ওর পেছন পেছন ঘুরছি। ভাত শেষ হয় না। এই পেট নিয়ে আমি পারি ওর সাথে”?
মৃত্তিকা বলে,
“- আমাকে দাও, আমি খাইয়ে দিচ্ছি”।
ঠোঁট বাঁকায় জাহানারা। খুব বিরক্তিকর কণ্ঠে বলে,
“- কাজ করার ভয়ে উপরে গিয়ে বসে আছো। এখনই ফিরলে কেন? রাত হলে ফিরতে। শুক্রবারের দিন, তোমার ভাই বাসায়। তার খেদমত করতে গিয়ে জীবন চলে যাচ্ছে”।
জাহানার খোঁচা ঠিকই ধরতে পারে মৃত্তিকা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত কণ্ঠে বলে,
“- রোজ তো আমিই সব করি। তোমাকে কিছু করতে দিই না। তবুও এভাবে বলতে পারো কি করে”?
তোয়ালে গিয়ে কাঁধ মুছতে মুছতে মেহমেত বেরিয়ে আসে। মৃত্তিকাকে দেখে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
“- সারাদিন কোথায় ছিলি মৃত্তি”?
“- উপরের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলাম। নানুর সাথে দেখা করতে”।
“- আজ সাহিল বাসায় না”?
“- হ্যাঁ বাড়িতেই”।
“- তাহলে ওই বাড়িতে গেলি কেন? জোয়ান ছেলে বাড়িতে। শুনলাম সাহিলের সাথে খুব কথা বলিস আজকাল”।
মুচড়ে ওঠে মৃত্তিকার হৃদয়। মেহমেতের স্বাভাবিক কণ্ঠে যে অপমান ছিল, তা বুঝতে বেগ পেতে হয় না মৃত্তিকার। এসব কথা ভাবি ছাড়া আর কেউ বলবে না। সাহিলের সাথে তার টুকটাক কথা হয়। একজন প্রতিবেশীর সাথে যেভাবে, যে কারণে কথা হয়, মৃত্তিকাদের মাঝেও তেমনই স্বাভাবিক আলাপ থাকে। এই ছোট্ট বিষয়টাকে ভাবি বোধহয় বড় করে দেখেছে। সে নেই, সুযোগ বুঝে ভাইয়ের কানে কুৎসা রটিয়েছে। মৃত্তিকা ভেবে পায় না এসব করে কি লাভ হয় জাহানারার? মৃত্তিকার খরচ বহন করতে হয় বলে? মৃত্তিকার বিয়ের বয়স হওয়া সত্বেও বিয়ে না করে রয়েছে বলে?
“- হয় তো”।
“- ইয়াসিন কিন্তু ভদ্রই ছিল, তবুও যা করল। তোর পছন্দ যে ভালো না, এর প্রমাণ আগে পেয়েছিস। এ ভুল আর করিস না”।
শিউড়ে ওঠে মৃত্তিকা। কি বলতে চায় ভাইয়া? কি বোঝাতে চায়? আকারে ইঙ্গিতে মৃত্তিকার বিয়ে ভাঙার বিষয়টা টেনে আনছে ভাইয়া? তার নিজস্বতাকে অপমান করছে? মৃত্তিকাকে তো চেনে মেহমেত। জানে সে কেমন স্বভাবের মেয়ে। তবুও কেন বউয়ের কথায় এত বড় আঙুল তুলল মৃত্তিকার দিকে? কেন এভাবে বলল? কিছু বলার রুচি মরে যায় মৃত্তিকার। ইরহামকে নামিয়ে দিয়ে বলে,
“- ভুল মানুষ মাত্রই হয় ভাইয়া। আমি যেমন মানুষ চিনতে ভুল করেছি, তুমিও তেমনই মানুষ চিনতে প্রতিনিয়ত ভুল করো”।
মৃত্তিকার ভাবির বয়স ছাব্বিশ। দেখতে সুন্দর, গায়ের রঙ উজ্জ্বল। ইরহাম হওয়ার পর মাথায় চুল নেই তেমন। মৃত্তিকার কথায় কঠোর সুরে সে বলে ওঠে,
“- কাকে চিনতে ভুল করেছে”?
মৃত্তিকা ঠাণ্ডা মাথায় বলে,
“- তোমাকে চিনতে ভুল করেছে। ভাইয়া ভেবেছিল তুমি আমাদের সংসারটাকে আগলে রাখবে, পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে ভালোবাসবে। কিন্তু দেখো, কি হচ্ছে তোমাকে দিয়ে”।
মেহমেতকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“- ভাইয়া, তুমি আমায় চেন। জানো আমি কেমন মেয়। ভাই হয়ে নিজের বোনের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলো না। সাহিল ভাইকে আমি ভাই মনে করি, অন্য কোনো ভাবনা আমার মাথাতে নেই। তোমার মাথায় যা আছে তা অন্য মাথা থেকে ট্রান্সফার করা। তাই বলবো, নিজের বুদ্ধিতে চলতে না পারো, অন্যের বুদ্ধিতে চলিও না”।
এক মুহুর্ত দাঁড়ায় না মৃত্তিকা। জাহানারার চেঁচামিচি শোনা যায়। মেহমেত ও রেগে গেছে। মৃত্তিকার অবশ্য তাতে যায় আসে না। মেনে নিতে নিতে ক্লান্ত সে। এখন আর সয় না, চুপ থাকতে মন চায় না। ভেতরের দৈব সত্তা আজকাল প্রতিবাদ করে ওঠে। তার হৃদয়কে ভেঙে দিয়েছে ওরা। মৃত্তিকা ভুল করেছে, তার খেসারত তো দিচ্ছে। কই বাবা-মা তো এ নিয়ে আজেবাজে কথা শোনায় না। জাহানারা কেন মৃত্তিকার পেছনে পরে আছে? কেন কলঙ্ক লাগাচ্ছে? জবানকে কেন নিয়ন্ত্রণ করছে না?
মৃত্তিকা গোসল করে ভালো একটি জামা পরে। আতিকুর রহমান বাড়ি ফিরলে তাকে খেতে দেয় মৃত্তিকা। বেলকনিতে কিছু গাছ লাগিয়েছিল সপ্তাহ খানেক আগে, সেগুলোতে পানি দেয়। মেহমেত নামাজে যায়। জাহানারা মুখে কুলুপ এঁটেছে। মেহমেতের সামনে এক চোট কেঁদেছে সে। ইনিয়েবিনিয়ে সে যে সুখে নেই, বাচ্চা পেটে নিয়ে তাকে যে কষ্ট করতে হচ্ছে সেসবই বুঝিয়েছে মেহমেতকে। মেহমেত নাদান বালক। জাহানারাকে সে প্রচণ্ড বিশ্বাস করে। প্রেমের বিয়ে, তাই একে অপরের প্রতি বিশ্বাস, ভরসা অনেক বেশি। তাদের মাঝেকার বন্ধন মৃত্তিকার পরিবারকে ভেঙে দেয়।
তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি বেয়ে নামছিল মৃত্তিকা। সিঁড়িতেই সাহিলের সাথে দেখা হলো মৃত্তিকার। ছাত্রীর পরীক্ষা সামনে৷ নিয়ম করে দু বেলা পড়াতে যেতে হবে তাকে। বিনিময়ে টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে দেবে বলেছে ছাত্রীর গার্ডিয়ান। সকাল নয়টায় বাচ্চার স্কুল, সাড়ে সাতটায় যেতে বলেছে মৃত্তিকাকে। মৃত্তিকা বাড়ি থেকে বেরিয়েছে সাতটার পরে। সাহিলের অফিস আছে। কিছুটা দূরে বলে আগেভাগে বেরিয়ে পরেছে সে। মৃত্তিকাকে দেখে হাসি মুখে সাহিল বলে,
“- এত তাড়াহুড়ো করে কোথায় যাচ্ছেন”?
বিনিময়ে হাসে মৃত্তিকা। ব্যাগটা কাঁধে চেপে বলে,
“- পড়াতে যাচ্ছি”।
দুজনে বেরিয়ে আসে পথে। সকালে রিকশা পাওয়া ঝামেলার। ওদিকে দুজনেরই যাবার তাড়া খুব। একটি রিকশা পেতেই সাহিল বলে,
“- চলুন একসাথে যাই। একা গেলে যে ভাড়া, দুজন গেলেও সেই ভাড়া। একজনের ভাড়া অন্তত বেচে যাবে”।
মৃত্তিকা দ্বিধায় পরে। গতকাল মেহমেতের মুখে ওসব শোনার পর সাহিলের সাথে কথা বলতে মন টানে না তার। আইঢাই করে বলে,
“- আপনি চলে যান ভাইয়া, আমি আসছি”।
সাহিল বুঝদার ছেলে। একটু ভেবে সে বলে,
“- আমি মামার পাশে বসছি, আপনি পিছনে বসুন।”
মৃত্তিকার এবার অস্বস্তি হতে লাগল। মানুষটা এত ভালো, এভাবে বলছে, তার যাওয়া উচিত। কিন্তু সে পেছনে আরামে যাবে আর সাহিল ভাই কষ্ট করে বসে যাবে তা ভালো দেখায় না। মৃত্তিকা বাধ্য হয়ে বলে,
“- একসাথেই বসি, সমস্যা নেই”।
মৃত্তিকা বসল প্রথমে। মাঝে দুরত্ব রেখে বসল সাহিল। রিকশা চলতে লাগল। মোড় ঘুরতেই আফিম ও তার দলবলকে দেখতে পায় মৃত্তিকা। আফিম বন্ধুদের সাথে বসে আছে। বাইকে ওদিক ফিরে ছিল সে। রায়ানের ইশারা পেয়ে সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় মৃত্তিকার দিকে। মৃত্তিকা তাকিয়ে ছিল আফিমের পানে। তাই দুজনের দৃষ্টি একত্রিত হয়ে পরে। আফিমের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে মুখ থুবড়ে পরে মৃত্তিকার নির্মল চাহনি। সাথে সাথে চোখ ফিরিয়ে নেয় মৃত্তিকা। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর সে আর সাহিল নেমে যায়। মৃত্তিকা হেঁটে গলিতে ঢুকে পরে, সাহিল পথের কাছের অফিসে চলে যায়।
দেড় ঘন্টা পরে টিউশন করিয়ে পথে এসে দাঁড়াতেই আফিমকে দেখতে পায় মৃত্তিকা। তাকে এখানে দেখে মৃত্তিকা চমকায় খুব। আফিম বেশ স্বাস্থ্যবান। পেশিবহুল গা তার। হাজার জনের মাঝে আলাদা করে চোখে পরার মতো মানুষ সে। আজ ছেলেটা কালো পাঞ্জাবি পড়েছে। কয়েকটা ছেলের সাথে কথা বলছে দাঁড়িয়ে। পাঞ্জাবির হাতা গোটানো, চুলগুলো গুছিয়ে রাখা। মৃত্তিকা মাথা নিচু করে আফিমকে ক্রস করে চলে যেতে চায়। আফিম ঠিকই অনুভব করে মৃত্তিতার অস্তিত্ব। পাশ ফিরে চেয়ে বলে,
“- মৃ্ত্তওও”।
থেমে যায় মৃত্তিকার পা। নত মুখ তুলে বলে,
“- জি”?
আফিম তার বন্ধুদের উদ্দেশ্য করে বলে,
“- তোরা যা, আমি আসছি”।
ছেলেগুলো মিটিমিটি হেসে চলে গেল। মৃত্তিকা দাঁড়িয়ে রইল আফিমের কথা শোনার জন্য। আফিম মৃত্তিকার পুরো মুখে নজর বুলায় বেশ কয়েকবার। অস্বস্তি দানা বাঁধে মৃত্তিকার দেহে। মিইয়ে আসা কণ্ঠে বলে,
“- কিছু বলবেন”?
“- ছেলেটা কে ছিল মৃত্ত”?
মৃত্তিকা বিস্মিত হয় খুব। সাহিলের কথা বলছে আফিম? আফিমের তার প্রতি এহেন কৌতুহলী দৃষ্টি মৃত্তিকাকে নাস্তানাবুদ করে। সে কস্মিনকালেও ভাবেনি আফিম এ সময় এ প্রশ্ন করে বসবে। করার অধিকারও তো নেই।
“- ভাই হয়”।
“- মেহমেত ভাইকে আমি চিনি। মিথ্যে বলবে না, মানায় না তোমাকে”।
“- উপরের ফ্ল্যাটে থাকেন সাহিল ভাই”।
মাত্রাতিরিক্ত গম্ভীর লাগছে আফিমকে। মৃত্তিকা ছেলেটার এই গম্ভীরতায় ভীত হয়ে পরে। আফিম পরবর্তীতে এমন একটি কথা বলে, সে কথা শুনে মৃত্তিকার রক্ত হীম হয়ে যায়। আফিম খুব স্বাভাবিক, রাগ-জেদ ছাড়াই, খুব শান্ত কণ্ঠে বলে,
“- দ্বিতীয়বার সাহিলকে তোমার আশেপাশে দেখলে ওকে আমি খুব মারবো মৃত্ত। তোমার কান্নাকাটির ধার ধারবো না আমি”।
আফিমের কণ্ঠে জোর ছিল না। ঠাণ্ডা মাথায় মৃত্তিকাকে শাসাল ছেলেটা। মৃত্তিকা উপলব্ধি করল আফিম আসলেই বখাটে ছেলে। যখন যা ইচ্ছে হয় করে ফেলে সে। কারো মতামতের ধার ধারে না আফিম, ন্যায়-অন্যায় বোঝে না। এরকম একটা মানুষের সামনে থাকতেও মৃত্তিকার ভয় হয়। শুষ্ক ঢোগ গিলে সে। বলে,
“- এরকম বলছেন কেন? সাহিল ভাই ভালো মানুষ”।
“- সমস্যা এখানেই। সাহিল ভালো হলেও আমি ভালো নই মৃত্ত। আমি চাই না ভালো কারো সংস্পর্শে আপনি থাকুন”।
মৃত্তিকার মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে আসে। বলার মতো কোনো ভাষাই খুঁজে পায় না মেয়েটা। মাথা থেকে সরে যায় মৃত্তিকার ওড়না। বেরিয়ে পরে সুদীর্ঘ অনাবৃত কেশ। মৃত্তিকার চুলগুলো খুলে রাখা। আলখাল্লার মতো ওড়না জড়িয়ে রাখলেও ওড়নার চওড়া অংশ পেরিয়ে চুলের আগা উঁকি দিচ্ছে। আফিম মোহগ্রস্তের ন্যায় তাকিয়ে রয় নিষ্পাপ, ভীত মুখ পানে। বলে,
“- চুলগুলো বেধে নাও মৃত্ত”।
“- কেন”?
“- ওরা তোমার সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমার চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে মৃত্ত”।
মৃত্তিকার এখন ভয় হয় আফিমের কথায়। কোনো রকমে সাহস সঞ্চয় করে বলে ওঠে,
“- আপনি আমার সাথে বখাটেপনা করতে পারেন না”।
আফিম রূঢ় কণ্ঠে বলে,
“- আমি এখনো কিছুই করিনি”।
“- আপনার কথা গুলো অযৌক্তিক। কেউ আমার পাশে থাকলে তার উপর আক্রমন করবেন কেন? কোন সাহসে”?
“- সাহসের দেখেছো কি? এক সাথে, এক রিকশায় কে চড়তে বলেছিল তোমাকে”?
আফিমের শান্ত স্বরে কাঠিন্যতা ঠিকরে বেরিয়ে আসে।
মৃত্তিকার রাগ বাড়ে তড়তড়িয়ে৷ কোনোরূপ বাক্য ব্যয় না করে সে এগিয়ে যায়। পিছু পিছু হেঁটে যায় আফিম। মৃত্তিকা তড়িঘড়ি করে একটা অটো ডাকে। অটোতে বসেই তাড়া দেয় চালককে। আফিম হাসে তাতে। অটোওয়ালার দিকে ভাড়াটা এগিয়ে দিয়ে বলে,
“- একাই নিয়ে যাবেন। অটো থামিয়ে লোক তুলবেন না”।
অটোওয়ালা আফিমকে চেনে ভালো মতো। বললেন,
“- চিন্তা করবেন না, ঠিক মতো পৌঁছাই দিমু”।
ইয়াসিন গত রাতে বাড়ি ফেরেনি। কি এক কাজে আটকে গিয়েছে বলল। একটু আগে রুবিকে কল করে জানায় সে বাড়ি ফিরছে। রুবিকে নিয়ে বের হবে একটু। রুবি যেন তৈরি হয়ে থাকে।
রুবি সাজগোছ করে বসে আছে ইয়াসিনের অপেক্ষায়। ইয়াসিন আসে একটু দেরি করেই। ইয়াসিনের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে যায় রুবি। ইয়াসিনের কপাল কেটে গেছে, নাক ফুলে গেছে, ঠোঁটের কোণে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। রুবি ছুটে আসে ইয়াসিনের কাছে। ইয়াসিনেের গালে হাত রেখে আহত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“- কি হয়েছে তোমার? কেটে গেল কিভাবে এতটা”?
রুবির হাত সরিয়ে দেয় ইয়াসিন। আয়নায় গিয়ে দেখে সে নিজেকে। মার খেয়ে অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল রাতে। তাই বাড়ি ফেরেনি। ফিরলেই অনেক অনেক প্রশ্নের তোপে পরতে হতো। রুবির পানে চেয়ে রাগান্বিত কণ্ঠে ইয়াসিন বলে,
“- এলাকার বখাটে ছেলে, আফিম মেরেছে”।
রুবি অবাক হয়ে শুধোয়,
“- আফিম ভাই?, ওইযে সুন্দর করে ছেলেটা?”
“- হু”।
“- কেন মেরেছে”?
“- জানি না”।
“- তুমি যে বললে ঘুরতে নিয়ে যাবে”?
“- যাবো, চেঞ্জ করে আসছি”।
রুবি দ্বিধায় ভোগে। নড়েচড়ে বলে,
“-, থাক আজ যাবো না”।
“- কেন”?
“- তোমার মুখের অবস্থা দেখেছো? দেখতে ভয়ঙ্কর লাগছে তোমাকে। আমি তোমার সাথে এখন কোথাও যাবো না। লোকে দেখলে কি বলবে”?
ইয়াসিন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে রুবির দিকে। রুবি বুঝতে পারে সত্য কথাটা এভাবে বলা ঠিক হয়নি। দোনামনা করে ভুল শুধরে সে বলে,
“- আরেহ, তুমিই বলো, এভাবে যাওয়া যায়? তুমি অসুস্থ। রেস্ট নাও, খাওয়াদাওয়া করো। এই শরীর নিয়ে আর বের হতে হবে না”।
রুবি খাবার আনতে যায়। ইয়াসিনের হঠাৎই মৃত্তিকার কথা মনে পরে। আয়নায় ভেসে ওঠে মেয়েটার নিষ্পাপ, উজ্জ্বল মুখ, গভীর নেত্রযুগল, ফুলে থাকা গাল। মেয়েটা বড়ই আদুরে। চেয়ে থাকতে ক্লান্তি আসে না। সেবার জ্বরে পরেছিল ইয়াসিন। তেমন জ্বর নয়। তবে খাবারের উপর থেকে রুচি উঠে গিয়েছিল। কোনো কিছুই খেতে মন চাইতো না, তেঁতো বিদঘুটে লাগতো সবকিছু। সে খেতে পারছে না জানার পর মৃত্তিকা খুব দুশ্চিন্তায় পরে গিয়েছিল। নিজ হাতে পাটায় বেটে ছয় রকমের ভর্তা করেছিল ইয়াসিনের জন্য। ভর্তাগুলো খাঁজ বিশিষ্ট বাটিতে ভরে নিয়ে এসেছিল একটি খোলা জায়গায়। ইয়াসিন জ্বর নিয়েও এসেছিল মেয়েটির আহ্বান শুনে। কিছুই খেতে না পারা ইয়াসিন ভর্তার মায়ায় পরে খোলামেলা বেঞ্চে বসে এক প্লেট ভাত খেয়ে ফেলেছিল। দেখেছিল মেয়েটির চোখের জল, হাতের দাগ, লালচে হয়ে আসা হাতের তালু। দেখেই ধরে ফেলেছিল মৃত্তিকার হাত জ্বলছে। বেশ কয়েকবার হাতের পিঠে ফু দিয়ে মেয়েটা জানান দিচ্ছিল তার ব্যথার পরিমাণ। বুঝতে পেরে ইয়াসিন নিজেও বাতাস করেছিল মেয়েটার হাতে।
সেসব এখন অতীত। সামান্য জ্বরে মৃত্তিকা দুশ্চিন্তায় হেলে পরেছিল। আর রুবি? কেটে যাওয়া কপাল, ফুলে যাওয়া নাক, রক্ত জমাট বাঁধা ঠোঁটের দিকে চেয়ে ভয়ে পালিয়েছে। আশ্চর্য! দুজনের মাঝে কি আকাশ পাতাল তফাৎ। মৃত্তিকা, এক সাদামাটা রমণী। ইয়াসিনের মনে পরে না সে কখনো মৃত্তিকাকে জড়িয়ে ধরেছিল কিনা, চুমু খেয়েছিল কিনা, কখনো হাত বাড়িয়ে গাল ছুঁয়েছিল কিনা। সেই জ্বরের ঘোরেই মৃত্তিকার হাত ধরেছিল। তার হাতে বাতাস করেছিল। ব্যাস এটুকুই, মেয়েটা কখনো তার ধারে ঘেঁষতে দেয়নি ইয়াসিনকে। তাদের মাঝে অশ্লীল আলাপও হয়নি কখনো। বিয়ে ঠিক হওয়ার পরেও পুতুপুতু আচরণ করেনি মৃত্তিকা। ইয়াসিনকেও সে সুযোগ দেয়নি। মেয়েটার ব্যক্তিত্ব বোধ ছিল প্রখর, আত্মসম্মান, পবিত্রতা বরাবরই মুগ্ধ করতো ইয়াসিনকে। কিন্তু ওইযে, ইয়াসিন খারাপ। খারাপ বলেই রুবির মায়ায় পরেছিল। রুবির অঙ্গভঙ্গি তার দেহ-মনকে অপবিত্র করে ফেলেছিল। গোপনে তার সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পরেছিল ইয়াসিন। ভেবেছিল মৃত্তিকা এসব ঘুণাক্ষরেও টের পাবে না। কারণ মেয়েটা বোকা, সাধাসিধা। দশ কথায় রা কাটে না, তর্কও করে না। অন্যের মতামতের প্রতি মৃত্তিকার সম্ভাবনা ছিল।
কিন্তু এক দমকা হাওয়ায় ছিন্ন হলে সম্পর্কের বন্ধন। ইয়াসিন আর রুবি শপিংমলে গিয়েছিল। লিফটের ওদিকে কেউ না থাকায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছিল নিবিড় ভাবে। রুবি ছটফট করছিল, গোঙাচ্ছিল। তার আহ্বান আরো নিয়ন্ত্রণের বাঁধ ভেঙে দিয়েছিল ইয়াসিনের। কাল, স্থান ভুলে ঘনিষ্ঠ হতে চেয়েছিল। তাদের এই অন্তরঙ্গ মুহুর্তটা যদি মৃত্তিকা না দেখতো? ভালো হতো না?
রুবি ঘরে ফিরে খাবার নিয়ে। ইয়াসিন গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
“- একটু গরম পানি করে তোয়ালে ভিজিয়ে নিয়ে এসো। ক্ষত স্থানগুলো পরিষ্কার করতে হবে”।
“- সে কি? তুমি ফার্মেসিতে যাও নি”?
“- না”।
হতাশ হলো রুবি। গরম পানি আর স্যাভলন দিয়ে তোয়ালে ভিজিয়ে ইয়াসিনের ক্সত স্থানগুলো পরিষ্কার করে দিল সে। ইয়াসিন রুবিকে দেখল মন দিয়ে। মৃত্তিকা যেভাবে যত্ন নিতো, তার চোখে যতটা বেদনার রেশ দেখা দিতো, রুবির চোখে মুখে তা নেই। বিরক্ত ভঙ্গিতে ইয়াসিনের ক্ষত পরিষ্কার করে হাফ ছেড়ে বাঁচে সে। রুবির শাশুড়ি ডাকে রুবিকে। নিজের ঘর থেকে চেঁচিয়ে রুবিকে চা করতে বললে রুবি রেগে যায়। সে যায় না শাশুড়ির ঘরে। ইয়াসিনের সামনে প্লেট বাড়িয়ে দিয়ে উচ্চস্বরে বলে,
“- আপনার ছেলে মাত্রই এসেছে। দুদণ্ড কথা বলবো, সেটুকু সময়ও দেবেন না? তানভি কি করছে? ওকে বলুন চা বানাতে।”
রুবির শাশুড়ি বলে,
“- তানভি পড়তে বসেছে, ওর পরীক্ষা চলে। কথাবার্তা একটু সাবধানে বলো”।
খেঁকিয়ে উঠে রুবি বলে,
“-, দুপুরে কে পড়তে বসে মা? কাজের বুয়া পেয়েছেন আমাকে? আমি সব করবো কেন? মেয়েকেও কিছু শিক্ষা দিন। আমার বাড়িতে কাজের লোক ছিল। আমি তাকে নিয়ে আসবো, তবুও আমাকে খাটাবেন না”।
পর্ব সংখ্যা [৮]
সন্ধ্যে বেলায় পড়তে বসেছে মৃত্তিকা। ইরহাম এই ভর সন্ধ্যায় ঘুমিয়েছে। মেহমেত ভাই গিয়েছে দোকানে আড্ডা দিতে। পড়ার মাঝে বাহির থেকে আগত চিৎকার চেঁচামিচি শুনে ছলকে ওঠে মৃত্তিকার হৃদয়। টেবিল ছেড়ে বই নিয়ে ছুটে যায় বেলকনিতে। তাদের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরের রাস্তায় গোলমাল হচ্ছে। প্রচুর ভিড় জমেছে সেখানে। আফিমের তীব্র কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে । মৃত্তিকা ফোঁস করে শ্বাস টেনে বেলকনির দটজা লাগিয়ে দেয়। হতাশ হয়ে বলে,
“- এই পাগলকে আবার কে ক্ষেপিয়ে দিল”?
মেহমেত বাড়ি ফিরল রাত করে। ইরহামের সাথে জাহানারাও ঘুমিয়েছে। মেহমেত ফিরলে তার খাবারটা গরম করে দিল মৃত্তিকা। কারেন্ট চলে গেল তখনই। ঘর থেকে হাত পাখা এনে বাতাস করতে লাগল ভাইকে। খেতে খেতেই মেহমেত বলল,
“- কে যেন একটা বাচ্চা ছেলের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। এই বিচার চেয়ে রাস্তায় বসে আছে আফিম আর তার দলবল। আফিমকে চিনিস”?
মৃত্তিকার দিকে চেয়ে কথাটা বলল মেহমেত। মৃত্তিকা বলল,
“- চিনি”।
“- বখাটে ছেলে। কোনো কাজ কাম নেই। সারাদিন মারামারি করবে, আর অন্যদের বিরক্ত করবে। কার না কার ছেলের মাথা ফেটেছে, এই অভিযোগ জানিয়ে রাস্তায় বসে আছে। গাড়ি চলাচল করতে দিচ্ছে না। যে লোক বাচ্চাটাকে মেরেছে সে আবার ধনী লোক বুঝলি? মনে হয় পুলিশের কাছে গিয়ে মামলা ঠুকে দিয়েছে। পুলিশ দেখলাম ওকে আর ওর বন্ধুদের ধরে নিয়ে গেল।”
শেষের কথাটায় আঁতকে ওঠে মৃত্তিকা। জবান বন্ধ হয়ে যায় ওর। আফিমকে পুলিশে ধরেছে। এখন সে জেলখানায় বন্দি? মৃত্তিকা ভাইয়ের থেকে আরো কথা শুনতে চায়। জিজ্ঞেস করে,
“- আফিম মানে ওই ছেলেটা তো অনেক ধনী। বোধহয় ছাড়া পেয়ে যাবে”।
হাসে মেহমেত। গোস্তর হাড্ডি চিবিয়ে গুড়ো করে অন্য প্লেটে ফেলে। বলে,
“- হ ওর বাবা আশরাফ মির্জা ধনী মানুষ। আফিম মানে ওই বখাটে ওর বাপের ধার ধারে না তো। বাপের কথাই শোনে না। বাপ উচ্চবিত্ত, বিখ্যাত মানুষ, তার সুনাম শহর জুড়ে। আর ছেলে, ছেলে হয়েছে কুখ্যাত। আশরাফ মির্জা মনে হয় না পুলিশ স্টেশনে ঢুকবে। মান-সম্মানের একটা ব্যাপার-স্যাপার আছে না? ছেলে বারবার মারামারি করে জেলে ঢুকবে, বারবার ছাড়াতে যাবে? আর আফিম ওর বাপের সাহায্য নেবে না। এক এলাকায় আছি তো, চিনি ছেলেটাকে। যদি আশরাফ মির্জার পরিচয় নিয়ে বিচার চাইতো, ঠিকই পেতো। পুলিশও সম্মান দিতো। বখাটে হয়ে বিচার চেয়েছে, পাবে না”।
মৃত্তিকার না চাইতেও মনটা খারাপ হয়ে গেল। ছেলেটা অতটাও খারাপ না, আবার খারাপও। কোনো এক বাচ্চার জন্যই আফিম কারাগারে বন্দী। কিন্তু কোন বাচ্চা? কেনই বা মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে ছেলেটার? মেহমেত নিজেই সেই প্রশ্নের উত্তর দিল। নিজে থেকেই বলল,
“- একটা ছেলে আছে এলাকায়। নাম মনে হয় সুমন। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল সাইকেল চালিয়ে। এক ধনী লোকের গাড়ি ওর সাইকেলটাকে ধাক্কা দিয়েছে। সেভাবে আঘাত পায়নি তখন। ধাক্কা খেয়ে ইটের উপর পরেছে। মাথা ফেটে দু ভাগ হয়ে গেছে প্রায়। অনেক টাকা লাগবে, এত টাকা পাবে কই? পেলেও ছেলেটা যে কষ্ট পেল, এর দায়ভার ওই গাড়িওয়ালা নেবে? আফিম ঠিকই করেছে। কিন্তু এত বড় লোকের সাথে টক্কর দেয়া ঠিক হয় নাই”।
মৃত্তিকা সবটা বুঝতে পারে। এবারে তার মনটা দ্বিগুণ খারাপ হয়ে যায়। সারা রাত আর ঘুম আসে না মেয়েটার, প্রচণ্ড অস্থির লাগে। বিচার চাইতে গিয়ে আফিম কারাগারে ঢুকল?, কি করছে ছেলেটা? গজগজ করতে করতে পুলিশকে গালি দিচ্ছে নাকি ঠাণ্ডা মাথায় জেলের শিকল গুলোয় মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে?
খুব সকালে মৃত্তিকা তৈরি হয়ে নিল। সকালে সে ইলিশ মাছ রেঁধেছিল। কয়েক পিস বেশিই রেঁধেছিল। ওর ইচ্ছে হয়েছে আফিমের সাথে দেখা করার। বেশ কয়েকবার তাকে বাঁচিয়েছে আফিম। ইয়াসিনের হাত থেকে দু বার বাঁচিয়েছে, বিভিন্ন ভাবে সাহায্য-সহযোগীতাও করেছে। মৃত্তিকা তো বেশি কিছুই করবে না। রান্না করা খাবারগুলো নিয়ে কনস্টেবল কে দিয়ে বলবে আফিমদের দিয়ে দিতে। কেউ জানবে না এসব। গোপনে এটুকু দয়া করবে আফিমকে।
খুব লুকিয়ে চুরিয়ে বেরিয়ে পরে মৃত্তিকা। বড় একটা টিফিন বক্সের তিনটি বাটিতে ভরে ভরে ভাত নিয়েছে সে। আর একটায় তরকারি নিয়েছে। প্রথমবার পুলিশ স্টেশনে ঢুকে মৃত্তিকার হাত পা কাঁপছিল থরথর করে। একজন কনস্টেবলকে আফিমের কথা বলতেই সে থানার এস আই কে জানায়। মৃত্তিকা এস আই কে জানায় সে আফিমের বাড়ির লোক। কিছু খাবার দিতে এসেছে। খাবারটা ওকে দিয়ে দিলেই মৃত্তিকা চলে যাবে।
কনস্টেবলের হাতে খাবার ধরিয়ে দেয় মৃত্তিকা। কনস্টেবল খাবার নিয়ে সেলে যায়। আফিমের সাথে তার কি কথা হয় জানে না মৃত্তিকা। সে একটি বেঞ্চে বসে থাকে। কনস্টেবল ফিরে আসে টিফিনবাক্স হাতে নিয়ে। বলে,
“- ওরা খেতে চাইছে না”।
মৃত্তিকা আহত হয়। ছেলেটা এত ঘাড়ত্যাড়া কেন? সারা রাত ধরে জেলে আছে, নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে। বড়লোক ঘরের ছেলে, সেলের খাবার কি তার মুখে রুচবে? মৃত্তিকা এস আই কে অনুরোধ করে আফিমের সাথে দেখা করতে দেবার জন্য। এস আই অনুমতি দিলে ধীর পায়ে সে এগিয়ে যায় সেলের দিকে। তিন নম্বর সেলে আফিম বসে আছে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে। পরনে গতকালকের সেই কালো পাঞ্জাবি। লোকটাকে বড় ক্লান্ত দেখাচ্ছে। রূপক, শান্ত, রায়ান মনমরা হয়ে বসে আছে। মৃত্তিকার অজানা কারণে বুক কেঁপে ওঠে। ধীর কণ্ঠে ডেকে ওঠে,
“- আফিম”।
চোখ বুজে ছিল ছেলেটা। মৃত্তিকার গলা শুনেও তাকায় না সে। বিড়বিড় করে বলে,
“- ধুরর, এই মেয়েটা মাথা থেকে যাচ্ছেই না। এখন ওর কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছি ছ্যাহ্”।
তার কথা শুনতে পায় না মৃত্তিকা। তবে রূপক, রায়ান শান্ত মৃত্তিকাকে দেখে এতটাই চমকে যায় যে একে অপরের দিকে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে ইশারায় বোঝায় “ আমি যা দেখি, তোরাও কি তাই দেখিস”? ওদের ভড়কে যাওয়া দেখে বিব্রত হয় মৃত্তিকা। আঁটসাঁট হয়ে দাঁড়ায়। রায়ান আফিমকে কনুই দিয়ে গুঁতা দেয়। বলে,
“- আফিম, মৃত্তিকা এসেছে”।
সাথে সাথে চোখ মেলে আফিম। মৃত্তিকাকে সেলের ওপ্রান্তে দেখে বিস্ফোরিত চোখে চেয়ে রয়। উঠে এসে সেলের শিকল চেপে ধরে বলে,
“- তুমি এখানে কি করছো মৃত্ত”?
আবারও সেই ডাক। চোটপাট করতে গিয়েও থামে মৃত্তিকা। বলে,
“- আপনার জন্য খাবার পাঠিয়েছিলাম, আপনি ফিরিয়ে দিয়েছেন কেন”?
শিশুসুলভ ভঙ্গি মৃত্তিকার। আফিম বলে,
“- আমি ভেবেছি আশরাফ মির্জা কাউকে দিয়ে খাবার পাঠিয়েছে”।
“- সে পাঠালে খাবেন না? আপনি আপনার বাবাকে জানাচ্ছেন না কেন? জানালেই তো সে আপনাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়”।
আফিম ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। বলে,
“- ওরা আমাকে এমনিতেই ছেড়ে দেবে। কতক্ষণ আটকে রাখতে পারে আমিও দেখবো। বাবা যদি আসে, আর ওরা আমাকে ছেড়ে দেয় তবে আমার নিজস্বতা রইল কই? আমি ক্ষমতার দাপট দেখাতে আসিনি, বিচার চাইতে এসেছি। ওই ছোট বাচ্চার বাবা-মার চোখের পানির হিসেব নিতে এসেছি”।
“- আপনার বাবা আসেননি দেখা করতে”?
“- না, আমি যতক্ষণ না বলবো ততক্ষণ আসবে না। বাবা জানে তার দয়া আমার প্রয়োজন হয় না”।
একটি মহিলা গার্ড খাবারটা ঢুকিয়ে ফের তালা দেয় সেলে। আফিম দুর্বল চোখে তাকায় মৃত্তিকার দিকে। মেয়েটাকে এখানে দেখে বড্ড ভালো লাগছে আফিমের। সুখকর অনুভূতি জাপটে ধরেছে। নত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল মৃত্তিকা। বলার মতো কিছুই পেল না। আফিম কিছুটা শান্ত কণ্ঠে বলল,
“- আমার একটা কথা রাখবে মৃত্ত”?
মৃত্তিকার গা শিউড়ে ওঠে। আফিমকে তো এতটা দুর্বল মনে হয়নি। তার কথার ঝংকারটা কোথায়? মৃত্তিকা সম্মতি জানালে আফিম বলে,
“- সুমন হাসপাতালে ভর্তি। ওর অবস্থা কেমন, জানতে ইচ্ছে করছে। তুমি একটু হাসপাতালে গিয়ে দেখে আসবে ওকে? অপারেশন ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা, জানা দরকার”।
এক মুহুর্তের জন্য আফিমকে একটা আবেগি মানুষ মনে হলো মৃত্তিকার। তার হৃদয় বুঝি ওই ছোট ছেলেটার জন্য কাঁদছে? এখানে বন্দী অবস্থায় থাকার পরও ছেলেটার হেলদোল নেই, নিজেকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করবার জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন নেই, তার মনে চিন্তা ওই বাচ্চাটার জন্য। মৃত্তিকার চোখ ছলছল করে ওঠে। আফিমের এই রূপ তার অজানা। এক আফিম বহু রুপে, বহু ভাবে মৃত্তিকার সামনে এসেছে। মৃত্তিকা মলিন হেসে বলে,
“- আপনারা খাবারটা খান। আমি হাসপাতালে যাবো এখনই।”
শান্ত আর বাকিরা খেতে শুরু করেছে। মৃত্তিকা ওদের দিকে চেয়ে খুব আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলে ওঠে,
“- আপনাদের মুক্ত করবো। আমাকে একটু সময় দিন”।
দাঁড়াল না মৃত্তিকা। চলে এলো দ্রুত। মৃত্তিকার একটি ক্লাসমেট আছে। তার ভাই একজন সাংবাদিক। শহরের আশি শতাংশ মানুষ জানে না ঠিক কি কারণে আফিম রাস্তায় অবরোধ করে বসেছিল, কেন রাস্তা আটকে পথচারীদের কাজে বিঘ্ন ঘটাচ্ছিল। কারণটা যদি সামনে আসে, নিশ্চয়ই সবাই আফিমকে ভালো ছেলে বলেই সংজ্ঞায়িত করবে। আফিমকে ধরে নিয়ে যাওয়ায় বাকিরাও রুখে দাঁড়াবে।
মৃত্তিকা তার বন্ধু জামিলের থেকে তার ভাই জিহাদের নম্বর নেয়। টুকটাক কথা বলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসে। সুমন নামের ছেলেটার অপারেশন শেষ। তাকে কেবিনে শিফট করা হয়েছে। মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছে ছেলেটা। অপারেশনের ঝুঁকি ছিল, এখনো জ্ঞান ফেরেনি। ডাক্তাররা বলেছে অ্যাক্সিডেন্টটা সুমনের ব্রেইনে ইফেক্ট ফেলতে পারে।
করিডোরে সুমনের বাবা-মায়ের সাথে দেখা হয় মৃত্তিকার। মৃত্তিকা যখন জানায় সে আফিমের লোক, তখন ওরা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। জড়িয়ে ধরে মৃত্তিকাকে। ক্রন্দনরত কণ্ঠে সুমনের মা বলে ওঠে,
“- পোলাডা আমার সুমনের জন্য বিচার চাইছে দেইখা পুলিশ হ্যারে ধইরা নিয়া গেছে। এহন কেরা আমার পোলার জন্যে আওয়াজ তুলবো। ভালো মানুষরে কেউ ভালো থাকতে দেয় না”।
মৃত্তিকা মহিলাকে শান্ত করে বলে,
“- ঠিক কিভাবে কি হয়েছিল, আফিম আপনাদের জন্য কতটা কি করেছিল সবটা আমাদের বলবেন। ক্যামেরায় রেকর্ড করে টিভিতে প্রচার করা হবে। তবেই আফিম মির্জাকে মুক্ত করতে পারবো আমরা”।
কথামতো কাজ হলো। কান্নাকাটি করে সুমনের বাবা-মা জবানবন্দি দিল। ক্যামেরায় সবকিছু রেকর্ড করে নিল জিহাদ। প্রথমে স্যোশাল সাইটে গুলোতে ভিডিওটি ছেড়ে দেয়া হয়। পরপর টিভিতেও কাস্ট করা হয়। সবটা এত সহজে হবে ভাবতে পারেনি মৃত্তিকা। তবে এসবে সবচে বড় ভূমিকা রাখল আফিমের বন্ধুরা, যাদের পুলিশ অ্যারেস্ট করেনি।
আফিমের বন্ধুরা লোক জড়ো করে ফেলে। শহরের যেসব মানুষ আফিমকে সহ্য করতে পারতো না, তারাও এগিয়ে আসে মিছিলে। দলবদ্ধ হয়ে অনেকেই ছুটে যায় থানার দিকে। টিভি, নেট দুনিয়ায় এই বিস্ময়কর ঘটনা ছড়িয়ে গেল মুহুর্তেই। আশরাফ মির্জার ছেলে বলে সকলে যেন এ তথ্যটা আরো ভালো ভাবে গ্রহণ করে নিল। শহরের সব ছেলে আফিমের জন্য এগিয়ে বসে। সারা দুপুর থানার সামনে বসে থাকে ওরা। সাংবাদিকদের দেখে মৃত্তিকা লুকায় নিজেকে। বাড়ি চলে আসে। বাড়ির কেউ যদি জানে মৃত্তিকা এসব করেছে, নির্ঘাত মারবে ওকে। এসবে জড়িয়ে যেতে চায়নি মৃত্তিকা। তবে আফিমকে বিনা দোষে হাজতে দেখে মনও মানেনি।
ধনী লোকটির নাম জমরুল হোসেন। ক্ষমতা খাটিয়ে পুলিশকে নিজ হাতে রেখে আফিমকে অ্যারেস্ট করার জন্য অনেক টাকা দিয়েছে পুলিশকে। তাই তো রিস্ক থাকা সত্বেও আফিমকে ধরেছিল পুলিশ। সারা দিন থানার সামনে শত শত লোক বসে ছিল। টিভিতে প্রচার হওয়ায় উপর মহলেও পৌঁছে গেছে খবরটি। জমরুলকে অ্যারেস্ট করে আফিম ও তার বন্ধুদের ছেড়ে দেয়ার জন্য আদেশ দেয়া হয়েছে। মৃত্তিকা দুপুরে বাড়ি ফিরে আর যায়নি ওদিকে। সে মেয়ে মানুষ, রাত অবধি বাহিরে থাকা একদমই মানায় না। ঘরে বসেই টিভি চালিয়ে সবটা দেখছে সে। মৃত্তিকার বাবা-মা, মেহমেত সবাই পুরো সময়টা টিভিতে নজর রেখেছে। আফিমকে ছেড়ে দেওয়ায় শহরে হই হুল্লোড় পরে গেছে। বাহিরে বাজি ফুটছে, বক্স বাজছে। আফিমের ছেলেপেলেদের আনন্দের শেষ নেই।
রাত বেড়ে যাওয়ায় ঘরে ফেরে মৃত্তিকা। ধুলোবালিতে মুখ আর চুল নষ্ট হয়ে গেছে বলে এই রাতেও গোসল করে মৃত্তিকা। গামছা দিয়ে চুল ঝাড়া দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই টেবিলের উপর থেকে তার ফোনটা বেজে ওঠে। নাম্বারটা পরিচিত মনে হয় মৃত্তিকার। কল ধরে ওপাশের মানুষটিকে সালাম জানায় মৃত্তিকা। সালামের উত্তর দিয়ে আফিম বলে ওঠে,
“- বাইরে বের হও তো”।
মৃত্তিকা তব্দা খেয়ে বলে,
“- আপনি কোথায়”?
“- তোমাদের ফ্ল্যাটের সামনে”।
“- এখানে কি করছেন? বাড়ি যান, রেস্ট নিন”।
“- তোমাকে দেখতে এসেছি মৃত্ত। একটুখানি দেখা দাও, চোখ দুটোকে প্রশান্তি দাও”।
মৃত্তিকার দেহ কেঁপে ওঠে। লোমকূপ খাড়া হয়ে ওঠে। আফিম এসব কি বলছে? কেনই বা বলছে?, কঠোর হয়ে মৃত্তিকা জবাব দেয়,
“- আমি কোথাও যাবো না। আপনি বাড়ি ফিরে যান”।
“- তোমাকে না দেখে আমি যাবো না মৃত্ত। এখানেই সারা রাত দাঁড়িয়ে থাকবো। আমি জানি আমি কষ্ট পেলে তুমি সুখ পাও না”।
“- এসব কি ধরণের কথা বলছেন? ধন্যবাদ জানাতে এসেছেন তো? অন্য একদিন দেখা হবে। দয়া করে বাড়ির সামনে থেকে সরে যান। কেউ দেখে ফেললে খারাপ ভাববে”।
“- ধন্যবাদ দিতে আসিনি মৃত্ত, ভালোবাসা দিতে এসেছি। গ্রহণ করবে”?
এক লহমায় উত্তপ্ত দেহ শীতল হয়ে আসে মৃত্তিকার। অজানা আতঙ্কে বুকে রক্তক্ষরণ হয়। রেগে গিয়ে মৃত্তিকা বলে,
“- আপনার সাথে আমি কোনো কথা বলতে চাই না। দয়া করে আমার থেকে দূরে থাকুন। আল্লাহর দোহাই লাগে, এসব কথা মুখে আনবেন না”।
“- তোমাকে ছাড়া আমার পাগল পাগল লাগছে মৃত্ত। যতক্ষণ না দেখছি, ততক্ষণ প্রান জুড়াবে না। একটুখানি দেখা দাও”।
মৃত্তিকা খট করে কলটা কেটে দিল। গা এখনও কাঁপছে ওর। বেলকনির পর্দা ঠেলে সে তাকায় রাস্তার দিকে। আফিম দাঁড়িয়ে আছে। ক্ষণে ক্ষণে উঁকি দিচ্ছে এদিকে। ভয়ানক বিপদে পরে গেল মৃত্তিকা। আফিম তার বন্ধুদের ছেড়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছে, মানুস কি বলবে? কেউ বিষয়টা আচ করতে পারলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। মেহমেহ ভাই এসব টের পেলে মৃত্তিকাকে হয়তো বা বাড়ি থেকেই বের করে দেবে। কিন্তু আফিমও তো নাছোরবান্দা, ঘাড়ত্যাড়া। এক ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছে, সরে যাওয়ার নামগন্ধ নেই। মৃত্তিকা আড়াল থেকে ছেলেটাকে দেখে। এত দূর থেকেও আফিম মৃত্তিকার ছটফটে স্বভাব টের পায়। বেলকনিতে মানবীর ছায়া দেখে টেক্সট করে মৃত্তিকার ফোনে। লিখে,
“- আমি জানি তুমি ঘুমাওনি। এখনই আসবে? নাকি আমি আসবো?”
মৃত্তিকা টেক্সটটা দেখে ভয় পায় খুব। আফিমকে সাহায্য করে সে নিজেই বিপদে পরে গেছে। এই লোক কবে তার পিছু ছাড়বে, কবে মুক্তি মিলবে মৃত্তিকার?, কেউ যদি দেখে ফেলে? আবার না গেলে আফিমও চলে আসবে। ওর উপর একদমই বিশ্বাস নেই মৃত্তিকার।
ভাবতে ভাবতে মাথা ধরে মৃত্তিকার। আফিমকে মেসেজ দিয়ে বলে,
“- আজ না, কাল দেখা করবো। প্লিজ আজ চলে যান”।
আফিম মেসেজ পেয়ে গা দুলিয়ে হাসে। ফিরতি মেসেজ পাঠিয়ে বলে,
“- কথার খেলাপ করবে না মৃত্ত। চলে যাচ্ছি ঠিকই৷ একেবারের জন্য যাচ্ছি না। তুমি আজ যা করেছে, তার প্রতিদান না দিয়ে আমি ছাড়ছি না তোমাকে”।
চলবে?
[ কথা দিয়ে কথা রাখতে না পারার জন্য দুঃখিত। আমি খুব ঝামেলায় আছি। দু ঘন্টায় এতটা লিখেছি। আর এটা গল্প, বাস্তবের সাথে মেলাতে যাবেন না। রি-চেইক দিইনি। অনেক ভুল আছে, সময় পেলে এডিট করবো ]
Share On:
TAGS: ওরা মনের গোপন চেনে না, বৃষ্টি শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ওরা মনের গোপন চেনে না গল্পের লিংক
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১০
-
ওরা মনের গোপন চেনেনা পর্ব ৬
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৯
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৫
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১১
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৪