ওরামনেরগোপনচেনে না
পর্ব সংখ্যা __[৬]
ক্লাবে রাত-দিন আড্ডা চলে। কখনো দেশের রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে, আবার কখনো ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলে। রূপক, রায়ান, শান্ত আর আফিম এই আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু। তাদের ছাড়া আড্ডা জমে না। চায়ের সাথে টোস্ট বিস্কিট ভিজিয়ে খেতে খেতে বিভিন্ন আড্ডায় মেতে ওঠে ওরা। আফিম বেপরোয়া প্রকৃতির ছেলে। জগতের কোনো নিয়মকানুনই তাকে বশীভূত করতে পারে না, আটকাতে পারে না। সে ছন্নছাড়া, লাগামহীন। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া, এলাকায় টহল দেওয়া, রাজনৈতিক সমাবেশ কিংবা রাজনীতির যেকোনো কাজে সে আঠার মতো লেগে থাকে। তার প্রিয় বন্ধুদের মধ্যে শান্ত একটু ভিন্ন। সে তার নামের মতোই শান্ত। কোনো ঝামেলার আগেপিছে সে নেই। আফিমের সাথে ঘুরলেও কখনো কারো সাথে ঝামেলায় জড়ায় না শান্ত। বরং কোনো কারণে আফিম রেগে গেলে তাকে স্থির করাই শান্তের কাজ।
একটি মজার ঘটনা ঘটেছে আফিমের সাথে। সকাল সকাল তার কাছে একটি লোমহর্ষক খবর এসেছে। খবরটা নিয়ে এসেছে শান্ত নিজে। খুশিতে চোখ জোড়া জ্বলজ্বল করছিল ছেলেটার। আপাদমস্তক সুখী মানুষ বলে মনে হচ্ছিল। এসির নিচে কম্ফোর্টার টেনে ঘুমিয়ে থাকা নিষ্পাপ ছেলেটির মেজাজ গরম করতে শান্ত হাজির হয় তার বাড়িতে। জানায় আফিমের সহজ-সরল পিতা জনাব আশরাফ মির্জা শহরের অলিগলির সব দেয়াল, রশিতে পোস্টার টানিয়েছে। আফিম বিস্মিত হয় খানিক। চোখ কচলে বলে,
“- পোস্টার? কিসের”?
গাল ভরে হাসে শান্ত। দাঁত সবগুলো বের করে বলে,
“- শহরের কোনো দোকানদার যেন তোর কাছে সিগারেট বিক্রি না করে, সেই আবেদন জানিয়ে পোস্টার টানিয়েছে। সাথে মামলা করে দেবার হুমকিও দিয়েছে”।
চুপসে যায় আফিমের মুখ। রাগও হয় খুব। এগুলো কি ধরণের কাজ? বাপ হয়ে ছেলের বিরুদ্ধে এত বড় ষড়যন্ত্র কি করে করল? একটুও বুক কাঁপল না? এত বড় কুটনৈতিক চাল চালতে কিভাবে পারে? গর্জে ওঠে আফিম। তার বাবা বাড়ি নেই। এত বড় একটা কাজ করে সে ঘাপটি মেরে আছে। একবার জানায়ওনি তাকে।
“- দেখেছিস? এমনি এমনি বলি আমার বাপ আমার জাত শত্রু? জাদরেলের কাজ কারবার দেখেছিস? আমাকে মেরে ফেলার ধান্দা করছে”।
বোকা হাসে শান্ত। বলে,
“- ভালোই তো করেছে”।
ক্রুর হাসে আফিম। বলে,
“- সমস্যা নেই। আমাকে সিগারেট না দিলেও তোদের তো দেবে”।
ফিক করে হেসে ফেলে শান্ত। বলে,
“- আঙ্কেলকে তোর এত কাঁচা খেলোয়াড় মনে হয়? তোর ছবি সহ আমাদের ছবিও ছেপে দিয়েছে বিরাট আকারে। আমরা কেউই দোকানে গেলে সিগারেট পাবো না”।
বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে আফিম। রাগ হয় খুব। ঝট করে উঠে যায় বিছানা ছেড়ে। ব্রাশে টুথপেষ্ট লাগিয়ে বলে,
“- এই আইডিয়া পেল কোথায়? আসুক আজ বাড়ি, একটা এসপার ওসপার করেই ছাড়বো”।
বিছানা ছেড়ে উঠে আফিমের কাছে এসে দাঁড়ায় শান্ত। নরম কণ্ঠে বলে,
“- আঙ্কেল তোর ভালোর জন্যই করছে। দিনে কটা সিগারেট খাস গুনে রাখিস? ভিতরের সব তো পুড়ে যাচ্ছে”।
সবুজাভ চোখ দ্বারা শান্তকে ভস্ম করে দেয়ার মতো করে তাকায় আফিম। শান্ত দমে যায়। ব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে আফিম বলে,
“- হঠাৎ আমার সিগারেট খাওয়া নিয়ে তার এত জ্বলন হলো কেন বলতো?”
সন্দিহান দৃষ্টিতে শান্তর দিকে তাকিয়ে আফিম ফের বলে,,
“- এতে তোর হাত নেই তো”?
দাঁত দিয়ে জিভ কাটে শান্ত। মাথায় হাতের তালু ঠেকিয়ে কসম কাটে,
“- আল্লাহ’র কসম, আমি এইসবে নাই”।
“- পোস্টার এনেছিস? দেখি”?
শান্ত পোস্টার মেলে ধরে আফিমের সামনে। পোস্টারে কালো করে তার, রায়ান, রূপক আর শান্তর ছবি প্রিন্ট করে দিয়েছে কিছুটা বড় আকারে। আফিমের দলের আরো কয়েকটা ছেলেপেলের ছবি দিয়েছে। তবে সেগুলো কিছুটা ছোট আকারের। যেন বিশেষ করে ওদের চারজনকে টার্গেট করে রেখেছে। বড় বড় করে কাগজে লিখে দিয়েছে “আমার ছেলে আফিম মির্জা ও তার বন্ধুদের নিকট মাদকদ্রব্য বিক্রয় করা থেকে বিরত থাকুন। কোনো দোকানী তাকে ধুমপানে সাহায্য করলে, দোকানীর নামে মামলা করা হবে”।
আশরাফ মির্জা
চোখ কপালে ওঠে আফিমের। ত্যক্তবিরক্ত হয়ে গজগজ করে পোস্টারটা ছিঁড়ে ফেলে সে। দাঁত ব্রাশ করে তোয়ালে দিয়ে ঘষাঘষি করে মুখ মুছে হঠাৎ তাকায় শান্তর দিকে। ক্রুর হেসে বলে,
“- ওই লোক আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে না? দেখ এবার আমি কি করি”?
ভয় পায় শান্ত। আঁতকে উঠে বলে,
“ কি করবি”?
“- এই বার এই ব্যাটাকে আমি বিয়ে করিয়েই ছাড়বো”।
আফিম বাইক নিয়ে ছুটে যায় কোথাও। দলের লোকদের সাথে কথা বলে আফিম আশরাফ মির্জার অনেক গুলো করে ছবি ছাপায় কাগজে। নিচে বড় বড় করে লিখে দেয় “ আমি জনাব আশরাফ মির্জা, বিবাহ করিতে ইচ্ছুক। কোনো হৃদয়বান নারী আমাকে বিয়ে করিতে আগ্রহ প্রকাশ করিলে, উক্ত নাম্বারে যোগাযোগ করিবেন”।
এরপর আশরাফ মির্জার নাম্বার লিখে দেয় নিচে। দলের সব ছেলেপেলেকে দিয়ে দেয়ালে দেয়ালে, রশিতে, দোকানের শাটারে, এমনকি রাস্তায় ছিটিয়ে পোস্টার গুলো সবার কাছে পৌঁছে দেয় ওরা। সারাদিন এই অপকর্ম করার পর শান্তিতে জিরিয়ে নেয় সে। কোক কিনে বন্ধুদের সাথে খেতে খেতে উল্লাসে মেতে ওঠে। আশরাফ মির্জার প্রতিক্রিয়া জানার জন্য আকুপাকু করে আফিমের মন। তাকে ঘোল খাওয়ালে সে ঘোল দিয়ে দই বানিয়ে খাওয়াবে। এতক্ষণে নিশ্চয়ই সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে আশরাফ মির্জা বিয়ের জন্য পাত্রী খুঁজছেন। হয়তো শ খানেক কল ও ঢুকেছে তার বাবার ফোনে। ভেবেই খিলখিল করে হেসে ওঠে ছেলেটা। রাতে একটা ভালো ঝামেলা হবে। নিজেকে প্রস্তুত করে আফিম। হাই তোলে ঘন ঘন।
আজ সাভারের এক দলের সাথে তর্ক হয়েছে আফিমের। ছেলেগুলো আফিমদের এলাকায় এসে দল বেঁধে মদ, গাঁজা, ইয়াবা খেতে শুরু করেছে। প্রথমে আফিমের নজরে আসেনি এসব। বেশ কয়েকদিন উক্ত দলের ছেলেদের এ এলাকায় যাতায়াত বাড়তে দেখা গিয়েছে। ফলে বিষয়টা নজরে এসেছে আফিমের। তার মুখ দিয়ে নরম কথা বের হয় না। দলের সামনে গিয়েই ছেলেটা চোটপাট করে এসেছে। পরিপ্রেক্ষিতে ওই দল
ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে আফিমকে মারার হুমকি দিয়েছে। কাল ওরা দলবল নিয়ে এদিকে আসবে। আফিম নিজেও প্রস্তুত। লোহার রড, ক্রিকেট ব্যাট, বাঁশের লাঠি জমিয়ে রেখেছে। ওরা আঘাত করতে এলেই পাল্টা আঘাত করবে আফিমরাও।
দুরের সুপার শপটায় এসেছে মৃত্তিকা। ইরহামের সুজি শেষ। জাহানারার জন্য মাদার্স হরলিক্স কিনতে হবে। বাড়ির আশেপাশের দোকানে হরলিক্সটা নেই, থাকলেও তা অন্য কোম্পানীর। ভাবি যে কোম্পানির হরলিক্স খায় তা নিতে হলে সুপার শপে আসতে হয়। বাড়ি থেকে বেশি দূর নয়। মাত্র দশ টাকা রিকশা ভাড়া। মৃত্তিকার গায়ে আজ হলদে পাতলা কামিজ। বদন কিছুটা ঘর্মাক্ত, তেলতেলে। মাথার ওড়না কাঁধে পরে আছে। গরমে গাল হয়ে উঠেছে রক্তিম। সুগভীর নেত্রযুগলে কিঞ্চিৎ কাজল লেপে দেয়া। শুষ্ক ঠোঁট জোড়া জিভ দিয়ে ভেজাতেই রাস্তার অপর পাশে রাজকীয় ভাবে বাইকে বসে থাকতে দেখতে পায় আফিমকে। অত্যন্ত সুন্দর আর নাটকীয় ভঙ্গিতে বসে আছে ছেলেটা। পরনে স্কাই ব্লু রঙের শার্ট আর কালো প্যান্ট। বরাবরের মতোই টপ বাটন খোলা। মৃত্তিকা যে আফিমকে দেখতে পেয়েছে তা বুঝতে দেয় না আফিমকে। তৎক্ষনাৎ চোখ ঘুরিয়ে রিকশা খোঁজে মৃত্তিকা। আফিমের সাথে কিছু ছেলেপেলে আছে। সবার হাতে লাঠি, বাঁশ আর রড। কি নিয়ে যেন ব্যাপক আলোচনা করছে ওরা। আফিমকে দু পাশ দিয়ে ঘিরে রেখেছে ছেলেগুলো। তাদের সাথে কথা বলতে বলতেই আফিমের নজর পরে মৃত্তিকার দিকে। তাকে দেখে সহসাই চিত্ত চনমনে হয়ে ওঠে আফিমের। প্রায় তিনদিন পর মৃত্তিকার সাথে দেখা হয়েছে। এভাবে মেয়েটাকে না জ্বালিয়েই ছেড়ে দেবে?
ছেলেগুলোকে সরিয়ে আফিম শিস বাজায় খুব জোরে। ভড়কে যায় মৃত্তিকা। না চাইতেও রাস্তার অপর প্রান্তের ছেলেটির দিকে তাকায় সে। সুযোগটা কাজে লাগায় আফিম। আঙুলের ইশারায় ডাকে মৃত্তিকাকে। মৃত্তিকা অবুঝের ন্যায় আইঢাই করে এদিক ওদিক তাকায়। যেন সে দেখতেই পায়নি আফিমকে। কিন্তু আফিম কি ছেড়ে দেয়ার পাত্র। চেঁচিয়ে সে ডেকে ওঠে,
“- এই মেয়ে, এদিকে”।
মৃত্তিকা আফিমের সাথে খুব বেশি সখ্যতা বাড়াতে চায় না। এ এলাকার অনেকে ইয়াসিনকে চিনতো। আগে-পিছে কথাও বলতো তাদের নিয়ে। যখন জেনেছে ইয়াসিন মৃত্তিকার ফিয়ন্সে, তখন তাদের মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন যদি আফিম নামক বখাটে, বেয়ারা ছেলের সাথে মৃত্তিকাকে বারবার কথা বলতে দেখে, তাহলে অনেকেই অনেক কটু কথা বলবে। এসব কিছুই চায় না মৃত্তিকা। এতসব ঝামেলা আর ভালো লাগে না তার। খুব সাদামাটা একটা জীবন চেয়েছিল সে। ইয়াসিন নামের ছেলেটিকে নিজের করে পেতে চেয়েছিল, একটি ছোট্ট সংসার গোছাতে চেয়েছিল। সেসব যখন পায়নি, তখন আর কোনো কিছুই গ্রহনযোগ্য ঠেকে না।
আফিম পুনরায় চেঁচিয়ে ডাকে মৃত্তিকাকে। কঠিন স্বরে বলে,
“- আমি উঠলে কিন্তু রেহাই পাবে না মৃত্ত”।
“মৃত্ত”? নামটা শুনে শরীর ঝাঁকিয়ে ওঠে মৃত্তিকার। গা দুলে ওঠে কিছুটা। ফাঁকা হয়ে আসে মেয়েটার মস্তিষ্ক। আফিমের কড়া হুমকির নিচে ধামাচাপা পরে তার দুর্বল প্রতিবাদ। কণ্ঠরোধ হয়ে আসে। আশপাশের মানুষ তির্যক নজরে দেখছে মৃত্তিকাকে। অস্বস্তিতে আঁটসাঁট হয়ে দাঁড়ায় মৃত্তিকা। ওদের হাতে অস্ত্র দেখে ভয় বাড়ে তার। কিছুক্ষণ দোনামনা করে রাস্তা পার হয়ে সে এগিয়ে আসে আফিমদের দিকে। আফিম হেলে থাকা দেহটি তুলে ফেলে। তার সবুজাভ চোখ জোড়ায় ক্রোধ আর অধিকার বোধ দেখতে পায় মৃত্তিকা। মিনমিনে স্বরে বলে ওঠে,
“- আপনি আমাকে আর এভাবে ডাকবেন না প্লিজ। কেউ দেখে ফেললে বিপদ”।
আফিম গা দুলিয়ে হাসে। বলে,
“- সবচে বড় বিপদ তোমার সামনে বসে। অন্য কোনো বিপদ তোমায় ছোঁয়ার সাহস রাখে”?
শিউড়ে ওঠে মৃত্তিকা। আফিম হয়তো এসব মজা করে কিংবা কথার অর্থ না বুঝেই গড়গড় করে বলে ফেলছে। কিন্তু কথাগুলো নিজের মতো করে সাজালে তা আরো ভয়ঙ্কর অর্থ বহন করে। ঢোগ গেলে মৃত্তিকা। বলে,
“- যা বলার দ্রুত বলুন।”
শান্ত, রায়ান, রূপক তাকিয়ে আছে মৃত্তিকার দিকে। মিটিমিটি হাসছে ওরা। ওদের দিকে চোখ গরম করে তাকায় আফিম। বলে,
“- আমার জন্য এক প্যাকেট সিগারেট এনে দাও তো”।
বিস্ময়ে আঁতকে ওঠে মৃত্তিকার দেহ। লোমকূপ খাঁড়া হয়ে ওঠে। কি আশ্চর্য! ছেলেটা মাত্রাতিরিক্ত বেয়াদবি করছে না এবার? মৃত্তিকাকে সিগারেট আনতে পাঠাচ্ছে? এত সাহস? প্রচণ্ড রুক্ষ স্বরে মৃত্তিকা বলে ওঠে,
“- দেখুন, আপনি বাড়াবাড়ি করছেন”।
আফিম প্যান্টের পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে ৫০০ টাকার চকচকে নোট বাড়িয়ে দেয় মৃত্তিকার দিকে। মৃত্তিকা বিরক্ত হয় বেজায়। পোস্টার তাদের গলিতেও লাগানো হয়েছে। সে জানে সবটা।
আফিম বলে,
“- দেখো, এ এলাকার কোনো দোকানদার আমার কাছে সিগারেট বিক্রি করবে না। আমার বাবা সব দোকানদারকে নিষেধ করেছে আমায় সিগারেট না দেয়ার জন্য”।
হাসি পায় মৃত্তিকার। আশরাফ মির্জার কাজটায় সে খুশি হয়েছে খুব। তেনার প্রশংসা করে মৃত্তিকা বলে,
“- নিঃসন্দেহে তিনি একটি চমৎকার উদ্যোগ নিয়েছেন”।
“- এটা তোমার ভালো মনে হচ্ছে? আমাকে এলাকার বাইরে গিয়ে লোক লাগিয়ে সিগারেট আনতে হচ্ছে”।
“- তিনি একজন বাবা। তাই বাবা হয়ে ছেলের খারাপ দিকগুলো মেনে নিতে পারছেন না বলেই এমনটা করেছেন”।
“- তুমি এনে দেবে কি না”?
মৃত্তিকা দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“- কোনোভাবেই আমি এরকম কিছু করবো না”।
বিরক্তি ঘিরে ধরে আফিমকে। টানা কয়েক ঘন্টা এদিক ওদিক ঘুরে বেহাল দশা তার। এখন আর এনার্জি নেই শহরের বাইরে যাওয়ার। তাকে চেনে না এমন দোকানী খুব কম। এখন সিগারেট না খেলে মাথা হ্যাং হয়ে থাকবে। এনার্জি ফিরে পাবে না একদম। বন্ধুদের সাথে যা খেয়েছে তাও হজম হবে না। মেয়েটাকে আজ ভারি সুন্দর লাগছে। এত সুন্দর মেয়েদের ধমক দিতেও মন সায় দেয় না। কিন্তু মৃত্তিকা মেয়েটা এমনই। তার ব্যক্তিত্ব দৃঢ়। অন্যান্য মেয়েটের মতো নাটুকেপনা তার দ্বারা হয় না।
আফিম চোখের ইশারায় সবাইকে চলে যেতে বলে। সবাই চলে গেলে সে ধীর কণ্ঠে বলে,
“- এখন যদি তোমাকে উঠিয়ে নিয়ে যাই মৃত্ত? কি করবে”?
চমকায় মৃত্তিকা। দু কদম পিছিয়ে বলে,
“- মজা করবেন না”।
“- মজা করছি না, ভেবেচিন্তেই বলছি”।
“- আমাকে আপনি তুলে নিয়ে যাবেন কেন”?
“- কারণ তোমাকে আমার মনে ধরেছে। তোমার মধ্যে আহ্লাদী স্বভাব নেই, নাটুকেপনা নেই। এরকম মেয়েদের প্রতি ছেলেদের আগ্রহ কাজ করে।”
“- এ ধরণের কথা আর বলবেন না। আমি এ ধরণের কথা শুনতে অভ্যস্ত নই”।
“- অভ্যেস করে নাও মেয়ে। আমার এ ধরণের কথা তোমাকে আজীবন শুনে যেতে হবে”।
“- কেন”?
“- কারণ আমি তোমাকে সহজে ছেড়ে দেবো না”।
“- আমার সাথে আপনার কিসের শত্রুতা”?
“- শত্রুতা থাকলে কি আর ডেকে কথা বলতাম? এভাবে কথা বলতাম? তুলে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব রাখতাম? তোমার মনে হয় আমি এত নত স্বরে কথা বলতে পারদর্শী”?
মৃত্তিকা পিছিয়ে আসে। কোনো কথা না বলেই সে দ্রুত পা চালায়। আর বাইরে বের হবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয় সে। মৃত্তিকাকে যেতে দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে আফিম। সুমধুর, সাবলীল কণ্ঠে উচ্চস্বরে গেয়ে ওঠে,
“দস্যু হয়ে তারা, ভাঙবে যে পাহারা,
জাগাবে তোমায় রাতেএএএএএ
বলো না বলো শুনতে কি চাও?
বলো না বলো শুনতে কি পাও?
বলো না বলো, আজকে আমায়”।
খানিক নিচু কণ্ঠে পুনরায় আউড়ায়,
“তোমায় ঘিরে, অকারণে, আমার এ পাগলামী,
বুঝিয়ে দেয় যখন-তখন বদলে গেছি আমি”।
আফিমের এ গান শুনে ধরফর করে ওঠে মৃত্তিকার বুক। বুকে হাত চেপে তড়িঘড়ি করে রিকশায় চড়ে সে। সিদ্ধান্ত নেয় আফিমের সামনা-সামনি আর কখনো পরবে না। তাকে দেখলে উল্টো রাস্তা ধরবে মৃত্তিকা।
সন্ধ্যের পর পর হন্তদন্ত হয়ে বাড়িতে ফেরেন আশরাফ মির্জা। তার এক হাতে ফোন আর অপর হাতে পোস্টার। দ্রুত পায়ে হম্বিতম্বি করতে করতে সে বাড়িতে আসে। বাড়িতে ঢোকার পথেই হুংকার করতে থাকেন তিনি। বজ্র কণ্ঠে আফিমকে ডাকতে থাকেন। আফিম সে ডাক শুনেও না শোনার ভান ধরে। মনে মনে হাসে সে। বাড়িতে ঢুকেই আশরাফ মির্জা দেখেন আফিম টিভিতে খবর দেখছে। তার হাতে পপকর্ণের ঠোঙা। খুব মনোযোগী ভঙ্গিতে টিভির দিকে চেয়ে আছে সে। আশরাফ মির্জা গজগজ করতে থাকেন। আফিম তার হিংস্রতাকে উপেক্ষা করে। আফিমের দৃষ্টি বরাবর চোখ রেখে তিনি টিভির দিকে তাকান। খবরের হেডলাইনে নিজের নাম দেখে চমকে ওঠেন। চশমা এঁটে ভালো করে তাকান টিভির দিকে। হেড লাইনে লিখেছে “ঢাকার অলিগলিতে পাত্রী চেয়ে পোস্টার টানিয়েছেন ঢাকার অন্যতম ধনী ব্যবসায়ী আশরাফ মির্জা। শহর জুড়ে চলছে বিভিন্ন মুখী আলোচনা-সমালোচনা”।
হতবিহ্বল হয়ে পরেন আশরাফ মির্জা। ছেলের দিকে ক্রোধ মাখা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন,
“- বেয়াদবীর একটা সীমা থাকে, তুমি এটা কিভাবে করলে? আমার মান সম্মান সব ধুলোয় মিশিয়ে দিলে”।
অত্যাধিক শান্ত কণ্ঠে আফিম জবাব দেয়,
“- আপনি আমার ছবি ছাপাতে পারেন, আমি পারি না”?
“- তাই বলে তুমি আমাকে এভাবে অপমান করবে”?
“- বিয়ে করলে কেউ অপমানিত হয়”?
“- তুমি জানো এ পর্যন্ত কতগুলো কল এসেছে আমার ফোনে? রাগে আমি ফোন অফ করে রেখেছি। তুমি এই দুঃসাহস কেন দেখালে? সমাজের সামনে আমার গুড ইমেজটাকে নষ্ট করলে”।
“- আপনিও তো আমাকে নেশাখোর বানিয়ে ফেলেছেন সবার কাছে। সে বেলায়”?
রাগে, দুঃখে মাথার চুল টেনে ছিঁড়তে ইচ্ছে হয় আশরাফ মির্জার। হিংস্র সিংহের ন্যায় গর্জন করতে থাকে সে। গটগট করে চলে যান নিজের ঘরে। আফিমকে দেখলেই রাগ তরতর করে বাড়ছে। এ ছেলের সাথে কথা বলাই বৃথা। যত কথা হবে কত তাকে রাগানো হবে। আশরাফ মির্জা ঘরে চলে যেতেই ফিক করে হেসে ফেলে আফিম। ব্যাটা ঘাবড়ে গেছে। তাকে জব্দ করতে পেরে এক চোট হেসে নেয় আফিম। কিছুক্ষণ বাদে কল করে তার ছেলেপেলেদের। পোস্টার গুলো খুলে ফেলার আদেশ জানায়। জানায় তার বাবা কতটা ভড়কেছে, বিব্রত হয়েছে।
বাড়ি থেকে কিছুটা দূরের মাঠে মেলা বসেছে। মৃত্তিকার সেখানে যাবার কোনো ইচ্ছেই নেই। একেই আফিম যা কাণ্ড করে বেড়াচ্ছে তাতে কলঙ্ক লাগতে বেশি সময় লাগবে না। ছেলেটার থেকে দুরত্ব বাড়াতে চায় মৃত্তিকা। কিন্তু বিধাতার মর্জির কারণে বারবার আফিমের সামনে পরতে হয় তাকে। না চাইতেও আফিমের সাথে সাক্ষাৎ হয় মৃত্তিকার। দুদিন ঘর ছেড়ে বের হয়নি সে। আফিমের কথাবার্তা বড় অদ্ভুত লাগে তার কাছে। পাশেই মেলা বসেছে জানতে পেরে ইরহাম মেলায় যাওয়ার জন্য বায়না ধরেছে। ওদিকে জাহানারার সাত মাস চলছে, ভর সন্ধ্যায় কিছুতেই সে বের হয় না। মেহমেতের অফিস ছুটি হবে আটটায়। ইরহামের দাদুর দোকান মেলার কাছেই। আজ বিক্রি-বাট্টা বেশি হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে সে চলে গেছে দোকানে। একমাত্র ব্যস্ততা নেই মৃত্তিকার মাঝে। পরীক্ষা শেষ, ভার্সিটি নেই বললেই চলে। তাই ইরহামকে মেলায় ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব এসে পরে মৃত্তিকার কাঁধে। ছেলেটা এত জেদ ধরেছে যে বাধ্য হয়েছে তাকে নিয়ে মেলায় আসতে।
দিগন্তজুড়ে বিস্তৃত খোলা জায়গাটায় সারি সারি করে বসেছে মেলার আয়োজন। নাগরদোলার বিশাল চাকা ঘুরছে ধীরে ধীরে, আলোয় আলোয় ঝলমল করছে চরকি। মিনি ট্রেনের শিস ভেসে আসছে ভিড়ের ভেতর দিয়ে, আর বেলুন ছোড়ার দোকানে ছোটদের উচ্ছ্বাস বোঝা যাচ্ছপ। চারপাশে মানুষ গিজগিজ করছে। এতটাই ভিড় যে, পা ফেলার জায়গাটুকুও পাওয়া দায়।
খাবারের দোকানগুলো থেকে ভেসে আসছে ভাজাভুজির গন্ধ, মিষ্টির দোকানে রঙিন জিলাপি আর সন্দেশ চোখ টানে। কসমেটিকসের ঝকঝকে স্টলে সারি সারি চুড়ি, কানের দুল, চিরুনি সাজানো। একটু দূরে হাঁড়ি-পাতিলের দোকানে ধাতব জিনিসের ঝনঝন শব্দ। চারদিকে স্ট্রিট ফুড, চটপটি, ফুচকা, কাবাবের দোকান বসেছে। প্রতিবছর একদিনের জন্য এই মেলাটা বসে, আর সেদিন আশপাশের সব মানুষ এখানে চলে আসে।
মৃত্তিকা আজ ঢিলেঢালা পাকিস্তানি ইন্সপায়ার্ড ফোর পিস পরে এসেছে। মাথায় সুন্দর করে ওড়না টেনেছে। ভিড়ের মধ্যেও তাকে আলাদা করে চেনা যাচ্ছে। পার্সে দুই হাজার টাকা এনেছে। ইরহামের খেলনার জন্য জাহানারা দিয়েছে এক হাজার, বাকি টাকা মৃত্তিকার নিজের জমানো। ছোট্ট ইরহামের হাতটা মৃত্তিকা শক্ত করে মুঠোয় ধরে এদিক-ওদিক হাঁটে। মিনি ট্রেনে চড়ে দু’জন, তারপর নাগরদোলায় উঠতে অনেকক্ষণ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।
ইরহামের জন্য বেশ কয়েকটা খেলনা কেনার পর মৃত্তিকা দাঁড়ায় কসমেটিকসের দোকানে। মায়ের জন্য একটা কানের দুল নেবে এই ভেবেই সে ইরহামের হাত ছেড়ে দুলগুলো উল্টেপাল্টে দেখে। আড়চোখে তাকায় ছেলেটার দিকে। ইরহাম দেখতে একেবারে তার বাবার মতো। শ্যামলাটে গায়ের রং, তবু মুখের আদল অপার মিষ্টি। একেবারে গোলগাল মুখ, হাসলে গালে ছোট্ট টোল পড়ে। মুহূর্তের জন্য মৃত্তিকার চোখ আটকে থাকে তার সেই হাসিতে। ফের দুল দেখে দামাদামি করে মৃত্তিকা পার্স থেকে টাকা বের করে। দোকানীকে টাকাটা দিয়ে সে পাশ ফিরে দেখে ইরহাম নেই। চমকে উঠে মৃত্তিকা। দ্রুত আশেপাশে চোখ বুলায় সে। মানুষের অভাব নেই। ইরহামের ছোট্ট দেহটা কোথাও নেই। ভিড়ের মাঝে সে হারিয়ে গেছে। মৃত্তিকার বুক কেঁপে ওঠে। সামনে এগিয়ে ভিড় ঠেলে ঠেলে এগোয় সে। এত কোলাহল, শব্দের মাঝেও চিৎকার করে ডাকে,
“- ইরহাম, বাবা, কোথায় তুমি? ইরহাম”?
ইরহামের সাড়াশব্দ নেই। এত এত বাচ্চাকাচ্চার ভিড়ে তাকে কোথায় খুঁজবে? মাত্রই পাশে ছিল। কোথায় হারাল ছেলেটা? বুক ভার হয়ে আসে মৃত্তিকার। এদিক ওদিক ছুটে ডাকতে থাকে ছেলেটাকে। সবাই তাকায় তার দিকে। প্রশ্ন ছোড়ে। মৃত্তিকার মেরুদণ্ড বেঁকে আসে। ইরহামকে না পেলে কি হবে? আতঙ্কে নীলচে হয়ে ওঠে মৃত্তিকার মুখ। দিশেহারা হয়ে যায় সে।
এদিক ওদিক ছুটে যায় মৃত্তিকা। চেঁচিয়ে ডাকে ইরহামকে। প্রায় পাঁচ-দশ মিনিট পুরো মাঠে টহল দেয় মেয়েটা। মাঠের কোণার একটি খেলনার স্টলে ইরহামের শার্ট গায়ে জড়ানো একটি বাচ্চাকে দেখে থমকে তাকায় সে। সাথে সাথে ডেকে ওঠে,
“- ইরহাম”।
ইরহাম নিজের ডাক শুনে পিছু ফেরে। গাল ভরে হাসে সে ফুপিকে দেখে। ইরহামের সাথের লম্বাটে ছেলেটিও পিছু ফেরে। তাকে দেখে ছলকে ওঠে মৃত্তিকার হৃদয়। কনে যায় তার অস্থিরতা। বুঝতে পারে ইরহামের এভাবে হারিয়ে যাবার আসল রহস্য। ইয়াসিন দাঁড়িয়ে আছে ইরহামের পাশে। নিশ্চয়ই ইয়াসিনকে দেখে ইরহাম ছুটে এসেছে। তাদের বিয়ে ঠিক হওয়ার পর বেশ কয়েকবার ইরহামের সাথে ইয়াসিনের দেখা হয়েছে। ইয়াসিন ঘটা করে ইরহামকে খেলনা, মজা, খাবার কিনে দিয়েছে। তাই লোকটার সাথে বেশ খাতির জমিয়ে ফেলেছিল ইরহাম। তাকে দেখলেই ইরহাম খুশি হয়ে যায়। ইয়াসিনকে দেখে সে ছুটে গেছে এ নিয়ে সন্দেহ নেই মৃত্তিকার মনে। তবে ইয়াসিন কেন ইরহামকে নিয়ে এদিকে চলে এসেছে? কেন ইরহামকে তার হাতে তুলে দেয়নি? মৃত্তিকাকে দুশ্চিন্তায় ফেলবে বলে? রাগে ফেটে পরে মৃত্তিকা। ক্রোধে গভীর চোখ জোড়া জ্বলে ওঠে। তিরতির করে কাঁপে নাকের পাটা। এগিয়ে গিয়ে ইরহামের হাত ধরে মৃত্তিকা। ইয়াসিন হেসে জিজ্ঞেস করে,
“- কেমন আছো মৃত্তিকা”?
মৃত্তিকা কটমট করে তাকায় ইয়াসিনের দিকে। রাগে সে কাঁপছে রীতিমতো। কিছু না বলে ইরহামকে নিয়ে সে খালি জায়গায় আসে। মাঠের পিছন দিকে অনেক কাঁঠাল গাছ দিয়ে ভরা। এদিকটা পুরো ফাঁকা,
মানুষের সমাগম নেই একদম। সবার আনন্দ মাঠের ভিতরের স্টলগুলোতে। ইরহামকে নিয়ে মৃত্তিকা পেছনের ফাঁকা স্থানটায় আসে। ইয়াসিন তার উত্তর না পেয়ে মৃত্তিকার পিছু আসে। ফাঁকা, কোলাহল মুক্ত জায়গায় প্রবেশ করতেই মৃত্তিকার হাত পিছন থেকে টেনে ধরে ইয়াসিন। মৃত্তিকা রেগে আগুন। ঘৃণায় গা দুলে ওঠে। চট করে ঘুরে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে কষে চড় মারে ইয়াসিনের গালে। শব্দ হয় প্রকোট। না থেমে ফের ইয়াসিনের অপর গালে কষে চড় দেয় মৃত্তিকা। হতভম্ব ইয়াসিন। গালে হাত দিয়ে তাকায় মৃত্তিকার পানে। মৃত্তিকা ইরহামের হাত শক্ত করে চেপে ধরে উচ্চ স্বরে চেঁচিয়ে বলে,
“- খবরদার, ওই নোংরা হাত দিয়ে আমাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করবেন না। থুউউ, আপনাকে দেখলে আমার ঘেন্না লাগে”।
ইয়াসিনের গদগদ স্বভাব বদলে গেল সাথে সাথে। প্রথমবার কারো হাতে চড় খাওয়াটা ছেলেটার ইগোতে গিয়ে লাগে। রাগান্বিত কণ্ঠে বলে,
“- তুমি আমায় চড় মারলে কোন সাহসে”?
মৃত্তিকা সমান তালে গর্জে ওঠে,
“- আবার মারবো, যতবার আমার কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করবেন তত বার মারবো। আপনার মতো নরকের কিটদের প্রতিদিন তিন বেলা সপাটে চড় দিলে তাদের শিক্ষা হয়। ইরহামকে আপনি কেন ওদিকে নিয়ে গেছেন? আমাকে কষ্ট দেবেন বলে? আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলবেন বলে”?
“- ইরহাম আমার কাছে এসেছে। তাই আমি ওকে খেলনা কিনে দিতে নিয়ে এসেছি”।
“- কেন ওকে খেলনা দেবেন? ও কি এতিম, অনাথ নাকি দরিদ্র? কোনোটাই নয়। কোন সম্পর্কের খাতিরে ওকে খেলনা কিনে দিবেন”?
মাঠের ভিতর অনেক শব্দ। তাদের উচ্চস্বর পৌঁছায় না কারো কানে। ইয়াসিনের রাগ মাথায় চড়ে। এগিয়ে এসে মৃত্তিকার হাত চেপে ধরে সে। জেদ দেখিয়ে বলে,
“- দেখি মারো, কত পারো তুমি, আমি দেখতে চাই”।
অতিরিক্ত কষ্ট পেলে রাগ ধামাচাপা পরে যায়। এই ইয়াসিনকে মৃত্তিকা যত দেখে, তত অবাক হয়। তার এত রূপ ছিল, মৃত্তিকা কখনো বোঝেনি। রাগে, দুঃখে কান্না চলে আসে মৃত্তিকার। কন্ঠ নামিয়ে, তেজ দেখিয়ে সে বলে,
“- আমার হাত ছাড়ুন”।
“- ছাড়বো না”।
মৃত্তিকা ছটফট করে নিজের হাত ছাড়াতে চায়। শক্ত হাতের বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে না মেয়েটা। রাগ গুলো উড়ে গিয়ে কান্নারা আছড়ে পরে। হু হু করে ওঠে কায়া। চোখ বেয়ে গড়ায় নোনা পানি। মৃত্তিকা শক্তি খাটায়, নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার প্রয়াস চালায়। না পেরে শক্তি ফুরিয়ে আসে মৃত্তিকার। মুক্তির আশা ছেড়ে দিতেই একটি দানবীয়, শক্তপোক্ত হাত মৃ্ত্তিকার হাতের উপর রাখা ইয়াসিনের হাতটা চেপে ধরে। ভীত হয়ে পাশে তাকিয়ে আফিমকে দেখে ইয়াসিন। তার আগমনের কারণটা বোধগম্য হয় না ইয়াসিনের। তবে এই সময়টায় আফিমকে দেখে স্বস্তি পায় মৃত্তিকা। ছলছল চোখে তাকায় আফিমের দিকে। আফিম দেরি না করে আচমকা ঘুষি বসিয়ে দেয় ইয়াসিনের মুখে। ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে ছেলেটা। মুখে কালসিটে দাগ পরে সঙ্গে সঙ্গে। মৃত্তিকার হাত ছেড়ে দু কদম এগিয়ে মাটিতে আছড়ে পরে সে। আফিমের চোখ হিংস্র হয়ে উঠেছে। ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে তাকে। রাগে শরীরের সমস্ত রগ ফুলে উঠেছে। ইয়াসিন উঠে দাঁড়ালে তার কলার চেপে ধরে আফিম। ধাক্কা দিয়ে মৃত্তিকার পাশের গাছটির সাথে মিশিয়ে দেয়। মৃত্তিকার কান্না পায় প্রচণ্ড। ইয়াসিনের এই কুৎসিত রূপ তাকে বুঝিয়ে দেয় সে কতটা বোকা, কতটা গাধা। ইয়াসিন ব্যথায় নতজানু হয়ে প্রশ্ন করে,
“- আপনি আমায় মারছেন কেন”?
আফিম ক্রোধে ফেটে পরে। হুংকার ছেড়ে বলে,
“- মাদার*চোদ, মৃত্তিকার হাত ধরেছিস কেন?”
ইয়াসিন বিব্রত কণ্ঠে বলে,
“- আপনি বুঝবেন না, ছাড়ুন আমায়। মৃত্তিকা, একে বলো আমাকে ছেড়ে দিতে”।
পুনরায় ইয়াসিনের কলার শক্ত করে চেপে ধরে আফিম। ঝাঁঝ মিশিয়ে বলে,
“- আর একবার ওর নাম উচ্চারণ করে দেখ, জিন্দা পুঁতে ফেলবো বাই*চোদ।”
মৃত্তিকা আফিমকে থামায় না। বরং ইরহামকে কোলে চেপে ঝরঝর করে কাঁদে মেয়েটা। তার কান্নার শব্দে আফিম বিচলিত হয়ে পরে। ছেড়ে দেয় ইয়াসিনের শার্টের কলার। মনটা কু ডেকে ওঠে। এই নির্জন জায়গায় মৃত্তিকার সাথে কোনো ভুল করেনি তো ছেলেটা? ব্যতিব্যস্ত হয়ে আফিম মৃত্তিকার কাছে এসে শুধোয়,
“- মৃত্ত, কি হয়েছে? দেখি, কাঁদছো কেন? ও মেরেছে তোমাকে? কোথায় মেরেছে দেখাও? ছুঁয়েছে খারাপ ভাবে? খারাপ কথা বলেছে? বলো আমায়”।
মৃত্তিকা নাক টানে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে আফিমের দিকে। ঠোঁট জোড়া কাঁপে মেয়েটার। আফিম এত নরম স্বরে কথা বলছে কেন? এভাবেও ছেলেটা কথা বলতে পারে? মৃত্তিকাকে বাচ্চাদের মতো ট্রিট করছে ছেলেটা। তার চিন্তিত স্বর, আদল হতভম্ব করে দেয় মৃত্তিকাকে। সে ভেবে পায় না আফিমের বিচরণ কেন সর্বত্র? কেন সে সব জায়গায় হাজির হয়ে যায়? মৃত্তিকার বিপদে তাকেই কেন আগে পাওয়া যায়? বোঝে না মৃত্তিকা। বোকা, সাধাসিধে, অবুঝ বালিকার ন্যায় সে চেয়ে রয় আফিমের সুন্দর মুখের দিকে। তাকিয়েই থাকে। চোখ জোড়া শান্ত হয়ে ওঠে মৃত্তিকার।
মৃত্তিকাকে কথা বলতে না দেখে ভয় বাড়ে আফিমের। মেয়েটা তো সচরাচর চুপ থাকে না। তেজী স্বরে প্রত্যুত্তর করে যে মেয়েটা, সে এভাবে থিতিয়ে আছে কেন? প্রশ্নের উত্তর দিতে এত দেরি করছে কেন?
আফিমের দানবীয় দেহের সম্মুখে মৃত্তিকাকে ছোট বলে মনে হচ্ছে। আফিমের লম্বাটে গড়ন, প্রশস্ত বুক, চওড়া কাঁধ, তার সামনে মৃত্তিকা যেন আঠারো বছরের তরুনী। নিষ্পাপ শিশু। তার গোলগাল ছোট্ট মুখ পানে তাকিয়ে ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে আসে আফিমের। আফিম মৃত্তিকার থেকে উত্তর না পেয়ে তেড়ে যায় ইয়াসিনের দিকে। মৃত্তিকা ইরহামকে কোল থেকে নামিয়ে আফিমের শার্ট টেনে ধরে। কম্পিত কণ্ঠে বলে,
“- আ আফিম, ছেড়ে দিন। আমি কাঁদছি না।”
আফিমের দৃষ্টিতে মৃত্তিকার প্রতি মায়া। ইয়াসিনের প্রতি তার দৃষ্টি যতটা হিংস্র, মৃত্তিকার প্রতি তার দৃষ্টি ততটাই মোলায়েম। মৃত্তিকাকে তার শার্টের কোণা ধরে রাখতে দেখে ফিচেল হাসে আফিম। বলে,
“- তুমি আমাকে ছুঁলে কেন মৃত্ত? আমি ছুঁলেই তো দোষ হয়ে যাবে”।
চলবে?
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি_শেখ
[ পেজে ঢুকিনি, জানতাম না আপনারা শর্ত পূরণ করেছেন। প্রিয় পাঠক, আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। এভাবেই পাশে থাকবেন আর সুন্দর মন্তব্য জানাবেন ]
Share On:
TAGS: ওরা মনের গোপন চেনে না, বৃষ্টি শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২
-
ওরা মনের গোপন চেনে না গল্পের লিংক
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১০
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৭+৮
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৪
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১১
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৫
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৯
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১