Golpo romantic golpo ওরা মনের গোপন চেনে না

ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২৭


ওরামনেরগোপনচেনেনা

পর্ব সংখ্যা [২৭]
বিকেলে ছাদের দোলনায় দুলছে মৃত্তিকা। মন ভালো নেই ওর। শরীরটা দুর্বল লাগছে। বাতাসও গুমোট, শান্তি নেই কোথাও। আলস্য ভঙ্গিতে দোলনা থেকে উঠে দাঁড়ায় মৃত্তিকা। দুদিন ধরে আফিমের সাথে যোগাযোগ নেই মৃত্তিকার। লোকটা আর আসেনি তাকে নিতে, জোরজবরদস্তিও করেনি। টিউশন পড়াতে বনানীর ওদিকে যেতে হবে। আজ বের না হলেই নয়। তিক্ত, বিদঘুটে লাগছে সবকিছু। ক্ষুধা লাগে না, আলস্য কাজ করে, বিষাদ ঠেকে সব। মৃত্তিকা ঘরে ফিরে একটা নীল রঙের কুর্তি পড়ে। কাঁধে টোট ব্যাগ চেপে বের হয় রাস্তায়। বাড়ি থেকে বের হলেই রাস্তা। একটু হেঁটে গেলে স্ট্যান্ড। মৃত্তিকা হেঁটেই যাবে অটো স্ট্যান্ড অব্দি। সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যেতেই একটি অটো এসে থামে তার সামনে। অটোর মালিক বৃদ্ধি। আধাপাকা দাঁড়ি বুক ছুঁয়েছে প্রায়। মৃত্তিকাকে দেখেই বলে ওঠে,

“- আপনের নাম মিত্তিকা”?

নাম শুনে চমকায় মৃত্তিকা। বৃদ্ধ লোকটি তার সঠিক নাম উচ্চারণ করতে পারে না। আশপাশে নজর বুলিয়ে সন্দিহান চোখে চেয়ে মৃত্তিকা বলে,

“- জি, আপনি কি করে জানেন”?

বৃদ্ধ হেসে বলেন,
“- ওঠেন ওঠেন। আপনারে পৌঁছাই দেই”।

মৃত্তিকা অবাক হয়। লোকটাকে তার ঠিক মনে হয় না। ভ্রু কুঁচকে বলে,

“- আমি হেঁটে যাবো, আপনি যেতে পারেন”।

লোকটি ফের হেসে বলে,
“- ভয় পাইও না মা। আমি তোমার বাপের লাহান। আফিম বাবা আমারে পাঠাইছে। কইছে রোজ তোমারে পৌঁছাই দিতে, আবার নিয়া আসতে”।

আফিম নামটি শুনে কয়েক লহমায় মৃত্তিকার কাঁপন ধরে। থমকে যায় সে। ভার হয়ে আসে বুক। যাবার কালে আফিম সুর, বেদনা মিশিয়ে যে গানটা গেয়েছিল, তা এখনো মৃত্তিকার কানে বাজছে। মৃত্তিকার চেতনা ফেরে বৃদ্ধর দুশ্চিন্তায়। সে বলে,

“- বিশ্বাস হয় না আমারে? আফিম বাবার লগে কথা কইবা? দাঁড়াও আমি ফোন দেই”।

মৃত্তিকা ফোঁস করে শ্বাস ফেলে রিকশায় উঠে পড়ে। লোকটি আর আফিমকে ফোন না করে মৃত্তিকাকে উঠিয়ে নিয়ে যায় গন্তব্যে। মৃত্তিকার মুখে হাসি ফোটে। আফিমের চমৎকার মুখ ভেসে ওঠে মানসপটে। তার তীক্ষ্ণ সবুজাভ চোখের চাহনি, বাঁকানো হাসি, দুলে ওঠা লম্বাটে শরীর সবই চোখ বুজলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নেশাতুর, মাদকতা মেশানো চোখে যখন মৃত্তিকার দিকে চায়, আকুল আবেদন জানায় ভালোবাসার, মৃত্তিকার হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি বাড়ে। হাত-পা শিরশির করে।


সন্ধ্যায় টিউশন থেকে বের হবার পরই সেই বৃদ্ধর সাথে দেখা হয় মৃত্তিকার। লোকটি অটো থেকে নেমে দাঁড়িয়ে আছে। মৃত্তিকাকে দেখেই পান খাওয়া লাল টকটকে দাঁত বের করে হাসে লোকটা। মৃত্তিকার দিকে চেয়ে বলে,

“- একদম ঠিক টাইমে আইছি”।

মৃত্তিকা উঠে বসে অটোতে। অটো চলে ধীর গতিতে। ল্যাম্পপোস্টের আলোতে রাস্তাগুলো সুন্দর দেখাচ্ছে৷ মুগ্ধ দৃষ্টিতে মৃত্তিকা দেখে সেসব।

আফিম বাইকে উঠেছে৷ এলাকার টং দোকানে আড্ডা দিয়েছে অনেকক্ষণ। এখন বাড়ি ফিরবে। খিদে পেয়েছে খুব। তন্মধ্যে হেলমেট মাথায় বাঁধতেই একটি মেয়ে এসে দাঁড়ায় তার সামনে। মেয়েটির গায়ে জলপাই রঙের লং ফ্রক। মাথায় খোপা বাঁধা। মেয়েটি এসে আফিমের মুখোমুখি দাঁড়ায়। কয়েক সেকেন্ড বুকে দু হাত গুঁজে আফিমকে পর্যবেক্ষণ করে মেয়েটা বলে ওঠে,

“- আপনি আফিম মির্জা না”?

আফিম চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। তার চাহনি পরখ করেই মেয়েটি বলে ওঠে,

“- এবার আমি কনফার্ম আপনিই আফিম মির্জা। কনফেশন পেজগুলোতে আপনার নামে রোজ কতশত কনফেকশন আসে আপনি জানেন”?

আফিম মেয়েটার উত্তেজিত কণ্ঠ শুনে হাসে না মোটেই। সে বখাটে বলে পথে ঘাটে কেউ তাকে উত্ত্যক্ত করতে পারে না, প্রেমের প্রস্তাব দিতে পারে না। সকলে ভয় পায় এই ভেবে যে, তারা সামনে গিয়ে দাড়ালেই আফিম মির্জা রেগে যাবে। গালে দু একটা চড় ও বসিয়ে দিতে পারে রাগের মাথায়। অপমান আর তুইতোকারি করা তো ফ্রি। এজন্য মেয়েরা তার ধারে ঘেঁষে না। ঢাকা শহরের প্রায় সব মেয়েরা কল্পনায় তাকে স্থান দিয়েছে। ইনবক্সে মেসেজ আসে, বিভিন্ন পেজগুলোতে তার ছবিটবি পোস্ট করা হয়, কনফেকশন দেয়া হয়। অনেকে অনেক বেহুদা, আবেগী কথা বলে পোস্ট করে আফিমকে মেনশন করে। আফিম সেসব দেখে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় সে একটিভ নয়। মাঝেসাঝে স্ক্রল করতে গিয়ে এসব দেখলেই রক্ত মাথায় উঠে যায় তার।

মেয়েটার কথায় হেলদোল করে না সে। সোজাসাপটা উত্তর দেয়,

“- ওসব দেখার টাইম নেই”।

মেয়েটি লাজুক হাসে। বলে,
“- আমাকে একটু পৌঁছে দেবেন আফিম ভাইয়া? আমি হাসপাতালে যাবো, আমার বোন আইসিইউতে। জ্যামে বসেছিলাম, এইমাত্র অটো থেকে নেমে হাঁটা ধরেছি। বাইকে করে জ্যামের মাঝ দিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু এ মুহুর্তে আমি লিফট চাওয়ার মতো কাউকে পাচ্ছি না”।

আফিম ত্যাড়া সুরে উত্তর দেয়,
“- আমি কাউকে লিফট দিই না”।

“- আমি বিপদে আছি, হাসপাতালে যাওয়াটা জরুরি। তবুও সাহায্য করবেন না”?

আফিম অবিলম্বে সামনে তাকিয়ে উত্তর দেয়,
“- না। আমি দয়ালু নই”।

মেয়েটি হতাশ হয়ে তাকায়। বলে,
“- ঠিক আছে, আমি হেঁটে চলে যাবো”।

আফিম সামনে তাকায়। অনেকগুলো গাড়ি জ্যামে আটকে আছে। কেবল সাইকেল আর মোটরবাইক চিকন, ফাঁকা জায়গাগুলো দিয়ে চলে যাচ্ছে। জ্যামটা আকারে লম্বা। বসে থাকতে থাকতে যাত্রীরা কাহিল হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ বাহন থেকে নেমে হেঁটে যাচ্ছে। মেয়েটিও আফিমের বাইকের পাশের ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যায় মন খারাপ করে। আফিম বিরক্ত হয় খুব। ঘাড় বাঁকিয়ে ত্যক্ত সুরে ডাকে,

“- এইযে, শোনো”।

মেয়েটির নাম লাবন্য। আফিমের ভক্ত সে। যেদিন খবরে দেখেছিল আফিম একটি মেয়েকে রেইপ করেছে, সেদিন লাবন্য ভাতই খায়নি। সারাটাদিন কেঁদেছে। আজ আফিমকে দেখে ভেবেছিল কিছু কথা বলবে। কিন্তু তা না হওয়ায় লাবন্যর মনটা খারাপ হয়ে গেছে। এমনিতেও বোনের অসুস্থতায় সে ভালো নেই। তার উপর আফিমের এই গা-ছাড়া স্বভাবে হৃদয় ভেঙে খান খান হয়ে গিয়েছে মেয়েটার। পেছন থেকে আফিম ডাক দেয়ায় তার বিষণ্ণ চোখ জোড়া চকচকে হয়ে ওঠে। খুশি লেপ্টে যায় চোখে-মুখে। পিছু ফিরে পা বাড়িয়ে পুনরায় আসে আফিমের নিকট। আফিম বিরক্ত চোখে চেয়ে বলে,

“- বসো, ড্রপ করে দিচ্ছি”।

মেয়েটি তাড়াহুড়ো করে ব্যাক সিটে বসে পড়ে দু পা একপাশে মেলে। হেলমেটটা মাথায় পড়ে নেয় সে। আফিম বাইক স্টার্ট করতে করতে গম্ভীর অথচ তেজী কণ্ঠে বলে,

“- ডোন্ট টাচ, আ’ম ম্যারিড, সো দ্য টাচ অফ এনিওয়ান আদার দ্যান মাই ওয়াইফ ইজ নট এক্সেপ্টেবল টু মি”।

ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামে অনেকেই বলেছিল আফিম মির্জা ম্যারিড। কিছুদিন আগে বিয়ে হয়েছে তার। এ কথা কতটএকু যৌক্তিক জানতো না লাবন্য। ইউটিউব চ্যানেল ও প্রফাইল গুলোতে এআই দিয়ে আফিমের অনেক ভিডিও বানানো হয়। অনেক উল্টাপাল্টা হেডলাইন দিয়ে ভিডিও পোস্ট করা হয়। সেসবের সত্যতা যাচাই করা কঠিন। তাছাড়া এত বড়লোক ঘরের ছেলে, বিয়ে করলে শহরের সবাইকে জানাবে না? লাবন্যর এই বিশ্বাসটাকে মাটিচাপা দিয়ে দিয়েচে আফিম। মেয়েটা সিটের পেছন অংশ ধরে শক্ত করে বসে। বলে,
“- আপনি সত্যিই বিবাহিত”?

আফিম কটুক্তি করে বলে,
“- না, ম্যারিড”।

আফিমের রাগ দেখে আর কথা বাড়ায় না লাবন্য। তবে কষ্ট পায় খুব। ওদিকে জ্যাম দেখে মৃত্তিকাও অটো থেকে নেমেছে। ফুটপাত ধরে এদিকেই হেঁটে আসছে। আফিম দুর থেকেই মৃত্তিকাকে দেখে। বাইকের গতি কমায় সে। দুষ্ট বুদ্ধি তখনই মাথায় এঁটে যায় ছেলেটার। তাড়াহুড়ো করে বলে

“- সামনের ওই মেয়েটি আমার বউ। তোমাকে এমন কিছু একটা বলতে হবে, যাতে আমার বউ জেলাস ফিল করে। ভাবে তোমার সাথে আমার গলায় গলায় সম্পর্ক। পারবে”?

লাবন্য বোঝে। তবুও চুপ থাকে। আফিম বলে ওঠে,
“- যা বলবে মুখে বলবে। টাচ করবে না কিন্তু। জেলাস ফিল করাতে গিয়ে ছুঁয়েছ তো চটকনা মেরে বাইক থেকে ফেলে দেবো”।

লাবন্য মাথা নাড়ে। ভিতরটা পুড়লেও বলে ওঠে,
“- ঠিক আছে”।

বাইকের গতি এবার স্বাভাবিক করে আফিম। মৃত্তিকা দেখেনি ওদের। মৃত্তিকা যে পাশ দিয়ে হাঁটছে সে পাশে এসে জ্যামের মুখে বাইক থামায় আফিম। মৃত্তিকা তাদের একদম কাছে এসে আফিমকে দেখতে পায়। চলন্ত পা জোড়া থামে মৃত্তিকার। আফিমের বাইকের পেছনে একটি মেয়েকে দেখে কাঁপন ধরে বক্ষমাঝে। মৃত্তিকাকে তাদের দিকে তাকাতে দেখে লাবন্য হেসে হেসে খানিক উচ্চৈস্বরে আফিমকে বলে,

“- তোমাকে অনেক ধন্যবাদ আমার লাভ প্রপোজ অ্যাক্সেপ্ট করার জন্য। আমি তো ভাবতেই পারছি না তুমি আমার”।

মৃত্তিকা মেয়েটির কথায় হতভম্ব হয়ে আফিমের দিকে তাকায়। দু চোখ আর কানকে বিশ্বাস করতে পারে না সে। শোকে, তাপে বুক ভার হয়ে আসে মেয়েটার। বাইকের দিকে পা বাড়াতেই আফিম জ্যামের মাঝে ঢুকে তীব্র গতিতে চলে যায় সেখান থেকে। দেখেও যেন দেখে না মৃত্তিকাকে।

মৃত্তিকার আর পা চলে না। এসব কি দেখল সে? কেন দেখল? ওই মেয়েটা কেন এমনটা বলল? মাথা কাজ করে না মৃত্তিকার। ভয়ে গা হীম হয়ে আসে। সে জানে আফিম এমন নয়। সামান্য কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে আফিম বদলে যেতে পারে না। কিন্তু এসব কেন? আফিম কী মজা করছে? হ্যাঁ তাই হবে। নিজেকে শান্ত রাখে মৃত্তিকা। সে এসব বিশ্বাস করে না।

লাবন্যকে নির্দিষ্ট হাসপাতালের সামনে পৌঁছে দেয় আফিম। মেয়েটি বাইক থেকে নেমে হেলমেট খোলে। মলিন হেসে বলে,

“- আপনার বউ খুব সুন্দর। আপনার সাথে খুব মানাচ্ছে”।

আফিম সামান্য হাসে। লাবন্য ফের বলে ওঠে,
“- আপনার বউ কষ্ট পেয়েছে বোধহয়”।


অফিসের ক্যান্টিনে সবাই একসাথে দলবদ্ধ হয়ে বসলেও নেই কেবল শান্ত। তার অস্বস্তি হয় সবার মাঝে। অতটা মিশুক আচরণ করতে পারে না সে। রাইৃা বেশ কয়েকবার বলেছে তাদের সাথে সন্ধ্যায় কফি খেতে। শান্ত শোনেনি। তাকে রেখে ক্যান্টিনে আড্ডা দিতে একটুও ভালো লাগছে না রাইমার। খচখচ করছে মন। সে উঠে যায় সবার মাঝ থেকে। পূর্বা জিজ্ঞেস করে,

“- কোথায় যাচ্ছিস”?

রাইমা মিথ্যে বলে,
“- কফি খেতে ভালো লাগছে না। ডেস্কে যাচ্ছি”।

“- কফি না খেলে অন্যকিছু নিই আমরা”।

রাইমা তবুও বলে,
“- তোরা ইনজয় কর আমি উঠি। ভালো লাগছে না”।

রাইমা ছুটে যায় ডেস্কে। শান্তর গায়ে আজ কালো টিশার্ট। ল্যাপটপে টাইপিং করছে সে। কোনো দিকে মন নেই ছেলেটার। রাইমা চেয়ার টেনে তার পাশে বসে। বলে,

“- এভাবে একা একা থাকবেন? কারো সাথে না মিশলে বন্ধুত্ব হবে কি করে”?

শান্ত হেসে বলে,
“- আমি একাই ভালো থাকি রাইমা”।

“- একা ভালো থাকা যায়? আপনার এই একাকীত্বে আমি সঙ্গী হতে পারি না?”


বাড়িতে ফেরার পর একটি দূর্ঘটনা ঘটে গেছে মৃত্তিকার সাথে। জাহানারা ভাত চড়িয়েছিল চুলোয়। ভাত হয়ে এসেছে, মার গালতে যাবে। অমনি ইরফান উঠে গেছে ঘুম থেকে। জাহানারা তড়িঘড়ি করে ঘরে ছুটে গিয়েছে ইরফানের কান্নার আওয়াজ শুনে। মৃত্তিকাকে বলেছে ভাতের মারটুকু গেলে দিতে। জাহানারার মাঝে পরিবর্তন ঘটেছে। আগের মতো হম্বিতম্বি করে না। ইরফান আর ইরহামকে সামলাতে গিয়ে নাজেহাল সে। হম্বিতম্বি করার সময়টুকুই বা পায় কখন?

মৃত্তিকা তখন হুঁশে নেই বললেই চলে। আফিম আর ওই মেয়েটির মুখ ভেসে উঠছে চোখের পাতায়। খুব খারাপ লাগছে। দুদিন ধরে খাওয়াদাওয়া করেনি বললেই চলে। খিদে পায় না একদম। স্টুডেন্টের মা চা আর বিস্কিট দিয়েছিলেন। সারাদিনে ওটুকুই পেটে পরেছিল। ভাত-মাছের রুচি উঠে গেছে মেয়েটার। জিহ্বায় কোনো স্বাদ নেই, নাকে ঘ্রাণ নেয়ার ক্ষমতা নেই। একটু সর্দিও লেগেছে। জাহানারার কথা শুনে রান্নাঘরে গিয়ে ভাতের মার গালতে গেলেই পাতিলের ঢাকনা ভুলবশত সরে গিয়ে অনেকটা গরম মার এসে পড়েছে মৃত্তিকার হাতে। হাত থেকে পাতিল ফসকে গিয়ে সব ভাত পড়ে গিয়েছে বেসিনে। ঘটনার আকস্মিকতায় মৃত্তিকা চিৎকার করে ওঠে। হাতের পিঠ ও তালু সাথে সাথে ঝলসে ওঠে, লাল হয়ে যায়। চামড়া পুড়ে উঠে আসছে। ব্যথায় চিৎকার করে ওঠে মৃত্তিকা। মনোয়ারা ছুটে আসে। মেয়েকে দেখে চমকে ওঠে। তৎক্ষনাৎ ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা ডিম ফাটিয়ে মেয়ের হাতে ঢেলে দেন। বরফ পানিতে হাত চুবিয়েও রাখে কিছুক্ষণ।

এরপরেই সব রকমের আতঙ্ক কেটে যায়। মৃত্তিকা একদম চুপ। হাত ঝলসে গেছে তার, যন্ত্রণায় হাত অবশ হয়ে আসছে তবুও কাঁদে না সে। চেঁচামিচিও করে না। মনোয়ারা তার হাতের পিঠে মুখ দিয়ে ফু দিতে থাকে, পাখার বাতাস দেয়। তবুও মৃত্তিকার হেলদোল নেই। কেবল নিষ্প্রাণ চোখে চেয়ে সে বলে,

“- হাত ধরো না, মরে যাবো আমি। ধরো না, কষ্ট হচ্ছে”।

মনোয়ারার চোখে পানি জমে। জাহানারা বলে,
“- তোমার ভাই কাছেই আছে। ওকে বলেছি বার্নার আনতে। বরফ পানিতে হাত চুবিয়ে রাখো। একটু দেখে কাজ করতে হয় তো। চামড়া ঝলসে গেছে”।

ইরহাম ফ্যালফ্যাল করে মনির পানে তাকায়। জাহানারার দিকে তাকিয়ে বলে,
“- মনি ব্যথা পেয়েছে”?

জাহানারা বলে,
“- মনিকে আদর দাও, বলো আদর”।

ইরহাম তাই করে। মৃত্তিকার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় সযত্নে। মৃত্তিকার সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে। এসব তাকে কষ্ট দিচ্ছে না। তার কষ্ট হচ্ছে অন্য কারণে। আফিম, আফিম, আফিম। এই একটি মানুষ মৃত্তিকাকে বারংবার কাঁদাচ্ছে। লোকটার একটুও মায়া-দয়া নেই। দুদিনে একবারও কল, টেক্সট করেনি। বাড়ির বাইরেও ঘুরঘুর করেনি। কেমন ভালোবাসা তার? এ দুদিনেই মৃত্তিকাকে ভুলে আরেক মেয়েকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মৃত্তিকার বুঝি কষ্ট হয় না? বুক পোড়ে না? কোন ক্ষত সাড়াবে সে? বুকের দহন নাকি হাতের?

হাত পুড়ে খারাপ অবস্থা মৃত্তিকার। ক্রিম লাগিয়েও যন্ত্রণা কমেনি। দু-তিন ঘন্টা জ্বলবেই। একেবারে ফুটন্ত গরম পানি ছিল, পাতিলের অর্ধেক পানি মৃত্তিকার হাতে পড়েছে। চামড়া কুঁচকে গিয়েছে, যেন গলে যাচ্ছে।

আতিকুর রহমান কষ্ট পেলেন মেয়ের এই দশায়। দুটো দিন মেয়েটাকে সে পর্যবেক্ষণ করেছেন। মৃত্তিকার মন ভালো নেই, সবসময় মনমরা থাকে, ভালো করে খায়ও না। মেয়ে যে ভালো নেই তা তিনি বোঝেন। হঠাৎ এ দুর্ঘটনায় তিনি ব্যথিত হলেন। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। জোর করে কয়েক লোকমা খাইয়েও দিলেন।

ঘুমোতে যাবার আগে থেকে মৃত্তিকার গা গরম হচ্ছে। সেসবকে খুব একটা পাত্তা না দিয়ে মৃত্তিকা কম্বল জড়িয়ে শুয়ে পড়ে। মাঝ রাতে সে বুঝতে পারে তার মুখ তেতো হয়ে গেছে, সর্দিতে নাক দিয়ে শ্বাস নিতে পারছে না সে। মুখ হা করে শ্বাস ফেলতে হচ্ছে। হাতও জ্বলছে, প্রচণ্ড শীত করছে। ঠকঠক করে কাঁপছে তার গা। শরীরে অসহনীয় ব্যথা অনুভূত হয় মৃত্তিকার। হাত অবশ হয়ে যায় মেয়েটার। মাথা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। আপনা-আপনি চোখ বেয়ে অঝরে পানি গড়াচ্ছে। মৃত্তিকা মাঝ রাতে উঁচু স্বরে মনোয়ারাকে ডাকে। প্রথমে শুনতে না পেলেও তিনবার ডাকার পর মনোয়ারা ছুটে আসে ঘরে। মৃত্তিকাকে এই সময়ে কম্বল জড়িয়ে শুয়ে থাকতে দেখে চিন্তিত হয় সে। মৃত্তিকা মনোয়ারাকে দেখে বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলে ঠোঁট উল্টে। বলে,

“- ও মা, দেখো তো আমার জ্বর এসেছে কিনা”?

মনোয়ারা মৃত্তিকার ললাটে হাতের পিঠ ঠেকিয়ে দেখে জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে মৃত্তিকার। হাত ছোঁয়াতেই তার হাত গরম হয়ে উঠেছে। উত্তপ্ত গা থেকে গরম তাপ বের হচ্ছে। দাঁত কপাটি লেগে আসছে মেয়েটার। মুখটা ওইটুকুনি হয়ে গেছে। সাথে সাথে সে চিন্তিত কণ্ঠে বলে ওঠে,

“- মৃত্তি, তোর তো জ্বর এসেছে মা। ঔষধ খেতে হবে। দাঁড়া, আমি তোর মাথায় পানি ঢেলে দিই”।

বাতি জ্বালিয়ে মাথার নিতে মোটা, বড় পলিথিন বিছিয়ে মৃত্তিকার মাথায় পানি ঢালে মনোয়ারা। মাথায় জলপট্টি দিয়ে ট্যাবলেট খাইয়ে দেয়। মৃত্তিকা পুরো শরীর গুটিয়ে নিয়ে নিচু কণ্ঠে, জ্বরের ঘোরে বলে,

“- ও মা”।

মনোয়ারা উত্তর দেয়,
“- কি মা?”

“- আমার খুব জ্বর এসেছে তাই না”?

“- হ মা, অনেক জ্বর”।

মৃত্তিকার চাহনি বাচ্চাদের মতো। কথাবার্তাও খুব সহজ। সে আলতো হেসে আবার ডাকে,,

“- ও মা”।

“- বল”।

“- আমার জ্বর এসেছে, তুমি ওকে বলোনি”?

মৃত্তিকার মা ‘ও’ বলতে কাকে বুঝিয়েছে তা বুঝতে পারে। তবুও মেয়ের মুখে শুনবে বলে ভনিতা করে বলে,

“- কাকে জানাতে বলছিস”?

মৃত্তিকা বিরক্ত হয় খুব। চোখ বুজেই কপালে ভাঁজ ফেলে। মনোয়ারার কথাকে অগ্রাহ্য করে বলে,

“- ও বলতো আমার ভিজে জবজবে হওয়া কান্নামাখা মুখ ওর প্রিয়। এখন কি আমি কাঁদবো মা? কাঁদলে আমাকে ভালো লাগবে”?

মনোয়ারা বোঝে না এ কথার অর্থ। মেয়ের কণ্ঠ নরম, আদুরে। ঘোরের মাঝে আছে মৃত্তিকা। বাচ্চাদের মতো নিষ্পাপ দেখাচ্ছে ওকে। কোনো প্যাঁচ নেই যেন কথায়। বলে,

“- কি বলছিস তুই”?

মৃত্তিকা বিরক্ত হয়ে ওঠে। তার কথা তার মা বুঝতে পারছে না দেখে মৃত্তিকার খুব রাগ হয়। ধমকে উঠে সে বলে,

“- ধ্যাত্, তুমি কিছুই বোঝো না। আব্বুকে ডাকো, জলদি”।

মনোয়ারা তার ঘুমন্ত স্বামীকে ডেকে তোলে। মৃত্তিকার ভয়ানক অবস্থার কথা জানাতেই তিনি ছুটে আসেন। মৃত্তিকাকে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তিনি। জ্বরে মেয়েটা হুঁশ-জ্ঞান হারিয়েছে। চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে মুখ ভিজে গেছে। শীতে শরীর ঝাঁকি দিচ্ছে মেয়েটার। তিনি মৃত্তিকার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,

“- কিছু খাবে তুমি? বলো, আমি এনে দিই”।

মৃত্তিকা চোখ বুজে বাচ্চাদের ন্যায় আহ্লাদী কণ্ঠে বলে,
“- ও আব্বু, আমার তো অনেক জ্বর। হাত ও পুড়ে গেছে। আমি কি মরে যাবো”?

চমকে ওঠেন আতিকুর রহমান। মেয়ের মাথা বুকে ঝাপটে ধরে উত্তেজিত স্বরে বলেন,

“- কি বলো তুমি? জ্বরে কিছুই হয় না মা। সকাল হলেই ডাক্তার দেখিয়ে ঔষধ আনবো, তুমি ঠিক হয়ে যাবে মা।”

মৃত্তিকা বোঝে। বাবার দিকে মুখ উঁচিয়ে বলে,
“- শোনো না, রাস্তায় অনেক জ্যাম থাকে। অটো করে যেতে যেতে আমার যদি কিছু হয়ে যায়? ওর গাড়িতে চড়ে গেলে তাড়াতাড়ি যেতে পারবো”।

মৃত্তিকার কথার আগামাথা নেই। সে সরাসরি আফিমকে ডাকার কথা বলছে না। ইনিয়েবিনিয়ে, অহেতুক ছুতো আর কারণ দেখিয়ে আফিমের কথা তুলছে। তার কথায় যুক্তি নেই। জ্বরে কেউ মারা যায় এখন? বাড়ির আশেপাশেই অনেক ফার্মেসি। হেঁটে গেলে পাঁচ মিনিট। এই সামান্য পথ যেতে গিয়ে মরে যাওয়ার চিন্তা মাথায় আসে কি করে? মেয়েটার কি মাথা ঠিক নেই?

মনোয়ারা বলে,
“- আমাকে বলল ওকে খবর দিতে। “ও” টা কে তা বলল না। তোমার মেয়ের বুক ফাটবে, মুখ ফুটবে না”।

“- তোমার কি মনে হয়? আফিমকে ডাকা উচিত”?

“- মেয়েকে কষ্ট দেওয়া ঠিক হবে না। ছেলেটা কাজ না করুক, মৃত্তিকাকে ভালো তো বাসে। তোমার মেয়ের তো কোনোকিছুর অভাব রাখছে না ছেলেটা, তাহলে চলে আসার দরকার কী”?

আতিকুর রহমান বোঝেন। উঠে গিয়ে আফিমের নম্বরে কল করেন। দু বারের মাথায় আফিম ফোন তোলে। রাত বাজে দুটো পঁচিশ। এই অসময়ে মৃত্তিকার বাড়ির নম্বর থেকে কল আসায় সে কাজের মাঝেও কলটা তুলে নেয় কানে। ওপাশ থেকে মৃত্তিকার অসুস্থতার কথা শুনেই ছেলেটা থমকায়।

আফিম ফিল্ড রুমে আছে। বড় একটা টেবিলের চেয়ারে বসে আছে সে। বাকি চেয়ারগুলোতে টিম মেম্বাররা বসে আছে। মাঝ খানে কিছু কাগজ আর ম্যাপ রাখা। পিস্তল, রাইফেল, কলম আর প্রয়োজনীয় জিনিস টেবিলে রাখা। আতিকুর রহমানের কথা শোনার পর আফিম চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। সকলের উদ্দেশ্যে বলে,

“- আমাকে যেতে হবে, আমার স্ত্রী অসুস্থ”।

আফিমদের বস রুক্ষ স্বরে বলেন,
“- তুমি চলে গেলে কীভাবে হবে? আজ প্ল্যানটা না করলে মিশনে যাওয়া যাবে”?

আফিম তির্যক চোখে তাকায় বসের দিকে। বলে,
“- এতগুলো মানুষ আছে, ওদের ব্রেইনকে ও একটি কাজে লাগান।”

একজন জুনিয়র বলে ওঠে,
“- ব্রাদার, আপনি না থাকলে কিভাবে কি প্ল্যান করবো আমরা?”

আফিম এবার রেগে ওঠে। মৃত্তিকার চিন্তায় অস্থির সে। মস্তিষ্ক এখন ফাঁকা। মাথা কাজ করছে না একদম। উত্তেজিত হয়ে ধমকে উঠে আফিম বলে,
“- বারোজন মিলে একটা প্ল্যান করবে সেটুকুও পারবে না? আমি না থাকলে কিছুই হবে না নাকি? শুনতে পেলে না আমার স্ত্রী অসুস্থ? বিপরীতে কথা বলার সাহস কিভাবে পাও? প্ল্যান, অ্যাকশন সব যদি আমিই করবো তখন তোমরা আছো কি করতে? ওকে ফাইন, আমি একাই সব করবো, তবুও যেতে হবে আমাকে।”

আফিম কালো ব্লেজার খুলে ফেলে একটানে। গলা থেকে টাই খানা ছুঁড়ে ফেলে টেবিলে। পকেটে থাকা বন্দুক, ছুড়ি বের করে রেখে দেয়। সাদা শার্টের হাতা গুটিয়ে চুলগুলো অগোছালো করে বেরিয়ে পড়ে বাইরে। লেন্স খুলে রাখে বক্সে, মাস্ক পড়ে বাইকে এসে বসে।


রাস্তায় মানুষ নেই। কুকুর গুলো আরামে শুয়ে আছে গা এলিয়ে। গাড়ি না থাকায় তুলনামূলক উচ্চ গতিতেই বাইক চালিয়ে মৃত্তিকাদের ফ্ল্যাটে পৌঁছায় আফিম। বাইক লক করে হন্তদন্ত হয়ে সিঁড়ি বেয়ে দু তলায় ছুটে আসে সে। দরজা খোলাই ছিল। আফিম একটু শান্ত হয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যায় মৃত্তিকার ঘরে। বিছানায় গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে মৃত্তিকা। পাশে মৃত্তিকার বাবা-মা, মেহমেত দাঁড়িয়ে, বসে আছে। আফিমকে দেখে মেহমেত বেরিয়ে যায়। ইরফানের ডায়াপার চেঞ্জ করতে হবে তাকে।

আফিম সালাম জানায় সবাইকে। ওদিন ফিরে যাওয়ার পর আবারও এ বাড়িতে পা রাখায় তার অস্বস্তি হচ্ছে। আতিকুর রহমান তাকে দেখে উঠে দাঁড়ায় মেয়ের পাশ থেকে। বলে,

“- এসো, মৃত্তি তোমাকে খুঁজছিল”।

মনোয়ারাকে তিনি বলে ওঠেন,
“- জামাইয়ের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করো”।

আফিম বাঁধ সাধে। বলে,
“- মৃত্তিকাকে নিয়ে আমি চলে যাবো”।

মনোয়ারা বলে,
“- ওর অবস্থা ভালো না বাবা। এই অবস্থায় নিয়ে যাবে”?

আফিম মৃত্তিকার দিকে চেয়ে বলে,
“- সমস্যা নেই আন্টি। ভরসা রাখুন, ডক্টর ডেকেছি বাড়িতে”।

“- যেতে চায় কিনা জেনেশুনে নাও। আমি একটু চা বানিয়ে আনি। খেয়ে যেও”?

“- ঠিক আছে”।

ঘর ফাঁকা হতেই আফিম মৃত্তিকার মাথার কাছে এসে বসে। কোনো রূপ বাক্য ব্যয় না করে মৃত্তিকার মাথা বালিশ থেকে তুলে নিজের বুকে চেপে ধরে। পরিচিত সুঘ্রাণ পেতেই মৃত্তিকা আধো আধো চোখ মেলে। আফিমকে দেখেই তার ফ্যাকাসে মুখ খানা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কম্বলের নিচ থেকে দু হাত বের করে জড়িয়ে ধরে আফিমের পিঠ। গা শিরশির করে ওঠে আফিমের। মেয়েলি নরম হাতটা পিঠে আটকে যেতেই হাতের চাপ প্রয়োগ করে মৃত্তিকার মাথা চেপে ধরে বুকে। খুব দুর্বল কণ্ঠে মৃত্তিকা বলে,

“- কোথায় ছিলেন”?

আফিম উপেক্ষা করে মৃত্তিকার প্রশ্ন। নরম রুপ বদলে মুহুর্তেই গম্ভীর হয় সে। রুক্ষ, রাগী সুরে বলে,

“- জ্বর বাঁধালে কি করে?”

মৃত্তিকা আফিমের বুক থেকে সরে যায়। ভেজা গাল দুটো মুছে নেয় সন্তপর্ণে। শুকনো ঢোগ গিলে বলে,

“- শ্বাস নিতে পারছি না আফিম”।

আফিমের হৃদয় তবুও কি গলে? সামান্যতম চিন্তিত, নরম দেখায় না তাকে। মাত্রাতিরিক্ত কঠোর রূপে সে ধরা দেয় মৃত্তিকার নিকট। চোয়াল শক্ত করে বলে,

“- সন্ধ্যায় তোমাকে সুস্থ দেখেছি আমি”।

মৃত্তিকার পরনে একটি ওভারসাইজ মেরুন শার্ট আর কটন কাপড়ের প্লাজু। মৃত্তিকাকে আগে কখনো এ ধরণের পোশাক পড়তে দেখেনি আফিম। মৃত্তিকার পোশাক খুবই শালীন। মাথা থেকে সচরাচর ওড়না নামায় না। বড় ও চওড়া ওড়না দ্বারা বুক, পিঠ ঢেকে রাখে মেয়েটা। মৃত্তিকা দুর্বল কণ্ঠে বলে,

‘- আপনি আমাকে কী করে ভুলে গেলেন?”

মৃত্তিকার শরীর টলছে। প্রচণ্ড দুর্বল দেহ মেয়েটার। আফিম মেয়েটির এই আবেগী, আহ্লাদী কণ্ঠের বিপরীতে কড়া কণ্ঠে বলে,

“- ভুলে যাওয়ার মতো কাজ করলে ভুলবো না”?

মৃত্তিকার ঠোঁটের কোণ কেঁপে ওঠে। খোপা খুলে যায় মেয়েটার। দুর্বল হাত জোড়া দিয়ে চুলের খোপা বাঁধতে গেলেই হাতের ব্যথায় চিৎকার করে ওঠে মৃত্তিকা। “আহ” জাতীশ অস্ফুটে শব্দ বেরিয়ে আসে মুখ থেকে। আফিম চোখ জোড়া মৃত্তিতাতে স্থির। তার ব্যথাতুর ধ্বনি আফিমকে কাবু করে। আফিম মৃত্তিকার হাত ধরে খুব ধীরে, নরম হাতে। হাত পুড়ে কালচে হয়ে গেছে মৃত্তিকার। চামড়া উঠে সাদা মাংস বেরিয়ে এসেছে। জ্বলনে মেয়েটা কতই না কষ্ট পেয়েছে! আফিম চোখ বুজে নেয়। চোখ জোড়া জ্বলে ওঠে।৷ আশ্চর্য! এই মেয়েটার ঠুনকো ব্যথাও আফিমকে দুর্বল করে। কঠোর, দৃঢ় মনোবল ভেঙে দেয়। গুলি চালাতে যে ছেলের হাত একটুও কাঁপে না, সেই ছেলের বুক কেঁপে ওঠে এই পিচ্চি মেয়ের চাহনিতে।

মৃত্তিকা তাচ্ছিল্যের সুরে হাসে,
“- আপনি বলেছিলেন আমার ভেজা চোখ, ভেজা গাল আপনার প্রিয়”।

আফিম মৃত্তিকার পোড়া হাতের তালুতে খসখসে ঠোঁটের চুমু এঁকে দেয়। যন্ত্রণায় ঠোঁটের সেই মিষ্টতা অনুভব করতে পারে না মৃত্তিকা। আফিম নিচু স্বরে হিসহিসিয়ে বলে,

“- আমি এও বলেছিলাম যে তুমি পুরোটাই আমার। আমার শখের, আমার সাধের”।

“- আপনিও আমায় ছেড়ে যাচ্ছেন। আমায় ছাড়তে আপনার একটুও কষ্ট হবে না”?

“- তোমার কি মনে হয়? ব্যথা কেবল তোমারই আছে? কষ্ট শুধু তোমারই হয়”?

“- আপনি তবুও ভালো হবেন না। আমাকে ছেড়ে দিবেন, কিন্তু নিজেকে পরিবর্তন করতে পারবেন না”।

“- এই মন্দ লোকের জন্য এত কান্নাকাটি কেন করছো”?

মৃত্তিকা হকচকিয়ে ওঠে। বলে,
“- আমি আপনার জন্য কাঁদছি না তো। জ্বরে, যন্ত্রণায় কাঁদছি”।

আফিম ফোস করে শ্বাস ফেলে বলে,
“- ঠিক আছে, আমি তাহলে চলে যাচ্ছি”।

আফিম মৃত্তিকাকে রেখে উঠে দাঁড়ায়। মৃত্তিকার মুখটা শুকনো হয়ে আসে। ছলছল করে ওঠে চোখ। আফিম পা বাড়াতেই নিচু স্বরে মেয়েটা বলে ওঠে,

“- আমার ঘুম আসছে না। ঘুম এলে নাহয় চলে যাবেন”।

প্রিয়তমার সহজ সরল আবদারে পা থামে আফিমের। অগোচরে মুচকি হাসে সে।
আফিম মৃত্তিকার মাথার পট্টিতে পানি ভিজিয়ে আবার কপালে লেপ্টে দেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় মেয়েটার। চোখের পানি বুড়ো, খসখসে আঙুলের দ্বারা মুছে দেয় বারংবার। মৃত্তিকা আফিমের বাইসেপ্স ধরে রাখে। তার বাহু আগলে নেয় বুকের মাঝে। চোখ বুজে নেয় শান্তিতে। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে মেয়েটার। বসে থাকা আফিমের পায়ের উপর পুরো শরীরের ভর দিয়ে মৃত্তিকা তার বুকের মাঝে লেপ্টে থাকে। এক হাত জড়িয়ে সুখকর নিদ্রায় তলিয়ে যায়। ভুলে যায় সকল ব্যাধি।

মনোয়ারা আফিমের জন্য চা নিয়ে আসে। মেয়েকে এভাবে আরামে আফিমের বাহু ধরে ঘুমোতে দেখে সে খানিক লজ্জা পেলেও চোখ সরায় না। আফিমকে চা দিয়ে বলে,

“- ওর মাথাটা বালিশে দাও। তুমিও ঘুমিয়ে পড়ো”।

আফিম বুকের মাঝে লেপ্টে থাকা ছোট্ট, মোলায়েম শরীরটা আঁকড়ে ধরে বলে,
“- সমস্যা নেই আন্টি। নড়াচড়া করলে ও জেগে যাবে। থাকুক এভাবেই”।

চলবে?
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি শেখ

[ এই পর্বটা সবচে বাজে হয়েছে আমার ধারণা। ঠিকঠাক ভাবে সবটা উপস্থাপন করতে পারিনি বোধহয়। আমারই ভালাগছে না পড়তে🙂 ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply