Golpo romantic golpo ওরা মনের গোপন চেনে না

ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২৬


ওরামনেরগোপনচেনেনা

পর্ব সংখ্যা [২৬]
[পর্বটি সংবেদনশীল🚫]

ছোট্ট শিশু ইরফান কান্না করছে। সে দুধ খাবে। ভাবি ঘুমোচ্ছে মরার মতো করে। বাচ্চা প্রতি রাতে উঠে কান্না করে, তাই বেচারির ঘুম হয় না। প্রথমে ভেবেছিল বাবুর গ্যাস হয়েছে পেটে। কিন্তু ঔষধ খেয়েও কোনো কাজ হয়নি। মনোয়ারা কবিরাজের থেকে পানি পড়ে এনেছে, শিকড়যুক্ত তাবিজ এনে পড়িয়েছে। জানা মাত্র মৃত্তিকা রেগে গিয়েছে। তাবিজ পড়াতে হবে কেন? তাবিজ পড়া শিরক। শুধু শুধু এই নাফরমানি করার প্রয়োজন কী? মৃত্তিকা নেট সার্চ করে দেখেছে প্রথম কয়েকদিন কিছু বাচ্চা এরকম জ্বালায়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ওদের কান্না কমে।

মৃত্তিকা বাসায় এসেছে বলে আতিকুর রহমান গিয়েছেন বাইপাইল মাছের আড়তে। মৃত্তিকার পছন্দের মাছ আনবেন তিনি। ইরহাম মৃত্তিকাকে ছাড়ছেই না। এক্কেবারে লেগে আছে তার সাথে আঠার মতো। মনোয়ারা সকালে রান্না বসিয়েছে। বাচ্চা কাঁদছে বলে মৃত্তিকা বাচ্চাটাকে কোলে আর ইরহামকে সাথে করে নিয়ে গেছে ছাদে। ভোরের আলো বাতাস শিশুর জন্য উপকারী। সকালের সূর্যের আলো শিশুর জন্ডিস প্রতিরোধ করে। ছাদে বাড়িওয়ালা একটা দোলনা পেতেছে। বাড়ির ছোট ছোট বাচ্চারা খেলে এখানে এসে। এত সকালে কেউ ওঠেনি। বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে মৃত্তিকা দোল খাচ্ছে। ইরহাম পাশে বসে বিস্কিট চিবুচ্ছে।

একটি ভ্যান ওয়ালা যাচ্ছে নিচ দিয়ে। হাঁক ছেড়ে ক্রেতাদের ডেকে ডেকে বলছেন “ তেঁতুলের আচার, বড়ইয়ের আচার, আমড়া, জলপাই, পেয়ারা, চালতা সব আচার আছে। খাইয়া কইবেন সেই টেস্ট”।

বিক্রেতার কথা শুনে হাসি পায় মৃত্তিকার। এত সকাল সকাল আচার বিক্রি করতে এসেছেন? নিশ্চয়ই জীবিকার তাগিদে। মৃত্তিকা ছাদের গ্রিলের সামনে এসে ঝুঁকে নিচে তাকায়। উচু স্বরে বলে,

“- এই যে চাচা, একটু দাঁড়ান”।

লোকটি দাড়িয়েছে। মৃত্তিকা ওড়নার কোণায় গিট দিয়ে পঞ্চাশ টাকা বেঁধে রেখেছিল। ওরনার কোনা খুলতে খুলতে সে ইরহাম আর ইরফানকে নিয়ে নিচে নামে। বড় রাস্তাটা ফাঁকা, ওপাশে দুটো কুকুর শুয়ে আছে। মৃত্তিকা ইরহামের জন্য ঝাল ছাড়া পেয়ারার আচার কিনেছে, আর নিজের জন্য চালতা আর বড়ইয়ের আচার। আচার খেতে খেতে ইরহাম বলে,

“- উফফ সেই টেস্ট”।

মৃত্তিকা হাসে তার বলার ভঙ্গি দেখে। তখনই তিন তলা থেকে নেমে আসে সাহিল। পরনে ফর্মাল শার্ট-প্যান্ট, চোখে চশমা। মৃত্তিকাকে দেখেই চিরচেনা হাসি দেয় লোকটা। বলে,

“- কেমন আছেন মৃত্তিকা”?

মৃত্তিকা হেসে প্রত্যুত্তর করে,

“- আলহামদুলিল্লাহ্ সাহিল ভাই, আপনার কি খবর”?

“- এইতো চলছে, তা বাচ্চাদের নিয়ে ঘোরা হচ্ছে”?

“- সবাই ব্যস্ত, তাই বের হলাম ওদের নিয়ে”।

“- কবে এসেছেন”?

“- যখন এলাম তখন আলো ফোটেনি।”

“- ভাই আসেনি সাথে”?,

মৃত্তিকার মুখ থেকে হাসি সরে না। বলে,
“- না আসেননি। ভীষণ ব্যস্ত”।

সাহিল অবাক হয়ে শুধোয়,
“- আঙ্কেল বলেছিল সে নাকি কাজ করে না”?

“- তার কাজ হলো গুণ্ডামি করা। মাস্তানি করতেই ব্যস্ত”।

সাহিল হেসে বলে,
“- মানুষটা এতটাও খারাপ না মৃত্তিকা। আপনি আপনার ভাবির বাড়ি গোপালগঞ্জ গিয়েছিলেন না? ভাই তো পুরো এলাকা তন্ন তন্ন করে আপনাকে খুঁজেছে। না পেয়ে আমার কাছে এসেছিল, আমি বলিনি বলে দুটো চড় মেরেছিল গালে। খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, ঘৃণাও হয়েছিল। এক পর্যায়ে ভয়ে বলে দিয়েছিলাম আপনার ঠিকানা। আপনাকে খুঁজে পাবার দুদিন পর চায়ের দোকানে দেখা হয়েছিল তার সাথে। আমাকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে বেচারা বেকায়দায় পড়েছিল। ক্ষমা চাওয়া তার সাথে যায় না, অপর দিকে সে কিছুটা অনুতপ্ত আমার মতো নিরপরাধীকে মারার জন্য। কি বলবে বুঝতে না পেরে গুলিয়ে ফেলেছিল কথা। কি বলেছিল জানেন”?

সাহিলের কথায় আগ্রহ পাচ্ছে মৃত্তিকা। আফিমকে ঘিরেই কথাটা। তাই বুঝি আগ্রহ কাজ করছে, শুনতে ইচ্ছে করছে পরের টুকু। কৌতুহল দেখিয়ে সে বলে,

“- কি বলেছিল”?

“- বলল ওইদিন মারলাম তোমাকে। সোজাসাপটা বলে দিলে ঝামেলা হতো না। বলোনি তাই মার খেলে। মৃত্তকে আমার পছন্দ। সবচে পছন্দ কি জানো? ওর কান্না। কাঁদলে ওকে আদুরে লাগে।”

মৃত্তিকা ড্যাবড্যাব করে চেয়ে বলে,
“- এসব বলেছে আপনাকে”?

“- আরো বলেছে তোমাকে খুঁজে পাওয়া জরুরি। তোমাকে না পেলে তার জীবনটা একঘেয়ে, বিরস হয়ে যাবে। তাই সে তোমাকে খুঁজছে। তোমাকে খোঁজার জন্য আমাকে মেরেছে, আমি যেন সেসব ভুলে তোমার থেকে দূরে থাকি। বলো তো, এসব কোনো কথা হলো”?

মৃত্তিকা বিব্রত হয়। লজ্জায় ঠোঁট কামড়ে নত হয়। বলে,
“- ও এমনই”।

“- পাগল স্বামী পেয়েছেন মৃত্তিকা। আপনাকে ছাড়বে না সহজে। ভালো না বেসে যাবেন কোথায়”?

“- আপনি এসব বলে আমাকে লজ্জা দেবেন না সাহিল ভাই।”

“- আচ্ছা দিলাম না। থাকুন, আমি খেয়েদেয়ে অফিসে যাই”।

সাহিল চলে যায়। মৃত্তিকা দুটো বাচ্চাকে টেনে দু তলায় নিয়ে যায়। ইরফান ঘুমিয়েছে। ঘুমন্ত নিষ্পাপ শিশুটিকপ বুকে চেপে মৃত্তিকা বিছানায় বসে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। দুটো পাখি একে অপরের সাথে আঠার মতো লেগে আছে। মৃত্তিকার মনে হয় একটি পাখি রাগ করেছে, অপর পাখিটি রাগ ভাঙাতে কসরত করছে। লেগে থাকছে দেহের সাথে। দৃশ্যটি চমৎকার। মৃত্তিকা চেয়ে থেকে পাখি দুটোর অভিমান ভাঙানোর পর্ব দেখে। পাখি দুটোর শেষ পরিণতি দেখে তার মুখে এক চিলতে হাসি ফোটে। ইরফানকে শুইয়ে দেয় তার মায়ের পাশে। রান্নাঘরটা নোংরা হয়েছে। মায়ের রান্না শেষ হতেই মৃত্তিকা ডিটারজেন্ট পাউডার আর পানি দিয়ে পুরো ঘর মুছে ফেলে। আটটায় মেহমেতের অফিস। খেতে বসে সে মৃত্তিকাকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“- কয়েকদিন থাকবি মৃত্তি”?

মৃত্তিকার মেহমেতের উপর থেকে মন উঠে গেছে। এখন আর তার ভালো কথাও মৃত্তিকার ভালো লাগে না। দুঃসময়ে যে পাশে থাকে না, খোঁচা দিয়ে দোষারোপ করে, তাকে নিজের বলে মনে হয় না। সে গম্ভীর স্বরে বলে,

“- এখনো সিদ্ধান্ত নিইনি”।

“- তুই থাকলে মা-র উপকার হয়।”

মৃত্তিকা হেসে বলে,
“- শুধু কি মার উপকার হবে? তোমাদের হবে না? আমার মা কখনো চাইবে না সংসার ফেলে আমও তার উপকার করতে আসি”।

মেহমেত অবাক হয় মৃত্তিকার এই আচরণে। বলে,
“- এভাবে কথা বলছিস কেন”?

“- তুমিও তো আমার সাথে সুন্দর করে কথা বলো না ভাইয়া। প্রয়োজন হলেই একটু গদগদ হয়ে কথা বলো। বাকি সময়টা কেবল খোঁচা দেয়ায় ব্যয় করো”।

মেহমেত থেমে যায়। টেবিল থেকে উঠে হাত ধুয়ে অফিসের জন্য ছোটে। মৃত্তিকার পরনের কাপড় ভিজে গেছে৷ ও বাড়ি থেকে আফিমের দেয়া কিছুই আনা হয়নি। সে মনোয়ারার একটি সিল্কের শাড়ি পড়েছে। শাড়িটা যদিও খুব পুরোনো, তবে রং ঝলসায়নি। এত বছর পরেও সুন্দর দেখায় শাড়িটি। গোসল করে ঠিকঠাক ভাবে শাড়ি পড়ে মৃত্তিকা মায়ের কাছে আসে। তিনি নকশিকাঁথা বুনছেন। মৃত্তিকা মায়ের পাশে এসে বসে জিজ্ঞেস করে,

“- আর কত সেলাই করবে? ইরফানের তো কাঁথার অভাব নেই”।

মনোয়ারা হেসে বলে,
“- তোর বাচ্চাকাচ্চাদের জন্য সেলাই করছি”।

মৃত্তিকা তাচ্ছিল্য করে হেসে বলে,
“- সেসবের প্রয়োজন নেই। বাচ্চা নেয়ার কথা ভাবছি না”।

মনোয়ারা মৃত্তিকার দিকে মনোনিবেশ করে। বলে,
“- হঠাৎ এত ভোরে হাজির হলি, কোনো সমস্যা হয়েছে”?

“- সমস্যা? আমার তো কপাল পোড়া। এই পোড়া কপালে সমস্যা জোটে না, ছাই জোটে”।

“- আহ্! এমন করে বলছিস কেন মা? কি হয়েছে”?

“- সারা রাত বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়, স্ত্রীর কথা মনে না থাকুক, বাবাকে কি করে এত কষ্ট দেয় উনি? আজ তাঁর জন্মদিন। আমি আর বাবা আয়োজন করেছিলাম, কেক বানিয়েছিলাম। উনি ফিরলেন না। কল ধরলেন না। এতই ব্যস্ত, সে সারা রাত আর বাড়ি ফেরার তাগাদা অনুভব করলেন না”।

“- তোর বাবা জানলে আর তোকে যেতে দেবে না।”

কথাটা বলা মাত্রই হাজির হন আতিকুর রহমান। সব কথা শোনেন তিনি। বাজারের ব্যাগটা রেখে বলেন,

“- আফিম যতদিন না ভালো হচ্ছে, ততদিন তুমি ও বাড়িতে ফিরবে না। এটাই আমার আদেশ”।

মৃত্তিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“- উনি শোধরাবেন না বাবা। তার অভ্যেস বদলানো অসম্ভব।”

“- শোনো মৃত্তিকা। তোমাকে আমি গড়ে তুলেছি আত্মসম্মান, মর্যাদার সাথে। বিয়েটা হওয়ার পরও আমি আফিমকে মেনে নেইনি। যে ছেলে তোমার হবু স্বামীকে মেরে পা ভেঙে দিতে পারে, গোপালগঞ্জে চলে যেতে পারে, সারাদিন মারপিট করা যার নেশা তার সাথে আমি তোমাকে থাকতে দিতে চাইনি। তুমি নিজেই গিয়েছিলে, ভেবেছিলে এটাই তোমার ভাগ্য। কিন্তু ভাগ্য নিজ শ্রমের দ্বারা পরিবর্তন করা যায়। বিয়ে হয়ে গেছে বলে তুমি নিজের অপছন্দ বিষয় গুলো মেনে নিয়ে পড়ে থাকবে তা হয় না।”

মৃত্তিকা সব কথা শোনে। শেষে কম্পিত স্বরে বলে,
“- কিন্তু বাবা, উনি আমাকে ভালোবাসেন। অনেক বেশি ভালোবাসেন আমাকে। সবকিছুর উর্ধ্বে এটাই যে উনি আমাকে কখনো ছাড়তে চান না, আমায় পেতে উনি সব ধরণের নিচু কাজ করতেও ভাবেন না। এই ভালোবাসার লোভেই আমি থেকে গিয়েছি, তাকে শোধরানোর চেষ্টা করেছি। ভালোবাসাই তো সবচে বড় বাবা। আমার তো কেবল এই একটাই চাহিদা”।

আতিকুর রহমান আর বলতে পারলেন না কিছুউ। মৃত্তিকার সহজ আচরণ তাকে দমিয়ে দেয়। তার অকপটে করা সহজ স্বীকারোক্তি মেনে নেন তিনি। বুঝে ফেলেন আফিম মৃত্তিকার সাথে যেমন ভালো আছে, মৃত্তিকাও তেমনই আফিমের সান্নিধ্য উপভোগ করে। বাঁধা কেবল একটাই, আফিমের সহজাত, কাজ, তার নেশা। এগুলো যদি ছেলেটা শুধরে ফেলে, তাহলে ওদের মাঝে আর কোনো ঝামেলাই থাকে না। আফিমের বাবার অনেক টাকা, তবুও আতিকুর রহমানের মনে হয় আফিমের কাজ করা উচিত। বেকার, ভবঘুরে না থেকে অন্তত খুব কম টাকা হলেও উপার্জন করুক হালাল উপায়ে।


ভোর হয়েছে অনেকক্ষণ ভোরের মৃদু বাতাস শহরটাকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। সূর্যের তেজ ক্ষীণ। আলো স্পষ্ট হয়েছে। আফিম ক্লান্ত হয়ে ফিরেছে বাড়িতে। সারারাত গান-বাজনার পর খাওয়াদাওয়া করেই বাড়ি ফিরেছে সে। আইনমন্ত্রী আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে বিশেষ ভাবে খাতির করেছে, একটি বন্দুক উপহার দিয়েছে। একসাথে কেক কেটেছে আফিমের সাথে। এটা আফিমের বিরাট এচিভমেন্ট। তার সিনিয়র অনেকেই আছে যারা বড়সড় অপারেশন সাকসেসফুল করতে পারেনি, এভাবে মন্ত্রীদের সাথে মুখোমুখি পায়ের উপর পা তুলে বসতে পারেনি। আফিম তা পেরেছে, তার উপর সবাই ভরসা করে। টিম লিডার হিসেবে তার সুনাম অনেক।

ঘরে ঢুকে মৃত্তিকাকে না পেয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলে ছেলেটা। সে জানে মৃত্তিকা প্রচণ্ড রেগে আছে। তার রাগ ভাঙানোটা খুব জটিল। তবে কোথায় সে? আফিম বেলকনি, ছাদ, কিচেন সব জায়গায় খুঁজে মৃত্তিকাকে পায় না। ললাটে ভাজ পড়ে ছেলেটার। উচ্চস্বরে ডাকে,

“- মৃত্তওওওওও, অ্যাই মৃত্তওওওওও”।

মৃত্তিকা ডাকে সাড়া দেয় না ঠিকই তবে আফিমের চেঁচামিচিতে আশরাপ মির্জা আসেন। তার পরনে ব্লেজার। এখনই ব্যবসার কাজে ছুটে যাবেন তিনি। যাবার আগে ছেলেকে দেখে বললেন,

“- মৃত্তিকা চলে গেছে, ঘরে একটি চিঠি রেখে গেছে। পড়ে নাও, চেঁচিও না। মাস্তানি বাইরে গিয়ে করবে, এটা ভদ্রলোকের বাড়ি”।

আফিম বিরক্ত হয়। বলে,
“- বাপরে, মেজাজ এত হিট কেন জনাব?”

“- তুমি ঠাট্টা করো আমার সাথে? সারা রাত ঘরে ফেরার ইচ্ছে হয়নি তোমার? মেয়েটা কেক বানিয়ে, ঘর সাজিয়ে তোমার জন্য অপেক্ষা করছিল, আর তুমি কি করলে? কলটাও ধরলে না, বাড়ি ফেরা তো দূরের কথা”।

আফিম আশ্চর্যান্বিত কণ্ঠে বলে,
“- আমাকে তো বলেনি? ওর সামনে দিয়ে গেলাম, কই বলল না তো? আমি কি জানি আপনারা এতসব প্ল্যান করে রেখেছেন”?

“- গর্দভ ছেলে কোথাকার। যার জন্মদিন তাকে জানিয়ে জানিয়ে সারপ্রাইজ দেবে? বলেছিল না তাড়াতাড়ি ফিরতে”?

কোমরে দু হাত চেপে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আফিম। ছুটে যায় ঘরের দিকে। টেবিলের উপর নীল কাগজের খামটি তুলে নেয় সে। মৃত্তিকার হাতের লেখা সুন্দর। গোটা গোটা অক্ষর গুলোতে নিদারুণ হাহাকার মিশে আছে। চোখের পানিতে কালি লেপ্টে গেছে। লিখেছে,

আফিম,

কোথায় আছেন, কি করছেন জানি না। আমি বসে আছি। কাঁদছি মুখ বুজে। আগে আমার এত কান্না পেত না। সব সয়ে নিতাম আমি। আজকাল বড্ড ন্যাকা হয়ে গিয়েছি। ছোট ছোট সাধারণ বিষয়গুলোতেও মাত্রাতিরিক্ত মন খারাপ হয়। সহজে আপনার পরিবর্তন মেনে নিতে পারি না। আজ আপনার জন্য বিশেষ একটা দিন। চেয়েছিলাম দিনটাকে আরো সুন্দর ভাবে আপনার সামনে উপস্থাপন করতে। অথচ আপনি বাড়ি ফিরলেন না, সাজগোছ করে বসে থাকা রমনীর দিকে ফিরেও তাকালেন না। আমার পরিশ্রম, আমার অপেক্ষা সব বৃথা গেল। আপনার ঘরে বন্দুক পেয়েছি। খুব ভয় হচ্ছে আমার। আচ্ছা, আপনি কি খুন-খারাবিও করতে চান? অস্ত্রটা কেন লুকিয়ে রেখেছেন? আমার হাত-পা কাঁপছে বিশ্বাস করুন।

আফিম, আফিম, আফিম আপনি সাধারণ হলেন না কেন? আমায় বুঝলেন না কেন? আমি থাকতে চাই না আপনার সাথে। আর কোনোদিন আপনার কাছে পাবেন না আমায়। তখন আফসোস করবেন? নাকি পাগলামি? আমি সত্যিই আর ফিরবো না। দয়া করে আমায় জোর করবেন না। আমাকে একা বাঁচতে দিন।

ইতি,

মৃত্তওওও।

চিঠিটা পড়ে মন খারাপ হওয়ার পরিবর্তে আফিমের রাগ বাড়ে। ক্রোধে চিঠিটা ছুঁড়ে মারে ডাস্ট বক্সে। মেয়েটার সাহস কত বড়, কথায় কথায় বাপের বাড়ি যাওয়া কোন ধরণের সভ্যতা? আবার বলছে তাকে কাছে পাবো না? চটকানা মেরে গাল দুটো লাল করে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে আফিমের। সে দ্রুত বেরিয়ে আসে বাইরে। বাইকের তেল শেষ। বাড়ির গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সে। খুব দ্রুড গতিতে মৃত্তিকার বাড়ির সামনে এসে পৌঁছায় আফিম। ঝড়ের বেগে ক্ষীপ্র গতিতে সিঁড়ি বেয়ে দু তলায় ওঠে সে। কলিং বেল বাজলে মনোয়ারা দরজা খোলে। আফিমকে দেখে খুব একটা অবাক হয় না সে। বলে,

“- এসো, বাবা। “

আফিম ব্যগ্র হয়ে ঘরে ঢোকে। জিজ্ঞেস করে,

“- মৃত্তিকা কোথায়”?

“- ঘুমোচ্ছে, আমি ডেকে দিচ্ছি”।

আফিম তড়িঘড়ি করে বলে,
“- ডাকার দরকার নেই, আমিই যাচ্ছি”।

“- তোমার জন্য ভাত বাড়বো”?

“- না আন্টি, মৃত্তিকার সাথে ঘুমোই? সারারাত ঘুমোইনি”।

দাঁড়ায় না আফিম চট করে মৃত্তিকার রুমে ঢুকে পড়ে অনুমতি না নিয়েই। মৃত্তিকা ঘুমোচ্ছে। সিল্কের শাড়ি পায়ের নিচ থেকে কিছুরা উপরে উঠে গেছে। আঁচলটাও ঠিক জায়গায় নেই। এলোমেলো চুল গুলো মুখের উপর উড়ে বেড়াচ্ছে বাতাসের দাপটে। আফিম ঝড়ের বেগে মৃত্তিকার উপর সম্পূর ভর দিয়ে শুয়ে পড়ে। তার দানবীয় দেহের ভারে মৃত্তিকার শ্বাস আটকে আসে তখনই। ঘুম ভেঙে যায় সঙ্গে সঙ্গে। ঘুমের মাঝেও সে বুঝতে পারে আফিম এসেছে। তার উপস্থিতি মৃত্তিকার হৃদয়ে আলোড়ন তোলে। বিরক্ত হয়ে মৃত্তিকা বলে,

“- সরুন, আফিম”।

আফিম ক্রোধ মেশানো কণ্ঠে বলে,

“- কেন? বুকে পিষে মেরে ফেলি?”

তার হিংস্র কণ্ঠে মৃত্তিকার চেতনা ফেরে। চোখ মেলে তাকায় সে। আফিমের ওজন অনেক বেশি। দম বেরিয়ে আসে মৃত্তিকার। আফিম মৃত্তিকার মুখের উপর থেকে চুল সরিয়ে দেয়। বলে,

“- এত সাহস তোর মৃত্ত? কি লিখেছিস? আর আসবি না আমার কাছে? থাকবি না আমার সাথে? আবার বল তো, চোখে চোখ রেখে বল”।

মৃত্তিকা ঘাবড়ায় না সহজে। চোখ পাকিয়ে বলে,

“- বলবো, একশো একবার বলবো, হাজার বার বলবো। আপনাকে আমি ভয় পাই ভেবেছেন”?

“- পাস না”?

“- একদমই না”।

“- কথায় কথায় বাপের বাড়ি আসিস কেন? রাগ, অভিমান সব ওই বাড়িতে থেকে করবি। বাড়ি ফেরার পর তোকে পাইনি কেন? সাহস বাড়ছে? দেবো গাল দুটো লাল করে? বল?”

“- হাত তুলবেন গায়ে, তুলুন। আমি আমার সিদ্ধান্ত বদলাবো না”।

“- একদম জানে মেরে দেবো। কত বড় সাহস আফিম মির্জাকে রিজেক্ট করিস। আমি তোকে নিয়েই ফিরবো। জেদ করবি না একদম”।

“- জেদ আপনার থাকলে আমারও আছে”।

আফিম মৃত্তিকার থুতনি চেপে ধরে বুড়ো আঙুলে। আঙুলের চাপ প্রয়োগ করে সেথায়। একটু চাপেই মেয়েটার থুতনি রক্তিম রং ধারণ করে।

“- পা ভেঙে কাছে রেখে দেবো”।

“- জোর জবরদস্তি ছাড়া আর কিছু পারেন”?

“- পারি কিনা দেখবি?”

মৃত্তিকা মুখ ফিরিয়ে নেয়। চোখে জল জমে মেয়েটার। আফিম ত্যক্ত স্বরে খুব ধমকে বলে ওঠে,

“- শুধু শুধু কাঁদবি কেন? আয় মেরে কাঁদাই, তোর কান্না আমার সহ্য হচ্ছে না। বুকে পিষে হাড়-গোড় ভেঙে ইচ্ছে করছে”।

আফিমের ধমকে মৃত্তিকার ছল ছল চোখ জোড়া বুজে নেয়। দ্রিমদ্রিম শব্দ হয় বুকের বা পাশে। আফিম এবার শীতল কণ্ঠে বলে,

“- আচ্ছা, কাছে আয়, ভালোবেসে কাঁদাই”।

মৃত্তিকার সর্বাঙ্গ ছলকে ওঠে। কান ঝা ঝা করে ওঠে। আফিমের বুকে হাত রেখে তাকে সরিয়ে বলে,

“- এসব কি কথা? এ ধরণের কথা কেউ কাউকে বলে? ছিঃ”।

“- আমাকে ভালো থাকতে দিচ্ছিস কই”?

“- ভালো থাকবেন না কেন? আমি না থাকলেই আপনি স্বাধীন। সারারাত বাড়ি না ফিরলেও কেউ আপনাকে প্রশ্ন করে জ্বালাবে না”।

মৃত্তিকার নাকে নাক ঘষে আফিম। বলে,
“- আমি তো আমার আগুন সুন্দরীর রূপে পুড়ে ছাই হতে চাই, জ্বলতে চাই প্রণয় দহনে”।

মৃত্তিকা উঠে বসে আফিমকে ঠেলে। পালাতে গিয়ে শাড়ির আঁচলে টান পড়ে। কঠিন কণ্ঠে মৃত্তিকা বলে ওঠে,

“- আপনি চলে যান। আমি ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেবো”।

আফিমের চোখের শিরা গুলো লাল হতে শুরু করেছে। ক্রোধে কাঁপছে সে। ঘাড় আর কপালের রগ ফুলে উঠেছে। একটানে মৃত্তিকাকে ছুঁড়ে ফেলে বিছানায়। মৃদু চিৎকার করে ওঠে মৃত্তিকা। আফিম বেহিসেবী কণ্ঠে মারাত্মক গর্জন করে বলে,

“- কি বললি? আবার বল, স্পিক আপ। একদম জ্যান্ত পুঁতে দেবো মৃত্ত। ভালোবাসি ভালো লাগে না, না? বকছি না, মারছি না, সাহস এতটাই বেড়েছে যে ডিভোর্স অব্দি ভেবে বসে আছিস। বাড়ি চল, তোকে আজ আমি কি করবো মৃত্ত, তুই ভাবতেও পারছিস না”।

শরীর হীম হয়ে আসে মৃত্তিকার। ভীত কণ্ঠে বলে,
“- কি করবেন? তুই তোকারি করবেন না। খারাপ হয়ে যাবে কিন্তু”।

“- কি খারাপ হবে? বল? দেখি কে কার কত খারাপ করতে পারে। আয়, দেখি”।

“- আপনি কিন্তু অভদ্রতা করছেন”।

“- তুই কি করলি? কি বললি একটু আগে? খোদার কসম, ভালোবাসি বলে। নইলে জিভ কেটে ফেলতাম এখনই”।

আফিমের ঠাণ্ডা মাথার কড়া হুমকিতে ভয়ে সংকুচিত হয় মৃত্তিকা। আফিম ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলে,

“- বাড়ি চল, ঘর ফাঁকা লাগে”।

মৃত্তিকা নিচু কণ্ঠে বুকে চিবুক ঠেকিয়ে বলে,
“- আমি একেবারের জন্য এসেছি”।

“- শুনতে পাইনি, আবার বল”।

সাহস হয় না মৃত্তিকার। চুপ করে থাকে সে। আফিম ক্রোধটুকু গিলে বলে,

“- আমি রাতে বাড়ি ফিরিনি এজন্য এত রাগ করেছো? জন্মের দিন কি ফুরিয়ে গেছে? আমরা কেক কাটবো, চলো”।

মৃত্তিকা উত্তর দেয় না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে নিঃশব্দে কাঁদে। আফিমের হৃদয় গলে। প্রেয়সীর কান্নার চোটে শরীর দোলার তিতকুটে দৃশ্য খুব চোখে লাগে। বলে,

“- আচ্ছা, আমি আর বাইরে রাত কাটাবো না। তোমার সাথে থাকবো। আর ওই বন্দুক? ওটা আমার না তো বোকা। ওটা কোনো একজন পুলিশের। হারিয়ে গেছে, আমি খুঁজে পেয়েছি। ফেরত পাঠাতে হবে”।

মৃত্তিকা ভিতু কণ্ঠে বলে,
“- আপনি বলুন আপনি ভালো হয়ে যাবেন। মারপিট করবেন না আর”।

আফিম চোখ ছোট ছোট করে ফেলে। বলে,
“- অ্যাই এত বড় শর্ত দাও কেন? ছোট শর্ত দাও”।

‘- আপনি কথা দিন কাজ করবেন”।

“ ধ্যাত, যাবে না বলে এ ধরনের শর্ত রাখছো। তুমি কি ভেবেছো তুমি না যেতে চাইলে আমি তোমাকে এখানে রেখে যাবো”?

মৃত্তিকা দরজার কাছে আসে। আফিম দরজাটা আটকে এসেছে। সে দরজা খুলে দিয়ে বলে,

“- বাড়ির সবাইকে যদি রাজি করাতে পারেন, তবেই যাবো”।

আফিম মাথার চুল টেনে বলে,
“- ওরা আমার কি হয়? ওদের রাজি করাতে যাবো কোন দুঃখে? আমার বউ তুই, বিয়ে করেছি তোকে। মেরে, ভালোবেসে তোকে মানাবো। ওরা কোন চ্যাটের বা*ল”।

মৃত্তিকা মুখ কুঁচকে বলে,
“- ছিঃ, ভাষা এত জঘন্য আপনার। কথা বলতেও রুচিতে বাঁধে আমার”।

মৃত্তিকা বেরিয়ে আসে বাইরে। আতিকুর রহমান বসে ছিলেন। মৃত্তিকা আর আফিমকে একত্রে দেখে তিনি গম্ভীর হলেন খানিক। আফিম আতিকুর রহমানকে বলে,

“- আপনার মেয়েকে নিয়ে যেতে এসেছি”।

মৃত্তিকার বাবা বলে,
“- ও যদি যেতে চায় নিয়ে যাও, না যেতে চাইলে দাপট দেখিও না”।

মৃত্তিকা বলে ওঠে,
“- আমি যাবো না। ও ভালো হয়ে যাবে, কটা দিন কাজ-বাজ করবে, তারপর আমি নিজেই ফিরে যাবো। ওকে আসতে হবে না আমাকে নিতে”।

আতিকুর রহমান স্পষ্ট সুরে বলেন,
“- মৃত্তিকাকে যেতে দেবো না। ভালো হও, মৃত্তিকা ফিরে যাবে। এরকম ছন্নছাড়া জীবনে ওকে জড়িও না”।

আফিম রাগ সংবরণ করে বলে,
“- তোমারও এটাই মত? শেষ সিদ্ধান্ত”?

মৃত্তিকার গা দুলে ওঠে। আব্বু তাকে কোনোমতেই যেতে দেবে না। সেও চায় না আর ফিরে যেতে। আফিম যদি সত্যিই ওকে ভালোবাসে তাহলে নিজেকে শোধরানোর চেষ্টা করবে। এরকম আঘাত না পেলে আফিম শোধরাবে না। এ ধরণের কঠিন সিদ্ধান্তই পারে আফিমকে ঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে। ভালোবেসে মানুষ মরতেও পারে, সেখানে আফিম কী পারবে না নিজের মন্দ অভ্যাস গুলো ত্যাগ করতে? বুকে পাথর চেপে মৃত্তিকা বলে,

“- চলে যান আফিম। আমি যাবো না”।

আফিম হতাশ চোখে তাকায় মৃত্তিকার পানে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“- ঠিক আছে, চলে যাচ্ছি”।

আফিম পা বাড়ায়। দরজা পেরিয়ে সিড়ি বেয়ে চলে যাওয়ার শব্দ শোনা যায়। মৃত্তিকা ভাবতেও পারেনি আফিম এত দ্রুত হার মেনে নেবে। কোনোরকম দাপট ও ক্ষমতার অপব্যবহার না করে চলে যাবে। মৃত্তিকা সময় ব্যয় না করে তড়িঘড়ি করে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দেয়। বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে নিচে তাকায়। আফিম যাচ্ছে। লোকটার পরণে সাদা ফর্মাল শার্ট আর কালো প্যান্ট। শার্টের হাতা গুটিয়ে রেখেছে কনুইয়ে। কি মনে করে সে ফিরে তাকায় মৃত্তিকাদের তিনতলা বাড়ির দিকে। চোখ ঘুরিয়ে মৃত্তিকার বেলকনিতে নজর ফেলে। ধরা পড়ে যায় মৃত্তিকা। তাকে দেখে মৃদু হাসে আফিম। মেয়েটার বুক ফাটে তবু মুখ ফোটে না। ঠিকই লুকিয়ে দেখছে আফিমকে। আফিম দু পকেটে হাত গুঁজে উচ্চস্বরে হেলেদুলে গেয়ে ওঠে,

"পাখি ক্যামনেএএএ আসে, যায়?

“তারে ধরতে পারলে মনো বেড়ি, ধওওরতে পারলে মনো বেড়ি, দিতাম, পাখির পাআআআআআয়।

“ক্যামনে আসে যায়? খাঁচার ভিতর অচিন, পাখি ক্যামনে আসে যায়।”

চলবে?
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি_শেখ

নোটঃ হাসপাতাল থেকে সবে এসেছি। এতটুকুই লিখেছিলাম দিনে। রিয়্যাক্ট ১ টা দেয়া গেলেও মন্তব্য অনেক করা যায়। আপনারা ২০০+ মন্তব্য রাখবেন আজ।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply