ওরামনেরগোপনচেনেনা
পর্ব সংখ্যা [২৮]
আবহাওয়া আজ নাতিশীতোষ্ণ। বাড়ির বাইরের রাস্তায় বেল বাজিয়ে ছুটছে রিকশা। বেলকনির ফাঁক গলিয়ে মৃদু রোদ এসে ঘরটাকে আলোকিত করছে। মৃত্তিকার ঘরে আসবাবপত্র তেমন নেই, তবে পুরো ঘর গোছানো। বিছানায় একটি ভাজ ও নেই। বেলকনির দু পাশের শিক গুলোতে ঝুলন্ত ফুলের টপ আটকে রাখা। দেখতে খুবই সুন্দর দেখায় বেলকনিটা।
মৃত্তিকার ঘুম ভাঙতেই নিজে কারো বক্ষমাঝে গভীর আলিঙ্গনে আবদ্ধ অবস্থায় আবিস্কৃত করে। ঘুমের মাঝেই ভয় জেঁকে ধরে মৃত্তিকাকে। ছটফট করে দ্রুত চোখ মেলে সম্মুখের মানুষটিকে দেখে স্বস্তি পায় সে। আফিম বিছানার হেডবোর্ডে পিঠ ঠেকিয়ে আধ শোয়া অবস্থায় রয়েছে। মৃত্তিকার পুরো শরীর বিছানায় থাকলেও মাথাটা আফিমের বুকে। আফিম তার দৃঢ় বাহুর যাতা কলে পিষে দিয়েছে তাকে। তবুও ঘুমটা এত আরামদায়ক হলো কি করে কে জানে? একটুও দুর্বল লাগছে না মৃত্তিকার। সতেজ, ফুরফুরে লাগছে দেহ। মনে হচ্ছে কিচ্ছুটি হয়নি রাতে, কোনো অসুস্থতা নেই তার মাঝে।
মৃত্তিকা তার পরনের কাপড় দেখে কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। গরম এলেই রাতে কারেন্ট থাকে না। চার্জার ফ্যান এ বাড়িতে একটাই। সেটা আবার ইরফানের জন্য বরাদ্দ। গরম কাপড় পড়ে রাতে ঘুম হয় না ঠিকঠাক। তাই নিউ মার্কেট থেকে আব্বু এ কটনের শার্ট আর প্লাজু এনে দিয়েছিলেন। মৃত্তিকা শার্টটা পড়ে কখনো বেলকনিতেও যায়নি। এ পোশাকে বাড়ির লোক ছাড়া আর কেউ দেখেনি তাকে। আফিম এভাবে তাকে দেখে ফেললে মৃত্তিকার লজ্জা লাগবে, অস্বস্তি হবে। তাই সে আফিমের হাত সরিয়ে উঠে যাওয়ার জন্য বল প্রয়োগ করে। আফিমের ঘুম পাতলা। মৃত্তিকার একটু নড়াচড়ােই সজাগ হয় সে। ঘুমু ঘুমু চোখে মৃত্তিকাকে দেখেই তার ললাটে হাত ছোঁয়ায় আফিম। সেই হাতই উল্টে যায় মৃত্তিকার গলায়, গালে। অতঃপর মানুষটা বেশ শান্তি অনুভব করে। সতেজ সুরে বলে,
“- হালকা আছে, ক্যাপসুল খেলে ওটুকুও থাকবে না”।
আফিম উঠে পড়ে। টেবিলের ড্রয়ার থেকে বের করে থার্মোমিটার। একটু নেড়ে থার্মোমিটার এগিয়ে দেয় মৃত্তিকার দিকে। বলে,
“- মেপে দেখো।
আফিমের চোখ লাল হয়ে আছে। চোখে রাজ্যের ঘু। মুখ ফ্যাকাসে, তন্দ্রাচ্ছন্ন। পরনের সাদা শার্টটা কুঁচকে গেছে। তা টেনেটুনে সোজা করার প্রয়াস চালায় ছেলেটা। হাই তোলে দুবার। চুলগুলোকে ঠেলে দেয় পিছনে। বলে,
“- তুমি মেপে দেখো, আমি মুখে পানি ছিটিয়ে আসছি। বিছানা ছেড়ে নামবে না কিন্তু”।
আফিমের শেষের কথাটুকুতে প্রবল অধিকার বোধ ফুটে ওঠে। খানিক ঝাঁঝ মিশিয়ে শেষের বাক্যটি সম্পূর্ণ করে আফিম। মৃত্তিকা যদি সারারাত এভাবেই কাত হয়ে মানুষটার বুকে শুয়ে থাকে, তাহলে তো আফিমের ঘুম হয়নি। রাতটা সে এভাবে বসেই কাটিয়েছে? মৃত্তিকার চিন্তা হয়। আফিম মিনিট পাঁচেক বাদে চোখে মুখে পানি দিয়ে আসে। ভেজা মুখ মুছে নেয় মৃত্তিকার গামছায়। জিজ্ঞেস করে,
“- কত”?
“- ৯৭° সেলসিয়াস”।
আফিম গামছা বেলকনির দড়িতে টানিয়ে এসে বসে মৃত্তিকার পাশে। মৃত্তিকার ডান হাত টেনে নিয়ে বলে,
“- জ্বলছে এখনো”?
-” হু অল্প”।
আফিম তাগাদা দিয়ে বলে,
“- খেয়ে আসো, একসাথে বের হবো। ফেরার পথে ডক্টরের চেম্বারে যেতে হবে। ভালো ওয়েনমেন্ট না লাগালে জ্বালা কমবে না”।
মৃত্তিকা মুখ তুলে দেখে লোকটাকে। আফিম সাদামাটা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পোশাকে আভিজাত্য নেই, বাহ্যিক চাকচিক্য নেই। অথচ লোকটাকে দেখলে হৃদয়ে অদ্ভুত আনন্দের আভাস পাওয়া যায়। সঙ্কোচহীন ভাবে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। মানুষটার মাঝে আলাদা এক টান অনুভব করে মৃত্তিকা। বিপদ হলে মনে হয় কিছুই হবে না, আফিম আছে তো সাথে। ব্যথা পেলেও মনে হয় আফিমকে দেখলে ব্যথারা সব পালাবে। বলবে “আফিমের বউকে কষ্ট দেয়া যাবে না”। এতটা বিশ্বাস, ভরসা আর কেউ দখল করেছে মৃত্তিকার?
“- আপনি ঘুমিয়ে নিন কিছুক্ষণ।”
“- বাড়ি গিয়ে ঘুমাবো।”
মৃত্তিকা থার্মোমিটার রেখে ওয়াশরুমে ছোটে। সুতির লম্বা ফ্রক পড়ে ওড়না মাথায় চেপে বেরিয়ে আসে। আফিম তাড়া দিয়ে বলে,
“- খেয়ে জলদি আসবে, বের হবো তাড়াতাড়ি। ডক্টর বসবে নয়টায়”।
মৃত্তিকা আফিমের পানে তাকিয়ে বলে,
“- আমি আপনার সাথে যাবো না”।
মিনমিনে স্বরে কথাটা বলে মৃত্তিকা। আফিম যে রাগী, এখনই না চট করে গালটা চেপে ধরে তার। মনে মনে সে বুঝে ফেলে আফিম কি বলবে।
“- তাহলে রাতে ডেকে পাঠালে কেন? সারারাত বুকটাকে বালিশ মনে করে ঘুমোলে কেন? এখন বলছো যাবে না”?
আফিম আসলেই রেগে গিয়েছে। মৃত্তিকা জানতো লোকটা তাকে খোঁচা দেবে। ঘোরে থাকলে বুঝি মৃত্তিকা ওই দুঃসাহসিক কাজটা করতো? মোটেই না। বরং রাগ, জেদ, ইগো টাই তখন প্রাধান্য পেতো। মনের কোণে জমা ঠুনকো আবেগ পিষে যেত এসবের নিচে। কোনোভাবেই আফিমকে কাছে পাওয়ার জন্য মরিয়া হতো না সে।
“- আমি সবাইকে বলেছি আর যাবো না আপনার সাথে। আপনি যতদিন না নিজেকে শোধরাচ্ছেন, ততদিন আমি এখানেই থাকবো”।
আফিম রেগে বলে ওঠে,
“- সারা রাত ঘুমোইনি মৃত্তিকা, মন মেজাজ ভালো নেই। রাগ দেখালেই তো কেঁদেকেটে বন্যা বানিয়ে ফেলবে। তখন আমার জল্লাদ শ্বশুর এসে আমার গলাটা চেপে ধরবে। বিচ্ছিরি একটা ব্যাপার হবে। তাই বলছি ত্যাড়ামি করো না”।
মৃত্তিকার মুখটা নত। চোখ তোলার সাহস তার নেই। সে যেতে পারবে না। বড় মুখ করে ওইদিন বলেছিল আফিম ভালো না হলে সে ফিরবে না। আব্বুও বলেছিল আফিম নিজেকে পরিবর্তন না করলে সে ও মৃত্তিকাকে ফেরত পাঠাবে না। এখন যদি লাজ লজ্জা ভুলে বেশরমের মতো আফিমের পিছু পিছু চলে যায় তাহলে আব্বু খুব রেগে যাবে। তার কথা না শোনার কারণে পরবর্তীতে মৃত্তিকার মুখটাও না দেখার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এমতাবস্থায় মৃত্তিকা চাইলেও ফিরতে পারবে না। আফিমকেও আর শোধরানো যাবে না। সে মিনমিনে স্বরে বলে,
“- আপনি যেহেতু ভালো হবেন না, সেহেতু আমারও ফেরা হবে না”।
আফিম আর কথা বাড়ায় না। হার মেনে নিয়ে বলে,
“- ঠিক আছে, আমি চলে যাচ্ছি”।
আফিম পা বাড়িয়ে বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। মৃত্তিকা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল স্থিরভাবে। খানিকক্ষণ বাদে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে দরজার দিকে তাকাল। মেইন ডোর খোলা, মানে আফিম সত্যিই বেরিয়ে গেছে। মৃত্তিকার মনটা বিষিয়ে গেল তখনই। চোখ জোড়া ছলছল করে উঠল। নীরবে দু ফোঁটা পানিও ঝরল চোখ বেয়ে। আফিম চলে গেল? তার ফেরার রাস্তা তবে একেবারেই বন্ধ? মৃত্তিকার মন মানে না। খাটের পাশে বসে জড়সড় ভঙ্গিতে। জ্বরটা আবার বাড়বে বোধহয়। বুক পিঠ জ্বলতে আরম্ভ করেছে। মৃত্তিকা চুপচাপ বসে রয় সেভাবেই। বেশ কিছুক্ষণ পর মনোয়ারা ডেকে ওঠে মৃত্তিকাকে। চোখ মুখ স্বাভাবিক করে মৃত্তিকা বেরিয়ে এলে মনোয়ারা তার হাতে খাবারের প্লেট ধরিয়ে দেয়। মুরগির মাংস কষা আর খিচুড়ি রান্না হয়েছে। ট্রে তে খাবার আর পানি দিয়ে বলে,
“- যা দিয়ে আয় আফিমকে”।
মৃত্তিকা তাচ্ছিল্যের সুরে হাসে। বিষাদ মাখা কণ্ঠে বলে,
“- উনি তো চলে গেছে”।
মনোয়ারা বলে,
“- কি বলিস? আফিম তোর আব্বুর ঘরে বসে আছে। খাবারটা দিয়ে আয়”।
মৃত্তিকা চমকায়। পা বাড়িয়ে তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে যায় আব্বুর ঘরের দিকে। দরজা মেলতেই দেখে আফিম বসে আছো আতিকুর রহমানের সাথে। দুজনের কারোই অভিব্যক্তিতে রাগ, ক্ষোভ নেই। মৃত্তিকাকে দেখে আতিকুর রহমান বলেন,
“- এখানে আনলে কেন? টেবিলে দাও। যাও, খেয়ে নাও। তারপর রওনা দিও”।
আফিম আলতো হেসে বলে,
“- ঠিক আছে বাবা”।
আফিমের মুখে বাবা ডাকটি শুনে প্রশান্তিতে গাল ভরে হাসলেন মৃত্তিকার বাবা। মৃত্তিকা ফ্যালফ্যাল করে দেখল ওদের। মৃত্তিকার উদ্দেশ্যে আতিকুর রহমান বললেন,
“- দেরি করো না, আফিমের সাথে চলে যাও। আরেকদিন এসো দুজন একসাথে”।
মৃত্তিকা প্রচণ্ড অবাক হয়। তার আব্বু এত সহজে আফিমকে মেনে নিল? আফিম এমন কি বলেছে তাকে যে বিনা দ্বিধায় লোকটার সাথে যেতে বলছে মৃত্তিকাকে? রাগ, ক্ষোভ কোনোটাই নেই তার মাঝে। বরং আফিমের সাথে খুব ভালো ভাবে মিশছেন তিনি। মৃত্তিকা তব্দা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আফিম তার হাত থেকে ট্রে টা নিয়ে টেবিলে চলে যায়। পিছু পিছু যায় মৃত্তিকা। আফিম খেতে শুরু করে। আফিমের পাশের চেয়ার টেনে বসে মৃত্তিকা। নিচু স্বরে ফিসফিসিয়ে বলে,
“- আব্বুকে কি বলেছেন আপনি? কালকেও বলছিল আমি যেন নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকি, আর আজ আপনার সাথে চলে যাওয়ার জন্য জোর করছে। কেন বলুন তো”?
আফিম মিটিমিটি হেসে বলে,
“- তোমার আব্বুকে জিজ্ঞেস করো। এখন খাও”।
মৃত্তিকার মুখে খাবার তুলে দেয় আফিম। ভীষণ লজ্জিত হয় মৃত্তিকা। বাঁধা দিলে আফিম শোনে না তার বারণ। অদক্ষ হাতে সবটুকু খাবার খাইয়ে দেয় মৃত্তিকাকে। খাওয়া শেষ হতেই দুজম রওনা দেয়। পথে ফিমেল ডক্টর দেখিয়ে মৃত্তিকার পোড়া হাতের জন্য ঔষধ কেনে। মৃত্তিকা কথা বলার ভাষা খুঁজে পায় না। কিছুটা আনন্দ হচ্ছে ভেতরে ভেতরে, সামনে সেই আনন্দটুকু দেখাতে পারছে না। আফিম কি জানে তার সাথে থাকতে মৃত্তিকার ভালো লাগে? আস্ত মানুষটাই মৃত্তিকার কাছে স্বস্তির।
টিউশনে আজ আফিমই পৌঁছে দিয়েছিল মৃত্তিকাকে। চাচাকে আজ আফিম আসতে বারণ করে দিয়েছে। আরো অবাক করা বিষয়টি হলো আফিম কেবল মৃত্তিকাকে পৌঁছে দিয়ে ক্ষান্ত হয়নি। মৃত্তিকা দেড় ঘন্টা স্টুডেন্টকে পড়িয়েছে। এই দেড় ঘন্টা আফিম স্টুডেন্টের বাড়ির বাইরে বাইকে বসেছিল। মৃত্তিকাকে নিয়েই লোকটা বাড়ি ফিরবে। এর কারণ জানতে চাইলে আফিম বলেনি কিছু। বলার প্রয়োজন বোধ করেনি।
“- আপনি কেন বসে ছিলেন এতটা সময়? আমি বুঝি একা চলাফেরা করতে পারি না”?
আফিম স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে,
“- আগে তুমি সুস্থ ছিলে, আজ অসুস্থ। তোমাকে ফেলে কোথাও যেতে পারছি না মৃত্ত”।
মৃত্তিকা আলগোছে হাসে। বলে,
“- আমি তেমন অসুস্থ নই, আপনি অযথাই ভাবছেন”।
আফিম বাইকের মিররে মৃত্তিকার চোখের দিকে চেয়ে উপহাস করে বলে ওঠে,
“- তুমি অসুস্থ ছিলে মৃত্তিকা। অসুস্থ না থাকলে আমাকে ডাকতে না। সুস্থ, স্বাভাবিক মৃত্তিকা আফিমের সঙ্গ চায় না, আফিমের উপস্থিতি সুস্থ মৃত্তিকাকে স্বস্তি দেয় না। তুমি অসুস্থই ছিলে, অসুস্থ ছিলে বলেই আমার বুকে স্বেচ্ছায় মাথা রেখেছিলে।”,
মৃদু কেঁপে উঠল মৃত্তিকার সর্বাঙ্গ। আফিমের কণ্ঠটা এত ভাঙা মনে হলো কেন? কথাটায় কি মৃত্তিকার প্রতি অভিযোগ ছিল? রাগ, অভিমান ছিল? মৃত্তিকা সচরাচর আফিমের সাথে ভালো ব্যবহার করে না, আফিমকে ভালোবাসেনি সে, আফিমের সাথে ভালো মুহুর্ত কাটায়নি। আফিম কি এ কারণে খুব কষ্ট পায়? মন খারাপ হয় তার? একরাশ অভিযোগ মনে জমিয়ে রেখেছে লোকটা? মৃত্তিকাকে খোঁচা মেরে কথাটা বলল আফিম?
মৃত্তিকা আজ একটি শপথ নিয়ে বসে। আফিমকে সে ভালোবাসবে, খুব ভালোবাসবে। এতটাই ভালোবাসবে যে আফিম বিরক্ত হবে তার ভালোবাসায়, ত্যক্ত হয়ে উঠবে। আফিমকে খুব জ্বালাবে সে। ভালোবেসে নিজের সব ভালোটুকু দেবে আফিমের মাঝে। আফিম হয়তো তার ভালোবাসায় আটকাবে। ভুলে যাবে সব অন্যায়। নতুন ভাবে মৃত্তিকার সাথে বাঁচবে।
মৃত্তিকাকে পৌঁছে দিয়ে আফিম গিয়েছে কোথাও। আশরাফ মির্জা ব্যবসার কাজে জামশেদপুর গিয়েছে। মৃত্তিকা ওইদিনের লাল শাড়িটা গায়ে জড়িয়েছে। আফিম এলেই তাকে চমকে দেবে? কি করবে ভাবতে বসে মৃত্তিকা। প্রথমেই চুমু খাবে? নাকি জড়িয়ে ধরবে? আফিম খুব চমকে যাবে তাইনা? খুশিতে তার সবুজাভ চোখ জোড়া আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠবে?
বাড়ির ফোনটা বেজে ওঠে। মৃত্তিকা ভাবে আফিম কল করেছে। কিন্তু ফোন তোলার পরই বুঝতে পারে আফিম নয়, কল করেছে ইয়াসিন। মৃত্তিকার আগের মতো রাগ নেই ইয়াসিনের উপর। বেচারা অসুস্থ, বাঁচার নিশ্চয়তা খুব কম। রাগ, ক্ষোভ রেখে লাভ নেই। সৃষ্টিকর্তা হয়তো মৃত্তিকার ভালো ভেবেই এমন জীবন দান করেছেন। কলটা তোলা মাত্র ইয়াসিন বলে ওঠে,
“- মৃত্তিকা”?
“- জি, বলুন”?
“- আমরা ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছি। একটু পরেই ফ্লাইট”।
“- ও আচ্ছা, শুভ কামনা”।
“- আমার বাবা-মা তোমার সাথে দেখা করতে চাইছে, আর হয়তো দেখা হবে না। আমরা বেরিয়ে পড়েছি। তুমি আসবে”?
মৃত্তিকা ভড়কে যায়। বলে,
“- আমি গিয়ে কি করবো”?,
“- সবাই তোমাকে দেখতে চাইছে। এবারই শেষ, আর আসতে বলবো না। তানহা তোমার কাছে পড়াশোনা করেছে, সে পরিচয়ে হলেও এসে দেখা করে যাও। আমরা তোমাদের বাড়ির কাছেই আছি। আসবে একটু? সবার ভালো লাগবে”।
মৃত্তিকা দোনামনা করে রাজি হয়ে যায়। ওরা চলে যাচ্ছে, দেখা করাই যায় একবার। সে শাড়ির আঁচল ঠিকঠাক করে দারোয়ান চাচাকে বলে বাড়ির গাড়ি চড়ে নির্দিষ্ট ঠিকানায় যায়। ওদিকে আফিম বাড়ি ফেরে রাতে। দারোয়ানের থেকে জানতে পারে মৃত্তিকা ইয়াসিন নামের একটি ছেলের সাথে দেখা করতে গিয়েছে। ছেলেটার ক্যান্সার, আজ ইন্ডিয়া চলে যাবে। তার পরিবারের সাথে দেখা করার জন্য মৃত্তিকা বেরিয়েছে।
জানার পর আফিম কিছুই বলে না। ঘরে গিয়ে শার্টটা টেনে খুলে ফেলে সে। মোবাইল, ওয়ালেট ফেলে দেয়। একের পর এক সিগারেট ফুঁকে যায় আফিম। সিগারেটের দুর্গন্ধে ঘরটা ভরে ওঠে। ধোঁয়া, দুর্গন্ধ সব কিছুকে অগ্রাহ্য করে আফিম বসে থাকে মেঝেতে। চোখ জোড়া জ্বলে ওঠে তার, আঙুলের ফাঁকে ছ্যাকা লাগে আগুনের।
মৃত্তিকা নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দেখে রাস্তার পাশে ইয়াসিন দাঁড়িয়ে আছে। তার পরিবারের কেউ নেই সাথে। মৃত্তিকার মনটা খচখচ করে ওঠে। ধীর পায়ে এগিয়ে যায় সে। তাকে দেখে ইয়াসিন এমন ভাবে তাকায় যেন তার হৃদয় অস্থির হয়ে উঠেছিল মৃত্তিকাকে দেখার জন্য। নতুন রুপে মৃত্তিকাকে সে মুগ্ধ হয়ে দেখে। তার চাহনিতে বিব্রত হয় মৃত্তিকা। বলে,
“- আপনার পরিবারের বাকিরা কোথায়”?
ইয়াসিন মৃত্তিকার দিকে এগিয়ে আসে। আচমকা সে মৃত্তিকার দু হাত নিজের মুঠোয় পুড়ে নেয়। ঘটনার আকস্মিকতায় তাজ্জব বনে যায় মৃত্তিকা। ইয়াসিন গড়গড় করে বলে,
“- আমি তোমাকে মিথ্যা বলেছি মৃত্তি। আমি অসুস্থ নই, সম্পুর্ণ সুস্থ। আমি রুবিকে ডিভোর্স দিয়েছি মৃত্তি। ও একটা মা*গী। ক্যারিয়ারের লোভে দু মাসের বাচ্চাকে নষ্ট করেছে ও। মা হয়ে কিভাবে পারল এমনটা করতে? ওর লোভ, লালসা আমার পরিবারের সবাইকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। আমি ওকে ডিভোর্স দিয়েছি সব টাকা পরিশোধ করে। ও আর ফিরবে না। চলো মৃত্তি, আমরা আবার সব শুরু করি। আমি আর ভুল করবো না। তুমি যেমন চাইবে তেমনই হবে মৃত্তি। প্লিজ ফিরে এসো। তুমি বললে আমরা দেশ ছেড়ে চলে যাবো, সব পিছুটান ভুলে নতুন করে বাঁচবো”।
মৃত্তিকার গা ঘিনঘিন করে ওঠে। হতভম্ব হয়ে যায় সে। ইয়াসিন ওদিন যা বলেছিল সব মিথ্যে? মৃত্তিকার সহানুভূতি পেতে এত বড় মিথ্যে বলেছিল সে? রুবির সাথে ইয়াসিনের কোনো সম্পর্ক নেই, এখন ইয়াসিন মৃত্তিকাকে চাইছে। এসব কি করে সম্ভব?
ইয়াসিন পুনরায় বলে ওঠে,
“- আমি ভালো হয়ে যাবো মৃত্তি, কখনো কথার খেলাপ করবো না। তোমাকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবো। সব ভুলে গিয়ে নতুন করে সব শুরু করবো। আমাকে ক্ষমা করো মৃত্তিকা। তুমি যদি আজ আমায় ফিরিয়ে দাও আমি সুইসাইড করবো”।
ইয়াসিন পা ধরেছে মৃত্তিকার। জোকের মতো চেপে ধরেছে তার পা যুগল। মৃত্তিকার ঘেন্না লাগছে। রাগে কাঁপছে দেহ। এসব কথা কি করে বলে লোকটা?,এত অন্যায় করেও সাধ মেটেনি? সবকিছুর সাথে মৃত্তিকা যখন নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে, তখন এসেছে ভালোবাসা ভিক্ষা চাইতে? প্রবল ক্রোধ গিলে মৃত্তিকা বলে,
“- আমার পা ছাড়ুন”।
ইয়াসিনও ত্যাড়ামি করে বলে,
“- আগে তুমি রাজি হও। আমি জানি তুমি আমায় আগের মতোই ভালোবাসো। না করো না প্লিজ”।
মৃত্তিকা ফের বলে,
“- পা ছাড়ুন আমার”।
“- ছাড়বো না”।
মৃত্তিকা টেনে তোলে ইয়াসিনকে। তৎক্ষনাৎ কষে একটি চড় বসায় ইয়াসিনের গালে। রাগে লাল হয়ে ওঠে তার নাক, চোখ। ত্যক্ত চোখে চেয়ে বলে,
“- আপনার কি মনে হয় আমি এতটাই সস্তা? যখন মন চাইবে কাছে চাইবেন যখন মন চাইবে ছুঁড়ে ফেলে দেবেন? আর কী বললেন আমি ভালো নেই, আমি আপনাকে ভালোবাসি? আপনার ভাবনা ভুল। আমি আফিমের সাথে ভালো আছি। আমি উনাকে ভালোবাসি। আমরা একে অপরকে ভীষণ ভালোবাসি। আপনার প্রতি আমার কেবল ঘৃণাই আছে, বিন্দুমাত্র ভালোবাসা নেই আপনার প্রতি। আপনি আসলে একজন কাপুরুষ। নিত্য নতুন সঙ্গী না হলে আপনার হয় না। রুবি আর আপনি একই। অন্যকে ঠকাতে গিয়ে আপনারা দুজনই ঠকে গেছেন। সৃষ্টিকর্তা আপনাদের কর্মফল পৃথিবীতেই দিয়েছেন। এবার শাস্তি ভোগ করুন। ফারদার আমাকে কল করবেন না, আমাকে বিরক্ত করবেন না। নইলে আপনার নামে মামলা করতে বাধ্য হবো। আমার স্বামীকে নিশ্চয়ই ভালো করে চেনেন? আফিম মির্জার বউ আমি, আমার দিকে চোখ তুলে তাকালে সেই চোখ আমি তুলে নেবার ক্ষমতা রাখি”।
মৃত্তিকা দ্রুত বেগে গাড়িতে উঠে বসে। খুব কান্না পায় ওর। জীবনটা এমন কেন? যাকে ভালোবেসেছে তাকে পায়নি। এখন যখন অন্য কারো সাথে জীবনটা মানিয়ে নিতে চাচ্ছে তখনই পুরোনো মানুষটা ফিরে এসে পুরোনো ঘা তাজা করছে, খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করছে। ইয়াসিনকে কতই না ভালোবাসতো সে, ঘর করার স্বপ্ন দেখতো। সব বিষিয়ে দিয়ে এখন নিজে ঠকে গিয়ে মৃত্তিকাকে ব্যবহার করতে চাইছে। কতটা জানোয়ার হলে একজন পুরুষ একাধিক নারীর সাথে অন্যায় করে? রুবি একজন স্বার্থপর চরিত্র। তার সাথে মৃত্তিকার যোগাযোগ নেই, ইয়াসিনের সাথে যেটুকু যোগাযোগ ছিল তা আজ শেষ। কারো কাছে কোনো দাবি নেই মৃত্তিকার।
বাড়িতে হন্তদন্ত হয়ে ফেরে মৃত্তিকা। কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা চলে যায় ঘরে। ঘরের দরজা আটকে দিতেই দেখে আফিম বসে আছে বিছানায় কাছে। সিগারেটের দুর্গন্ধে টেকা দায়। ধোঁয়ায় নাক মুখ কুঁচকে ফেলে মৃত্তিকা। অবাক হয়ে দেখে আফিমকে। ঝড়ের বেগে আফিমের কাছে আসে মৃত্তিকা। আফিমের দিকে চেয়ে বলে,
“- আফিম, আপনি এত সিগারেট খাচ্ছেন কেন?”
আফিম গাঢ় হেসে বলে,
“- কষ্ট হচ্ছে আমার”।
“- কোথায়”?
“- বুকে”।
মৃত্তিকা চটজলদি আফিমের বুকে হাত রাখে। বলে,
“- বেশি কষ্ট হচ্ছে”?
আফিম সিগারেট ফেলে বলে,
“- খুব বেশি মৃত্ত, অসহনীয়”।
“- আপনি জানেন আমি কোথায় গিয়েছিলাম”?
“ জানি”।
“- আমি আপনার সাথে থাকতে চাই আফিম”।
আফিম শোনেনি বোধহয়। বলে,
“- কি বললে”?
মৃত্তিকা কেঁদে ফেলে ঝরঝর করে। ইয়াসিনের সাথে আগেরবার দেখা করার কারণ, আজ দেখা করার কারণ আর ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো সংক্ষিপ্ত আকারে বলে আফিমকে। আফিম শোনে সবটা। মৃত্তিকা একটু থেমে বলে,
“- আমি, আমি আপনার সাথে থাকবো আফিম। আপনি আমাকে আশ্রয় দেবেন না? যেভাবে ভালোবাসতেন, সেভাবে ভালোবাসবেন আবার?”
আফিম মৃত্তিকার দিকে অবিশ্বাস্য চোখে তাকায়। বিশ্বাস হয় না মৃত্তিকার অকপট স্বীকারোক্তি। মৃত্তিকা আফিমের বুকে মাথা রেখে কেঁদে বলে ওঠে,
“- আমার মনে হয় আমি আপনাকে ছাড়া বাঁচবো না। দেখুন, আপনাকে ছেড়ে চলে গেলাম আর জ্বরে বিছানায় পড়লাম। আপনার চিন্তায় আমার দু চোখে কালি পড়েছে, দেখুন, হাতটাও পুড়িয়ে ফেলেছি উদাসীনতায়। আপনাকে ছাড়া আমার কিছুই ভালো লাগে না আফিম। সবকিছু বিরক্ত লাগে। আফিম, শুনুন না, আমার মনে হয় আমি আপনাকে ছাড়া আর কাউকে আমার জীবনে ঠাই দিতে পারবো না। আফিম, আফিম আমি…আমি আপনাকে কখনো দুরে সরাবো না”।
আফিম মৃত্তিকার ভেজা নেত্রপল্লবে আঙুল ছোঁয়াতেই টপ টপ করে অশ্রুকণা গড়ায় গাল বেয়ে। মৃত্তিকা চোখ বুজে বলে,
“- ইয়াসিনকে আমি প্রত্যাখ্যান করেছি, শুধু আপনার জন্য। আপনার জন্য আমি আমার অতীত ভুলতে সক্ষম হয়েছি। আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না। আপনার ভালোবাসা না পেলে আমি মরে যাবো”।
আফিম মৃত্তিকার মুখ দু হাতের আজলায় তুলে নেয়। মেয়েটির ভেজা গাল মুছে দেয় সযত্নে। নরম কণ্ঠে বলে,
“- হয়েছে, আর কাঁদে না, মাথা ধরবে এবার”।
“- আমি আপনাকে জড়িয়ে ধরি আফিম”?
আফিম মৃত্তিকার হাতের তালুতে গভীর চুম্বন একে দেয়। মৃত্তিকা সুযোগ বুঝে আফিমকে জড়িয়ে ধরে। এমন ভাবে জড়িয়ে ধরে যেন আফিম হারিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটার বাচ্চামিতে হাসে আফিম। বলে,
“- হাতে ব্যথা পাবে, আস্তে ধরো”।
মৃত্তিকা হেসে ফেলে। আফিমের মুখ পানে চেয়ে বলে,
“- আপনাকে বুকের মাঝে লুকিয়ে ফেলি আফিম? কেউ না দেখুক, আপনি শুধু আমার থাকুন।”
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি_শেখ
নোটঃ রি চেইক দিইনি। অনেক ভুল আছে, পরে এডিট করবো। আমার গ্রুপে এড হয়ে যান, গল্পের আপডেট ওখানে থাকবে।
Share On:
TAGS: ওরা মনের গোপন চেনে না, বৃষ্টি শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৫
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১২
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৭+৮
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৩
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২৫
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২৩
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৬
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৮
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৭
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১১