ওরা মনের গোপন চেনে না
পর্ব সংখ্যা [২৯]
[পর্বটি সংবেদনশীল 🚫]
বিছানার পায়া তে গা এলিয়ে বসে আছে আফিম। গা তার উদাম। মৃদু কাঁপছে সে। মৃত্তিকার মনোযোগ তার হৃৎস্পন্দনের গাঢ় শব্দে। আফিমের দৃষ্টিতে ঘোর। শুকনো ঢোক গিলছে সে। মানুষটা আশ্চর্য রকমের সুন্দর। চোখ জোড়া চকচক করছে তার। মৃত্তিকার বলা কথাগুলো হৃদয়ে দাগ কেটেছে। একদম নিশ্চুপ হয়ে আছে আফিম। মৃত্তিকার মাথা বুক থেকে তোলে সে। মেয়েটা লজ্জায় জুবুথুবু হয়ে আছে। বুক থেকে মাথা তুললেও তার চিবুক ঠেকে কণ্ঠদেশে। ফোলা গাল জোড়া রক্তজবার ন্যায় রক্তিম হয়ে ওঠে। আফিম গাঢ় হেসে, মন্ত্রমুগ্ধ চোখে চেয়ে বলে,
“- সবই বললে, শুধু ভালোবাসি বললে না”।
মৃত্তিকা চট করে তাকায় আফিমের পানে। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসছে লোকটা। দৃষ্টি তার দিকেই নিবদ্ধ। লজ্জিত হয়ে সে শাড়ির আঁচল আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে বলে,
“- ওটা জমা রইল।”
আফিম গালে হাত রেখে মৃত্তিকার আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে। অমায়িক লাগছে মৃত্তিকাকে। তার ফর্সা শরীরে খয়েরি রঙের শাড়িটা দারুণ মানিয়েছে। এতক্ষণে সে খেয়াল করে মৃত্তিকা শাড়ি পড়েছে। শাড়িটা তারই দেয়া। সেদিন যদিও পড়েছিল, আফিম ভালো করে দেখেনি। রাগে-অভিমানে বুদ হওয়া নজর কেন যেন মেয়েটির দিকে ফেলতে ইচ্ছে হয়নি। মৃত্তিকার দিকে কেবল ভালোবেসেই তাকানো যায়।
“- শাড়ি পড়েছো হঠাৎ”?
মৃত্তিকা লাজে আড়ষ্ট হয়। চোখের সামনে চলে আসা অবাধ্য চুলগুলোকে কানের পিঠে গুঁজে বলে,
“- এমনি”।
চোখ ছোট ছোট করে ফেলে আফিম। খানিক ভেবে মুচকি হেসে বিদ্রুপাত্মক কণ্ঠে টেনে টেনে বলে,
“- এমনিইইইইই”?
মৃত্তিকা প্রত্যুত্তর করে না। আফিম উঠে দাঁড়ায়। উঠে দাঁড়ায় মৃত্ত নিজেও। আফিম বেলকনির গ্লাস মেলে দেয় ঘরের ধোঁয়া ঝেরে ফেলার জন্য। গ্লাস সরিয়ে মৃত্তিকার কাছে এসে জিজ্ঞেস করে,
“- খেয়েছো”?
“- না”।
“- ঔষধ খাওনি”?
মৃত্তিকা বোকা হাসে। বলে,
“- মনে নেই”।
“- রান্না করেছো”?
“- উঁহু”।
আফিমের ললাটে ভাঁজ পড়ে। মেয়েটা এত উদাসীন হলো কবে থেকে? আফিম ফোন বের করে। বলে,
“- কি খাবে বলো, অর্ডার করি”।
মৃত্তিকা সাথে সাথে বলে ওঠে,
“- খেতে ইচ্ছে করছে না”।
“- না খেলে মেডিসিন নেবে কি করে”?
মৃত্তিকা চুপ করে থাকে। সহসা লাজ লজ্জা ভুলে বলে ওঠে,
“- আমাকে কেমন লাগছে? বললেন না তো”?
আফিম হতভম্ব। মৃত্তিকার আচরণ ভালো ঠেকছে না। কি তালগোল পাকিয়েছে কে জানে? ব্যগ্র পায়ে মৃত্তিকার নিকট এগিয়ে আসে সে। মৃত্তিকার কপালে শীতল হাত রেখে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত কণ্ঠে বলে,
“- জ্বরটা কি বেড়েছে”?
মৃত্তিকা না বোধক মাথা দোলায়। বলে,
“- আমাকে ভালো লাগছে না”?
“- লাগছে”।
“- কতটা”?
“- যতটা ভালো লাগলে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে, ঠিক ততটা”।
লাজে রাঙা হয় মৃত্তিকা। আফিম তার চিবুক উঁচু করে। চোখের তৃষ্ণা মেটায় মৃত্তিকাকে দেখে। কতক্ষণ চেয়ে থাকে হিসেব নেই। বলে,
“- সাজগোছ তো করোনি।”
“- ডান হাত ঠিক হয়নি, তাই করতে পারিনি”।
“- এসো, আমি সাজিয়ে দিচ্ছি”।
“- আপনি পারেন এসব”?
“- চেষ্টা করি”?
মৃত্তিকা থ বনে যায়। আফিম তাকে নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে আসে। ড্রেসিং টুলে বসায় মৃত্তিকাকে। চিরুনি নিয়ে আঁচড়ে দেয় মেয়েটার দীঘল, লম্বা চুল। মৃত্তিকা মুচকি হাসে। নত হয়ে রয় সে৷ মৃত্তিকার গলায় পাতলা, সাদামাটা সোনার নেকলেস পড়িয়ে দেয়, হাতে চুড়ি পড়িয়ে দেয়। চোখে কাজল দিতে গিয়ে হিমশিম খায় আফিম। ভয় হয়, মেয়েটা চোখে না ব্যথা পায়। এই চোখ দুটোতেই তো তার মায়া প্রগাঢ়। কোনোমতে মৃত্তিকার ঠোঁটে লিপস্টিক, চোখে কাজল দিয়ে মৃত্তিকার পানে নেশাগ্রস্ত হয়ে তাকায় আফিম। চোখ ধাঁধিয়ে ওঠে তার। মৃত্তিকার নতজানু মুখটা দেখে প্রশান্তিতে বুকের মাঝে কম্পন সৃষ্টি হয়। দিগবিদিক ভুলে মৃত্তিকার ঠোঁটের দিকে ঠোঁট এগিয়ে দিতেই মৃত্তিকা ছল করে নিজের মুখে হাতের উল্টোপিঠ চেপে ধরে। বাঁধা দেয়ার প্রয়াস চালায়। আফিম তাতে বিরক্ত হয় না, রাগ ও করে না। সামান্য হেসে মৃত্তিকার হাতের তালুতে ভেজা ঠোঁটের গাঢ় স্পর্শ এঁকে দেয়। একের পর এক, অবিরত, অনিয়ন্ত্রিতভাবে মৃত্তিকার হাতের তালু ভিজিয়ে দেয় সে। মৃত্তিকা লাজে নুইয়ে পড়ে, শ্বাস আটকে বসে থাকে।
আয়নায় নিজেকে দেখে লাজুক হাসে মৃত্তিকা। কেন যেন আজ তার নিজেকে সুন্দরী বলে মনে হচ্ছে। এমনটা হচ্ছে কেন? আফিম সাজিয়ে দিয়েছে তাই? আফিমের স্পর্শ পড়েছে চোখে, ঠোঁটে এজন্য? তার ভালোবাসায় বুঝি আজকে অন্যরকম সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে মৃত্তিকার মুখে?
রাইমা তিনদিন ধরে অফিসে আসছে না। শান্ত শুনেছে রাইমা অসুস্থ। মেয়েটার তিনদিন যাবত পেট ব্যথা। অফিসের সকলে বলাবলি করছে অতিরিক্ত বাইরের খাবার খাওয়ার ফলেই পেটে ব্যথায় ভুগছে রাইমা। ফুচকা থেকে শুরু করে পিৎজা সব কিছুতেই তার প্রবল আগ্রহ। প্রতিদিন ডেলিভারি ম্যানকে ছুটতে হয় রাইমার বাড়ি। মেয়েটা ভীষণ পেটুক। এ কারণেই দুদিন পর পর পেট ব্যথায় ভোগে।
টিফিন পিরিয়ডে শান্ত কল করল রাইমাকে। রাইমা সাথে সাথে কল তুলল। শান্তকে কিছু বলতে না দিয়েই অশান্ত রাইমা চটপটে কণ্ঠে বলল,
“- আমি তিনদিন ধরে অসুস্থ, আর আপনি আমায় দেখতে এলেন না”?
বিব্রত হয় শান্ত। স্বাভাবিক সুরে প্রশ্ন করে,
“- আপনার শরীর এখন কেমন”?
“- কাল যেতে পারবো অফিসে”।
শান্ত মাথা নেড়ে বলে,
“- ও আচ্ছা, কাল তাহলে দেখা হচ্ছে”।
ওপাশ থেকে বিস্ফোরিত কণ্ঠে রাইমা বলে ওঠে,
“- আপনি এমন কেন বলুন তো? আমি সত্যিই খুব অসুস্থ। আপনার কি উচিত না আমাকে দেখতে আসা?”
“- আপনি তো এখন সুস্থ রাইমা”।
“- তো? কোথায় উল্লেখ আছে যে অসুস্থ মানুষকেই দেখতে যেতে হবে? সুস্থ মানুষকে কী দেখতে আসা যায় না? আমি আপনার ফোনের অপেক্ষায় ছিলাম। আপনি একটা টেক্সট ও পাঠালেন না আমায়? এটুকু ভদ্রতা নেই আপনার মাঝে”?
শান্ত হকচকিয়ে ওঠে। বলে,
“- আপনার ঠিকানা তো আমি জানি না রাইমা”।
“- জেনে নিন, আমি মেইল করে এড্রেস দিচ্ছি। চলে আসুন, আব্বু-আম্মুর সাথে দেখা করে যাবেন। আপনার কথা অনেক বলেছি। আমি অসুস্থ, আপনি না এলে খুব দুঃখ পাবো”।
শান্ত তড়িঘড়ি করে কল কাটে। এই মেয়ে বলে কি? সুস্থ মানুষকে দেখতে তার বাড়ি যেতে হবে? এভাবে কি যাওয়া যায়? কাল তো আসবেই অফিসে, আজ দেখতে যেতে হবে কেন? এ তিনদিন শান্ত খুব করে অনুভব করেছে যে রাইমা না থাকলে কাজ করতে তার ক্লান্ত লাগে। ক্লান্তি, উদাসীনতা, অমনোযোগ এসে ঘিরে ধরে তাকে। অফ টাইমে বাচাল রাইমার পাকা পাকা কথা না শুনলে এনার্জি লস হয়ে যায়। ওই সময়টা একঘেয়ে, পানসে লাগে। শান্ত ভাবল সে যাবে রাইমার বাসায়। কারণটা খুব ছোট। মেয়েটা তার জুনিয়র। এই একঘেয়ে কর্মজীবনে একমাত্র রাইমাই শান্তকে উৎফুল্ল রাখে। কারো সাথে মন খুলে কথা বলতে না পারলেও রাইমার সাথে টুকটাক কথা বলতে স্বস্তি পায় শান্ত। কেননা রাইমা তাকে জাজ করে না, কথোপকথন দীর্ঘ করার অনেক চেষ্টা করে। এতে শান্ত না চাইলে অকপটে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, আলাপ দীর্ঘ করতে হয়।
লাঞ্চ টাইমে শান্ত ছুটি নেয় বসের থেকে। একটি ফুলের তোড়া নিয়ে রাইমার বলা ঠিকানাটায় আসে। রাইমার বাড়ি দেখে শান্ত হুঁশ হারায়। মেয়েটা যে ধনী তা বোঝেনি শান্ত। ঘটা করে জিজ্ঞেস করা হয়নি তার ব্যাকগ্রাউন্ড ঠিক কেমন। পরিবার নিয়ে খুব একটা কথা তোলে না রাইমা। শান্ত প্রশ্ন করে না সচরাচর, তার কাজ কেবল উত্তর দেয়া। বাড়ির কাছে এসে আর ফিরে যেতে পারল না শান্ত। কলিং বেল বাজাতেই বাড়ির পরিচারিকা দরজা খুলে দিল। বাড়িতে পা রাখতেই সিঁড়ি বেয়ে রাইমাকে আসতে দেখল শান্ত। ঢিলেঢালা গেঞ্জি আর প্লাজু পড়ে আছে রাইমা। গায়ে ওরনা নেই তার। চুল গোছাতে গোছাতে সে আসছে এদিকে। সিঁড়ির নিচে শান্তকে দেখে রাইমা অবাক হয় খুব। ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকে কিছু সেকেন্ড। অতঃপর নিজের দিকে তাকিয়ে সে দৌড়ে ছুটে যায় ঘরে। তার দৌড় দেখে ভড়কে যায় শান্ত। রাইমা ঘর থেকে একটি স্কার্ফ এনে গলায় ঝুলাতে ঝুলাতে ফিরে আসে সিঁড়ি বেয়ে নিচের দিকে। হাসি হাসি মুখে বলে,
“- আপনি এসেছেন? আমি ভাবলাম আপনি আসবেন না”।
শান্ত মুচকি হেসে বলে,
“- না এলে আপনি আমায় খুব জ্বালাতেন রাইমা। সেজন্যই এসেছি”।
রাইমা হাসে। বলে,
“- আপনি বসুন, আমি আপনার জন্য কফি আনছি”।
শান্ত বাধ্য ছেলের মতো বসে। ওদের বাড়িটা দু তলা। আসবাবপত্র গুলো বেশ দামী। বিভিন্ন পুরোনো শোপিস সাজিয়ে রাখা বাড়ি জুড়। বাড়ির বাইরে দামী গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। শান্তদের চেয়ে ওদের পারিবারিক অবস্থা ভালো। শান্তর বাবা নেই, মা আছে। তিনি ইদানিং অসুস্থ থাকেন। ছোট্ট একটি বাসায় ভাড়া থাকে শান্তরা। কিছুটা বস্তির মতো জায়গায় ছোট ভিটেতে তার বসবাস। শান্তর মা শিক্ষক ছিলেন। এখন বাড়িতেই থাকেন। তার জমানো পয়সা দিয়েই শান্ত বাইক কিনেছে। শান্তর রোজগার ভালো। ওর ইচ্ছে একটা নতুন বাড়ি কিনবে। নিজেদের বাড়িতে উঠবে। মাকে নিয়ে সেখানেই থাকবে। আফিম তার বেস্ট ফ্রেন্ড। সর্বদা শান্তকে সব বিষয়ে সাহায্য করেছে ছেলেটা। তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে শান্ত। তার জীবনে তার মা এবং আফিম সবচে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর বাইরে তার জীবনে কেউ নেই, ছিলও না।
রাইমা কিচেনে ঢুকতেই পরিচারিকা আঁতকে ওঠে। ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে,
“- বু, তুমি আসলা ক্যান? কি লাগবো আমারে কও”।
রাইমা হাসে। বলে,
“- নুডলস বানাবো।”
“- তুমি আসলা ক্যান? আমি কইরা দিতেছি। তুমি তো কোনোদিন রানদো নাই, তুমি পারবা না”।
“- তুমি বলে দাও কিভাবে কি করতে হয়, আমি করে নিবো”।
রাইমা জেদ দেখিয়ে বলে,
“- না, আমিই করবো।”
“- তোমার মায় জানলে আমারে আস্ত রাখবো না”।
রাইমা তবুও শুনল না। আলালের ঘরের দুলালি সে। তার বাবা বিদেশে থাকে। মা সরকারি চাকরি করেন। নিজে কখনো রান্না করে খেতে হয়নি রাইমাকে। আজ প্রথমবার তাকে নিজ উদ্যোগে রান্নাঘরে এসে কাজ করতে দেখে বাড়ির পরিচারিকা ভয় পায়। রাইমা চুলোটাও জ্বালাতে জানে না। কি করে নুডলস বানাবে ভেবে পায় না। রাইমা নিজের জেদে অটল থাকে। শান্তকে সে আজ কফি আর নুডলস বানিয়ে খাওয়াবে নিজ হাতে। বাইরে বসে থাকা শান্ত রাইমা আর পরিচারিকার সব কথাই শোনে। রাইমার আগ্রহ দেখে সে খানিক লজ্জিত হয়। পরিচারিকা সব বলে বলে দেয় রাইমাকে। বলতে গেলে সেই-ই সব করে। রাইমা কেবল উপকরণ গুলো মিশিয়ে দেয় বলে দেয়া পরিমাণ অনুযায়ী। সামান্য নুডলস বানাতে গিয়ে খুব হাঁপিয়ে ওঠে মেয়েটা। তেল ছিটেও আসে দুবার। গরম তেলে পেয়াজ কুঁচি, মাংস কুচি ছাড়তে গিয়ে কবার যে চিৎকার করে ওঠে! সবটাই শোনে শান্ত। রাইমার এই আন্তরিকতা তার ভালো লাগে।
মিনিট কয়েক পর প্লেটে করে নুডলস আর কফি নিয়ে আসে রাইমা। শান্ত কফি খাওয়ার পর নুডলস খায়। শান্ত ফুলের তোড়াটা বাড়িয়ে দেয় রাইমার দিকে। ফুলগুলো দেখে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে মেয়েটা। আড়চোখে চেয়ে বলে,
“- আপনার থেকে ফুল পেয়ে আমার কি যে ভালো লাগছে, আমি বলে বোঝাতে পারবো না”।
শান্ত লজ্জিত, নত সুরে বলে,
“- সামান্য ফুলই তো”।
রাইমা গালে হাত ঠেকিয়ে বলে,
“- সামান্য? ভালোবাসা থেকে শুরু করে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় গুলো শুরু হয় ফুলের সুগন্ধে, ফুলের ব্যবহারে। আপনি ফুলকে সামান্য বলছেন”?
“- আচ্ছা সামান্য বলবো না”।
“- আপনাকে একটা কথা বলবো”?
“- বলুন”।
“- আপনি খুব সাধারণ, আমার সাধারণ মানুষ পছন্দ”।
“- আচ্ছা”।
“- আপনি খুবই ইনোসেন্ট, আমার ইনোসেন্ট মানুষ পছন্দ”।
শান্ত বলে,
“-, ভালো তো”।
“- আমার বোকা, সহজ-সরল মানুষ পছন্দ”।
“- ওহহ্,
“- আমার আপনাকে পছন্দ”।
“- আচ্ছা”।
হেসে উত্তর দেয়ার পর শান্তর পিলে চমকে ওঠে। শ্বাস রোধ হয়ে আসে ছেলেটার কেশে ওঠে সে। প্লেট টা টেবিলে রেখে বসা থেকে দাঁড়ায় সে। অভিব্যক্তি বদলে যায় শান্তর। যেন খুব অস্বাভাবিক, অপ্রত্যাশিত সত্য জেনেছে। অস্থির কণ্ঠে সে বলে,
“- আমি যাচ্ছি”।
রাইমাকে বলার সুযোগ দেয় না শান্ত। হন্তদন্ত হয়ে বড় বড় পা ফেলে চলে যায় গেটের বাইরে। রাইমা ছুটে যায় পিছু পিছু। শান্ত থামে না মোটেই। খুব তাড়াহুড়ো করে বাইক নিয়ে বেরিয়ে যায়। তার এই কাণ্ডে হেসে গড়াগড়ি খায় রাইমা। মনে মনে বলে,
“- আপনি তার মানে অতটাও বোকা না শান্ত। খুব সহজে বুঝে গেলেন। আজ পালালেন, কিন্তু কাল? কাল তো ধরা দিতেই হবে। আপনাকে প্রেমের ফাঁদে না ফেলা পর্যন্ত আমি স্বস্তি পাবো না। আপনাকে আমার খুব আপন আপন লাগে”।
রায়ানদের বাড়িতে আজ নিমন্ত্রণ ছিল মৃত্তিকা আর আফিমের। আফিমকে নিজে থেকে নিমন্ত্রণ জানিয়েছে রায়ানের বাবা। যদিও তিনি আফিমকে খুব একটা পছন্দ করেন না, তবে তন্বীকে নিজেদের কাছে রাখায় তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেই ডেকেছিলেন ওদের। সন্ধ্যায় মৃত্তিকা আর আফিম রায়ানদের বাসায় খেয়েছে। ওরা ছাড়াও শান্ত, রূপক আর দলের কিছু সদস্য ছিল। আফিম পড়েছিল মেরুন সিল্কের শার্ট আর কালো ব্লেজার। মৃত্তিকা পড়েছিল মেরুন রঙের লং ফ্রক।
আফিমদের কাজের চাপ চলছে প্রচুর। রাজনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটছে দিন-দিন। দেশের শত্রু ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এতে কিছুটা বিরক্ত আফিম। মাথায় বিভিন্ন চল-চাতুরী ঘুরছে তার। বাড়ি ফিরেই আফিম হাত মুখ ধুয়ে নিয়েছে। মৃত্তিকার মুখটা শুকনো। আফিম খেয়াল করেছে মৃত্তিকার মনটা ভার, মুখে হাসি নেই। সে বিছানায় শুতে গেলেই মৃত্তিকা সহসা কাছে এসে জিজ্ঞেস করে,
“- তন্বী আপুর সাথে আপনার কোনো সম্পর্ক ছিল না। তন্বী আপুর ভালোবাসাটা এক তরফা ছিল, রাইট?
আফিম শুনল মনোযোগ দিয়ে। গা-ছাড়া ভাবে উত্তর দিল,
“- হু”।
“- আপনি আপুকে একটুও পছন্দ করতেন না”?
“- না”।
“- তন্বী আপুর গলায় একটা চেইন ছিল। দেখেছেন”?
আফিম ভ্রু কুঁচকে ফেলে। মৃত্তিকার কণ্ঠে প্রবল তেজ। কণ্ঠস্বর উত্তপ্ত। অথচ মস্তিষ্ক তার ঠাণ্ডা, কথা গুলোও নত স্বরে বলছে। আফিম বোঝে না এই নতুন মৃত্তিকার মনের লুকানো কথা। মৃত্তিকা বদলাচ্ছে। নব্য প্রেমে পড়লে যেমন মানুষ বদলে যায় তেমন। সে আফিমকে কারণ ছাড়াই দেখতে থাকে, তাকে পর্যবেক্ষণ করে। তার ভাবনা চিন্তা হৃদয়ে ধারণ করে। আফিম সেসব বুঝলেও বোঝে না তার ব্যাকুলতা।
“- আমি ওর দিকে অতটা ভালোভাবে তাকাইনি মৃত্ত”।
“- তাকাননি কেন? আমি পাশে ছিলাম বলে”?
তীরের ফলার ন্যায় তীব্র, ধারালো কণ্ঠে প্রশ্নটি ছোঁড়ে মৃত্তিকা। পর পর বলে ওঠে,
“- তন্বী আপু আমাকে বলেছে, ওই চেইনটা আপনি আপুর জন্মদিনে গিফট করেছিলেন”।
আফিম ভাবে একটু। বলে,
“- হতে পারে”।
মৃত্তিকার মনটা আরো বিষিয়ে উঠল। শব্দ করে উঠে দাঁড়াল আফিমের পাশ থেকে। আফিম বোকা বনে গেল। মৃত্তিকা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তাকে যেতে দেখে পিছু ছুটল আফিমও। তড়াক করে টেনে ধরল মেয়েটির হাত। হেঁচকা টানে কাছে এনে বলল,
“- কি হয়েছে? মন খারাপ”?
মৃত্তিকা কথা বলে না। মোচড়ামুচড়ি করে হাত ছাড়াতে চায়। আফিম ফের বলে,
“- না বললে বুঝবো কি করে”?
মৃত্তিকা ত্যাড়া উত্তর দেয়,
“- আগে তো বুঝতেন। এখন বোঝেন না”?
“- আগে তুমি এত হেয়ালি করতে না মৃত্ত”।
মৃত্তিকা উত্তর দেয় না। নাকের পাটা ফুলে উঠে মেয়েটার। কান্না গিলে ফেলার চেষ্টা করে সে। কম্পিত কণ্ঠে বলে,
“- তন্বী আপুর ঘরে গিয়েছিলাম। দেখলাম আপু একটা চেইন পড়ছে গলায়। জিজ্ঞেস করলাম চেইনটা কে দিয়েছে? অমনি আপনার নাম বলল। আপনি উনাকে চেইন দিয়েছিলেন, একথা তো আমায় বলেননি”।
“- বলার মতো কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নয় মৃত্ত”।
মৃত্তিকা তেতে ওঠে,
“- আমার ভালো লাগছে না। সরুন”।
“- ও আমাদের জুনিয়র ছিল। আমাদের সাথেই থাকতো। প্রোগ্রামে কাজবাজ করে দিত। ওর জন্মদিনে আমরা সবাই গিফট দিয়েছিলাম”।
“- সবাই দিল বলে আপনাকেও দিতে হবে”?
মৃত্তিকার চোখ ছলছল করছে। মন মেজাজ একদমই ভালো নেই তার। খুব রাগ হচ্ছে। ইচ্ছে করছে আফিমকে খুব করে বকতে। কিন্তু উপায় নেই। এটা মস্ত বড় ভুল নয়। এ ভুলের জন্য লোকটাকে খুব কড়া করে বকা যায় না।
মৃত্তিকার গাল টেনে দেয় আফিম। হেসে বলে,
“- বোকা, এটা নিয়ে এত আপসেট”?
মৃত্তিকা গাল মুছে বলে,
“- আমাকে কেউ কিছু দিলে আপনার বুঝি খারাপ লাগত না”?
আফিমের হাসি থামে। ত্যক্ত সুরে বলে,
“- দিয়ে দেখুক শুধু। ফুল দিয়ে জুসস বানিয়ে ব্যাটাকে খাইয়ে আরাম ধোলাই দেবো”।
মৃত্তিকা ফের অভিযোগ ছোড়ে,
“- আপনি এত সেজে গিয়েছিলেন কেন? সবাই দেখছিল”।
আফিম আয়নার সামনে গিয়ে চুল ব্রাশ করতে করতে বলে,
“- তো? দেখবে না? দেখার জিনিস, অবশ্যই দেখবে। না দেখলে আমার খুব খারাপ লাগতো”।
কথাটা মজা করেই বলল আফিম। মৃত্তিকাকে রাগানোটাই তার উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য পূর্ণ হলো। মৃত্তিকা সত্যিই রেগে গেল। দিগবিদিক ভুলে আফিমের কাছে এসে তার শার্টের কলার টেনে ধরল। হিংস্র কণ্ঠে বলল,
“- এজন্যই এমন সেজেগুজে গিয়েছিলেন, এমনিতে তো বখাটেদের মতো থাকেন। জানতেন কচি কচি মেয়ে আসবে, তাই হিরো সেজেছিলেন”।
আফিম মুখ টিপে হেসে বলে,
“- এইতো, বুঝে গেছো”।
মৃত্তিকা রাগে খুব। গা কাঁপে রাগে। বলে,
“- আমার খুব রাগ হচ্ছে আফিম”।
আফিম পূর্ণ মনোযোগ দেয় মৃত্তিকার দিকে। বলে,
“- রাগছো কেন”?
“- আপনি আমাকে আর পছন্দ করেন না। তাইনা”?
“- আমি বলেছি”?
“- বোঝা যায়”।
আফিম প্রগাঢ় হেসে মৃত্তিকার শাড়ির আঁচল তুলে দেয় মেঝে থেকে। বেলকনির দিকে এগিয়ে গিয়ে ডাকে মৃত্তিকাকে। আকাশে মস্ত বড় চাঁদ উঠেছে। তার সৌন্দর্যে আলোকিত চারপাশ। সেই চাঁদের দিকে তাকায় দম্পতি। আফিম মৃত্তিকার দু পাশের গ্রিলে হাত রেখে বন্ধনে আটকায়। তাকে আজ বড় সুন্দর লাগছে। একদম ভদ্র-সভ্য মানুষ মনে হচ্ছে। মৃত্তিকার পানে কিছুক্ষণ চেয়ে আফিম বলে,
“- আমি চাইতাম তুমি আমার হও”।
মৃত্তিকা মাথা তোলে। চোখে চোখ রাখে আফিমের। দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“- এখন চান না”?
“- না”।
“- কেন”?
“- কারণ এখন তুমি পুরোটাই আমার। এখন চাই তুমি এভাবেই থাকো”।
মৃত্তিকা হেসে ফেলে। তার হাসিতে হৃদয়ে তোলপাড় শুরু হয় আফিমের। মেয়েটির কোমড় পেঁচিয়ে ধরে সে। এক চুল ও ফাঁক রাখে না নিজেদের মাঝে। মৃত্তিকার চুলগুলো মুখের পাশ থেকে সরিয়ে দেয় আফিম অতঃপর খুব ধীরে ঠোঁট বসায় মৃত্তিকার অধরযুগলে। পরপর মৃত্তিকার ঘাড়ে ঠোঁট ঘষে। কেঁপে ওঠে মৃত্তিকার সর্বাঙ্গ। আঁকড়ে ধরে চওড়া, প্রশস্ত পিঠ। আফিম চাপ প্রয়োগ করে ঠোঁটে। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দেয় মেয়েটির ছোট্ট গাল। শাড়ির আঁচল খসে পড়ে মৃত্তিকার। লজ্জায় নতজানু হয় সে। আফিম মৃত্তিকার থুতনিতে ছোট্ট কামড় বসিয়ে বলে,
“- নেশাআআআআআআ”?
মৃত্তিকা হেসে ফেলে আফিমের সম্বোধনে। ইতিমধ্যে ঠোঁটের চাপে তার গাল দেবে গিয়েছে। চিনচিনে ব্যথা অনুভুত হচ্ছে থুতনিতে। উত্তর দেয় না সে। চোখ বুজে নেয় আমুদে। আফিম মোহগ্রস্ত কণ্ঠে বলে,
“- মাদকতা”?
মৃত্তিকা খুব নিচু স্বরে উত্তর দেয়,
“- শুনছি”।
“- আমি আফিম মির্জা, আত্মসমর্পণ করছি আমার মৃত্তর কাছে। তুমি আমায় গ্রহণ করলে, আমি আমার এক জীবন তোমাকে দিলাম। এই এক জীবনে মৃত্ত ব্যতিত অন্য কোনো নারী থাকবে না”।
বলার পর পরই মৃত্তিকার শাড়ির কুঁচি খুলে ফেলে আফিম। লজ্জায় মৃত্তিকার গা হীম হয়ে আসে। আফিম হাসে মৃত্তিকার প্রতিক্রিয়া দেখে। মৃত্তিকার ললাটে শুষ্ক ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,
“- আমার মৃত্ত, আমার প্রেম”।
মৃত্তিকার ঝলমলে বদনে পরশ ছোঁয়ায় আফিম। ছোট বাচ্চাদের যেভাবে আদর দিতে ইচ্ছে হয়, দেখলেই চুমু খেতে ইচ্ছে হয়, ঠিক সেভাবেই চুমুতে চুমুতে গাল ভিজিয়ে দেয় মেয়েটার। কোলে তুলে নিয়ে ঘরে ফেরে। বাতি নিভিয়ে দিয়ে মৃত্তিকার বুকে মুখ গুঁজে বলে,
“- আ’ম স্যরি”।
মৃত্তিকা বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করে,
“- কেন”?
“- তোমার সাদামাটা, সাধারণ প্রেমিক হতে পারিনি তাই। কিন্তু তোমার সবচেয়ে ভরসার স্থানটি দখল করতে পেরেছি, তোমার ক্ষত বিক্ষত হৃদয় মেরামত করেছি। তোমার মনটাও ছিনিয়ে নিবো”।
রাত বারোটার দিকে আফিমের ফোনে একটি কল আসে। ফোনের কর্কশ শব্দে ঘুম আগে ভেঙে যায় মৃত্তিকার। আফিমকে জাগিয়ে দেয় সে। আফিম ঘুমুঘুমু ঘোলা চোখে ফোনটা দেখে। নম্বরটা পরিচিত ঠেকতেই কল তোলে সে। ওপাশ থেকে ক্রন্দনরত কণ্ঠে একটি মেয়ে কথা বলে ওঠে। তার কথা শেষ হতেই হু হা না করেই আফিম কল কেটে দেয়। মৃত্তিকা জিজ্ঞেস করে কলের মানুষটির কথা। আফিম উত্তর দেয় না। চুপ হয়ে যায় ছেলেটা। অনেকক্ষণ চুপ থেকে বিছানা ছেড়ে নামে সে। মধ্যরাতে আফিমকে এভাবে উঠতে দেখে মৃত্তিকা বলে,
“- কোথাও যাবেন”?
আফিম কাবার্ড থেকে কালো শার্টটা বের করে পড়ে নিতে নিতে বলে,
“- হ্যাঁ, বাইরে যাবো। আজ ফিরবো না”।
মৃত্তিকা বিছানা ছেড়ে নামে। বলে,
“- কোথায় যাবেন”?
“- মানিকগঞ্জ”।
“- ওখানে কেন”?
আফিম খুব ধীরে শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে বলে,
“- আমার মাম্মা মারা গিয়েছে মৃত্ত। তার শেষ ইচ্ছে ছিল আমি যেন তার কবরে মাটি দিই। মাম্মার শেষ ইচ্ছেটা পূরণ করতে যাচ্ছি”।
মৃত্তিকার মাথায় বাজ পড়ে। আফিমের কণ্ঠে কাঁপুনি নেই, খুব সহজ স্বরে কথাটা বলে ফেলে লোকটা। আফিমের মাম্মা, অর্থাৎ যে পালিয়ে গিয়েছিল আশরাফ মির্জা আর আফিমকে রেখে, যে কিনা আশরাফ মির্জার অর্জিত সম্পদ নিয়ে, তাকে তালাক দিয়ে অন্য কারো সাথে চলে গিয়েছিল। এত এত অপবাদের মাঝেও মহিলার মৃত্যুর খবর শুনে মৃত্তিকার চোখ টলটল করে উঠল। মা যতই খারাপ হোক, জন্মাদাত্রী তো। আফিম তার সাথে দশ বছর কাটিয়েছে, নাড়ির টান বলেও তো কিছু আছে। তার মৃত্যুটা আফিমের জন্য নিশ্চয়ই যন্ত্রণাদায়ক। মানুষটার মনে এখন কি চলছে কে জানে? আফিম চুপ হয়ে গেছে। মুখটা মাত্রাতিরিক্ত গম্ভীর। বড্ড অসহায় দেখাচ্ছে আফিমকে। মৃত্তিকার বুক কাঁপে, কণ্ঠ কাঁপে। বলে,
“- কিভাবে মারা গিয়েছে”?
আফিম ওয়ালেট পকেটে ভরে স্বাভাবিক সুরে বলে,
“- শুনেছিলাম ব্রেইন টিউমার”।
“- ফোন কে করেছিল? আপনার আম্মার সাথে যোগাযোগ আছে”?
“- উনার মেয়ে কল করেছিল।”
আফিম চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে বাইকের চাবি নিয়ে বের হতেই দেখে মৃত্তিকা মাথায় কাপড় দিয়ে বেরিয়েছে। আফিমকে তার দিকে তাকাতে দেখে মৃত্তিকা বলে ওঠে,
“- আমিও যাবো আপনার সাথে।”
আফিম বাঁধা দেয় না। মৃত্তিকা উঠে বসে বাইকে। মানিকগঞ্জ স্টেশনের পাশেই আফিমের মা ইতিশার বাড়ি। তার একটি মেয়ে আছে। মেয়েটির বয়স পনেরো, নাম লিজা। ইতিশার স্বামী ব্যাংকের ম্যানেজার। আফিম আর মৃত্তিকা পৌঁছাল যখন তখন হাসপাতাল থেকে মৃতদেহ বাড়িতে আনায় হয়েছে। বাড়ি ভর্তি মানুষ। হাহাকড ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। একটি ছোট্ট মেয়ে হাউমাউ করে কাফনে জড়ানো হীম শীতল দেহ জড়িয়ে কাঁদছে। একটি মধ্যবয়স্ক লোক ও কাঁদছে। মৃত্তিকা বুঝতে পারে ইতিশার বর্তমান স্বামী ইনি আর কান্না করা মেয়েটি উনাদের মেয়ে।
বাড়িটা ছমছমে। কান্নার আওয়াজ তীব্র। আফিম সবাইকে সরিয়ে লাশের সামনে আসে। লিজা আফিমকে দেখে ছুটে আসে। জড়িয়ে ধরে আফিমকে। কেঁদে কেঁদে বুক ভাসিয়ে বলে,
“- ভাইয়া, আম্মু নেই ভাইয়া। আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে ভাইয়া”।
মেয়েটি যেভাবে আফিমকে দেখে ছুটে এসেছে তাতে মনে হলো আফিমকে সে ভালোভাবে চেনে। তার সাথে আফিমের সম্পর্ক খুব স্বাভাবিক অথবা খুব সুন্দর। কিন্তু আফিমের অভিব্যক্তিতে তা স্পষ্ট বোঝা গেল না। সে মেয়েটিকে ধরল না, সান্ত্বনা দিল না। কোনোরূপ শোক প্রকাশ করল না। কেবল ঠাণ্ডা মাথায় লাশটিকে পরখ করে বলল,
“- কখন মারা গিয়েছে”?
মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“- এগারোটায়”।
“- কোথায় কবর দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে”?
“- বড় মসজিদের পাশে”।
আফিম আশপাশে চেয়ে বলে,
“- আমি বসছি, সময় হলে বলো। কবরস্থানের দিকে রওনা হবো”।
আফিম খুব স্বাভাবিক। মায়ের মৃত্যুতে সে শোকাহত নয়। মেয়েটির হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সে পাশের একটি চেয়ারে বসে। মহিলারা গুনগুন করে কান্না করছে। এরা হয়তো ইতিশার বর্তমান স্বামীর আত্মীয়-স্বজন। আফিম সবাইকে দেখে খুব সূক্ষ্ম নজরে। সবার আর্তনাদ, বিশেষ করে ছোট্ট মেয়েটির করুণ দশা দেখে মৃত্তিকাও নিঃশব্দে কেঁদে ফেলে। অনেকেই তাদের দিকে অদ্ভুত চোখে তাকায়। লিজা মেয়েটি আফিমের পাশে বসে বলে,
“- ভাইয়া, তুমি আম্মুকে দেখবে না”?
আফিম স্পষ্ট উত্তর দেয়,
“- যার আমাকে দেখার প্রয়োজন হয়নি, বিদায়ের ক্ষনে তাকে দেখে করুণা করতে পারছি না”।
মেয়েটি কেঁদে বলল,
“- আম্মু তোমার কথা খুব বলতো, তুমি তো জানোই”।
“- জানি বলেই এসেছি”।
আফিমকে অনুভুতিহীন মনে হচ্ছে। যেন সে একজন মূর্তি। তার কোনো শোক, তাপ নেই, প্রাণ নেই। উজ্জ্বল চোখ জোড়া খানিক ঘোলাটে। মৃত্তিকা আফিমের পাশে গিয়ে বসে। না চাইতেও সবার কান্না দেখে তারও কান্না পায়। মৃত দেহকে গোসল করানো হয়। অনেক ক্ষণ পর লাশ নিয়ে রওনা হয় পুরুষরা। খাটিয়ার এক পা ধরে উঁচু করে আফিম। তার মাথায় টুপি, শরীরে আতরের ঘ্রাণ। এই দৃশ্যটা অসহ্যকর ঠেকল মৃত্তিকার। সন্তানের কাঁধে মায়ের লাশ। আহ,কি বিভৎস! আফিমরা এগিয়ে যায়। মৃত্তিকা সবার সাথেই বাড়িতে থাকে। ভোরের দিকে আফিম সহ বাকিরা ফিরে আসে। আফিম আর মৃত্তিকাকে আলাদা একটি ঘর দেয়া হয়। লিজা কান্না করতে করতে অজ্ঞান হয়েছে দুবার। দাঁত কপাটি লেগে গিয়েছিল।
আফিম ঘর আটকে দিতেই মৃত্তিকা হামলে পরল আফিমের বুকে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরল নিষ্ঠুর মানুষটাকে। আফিম ঘরটাকে পরখ করে একটি ছবি পেল দেয়ালে। মৃত্তিকার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“- তোমাকে আসতে বারণ করেছিলাম। ঘুম হলো না, কান্না করলে। শরীর খারাপ হবে”।
মৃত্তিকা তার অবান্তর কথা এড়িয়ে গিয়ে বলে,
“- আপনার কি একটুও কষ্ট হচ্ছে না আফিম?”
“- না”।
“- আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি দেখেছি আপনার আম্মুকে। খুব সুন্দর ছিলেন, তাকে আপনার মতোই দেখতে”।
আফিম ধপ করে বসে পরল বিছানায়। মুষ্টিবদ্ধ হাত কপালে ঠেকিয়ে চোখ বুজে নিল আলগোছে। মৃত্তিকা চুপচাপ তার পাশে বসে রইল। আফিম হঠাৎই মৃত্তিকার দিকে রক্তিম চোখে তাকিয়ে বলল,
“- মাথায় হাত বুলিয়ে দাও মৃত্ত। আমার এ ঘরটাকে ভয়ঙ্কর লাগছে”।
আফিমের মুখে কথাটা শুনে চমকাল আফিম। ভয়ঙ্কর লাগছে? আফিম ভয় পায়? ভয় বলে কোনো বস্তু আছে তার ডিকশনারিতে? সহসা ছেলেটা ভয়াতুর চোখে আশপাশ দেখে গভীর কণ্ঠে বলে,
“- আমার ভয় করছে মৃত্ত, আমি মাম্মাকে দেখতে পাচ্ছি”।
মৃত্তিকা অবাক হয় আফিমের বাচ্চামিতে। বলে,
-” কি বলছেন আপনি”?
“- আমি উনার মুখ দেখিনি। তবুও এখন দেখতে পাচ্ছি। এই ভয়টায় পাচ্ছিলাম আমি। এ ভয়েই তাকে শেষ বার দেখিনি”। “
“- হ্যালুসিনেশন হচ্ছে আপনার”।
আফিম বোঝে। তার চোখে মুখে ক্লান্তি। হৃদয়ে তোলপাড়। আফিমের চোখ জোড়া রক্তিম হচ্ছে কান্না আটকে রাখার ফলে। তাকে প্রচন্ড অস্থির, উন্মাদ দেখাচ্চে। শক্ত, মজবুত দেহটা রাত পেরিয়ে যেতেই নুইয়ে যাচ্ছে। শক্ত আবরণ মিশে যাচ্ছে কোলাহলের চাপে। মৃত্তিকার কোলে মাথা রাখে আফিম। মৃত্তিকা আফিমের চুলে হাত ডুবিয়ে দেয়। আলতো স্পর্শে মাথার চুল নাড়ে। আফিম চুপচাপ শুয়ে থেকে মৃত্তিকার পেটে মুখ গুঁজে দেয়। কোনো নড়চড় করে না ছেলেটা, টু শব্দও করে না। কিছুক্ষণ পরই তলপেটে ত্তপ্ত পানির স্পর্শ পেতেই মৃত্তিকার সর্বাঙ্গ ঝলসে ওঠে। আফিম কাঁদছে? তার চোখের পানিতে ভিজে যাচ্ছে মৃত্তিকার ফ্রক। মানুষটা কাঁদতে জানে? একটু আগে না বলল কষ্ট হচ্ছে না? এখন কাঁদছে লোকটা। তার কান্নায় শব্দ নেই, কেবলই যন্ত্রণা মিশে আছে। মৃত্তিকার বুক ভার হয়ে এলো। মস্তিস্কে দুর্বল হয়ে পরল। চোখ বেয়ে নোনাজল গড়াল। সে বিড়বিড়িয়ে আফিমকে আশ্বাস দিল,
“- আমি আছি আফিম। ভয় পাবেন না। আমি পাহারা দেবো আপনাকে, আপনি ঘুমান”।
চলবে?
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি_শেখ
Share On:
TAGS: ওরা মনের গোপন চেনে না, বৃষ্টি শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২৮
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২৬
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২৩
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৭
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২২
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৪
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২৭
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৭+৮
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৪
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২৪