Golpo romantic golpo ওরা মনের গোপন চেনে না

ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২৫


ওরামনেরগোপনচেনেনা

পর্ব সংখ্যা [২৫]

ভার্সিটির ক্যাম্পাসটি অত্যাধিক সুন্দর। ক্যাফেটেরিয়ায় ভিড় জমেছে। বাইরের কিছু সংখ্যক মানুষ ক্যাম্পাসে এসে আড্ডায় মেতেছে। এদের আগে কখনো দেখেনি মৃত্তিকা। কৃষ্ণচূড়া গাছটির নিচে এসে দাঁড়িয়েছে সে। ফুল পড়ে জায়গাটা সুন্দর ও উপভোগ্য দেখাচ্ছে। থোকা থোকা লাল ফুল কুড়িয়ে নিতে বসে পড়ে মৃত্তিকা। মুঠোয় করে ফুল গুলো ব্যাগে ভরতেই তার দেখা হয় লতার সাথে। লতা মেয়েটি মৃত্তিকার সহপাঠী। রুবি আর লতার সাথে মৃত্তিকার সম্পর্ক ছিল সবচে ভালো। তবে রুবির মতো করে লতাকে প্রিয় বন্ধু বানাতে পারেনি মৃত্তিকা। লতার সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে ফার্স্ট ইয়ারে। মেয়েটা চমৎকার। তার পুরো নাম কনকলতা। সবাই লতা বলে ডাকে। মৃত্তিকাকে দেখেই এগিয়ে আসে সে। বলে,

“- আজ কি মনে করে ভার্সিটিতে এলি? কতদিন ধরে আসিস না। মেসেজ দিলেও রিপ্লাই করিস না, কল দিলে ধরিস না”।

মৃত্তিকার ফোন ভেঙে ফেলেছে আফিম। বলেছিল কিনে দেবে, মৃত্তিকাই এটা নিয়ে আর কথা বাড়ায়নি। আফিমও হয়তো ভুলে গেছে। কারো সাথে যোগাযোগ হয় না তেমন। পরিবার কী তা ভুলেই বসেছে মৃত্তিকা। বাবার আদর পাওয়া হয় না, মায়ের শাসন শুনতে পায় না। জীবনটা একঘেয়ে লাগে। হেসে সে বলে,

“- ফোনটা নষ্ট হয়ে গেছে”।

হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যায় দুজন। লতা বলে,
“- রুবি বলল তুই নাকি বিয়ে করেছিস”?

রুবির নামটা শুনে মৃত্তিকার মন ভাঙে। তার রাগটা ধরতে পেরে লতা বলল,
“- ওর সাথে কথা বলি না আমি। ও যেচে নক দেয় আমাকে। ব্লক করে রেখেছি। এমন প্রতারকের জায়গা অন্তত আমার কাছে নেই”।

“- পরে একদিন সব বলবো।”

মৃত্তিকা আর লতা ক্লাস শেষ করে দুজন ক্যাফেটেরিয়ায় বসে। লতার সাথে পড়াশোনা নিয়ে কিছুক্ষণ আলোচনা করে মৃত্তিকা বেরিয়ে আসে ক্যাম্পাস থেকে। টানা তিন ঘন্টা ক্লাস করে সে ক্লান্ত ভীষণ। শরীর চলছে না। পানির পিপাসা পেয়েছে। দুর্বল পায়ে হাঁটতে গিয়ে আজ জুতোর তলা খসে যায় মৃত্তিকার। বিরক্তিতে গা রি রি করে ওঠে। একটানে দু পায়ের জুতো খুলে ছুঁড়ে মারে রাস্তায়। খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে কিছুটা রাস্তা চলে আসার পর মৃত্তিকার মনে হয় তার পিছু পিছু কেউ আসছে। জুতোর খসখস আওয়াজ পেয়ে সে পিছু ফিরতেই ইয়াসিনকে দেখতে পায়। ফর্মাল শার্ট-প্যান্ট পড়ে দাঁড়িয়ে আছে ইয়াসিন। চুলগুলো বড় হয়েছে, দাড়িও গজিয়েছে। মৃত্তিকাকে নিজের দিকে ফিরতে দেখেই ইয়াসিন দুরত্ব কমিয়ে কাছে এসে দাঁড়ায়। কঠোর ভঙ্গিতে দাঁড়ায় মৃত্তিকা। ইয়াসিন বলে ওঠে,

“- তোমার সাথে আমার কথা আছে মৃত্তি”।

মৃত্তিকা শান্ত স্বরে বলে,
“- আমার আপনার সাথে কোনো কথা নেই
আগেও বলেছি এখনও বলছি আমার থেকে দূরে থাকুন।”

ইয়াসিন শোনে না। ছেলেটা চোখ ছলছল করে ওঠে। অসহায় কণ্ঠে বলে,

“- আজই শেষ, এরপর আর কখনো তোমাকে বিরক্ত করবো না”।

মৃত্তিকাও জেদ বজায় রেখে বলে,
“- আপনার সাথে কথা বলতে আমার রুচিতে বাঁধে। আমি যাচ্ছি, পিছু নিলে আমি চিৎকার করবো।”

“- আর কখনো তোমার সামনে আসবো না। শেষবারের মতো একটু কথা বলো আমার সাথে”।

“- কেন? রুবি কোথায়? স্ত্রী থাকতেও অন্য মেয়ের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে কেন? আপনি মানসিক ভাবে অসুস্থ বুঝেছেন? চিকিৎসা নিন। পশু হয়ে গেছেন তো। বিবেকটাও মরে গেছে”।

ইয়াসিন মলিন হাসে। বিষাদে ছেয়ে যায় তার দেহ-মন। আলতো হেসে বলে,

“- আমি কেবল মানসিক ভাবে অসুস্থ নই মৃত্তিকা, শারীরিক দিক থেকেও অসুস্থ। আমি ক্যান্সারে আক্রান্ত, লাস্ট স্টেজ”।

কথাটা শোনা মাত্র মৃত্তিকার হৃদয়টায় তোলপাড় শুরু হয়। কণ্ঠ রোধ হয়ে আসে মেয়েটার। দমে যায় সে। ইয়াসিনের ক্যান্সার হয়েছে? এরকম জটিল রোগ বাসা বেঁধেছে কেন? মৃত্তিকার অভিশাপে? হ্যাঁ, মৃত্তিকাই বোধহয় দায়ী। এত এত কান্না করেছে, অভিশাপ ছুঁড়েছে যে ইয়াসিনের দাম্পত্য জীবন সুখকর হয়নি। হয়তো সৃষ্টিকর্তা মৃত্তিকার ডাক ফেলতে পারেননি। খুব দ্রুত ইয়াসিনের কর্মফল প্রদান করেছেন। বয়স তো বেশি না, যুবক। বিয়ে করেছে, শুনেছে রুবির বাচ্চাও হবে। এ সময়ে ইয়াসিনের কিছু হলে রুবিআর তাট বাচ্চাটার কি হবে? ভাবে মৃত্তিকা। যদিও রুবির জন্য মায়া হয় না। করুণা হয় সামান্য। মৃত্যু পথযাত্রীর সামনে কঠোর হতে পারে না মৃত্তিকা। একটা সময় যাকে মনে প্রাণে ভালোবাসতো, স্বামী হিসেবে কল্পণা করতো, তার শারীরিক ব্যাধি কিছুতেই মৃত্তিকার জন্য খুশির হতে পারে না।

“- কবে হলো এসব”?

“- দুদিন আগে টেস্ট করে জানতে পারলাম। রোগটা অনেক আগে থেকেই ছিল, বুঝতে পেরেছি দুদিন আগে”।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃত্তিকা। ইয়াসিন বলে ওঠে,
“- একটু বসা যাবে মুখোমুখি? তোমার সাথে আমার কথা আছে মৃত্তিকা। হয়তো আর দেখা হবে না, ইন্ডিয়া যাবো কেমোথেরাপি নিতে। আর ফিরবো না হয়তো”।

“- এখানেই বলুন যা বলার”।

ইয়াসিন কেশে ওঠে। প্রচুর কাশে সে। কাশতে কাশতে চোখ দিয়ে পানি বের হয়। গলার স্বর বদলে যায়। ছেলেটার কাশতে কাশতে বেহাল দশা হয়। বুকে ক্রমাগত হাত বুলায়। মৃত্তিকার দম আটকে আসে। বলে,

“- পানি নিয়ে আসছি, দাড়ান”।

মৃত্তিকা পাশের একটি দোকানে ছুটে যায়। পানির বোতল কিনে এনে এগিয়ে দেয় ইয়াসিনের দিকে। পানিটুকু পান করার পরেও কাশি পুরোপুরি কমে না। মৃত্তিকা ঠায় দাঁড়িয়ে দেখে ইয়াসিনকে। রুক্ষ, দুর্বল দেহটা দেখে খানিক মায়া হয়। ইয়াসিনের কাশি কিছুটা কমতেই সে বলে,

“- কথাগুলো না বলা অবধি আমি শান্তি পাবো না মৃত্তিকা। যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে তোমাকে বলতে না পারা কথাগুলো আর বলা হবে না। আফসোস থেকে যাবে আমার”।

মৃত্তিকা এবারে একটু নরম হয়। তার পায়ে জুতো নেই। এভাবে কোথাও যাবে কিভাবে? ইয়াসিনকে বলায় সে প্রথমে জুতোর দোকানে নিয়ে যায়। উপরে রেস্টুরেন্টে আর নিচে শপিংমল। এক জোড়া স্লিপার জুতো কিনে উপরে উঠে রেস্টুরেন্টে বসে ওরা। মৃত্তিকার অস্বস্তি হয় খুব। অনেকদিন পর ইয়াসিনের সাথে এভাবে কথা হচ্ছে ওর। ভেতরটাও জ্বলছে। ইয়াসিন বাঁচবে কিনা তা নিয়ে সে নিজেই সন্দিহান। শরীর বেঁকে গেছে তার, আগের মতো বল নেই শরীরে। সে মৃত্তিকার জন্য এবং নিজের জন্য কোল্ড কফি অর্ডার করে। মৃত্তিকা তার কফির টাকা নিজেই পেমেন্ট করে। ইয়াসিন বিষয়টা দেখে হাসে,

“- আগের মতোই আছো। বদলাওনি একটুও”।

মৃত্তিকা বলে ওঠে,
“- বদলাতে চাইও না। আপন মানুষদের পরিবর্তন নিজ চোখে দেখেছি তো, তাই এই বদলে যাওয়ার বিষয়টাতে খুব ভয় পাই”।

মৃত্তিকার খোঁচা ঠিকই ধরতে পারে ইয়াসিন। মলিন হাসে সে। বলে,

“- রুবিও ভালো নেই আমার সাথে। বিয়েটা করেছিলাম জেদের বশে। এখন দুজনই পস্তাচ্ছি”।

“- এসব বলার জন্য এখানে নিয়ে এসেছেন”?

“- না। আমি ক্ষমা চাইতে এসেছি”।

“- বেশ, ক্ষমা করে দিলাম। এবার আসি”?

“- এত তাড়া? বিবাহিত জীবন কেমন কাটছে”?

“- জি ভালো”।

“- আফিম তো কাজবাজ করে না। যদি বলো আমি চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারি”।

“- কাজের অভাব তো তার নেই। কাজ করার মানসিকতা নেই আফিমের। থাকলে এতদিে বাবার ব্যবসা ধরতো”।

“- মানুষ বড়ই বিচিত্র। জীবন এভাবে বদলে যাবে ভেবেছিলাম”?

“- জীবনের নিয়মই এমন”।

“- তোমাকে না পাওয়ার আফসোস আমার থেকে যাবে মৃত্তি”।

“- এ আফসোস আমার হবে না। আপনি রুবির সাথে ভালে থাকুন, সুস্থ হয়ে উঠুন। আশা করি এটা আমাদের শেষ দেখা”।

মৃত্তিকা উঠে দাড়ায়। আশ্চর্য ভাবে তার হৃদয় কাঁপছে। পা টলছে। ইয়াসিন তাকিয়ে আছে তার দিকে। চোখ জোড়াও জ্বলছে বোধহয়। মৃত্তিকা সেদিকে ফিরেও তাকায় না।


টিউশন করে বিকেলের দিকে বাড়ি ফিরেছে মৃত্তিকা। আফিম বাড়িতেই আছে। ফিরেই মৃত্তিকা গোসল সেরেছে। আফিম সিগারেট ফুঁকছে ছাদে বসে। মৃত্তিকা জামাকাপড় মেলতে গিয়েই আফিমকে দেখে। দড়িতে কাপড় টানিয়ে মাথায় পেঁচিয়ে রাখা তোয়ালটা দিয়ে চুল ঝেরে বলে,

“- আপনি খেয়েছেন”?

আফিম পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখে মৃত্তিকাকে। আফিমের গা উদাম, নিচে হাফ প্যান্ট। উষ্কখুষ্ক চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। মৃত্তিকা খেয়াল করে আফিমের সবুজাভ চোখের সাদা অংশ লাল হয়ে আছে। সিগারেটটা এমন ভাবে ঠোঁটে চেপে ধরেছে যেন এতেই তার সুখ। মৃত্তিকার কথার প্রত্যুত্তরে কিছু বলে না আফিম। মৃত্তিকা ফের জিজ্ঞেস করে,

“- সারাদিন সিগারেট ফুঁকতে থাকেন, একটুও লজ্জা করে না মেয়েদের সামনে সিগারেট খেতে”?

আফিম এবার পিছু ফেরে। মৃত্তিকার সর্বাঙ্গ পর্যবেক্ষণ করে সে। এক ধ্যানে তাকিয়ে রয় প্রিয়তমার দিকে। মৃত্তিকা সাদা রঙের কুর্তি পড়েছে। গোসল করে সবে বের হওয়ায় চুল শুকায়নি। ভেজা চুলগুলো পিঠে লেপ্টে আছে মেয়েটার। সাদা রঙের জামা ভিজে পিঠ দৃশ্যমান হয়ে আছে। আফিম সেদিকে তাকিয়ে বলে,

“- চুল মোছো ভালো করে”।

মৃত্তিকা হাত দিয়ে চুল ঝাড়া দিয়ে বলে,

“- আপনি আমার তোয়ালে ব্যবহার করেন কেন? গোসল করে বিছানায় ফেলে রাখেন। বিছানাও ভিজে যায়, টাওয়াল ও ভিজে থাকে। চুল মোছা যায় না”।

“- তোমার সবকিছুই আমার মৃত্ত”।

দৃঢ় অধিকার বোধ থেকে কথাটা বলে ওঠে আফিম। তার চোখে-মুখে কিছুটা রাগের আভাস পায় মৃত্তিকা। তীক্ষ্ণ, সূচালো চোখে এক ধ্যানে মৃত্তিকার দিকে চেয়ে রয় সে। সিগারেট ও টানে খুব ধীরে। তার চাহনিতে বিব্রত হয় মৃত্তিকা। হাতের তোয়ালেটা মেলে দেয় দড়িতে। বলে,

“- ব্যবহার করবেন ভালো কথা, যত্নে রাখবেন তো। কাপড় ভেজা অবস্থায় রেখে দিলে দুর্গন্ধ ছড়ায়”।

আফিম এগিয়ে আসে। মৃত্তিকার চুলগুলো ছড়িয়ে দেয় পিঠে। এক গোছা চুল নাকের সামনে এনে শুকেও নেয়। অস্বস্তিতে শ্বাস আটকে দাঁড়ায় মৃত্তিকা। শুভ্রতার প্রতীক সে। সাদা রঙটায় চমৎকার মানিয়েছে মৃত্তকে। চোখ গিয়েই মৃত্তিকাকে গিলে খাচ্ছে আফিম। মৃত্তিকা দ্রুত সরে এসে বলে,

“- সকালে গিয়েছি ভার্সিটিতে। কিছুই খাইনি। খেতে যাই, আপনি আসুন”।

“- আমার কাছে আসো মৃত্ত”।

মৃত্ত বুঝল না আফিমের এই আহ্বান। বলল,

“- কেন”?

“- আমি বলেছি তাই”।

মৃত্তিকা দু কদম এগিয়ে আসে আফিমের দিকে। বলে,
“- বলুন”?

আফিম সিগারেটটা ছাদ থেকে ছুঁড়ে মারে। মৃত্তিকার দিকে চেয়ে মোহগ্রস্ত কণ্ঠে বলে,

“- তুমি আমায় ভালোবাসো না কেন মৃত্তওওও”?

থমকায় মৃত্তিকা। আফিম সরাসরি তাকে এ প্রশ্ন করে বসবে ভাবেনি মৃত্তিকা। হকচকিয়ে ওঠে সে। তার উত্তরের অপেক্ষা না করেই আফিম বলে,

“- আচ্ছা, ভাবতে হবে না। এসো খাবে চলো”।

মৃত্তিকা আর কথা বলে না। বলার মতো কিছুই পায় না সে। খাবার খেয়ে আফিম বেরিয়েছে। টিভি খুলে বসে পড়ে মৃত্তিকা। টিভিতে একটি অপ্রত্যাশিত সংবাদ দেখতে পায় সে। খবরে দেখাচ্ছে “আফিম মির্জা নির্দোষ। সাবিহা নামের মানসিক প্রতিবন্ধী মেয়েটিকে ধর্ষণ করেছে তারই বড় ভাইয়ের প্রিয় বন্ধু আসাদ। আসাদকে আজ সকালে বাড্ডার চেকপোস্ট থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সে নিজ মুখে অপরাধের কথা স্বীকার করেছে। পুলিশ কয়েক ঘা দেয়ার পর আসাদ বলেছে “আফিমকে ফাঁসানো তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল না। সাবিহাকে অনেক আগে থেকেই পছন্দ করতো আসাদ। বন্ধুর বোন বলে এ কথা বলার সুযোগ পায়নি সে। সাবিহাকে দেখলেই আসাদের কামনা জেগে উঠতো। সাবিহাকে ছোঁয়ার ইচ্ছে হতো, সাবিহার দেহ দেখলেই ওর লোভ লাগতো। কিন্তু ভয়ে কখনো সে এসব করার সাহস করেনি। আফিম মির্জা সাবিহাকে অপহরণ করায় সাহস ও সুযোগ দুটোই পেয়ে যায় আসাদ। ভাবে সব কিছু করে আফিমের উপর দোষ দেয়া সম্ভব। তাই নিজের পৌরষত্ব খাটিয়ে সাবিহাকে ধর্ষণ করে সে। নিজের কামনা-বাসনা পূর্ণ করে। নিজে যেন কোনোদিন ধরা না পড়ে সেজন্য আফিমের ছদ্মবেশে সাবিহার কাছে যায় আসাদ। ভেবেছিল কেউ তাকে কোনোদিন সন্দেহ করবে না। নিজের স্বার্থ হাসিল করতে পারবে সে। বন্ধুত্ব ও থাকবে, শারীরিক চাহিদাও মিটবে।

এ কথা জানার পর শিহাব কারাগারে চিৎকার করে কান্নাকাটি জুড়েছে। সাংবাদিকরা সেসবও ক্যামেরায় ধারণ করে যোগাযোগ মাধ্যম গুলোকে প্রকাশ করেছে। শিহাবের আর্তনাদ দেখে চোখে পানি জমে মৃত্তিকার। ছেলেটা প্রচণ্ড খারাপ এ কথা সত্য, কিন্তু ভাই হিসবে শিহাবের তুলনা নেই। তার চিৎকার, আর্তনাদ, কান্নাকাটি দেখে বাংলাদশের হাজার হাজার মানুষের চোখে পানি জমেছে। শিহাব মানতে পারছে না তার বন্ধু সাবিহাকে প্রতিনিয়ত খারাপ নজরে দেখেছে, তারই বন্ধু সাবিহাকে শারীরিক অত্যাচার করেছে। কষ্টে-দুঃখে ছেলেটা আধমরা হয়ে পড়ে আছে সেলে। অভিশাপ ছুঁড়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। আসাদকে শিহাব খুব বিশ্বাস করতো। বিশ্বাসের এই পরিণতি হবে কখনো ভাবেনি সে। কাছের বন্ধুর এই প্রতারণায়, এই নোংরা মানসিকতায় হাহাকারে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে তার মন।

মৃত্তিকার বন্ধুত্বের উপর থেকে বিশ্বাস উঠে গিয়েছে অনেক আগেই। এখন এ ধরণের খবর দেখে গা গুলিয়ে আসে মেয়েটার। বিতৃষ্ণায় হৃদয় ছেয়ে যায়। তবে একটা সংবাদ তাকে আলাদা শান্তি দেয়। আফিম নির্দোষ এ সত্যটা আগে কোথাও প্রচার হয়নি। আজ আফিম পুরো দেশের সামনে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে। কেউ আর মৃত্তিকাকে দেখে নাক ছিটকাবে না, কটু কথা বলবে না। রেপি’স্টের বউ বলে গালিগালাজ ও করবে না। এবার সমাজে সে আগের মতো বাঁচতে পারবে। ভাবতেই শান্তি লাগে মৃত্তিকার। আছরের আযান দিতেই সে নামাজ পড়ে। মোনাজাতে পরিবারের জন্য দোয়া চেয়ে আফিমের জন্যও দোয়া করে সে। কেঁদে কেঁদে আল্লাহ্রর কাছে ফরিয়াদ জানিয়ে বলে,,

“- হে আল্লাহ্, আপনি দয়া করুন, একটুখানি সদয় হন আমার প্রতি। আফিমকে ভালো করে দিন, ওর হৃদয়ে আপনার ভয় ঢুকিয়ে দিন। খারাপ কাজ থেকে আফিমকে দূরে রাখুন, কাজ-বাজে মনোযোগী করে তুলুন। আফিমের নেশা দূর করুন, সবাইকে সুখী করুন। আমাকে ক্ষমা করুন, আমার অতীতকে মুছে দিন হৃদয় থেকে। একজন আদর্শ স্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা দান করুন আমায়। আমিন”।

নামাজ শেষ করেই মৃত্তিকা আফিমের জন্য চিংড়ি মাছ রান্না করে। খানিকক্ষণ বাদেই আশরাফ মির্জা বাড়ি ফেরেন। তাকে চা দিয়ে মৃত্তিকা বলে,

“- ভাত দিই বাবা? চিংড়ি মাছ রেঁধেছি”।

আশরাফ মির্জা হাসেন। বলেন,
“- আফিমের জন্য”?

মৃত্তিকা লাজুক হেসে বলে,
“- শুধু উনার জন্য হবে কেন? আপনার জন্যও রেঁধেছি”।

আশরাফ মির্জা দুষ্টুমি করে বলেন,
“- না না, তুমি আফিমের জন্যই রেঁধেছ। আফিমের তো গলদা চিংড়ি প্রিয়। কাল চিংড়ির সাথে একটু গরুর মাংস রেঁধো। কাল একটা বিশেষ দিন, বিশেষ খাবার না হলে হয়”?

মৃত্তিকা বোঝে না। বলে,
“- বিশেষ দিন”?

“- হা, তুমি জানো না”?

“- না তো”।

“- কাল আফিমের জন্মদিন”।

মৃত্তিকা লজ্জা পায়। আফিমের জন্মদিন সে জানে না এটা অত্যন্ত লজ্জাজনক। ঠোঁট কামড়ে ধরে সে। সাথে সাথেই পরিকল্পনা আটে রাত বারোটায় আফিমকে সারপ্রাইজ দেবে মৃত্তিকা। আফিমের জন্য একটা কেক বানাবে সে, ফুল দিয়ে ঘর সাজাবে। যেহেতু আফিম নিজেকে নির্দোষ প্রমাণিত করতে পেরেছে, সেহেতু তাকে এই সামান্য পুরস্কার দেবে মৃত্তিকা। আফিম নিশ্চয়ই খুশি হবে। আশরাফ মির্জা খেয়েদেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেন। অতঃপর জরুরি কল আসায় চলে গেলেন কাজে। যাবার আগে তিনি মৃত্তিকাকে নিশ্চয়তা দিলেন যে বারোটার আগেই তিনি ফিরে আসবেন, আফিমের জন্য গিফট কিনে আনবেন আসার পথে। একসাথে রাতে খেতে বসবে সকলে।


দুর্ভাগ্যবশত আজ সন্ধ্যায় আফিম বাসায়। সে এ সময় বাসায় থাকে না। সন্ধ্যায় বাইরে আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফেরে রাত দশটার পর। অথচ আজকেই সে বাসায় বসে আছে। মৃত্তিকা কেক বানিয়েছে, ফুল আনিয়েছে দারোয়ান চাচাকে দিয়ে। কিন্তু আফিম বাড়িতে থাকায় সে কোনোকিছু বন্দোবস্ত করতে পারছে না। বেশিক্ষণ ঘরে না থাকলে আফিম তাকে সন্দেহ করবে। আফিমকে কোনোভাবেই বুঝতে দেয়া যাবে না যে মৃত্তিকা তার জন্মদিন পালন করার কথা ভাবছে। আফিমকে সে সারপ্রাইসড করতে চায়।

ড্রইংরুমে আফিম যাতায়াত করবে ভেবে তাদের পাশের রুম অর্থাৎ তন্বী যে রুমে ঘুমাতো, মৃত্তিকা সেই রুমটা সাজাবে ভেবেছে। আফিমের দেয়া শাড়ির থেকে টকটকে খয়েরি রঙের শাড়িটা বের করেছে মৃত্তিকা। সাথে ম্যাচিং হাফ হাতার ব্লাউজ। শাড়ির পাড়ে সোনালী সুতোর কাজ করা। হাতে কাচের চুড়ি পড়েছে, চুল ছেড়ে দিয়েছে পিঠে, নাকে সোনার ছোট্ট নাকফুল পড়েছে। গলায় একটি চিকন লকেট পড়ে মৃত্তিকা ঘরে আসে। আফিম শুয়ে ফোনে গেইমস খেলছিল। মৃত্তিকা লজ্জায় দাঁড়িয়ে থাকে বাইরে। আফিমের সামনে এতটা সেজেগুজে যেতে ওর অস্বস্তি হচ্ছে। বিয়ের পর এভাবে সেজে থাকেনি মৃত্তিকা। শাড়ি-চুড়ি পড়ে ঘোরা হয়নি। আফিম তাকে এভাবে দেখলে খুব লজ্জায় ফেলবে?

মৃত্তিকা ধীর পায়ে ঘরে আসে। সোজা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে। আফিমের মনোযোগ ফোনে। মৃত্তিকা আয়নায় নিজেকে দেখে আফিমের দিকেও তাকায়। মানুষটার খেয়ালই নেই মৃত্তিকা ঘরে এসেছে যে। মৃত্তিকা খুব করে চাইল আফিম তাকে দেখুক। একটু প্রশংসা করুক, কিংবা তাকিয়ে থাকুক তার পানে। আফিম তেমন কিছুই করল না। মৃত্তিকা আফিমের সামনে এসে অজুহাত খোঁজে কথা বলার। একটু ভেবে সে বলে,

“- আপনাকে নিয়ে স্যোশাল মিডিয়ায় অনেক আলোচনা হচ্ছে। দেখেছেন”?

আফিম ফোন থেকে চোখ সরিয়ে এক নজর তাকায় মৃত্তিকার দিকে। ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক দিয়েছে মৃত্তিকা। মেয়েটাকে এতটা সাজতে সে একবারই দেখেছিল। ইয়াসিনের বিয়ের দিন সেজেছিল মৃত্তিকা। এরপর আর নিজেকে দারুণ ভাবে উপস্থাপন করেনি আফিমের সামনে। মৃত্তিকা ভেবেছিল আফিম তার দিকে আরো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকবে। কিন্তু আফিম তা না করে পরক্ষণেই চোখ সরিয়ে নিয়েছে। ফের ফোনে চোখ রেখে আফিম প্রত্যুত্তরে বলে,

“- হু দেখেছি”।

মৃত্তিকার মুখটা মলিন হয়ে উঠল। বলল,

“- শাড়িটা সুন্দর, থ্যাঙ্কস”।

আফিম এবারে তাকায় না মৃত্তিকার দিকে। খানিক হেসে বলে,
“- হু, তোমার পছন্দ হবে জানতাম”।

আফিমের মনোযোগ পায় না মৃত্তিকা। মনটা খুব খারাপ হয় তার। বেশরমের মতো লাজ লজ্জা ভুলে সে জিজ্ঞেস করে,

“- আমাকে কেমন লাগছে”?

আফিম ফোনে চোখ রেখেই বলে,

“- ভালো লাগছে”।

মৃত্তিকার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে আসে। শাড়ির পুরু আঁচল চিকন করে সে। আফিমকে কথোপকথন বাড়াতে না দেখে সে নিরাশ হয়। চলে আসে আফিমের সামনে থেকে। আফিম এমন করছে কেন? কোনো কথা বলছে না মৃত্তিকার সাথে। দেখছেও না ভালো করে। এইযে সে চুলে গাজরা পড়েছে, হাতে ঝনঝন করে শব্দ তোলা চুড়ি পড়েছে, লিপস্টিক কাজল সহ প্রসাধনী মেখেছে মুখে। এসবে কী ওকে ভালো দেখাচ্ছে না? এ সাজে বুঝি ওকে মানাচ্ছে না? তাই আফিম চেয়ে দেখেনি তাকে? চোখ তুলেও চায়নি, মুগ্ধ হয়নি। তার আকর্ষণ পায়নি মৃত্তিকা।

তন্বীর সেই রুমটার ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ায় মৃত্তিকা। নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে সে। কোনো রকম সাজগোছ না করলেও আফিম প্রায়ই বলে মৃত্তিকা আগুন সুন্দরী। তাকে দেখলে নাকি আফিমের চোখ ধাঁধিয়ে যায়। অথচ এত সুন্দর করে সেজেছে সে, আফিম পাত্তা দিল না তাকে। বিতৃষ্ণায় হৃদয় পুড়ে ওঠে মৃত্তিকার। বুকের মাঝে সূক্ষ্ম চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হয়। মন খারাপেরা আচমকা ঘিরে ধরে মৃত্তিকাকে। মৃত্তিকা নিজেকে শাসায়। সে কি ছোট আছে? টিনএজ দের মতো আচরণ করছে কেন? আফিম তাকে দেখে হা করে তাকিয়ে থাকে নি, বিশেষভাবে প্রশংসা করেনি এজন্য এত মন খারাপ করার কি আছে? এই ছোট খাটো বিষয় নিয়ে রাগ করে বসে থাকবে সে?

মৃত্তিকার মন শোনে না তবু। চোখ টলটলে হয়ে আসে মেয়েটার। দুমড়েমুচড়ে ওঠে হৃদয়। শাড়িটা বদলে ফেলে সে। হালকা মিষ্টি রঙের টুপিসের সাথে একটা সুতির ওড়না জড়িয়ে নেয় গায়ে। মুখের প্রসাধনী তুলে ফেলে, চুড়ি, দুল, গাজড়া খুলে ফেলে। অতঃপর ধীর সুস্থে ঘরটা গোছায় সে। কৃত্রিম ও বাস্তব গোলাপ, রজনীগন্ধা, হাসনাহেনা ফুল দিয়ে ঘর সাজায় সে। কিচেনে গিয়ে কেক সাজায়। রান্না করা তরকারি একটু গরম করে ঘন্টা খানেক বাদে ঘরে ফেরে সে। গিয়ে দেখে আফিম ঘুমিয়েছে। মৃত্তিকা একা একা কি করবে ভেবে পায় না। চুপচাপ আফিমের পাশে শুয়ে পড়ে সে। আফিমের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তন্মধ্যে তার রাগ, অভিমান তড়তড় করে বাড়ে। আফিমের ফোন আসায় সে চোখ মেলে। কলে কারো সাথে হা হু করে মৃত্তিকার দিকে তাকায়। মৃত্তিকার নজর তখনো তার দিকে। আফিম জিজ্ঞেস করে,

“- ঘুমাওনি? বাবা ফিরেছে”?

মৃত্তিকার কান্না গুলো গলায় আটকে থাকে। আশ্চর্য! এমন ন্যাকা সে কবে থেকে হয়েছে? এত কান্না, অভিমান কোথা থেকে আসে। বড় হয়েছে, বুদ্ধি হয়েছে সাধারণ বিষয় গুলো নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কোনো মানে আছে?

“- বাবা বলেছে রাত হবে।”।

আফিম ভাবলেশহীন কণ্ঠে বলে,

“- ঘুমাও, তাহলে”।

মৃত্তিকা আনমনেই বলে ওঠে,
“- আমি শাড়ি বদলে ফেলেছি”।

আফিম যেন এতক্ষণ পর মৃত্তিকার দিকে ভালো করে তাকায়। বলে,

“-, কেন বদলালে”?

“- আমাকে ভালো লাগছিল না”।

“- কে বলেছে”?

“- ভালো লাগছে না যেমন কেউ বলেনি, ভালো লাগছে সেটাও কেউ বলেনি”।

“- বললাম তো ভালো লাগছে”।

“- না দেখেই বলেছিলেন”।

মৃত্তিকা ফিচেল হাসে। সে হাসিতে প্রাণ নেই। আফিমের দিকে ঘুরে শুয়েছিল। মুখোমুখি হয়েছিল দুজন। মৃত্তিকা আফিমের দিকে পিঠ ঠেকিয়ে ওপাশ ঘুরে শোয়। আফিম তাতেও খুব একটা খেয়াল করে না। তার এই পরিবর্তনে মাত্রাতিরিক্ত চমকায় মৃত্তিকা। ঘাবড়ে যায় সে। তৎক্ষনাৎ আফিমের অতি নিকটে এসে সে জিজ্ঞেস করে,

“- আপনি, কিছু নিয়ে চিন্তিত”?

আফিম মৃদু হেসে বলে,

“- না তো”।

“- কথা বলছেন না, তাই জিজ্ঞেস করলাম”।

আফিম এ কথার বিপরীতে কিছু বলে না। মৃত্তিকার মন কাঁদে। অস্থির হয়ে বলে,

“- জানেন আজ কি হয়েছে”?

আফিম ত্যাছড়া কণ্ঠে বলে,

“- বলো নাই তো”।

“- ইয়াসিনের সাথে দেখা হয়েছিল”।

“- হু ভালো তো”।

“- কি বলেছে জানেন”?

“- না”।

“- জানতে চান না”?

“- আমার একটু কাজ আছে মৃত্তিকা। যেতে হবে, এসে শুনবো”।

“- কোথায় যাবেন”?

“- এক সিনিয়র ভাই ডেকেছে”।

মৃত্তিকা আয়োজন করেছে জন্মদিনের। রাত বাজে নয়টা। এখন আফিম চলে গেলে ফিরবে কখন? বারোটায় কেক কাটবে ওরা।

“- কখন ফিরবেন”?

“- বেশি সময় লাগবে না। চলে আসবো”।

আফিম উঠে দাঁড়ায়। বড় কোনো অপারেশন সাকসেসফুল হলে সব সরকারি কর্মকর্তারা মিলে পার্টির আয়োজন করে। এ বছর আফিমের জন্মদিন আর পার্টি একই দিনে পড়েছে। এ পার্টির মূল কেন্দ্রবিন্দু আফিম। আজ আইনমন্ত্রী আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসবে পার্টিতে। আফিম জানে, তাকে পুরস্কৃত করা হবে বলেই এত আয়োজন। জন্মদিন হওয়ায় রাত বারোটার পর এ পার্টিটি রাখা হয়েছে। আফিম যেতে চায়নি। বস কড়া ভাবে তাকে যেতে বলেছে। কেননা আইনমন্ত্রী ও তার সদস্যরা আসবে। আফিম না থাকলে পার্টিটা ভালো দেখাবে না। তাই আফিম এখন নির্ধারিত ক্লাবে যাবে। মৃত্তিকাকে যদি বলা হয় আজ সে ফিরতে পারবে না, তাহলে মেয়েটা রাগ করবে। প্রশ্ন করবে বারবার। সেজন্য মৃত্তিকাকে মিথ্যে বলল আফিম। তার যাওয়ার দিকে মৃত্তিকা কেমন মলিন চোখে তাকিয়ে রইল। আফিম বুঝল মনে হয়। ঘুরে তাকাল বারবার। একসময় ফিরেও আসে ছেলেটা। মৃত্তিকার কাছে এসে বলে,

“- শাড়িতে তোমায় খুব সুন্দর লাগছিল, আমি তাকিয়ে থাকতে পারিনি। নজর লেগে যাবে যে”।

মৃত্তিকা ফ্যালফ্যাল করে অবুঝের ন্যায় তাকিয়ে রয়। আফিম অধৈর্য্য ভঙ্গিতে বলে,

‘- খুব সুন্দর কিছুকে বারবার দেখতে নেই।”

মৃত্তিকা ফিচেল হেসে বলে,

“- কেন? সৌন্দর্য ফিকে হয় যায়? আকর্ষণ কাজ করে না”?

আফিম মৃত্তিকার গালে হাত রেখে বলে,

“- না, দেখলে কেবল দেখতেই ইচ্ছে করে। বেপরোয়া, উন্মাদ হতে ইচ্ছে করে, ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। তাই বেশিক্ষণ দেখতে পারিনি”।

মৃত্তিকার দেহে শীতল শিহরণ বয়ে যায়। জিভ ভার হয়ে আসে। মস্তিষ্ক এখন শূন্য। বলার মতো কোনো শব্দ নেই। আফিম মৃত্তিকার ললাটে শুষ্ক শব্দহীন চুমু বসিয়ে বলে,

“- তোমার উপর রাগ করেছি। রাগ ভাঙাবে আমার, তা না করে নিজে রাগ করছো”?

মৃত্তিকা মুখ তুলে তাকায় আফিমের দিকে। ছেলেটা খুব লম্বা। তার দিকে তাকাতে হয় মাথা উঁচু করে। বলে,

“- রাগ? রাগ করেছেন কেন”?

“- তুমি ইয়াসিনের সাথে দেখা করেছো”।

“- আমি তো লুকাইনি, বলতে গিয়েছিলাম সবটা”।

“- তবুও আমি মানতে পারছি না। আমার মৃত্ত, আমার প্রাণ। যার নেশায় আমি বুঁদ হয়ে থাকি। তাকে অন্য কেউ ওই নজরে দেখবে কেন”?

“- আ…আ.আমি তো, মানে আমি না করেছিলাম। আমাকে জোর করছিল”।

“- আসছি, থাকো”।

“- একটু তাড়াতাড়ি ফিরবেন প্লিজ।”

আফিম শুনল কি না কে জানে? পা বাড়িয়ে চলে গেল। মৃত্তিকার মন খারাপ কিছুটা কমল। কেকটা নিয়ে উপরে গেল। আশরাফ মির্জা বাড়ির ল্যান্ডলাইনে কল করে জানালেন তিনি ফিরছেন”।


অফিসে কাজের চাপ বেড়েছে। বেশি বোঝে না বলে কাজ গুলো শেষ করতে সময় লাগে রাইমার। ক্লান্ত লাগে খুব। এত কম বয়সে এত ধকল নিতে পারে সে? ছুটি হবার কথা সাতটায়। নয়টা বেজে গেছে, এখনো কাউকে যেতে দেয়া হয়নি। প্রজেক্ট শেষ করে সাবমিট করে ফিডব্যাক নিতে হবে। তারপরেই ছুট পাবে ওরা।

রাইমা হাই তুলছে ঘন ঘন। পূর্বা পিছু ফিরে বলে ওঠে,
“- কিরে ঘুম পাচ্ছে”?

রাইমা চোখ জোড়া আঙুল দিয়ে টেনে টেনে বলে,
“- হ্যাঁ রে, দেখ না চোখ টেনেও খুলে রাখতে পারছি না”।

রাইমার কাণ্ডে হো হো করে হেসে ফেলে পূর্বা। বলে,
“- পিয়নকে বলে এক কাপ কফি খা”।

“- না রে, কফি খেলে সারারাত আমার ঘুম হয় না”।

শান্ত ডেস্ক ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। পরনে তার ব্রাউন শার্ট আর কালো প্যান্ট। গলায় আইডি কার্ড ঝুলিয়ে রেখেছে। গা ঝাড়া দিয়েই সে রাইমার ডেস্কের সামনে আসে। বলে,

“- রাইমা, কফি খেতে যাবেন? ছুটি হতে হতে দশটা বেজে যাবে।”

সাথে সাথে ল্যাপটপের স্ক্রিন নামিয়ে ফেলে রাইমা। উঠে দাঁড়িয়ে হাসিখুশি কণ্ঠে বলে,
“- হ্যাঁ হ্যাঁ যাবো”।

শান্ত এগিয়ে যায় ক্যান্টিনের দিকে। পূর্বা ভ্রু কুঁচকে চেয়ে বলে,

“- তুই না মাত্র বললি কফি খাবি না, তাহলে”?

রাইমা বোকা হেসে বলে,
“- দেখলি না স্যার বলল, তাই মেনে নিলাম”।

ক্যান্টিনে বসে দু কাপ কফি অর্ডার দেয় শান্ত। রাইমা বলে ওঠে,

“- আপনার বন্ধুর ঝামেলা মিটেছে না”?

“- হুম, মিটেছে”।

শান্ত আশপাশে তাকায়। দেখে পূর্বা সহ বাকিরাও এসেছে কফি খেতে। সবাই তাদের দিকে তাকিয়েই আছে। শান্ত ভারী লজ্জিত হয়। বিব্রত ও হয় বেশ। কখনো কোনো মেয়ের সাথে এভাবে কফি খায়নি সে। মেয়ে বন্ধু স্কুল লাইফে থাকলেও কলেজ এবং ভার্সিটি লাইফ তার বোরিং কেটেছে। মেয়ে বন্ধুর খোঁজ পেয়েও এড়িয়ে গেছে সে। অফিসে রাইমার সাথেই কেবল তার সম্পর্ক ভালো। সম্পর্ক ভালো হওয়ার একটা বড়সড় কারণ আছে। রাইমা বাকপটু মেয়ে, প্রচুর কথা বলে। কথোপকথন দীর্ঘ করতে সে একাই একশো। এক্ষেত্রে শান্তকে খুব একটা কসরত করতে হয় না। আবার শান্ত চুপচাপ থাকলেও রাইমা একাই বকবক করে, একটুও মন খারাপ করে না, অভিযোগ করে না। সেজন্যই তাদের বন্ধুত্বটা এখনো টিকে আছে।

“- মিস্টার শান্ত ওরফে স্যার, আমার বোনের বিয়ে। আপনাকে আসতে হবে”।

শান্ত বলে ওঠে,
“- কবে বিয়ে”?

“- সপ্তাহ খানেক পর।”

“- ছুটির আবেদন করেছেন”?

রাইমা হাসে। বলে,

“- আমি চাইলে থোড়াই দেবে, আপনি আমার হয়ে বসকে বলবেন”।

শান্ত অবাক কণ্ঠে বলে,

“- কিন্তু বস তো আপনার আত্মীয় হয়। কেন দেবে না”?

রাইমা বিরস কণ্ঠে বলে,
“- এটাই তো সমস্যা। আত্মীয় বলেই খাটিয়ে মারে, কাজের প্রেশার দেয়। না পারি কইতে আর না পারি সইতে”।

ফিক করে হেসে ফেলে শান্ত। রাইমা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে,

“- এ বাবা, আপনি হাসতেও পারেন”?

শান্ত বলে,
“- সন্দেহ আছে”?

“- দেখি না তো হাসতে। আপনি সবসময় হাসবেন বুঝলেন? হাসলে আপনাকে সুন্দর লাগে”।

অবিলম্বে কথাটুকু বলে কফিতে চুমুক দেয় রাইমা। শান্ত থমকে যায়। লজ্জাও পায় ভীষণ। রাইমা হো হো করে হেসে বলে,

“- আরে আরে, আপনাকে লজ্জা পেলেও সুন্দর লাগে। এত লজ্জা কোথায় পান আপনি”?

শান্ত বলে বসে,
“- কোথা থেকে পাই সেটা বড় বিষয় না। আপনার লাগবে কিনা বলুন? ধার দিতে পারি”।

“- অবশ্যই, আমার আবার এসব একটু কমই আছে”

দুজনে হেসে ফেলে। তাদের স্বর কানে পৌঁছায় সবার। এতে খানিক বিব্রত হয় শান্ত। কিন্তু রাইমার কাছে সএব খুবই তুচ্ছ ব্যাপার।

দশটায় ছুটি হবার পর রাইমা বাস খোঁজে। শান্ত বাইক বের করলেই সে লাফিয়ে উঠে বসে শান্তর বাইকে। বাকিরা অন্যভাবে দেখে ওদের। শান্ত নিচু কণ্ঠে বলে,

“- আমি সামনে যাই, তারপর না হয় উঠুন”?

রাইমা না বুঝে বলে,
“- কেন”?

“- সবাই আমাদের অন্য চোখে দেখছে”।

“- কেন? দেখলে সমস্যা হবে”?

“- মিথ্যে আমি অপছন্দ করি রাইমা। আমি চাই না আমাদের নিয়ে কেউ মিথ্যে কিছু ভাবুক”।

দমে যায় রাইমা। বলে,
“- ঠিক আছে আপমি এগিয়ে যান। আমি আসছি”।

শান্ত হেসে বলে,

“- বোঝার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।”


বারোটা বাজতে দশ মিনিট বাকি। আশরাফ মির্জা একটি দামী ব্র্যান্ডের ঘড়ি কিনেছেন আফিমের জন্য। আফিমের জন্মদিন নিয়ে তিনিও আনন্দিত। এগারোটার আগেই বাড়ি ফিরেছেন তিনি। শান্ত, রূপক, রায়ান ওরাও এসেছে মৃত্তিকার কথায়। সবাই মিলে কেক কাটবে বলে খুবই এক্সাইটেড মৃত্তিকা। অথচ আফিমের ফেরার খবর নেই। ফোন বেজে যাচ্ছে কিন্তু আফিম ফোন তুলছে না। অস্থির লাগছে মৃত্তিকার। ভালো লাগছে না কিছুই। বারবার ফোন করায় আফিম কেবল একটি টেক্সট পাঠিয়েছে। লিখেছে,

“- আমি একটু ব্যস্ত আছি। আজ ফিরতে পারবো না।”

ব্যাস এটুকুই। ব্যস্ততার কারণ বলেনি। আশরাফ মির্জা হতাশ হলেন। এই দিনটায় আফিমকে পাওয়া যায় না। কোনোদিনই রাতে তাকে পাওয়া যায় না। সারারাত আড্ডা দিয়ে ফেরে ছেলেটা। বাবার সাথে সময় কাটায় খুব কম। ভেবেছিলেন এ বছরে তারা একসাথে কেক কাটবে, আনন্দ করবে। মৃত্তিকার মলিন মুখ দেখে তার খারাপ লাগে খুব। আফিমকে ফিরতে না দেখে শান্ত, রূপক, রায়ানকে খাবার বেড়ে দেয় মৃত্তিকা। অনেক রকম আইটেম করেছিল সে। সবগুলো খাবার খাইয়ে তবেই টেবিল থেকে উঠতে দেয় ওদের। মৃত্তিকার মন খারাপ বুঝতে পেরে ওদেরও মন খারাপ। আফিমকে বারবার কল, টেক্সট করেও লাভ হয়নি। খাওয়া-দাওয়া করে আফিমের জন্য অপেক্ষা করতে করতে শেষে একটা বিশে বাড়ি থেকে চলে যায় ওরা। আশরাফ মির্জা মৃত্তিকাকে একই ভাবে ঘরে বসে থাকতে দেখে বলেন,

“- এসবের জন্য আমি দায়ী”।

মৃত্তিকা বলে,

“- এমন করে কেন বলছেন বাবা? আপনার কি দোষ”?

আশরাফ মুর্জা চোখের ঘোলাটে চশমা পাঞ্জাবির প্রান্ত দিয়ে মুছে বলেন,

“- সব দোষ আমার। তোমাকে একটা কথা লুকিয়েছি আমি। তোমাদের বিয়েটা জোর করে হয়নি। আমার ইচ্ছেতে, আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়েছে”।

চমকায় মৃত্তিকা। বিভ্রান্ত হয় সে। বুঝতে পারে না আশরাফ মির্জার কথার মানে। বিস্ফোরণ বাড়িয়ে দিয়ে আশরাফ মির্জা বলেন,

“- আফিম তোমাকে পছন্দ করে, বিয়ে করতে চায় একথা আমি জানতাম। আফিম তো মেয়েদের তেমন একটা পছন্দ করতো না। মেয়েদের প্রতি ওর ভাবনাচিন্তা ইতিবাচক ছিল না। তাই যখন দেখলাম ও তোমাকে বিয়ে করে ঘরে তুলতে চাইছে তখন আমি লোভী হয়ে উঠলাম। ছেলেকে ভালো করতে, ছেলের পছন্দের মানুষটাকে পাইয়ে দিতে আমি খুব বাজে একটা পরিকল্পনা কষলাম। ওইদিন যারা যারা তোমাদের ধরে বেঁধে বিয়ে দিয়েছিল, তাদের আমিই টাকা দিয়ে বলেছিলাম এসব করতে। আমি ভেবেছিলাম তুমি ঘরে এলে বখাটে আফিম ভালো হয়ে যাবে, শুধরে যাবে। ঘরে মন বসবে ছেলেটার, একটা মেয়ে পাবো আমি। নিজেদের স্বার্থ পূরণ করতে তোমাকে এ বাড়িতে এনেছি। আমি খুব লোভী মা, আমি খুব খারাপ। আমার ছেলেটা ভালো নয় জেনেও তোমার সাথে ওর জীবন আমি জুড়ে দিলাম। এ পাপ আমাকে পিছু ছাড়বে না”।

বলেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন তিনি। হতবিহ্বল মৃত্তিকা। কথা বলার শক্তি নেই। শুধু অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বলে,

“- আপনি এসব করিয়েছেন? কেন বাবা? এতদিন বলেননি কেন? আপনার ছেলে কেমন আপনি জানেন না? তার সাথে আমায় বাঁধলেন কেন? কেন আমার জীবনটাকে নিয়ে আপনারা খেললেন”?

“- আফিম আমার ছেলে, তার ভিডিও ভাইরাল হবে বুঝতে পেরে আমিই খুব সতর্ক হয়ে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এসব করেছিলাম। তাই এই ঘটনাটা কেউ জানে না। নইলে হয়তো আরো ক্ষতি হতো”।

মৃত্তিকার কণ্ঠ রোধ হয়ে আসে। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বুক চিড়ে। আফিম বাড়ি ফেরে না। মৃত্তিকার আর কেক কাটার ইচ্ছে পূরণ হয় না। সে ঘরে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ে বিছানায়। রাগ ও জেদের বশে ঘরে থাকা আফিমের সিগারেট গুলো খুঁজতে থাকে সে। এক সময় ওয়ার্ড্রবের চাবিও পেয়ে যায় মৃত্তিকা। আফিমের ওয়ারড্রব অগোছালো করতে করতে একটি অপ্রত্যাশিত বস্তু দেখতে পায় মৃত্তিকা। বস্তুটি হাতে তুলে তার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে ওঠে। আফিমের ওয়ারড্রবে রিভলবার? ও মারপিট করতো, এখন গোলাগুলিও করে? অবৈধ অস্ত্র ঘরে এনে রেখেছে আফিম? এত সাহস ওর? মৃত্তিকার মাথা ঘুরে আসে। সত্যিকারের বন্দুক আফিমের ড্রয়ারে কি করে থাকে? বিপথে চলে গেছে ছেলেটা তাই বলে এতটা অন্যায় করছে আজকাল?

মৃত্তিকা সারা রাত ঘুমায় না আর। সকাল হতেই একটি চিঠি লিখে কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে আসে নিজের বাড়ি। প্রতিজ্ঞা করে আর কখনো সে আফিমের কাছে ফিরবে না। লোকটা যতই বাড়াবাড়ি করুক। সে নত হবপ না, দমবে না। হয় ভালো হবে, নয়তো মৃত্তিকাকে ছাড়তে হবে।

চলবে?
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি_শেখ

[ নোটঃ বড় পর্ব, অনেক ভুল আছে। ঘাবড়াবেন না। আগামী পর্বে উন্মাদ, বখাটে আফিমকে দেখতে পাবেন। আমি বখাটে আফিমকে খুব মিস করছি আপনাদের মতোই। ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply