ওরামনেরগোপনচেনেনা
পর্ব সংখ্যা [১২]
দুদিন ধরে জ্বরে বিছানায় পরে আছে মৃত্তিকা। খাওয়াদাওয়া একদম ছেড়ে দিয়েছে। শরীর প্রচণ্ড দুর্বল মেয়েটার। বাড়ির সকলেই বেশ চিন্তিত। দুদিন পরে যে মেয়ের বিয়ে, সে এভাবে বিছানায় পরে আছে। দু দিনেই খানিকটা শুকিয়ে দিয়েছে, ফ্যাকাসে হয়ে গেছে মুখটা। মেয়েকে ঠি সময়ে ঔষধ দিচ্ছে মৃত্তিকার মা। তবে অবস্থার উন্নতি নেই। বরং জ্বর বাড়লেই মেয়েটার গোঙানির শব্দ বাড়ে, বিড়বিড় করে কি সব যেন বলে, কাঁদেও খুব। সবাই ভাবে জ্বরের প্রকোপে কাঁদছে মেয়েটা। মৃত্তিকার বাবা-মা ভেবেছিলেন বিয়েতে মৃত্তিকা মন থেকে রাজি নয়। হুট করে বিয়েটা ঠিক হওয়ায় মৃত্তিকা মেনে নিতে পারেনি। গভীর কষ্টের অতলে ডুবে এই দশা হয়েছে তার। কিন্তু মৃত্তিকা বিষয়টাকে স্পষ্ট করেছে। জোর গলায় বলেছে বিয়েতে সে রাজি। তার কোনো আপত্তি নেই।
মৃত্তিকা ভেঙে পরেছে কেবলই আফিম নামক ছেলেটির শুষ্ক স্পর্শে। আজও মানসপটে আফিমের বেসামাল চুমু ভেসে ওঠে। মনে হয় তার ঠোঁটের স্পর্শ এখনো মৃত্তিকার অধরযুগলে লেগে আছে। কি ভয়ানক! অপরিচিত পরপুরুষ এসে মৃত্তিকাকে ছুঁয়ে দিল, কলঙ্কিত করে গেল অধর জোড়া। মৃত্তিকা বাঁধা দিল না, তেজ দেখাল না, প্রতিবাদও করল না। ওই সময়টায় সে হুঁশ হারিয়েছিল, বোধ শক্তি ছিল না তার। নইলে কিছুতেই আফিমকে এতটা কাছে আসার দুঃসাহস করতে দিতো না। কখখনো না। ওই এক চুমুর তোপে মৃত্তিকা জ্বরে ভুগছে। বেচারি পরপুরুষের তীব্র স্পর্শ মেনে নিতে পারেনি একদম। মন কিছুতেই মানছে না তার। মনে হচ্ছে খুব বড় অন্যায় হয়ে গেছে।
তীব্র ব্যথায় মাথা ফেটে যাচ্ছে। পুরো গা ব্যথা। মৃত্তিকার বাবা খুব ভয় পেলেন। সকাল সকাল ছুটলেন ডাক্তারের চেম্বারে। মেয়েকে নিয়ে সিরিয়ালে দাঁড়ালেন। দীর্ঘ সময় হাসপাতালের চেয়ার গুলোতে বসে থেকে মেয়েকে চেকআপ করিয়ে তবেই বাড়ি ফিরলেন। গাদা গাদা ঔষধ পেলেন বিনিময়ে।
আফিম ঘুমোচ্ছে। এসির শীতলতা ছড়িয়ে পরেছে ঘর জুড়ে। অনাবিল সুখ নিদ্রায় তলিয়ে থাকা মানুষটির উপর থেকে কম্ফোর্টার টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে ফেলে তার বন্ধু রূপক। কর্কশ কণ্ঠে বলে,
“- শালা, কাল রাতে এত কষ্ট করে মই এনে দিলাম। ভাবীর সাথে কি হলো তা না জানিয়েই চলে এলি। বেইমান কোথাকার।”
ঘুমের ঘোরে কথাটা শুনে বিরক্ত হলো আফিম। সেই এক বাজনা বেজেই যাচ্ছে। ভাবির সাথে কি করলি? কি কথা হলো? যতসব উদ্ভট প্রশ্ন করে যাচ্ছে ওরা। বিরক্ত হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠল আফিম। রায়ান কাউচে বসে আছে। শান্ত বরাবরের মতো শান্ত ভঙ্গিতে তার দিকে চেয়ে আছে। দুপুর বারোটা বেজে গেছে। তবুও ঘুম সরছে না আফিমের চোখ থেকে। বন্ধুদের বাড়িতে দেখে সে একটি প্রশ্নই করল,
“- মৃত্তকে দেখেছিস? কোনো খবর পেয়েছিস”?
শব্দ করে হাসে রায়ান ও রূপক। মিটিমিটি হেসে ফেলে শান্ত নিজেও। ভ্রু কুঁচকে বন্ধুদের পানে তাকায় আফিম। একটা জোরে ধমক দিয়ে বলে,
“- নাটক না করে বের হ। ঘুমটা ভেঙে দিলি কেন”?
রায়ান বলে,
“- একটা খবর নিয়ে এসেছি”।
প্রত্যুত্তরে আফিম কৌতুহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“- কি খবর? “
শান্ত বলে,
“- মৃত্তিকা ভাবির খুব জ্বর। সকালে দেখলাম আঙ্কেল ভাবিকে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছেন। আমরাও গেলাম পিছু পিছু। জানতে পারলাম দুদিন ধরে ভাবি জ্বরে বিছানায় পরে আছে, অবস্থা ভালো না তাই হাসপাতালে যেতে হয়েছে।”
বুকটা ধক করে উঠল আফিমের। বিভিন্ন ব্যস্ততায় দুদিন মৃত্তিকার কাছে যাওয়া হয়নি। বাড়ির বাইরে কয়েকবার ঘুরপাক খেয়েছে। কিন্তু মৃত্তিকা বের হয়নি। বেলকনির দরজাও বন্ধ ছিল। উপায় না পেয়ে তিন বন্ধুকে দিন-রাত নজর রাখতে বলেছিল। ওরা মৃত্তিকাদের বাড়ির সামনে টহল দিয়েছে এ দুদিন। আফিম ঝট করে বিছানা থেকে লাফিয়ে নামে। মস্ত বড় আয়নায় নিজেকে দেখে নেয় একবার। রায়ানের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে বলে,
“- একটা সিগারেট দে তো”।
ভেংচি কাটে রায়ান। বলে,
“- তোর বাপকে তুই চিনিস না? দারোয়ানকে বলে রেখেছে আমরা এলেই যেন আমাদের পুরো বডি সার্চ করে। দারোয়ান আমাদের সার্চ করে তবেই বাড়িতে ঢুকতে দিয়েছে”।
রূপক বলে,
“- আমার দুটো সিগারেট ছিল৷ তোদের দারোয়ান নিয়ে গেছে। রায়ানের কাছে ছিল, ওটাও নিয়েছে। এতক্ষণে বোধহয় সুখটান দিয়েও ফেলেছে”।
আফিম হতাশ কণ্ঠে বলে
“- এই জল্লাদ বাপকে নিয়ে আমি যাবো কোথায় বল তো? বাড়িতে একটা সিগারেট ধরাতে পারি না”।
রায়ান বলল,
“-, সব বাদ, তুই মেয়েটার সাথে কি করেছিস বলতো? তোর সাথে দেখা হওয়ার পরই ও জ্বরে ভুগছে। ওকে তুই মেরেছিস নাকি”?
আঁতকে ওঠে শান্ত। ব্যগ্র কণ্ঠে বলে ওঠে,
“- কিহ্! মেরেছিস? কিভাবে মেরেছিস?, এজন্যই তো ভাবি অসুস্থ হয়ে পরেছে”।
বন্ধুদের কথা কর্ণকুহরে পৌঁছানো মাত্র কপালের ভাঁজ বিলীন হয় আফিমের। মনে করে সে রাতের ঘটনা। ইতিমধ্যে শতবার ওই অপ্রত্যাশিত চুম্বনের দৃশ্য চোখের সামনে ভেসেছে। সুখকর অনুভূতি পুরো দেহে বিচরণ করেছে। কাঙ্খিত সুখের নিশানা পেয়ে আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে আফিম। এখন খুব করে মেয়েটাকে কাছে টানতে মন চায়। বুকের মাঝে পিষে দিতে ইচ্ছে জাগে। দু হাতের আজলায় মেয়েটার ছোট্ট মুখ আগলে ধরে ঠোঁট বসাতে ইচ্ছে করে পুরো মুখে। নারীর প্রতি আসক্তি কোনো কালেই ছিল না আফিমের। আপন মায়ের ব্যভিচার আর অপকর্ম সচক্ষে দেখার পর প্রতিটি নারীর উপর থেকে আফিমের রুচি উঠে গেছে। কাউকেই আর পবিত্র, নিষ্পাপ বলে মনে হয় না তার। কিন্তু মৃত্তিকাকে দেখার পর, তার সম্পর্কে জানার পর এ ধারণা সামান্য হলেও বদলেছে। মেয়েটা মাদকের মতো। একবার গ্রহণ করার পর বারবার গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। নইলে জান বাঁচে না, অস্থির অস্থির লাগে। তার দেহের সুবাস মাতোয়ারা করেছে আফিমকে। যে কোনো মূল্যে মৃত্তিকাকে নিজের করার বাসনা জেগেছে। ছুঁয়ে না দিক, অন্তত নিষ্পাপ, ভীত চোখের মেয়েটা তাকিয়ে থাকুক তার দিকে। চোখের তৃষ্ণা টুকু মিটুক।
আফিম আলতো হাসে। হাত পা ঝেরে বলে,
“- ওগুলোকে আদুরে মাইর বলে। তোরা বুঝবি না”।
রূপক ত্যাছড়া হেসে বলে,
“- দুই দিনের বৈরাগী, ভাতেরে কয় অন্য। তোর মাত্র তিন দিনের প্রেম। আমার তিন বছরের প্রেমের অভিজ্ঞতা আছে। আমি বুঝবো না, তুই বুঝবি? মেয়ে খোর”।
রাগ দেখায় আফিম। বলে,
“- মেয়েদের সামনে বখাটে গিরি করেছি, শিস বাজিয়েছি। কিন্তু কোনো মেয়েকে বাজে নজরে দেখিনি, ছুঁইনি। তুই আমাকে মেয়ে খোর বলিস কেন”?
“- যা করেছিস তা কম কিসে”?,
“- এসব না করলে কেউ আমাকে বখাটে বলে বিশ্বাস করবে? বখাটেদের সহজাত মেনে চলতে হবে না”?
রায়ান দুজনকে শান্ত করতে এগিয়ে আসে। বলে,
“- এর মধ্যে আসল কথাটাই শুনছিস না তোরা। মৃত্তিকার বিয়ে ঠিক হয়েছে, এখন আফিমের প্ল্যানটা তো শুনবি”।
আফিম শান্ত, স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে,
“- আজ আমি আর বাবা যাবো মৃত্তিকাদের বাসায়। ওরা ভালোয় ভালোয় মৃত্তিকাকে আমার হাতে তুলে দিলে তো ভালো, নইলে অন্য ব্যবস্থা”।
শান্ত বলে,
“- দেবে না কেন? যত যাই হোক, তোর বাবার নাম আছে, খ্যাতি আছে, প্রাচুর্য আছে। ওরা ফেরাবে না দেখিস”।
ফোঁস করে শ্বাস ফেলে আফিম। হেসে বলে,
“- যাক, আশরাফ মির্জার সম্পত্তি আমার কোনো একটা কাজে তো লাগল। আমি ভেবেছিলাম তার সম্পত্তি আমার কোনো কাজেই আসবে না”।
আশরাফ মির্জা ফিরেছেন দুপুরের পর। সকালের তাজা খবর তার পড়া হয়নি। ক্লান্ত বিকেলে খবরের কাগজের ভাঁজ খুললেন তিনি। পরিচারিকাকে এক কাপ চা দিতে বলেছিলেন। চা টা আসামাত্রই কাগজের অক্ষর গুলোতে চোখ বুলালেন আশরাফ মির্জা। সেসময় বিশাল কক্ষে আফিমের আগমন ঘটে। ব্যস্ত পায়ে ছুটে আসে সে বাবার নিকট। কোনো রাখঢাক না রেখে সরাসরি বলে বসে,
“- পাত্রী দেখতে যেতে হবে। তৈরি হন”।
আশরাফ মির্জা কাগজ থেকে চোখ সরালেন। রেগে উঠলেন তৎক্ষনাৎ। বললেন,
“- বেয়াদবি বন্ধ করো। বলেছি না বিয়ে করবো না? এক কথা বারবার বলে আমার মেজাজ খারাপ করো না”।
ফিক করে হেসে ফেলে আফিম। ত্যাছড়া কণ্ঠে বলে,
“- আমার তো খেয়েদেয়ে কাজ নেই, আপনার জন্য ঘটকালি করতে যাবো। আমি আমার জন্য মেয়ে দেখতে যেতে বলেছি”।
আশরাফ মির্জা থমকালেন। বিয়ে করো, বিয়ে করো বলে যখন তিনি ছেলের মাথা খাচ্ছিলেন, তখন ছেলে ছিল নির্জীব। বিয়ের কথা শুনতেই পারতো না আফিম। সবাইকে সে গুলিয়ে ফেলতো নিজের মায়ের সাথে। আজ তার মুখে ব্যতিক্রম কথা শুনে ভড়কালেন তিনি। বুঝতে দিলেন না তার হতভম্বতার পরিধি। খবরের কাগজে চোখ রেখেই বললেন,
“- আমি তোমার জন্য অপমানিত হতে পারবো না”।
“- অপমানিত হবেন কেন? বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে যাচ্ছি, মেয়েদেরকে টিজ করতে যাচ্ছি না”।
“- তোমার সাথে কোথাও যাওয়া মানেই ঝামেলায় জড়িয়ে পরা। তাছাড়া তোমার হাতে কোন বাবা তার মেয়েকে তুলে দেবে? সেই তো রিজেক্ট হয়েই ফিরে আসতে হবে”।
রেগে যায় আফিম। বলে,
“- ভার্সিটিতে কত মেয়েরা আমাকে অফার করতো জানেন? কত মেয়েরা প্রেমপত্র পাঠাতো ধারণা করতে পারেন? এখন পাঠাতে পারে না মার খাওয়ার ভয়ে, নইলে বয়স আমার কম হয়নি”।
“- যাই বলো না কেন, আমি যাবো না কোথাও”।
“- আমি আপনার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেবো”।
“- আমিও তোমায় জেলে ভরে দেবো”।
“- রাতটা হতে দিন, বাড়ির একটা ইটও খুঁজে পাবেন না। জেলে আমি আগেও দিয়েছি, আবার গেলে ক্ষতি নেই”।
ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লেন ভদ্রলোক। খবরের কাগজ টি টেবিলে রেখে দিয়ে পূর্ণ মনোযোগী হয়ে তাকালেন আফিমের দিকে। বললেন,
“- কখন যেতে হবে”?
আফিমের ঠোঁটের কোণে প্রশান্তির হাসি দেখা দিল। বলল,
“- এখনই”।
জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে মৃত্তিকার। অসহনীয় যন্ত্রণায় পুড়ছে হৃদয়। ছোটবেলা থেকে মৃত্তিকার অসুখ-বিসুখ কম হয়। হলেও তা সেড়ে যায় দ্রুত। এরকম জ্বর আগে কখনো হয়নি মেয়েটার। রাতে এলে দিনে সুস্থ হয়ে গেছে। মেয়েটার মুখ ও লাল হয়ে গেছে। ঠকঠক করে কাঁপছে বদন। চোখ মেলতে পারছে না কোনোভাবে। বাড়ির সবাই দুশ্চিন্তায় মগ্ন।
কলিংবেলের শব্দ শুনতেই মৃত্তিকার গা ঝাঁকি দিয়ে উঠল। বিছানা ছেড়ে উঠল দেয়াল ধরে ধরে। কে এসেছে তা দেখার জন্য উঠে এলো। সারাদিন শুয়ে থাকতে ভালো লাগে না। বালিশে মাথা রাখলে ঘাড় আরো বেশি যন্ত্রণা দেয়।
বৈঠকখানায় মৃত্তিকার বাবা ছিলেন। তিনি উঠে দিয়ে দরজা খুললেন। মৃত্তিকা তখন ড্রয়িংরুমে প্রবেশের পথের দরজা ধরে দাড়িয়েছে। দরজার ওপ্রান্তে স্বনামধন্য ব্যবসায়ী, শহরের অন্যতম ধনী মানুষটিকে দেখে থমকালেন আতিকুর রহমান। ভাষা হারিয়ে ফেললেন। আশরাফ মির্জার পরনে ব্ল্যাক শার্ট আর ব্রাউন ব্লেজার। পরিপাটি করে চুল গোছানো, পায়ের কালো বুট চকচক করছে, হাতের ঘড়িটিও আভিজাত্য ফুটিয়ে তুলছে। তিনি একটু সময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“- আপনি? কাকে খুঁজছেন”?
সাথে সাথে পেছন থেকে এগিয়ে আসে আফিম মির্জা। মৃত্তিকা মাথা কাত করে বাবার সম্মুখে দাঁড়ানো ছেলেটিকে দেখার প্রয়াস চালায়। পরিচিত সেই সবুজাভ চোখে চোখ পড়তেই ছলকে ওঠে মেয়েটার হৃদয়। আফিমের পরনে ছাই রঙা শার্ট, কালো প্যান্টের সাথে ইন করে রেখেছে। চুলগুলো গোছানো, পায়ের জুতো নতুন। নিত্যদিনের মতো হম্বিতম্বি নেই কোনো। সাবলীল, ব্যক্তিত্ববান পুরুষ ভদ্র ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। প্রশস্ত, চওড়া বুক কিছুটা দেখা যাচ্ছে। বলিষ্ঠ দেহটা স্থির। মৃত্তিকা অবুঝের ন্যায় চেয়ে রয় কিছু সময়। ঠোঁট বাঁকিয়ে ক্রূর হাসে আফিম। মৃত্তিকার ঘোর কাটে। ভয়ে আঁটসাঁট হয়ে দাড়ায়। অতি সুপুরুষ মানুষটির থেকে নজর সরায় সে। আতিকুর রহমান বৈঠকখানার পুরোনো সোফায় বসতে দেন আফিম ও আশরাফ মির্জাকে। ওদের পেছন পেছন আশরাফ মির্জার দুজন গার্ড আসে। তাদের হাতে দই, মিষ্টি, রসমালাইয়ের বক্স, ফুলের বুকে, চকলেট বক্স। সব দেখে মৃত্তিকা বোকা বনে যায়। আফিম তার দিকে চেয়ে আছে। তার চোখের দৃষ্টি খুব তীক্ষ্ণ, ধারালো। মণিটা জ্বলজ্বল করছে। মৃত্তিকার বাবা আন্তরিক হয়ে প্রশ্ন করেন,
“- আপনারা হঠাৎ? আমি ভাবতে পারছি না আশরাফ মির্জার সাথে আমার এভাবে সাক্ষাৎ হবে।”
আশরাফ মির্জা হাসলেন। দূরে ফ্যাকাসে বদনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে দেখে আতিকুর রহমানের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করেন,
“- আপনার মেয়ে”?
আতিকুর রহমান বললেন,
“- জি ভাই”।
“- এদিকে আসতে বলবেন”?
“- মেয়ে আমার দুদিন ধরে অসুস্থ”।
মৃত্তিকাকে কাছে ডাকলেন তিনি। ধীর পায়ে মাথার ওড়না টেনে এগিয়ে আসে মৃত্তিকা। ভয় হচ্ছে আফিমকে দেখে। কেন এসেছে লোকটা? আবার কোন ঝড় বইয়ে দিতে চাইছে? ওইদিনের চুম্বনের ঘটনাটা বলতে এসেছে? ভাবতে গিয়ে মৃত্তিকার শরীর আরো খারাপ হয়ে উঠে। অকস্মাৎ ভয় হতে শুরু করে আফিমকে। মানসপটে ভেসে ওঠে তিক্ত ঘটনাটুকু। গা গুলিয়ে ওঠে। জড়তা চেপে ধরে মৃত্তিকাকে। কোনো রকমে গলায় জোর এনে ভাঙা কণ্ঠে সালাম জানায় সে। আশরাফ মির্জা সালামের উত্তর দিয়েই চিন্তিত কণ্ঠে বলে ওঠেন,
‘- মনে হচ্ছে শরীরটা বেশি খারাপ, তুমি ঘরে যাও। রেস্ট নাও”।
মৃত্তিকার বাবা সম্মতি জানাতেই মৃত্তিকা দ্রুত পায়ে চলে যায় নিজ ঘরে। ঘরে গিয়েই দরজা লাগিয়ে দেয় সে। প্রচণ্ড ভয় হচ্ছে আফিমকে। ছেলেটা কি করতে এসেছে এখানে? কেন তার বাবাকে সাথে করে এনেছে? মৃত্তিকা ভয়ে থরথর করে কাঁপে। আফিম কি উল্টোপাল্টা কিছু বলতে এসেছে? হেনস্তা করতে চাইছে মৃত্তকে? ভাবতে পারে না মেয়েটা। শুষ্ক গলায় পানি ঢেলে বসে থাকে বিছানায়। অপেক্ষা করে অপ্রত্যাশিত ঘটনার মুখোমুখি হবার।
আশরাফ মির্জা মার্জিত, বিনয়ী কণ্ঠে বলেন,
“- ভাই, আপনার মেয়েকে আমার ছেলের জন্য চাইতে এসেছি”।
ভড়কে যান আতিকুর রহমান। অপ্রস্তুত হয়ে কেশে ওঠেন। দুদিন আগে মেয়ের বাগদান হয়েছে, এখন আবার নতুন করে কেউ তার মেয়েকে চাইতে এসেছে এটি নিতান্তই বিভ্রান্তিকর। তার উপর মানুষটা হয় যদি আশরাফ মির্জা, তবে তাকে কি করে প্রত্যাখ্যান করা যায়?
“- ভাইজান, আমি খুব লজ্জিত। আমার মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছ, আংটিবদল করে রাখা। আর ১২ দিন পরই বিয়ে”।
আশরাফ মির্জা দ্রুত পাশে বসে থাকা ছেলের দিকে তাকান। দু পা ফাঁক করে দু হাত একত্রে করে বসে আছে আফিম। আতিকুর রহমানের কথা শুনে আফিম চমকায় না একটুও। তাকে চমকাতে না দেখে কটমট করে তাকায় আশরাফ মির্জা। আফিম তবে জেনেশুনে তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। একটি মেয়ের বিয়ে ভাঙার জন্যই এত আয়োজন করছে? আফিমের কথায় রাজি হয়ে তিনি যে মত্ত বড় ভুল করেছেন তা হাড়ে হাড়ে টের পেলেন। প্রচণ্ড রেগে গেলেন আফিমের উপর। রাগকে নিয়ন্ত্রণ করে গাইগুই করে বললেন,
“- সমস্যা নেই ভাই, আমরা জানতাম না”।
আফিম তার ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে বলে,
“- আমি জানি মৃত্তর বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। বাট, আই লাভ হার। আমার সাথেই মৃত্তিকা সুখে থাকবে। বিয়েটা ভেঙে দিন আপনি”।
আফিম রেগে কথা বলেনি। খুব স্বাভাবিক ভাবে, সহজ করে বললেও কথায় তেজ, জেদ ফুটে উঠেছে। কঠিন হয়ে উঠেছে কণ্ঠধ্বনি। আতিকুর রহমান নত কণ্ঠে বললেন,
“- আমার পরিবারের সবাই এ বিয়েতে রাজি। তাই সরে আসার কোনো মানে নেই। আমি ওয়াদা ভঙ্গ করতে পারি না”।
আশরাফ মির্জা বুঝতে পারলেন আফিম এবার তাণ্ডব শুরু করে দিবে। ছেলেটা একদমই ভদ্র নয়। তাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেনি বলে বড্ড আফসোস হয় এ সময়ে। আফিম বড়-ছোট বোঝে না। মতের মিল না হলেই রেগে যায়। মাস্তানি করতে করতে এমন একটা পর্যায়ে চলে গেছে যে কাউকেই সে ভয় পায় না। পুলিশ, আর্মি কিংবা মুরুব্বি, কাউকেই সে তোয়াক্কা করে না। আশরাফ মির্জা ছেলের বাহু ধরে টেনে তোলেন। বলেন,
“- ঠিক আছে, আমরা তবে আসি”।
বাঁধা দেন আতিকুর রহমান। ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে বলে,
“- এখনই যাবেন কেন? সবে এলেন। একটু চা-নাস্তার ব্যবস্থা করতে দিন”।
“- ব্যতিব্যস্ত হবেন না। আরেকদিন আসবো। আজ উঠি, অনেক কাজ ফেলে এসেছি”।
তিনি আফিমকে টানলেও আফিম টলে না একবিন্দু। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে পকেটে হাত গুঁজে। আশরাফ মির্জা ভয় পান ছেলেকে। না জানি এখন ছেলেটা কি করে বসে? কি বলে বসবে আবার। শাসিয়ে ফিসফিস করে আফিমের কানের কাছে মুখ নিয়ে তিনি বলেন,
“- আমার অগোচরে যা করো, করো। কিন্তু আমার সামনে দাঁড়িয়ে বেয়াদবি করার চেষ্টা করবে না আফিম”।
আফিম সেদিকে তাকিয়ে পৈশাচিক আনন্দ নিয়ে হেসে ওঠে। বলে,
“- ভালোয় ভালোয় কোনো কাজ না হলে আমি অন্যান্য উপায় অবলম্বন করি। জানেন নিশ্চয়ই, ঢাকা শহরের বড় মাস্তান আমি। মেয়েকে একটু সাবধানে রাখবেন।”
বলেই দাঁড়ায় না একটি বারও। গটগট পায়ে চলে আসে। বাড়ির নিচে পার্ক করা দামী বাইকে চড়ে হেলমেট পরে নেয় অতি দক্ষ ভঙিতে। বাইক স্টার্ট দিয়ে আশরাফ মির্জার উদ্দ্যেশ্যে বলে,
“- বাড়ি চলে যান, আমি আসছি”।
আশরাফ মির্জা বেজায় চিন্তায় পরলেন। ছেলে তার সুবিধের না। কোথায় গেল এখন?, কি যে মাথায় চলছে ছেলেটার। স্বয়ং বিধাতা ছাড়া কারো জানার সাধ্যি নাই।
রাতে এক ঘরে বড়রা মিলে আলোচনায় বসেছে। আফিম মির্জার সম্পর্কে সকলেই অবগত। ছেলেটা যাওয়ার সময় হাসিমুখে যে ভয়ঙ্কর হুমকি দিয়ে গেছ, তা ফেলে দেবার মতো নয়। আফিমের কিছু ভালো গুণ আছে। পড়াশোনায় ছেলেটা ভালো, খুব ভালো বাইক চালায়, অসহায়দের কখনো হেনস্তা করে না। বরং টুকটাক সহযোগিতা করতে এগিয়ে যায়। আফিমের মতো মাস্তানদের দু একটা জ্ঞান দেয়া যায়, তাদের মন ভরে প্রশংসা করা যায়। কিন্তু নিজের ঘরের মেয়ের সাথে বিয়ে দেয়া যায় না। মারামারি, খুন খারাবি যার নেশা, তার হাতে কোনো ভালো ঘরের মেয়ের বিয়ে হতে পারে না।
সবচে বড় কথা মৃত্তিকার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে সাকিবের সাথে। ছেলে ভদ্র গোছের, নিজস্ব ব্যবসা আছে। কোনো খারাপ রেকর্ড নেই। এমন একটি ছেলেকে হাতছাড়া করা যায় না। আংটি বদল হবার পর ফিরে আসাও যায় না। তবে এর সমাধান কি? কিভাবে আফিম মির্জার হাত থেকে মৃত্তিকাকে সুরক্ষিত রাখবে? যখন যা খুশি করে ফেলতে পারে। কোনো বাজে কাজ করে ফেললে রক্ষে নেই।
মেহমেত কিছুতেই বেকার আফিমের সাথে মৃত্তিকাকে বিয়ে দেবে না। অনেক ভেবে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে মৃত্তিকাকে কয়েকদিনের জন্য লুকিয়ে রাখবে জাহানারাদের বাড়িতে। বেশ কয়েকদিন ধরে জাহানারা বাবার বাড়ি যেতে চাইছিল। বিয়ের আগ অবধি মৃত্তিকা গোপালগঞ্জে গিয়ে থাকবে। বিয়ের দিন না হয় চলে আসবে। নিরাপত্তাটা বেশি জরুরি এখন। কোনোভাবেই আফিমকে মৃত্তিকার ধারে কাছে আসতে দেওয়া যাবে না। সাকিবের কাছে এ ঘটনা পৌঁছাতে দেওয়া যাবে না। বখাটে ছেলেদের নজর মৃত্তিকার উপর পরেছে, এ কথা ছেলেপক্ষ ভালো ভাবে নাও নিতে পারে। মৃত্তিকাকে বিষয়টা জানালে সে রাজি হয়ে যায়। তার জ্বরটা নামছে। ভালো ডাক্তারের পরামর্শে ঔষধ খাওয়ায় জ্বর কমে গেছে অনেকটা। রাতেই ব্যাগপত্র গোছানো হলো মৃত্তিকার। বড়সড় ব্যাগে প্রয়োজনীয় পোশাক গুছিয়ে নিল সে। সিম কার্ড খুলে নতুন সিম ঢুকিয়ে নিল ফোনে। সেই রাতেই বাসে করে ইরহাম, জাহানারা আর মৃত্তিকা ছুটে গেল গোপালগঞ্জে। সবার অগোচরে, কাউকে কিছু না জানিয়ে গায়ে জ্বর নিয়ে নিজ বাড়ি ছাড়ল মৃত্তিকা।। ভয় হলো খুব। যাত্রাটা সহজ হবে তো? বিয়েটা হবে তো, মান সম্মান বজায় থাকবে? আফিম তাকে না পেয়ে কি করবে? লণ্ডভণ্ড করে দেবে সব কিছু?
বড়সড় এক বাইক রেসিংয়ের আসর বসেছে শহরের উপকণ্ঠে। ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি তীক্ষ্ণ হয়নি, তবু চারপাশে উত্তেজনা স্পষ্ট। বিশাল প্রশস্ত রেসিং ট্র্যাকটা কালো পিচে মোড়া, দু’পাশে লাল-সাদা স্ট্রাইপ দেওয়া ব্যারিকেড। দূরে উঁচু গ্যালারিতে আর ট্র্যাকের ধারে ধারে গিজগিজ করছে মানুষ। কারও গলায় ক্যামেরা, কেউ আবার চিৎকার করে প্রিয় বাইকারের নাম ধরে ডাকছে। বাতাসে ভাসছে পেট্রোল আর পোড়া রাবারের গন্ধ, সঙ্গে মানুষের গুঞ্জন আর উল্লাস।
এই ভিড়ের মাঝেই প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আফিম। তার বাইকটা দেখলেই চোখ আটকে যায়। ম্যাট ব্ল্যাক রঙের শক্তপোক্ত বডি, সামনের অংশ ঝুঁকে রাখা, পেছনে ধারালো ডিজাইন। ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই গর্জে ওঠে বাইকটা। থ্রটল টান দিতেই মুহূর্তের মধ্যে আরপিএম বাড়ে, বাইক কেঁপে ওঠে, আর সেই শব্দে চারপাশের মানুষ আরও উত্তেজিত হয়ে পড়ে। বেশিরভাগ মানুষ আফিমকে চেনে না। তারা শাফায়াত নামে আফিমকে চেনে। যাকে দেখা হয়নি কারোই। সুপুরুষ ছেলেটি হেলমেটের আড়ালে ঢেকে রেখেছে সৌন্দর্য। বাইক নিয়ে তার স্বপ্নরা ছুটে যাবে এবার।
রেস শুরু হতেই সকল বাইকাররা ছুটে চলে বিদ্যুতের গতিতে। ট্র্যাকের ওপর দিয়ে তাদের বাইকগুলো যেন উড়ে যাচ্ছে, হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। এত দ্রুত ছুটছে তারা, পলক ফেললেই হারিয়ে যাচ্ছে দূরে। আফিমের বাইক একেকটা বাঁকে হেলে পড়ে, তার শরীর বাইকের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিশে গিয়েছে। গতির চাপে হেলমেটের ভিসারে হালকা কম্পন দেখা দিলেও আফিমের সবুজাভ চোখ দুটো স্থির। গভীর, তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে আছে রাস্তার দিকে।
আফিমের পোশাকও ঠিক তার মতোই পেশাদার। গাঢ় রঙের লেদারের রেসিং স্যুট, যেখানে কাঁধ, কনুই আর হাঁটুতে শক্ত প্রোটেক্টর বসানো। হাতে মোটা রেসিং গ্লাভস, কালো আর লাল রঙের মিশেল। যার গ্রিপ এত শক্ত যে হ্যান্ডেল ছাড়ার প্রশ্নই আসে না। বুটগুলো ট্র্যাকের জন্য বিশেষভাবে তৈরি।
চারপাশের মানুষজন তখন নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে আছে। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ আবার ব্যারিকেটে হেলান দিয়ে চিৎকার করছে। প্রতিটা ল্যাপ শেষ হলে করতালির ঝড় ওঠে, শিস আর উল্লাসে কেঁপে ওঠে সব। রেসিংয়ের মাঠে গতি, সাহস আর দক্ষতার পরিচয়ে আফিম সর্বদা এগিয়ে।
আফিম সবাইকে পেছনে ফেলে অতি দক্ষ ভঙিতে বাইকের সাথে ঝুঁকে, মিশে গিয়ে ফিনিশিং লাইনের কাছে এসে পরে। সেই মুহুর্তে দম আটকে আসে ছেলেটার। আরেকটু পথ গেলেই জীবনের অনেক বড় সাফল্য অর্জন করবে। ভাবতে ভাবতে ঝড়ের গতিতে বাইকের সামনের অংশ উঁচু করে, প্রকাণ্ড শব্দ তুলে ফিনিশিং লাইন ছুঁয়ে ফেলে আফিম। সাথে সাথে শিস বাজায় সকলে, করতালিতে মুখরিত হয় চারপাশ। হই হুল্লোড়ে মেতে ওঠে দর্শক। আফিম নেমে বুক ভরে শ্বাস টানে। তার শক্তপোক্ত, দানবীয় শরীর, পেশিবহুল বাহু, আর সুঠাম গড়নে আকৃষ্ট হয়ে চেয়ে থাকে শত শত নারী। তাদের চোখে স্পষ্ট আকর্ষণের ছাপ ফুটে ওঠে। একটিবার দেখতে চায় হেলমেটের আড়ালে থাকা পুরুষটিকে। কিন্তু আফিম নিজেকে সামনে আনে না, সে বখাটে, মাস্তান এটাই তার পরিচয়। এর বাইরে আর কোনো পরিচয় নেই তার। আড়ালে থেকে নিজের স্বপ্ন গুলো পূরণ করার জন্য চেষ্টা করছে সে হয়ে। থাক না কিছু লুকানো আশ্রয়, না জানুক পৃথিবী।
জাজরা আফিমের হাতে একটি ট্রফি, সার্কিফিকেট তুলে দেয়। শান্ত, রূপক, রায়ান ওদের কাউকে রেসিং এর এখানে নিয়ে আসেনি আফিম। ওরা এলে অনেকেই বুঝে যেত এই শাফায়াত আর আফিম মির্জা একই ব্যক্তি।
সকাল সকাল একটি দুঃসংবাদ এসেছে। সাকিবকে কারা যেন বাজেভাবে পিটিয়েছে। কোনো প্রকার বাকবিতণ্ডা ছাড়াই কয়েকটি ছেলে এসে সাকিবকে রাস্তার মাঝে ধোলাই দিয়েছে। ছেলেগুলো হেলমেট পরে ছিল। কারো মুখই দেখেনি সাকিব। তবে কণ্ঠ শুনেছে। কাঠ দিয়ে পায়ে কয়েকবার প্রহার করে একটি ছেলে হুমকি দিয়ে বলেছে “ বাড়ি গিয়ে বিয়ে ভেঙে দিবি, নইলে তোর হাড়-গোড় ভেঙে দেবো”। সাকিবের পা জখম হয়েছে। আশা করা যায় এক সপ্তাহ বেড রেস্টে থাকতে হবে। বিয়েটা হবে কিনা তা নিয়েও সন্দিহান সাকিবের পরিবার। সংবাদটা মৃত্তিকা পায় তার ভাবির থেকে। মেহমেত আফিমকেই সন্দেহ করেছে। জাহানারাকে পুরো ঘটনা জানিয়েছে। জানার পর জাহানারা মৃত্তিকাকে বলেছে। সংবাদটা পাওয়ার পর মৃত্তিকার মনটা খারাপ হয়ে যায়। ছেলেটার কোনো দোষ নেই, তবুও আফিমের টার্গেটে তাকে পরতে হয়েছে। সব দোষ মৃত্তিকার। সে যদি প্রথম থেকেই আরেকটু কঠোর হতো, তবে হয়তো আফিম এতটা বাড়াবাড়ি করতে পারতো না।
মৃত্তিকার মাওয়ই মা আজ চিংড়ি মাছ ভূনা করবেন। গলদা চিংড়ি মৃত্তিকার খুব প্রিয়। তাই জাহানারার মা বেছে বেছে বড় চিংড়ি আনিয়েছেন হাঁট থেকে। এ গ্রামে ভাবিদের বাড়িটাই বড়সড়। আশেপাশের বাড়ি গুলো কিছুটা ছোট। ভাবিদের গরু আছে, ছাগল আছে, রাজহাঁস আছে। এগুলো লালন-পালন করার জন্য আলাদা লোক ও রাখা আছে। তাদের বাড়িটা পাকা করা। উপরে টিন, আর দেয়াল গুলো ইট-সিমেন্টের। বারান্দা আছে বড়সড়। বারান্দার চারপাশে লোহা দিয়ে বেড়া দেওয়া। বারান্দার দু পাশে সিমেন্টের উঁচু দেয়াল। আর নিচে তিনটা মোটা সিঁড়ি।
আশেপাশে সমবয়সী বাচ্চাদের পেয়ে ইরহাম ব্যাট বল নিয়ে ছুটেছে। জাহানারার মা ভীষণ ভালো মানুষ। সকালে তিনি রান্নাবান্না করতে গেলে মৃত্তিকা রান্নাঘরে আসে। গল্প করে কিছুক্ষণ। হাতে হাতে এটা ওটা এগিয়ে দেয়। মৃত্তিকাকে পছন্দ করেন মহিলা। মেয়ের বিয়ের পর মৃত্তিকা খুব একটা আসেনি। এক বার কি দুবার এসেছিল, তাও এক-দুই দিনের জন্য। ভালো করে কথাই হয়নি মৃত্তিকার সাথে। এবারে মৃত্তিকা বেশ কয়েকদিন থাকবে শুনে বেশ খুশি হয়েছেন তিনি।
“- সারাদিন মাথায় ওড়না দিয়া রাখা লাগবো না। আমরা আমরাই তো। একদম ফিরি হইয়া থাকবা”।
মৃত্তিকা হাসে। বলে,
“- আমি ওখানেও এভাবে থাকি মাওই মা”।
“- তুমি তো রান্নাঘরে আসলা, বিয়ার আগে জাহানারা কোনোদিন রান্নাঘরে আসে নাই। কি আর কমু, তোমারে দিয়া কাজ করায়, এত কইরা বলি ভালো হ। হয় না”।
মৃত্তিকা প্রতিবাদ করে বলে,
“- এ সময়ে রান্নাঘরে না আসাই ভালো মাওইমা। বাচ্চাটা সুস্থভাবে আসুক। তারপর যাবে না হয়”।
“- তুমি ভালো দেইখাই ও সংসারে টিকতে পারছে”।
দুজন হেসে ওঠে একসাথে। বিকেলে গোসল করে জাহানারার ছোট বোন ইশারার সাথে লুডু খেলে মৃত্তিকা। গ্রামের অনেক মানুষ মৃত্তিকাকে দেখতে আসে। পাড়া-প্রতিবেশীরা ইরহামকে দেখে, সাথে তাকেও দেখে যায়। গ্রামের মানুষের জীবন-যাপন, গ্রামীণ পরিবেশ মৃত্তিকা উপভোগ করে। ভুলে বসে সকল দ্বন্দ্ব।
ওদিকে আফিম সারাদিন ঘুর ঘুর করে মৃত্তিকাদের ফ্ল্যাটের সামনে। মৃত্তিকার বাবাকে বাড়ি থেকে বের হতে দেখে এগিয়ে যায় সে। তাকে দেখে একটু ভয় পান আতিকুর রহমান। তবে সামলে নেন নিজেকে। আফিম গা ছাড়া কণ্ঠে বলে,
“- আপনার মেয়ে কোথায়?”
“- যেখানেই থাকুক, তোমার কি”?
“- আপনার মেয়েকে না দেখলে পরান ছটফট করে। একটু বেলকনিতে আসতে বলেন তো৷ এক নজর দেখে যাই”।
তব্দা খেলেন আতিকুর রহমান। একটু রেগেও গেলেন।
“- মৃত্তিকা বাড়িতে নেই। ওকে ডিস্টার্ব করলে আমি কিন্তু থানায় গিয়ে মামলা করতে বাধ্য হবো”।
“- আপনি মুরুব্বি, দেখেন যা ভালো মনে করেন। শুধু বলেন মৃত্তিকা কোথায় গেছে”?
“- তোমাকে বলবো কেন”?
“- আপনার মেয়েকে খুঁজে পেতে আমার খুব একটা সময় লাগবে না। আগেভাগেই বলে দিলেই পারেন। আমি ঘাড়ত্যাড়া হলে, আপনিও কম নন”।
মৃত্তিকার বাবা রাগ দেখিয়ে চলে যান। আফিম সারা সন্ধ্যা দাঁড়িয়ে থাকে ওদের বাড়ির সামনে। ফ্ল্যাটের একজনের থেকে আফিম জানতে পারে গতকাল রাতে মৃত্তিকাকে দেখেছে ব্যাগ নিয়ে বের হতে। তবে কোথায় গিয়েছে, কে কে গিয়েছে সেসব সে জানে না।
চলবে?
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি_শেখ।
[নোটঃ বাইক রেসিং সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। আমি জিপিটি থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তবেই লিখেছি। ভুল হতে পারে]
Share On:
TAGS: ওরা মনের গোপন চেনে না, বৃষ্টি শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৫
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১০
-
ওরা মনের গোপন চেনে না গল্পের লিংক
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৪
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৭+৮
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৩
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৪
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৯