Golpo romantic golpo ওরা মনের গোপন চেনে না

ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৫


ওরা মনের গোপন চেনে না

পর্ব সংখ্যা [১৫] ( নিখোঁজ বার্তা )
[পর্বটি সংবেদনশীল ]

নিকশ আধারে আচ্ছন্ন ধরণী। ঝড়ো হাওয়া দিগবিদিক ছুটে চলেছে অবিরাম। দাঁত কপাটি কাঁপছে। বেলী ফুলের ঘ্রাণ ভেসে আসছে কোথাও থেকে। নতজানু, ভঙ্গুর দেহটা বুকে পিষে নিয়েছে আফিম। সাদা শার্টের এক প্রান্ত টেনে ধরে আছে মৃত্তিকা। আফিমকে বোধহয় বিশ্বাস করতে পারছে না পুরোপুরি। ভারসাম্য বজায় রাখতে মৃত্তিকার এক হাত আফিমের চওড়া কাঁধ চেপে ধরেছে। মৃত্তিকার চোখের তপ্ত নোনাপানিতে বুকের কাছের সাদা ঝকঝকে শার্টের অংশ ভিজে একাকার। মৃত্তিকা তার বুকে মাথা চেপে কাঁদছে ফুঁপিয়ে। কান্নার দাপটে শরীর কাঁপছে।
বাড়ির বাইরে বাইকটা পার্ক করেছে আফিম। মৃত্তিকাকে ব্যাক সিটে বসালে মেয়েটা বুক থেকে মুখ তুলল না। দেখাতে চাইল না ভেজা চোখ। সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আফিমের বুকে মুখ গুঁজে বসে রইল। আফিম কি করবে ভেবে পেল না। সান্ত্বনা দেয়া তার অভ্যেসে নেই। বরং রাগিয়ে দেয়া, মজা করাই তার সহজাত। এখন এই ভঙ্গুর মেয়েটাকে কিভাবে সামলাবে ভেবে পায় না আফিম। শুষ্ক অধরে দাঁত চেপে বলে,

“-, মৃত্ত, কিছু খাবে? পানি আনবো”?

মৃত্তিকার কণ্ঠ ভার। কান্নার দাপটে হেচকি তুলছে। শাড়ির আঁচল লুটিয়ে পরেছে রাস্তার ধুলায়। আলগোছে চোখ মুছে সে মাথা নেড়ে না বোঝায়। আফিম পুনরায় জিজ্ঞেস করে,

“- চা খাবে?”

মৃত্তিকা আগের মতোই মাথা নেড়ে না বোঝায়। আফিম ফের শুধোয়,
“- লাচ্চি কিনে দেই”?

মৃত্তিকা ভাঙা কণ্ঠে বলে,
“- কিছুই খাবো না”।

মেজাজ বিগড়ে যায় আফিমের। সে ঠাণ্ডা স্বভাবের মানুষ মোটেই নয়। তার কথা কেউ না শুনলে সে রেগে যায়। কোমল সুরে কথা বলার ধাঁচ নেই ছেলেটার। অল্পতেই হুটহাট মাথা গরম হয়ে যায় আফিমের। বেশিক্ষণ শান্ত থাকতে পারে না লোকটা। এবার কর্কশ সুরে বলে,
“- মাইর খাবে মৃত্ত”?

প্রথমে কথাটি বুঝতে না পারলেও কয়েক সেকেন্ড বাদে আফিমের কথা ঠাহর হয় মৃত্তিকার। চট করে মাথা তোলে মেয়েটা। ভেজা পাপড়ি গুলো মেলে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায় আফিমের দিকে। ছেড়ে দেয় শার্ট। দুরত্ব বাড়িয়ে বলে,

“- আপনার কথাবার্তা এমন কেন? ব্যবহার ভালো করতে পারেন না”?

আফিম গম্ভীর স্বরে বলে,
“- আমি ভালো ব্যবহারই করছি”।

“- ভালো ব্যবহারের যদি এমন নমুনা হয়, তাহলে খারাপ ব্যবহার কেমন হবে”?

“- মেজাজ খারাপ হলে আমার মুখ চলে না, সোজা হাত চলে।”

তটস্থ হয়ে নড়েচড়ে বসে মৃত্তিকা। নিচু কণ্ঠে বলে,
“- বউ পেটাবেন বুঝি”?

“- বউকে মারার ভিন্ন পন্থা আছে মৃত্ত। ওভাবে অন্য কাউকে আঘাত দেয়া যায় না। বউকে আদুরে মাইর দিতে হয়। তুমি বুঝবে না”।

মৃত্তিকা চুপ করে যায়। আফিম বাইকে বসে বাইক স্টার্ট দেয়। মৃত্তিকা আর কোনো কথা বলে না।


ও বাড়ি থেকে ফেরার পর বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় মৃত্তিকা। তার ঘুম ভাঙে রাত দশটায়। চোখ মেলে আশেপাশে কাউকে না দেখে ধীর পায়ে সে এগিয়ে যায় কিচেনে। গরুর মাংস আর রুটি রেঁধে গিয়েছে দুজন সার্ভেন্ট। এখনও খাবার গরম আছে। মৃত্তিকা আশরাফ মির্জার ঘরের সামনে আসে। শাড়ির আঁচল তুলে নেয় মাথায়। দরজায় মৃদু টোকা দিলে শব্দ আসে না ঘর থেকে। একটু উঁকি দিতেই দেখে আফিমের বাবা ঘুমিয়েছেন। তাহলে আফিম কোথায়? বাড়িতে নেই?

পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখতে পা বাড়ায় মৃত্তিকা। এখানে দু তলা ভবন তবে দুটো ভবনই বিস্তৃত আর রুম অনেক গুলো। ড্রইংরুমের পাশ দিয়ে সিঁড়ি চলে গিয়েছে। উপরে আফিমদের ঘর। নিচে রয়েছে খাবার টেবিল, কিচেন আর খালাদের জন্য ওয়াশরুম। মৃত্তিকা এক এক করে সব ঘর ঘুরে ফিরে আসে নিজের ঘরে। এগারোটা বেজে পনেরো মিনিট। আফিম এত রাতে কোথায় আছে? কোথায় বসে আড্ডা দিচ্ছে?

বিছানা গোছাতে গিয়ে বালিশের নিচে সিগারেটের একটা প্যাকেট পায় মৃত্তিকা। প্যাকেকটা খোলা হয়নি, একদম নতুন। আশরাফ মির্জা ছেলের এই নেশা পছন্দ করেন না। তাহলে কেন আফিম সিগারেট ফুঁকে? ভাবতে গিয়ে মৃত্তিকার হঠাৎই মাথায় জেদ চেপে বসে। রাগের বশে সিগারেটের প্যাকেট টেনে ছিঁড়ে ফেলে। দু হাত দিয়ে প্যাকেটে থাকা সবগুলো সিগারেট ভেঙে ফেলে সে। দুর্গন্ধে গা গুলিয়ে আসে মৃত্তিকার, বমি পায়। তবুও রাগ দেখিয়ে সবগুলো সিগারেট নষ্ট করে ডাস্টবিনে ফেলে দেয় মৃত্তিকা। ঘরে পারফিউম স্প্রে করে দুর্গন্ধ দূর করে ফ্লোর ঝেরে নেয়। অতঃপর সে বিছানায় শান্ত হয়ে বসে। আফিমের সিগারেট গুলো নষ্ট করতে পেরে মৃত্তিকার সুখ সুখ লাগছে। মনে হচ্ছে যেন সে প্রতিশোধ নিতে পেরেছে আফিমের উপর। কিন্তু তা কি সম্ভব? সামান্য কয়েকটা সিগারেটের বিনিময়ে তার সাথে হয়ে যাওয়া সব জঘন্য, কুৎসিত স্মৃতি মুছে ফেলা সম্ভব? কোনোভাবেই আফিম নামক এই ভয়ানক অধ্যায়ের চিহ্নিত দাগ মুছে দিতে পারবে না সে। কোনোকিছুর বিনিময়ে মৃত্তিকা তার সাথে হওয়া অন্যায়ের শোধ তুলতে পারবে না। ভেবেই তার বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। পরনের অগোছালো, নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা শাড়ির ভাঁজ খুলে ফেলে মৃত্তিকা। গতকালকের সাদা গাউনটা পড়ে সে। এখন মৃত্তিকার কি করা উচিত? আফিম বাড়িতে নেই, কখন ফিরবে মৃত্তিকা জানে না। আফিমের জন্য সে না খেয়ে বসে থাকবে? নাকি খেয়েদেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে যাবে? কোনটা করা উচিত মৃত্তিকার? মন নাকি মস্তিষ্ক? কোনটাকে তার অগ্রাধিকার দেয়া উচিত?

দু ঘন্টা আরামে ঘুমোনোর পর আর ঘুম আসছে না মৃত্তিকার। কিচেনে গিয়ে সে খাবার আবারও গরম করে। কাউচে বসে দু একটা কার্টুন ও দেখে। একটা বেজে যায়, অথচ আফিমের ঘরে ফেরার তাড়া নেই। কোথায় আছে লোকটা, কার সাথে আছে? নেশা করে পড়ে আছে কোথাও? মৃত্তিকার জানামতে আফিম শুধু সিগারেটই খায়, অন্যান্য নেশাদ্রব্য ছোঁয় না। তবে এ কথা কতটুকু সত্য তা নিয়ে সন্দিহান মৃত্তিকা। কাউকেই এখন সে বিশ্বাস করে না, মুখের কথায় আজকাল সে গলে যায় না। মানুষের ভিতরেও যে আরেক মানুষ থাকে তা ইয়াসিন আর রুবিকে দেখেই সে বুঝেছে।

আফিমের কাছে বাড়ির চাবি আছে। মৃত্তিকা দাঁড়িয়ে শাড়িটা ভাঁজ করছিল। আচমকা ক্ষিপ্র, উন্মাদ ভঙ্গিতে শব্দ করে দরজা মেলে ঘরে ঢোকে আফিম। মৃত্তিকার দিকে না তাকিয়েই আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে। খুব তাড়াহুড়ো করে শার্টের বোতাম খুলে ফেলে আফিম। একটানে শার্টটা ছুঁড়ে ফেলে বিছানায়। আয়নার দিকে পিঠ ফিরিয়ে পিঠে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করে। মৃত্তিকা আড়চোখে আফিমের দিকে তাকাতেই ছলকে ওঠে মেয়েটার হৃদয়। বিস্ময়ে হাত থেকে খসে পড়ে শাড়ি। অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করে,

“- আপনার পিঠ বেয়ে রক্ত পড়ছে। কি হয়েছে ওখানে? চোট পেলেন কিভাবে”?

আফিমের পিঠ বরাবর সোজা একটি কাটা দাগ। ছুড়ি অথবা চাকু দিয়ে লম্বালম্বি কেটে পিঠ জখম করে ফেলা হয়েছে। ক্ষত বেশ গভীর। সেখান থেকে চুইয়ে চুইয়ে তাজা রক্ত পড়ছে পিঠ বেয়ে। খুব ভয়ানক দেখাচ্ছে আঘাতপ্রাপ্ত জায়গাটি। অথচ মানুষটা ব্যথায় কোঁকড়াচ্ছে না, ব্যথাতুর অভিব্যক্তি ও নেই মানুষটার চোখে মুখে। তবে চোখ জোড়া হিংস্র হয়ে আছে আফিমের। সবুজাভ চোখ দিয়ে যেন ভস্ম করে দিতে চাইছে সব। অন্তর্ভেদী, তীক্ষ্ণ চোখ দেখলেই বুক মোচড় দিয়ে ওঠে ভয়ে।

আফিম মৃত্তিকাকে কিছু না বলেই গটগট করে চলে যায় ওয়াশরুমে। দরজা আটকে দেয়। মৃত্তিকা উত্তরের অপেক্ষায় দাড়িয়ে থাকে। আফিম মিনিট পাঁচেক বাদে ভেজা শরীর নিয়ে দরজা কিছুটা ফাঁক করে মৃত্তিকাকে ডাকে। মৃত্তিকা জড়সড় ভঙ্গিতে এগিয়ে যায়। আফিম শান্ত কণ্ঠে বলে,

“- টাওয়ালটা দাও তো”।
মৃত্তিকা শোনে আফিমের কথা। টাওয়াল নিয়ে আসে সে। আফিম নাভির নিচে টাওয়াল পেঁচিয়ে ঘরে ফিরে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ফের পিঠের ক্ষত দেখে। মৃত্তিকা তাকে দেখে থমকায়। সংকোচ, অস্বস্তিতে গাল দুটো রক্তিম হয়ে ওঠে। লোকটা গা ভালো করে মোছেনি। ফোঁটা ফোঁটা পানি লেগে আছে উদাম, ফর্সা গায়ে। পেশিবহুল দানবীয় শরীরটা বড্ড শক্ত। দেখে মনে হয় নিয়মিত এক্সারসাইজ করে আফিম। কিন্তু গুণ্ডামি করার পর এসব করার সময় পায় লোকটা?

আফিম ফার্সটএইড বক্স এনে মৃত্তিকার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বিছানায় বসে। বলে,

“- জলদি আমার পিঠে ব্যান্ডেজ করে দাও, যেতে হবে”।

মৃত্তিকার প্রচণ্ড রাগ হয়। মাঝরাতে এই অবস্থায় কোন বাড়ির ছেলে বাড়ি ফেরে? নিশ্চয়ই মাস্তানটা গ্যাঞ্জাম করে এসেছে। সে রাগটুকু গিলে বলে ওঠে,
“- কার সাথে মারপিট করে এলেন”?
আফিম শক্ত কণ্ঠে গর্জে উঠে বলে,
“- শিহাবের সাথে। ওর কত বড় বুকের পাটা, ও আমাকে ধাক্কা দেয়। আমার বাপ তুলে গালি দেয় জানোয়ারটা। আমি চুপ থাকবো?”

মৃত্তিকা আফিমের চোখে চোখ রেখে কঠিন স্বরে বলে
“- আপনি বুঝি চুপ থাকেন? এক হাতে তালি বাজে না”।

‘- আমি কারণ ছাড়া ওরকম গালি দিই না।”

ফোঁস করে শ্বাস ফেলে মৃত্তিকা। আফিমের পিঠের ক্ষতটা গভীর আর ভয়ঙ্কর দেখচ্ছে। মৃত্তিকার হাত কাঁপছে। কিন্তু আফিমের অনুরোধ তো ফেলা যায় না। আহত ব্যক্তির সেবা করাও ধর্ম। মৃত্তিকা আফিমের ক্ষত স্থান স্যাভলন দিয়ে মুছে মেডিসিন লাগিয়ে দেয়। রক্ত পড়া কমাতে ব্যান্ডেজ বাহুমূলের নিচ দিয়ে পুরো পিঠে পেঁচিয়ে দেয়। শক্ত-পোক্ত শরীর কেমন কুঁকড়ে ওঠে, চোখ জোড়া বুজে নেয়। মৃত্তিকার আফসোস হয় আফিমের জন্য। মানুষটা ভালো হতে পারতো, অন্যান্য ছেলেদের মতো কাজবাজ করে সুস্থ জীবনযাপন করতে পারতো। অথচ সেসব ইচ্ছে, আশা তার মাঝে নেই।

ব্যান্ডেজ শেষ হতেই মৃত্তিকা ফার্স্ট এইড বক্স রেখে দিয়ে বলে,
“- খেয়ে এসেছেন, নাকি খাবার দেবো?”

আফিম দেখে মৃত্তিকা। কোমল, শান্ত মেয়েটি আজ বড়ই চুপচাপ। আফিমের প্রতি রাগ, ঘৃণা কিছুই তার অভিব্যক্তিতে প্রকাশ পাচ্ছে না। আফিম তাকে দেখে গাড় হাসে ব্যথাতুর হৃদয়ে। বলে,

“- খেয়েছো তুমি”?

মৃত্তিকা জবাব দেয় না। প্রশ্নের পিঠেই প্রশ্ন ছুঁড়ে বলে,
“- আপনি খাবেন? আনবো কিছু”?
‘- সিগারেট খাবো, এনে দাও তো”।

মৃত্তিকা ভ্রু কুঁচকে ফেলে। জোর গলায় বলে,
“- এ বাড়িতে সিগারেট খাওয়া নিষেধ, আপনি তো জানেন”।

“- নিষেধাজ্ঞা ভাঙতেই আমার বেশি আগ্রহ “।

আফিম ব্যস্ত হয়ে বালিশ উল্টেপাল্টে দেখে বালিশ। সিগারেটের চিহ্নটুকু না পেয়ে বলে,

“- সিগারেটের প্যাকেট এখানেই ছিল, তুমি সরিয়েছো”?

মৃত্তিকা থতমত খায়। তখন রাগের মাথায় সব সিগারেট নষ্ট করার পর একটু আফসোস হচ্ছিল। এমনটা না করলেও তো হতো। আফিম যাই করুক, তাতে তার কি যায় আসে? কেনই বা আফিমের ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে সে?

“- কোথায় রেখেছো?”

মৃত্তিকা ঘাবড়ে যায় কিছুটা। কিছুই জানে না এমন ভাবে বলে,
“- দেখিনি আমি”।
“- ঘর তুমিই গুছিয়েছো”।

মৃত্তিকা চট করে মিথ্যা কথা সাজাতে পারে না। এ প্রতিভা তার নেই। অতএব সে নিজের দোষটা স্বীকার না করে বলে,

“- ফেলে দিয়েছি”।

আফিম প্রচন্ড আশ্চর্যিত হয়ে তাকায় মৃত্তিকার পানে। এ মুহুর্তে তার সিগারেট দরকার। না খেলে রাতে ঘুম হবে না ঠিকঠাক। লুকিয়ে চুরিয়ে বাড়িতে নেশাদ্রব্য ঢুকিয়েছিল। এতদিন খালা প্যাকেট ফেলে দিতো, আজ মৃত্তিকা ফেলে দিয়েছে? ভেবেই রাগ হয় আফিমের। কণ্ঠ বদলে যায় লোকটার। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে,

“-, কেন ফেলেছিস? অনুমতি নিলি না কেন মৃত্তওও”?

মৃত্তিকা নত না হয়ে সাহস সঞ্চয় করে বলে,
“- আমি সিগারেটের দুর্গন্ধ সহ্য করতে পারি না। আপনি জেনেবুঝে আমার সামনেই নেশা করেন, তাই রাগ করে ফেলে দিয়েছি”।

আফিম আগ্রাসী হয়ে উঠে আসে বিছানা ছেড়ে। মৃত্তিকার দিকে তেড়ে যায়। তার সবুজাভ চোখ আরো গভীর দেখায়। বিরস, রাগী কণ্ঠে ছেলেটা বলে,

“- তাই বলে ফেলে দিবি? যা, এখনই দোকান থেকে সিগারেট নিয়ে আসবি”।

মৃত্তিকা আঁতকে ওঠে। ঘড়ির দিকে চেয়ে বলে,
“- রাত দেড়টা বাজে, এখন আমি কোথায় এসব পাবো”?

“- ফেলে দেয়ার আগে এ কথা ভাবা উচিত ছিল।”

“- সামান্য এই সিগারেটের জন্য আপনি এতটা উন্মাদ হচ্ছেন? বুঝতে পারছেন এই নেশা আপনার পুরো দেহে ছড়িয়ে পরেছে?

“- জানি”।

“- তাহলে সরে আসছেন না কেন”?

“- ঠোঁট, হাত ব্যস্ত রাখতে আমার সিগারেট প্রয়োজন মৃত্ত। আচ্ছা ঠিক আছে, এখন সিগারেটের নেশা বাদ, তুই চুমু খেতে দিবি? নেশা কাটাতে কিছু একটা কর”।

মৃত্তিকা চোয়াল শক্ত করে বলে,
“- পাগলামি বন্ধ করুন”।

আফিম কিছু বলতে নিতেই তার ফোনটা বিকট শব্দে বেজে ওঠে। মৃত্তিকার কাছ থেকে সরে আফিম কল ওঠায়। ওপ্রান্তের মানুষটির কথা শোনার পরেই আফিম ব্যস্ত হয়ে পরে বাইরে যাবার জন্য। কালো রঙের টিশার্টটা জড়িয়ে নেয় গায়ে। টিশার্টের উপরে ডেনিমের শার্ট জড়িয়ে ওয়ালেট পকেটে পুড়ে ঘর থেকে বের হতে নিতেই মৃত্তিকা আটকায় তাকে। দৃঢ় কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে বলে,

“- কত রাত হয়েছে দেখেছেন? কোথায় যাচ্ছেন”?

আফিম দূর্ভেদ্য হেসে বলে,
“- পিছন থেকে ছুড়ি মেরেছে, আমি ওর চোখের সামনে থেকে ওরই ওর কলিজা বের করবো। সবাই অপেক্ষা করছে, যেতেই হবে”।

মৃত্তিকার গা শিউড়ে ওঠে। আফিম এত ভয়ানক কেন? কোনো ডিসিপ্লিন নেই ছেলেটার। এত রাতে সে যাচ্ছে মারপিট করতে। এটা কি কোনো ভদ্র বাড়ির ছেলে করতে পারে? মৃত্তিকা এখন কি করবে? আশরাফ মির্জা ঘুমিয়েছেন, তিনি যদি জানেন এত রাতে আফিম মারামারি করতে বেরিয়ে গেছে, মানুষটা খুব কষ্ট পাবেন। কিন্তু আফিমকে কিসে বেঁধে রাখা যাবে? কি দিয়ে মৃত্তিকা আটকে রাখবে এই হিংস্র মানুষটাকে? মৃত্তিকা কিয়দংশ সময় ভাবে। আচমকা বলে বসে,

“- বাড়িতে কেউ নেই। একা একা আমি কিভাবে থাকবো? আমার ভয় করবে। আঙ্কেল ও ঘুমিয়ে গেছেন”।

আফিমের হিংস্র চাহনি শিথিল হয়ে আসে। গম্ভীর হয়ে তাকায় মৃত্তিকার চোখে। মৃত্তিকা বুঝতে পারে আফিম তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না। তাই আরো কোমল কণ্ঠে বলে,
“- আমার সত্যিই ভয় করছে। আমি একা এভাবে কখনো থাকিনি। বাড়ি ফাঁকা, আমি ভয়ে ঘুমোতেও পারবো না”।

আফিমের মস্তিষ্ক কিছু সময়ের জন্য থমকে যায়। মৃত্তিকার পানে সে চেয়ে থাকে। মৃত্তিকার চোখে অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে। মৃত্তিকা মিথ্যে বলছে। একা থাকতে মৃত্তিকার কোনো অসুবিধেই হবে না। কিন্তু এ মুহুর্তে আফিমকে আটকাতে সে এই অহেতুক মিথ্যে বলে দিল। যদিও এর বিপরীতে প্রত্যাশার সংখ্যা শূন্য।

আফিম কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে,
“- থাকতে পারবে না? ভয় পাবে”?

মৃত্তিকা হা বোধক মাথা নাড়ে। আফিম দমে যায়। পকেট থেকে মুঠোফোন বের করে কাউকে টেক্সট করে। তার আঙুলের নড়চড় দেখে মৃত্তিকা বুঝে নেয় আফিম কিছু লিখছে কিবোর্ডে। মৃত্তিকা নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে থাকে। আফিম বুঝি এবার খুব চটে যাবে।

আফিম ফোনটা ছুঁড়ে দেয় বিছানায়। ওয়ালেটটা বের করে পকেট থেকে। শার্ট খুলে সেটি কাবার্ডে রাখতে রাখতে শান্ত কণ্ঠে বলে,
“- ঠিক আছে, যাচ্ছি না”।

হতভম্ব হয়ে গেল মৃত্তিকা। বিশ্বাস করতে পারল না আফিমের বলা বাক্যটি। আশরাফ মির্জা নিশ্চয়ই এ ক বছরে বহুবার আফিমকে এ পথ থেকে সরানোর চেষ্টা করেছেন। আফিম তার কথা শোনেনি, মানেনি কোনো নিষেধাজ্ঞা, ভয় করেনি নিজের পিতাকে। কিন্তু আজ? আজ মৃত্তিকার এক কথায় মানুষটা দমে গেল? ভুলে গেল প্রতিশোধ, কমে গেল হিংস্রতা? কিভাবে সম্ভব? আফিম তাকে এতটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবে, এতটা মানে? কই আগে তো মনে হয়নি আফিম কাউকে তোয়াক্কা করে, কারো অনুরোধ তার পাষণ্ড হৃদয়কে দমিয়ে ফেলে? সন্দিহান, বিস্মিত শুষ্ক কণ্ঠে মৃত্তিকা শুধোয়,

“- আপনি সত্যিই যাচ্ছেন না মারপিট করতে? বাড়িতেই থাকবেন”?

আফিম মুখ টিপে হাসে মৃত্তিকার অগোচরে। গম্ভীর ভাব ফুটিয়ে তুলে বলে,
“- তুমিই তো বললে ভয় পাচ্ছো”।

“- আমি বললাম বলে আপনি থেকে গেলেন”?

বিস্ময়ে আঁখি জোড়া বেরিয়ে আসার উপক্রম। বিশ্বাসই করতে পারছে না আফিমের এত সহজ আচরণ। আফিম তাকে দেখে এগিয়ে এসে বলে,

“- এমনি এমনি আমি কারো জন্য কিছু করি না। আমি তোমার জন্য প্ল্যান ক্যান্সেল করেছি, তোমাকেও আমার জন্য কিছু করতে হবে”।

কণ্ঠনালী আটকে আসে মৃত্তিকার। দাঁত দিয়ে ঠোঁট পিষে বলে,

“- কি চান”?

আফিম ফিক করে ঝরঝরিয়ে হেসে ফেলে। বরাবরের মতো হেসে ওঠায় তার শরীর সামান্য দুলে ওঠে, গভীর চোখ জোড়াও সমানভাবে হেসে ওঠে। আফিম হাসি থামিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় চেয়ে বলে,

“- কাছে আসো তো মৃত্ত”।

মৃত্তিকা চমকায়। তবে এগিয়ে যায় আফিমের নিকট। আফিম ফের মাদকতা মেশানো গভীর কণ্ঠে আবদার করে,

“- ভালোবাসো তো মৃত্ত”।

মৃত্তিকার হৃদপিণ্ডের ধুকবুকানি বাড়ে। আফিমের নেশাতুর চোখ মোহাবিষ্ট হয়ে তার আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করছে। সাদা গাউনের প্রান্ত চেপে ধরে মৃত্তিকা। অস্বস্তিতে নুইয়ে পরে। আফিম খানিক ঝুঁকে মৃত্তিকার মুখের সামনে মুখ রেখে বলে,

“- তোমার গাল দুটো ছুঁয়ে দেই”?

মৃত্তিকার অনুমতির ধার ধারে না ছেলেটা। হাত বাড়িয়ে অবিলম্বে ছুঁয়ে দেয় মৃত্তিকার মসৃণ গাল। একে একে আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেয় চোখের ঘন পাপড়ি, ঠোঁট। ঈষৎ কেঁপে ওঠে মৃত্তিক। আফিম আলতো হেসে বলে,

“- মিথ্যে বলে আমাকে আটকানোর চেষ্টা করলে, শাস্তি দিই এবার”?

ভড়কে যায় মৃত্তিকা। বিব্রত বোধ করে সে। বলে,
“- মিথ্যে বলবো কেন”?

“- কারণ তুমি জানো, একা থাকলেই তুমি বেশি নিরাপদ থাকবে। আমি তোমার কাছাকাছি থাকলে সময়টা তোমার জন্য মোটেও স্বস্তির হবে না। আমি তোমার প্রচণ্ড লজ্জার, অস্থিরতার কারণ হবো।”

মৃত্তিকা সরে আসে। ক্রমাগত বুকের মাঝে পাখা ঝাপটাতে থাকা ছটফটে পাখিটা শ্বাস নিতে পারছে না। পরিস্থিতি এত জটিল। আফিম চলে যেত, মারামারি করতো, মৃত্তিকার তাতে কি যায় আসে? কেন সে আটকাল আফিমকে? এখন প্রতি পদে পদে অসভ্য লোকটা তাকে বেকায়দায় ফেলবে।

‘- পিঠটা কেটে ছুঁড়ে ফালা ফালা করে নিয়ে এসেছেন। তাই যেতে দেইনি। মরবেন এখন? এত কম বয়সেই মরার শখ হয়েছে”?

আফিম দু’হাত বুকে গুঁজে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ায়। চোখে একরাশ নির্লিপ্ত আত্মবিশ্বাস তার। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে সে বলে,

“- আমাকে কে মারবে? এত সহজে কেউ আমাকে মেরে ফেলতে পারবে না।”

মৃত্তিকা তাচ্ছিল্য নয়, বরং গভীর উপলব্ধি থেকে হেসে ওঠে। সেই হাসিতে মজা নেই, আছে চিন্তার ভার। সে ধীর কণ্ঠে বলে,
“- আপনি জানেন, আপনার আসল দুর্বলতা কী? আপনার এই অটল আত্মবিশ্বাস। আপনি ভাবেন সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে এমন কেউ নেই, যে আপনাকে শেষ করতে পারে। এই বিশ্বাসেই আপনি আপনার জীবনটাকে খুব হালকাভাবে নেন। আপনি ভাবেন, বিপদ আপনাকে ছুঁতে পারবে না। তাই নিজের জন্য কোনো প্রস্তুতি নেন না, কোনো সতর্কতা রাখেন না। আপনি অন্যদের জন্য লড়েন, সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু নিজের অস্তিত্বের ব্যাপারে আপনি উদাসীন। এই আত্মবিশ্বাস আপনাকে শক্ত করে তুলেছে ঠিকই, কিন্তু এটিই আপনাকে অন্ধও করে দিয়েছে। আপনি বুঝতে চান না সবচেয়ে ভয়ংকর আঘাতটা আসে তখনই, যখন মানুষ ভাবে সে অজেয়।

আফিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় এসে শুয়ে পরে। দু হাত মাথার পিছনে ঠেকিয়ে বলে,
“- এখন ঘুমাও, আমি আছি”।

মৃত্তিকা লাইটের সুইচ নিভিয়ে আঁটসাঁট হয়ে বিছানার এক পাশে চেপে শুয়ে পরে। আফিম দুরত্ব টুকু ঘুচিয়ে নেয় নিজ উদ্যোগে। মৃত্তিকার কোমর টেনে তাকে কাছে টানে। মৃত্তিকা তেজ দেখালে সেও গর্জে উঠে বলে,

“- বিয়ে করেছি বউকে জড়িয়ে ঘুমবো বলে। এমন ভাব ধরছো যেন আমি পরপুরুষ, ছুঁলেই পাপ হয়ে যাবে”।

মৃত্তিকা না চাইতেও হেসে ফেলে। বলে,

“- সময় লাগবে। আপাতত আপনি আমার অপরিচিত”।

আফিম হেসে মৃত্তিকার চুলে মুখ গুঁজে বলে,
“- পাপ হবে না ঠিক, তবে অনর্থ হবেই”।

মৃত্তিকা আফিমকে ঠেলে দূরে সরিয়ে বলে,
“- একদম ঘেঁষাঘেঁষি করবেন না। অসভ্য পুরুষ, ছোঁয়ার ধান্দা খোঁজেন সবসময়”।

“- তোর জন্য অসভ্যই ঠিক আছি মৃত্ত। নইলে আমাদের সংসারে আর ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চার দল আসবে না। তুই নিজেই নিরামিষ, আমিও যদি তোর মতো বেরসিক হই তাহলে আর বস্ত্রহরণ করা হবে না। আমি অসভ্য, তোর লাজের কারণ না হয়ে ছাড়ছি না”।

আফিমের লাগামহীন কথায় অন্তরাত্মা কম্পিত হয় তিরতির করে মোলায়েম ঠোঁট কেঁপে ওঠে। আফিম বরাবরের মতোই খোঁচাতে থাকে মৃত্তিকাকে। মৃত্তিকা কম্ফোর্টার নাক অবধি টেনে বাচাল ছেলেটার অহেতুক, অপ্রয়োজনীয় কথা গুলো শুনে যায়।


জ্যাম ছুটে গিয়েছে কিছুক্ষণ হলো। এখনই আবার জ্যাম বেঁধেছে। রাস্তায় যানবাহনেরর ছড়াছড়ি। ধুলো উড়ছে। কাঠফাটা রোদ মাথায় নিয়ে পথচারী চলছে নিজ গন্তব্যে। শান্ত ইন্টারভিউ দিয়ে এসেছে। এবারের ইন্টারভিউ তুলনামূলক ভালো দিয়েছে। চাকরি হবার আশা আছে। শান্ত মানত করেছে চাকরিটা হলে সে মসজিদে জিলাপি বিলিয়ে দেবে।

জ্যামে আটকে থাকা কালীন পেছন থেকে একটি মেয়েলি, জোরদার কণ্ঠ কর্ণকুহরে পৌঁছায় শান্তর। পিছু ফিরে সেদিনের বাসের মেয়েটাকে দেখে থমকায় সে। আপনাআপনি শান্তর ঠোঁটের কোণ প্রশস্ত হয়ে ওঠে। রাইমার পরনে জিন্স আর লং কামিজ। গলায় স্কার্ফ ঝোলানো। চুল ব্যান্ড দিয়ে বেঁধেছে। শান্তকে দেখে মেয়েটা দৌড়ে আসছে। যেন খুব জরুরি কথা আছে। শান্ত নিতান্তই বোকার ন্যায় তাকিয়ে থাকে মেয়েটির দিকে। রাইমা প্রাণোচ্ছল ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়ায়। হাপিয়ে ওঠা চটপটে কণ্ঠে বলে,

“- কেমন আছেন শান্ত মশাই? চিনতে পেরেছেন? আমি রাইমা, বাসে দেখা হলো যে। আপনি উঠে আমাকে বসতে দিলেন। মনে পরেছে”?

শান্ত প্রথমেই চিনেছে মেয়েটিকে। কিন্তু তাকে বলার সুযোগ দেয়নি রাইমা। অনর্গল নিজেকে চেনানোর জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে সে। শান্ত তার এই চেষ্টাকে কিছুটা বাড়িয়ে দিতে দুষ্টুমি করে বলে,

“- কে আপনি?, চিনলাম না। রোজ কতজনের সাথে দেখা হয়, মনে রাখাটা কষ্টসাধ্য”।

রাইমার হাসি হাসি মুখটা মলিন হয়ে উঠল। ঠোঁটের হাসি উবে গেল নিমিষেই। ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,

“- আপনি আর আমি ভাগাভাগি করে সিটে বসলাম, মনে পরছে না? হেলপারের সাথে আমার ঝগড়া হলো, আপনাকে উঠিয়ে আমাকে বসতে দেয়া হলো। সব ভুলে গেছেন”?

রাইমার মলিন মুখ দেখে শান্ত একটু রয়েসয়ে ভেবে বলে,
“- ও হ্যাঁ মনে পরেছে। নামটা একদমই মনে ছিল না, স্যরি।”

মেয়েটি ক্লান্ত কণ্ঠে শুধাল,
“- আসলেই মনে ছিল না”?

“- না”।

রাইমা হতাশ হয়ে তাকাল। বলল,
“- ঠিক আছে, চলুন কোথাও বসে ঘটনাটা আবারও ফিরে দেখার চেষ্টা করি”।

শান্ত বলল,
“- আমি ইন্টারভিউ দিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম মিস রাইমা”।

“- আচ্ছা, তাহলে চলুন লাঞ্চটা করে ফেলি একসাথে”।

“- আপনার মনে ভয় নেই”?

“- ভয় কেন”? বিস্মিত কণ্ঠ রাইমার।

“- চেনেন না, জানেন না একটা ছেলের সাথে লাঞ্চ করার অফার করছেন”?

রাইমা হেসে বলে,
“- চিনি না কে বলেছে, ওইদিন আপনাকে দেখেই আমি বুঝে গিয়েছি আপনি কেমন। আমার সিক্সথ সেন্স অনেক শার্প কিনা”।

মেয়েটির দুষ্টু কথায় শান্ত হেসে ফেলে। বাইক লক করে পাশের একটি রেস্টুরেন্টে ঢুকে পরে ওরা। একসাথে লাঞ্চ করে দুজন বাড়ি ফেরে। এর মাঝে শান্ত একটা বিষয় উপলব্ধি করে যে, রাইমা খুবই মিশুক, আর বিনয়ী। সে নিজের চঞ্চলতা দিয়ে সব ক্লান্তি মুছে দিতে পারে। যদিও শান্তর মনে এরকম ভাবনা নেই। রাইমাকে তার কেবল একজন বন্ধুই মনে হলো। এবং অনুভব করল তার দিনটি দারুণ যাচ্ছে।


টিউশনি আছে মৃত্তিকার। কয়েকদিন মিস দেয়ায় চাপ কিছুটা বেড়েছে। বাচ্চাগুলোর পরীক্ষা খুব কাছেই। এক ঘন্টার জায়গায় দু ঘন্টা করে পড়িয়ে হলেও বাচ্চাদের রেজাল্ট ভালো করার পণ করেছে মৃত্তিকা। দুটো টিউশনি বাড়ির কাছাকাছি, তিন নম্বর টিউশনিতে যাতায়াত খরচ রোজ চল্লিশ টাকা লাগে।

টিউশনি থেকে অর্জিত টাকা নিয়ে শপিংমলে ঢুকেছে মৃত্তিকা। দুই সেট সালোয়ার-কামিজ কিনবে। বাসায় পড়ার মতো কিছুই নেই। আশরাফ মির্জা তার ক্রেডিট কার্ড মৃত্তিকাকে দিয়েছেন। বলেছেন মৃত্তিকার প্রয়োজন মতো খরচ করতে। এতে মৃত্তিকার মন সায় দেয়নি। আফিম নিজেই বেকার, বাপের টাকায় চলাফেরা করে। এখন স্বামী-স্ত্রী দুজনই বয়স্ক লোকের কামাইয়ে চলবে বিষয়টা খুব লজ্জাজনক। নিজের কাছেই নিজেকে ছোট মনে হবে। স্বামী থাকতে কেন সে শ্বশুরের টাকা ওড়াবে? এ তো ভারী লজ্জার কথা। মৃত্তিকা স্বাধীনচেতা, স্বনির্ভরশীল নারী। কারো কাছে হাত পাতার প্রয়োজন তার নেই। নিজের ইনকামে মৃত্তিকা সন্তুষ্ট।

কয়েকটা কাপড় মেলে দেখতে দেখতে কল আসে আফিমের। মৃত্তিকার ঠিকানা জানতে চায় আফিম। তাকে বাড়িতে পৌঁছে আফিম একটা কাজে যাবে। মৃত্তিকা না চাইতেও ঠিকানা দিয়ে দেয়। ঘুরে ঘুরে কাপড় দেখে। একটা সুন্দর শাড়িতে মৃত্তিকার চোখ আটকে যায়। সবুজ রঙের শাড়ি। শাড়ির পারে সোনালী সুতোর কারুকাজ করা। শাড়িটার ভেতরেও কাজ করা, আঁচলটা অনেক বেশি আকর্ষণীয়। তবে দামটা চড়া। পনেরো হাজার টাকা। এত টাকা দিয়ে শাড়ি কেনার মুরোদ নেই মৃত্তিকার। সে উল্টেপাল্টে কামিজ দেখতে থাকে। সহসা ট্রায়াল রুমের সামনের আয়নায় নজর পরতে এক জোড়া পরিচিত মুখ দেখতে পায় মৃত্তিকা। ইয়াসিন আর রুবি আসছে। হাতে কয়েকটা পেপার ব্যাগ, শপিং ব্যাগ। যেন এক জোড়া সুখী দম্পতি হেঁটে যাচ্ছে। মৃত্তিকার চোখ সরে না তাদের থেকে। সে নির্লিপ্ত চোখে চেয়ে রয় অবিরাম। চোখ ফেটে পানি গড়াতে চায়। চোখ বড় বড় করে টেনে মৃত্তিকা চোখের পানি লুকোতে চায়। অশ্রুসিক্ত করতে চায় না গাল। ইয়াসিনের চোখ মৃত্তিকার দিকে পড়তেই তার হাসি মুখটায় নিরবতা ছড়িয়ে পরে। হাঁটার গতিও কমে। রুবি তার গতির পরিবর্তন দেখে ইয়াসিনের দৃষ্টি অনুসরণ করে মৃত্তিকার দিকে তাকায়। মৃত্তিকাকে দেখে সে এগিয়ে আসে। হাসি খুশি কণ্ঠে বলে,

“- কিরে মৃত্তি, তুই এখানে কি করিস?”

মৃত্তিকা শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। গম্ভীর হয়ে হাতের টু পিস রেখে দেয়। ওদের এড়িয়ে চলে যেতে নিলে রুবি বলে,

“- কথা বলছিস না কেন? এভাবে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিস”?

মৃত্তিকা ঠাণ্ডা মাথায় বলে,
“- মুখ ফিরিয়ে নেয়ার মতো জঘন্য কাজ করেছেন বলেই এড়িয়ে চলছি”।

ইয়াসিন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে মৃত্তিকাকে। মৃত্তিকার অনামিকা আঙুলে হীরের আংটি দেখে হতভম্ব কণ্ঠে বলে,
“- তোমার এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে মৃত্তি”?

মৃত্ত হেসে বলে,
“- শুধু এনগেজমেন্ট নয়। বিয়েও হয়ে গেছে।”

বিস্ময়ে ফেটে পরে দুজনে। রুবি দ্বিধাচকিত কণ্ঠে বলে,
“- তুই মুভ অন করেছিস”?

“- কেন, আপনারা ভেবেছিলেন আপনাদের থেকে প্রতারিত হয়ে আমি মুখ থুবড়ে পরে থাকবো? পাগল হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াবো”?

রুবি থতমত খেয়ে বলে,
“- না তা নয়। কাকে বিয়ে করেছিস”?

ইয়াসিন ব্যগ্র কণ্ঠে বলে,
“- তুমি কিভাবে বিয়ে করলে? তুমি, তুমি তো…

মৃত্তিকা ইয়াসিনের কথা টেনে নিয়ে বলে,
“- কি? আপনাকে ভালোবাসতাম? এটাই তো বলতে চাইছেন। অপাত্রে ভালোবাসা দান করেছিলাম, ভুল বুঝতে পেরে সরে এসেছি। এখন শুধু আপনাদের জন্য করুণা হয় জানেন? আপনারা আমাকে ভাঙতে কতটা নিচে নেমেছেন দেখেছেন? আয়নায় নিজেকে দেখে চোখ নামিয়ে নেন না? দেখেন না ভেতরের কুৎসিত সত্তা”?

আক্রোশে ফেটে পরে মেয়েটা। ভুলে যায় স্থান-কাল। পুরোনো ক্ষত খুঁচিয়ে দগদগে ঘা বানিয়েছে এরা। এখন মৃত্তিকার জীবনে আনন্দের রেশও নেই। বিভীষিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে সব। বাইকের চাবি আঙুলে ঘুরিয়ে শপিংমলে আফিম ঢুকে পরে তখনই। মৃত্তিকার সাথে ইয়াসিনদের দেখে প্রথমে তার পা থমকায়। রাগ হয় খুব। পরক্ষণে রাগ সরিয়ে মুখে ফুটে ওঠে হাসি। এগিয়ে এসে মৃত্তিকার কাছে এসে মৃত্তিকার কাঁধ জড়িয়ে ধরে। হাত বাড়িয়ে দেয় ইয়াসিনের দিকে,

“- হ্যালো, আমি আফিম মির্জা। মৃত্তিকার হাসব্যান্ড”।

ইয়াসিন হাত বাড়াতেই আফিম সরিয়ে ফেলে নিজের হাত। বলে,
“- আপনাকে চিনি, ওইযে উত্তেজনায় ভেসে ভেসে ফিয়ন্সের ফ্রেন্ডকে নিয়ে ঢলাঢলি করতে গিয়ে ধরা পরা ভণ্ড, গর্দভ না আপনি”?

নিজের পরিচয় এভাবে পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে পরে ইয়াসিন। বলে,
“- মুখ সামলে কথা বলবেন”।

আফিম হেসে বলে,
“- ওকেহ, রিল্যাক্স। সত্য কথা শুনলে এত জ্বলেন কেন”?

রুবি বলে,
“- আপনার বউ ধোয়া তুলসি পাতা? দুবছর আমার হাসব্যান্ডের সাথে প্রেম করে দু দিনেই প্রাক্তনকে ভুলে বিয়ে করে ফেলেছে। সে আবার কেমন মেয়ে”?

মৃত্তিকার বুক কেঁপে ওঠে। ওরা কি শোধরাবে না? এতকিছুর পরও বদলাবে না নিজেদের? চড়া গলায় বলে যাচ্ছে সব, দোষী বানাচ্ছে তাকে। আফিম সহসা রেগে ওঠে। রুবির দিকে গালি ছুঁড়ে বলে,

“- বাইচোদ, জিভ কেটে কুত্তা দিয়ে খাওয়াবো। মৃত্তিকার সাথে তোর ওই নর্দমার কীট, দুমুখো জামাইয়ের তুলনা করবি না। তোর বরের মাইয়া মানুষ দেখলেই জিভ বেড়িয়ে আসে, নুনু খাড়িয়ে যায়, তুই আবার গলা উঁচিয়ে কথা বলিস? রতনে রতন চেনে, আর শুয়োরে চেনে কচু। তোদের দুজনকে মানিয়েছে।, এক বারোভাতার, আরেক বারোভাতারিকে পেয়েছে।”

একটু থেমে সে শাসিয়ে বলে,
“- আর একবার তোদের মৃত্তর আশেপাশে দেখি, বাপের নাম ভুলিয়ে ছাড়বো”।

আফিমকে কে না চিনে? তার হিংস্রতা সকলের জানা। রুবি থমকে যায়। মেয়েদের কেউ এভাবে গালি দিতে পারে তার জানা ছিল না। সবাই এদিকে তাকিয়ে আছে। সে ইয়াসিনের হাত ধরে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে যায় মল থেকে। তবে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে আফিমকে একটা শাস্তি তারা দেবেই।

আফিমের সাথে মৃত্তিকার আর কোনো কথা হয় না। দুজনেই চুপচাপ বাইকে চড়ে বাড়ির গেটে ফেরে। মৃত্তিকাকে বাড়িতে নামিয়ে আফিম বাইক ঘুরিয়ে নেয়। বলে,

“- একটু কাজ আছে, বাড়ি যাও। একটু মাংস রাঁধবে, সাথে ডাল। এসে খাবো”।

মৃত্তিকা কৃতজ্ঞতা সুূচক আফিমের জন্য মাংস রান্না করে, ডাল রাঁধে, চিংড়ি মাছ ভুনা করে। আশরাফ মির্জাকে ভাত বেড়ে খাইয়ে সে আফিমের জন্য অপেক্ষা করে। বিকেল পেরিয়ে, সন্ধ্যা পেরিয়ে, রাত চলে যায় আফিম আর ঘরে ফেরে না। পরদিন সকালেও আফিমকে ঘরে পাওয়া যায় না। বেশ কয়েকবার বাড়ির ফোন থেকে আফিমকে কল করেছে মৃত্তিকা। ওর ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে। মৃত্তিকা অপেক্ষা করে আফিমের জন্য। সে টিউশনিতে যায়, ফিরে আসে ক্লান্ত হয়ে। বাড়ির কাজ, বাইরের কাজ এক হাতে গোছায়, কিন্তু আফিম ফেরে না। টানা চারদিন ধরে আফিমের খোঁজ নেই। সে কোথায় আছে তা কেউ জানে না। মরে গেছে কি বেঁচে আছে সে নিয়েও সংশয়। আশরাফ মির্জা নির্বিকার। তাকে আফিমের কথা জানানো হলে তিনি প্রতিক্রিয়া দেখাননি। কেবল শুষ্ক কণ্ঠে বলেছেন,

“- দেখো মার খেয়ে কোথাও পরে আছে কিনা? বেঁচে থাকলে ফিরবে, নয়তো লাশটুকুও মিলবে না”।

বাবা হয়ে কিভাবে এত কঠিন কথা বলতে পারলেন মৃত্তিকা জানে না। আফিমের জন্য সে মরে যাচ্ছে এমনটা নয়। খুব বেশি চিন্তাও হচ্ছে না। কেবল জানতে ইচ্ছে করছে আফিম বেঁচে আছে কিনা। সেদিনের ঘা এখনও শুকেয়নি। আঘাত প্রাপ্ত পিঠ জুড়ে সফেদ ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছিল মৃত্তিকা। সেই আঘাতের ওখানেই কি কেউ পুনরায় আঘাত করেছে? আদৌ বেঁচে আছে আফিম? নাকি তার আত্মবিশ্বাস তাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

সময় চলে যাচ্ছে নিজ নিয়মে। সপ্তাহ চলে যায়, আফিমের খোঁজ মেলে না। বাতাসের ন্যায় সে উবে গিয়েছে। তার চিহ্নটুকু নেই শহরের কোথাও। আশ্চর্যজনক ভাবে মৃত্তিকা খোঁজ চালিয়েও তার হদিশ পায় না। বিয়ের তিনদিনের মাথায় স্বামীর নিখোঁজ সংবাদে তার কতটা ব্যথিত হওয়া উচিত? কতটা শোক পালন করা উচিত মৃত্তিকার?

চলবে?
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি_শেখ

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply