ওরামনেরগোপনচেনেনা
পর্ব সংখ্যা [২৪]
তীব্র বেগে, অদম্য গতিতে বাইক চালিয়ে ভোরের দিকে ঢাকায় ফিরেছে আফিম। পরনের পোশাক পাল্টে ফেলেছে সে। অস্ত্র গুলো রেখে এসেছে ফিল্ড রুমে। বাড়িতে ঢোকার আগ মুহুর্তে দারোয়ান জানিয়েছে মৃত্তিকা অনেকক্ষণ হলো ঘুম থেকে উঠেছে। মেয়েটা বেলকনিতে বসেছিল আফিমের অপেক্ষায়। কিছুক্ষণ হলো ঘরে গিয়েছে। শোনার পর আফিমের মাথায় হাত। মেয়েটাকে ঘুমে রেখে গিয়েছিল। ভেবেছিল সকালের আগে সজাগ হবে না। অথচ আফিম চলে যাবার কিছুক্ষণ পরই মৃত্তিকা জেগে গিয়েছে। এখন উপায়?
পা টিপে টিপে বাড়ি ফেরে আফিম। কিচেনে গিয়ে ফ্রিজ থেকে কোকাকোলার ক্যানটা বের করে চুমুক দিতেই দুষ্টু বুদ্ধি মাথায় আসে তার। এদিক ওদিক খুঁজে কাচের গ্লাস হাতে তুলে নেয় সে। কোকাকোলা গ্লাসে ঢেলে গ্লাসটা নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে আফিম। মৃত্তিকা নিশ্চয়ই রেগে আছে, তার রাগটা আরেকটু বাড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করছে আফিমের। রাগিয়ে মেয়েটাকে একদম লাল বানিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। তখন তাকে একদম লাল বউ লাগবে। আফিম সেই মতোই ঘরের ভিড়িয়ে রাখা দরজা কিঞ্চিৎ ফাঁক করে। শার্টের তিনটে বোতাম খুলে চুল গুলোকে অগোছালো করে ফেলে। শার্টের নিচের এক প্রান্ত প্যান্টের ভিতরে ঢুকিয়ে নেয়। এবার তাকে বখাটে আফিম লাগছে। নিজের ছদ্মবেশ এত দ্রুত কেউ কি করে পাল্টাতে পারে? পোশাক-পরিচ্ছদ পাল্টে ফেলা যায় কিন্তু আচার-আচরণ, অভ্যেস, সহজাত কি করে এত দ্রুত বদলায় আফিম? টিমের সদস্যদের মনে এই প্রশ্ন সবসময়ই জাগে। বাইরে আফিম ছন্নছাড়া, ভবঘুরে আর বেকার। কিছুটা রসিক ধাঁচের, ভদ্রতা, সভ্যতার কোনো ছিটেফোঁটা থাকে না। কোনো বাচবিচার নেই তার। কিন্তু টিমের ব্রিফিং রুমে ঢুকতেই সে অন্যরকম হয়ে যায়। হাসিখুশি মুখটা তখন মাত্রাতিরিক্ত গম্ভীর দেখায়। প্রয়োজনের বাইরে সামান্য কথাও বলে না আফিম। কোনো শব্দ না করেই সে নিজের নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়ায়। সময়ের আগে আসা তার অভ্যেস নয়, তার নীতি। কারণ সে জানে অপারেশনে পাঁচ মিনিট দেরি হলে কারও জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তখন তার পোশাকে ভাঁজ থাকে না, জুতো থাকে চকচকে। ফাইলগুলো হাতে এমনভাবে ধরা থাকে যেন প্রতিটা পাতার ভেতরের তথ্য তার মুখস্থ। চোখে সেই চিরচেনা তীক্ষ্ণতা, তুখোড়তা থাকে। চারপাশে একবার তাকিয়েই যেন সবাইকে, সবকিছুকে হিসেবের মধ্যে নিয়ে নেয় আফিম। তখন কথা বলে কম। যখন বলে, কণ্ঠস্বর নিচু, দৃঢ় শোনায়। আত্মবিশ্বাস আর দাপট থাকে তার কথার মাঝে। কেননা টিমকে নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব তার কাঁধে।
তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি সোজা, হাঁটার ছন্দ মাপা, হাতের প্রতিটা নড়াচড়া খুব হিসেবি। অস্ত্র, কমিউনিকেশন ডিভাইস, ডকুমেন্ট সব নির্দিষ্ট জায়গায় রাখতে পছন্দ করে আফিম। বখাটে আফিম আর ফিল্ড অপারেটিভ আফিম মির্জার মাঝে বিস্তর ফারাক। কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারে না আফিম ভালে ছেলে, ভালো মানুষ।
আফিম হেলেদুলে ঘরে প্রবেশ করে। তার শরীর দুলছে, পা টলছে। এমন ভাবে আফিম নিজেকে উপস্থাপন করেছে যেন সে মাতাল, ঢকঢক করে একের পর এক মদের বোতল গিলে এসেছে সে। গ্লাসটা বা হাতে চেপে ধরে এলোমেলো পায়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে আফিম গান গেয়ে ওঠে,
“- নেশাআআআআআ, নেশাআআআআআ।
ও নেশাআআআ, নেশাআআআ। নেশা, নেশা লেগেছে প্রেমের নেশা। জাগে লায়লা মজনুর মনে ভালোবাসা।”
মৃত্তিকা বিছানা গোছাচ্ছিল। আফিমের এলোমেলো, কম্পিত স্বর শুনে ঘাবড়ায় সে। দ্রুত আফিমের পানে চেয়ে নেশাগ্রস্ত আফিমকে দেখে বিস্ফোরক ঘটে তার হৃদয়ে। আফিম টালমাটাল হয়ে দুলছে, পদচারণ এলোমেলো৷ পা দুটো স্থির নয়, হেলেদুলে পড়ে যাচ্ছে ছেলেটা। মনে হচ্ছে এই বুঝি লুটিয়ে পড়বে। তার চোখ আধখোলা, এলোমেলো পদধ্বনি, হাতে মদের গ্লাস দেখে থমকায় মৃত্তিকা। তব্দা বনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আফিম গ্লাসটা মাথায় তুলে গোলক হয়ে ঘুরে ফের মাতাল, জড় কণ্ঠে গেয়ে ওঠে,
“- তোর দিলের উইলে স্ট্যাম্প মেরে লিখে দেবো যে, আমি তোর প্যায়ারে লাল রে, প্যায়ার লাল রে, আমি তোর পেয়ারলাল রে”।
বলতে বলতে টালমাটাল হয়ে এগিয়ে আসে আফিম। মৃত্তিকার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দুর্বল মৃত্তিকার দেহ আফিমের দেহের ভারে বেকে যায়। আফিম তার ঘাড়ে মাথা রেখে শরীরের সমস্ত ভর মৃত্তিকার উপর ছেড়ে দেয়। মেয়েটাকে আগলে নেয় বুকের মাঝে। এতটাই শক্ত করে জড়িয়ে ধরে যে মৃত্তিকার দম আটকে আসে। ভারী দেহটা বুকের মাঝে আছড়ে পড়ায় তাল হারায় সে। আফিম মৃত্তিকার অস্বস্তি দেখে অগোচরে হাসে। মৃত্তিকার পিঠে হাত বুলিয়ে আবার গান গায়,
“- নেশা নেশা লেগেছে প্রেমের নেশা, তাই মজনু দেবে লায়লাকে শসা”।
হতভম্ব মৃত্তিকা। ঠেলেও আফিমকে সরাতে পারছে না। বিকৃত মুখ করে সে বলে ওঠে,
“- আপনি মদ্যপান করেছেন? আফিম? সোজা হয়ে দাঁড়ান, এসব কি”?
আফিম দুলছে। মৃত্তিকার দেহে ভারসাম্য রেখে দাঁড়িয়ে আছে। টলটলে আধখোলা চোখে হেলেদুলে মৃত্তিকার দিকে চায় আফিম। যেন সে সত্যিই নেশাগ্রস্ত, মাতাল একটা ছেলে।
“- হ্যাঁ করেছি তো”।
মৃত্তিকার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। আফিম বেরিয়েছে প্রায় মাঝ রাতে, ফিরেছে সকালে। কোথায় গিয়েছিল, কেন গিয়েছিল সব প্রশ্ন সাজিয়ে বসেছিল মৃত্তিকা। কিন্তু আফিম যে এমন মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরবে কল্পনাও করেনি সে। আফিম একবার বলেছিল সে কেবল সিগারেট খায়, আর কোনো নেশা তার নেই। তবে এসব কি? মিথ্যা বলেছিল আফিম? মৃত্তিকা রাগারাগি করে না। অত্যন্ত শান্ত, দৃঢ় কণ্ঠে সে শুধোয়,
“- আপনি বলেছিলেন সিগারেট ছাড়া অন্য কোনো নেশা নেই আপনার”।
আফিম উষ্কখুষ্ক চুল নাড়িয়ে মাথা ঝুকিয়ে মৃত্তিকার মুখের পানে তাকায়। বলে,
“- সিগারেট কি নেশা? সবাই তো খায়”।
“- বেয়াদবদের মতো কথা বলবেন না। সিগারেট ও এক ধরণের মাদকদ্রব্য। জেনেবুঝে নাটক করছেন”?
“- সিগারেট ছাড়াও আরো একটি নেশা আছে আমার।”
মৃত্তিকা জিজ্ঞেস করল না কিসের নেশা। আফিম নিজেই বলে উঠল,
“- প্রেমের নেশা, মৃত্তর দেহের সুগন্ধির নেশা”।
বলেই আফিম মৃত্তিকার ঘাড়ে মুখ গুঁজে শুকে নেয় ঘ্রাণ। নাক টেনে টেনে শুকে প্রিয়তমার শরীরের মিষ্টি ঘ্রাণ। এতে মৃত্তিকার রাগ কমে না। বরং তড়তড় করে বাড়ে রাগ। দাঁতে দাঁত পিষে সে বলে,
‘- তাহলে মদ খেয়েছেন কেন”?
আফিম মৃত্তিকার চিবুকে ঠোঁট ঠেকিয়ে হিসহিসিয়ে বলে,
“- ট্রায়াল করে দেখলাম, কোন নেশা সবচে বেশি মাতাল করতে পারে আমায়”।
‘- তা কি বুঝলেন”?
আফিম প্রগাঢ় হেসে বলে,
“- প্রিয়তমার নেশার চেয়ে ভয়ংকর কোনো নেশা নেই”।
মৃত্তিকা তাচ্ছিল্যের সুরে হেসে ফেলে। মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে,
“- অথচ আপনি এখন মাতলামি করছেন, নেশায় বুদ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আমার সামনে। এক মুখে আর কত মিথ্যে বলবেন”?
আফিম হেসে ওঠে। মানুষটা আশ্চর্য রকমের সুন্দর। একদম নিখুঁত মনে হয় তার সৌন্দর্য। এই মানুষটাকে কত নারীই না জীবনসঙ্গী হিসেবে চেয়েছে, কত নারী আবেশিত হয়েছে। মানুষটা একটু খানি ভালো হতে পারে না? কল্পনার পুরুষের মতো ভদ্র-সভ্য হতে পারে না? কাজবাজ করে খেটে খেতে পারে না? মানুটা যেমন সুন্দর, কর্মকাণ্ড তেমনই বিশ্রী।
আফিম সটান হয়ে দাঁড়ায়। গ্লাস থেকে পানীয় পান করে। মৃত্তিকা কঠিন চোখে তাকিয়ে রয় আফিমের দিকে। আফিম তার চাহনি দেখে বলে,
“- খাবে”?
রাগে শরীর রি রি করে ওঠে মৃত্তিকার। সে মুখ ফিরিয়ে নিলে আফিম দু আঙুল দিয়ে মৃত্তিকার গাল চেপে ধরে। অতঃপর তার মুখের সামনে গ্লাসের প্রান্ত ধরে। তার কাজে বিস্মিত মৃত্তিকা। চোখ জোড়া টলটলে হয়ে ওঠে আফিমের এই কাজে। মৃত্তিকার অনুমতি না নিয়েই আফিম গ্লাসের পানীয় ঢেলে দেয় মৃত্তিকার জিভের ডগায়। সাথে সাথে মৃত্তিকা মুখ কুঁচকে ফেলে। দাঁতে দাঁত চেপে ধরে। গিলতে চায় না পানীয়টুকু। মুখ থেকে পানি বের করে দিতে উদ্যত হলেই বিকৃত মুখ সহসা নরম হয়ে ওঠে। পানীয় গিলে সন্দেহপূর্ণ দৃষ্টিতে চায় আফিমের দিকে। মৃত্তিকা সরাসরি কখনো মদ দেখেনি, খায়ওনি কোনোদিন। তবে কোকাকোলার স্বাদ তার চেনা। সন্দেহ নিয়ে সে প্রশ্ন করে,
“- এটা খেতে কোকাকোলা, মোজোর মতো।”
আফিমর গ্লাসের শেষের পানীয় টুকু নিজে পান করে বলে,
“- আমি মদ খাই না মৃত্ত, আগেও বলেছি। তুমি যা ভাবছো, এটা তাই। কিচেন থেকে নিয়ে এলাম।
“- তাহলে এতক্ষণ এমন করলেন কেন”?
“- মজা করলাম”।
“- এটা কি ধরণের মজা আফিম? আপনি একটু আগে যা যা করলেন, বললেন, সব মজা ছিল”?
“- হু, কসম”।
মৃত্তিকার এতক্ষণের জোর, শক্তি নিভে যায়। ধপ করে বিছানায় বসে পড়ে সে। পরক্ষণেই মুহুর্তের মাঝে বিছানা ছেড়ে উঠে আফিমের দিকে তেড়ে যায় মৃত্তিকা। আফিমের শার্টের কলার চেপে ধরে সে। কয়েকটা এলোপাথাড়ি কিল ও বসায় আফিমের বুকে। হিংস্র কণ্ঠে বলে,
“- আপনি খুব বাজে, খুব বদমাশ। আমি, আমি আপনাকে ক্ষমা করবো না। আপনি আমাকে আঘাত করেছেন আফিম”।
আফিম মৃত্তিকার কোমরে চাপ প্রয়োগ করে বলে,
“- আর করবো না, এটাই শেষ”।
“- প্রতিবারই এসব বলেন। আপনাকে আমি বিশ্বাস করি না”।
“- করো না, আমি করতে বলেছি”?
“- কোথায় গিয়েছিলেন আপনি”?
“- বন্ধুদের সাথে এলাকা টহল দিতে”।
“- তাই বলে সারারাত”?
“- উত্তরায় দুজন ছেলেমেয়ে কট খেয়েছে। পোলাপান ফোন দিয়েছিল, তাই যেতে হলো”।
“- সেখানে আপনার কাজ কী”?
“- আমারই তো সব কাজ। ছেলেটাকে ধরে কয়েকটা থাপ্পড় দিলাম, মেয়েটার বাবা-মাকে কল করলাম, জরিমানা নিয়ে ছেড়ে দিলাম”।
বিস্ময়ে চোয়াল হা হয়ে যায় মৃত্তিকার। বলে,
“- আপনি এ ধরণের গুণ্ডামিও করেন? ভালো হবেন না আপনি”?
আফিম হতভম্ব চোখে চেয়ে বলে,
“- আমি কি খারাপ”?
“- অবশ্যই। মাস্তানদের কেউ ভালো চোখে দেখে”?
“- কারো দেখায় যায় আসে না, তুই কোন চোখে দেখিস সেটাই ফ্যাক্ট”।
“- আপনার কি মনে হয়? আপনি এসব করেন জেনে আমি খুব খুশি?”
“- আমি জানি আমার সুইট সিক্সটিন এসব পছন্দ করে না”।
‘- জেনেও শোধরান না”।
“-, কথা বলো না, কাছে আসো তো”।
মৃত্তিকা প্রতিবাদী সুরে বলে,
“-, ছোঁবেন না আমায়।”
“- কাকে ছোঁবো”?
“- যাকে ইচ্ছে”।
“- তাহলে তোমাকেই”।
মৃত্তিকাকে জড়িয়ে ধরে আফিম। মৃত্তিকা রেগে সরে যেতে চাইলে তার হাত টেনে ধরে আফিম। বলে,
“- মৃত্ত, মুখে কি নাও তুমি”?
মৃত্ত ভ্রু উঁচিয়ে বলে,
“- কি নিবো? কিছুই না”।
এগিয়ে এসে মৃত্তিকার গালে জিভের ডগা ছুঁইয়ে আফিম বলে ওঠে,
“- তাহলে মিষ্টি মিষ্টি লাগে কেন”?
মৃত্তিকা আফিমের শয়তানি ধরে ফেলে তৎক্ষনাৎ। ধাক্কা দিয়ে বলে,
“- বদমাশ কোথাকার। আমার থেকে দূরে থাকবেন। আপনি খুব খারাপ, খুব বদ। আমার প্রতি কী আপনার একটুও মায়া হয় না? একটুও দয়া হয় না? করুণা টুকুও তো করতে পারেন। ভালো হতে পারেন তো একটু”।
শিহাব সেলে বন্দি। এই সুযোগে ঝামেলা ছাড়াই সাবিহাদের বাড়িতে প্রবেশ করেছে আফিম। যদিও সাবিহার বাবা অনেক বেশি রেগে গিয়েছে আফিমকে দেখে। তবু কিছু করার সামর্থ্য হয়নি তার। শিহাব অ্যারেস্ট হয়েছে এ খবরটা দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে গিয়েছে। কিভাবে শিহাব আর তার দল মাদকদ্রব্য ও মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ বিক্রি করতো সেসবের ফুটেজ ও লিক করে দেয়া হয়েছে। জনগন ছিঃ ছিঃ করছে, ধিক্কার জানাচ্ছে। শিহাবের বাবা-মা উদ্বিগ্ন। একেই সাবিহার এই অবস্থা, তার উপর ছেলেটাও অপরকর্ম করে ধরা পড়েছে। তাই ভীষণ পীড়ায় আছে তারা। আফিমকে আটকানোর চেষ্টা করেও বিশেষ লাভ হয়নি। আফিম এসেছে শহর দাপিয়ে। পঞ্চাশটা বাইকে প্রায় শতাধিক ছেলেপেলেকে নিয়ে এমন ভাবে বাড়িতে ঢুকেছে যে দারোয়ানও ভয়ে কিছু করতে পারেনি। বাড়িতে ঢোকার পর সব ছেলেদের বৈঠকখানায় রেখে আফিম এসেছে সাবিহার ঘরে। সাবিহাকে দেখতে এসেছে ঠিকই, কিন্তু এখন তার অস্বস্তি হচ্ছে। মেয়েটার এখন কি অবস্থা কে জানে? আফিমকে দেখে কেমন অভিব্যক্তি দেখাবে মেয়েটা তা নিয়েও উত্তেজনা আছে আফিমের মনে। মেয়েটা ওকে ভুল বুঝুক আফিম তা চায় না মোটেই। সাবিহার প্রতি মায়া জন্মেছে আফিমের। সেদিন রাতে শিশুর ন্যায় পবিত্র মেয়েটি তাকে ভাই বলে ডেকেছিল, ভরসা করে তার বাইকে উঠেছিল। আবেগী হয়ে ভাই ভাই বলে উৎফুল্ল হয়ে তাকিয়েছিল আফিমের পানে। আফিমের তো আপন ভাই বোন নেই। এলাকার ছেলেগুলে ওর ভাই, সবাই ওকে দেখেই লম্বা সালাম দেয়, ভক্তি ও সমীহ করে খুব। এই সাবিহাকে দেখেই আফিমের হৃদয় গলেছিল। নিজেকে ভাই বলে মনে হয়েছিল।
দরজা খুলতেই সাদা ফ্রক পড়া সাবিহাকে দেখে আফিম। টেডিবিয়ার নিয়ে মেয়েটা টেবিলে বসে আছে। ক্ষণে ক্ষণে পা নাড়াচ্ছে। যদিও মুখে আগের মতো উচ্ছ্বাস নেই, মুখ খানা মলিন, উদাস। ঠোঁটের কোণে রক্ত জমাট বাঁধা, হাতে পায়ে কাটা-ছেঁড়ার সহস্র দাগ। ওকে এভাবে দেখতেই আফিমের পাষণ্ড হৃদয় থমকে গেল। সরকারের একজন প্রতিনিধি হয়ে এ ধরণের আবেগ থাকা অত্যন্ত বোকামি। আফিমের মতো লিডাররা হয় কঠোর, তাদের হৃদয় হয় পাথরের মতো শক্ত। রক্ত, পঁচে-গলে যাওয়া মাংস ও তাদের কাছে দুধ ভাত। বিপদ, ভয়, আতঙ্ক কখনো তাদের কাবু করতে পারে না। আবেগের চেয়ে বিবেকের ধারাই বজায় রাখা হয় এই পেশায়। তবুও কেন জানি প্রথমবারের মতো সাবিহার মলিন মুখ দেখে বুক চিঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে আফিমের। ধীর পায়ে ঘরে ঢোকে সে। সাবিহা বই থেকে চোখ মেলে আফিমকে দেখে চিনতে পারে না প্রথমে। একটু ভালো করে তাকাতেই আফিমের সবুজাভ চোখ দেখে মেয়েটার চোখ মুখে আতঙ্ক নেমে আসে। সে অস্ফুটে স্বরে বিস্ফোরক ঘটিয়ে বলে,
“- আফিম ভাই”?
আফিম ভেবেছিল সাবিহা তাকে চিনবে না। ওইদিন তার মুখ সাবিহা দেখেনি। দেখেছিল কেবল সটান দেহ আর সবুজাভ চোখ। তখন তার নামটুকুও জানানো হয়নি মেয়েটাকে। অথচ এক দেখায় মেয়েটা তাকে চিনেছে কেবলই চোখ দেখে। এই সবুজাভ চোখ তার হৃদয়ে কতখানি প্রভাব ফেলেছে তা উপলব্ধি করতে পারে আফিম। নিজের জন্য আফিমের বড্ড করুণা হয়। সাবিহা তাকে ভয়াতুর চোখে দেখছে, খারাপ ভাবছে এটা কি সে চেয়েছিল?,
-” তুমি আমার নাম জানো সাবিহা”?
সাবিহা ভয় পায়। উঠে দাঁড়ায় চেয়ার ছেড়ে শব্দ করে। পুতুলটাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে,
“- তুমি আমায় কষ্ট দিয়েছো, আঘাত করেছো। আমি তোমাকে চিনি। তুমি চলে যাও, আমি কাঁদবো কিন্তু।”
আফিমের হৃদয়ে ক্ষত তৈরি হয়। বুকের ভেতরটায় তোলপাড় শুরু হয়। ধীরে ধীরে সে সাবিহার কাছে আসতে আসতে বলে,
“- বনু, ভয় পেও না। আমি তোমাকে ওইদিন চকলেট দিয়ে, আইসক্রিম দিয়ে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিলাম না? তখন কি আমি খারাপ ব্যবহার করেছি? খারাপ হলে আমি তোমায় ফিরিয়ে দিতাম বলে? আমি তোমায় আঘাত করিনি, বিশ্বাস করো। ওই ছেলেটা আমি ছিলাম না”।
সাবিহা কেঁদে ফেলে। ঠোঁট ভেঙে আসে তার। প্রতিবাদী সুরে বলে,
“- মিথ্যে বলছো, তোমার সবুজ চোখ আমি দেখেছি। তুমি আমার ফ্রক ছিঁড়েছো, ব্যাড টাচ করেছো, তুমি খুব খারাপ।
আফিম থমকে তাকায়। পর মুহুর্তেই ফর্মাল প্যান্টের পকেট থেকে লেন্স বক্স বের করে আয়না না দেখেই দ্রুত দু চোখে কালো লেন্স পড়ে নেয়। সাবিহা দেখে সবটা। তবে এসবে তার ধারণা কম। বাহিরের জগতটা তার অপরিচিত। ফোনে কার্টুন ছাড়া তেমন কিছুই দেখে না সে। তাই বিষয়টা নতুনই মনে হলো ওর। আফিম দু চোখে লেন্স পড়ে বলল,
“- এই দেখো, চোখের মনি চেঞ্জ করা যায়। কেউ সবুজ লেন্স পড়ে তোমাকে অ্যাটাক করেছিল। কারণ তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে। এই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই কেউ তোমার ক্ষতি করেছে। আমাকে একটু বিশ্বাস করো বনু। যে তোমার এই হাল করেছে, তাকে আমি জিন্দা কবর দিবো”।
সাবিহা অতশত বুঝল না। তবে বিশ্বাস করল একটু আধটু। আফিম বলল,
“- সবুজ চোখ ছাড়া আর কোনো কিছু দেখেছিলে তুমি ওই ছেলেটার? আমার মতো “এ” অক্ষরের চেইন ছিল তার গলায়? কোনো কিছু কি তোমার মনে আছে যা দেখে আমি ছেলেটাকে ধরতে পারবো?”
সাবিহা অবুঝের ন্যায় তাকিয়ে রয়। আফিম সহজ করে বলে,
“- ওর গায়ে কোনো চিহ্ন দেখেছিলে? তুমি ওকে আঘাত করেছিলে কোন ভাবে? ওর হাতে পায়ে কোনো ট্যাটু ছিল”?
সাবিহা একটু ভেবে মলিন কণ্ঠে বলে,
“- আমি ওর গলায় আমার বড় নখ দিয়ে কেটে দিয়েছিলাম। আর, আর ওর হাতে কামড়ে দিয়েছিলাম।”
“- ওর মুখ দেখোনি”?
“- তোমার মতো হেলমেট পড়া ছিল, মুখ দেখিনি আমি”।
“- আর কিছু মনে পড়ছে? একটু ভেবে বলো সোনা। তোমাকে যে কষ্ট দিয়েছে তাকে না ধরতে পারলে আমার শান্তি হবে না”।
সাবিহা মাথা চুলকে বলে,
“- গলাটা খুব চেনা ছিল। আমি শুনেছি এর আগেও। তোমার মতো গলা ছিল না তো”।
“- চেনা? প্রায়ই শোনো এমন কিছু”?
“- জানি না”।
আফিম সাবিহার কাছে এগিয়ে আসে। মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে পকেট থেকে বের করে দামী ডার্ক চকলেট। সাবিহা চকলেটটা দেখে প্রথমে খুশি হয়, পরক্ষণেই সেই চোখ দেখে ঘাবড়ে যায় খুব। বলে,
“- না আমি নেবো না। ভাইয়া বলেছে কিছু নিতে না। এগুলো খেলে আমি মরে যাবো”।
আফিমের নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হয়। কি নিষ্পাপ বাচ্চা! দেখলেই মায়া ধরে। অথচ কাপুরুষটা একটুও দয়া করেনি মেয়েটাকে। নিষ্ঠুর ভাবে নির্যাতন করেছে নরম দেহের উপর।
আফিম বেরিয়ে আসে বাইরে। আফিমের দলের কেউ এমনটা করেনি। আফিমের মনে হচ্ছে শিহাবের শত্রুদের মধ্যে কেউ এমনটা করেছে। আফিম আর শিহাবের মাঝে শত্রুতা আছে এ সম্পর্কে ওই অচেনা ব্যক্তি অবগত। জেনে বুঝে, পরিকল্পনা করে এই শত্রুতাকে কাজে লাগিয়ে নিজ স্বার্থ হাসিল করেছে জানোয়ারটা। কিন্তু কে করেছে এমনটা? আফিম দলবলকে নিয়ে একত্রে মিটিং এ বসে। শিহাবের শত্রুদেরকে খোঁজ করতে হবে। শিহাব কারাগারে, অতএব ওর বিশ্বস্ত কারো সাথে কথা বলে শিহাবের শত্রুর কাছে পৌঁছাতে হবে। এমন একটি ছেলের খোঁজ আফিম জানে। শিহাবের ডান হাত, আসাদ। সবসময় শিহাবের সাথেই থাকে ছেলেটা। দুয়েকবার ঝামেলায় আসাদও ছিল শিহাবের সাথে। সাবিহার ওই ঘটনার পর থেকে ওকে দেখা যায়নি। আসাদের মা অসুস্থ বলেই ওর দেখা মিলছে না। শিহাবের সাথে মাদক চালানেও ওকে দেখেনি আফিম।
আফিম শহরের রাস্তা উড়িয়ে, শতাধিক ছেলেদের নিয়ে বাইক চালিয়ে আসাদের বাড়িতে ছুটে আসে। আসাদ ঘরেই ছিল। আফিম সরাসরি ওকে ডাকে বাইরে। বিভিন্ন জিজ্ঞাসাবাদ করে শিহাবের সম্পর্কে। কোনো কিছু জানতে না পেরে হতাশ হয় আফিম। যথারীতি আসাদের সাথে কথা বলে তার বাড়ি পেরিয়ে রাস্তায় উঠে ফেরার জন্য বাইকে বসতেই আফিম সময় নেয়। থমকে দাঁড়ায় দুদণ্ড, ভাবে কিছু। মাথায় কিছু একটা চেপে বসতেই দৌড়ে ছুটে যায় আসাদের বাড়ির দিকে। ওকে ছুটতে দেখে বাইক ফেলে আরো পঁচিশ ছাব্বিশ জন ছুটে যায় আফিমের পিছু পিছু। ধরতে পারে লিডারের ভাবনা। বিপদ আঁচ করে কিংবা কোনো সন্ধান পেতেই যে আফিম ছুটেছে তা বুঝতে পারে ওরা। আফিম আসাদকে পায় না বাড়িতে। কোথায় যেন গিয়েছে মাত্র। আফিম পুরো অলিগলিতে লোক পাঠায়। চিৎকার করে সবাইকে নির্দেশনা দিয়ে এদিক ওদিক ঠেলে দেয়। উন্মাদের ন্যায় ছুটে যায় দিগবিদিক। রেপিস্ট আর কেউ নয়, আসাদ নিজেই।
সাবিহার কথা অনুযায়ী রেপিস্টের হাতে কামড়ে দিয়েছিল সাবিহা। আসাদের সাথে কথা বলার সময় তীক্ষ্ণ, বুদ্ধিদীপ্ত আফিমের চোখ পড়েছিল আসাদের হাতে। সেখানে ব্যান্ডেজ করে রাখা ছিল, এমনকি গলার কাছে মাফলার জড়িয়ে রেখেছিল আসাদ। তখন অতকিছু বোঝেনি সে। সাবিহা রেপড হওয়ার পর আসাদ আর শিহাবের সাথে কথা বলেনি, দেখাও করেনি তার জানামতে। চোরাচালানের সময় শিহাবের দলের সবাই ধরা পড়লেও আসাদকে পুলিশ ধরেনি। আসাদের ওই ক্ষত গুলোর কারণ সাবিহা নয়তো? ভেবে আফিমের মাথায় বাজ পড়ে। শিহাবের এত কাছের মানুষ আসাদ। কি করে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করল? ওদের মধ্যেকার বিবাদকে সামনে রেখে নিজের স্বার্থ হাসিল করল, নোংরা খেলায় মেতেত উঠল। কিভাবে করল এমনটা?, আফিমের উপর রাগ থাকায়? কিন্তু আফিমের উপর রাগ রাখার কারণটা তো শিহাব। আফিম শিহাবের শত্রু বলেই আসাদেরও শত্রু। তাহলে শিহাবের ক্ষতি করে তাকে সেলে পাঠানোর পরিকল্পনা কি করে করতে পারে ওরা?
উদয় নামের একটি ছোট ভাই আফিমের দ্বারে এসে বলে,
“- ভাই আপনি কী আসাদরে সন্দেহ করেন? আপনারে পুলিশ ধইরা নেওয়ার একটু আগেই আসাদরে আমি গুলিস্তানের মোড়ে দেখছি। ওর চোখ লাল টকটকা ছিল। চোখ দিয়া পানি পড়তাছিল। ও ক্যামনে এইসব করে? ওয় তো শিহাবের ভালো বন্ধু”।
আফিম কোমরে হাত রেখে উদয়ের দিকে তাকায়। হেসে বলে,
“- ভুল-ভাল, কম দামী লেন্স পড়লে চোখ লাল তো হবেই, পানিও পড়বে। আসাদ সাবিহাকে অ্যাটাক করার পরই লেন্স খুলে ফেলেছে। দুদিন বের হয়নি, চোরাচালানেও অংশ নেয়নি। ভেবেছিল আমি সেজে নিকৃষ্ট কাজটা করলে কপউ কোনোদিন ওকে সন্দেহ করবে না।”
আফিম লেদার জ্যাকেটের ভিতরে লুকোনো পকেট থেকে একটি দামী স্মার্টফোন বের করে। পুলিশ ফোর্সের হেডকে কল করে বলে,
“- শাফায়াত আফিম মির্জা, আন্ডারকভার এজেন্ট, ফিল্ড অপারেটিভ স্পিকিং। একজনের ছবি পাঠাচ্ছি। ছবিটি এখনই সব ইউনিটে পাঠিয়ে দিন।
এই ব্যক্তিকে কোনোভাবেই ঢাকার সীমানার বাইরে যেতে দেওয়া যাবে না। শহরের ভেতরে যেখানেই তাকে শনাক্ত করা হবে, সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হবে। প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের অনুমতি রইল।
সমস্ত মোবাইল টিম, চেকপোস্ট, ট্রাফিক ও ইন্টেল ইউনিটকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রাখার আদেশ রইল। পুরো শহর অবরুদ্ধ করে ফেলুন। ইটস আ অর্ডার”।
আজকে অফিসে মিটিং ছিল। ছুটির এই সময়টাতে মিটিং বসায় খুব বিরক্ত রাইমা। তবুও ক্লান্তি নেই তার অভিব্যক্তিতে। শান্ত কিছুক্ষণ আগে ওয়াশরুমে যাওয়ার বাহানায় এক নজর রাইমাকে দেখেছে। সেদিনের পর থেকে রাইমা তার সাথে যেচে কথা বলে না। কিছুটা চুপচাপ, শান্তও হয়ে গেছে মেয়েটা। শান্তর খুব অস্বস্তি হয়। তার জন্য প্রাণোচ্ছল মেয়েটা দমে গেছে, তার ছটফটে দুরন্তপনাও আটকে গেছে। অতটা রুড না হলেও তো চলতো, বুঝিয়ে বললেও তো রাইমা বুঝতো। আরেকটু গুছিয়ে, বুঝিয়ে বললে মেয়েটা হয়তো মন খারাপ করতো না। ওই সময় শান্ত কেন আরেকটু শান্ত হলো না? তার অন্তর্মুখী স্বভাবটা তখন ধরা দিল না কেন কে জানে?
অফিস ছুটি হলে শান্ত বাইকের চাবি নিয়ে রাস্তায় আসে। রাইমাও বের হয় তখন। শান্ত পার্কিং লট থেকে বাইকটা বের করে দেখে রাইমা বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। শান্ত একটু অপেক্ষা করে রাইমার উদ্দেশ্যে বলে,
“- আপনি চাইলে আমি আপনাকে পৌঁছে দিতে পারি”।
রাইমা শান্তর দিকে তাকায় নরম ভাবে। তার অভিমানী চোখ জোড়া শান্তর চোখে চেয়ে থাকতে পারে না বেশিক্ষণ। চোখ ফিরিয়ে নিয়ে সে বলে,
“- ধন্যবাদ স্যার। আমার প্রয়োজন হবে না।”
শান্ত বিব্রত হলো। প্রথমবার কাউকে স্বেচ্ছায় লিফট দিতে চাইল, অথচ সে রাজি হলো না। বিষয়টা আসলেই বিব্রতকর। তবুও সে বলল,
“- বাস আসতে লেট হবে”।
রাইমা উপহাস করে আলতো হাসে। বলে,
“- আপনি আমার স্যার, আপনার সাথে আমার দুরত্ব বজায় রাখা উচিত। ভুলে যাচ্ছেন”?
শান্ত ফোঁস করে শ্বাস ফেলে। বাইকের চাবি ঘুরিয়ে লকড করে রাইমার দিকে চেয়ে সে বলে,
“- দেখুন রাইমা, আমি ওদিন যা বলেছি তা মন থেকে বলিনি। আসলে আমি আলোচনা-সমালোচনা দুটোতেই ভয় পাই। আপনি যেভাবে আমার ডেস্কে বারবার আসতেন তাতে অনেকে অনেক কিছু ভেবে বসতে পারে তাই আমি আপনাকে সাবধান করেছিলাম।”
“- তাহলে এখন কেন কাছে যেতে বলছেন”?
রাইমার কণ্ঠে তেজ আছে। কঠিন তার চাহনি, দৃঢ় মনোবল। শান্ত এই রাইমাকে চেনে না, দেখেনি আগে। তার কথায় খানিক ভড়কে যায় শান্ত। তবুও বিজ্ঞদের মতো বলে,
“- অফিসে আমি আপনার বস হলেও অফিস থেকে বের হওয়ার পর আমাদের মাঝে অফিশিয়াল কোনো সম্পর্ক থাকে না রাইমা। অফিসের বাইরে কোথাও কেউ আমাদের নিয়ে আলোচনা করলে আমার একটুও গায়ে লাগবে না”।
“- এত ভয়”?
“- সম্মানের ভয়। আমি ছেলে মানুষ। আমাকে হয়তো খুব বেশি সাফার করতে হবে না। কিন্তু আপনাকে ঘিরে কোনো রকম আলোচনা হোক, আপনার নামে বদনাম হোক আমি তা চাই না। আ’ম স্যরি, ওরকম ভাবে বলা আমার উচিত হয়নি”।
রাইমা নরম মনের মানুষ। প্রাণোচ্ছল আর আবেগী। রাগ বেশিক্ষণ টেকে না ওর। মানুষের একটু ভালো আচরণ, নরম স্বর তার ভাঙা হৃদয়কে জোড়া লাগাতে পারে। রাগের পাহাড়কে ভেঙে ফেলতে পারে। সে মিছে রাগ দেখিয়ে বলে,
“- এতদিন পর মনে হলো যে আপনি ভুল করেছেন”?,
“- এতদিন? দুদিন ও তো হয়নি”।
“- আমার কেন মনে হলো অনেকদিন আপনার সাথে কথা হয়নি? রাগ চেপে রাখতে পারি না আমি, আমার দিন কাটে না। আমি খুব রাগ করেছিলাম আপনার উপর।”
শান্ত একটু হাসে। বলে,
“- ফুচকা খাবেন?, সামনের রোডে বিক্রি করে।”
রাইমার চোখ চকচকে হয়ে ওঠে। বলে,
“- আপনি খাওয়াবেন”?
“- হ্যাঁ”
“- তাহলে চলুন।”
রাইমার রাগ, অভিমান নিভে গেল। দুরন্ত পায়ে শান্তর বাইকের ব্যাক সিটে উঠে বসল।
চলবে?
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি_শেখ
Share On:
TAGS: ওরা মনের গোপন চেনে না, বৃষ্টি শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৩
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১০
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৮
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১
-
ওরা মনের গোপন চেনেনা পর্ব ৬
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১২
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৯
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৯
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৬
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২০