ওরামনেরগোপনচেনেনা
পর্ব সংখ্যা [৯]
সূর্য তেজ ছড়াচ্ছে। হাওয়াও বইছে দৃঢ় ভাবে। রুক্ষ হয়ে আছে ধরণী। কাজের সন্ধানে পাখিরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। অদূরের আকাশে ঝাঁক ঝাক কাক উড়ে বেড়াচ্ছে, শিকার পেয়ে গেছে বোধহয়। বর্ষা পেরিয়ে শরৎ আসতে চলেছে। মাঠে মাঠে কাশফুল সফেদ রঙে মুড়ে যাচ্ছে। নিছক অবহেলায় গাছের নিচে পরে আছে শুকনো, বর্বর পাতা। মৃত্তিকার ধারণা সে এখন ওই পাতার মতোই। সামান্য হাওয়াতেই মুখ থুবড়ে পরে যায় সে। ওই খরখরে পাতার মতোই অপ্রয়োজনীয়, কদর্য মানবী সে। যার জীবনে প্রত্যাশা বলে কিছুই নেই।
আজকে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়েছে মৃত্তিকার। রাতে চট করে ঘুম আসেনি। আফিমের কথাগুলো মস্তিষ্কে গেঁথে গেছে একদম। অপ্রত্যাশিত আশঙ্কায় বুক কাঁপছে রীতিমতো। মৃত্তিকা নাদান নয়। তার বয়শ বিশ পেরিয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক নারী সে। কোন পুরুষের চাহনি কেমন, তা বুঝতে বেগ পেতে হয় না। নারীর ষষ্ঠ ইন্দ্রীয় প্রায়সই জানান দেয় তার পরিপক্বতার পরিধি। তাছাড়া আফিম কালকে ইনিয়েবিনিয়ে কিছু বলেনি, যা বলেছে সরাসরি, সংক্ষিপ্ত ভাবে বলেছে। “ধন্যবাদ দিতে আসিনি, ভালোবাসা দিতে এসেছি। গ্রহন করবে”? এই বাক্যটুকু মন থেকে যাচ্ছেই না। বুঝতে একটুও অসুবিধে হচ্ছে না আফিম তাকে পছন্দ করে। ঠিক কেমন পছন্দ তা যদিও বোঝা বাকি মৃত্তিকার। কারণ প্রথম থেকে আফিম তার সাথে ভালো করে কথা বলেনি। ছেলেটা তার বখাটেপনা দেখিয়েছে মৃত্তিকাকে। তবে গতকাল যা বলল, তা কি ফেলে দেবার মতো?
মৃত্তিকা সকালে যাকে পড়ায় তার আজ স্কুল অফ। তাই দশটার দিতে তাকে যেতে বলেছে। মৃত্তিকা ঘুম থেকে উঠেছে আটটার পরে। প্রতিদিন ছটা বাজলেই ঘুম ভাঙে। তাড়াহুড়ো করে রান্না করে মেহমেতের লাঞ্চ প্যাকিং করে দেয় সে। ইরহামের জন্য ঝোল করে, মশলাপাতি কম দিয়ে নুডলস রান্না করে। ঘুম ভেঙে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে দেখে মেহমেত নেই। আব্বুও দোকানে চলে গেছে না খেয়ে। জাহানারা আর ইরহাম বিছানায় পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। মেহমেত চলে গেলে জাহানারা ঘুমায়। মৃত্তিকার মনটা খারাপ হয়ে গেল। আব্বু না খেয়ে চলে গেল, দুপুরে ফিরবে কিনা কে জানে? দোকানের পাশের হোটেল থেকে পরোটা কিনে খাবে হয়তো। তাতে কি আর মন ভরবে?
মৃত্তিকা রান্নাঘরের পাশে রাখা ফ্রিজ খোলার চেষ্টা করে। দুবার টেনে টেনে ফ্রিজের ডোর খুলতে না পেরে দেখে ফ্রিজ লকড করা। অবাক হয় মেয়েটা। বারো বছর ধরে এই ফ্রিজটা তাদের বাড়িতে আছে। কখনো তো লক করা হয়নি। আজ হঠাৎ ফ্রিজে তালা কে মেরে দিল? সবজি গুলো সব ফ্রিজেই রাখা। মৃত্তিকা হেলেদুলে যায় মায়ের ঘরে। মৃত্তিকার মা কাঁথা সেলাই করছেন। অসুস্থতায় নুইয়ে গেছেন তিনি। বয়সটা আজকাল খুব বেশি মনে হয়। মৃত্তিকা দরজা ঠেলে দাঁড়িয়ে থেকে বলে,
“- ও মা, ফ্রিজ লক করেছো কেন?”
ভ্রু কুঁচকে তাকালেন মৃত্তিকার মা। বললেন,
“- কি বলিস? ফ্রিজ তালা মারা থাকবে কেন”?
“- আমি তো দেখলাম লক করা। ডিম বের করবো, পারছি না”।
মৃত্তিকার মা কি যেন ভাবে। পরক্ষণে তাচ্ছিল্য করে হেসে বলে,
“- জাহানারার মা জাহানারার জন্য অনেক ফল, মিষ্টি, দই, আচার পাঠিয়েছে। বোধহয় সেজন্যে ফ্রিজে তালা মেরেছে”।
মৃত্তিকা বিরক্ত সুরে বলে,
“- রেখেছে তো কি হয়েছে? ফ্রিজ লক করে রাখবে কেন”?
মৃত্তিকার মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“- তোর আব্বু, তুই, কিংবা আমি যদি ফলমূল খেয়ে ফেলি, সে ভয়ে তালা মেরেছে”।
মৃত্তিকা বিস্মিত হয় না মোটেই। জাহানারা আজকাল বাড়াবাড়ি করছে। তার দ্বারা সবই সম্ভব এখন। সে বাপের বাড়ি থেকে খাবার এনেছে ভালো কথা, সেজন্য ফ্রিজে তালা মারতে হবে? বুড়ো-বুড়ি কতই বা খাবে? খেলেও ক্ষতি কি? মৃত্তিকার আব্বু যখনই বাড়তি কিছু আনে, ইরহাম আর জাহানারাকে আগে তা ভাগ করে দেয়। যেন জাহানারার মনে না হয় সে এ বাড়ির বউ। সে যেন নিজেকে এ বাড়ির মেয়ের মতো করে ভাবে, সেজন্য সব রকম সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় জাহানারাকে। এইযে এতদিন ধরে জাহানারা কোনো কাজবাজই করে না, মৃত্তিকাকে সব একা হাতে গোছাতে হয়, মৃত্তিকার বাবা কিছুই বলেন না জাহানারাকে। বরং মৃত্তিকাকেই বলে জাহানারার পাশে থাকতে, তার যত্ন নিতে। এত ভালো শ্বশুর-শাশুড়ি পেয়ে জাহানারা কি করে এমন অবিবেচকের মতো কাজ করে? ফ্রিজ লক করে চাবি নিজের কাছে রাখতে একটুও হীনম্মন্যতায় ভুগল না ভাবি? ভাবল না বয়স্ক মানুষ গুলোর কথা? একটু মিষ্টি, দই হাতে তুলে দিলে কি ক্ষতি? বুঝতে পারে না মৃত্তিকা।
ভেবেছিল ডিম রান্না করবে, তা হলো না। মৃত্তিকার রুচি উঠে গিয়েছে জাহানারাকে কিছু বলার। রাগে মৃত্তিকা রান্নাই করল না। গোসল করে তৈরি হতে লাগল টিউশনে যাবার জন্য। ওয়ারড্রবে একটা কালো থ্রিপিস আছে মৃত্তিকার। স্টোনের কাজ করা কালো রঙের পোশাকটিতে মৃত্তিকাকে মানায় ভালো। ফিটফাট হয়ে গায়ে লেগে থাকে জামাটা। তবে মৃত্তিকা সচরাচর ঢিলেঢালা পোয়াশই পরে। আজকে সে অন্য ভাবে নিজেকে পরিপাটি করল। ফিটিং থ্রি পিসটা গায়ে জড়ালো। চুলগুলো মাঝ বরাবর সিঁথি করে নিল, হাতে ঘড়ি পরল। তবে মাথায় ওড়না দিল না। শালীনভাবে বুকে ওড়নাটা জড়িয়ে নিল। ব্যাগে নোটস ঢুকিয়ে মাকে জানিয়ে বেরিয়ে পরল বাইরে।
মৃত্তিকাদের বাড়ির বাইরেই চিকন রাস্তা। কিছু পথ হাঁটলে চওড়া রাস্তা। রাস্তার ধারে দোকানপাটের অভাব নেই। আফিম বখাটে ছেলে। তাকে প্রায় সব খানেই পাওয়া যায়। আচমকা গলির ভেতর থেকে হাজির হয়ে যায় ছেলেটা। গতকালকের পর আফিমের পরিচয় অনেকের কাছে বদলেছে। তার প্রশংসা চলছে এলাকার অলিগলিতে। সবার মুখে কেবল আফিমের নাম। কেউ কি ভেবেছিল বখাটে, ভবঘুরে, অবাধ্য বেকার ছেলেটা কারো সাহায্যে জীবন দিতে দ্বিধা করবে না? কেউ কি ভেবেছিল আফিমের মতো ছেলে ন্যায়ের জন্য নিজের দলবলকে নিয়ে ছুটবে? তাকে তো সবাই খারাপ বলেই জানে, মাস্তান বলেই চেনে ওকে সকলে।
মৃত্তিকা যা নিয়ে ভয় পাচ্ছিল, তাই হলো। আফিম চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছে বন্ধুদের সাথে। তার পিঠ দেখেই মৃত্তিকা চিনে ফেলে। ডেনিমের একটি শার্ট তার পরনে, গলায় চেইন, হাতে ঘড়ি আর কি যেন বাঁধা। দানবীয় দেহটা স্থির হয়ে আছে। সৌষ্ঠব দেহ ক্ষণে ক্ষণে বিলম্বিত হয়ে হেলে যাচ্ছে। মৃত্তিকার ভয় হয় ভীষণ। আফিম তাকে দেখে ফেলার আগেই মৃত্তিকা সরে আসতে চায়। পা বাড়িয়ে অন্য রাস্তা ধরে। তখনই আফিম পিছু ফেরে। তার সবুজাভ তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি মৃত্তিকার দিকে পরতেই চিত্ত চনমনে হয়ে ওঠে। পুলকিত হয় নয়ন। আবেশে চোখ বুজে পরপর চোখ মেলে ডাকে,
“- মৃত্ত, অ্যাই মেয়ে”।
আফিমের পুরুষালি কণ্ঠ কর্ণকুহরে পৌঁছানো মাত্র মৃত্তিকা ঘাবড়ে যায়। আতঙ্কে বুক ফুলে ওঠে। ছেলেটাকে আজ তার একটু বেশিই ভয় লাগছে। দুদিন আগেও যার চোখে চোখ রেখে আক্রমণাত্মক কথা ছুঁড়ে দিয়েছিল, সেই ছেলেটাকে দেখে আজ মৃত্তিকার ভয়ে শরীর কেঁপে উঠছে। ব্যক্তিসত্তা প্রবল ভাবে আন্দোলনে নেমেছে। মৃত্তিকা একবার চোখ ফেরায়। পরক্ষণে ভয়ে, আতঙ্কে দিগবিদিক ভুলে অন্য পথে ছুটতে আরম্ভ করে। আফিমের সামনে যেতে চায় না কোনোভাবে। মৃত্তিকার অস্বাভাবিক আচরণে আফিম ভড়কে যায় কিছুটা। মেয়েটার কোনো বিপদ হয়েছে কিনা ভেবে সে উঠে দাঁড়ায়। মৃত্তিকার পিছু নেয় আফিম। মৃত্তিকার চেয়েও দ্রুত, দক্ষ ভঙ্গিতে দৌড়ে যায় পিছনে। মৃত্তিকার ভয়ে গা অসাড় হয়ে আসে। ছুটতে ছুটতে পিছু ফিরে আফিমকে কাছে আসতে দেখে মৃত্তিকার দম বেরিয়ে আসে। দৌড়াতে গিয়ে সহসা ইটের টুকরো অংশে পা বিঁধে যায় মৃত্তিকার। কোলাহল পূর্ণ বড় রাস্তার ফুটপাতে মুখ থুবড়ে পরে যায় মেয়েটা। তার চিবুক ঠেকে যায় রাস্তার ধুলো ও ইটের কণার মিশ্রণে। ছোট্ট কাঁচের দণ্ড ঢুকে যায় চিবুকের মাংসের স্তরে। ব্যথায় ককিয়ে ওঠে মেয়েটা। আফিম স্তব্ধ বনে যায়। শকুনের মতো, তেজী ঘোড়ার দ্রুত ছুটে এসে নিজের শিকারকে তুলে নেয় বাহুডোরে। তার এহেন কাণ্ডে ধরফর করে ওঠে মৃত্তিকা। সব ব্যথা ভুলে হাঁপিয়ে ওঠা কণ্ঠে বলে,
“- আমাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করবেন না আফিম। জানে মেরে দেবো”।
থ বনে যায় আফিম। কি ভেবে ফিক করে হেসে বলে,
“- একটু আগেই ভয় পাচ্ছিলে, এখন বাঘিনীর মতো গর্জন করছো”?
মৃত্তিকা আফিমের বাহুডোর থেকে ছাড়া পেতে মরিয়া হয়ে উঠল। মৃত্তিকাকে পরে যেতে দেখে পথচারীরা এগিয়ে এসেছে। গোল হয়ে জটলা বেঁধে ওরা দেখছে মৃত্তিকার দিকে। মৃত্তিকার পরনের সালোয়ার সরে গোড়ালির উপরের ধবধবে পায়ের অংশ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। লজ্জায় মরিমরি অবস্থা হলো মৃত্তিকার। জনসমাগম স্থানে এভাবে পরে যাওয়া ভারি অস্বস্তির। ছোট বাচ্চারা পরে গেলে তাতে কেউ হাসে না, তবে তার মতো যুবতি মেয়েরা এভাবে রাস্তায় পরে গেলে মানুষ তো হাসবেই। মৃত্তিকা লজ্জায় চোখ উপরে তুলতে পারল না। আফিম তার মুখ পানে চেয়ে বিষয়টা ঠাহর করতে পারল। তেজী কণ্ঠে বলে উঠল,
“-, এখানে সার্কাস হচ্ছে না। যে যার কাজে যান, আমি আছি এখানে”।
আফিমকে চেনে সকলে। দাঁড়িয়ে থাকার আর সাহস করে না কেউ। না চাইতেও সকলে বাধ্য হয়ে চলে যায়। আফিম ফোঁস করে শ্বাস টানে। মৃত্তিকার মাথা তার বুকের কাছে। আফিমের পা পরেছে মৃত্তিকার পিঠের কাছে। সংকোচে গা দুলে ওঠে মেয়েটার। শিউড়ে ওঠে নম্র কায়া। ব্যতিব্যস্ত হয়ে সরে আসতেই আফিম ঝাঁঝাল স্বরে বলে,
“- আমায় দেখে পালাচ্ছিলে কেন”?
তীব্র গর্জনে মেয়েটা আঁতকে ওঠে। আফিমের অন্তর্ভেদী চোখ মৃত্তিকার মুখে বিচরণ করছে। হালকা সবুজাভ চোখের মণি দীপ্তি ছড়াচ্ছে। আশ্চর্যজনক সুন্দর আফিমের চোখ। চোখের এ অস্বাভাবিক রঙ লাখে একজনের হয়। মাঝে মাঝে আফিমকে অন্য দেশের মানুষ বলে মনে হয়। তার সুন্দর মুখ দেখে এলাকার ছোট ছোট মেয়েরা আফিম ভাই আফিম ভাই বলে মুখে ফেনা তোলে। অথচ সে খুব সাদামাটা। বাহ্যিক চাকচিক্য নেই, নিজেকে জাহির করার চেষ্টা নেই। নিজ ব্যক্তিত্ব সর্বদা ধরে রাখে।
আফিমের প্রশ্নে ফ্যাকাসে হয়ে আসে মৃত্তিকার নতজানু, কোমল মুখ। আফিমকে ঠেলে সরিয়ে উঠে দাঁড়ায় সে। চুলগুলো পিঠ, কাঁধে লেপ্টে যায় ঘামে। হাত দিয়ে শরীরের ধুলোবালি ঝেরে তির্যক কণ্ঠে বলে,
“- আপনাকে দেখে পালাবো কেন”?
থুতনি জ্বলছে খুব। ইটের টুকরোয় ঘষা খেয়েছে, আবার ছোট্ট কাঁচের কণাও বিঁধে গেছে। রক্ত জমেছে সেথায়। মৃত্তিকা থুতনিতে আঙুল ছোঁয়াতেই ব্যথাতুর স্বরে চেঁচিয়ে ওঠে। চোখের কোণ চিকচিক করে ওঠে। জ্বলে ওঠে চোখের দুই প্রান্ত। বিচলিত হয় আফিম নিজেও। প্রথমবার কোনো নারীর জন্য আফিমের বক্ষ জ্বলে ওঠে। প্রেয়সীর চোখের জল চুষে নিতে ইচ্ছে হয় খুব। কিন্তু তার হাত বাঁধা। তার প্রেয়সী বড়ই নাজুক। ছুঁলেই বুঝি লুটিয়ে পরবে। বিশ্বাস, ভরসা সব উঠিয়ে নেবে তার থেকে। থাকুক না কিছু দুরত্ব।
“- ফার্মেসিতে চলো, ওয়েনমেন্ট নিতে হবে”।
মৃত্তিকা দ্রুত দু পাশে মাথা নেড়ে বলে,
“- আমি টিউশনিতে যাচ্ছি। কিছু একটা ব্যবস্থা করে নেবো”।
ভ্রু কুঁচকে রাগান্বিত কণ্ঠে আফিম বলে ওঠে,
“- চটকানা মেরে গাল লাল করে দেবো। তেজ দেখাও আমাকে? এমন ভাব ধরছো যেন আমাকে চেনই না। কি এমন বলেছি আমি? ভালোবাসা গ্রহণ করতেই তো বলেছি, ভুলভাল কিছু তো বলিনি”।
বিস্ময়ে হা হয়ে যায় মৃত্তিকা। বলে,
“- আপনার এসব ভুল মনে হচ্ছে না”?
গা-ছাড়া ভাবে আফিম উত্তর দেয়,
“- মোটেও না। প্রেমটেম এখন খুব কমন। ঘাবড়ানোর কিছু নেই। দেখা হবে, কথা হবে, মাঝে মাঝে একটু ছোঁয়াছুঁয়ি হবে, এর বেশি তো কিছু না”।
মৃত্তিকার মেরুদণ্ড বেঁকে আসে। ক্রমশ হৃদপিণ্ডর স্বাভাবিক স্পন্দনের গতি বাড়ে। এ ছেলে বলছে কি? ফ্যালফ্যাল করে মৃত্তিকা চেয়ে রয় সম্মুখের বখাটে ছেলের দিকে। চোয়াল শক্ত করে রাখা সুদর্শন ছেলেটি তাকে প্রস্তাব দিচ্ছে? তাও এভাবে?
আফিম পকেট থেকে সফেদ রুমাল বের করে। চার ভাঁজ করে রাখা রুমালটি তৎক্ষনাৎ চেপে ধরে মৃত্তিকার থুতনিতে। চাপ লেগে রক্ত বেরিয়ে সফেদ, শুভ্র রুমালের কিঞ্চিৎ অংশ লাল বর্ণ ধারণ করে। হাস ফাঁস করে মৃত্তিকা। লোকে দেখলে কি বলবে? কি জবাব দেবে সে? আফিমকে প্রত্যাখ্যান করা দরকার। কিন্তু গলা উঁচিয়ে তাকে কিছু বলতেও ভয় হচ্ছে এবার। মৃত্তিকা সরে আসতে চায়। বলে,
“- আমাকে যেতে দিন দয়া করে”।
সাথে সাথে জবাব দেয় আফিম,
“- স্যরি মৃত্ত। আমার দয়া-মায়া কম। তোমাকে এতখানি দয়া করতে পারছি না।”
“- কি চান আপনি”?
“- আপাতত তোমাকে”।
“- তারপর”?
“- তোমার পবিত্র হৃদয়টাকে”।
“- কে বলেছে আমি পবিত্র”?
“- পাশাপাশি নিখুঁত”।
প্রতিবাদ করে ওঠে মৃত্তিকা। বলে,
“- ভুল জানেন, আমার দাগ আছে, কলঙ্ক আছে”।
স্বাভাবিক কণ্ঠে প্রত্যুত্তরে আফিম বলে,
“- আমারও আছে। হয়তো বেশ ভয়ানক, তীব্র। আমার দাগের কাছে তোমার দাগ কিছুই না”।
ফের একটু থেমে আফিম হুংকার ছেড়ে বলে,
“- খবরদার, এ ধরণের ফালতু কথা দ্বিতীয়বার উচ্চারণ করবে না। মৃত্ত পবিত্র, তার চোখ দুটো পবিত্র, তার ঠোঁট, তার দেহ, তার মন, সবকিছুই পবিত্র। সে বড়ই নিষ্পাপ। তাকে কলঙ্কিত করার স্পর্ধা কিংবা ক্ষমতা, কারো নেই। কাউকে দিইনি আমি সেই অধিকার”।
মৃত্তিকার বুকটা হাহাকারে ভরে আসে। ঠোঁট জোড়া তিরতির করে কম্পিত হতে থাকে। আফিমের চোখে ব্যাকুলতা, আকুল আহ্বান। কিন্তু এসব মৃত্তিকাকে আকৃষ্ট করতে পারে না। সে একবার যে ভুল করেছে তা পুনরায় করতে পারবে না। ঠকে যাওয়া মানুষ গুলো সর্বদাই ঠকে। তার আছেই বা কি? দেহখানি ছাড়া? আর বেশি কিছু আছে? চাকচিক্যময় জীবন আছে, আভিজাত্য আছে? আধুনিকতা আছে তার চলনে-বলনে? সে সাধারণ, অতি সাদামাটা। এ ধরণের মানুষ পরিবারেও সুখ পায় না, সাংসারিক জীবনেও সুখের হদিশ পায় না। হুমায়ূন আহমেদ তার বইয়ে লিখেছিলেন যে মেয়ে বাপের বাড়িতে সুখ পায় না, সে মেয়ে স্বামীর ঘরে সুখ পায়। এ কথা আদৌ যৌক্তিক? মৃত্তিকার বিশ্বাস হয় না। সবকিছু মিথ্যে সান্ত্বনা মনে হয়।
আফিম তাড়া দেয়। মৃত্তিকাকে নিয়ে ফার্মেসিতে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করে। মৃত্তিকা নড়ে না পর্যন্ত। আফিমের সাথে কোনো সম্পর্কও রাখতে চায় না সে। কেউ দেখে ফেললে কি ভাববে? মেহমেত ভাই জানলে এক আছাড় দেবে। মৃত্তিকা নারাজ হয়ে বলল,
“- আমি আপনার সাথে কোথাও যাবো না। আপনি আমার থেকে দুরত্ব বজায় রাখবেন”।
আফিম হাসে। ফের হাতের রুমাল চেপে ধরে ক্ষত স্থানে। কোমল, মসৃণ ত্বকে আঙুল লাগে এক
-আধ বার। তীব্র সংকোচে নতজানু হয় মেয়েটা। আফিম পাশের একটি ছোট ফার্নেসিতে টেনে নিয়ে যায় মৃত্তিকাকে। ডক্টরের চেম্বারে বসায় তাকে। দুর্ভাগ্যবশত ডাক্তার যুবক। বয়স ত্রিশের একটু বেশি। তাকে দেখে আফিমের মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে উঠল। বিরক্তিতে গা রি রি করে উঠল। এই লোকটা মৃত্তিকার চিবুক ছোঁবে? মৃত্তিকার পাশাপাশি বসবে? আফিমের মন সায় দিল না। মৃত্তিকাকে ব্যগ্র কণ্ঠে তাড়া দিয়ে বলল,
“- ওঠো, এ ডাক্তার ভালো না”।
ডাক্তার লোকটা পাশে বসে ছিল। আফিমের কথায় সে চমকে বলল,
“- কি বলছেন আপনি? ডাক্তারের সামনে দাঁড়িয়ে ডাক্তারকে বলছেন ডাক্তার ভালো নয়”?
মৃত্তিকা কৌতুহলী হয়ে দেখল আফিমকে। আফিম গা ঝাড়া দিয়ে বিরক্তিতে “চ” সূচক শব্দ করে মুখ দিয়ে। কিছু একটা ভেবে মীমাংসা করে বলে,
“- আচ্ছা, আপনি ওয়েনমেন্টটা দিন। ব্যান্ডএইডটাও দিন, আমি করে দিচ্ছি। আপনার কিছু করা লাগবে না”।
হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল মৃত্তিকা। অপমানিত হলো ডাক্তার শারাফ। ভেংচি দিয়ে রাগান্বিত কণ্ঠে বলল,
“- এত পজিসিভ হলে ডাক্তারের কাছে কেন আসেন? নিজেই ডাক্তার হয়ে যান”।
লোকটার কণ্ঠে তাচ্ছিল্যের সুর ফুটে ওঠে। বোঝা মাত্র রেগে যায় আফিম। জ্বলে ওঠে তার মস্তিষ্ক। হিংস্র হয়ে পরে সে। এগিয়ে গিয়ে আক্রমণ করে ডাক্তারকে। ডাক্তারের শার্টের কলার চেপে ধরে বলিষ্ঠ হাতে। চেঁচিয়ে বলে,
“- আমার বউ, আমি পজিসিভ হবো না তো তুই হবি? পৃথিবীতে কি আর ডাক্তার নাই,যে আমাকে ডাক্তার হতে হবে? মানুষ চিনে কথা বলবি। হাড়-গোড় ভেঙে ডাক্তারি শিক্ষা পাছায় ভরে দেবো”।
আফিমের বিশ্রী গালি গালাজ শুনে তব্দা খায় মৃত্তিকা। কান ঝাঁঝিয়ে ওঠে তার। লজ্জা, অপমান আর অস্বস্তি ঘিরে ধরে মেয়েটাকে। টেনে ধরে সে আফিমের বাহু। উচ্চস্বরে বলে,
“- আপনি যে বখাটে তা জনে জনে বোঝাতে হবে না। চলুন এখান থেকে। আফিম, বাড়াবাড়ি করছেন”।
আফিমের ছাড়ার নাম গন্ধ নেই। খুব রেগে গেছে ছেলেটা। শক্ত-পোক্ত হাতে রোগা-পাতলা ডাক্তারকে শুইয়ে গিয়েছে ডেস্কে। মৃত্তিকার মাথা ধরে ওঠে। আফিমের বাহু মোটা। দু হাতে তা চেপে ধরে মৃত্তিকা। এবার অনুরোধ করে বলে,
“- আমাকে আর হেনস্তা করবেন না প্লিজ। ছেড়ে দিন, উনার তো কোনো দোষ নেই”।
আফিম শুনল। রাগে ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে সে। মৃত্তিকা তাকে নিয়ে তড়িঘড়ি করে কেবিন থেকে বেরিয়ে আসে। আফিমকে টেনে আনতে গিয়ে মৃত্তিকা নিজেও হাঁপিয়ে উঠেছে। আফিমের রাগ কমছে না মোটেই। ছেলেটা এমনই। কথায় কথায় হাত ওঠে ওর, ছ্যাত করে ওঠে ভালো কথা শুনলেও। এরকম মানুষকে নিয়ে কোথায়ও যাওয়া যায়? এর ওর সাথে মারামারি করে মামলা খেয়ে বসবে। মৃত্তিকা রেগে যায় আফিমের এই কাজে। পরক্ষণে রাগান্বিত মুখটির পানে চেয়ে থাকে এক ধ্যানে। আশ্চর্য! মানুষটা এত সুন্দর কেন?, তার সৌন্দর্য কেন কাবু করছে নারী সত্তাকে?
চলবে?
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি_শেখ।
[ খুব ছোট্ট পর্ব। রি-চেইক দেওয়া হয়নি। ভুল ত্রুটি মাপ করবেন।🙂]
Share On:
TAGS: ওরা মনের গোপন চেনে না, বৃষ্টি শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ওরা মনের গোপন চেনে না গল্পের লিংক
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৫
-
ওরা মনের গোপন চেনেনা পর্ব ৬
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৪
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১০
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৭+৮
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১১
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২