ওরমনেরগোপনচেনেনা
পর্ব সংখ্যা [২২] [ রোমান্স এলার্ট🙂 ]
[ প্রাপ্তমনস্কদের জন্য উন্মুক্ত ]
ফুটপাতের ধার ধরে হেঁটে চলেছে মৃত্তিকা। কাঁধে ব্যাগ ঝুলছে, মাথার ওড়না চুলের উপরিভাগে থাকছে না। বারবার নেমে আসছে ঘাড়ের পেছন অংশে। বিরক্তিতে ওড়না ঠিক করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটিও মৃত্তিকা করছে না। শিহাবদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটছে সে। সকাল হয়তো ন টা বাজে। ফোনটা ভাইব্রেট করে রেখেছে। একের পর এক কল আসায় ব্যাগটাও কেঁপে উঠছে ঘন ঘন। মৃত্তিকা আলস্য ভঙ্গিতে ফোনটা ব্যাগ থেকে বের করে। ধাতস্থ হয়ে মেহমেতের কল ওঠায় সে। কলটা তুলতেই ওপাশ থেকে কর্কশ কণ্ঠে মেহমেত বলে ওঠে,
“- কোথায় তুই? টিভিতে এসব কি দেখাচ্ছে? আফিম ধ”র্ষক? ও ধ”র্ষণ করেছে”?
মৃত্তিকা শান্ত কণ্ঠে জবাব দেয়,
“- আমি জানি না”।
মেহমেত বাজখাঁই কণ্ঠে বলে,
“- বারবার বলেছিলাম ওই বখাটে, ভবঘুরে ছেলের সাথে যাস না। কোনো কথা শুনিস না, বেশি পেকে গেছিস। ওদের মতো ছেলেরা কেমন হয় জানিস না? একই ভুল বারবার করতে খুব ভালো লাগে? তুই এ বাড়ি চলে আয়। ওর সাথে তোকে থাকতে হবে না। আশেপাশের মানুষ ছিঃ ছিঃ করছে”।
মৃত্তিকা ভাইয়ের কথায় একটুও কষ্ট পেল না। বরং পা চালিয়ে যেতে লাগল। ধীরস্থির কণ্ঠে খুব স্বাভাবিক ভাবে বলল,
“- আমার এই দুঃসময়েও তুমি খোঁটা দিচ্ছো, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমার ঘা গুলোকে তাজা করছো, একগাদা অভিযোগ ছুঁড়ে মারছো আমার দিকে। অথচ এটুকু বুঝতে পারছো না আমি ঠিক কোন অবস্থায় আছি, আমার মানসিক অবস্থা কেমন।”
হেসে ফেলে মৃত্তিকা। ফোনের ওপাশ থেকে মেহমেত স্পষ্ট বোনের প্রাণখোলা হাসি শুনতে পায়। দমে যায় সে। এবার খানিক কোমল স্বরে বলে,
“-, ওর মতো ছেলের সাথে তুই সংসার করতে পারবি না মৃত্তি। চলে আয়, ভয় পাস না। আমরা তো আছিই। আফিম যে কুকর্ম করেছে, এখন যদি ওকে ক্ষমা করিস পরে আরো পস্তাবি।”
মৃত্তিকা তাচ্ছিল্যের সুরে হেসে বলে,
“-, আমার জীবনটাই এমন ভাইয়া। রাখো এখন, আমি ঠিক আছি”।
কলটা কেটে ফোন সুইচড অফ করে রাখে মৃত্তিকা। ফোনটা পুনরায় ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখে। সহসা একটি গান তার মস্তিষ্কে বাজে। সুর গুলো আঁকড়ে ধরে তার কণ্ঠকে। মৃত্তিকা ধুলোবালি জমা চওড়া রাস্তার পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটে। আনমনে গুনগুন করে গেয়ে ওঠে,
“ আমাররর, জনম গেল ভুলে ভুলে কইরা পিরিতি,
জনম গেল ভুলে ভুলে, কইরা পিরিতি,
প্রেমের হাঁটে মন হারাইলাম, না জেনে ক্ষতি।
আমি প্রেমের হাঁটে মন হারাইলাম, না জেনে ক্ষতি।”
কিছুক্ষণ পর অটো ধরে মৃত্তিকা থানার সামনে আসে। আসার বোধহয় প্রয়োজন ছিল না। সবাই আছে থানায়। তার এসে কোনো লাভ হবে না। তবুও এসেছে মৃত্তিকা। আফিমকে কি একটিবার দেখে যাবে? দেখবে কেমন আছে মানুষটা? আফিম খুব গর্ব করে বলেছিল তাকে কেউ মারতে পারবে না। তার ক্ষতি করার ক্ষমতা কারো নেই। সেই গর্ব কোথায় গেল? গতকাল ওদের সামনেই আফিমকে মেরেছে পুলিশরা। আফিম বাঁধা দেয়ায় ওরা আরো হিংস্র হয়ে উঠেছে। রাতে কি আবারও ওরা আফিমকে মেরেছে? মিটিয়েছে ব্যক্তিগত ক্রোধ?
বাকিদের সাহায্যে মৃত্তিকা আফিমের সাথে দেখা করার অনুমতি পায়। জেলের সামনে এসে ওর পা জোড়া টলে ওঠে। ঢোগ গিলে সে। আফিমকে দেখার পর সে গলে যাবে না তো? কেঁদে ফেলবে না তো? নিজের দুর্বলতাটুকু প্রকাশ করতে চায় না মৃত্তিকা। আফিমকে দেখাতে চায় না তার সহজাত।
আফিম বসে আছে মাথা ঝুকিয়ে। ভেতরে একটি বেঞ্চ রাখা। বেঞ্চ চেপে ধরে বসে আছে ছেলেটা। গা উদাম আফিমের। কয়েকটা মোটা, গাঢ় কালসিটে দাগ দেখা যাচ্ছে। দাগ গুলোতে নজর পড়তেই আঁতকে ওঠে ওঠে মেয়েটা। অস্ফুটে শব্দ করে ওঠে। মৃত্তিকার ভীতু আর্তনাদ শুনে আফিম মাথা উঁচিয়ে তাকায়। তার চাহনি দেখে দু কদম পিছিয়ে যায় মৃত্তিকা। আফিমকে ভয়ানক দেখাচ্ছে। অদম্য রাগ, জেদে চোখ জোড়া হিংস্র, ধারালো হয়ে উঠেছে। মৃত্তিকাকে দেখে সে উঠে আসে। শিকের সামনে এসে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে বলে,
“- এত সকালে আসতে গেলে কেন? আজ টিউশন নেই”?
স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর আফিমের। যেন কিছুই হয়নি ওর সাথে। আঘাতে শরীরের চামড়া কুঁচকে গেলেও একটুও কুঁজো হয়নি আফিম, সামান্যতম দুর্বল, ক্লান্ত কিংবা অসহায় দেখাচ্ছে না আফিমকে। সবকিছু যেন আগের মতোই আছে, কোনো পরিবর্তন নেই। মৃত্তিকার ভয় বাড়ে। অতিরিক্ত আঘাত পেলে শরীর অসাড়, অকেজো হয়ে যায়। তখন আর মাইর শরীরে লাগে না, কোনো আঘাতই দেহকে যন্ত্রণা দিতে পারে না। তবে কি আফিমের দেহও অকেজো হয়ে গেছে? তাই এত দৃঢ় ভাবে দাঁড়িয়ে আছে? নইলে এভাবে সটান ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে কি করে লোকটা? নাকি অভিনয় করছে নিজেকে ঠিক দেখানোর? আফিম যে মাথা নত করার ছেলে নয়, নিজেকে কখনো দুর্বল দেখায় না সে। দুর্বলতা প্রকাশ ও করে না। শিকের উপরে আফিমের হাতটায় মৃত্তিকার হাত ছোঁয়াতে ইচ্ছে করে। কিন্তু মনকে একদমই প্রশ্রয় দেয় না সে। দৃঢ় স্বরে বলে,
“- ওরা আর মেরেছে আপনাকে”?
আফিম মৃদু হাসে। বলে,
“- মারবে না?”
“- সবসময়, সবখানে রাগ-জেদ খাটে না”।
“- আমি বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত নই, আফসোস ও হচ্ছে না”।
মৃত্তিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। নত হয় তার মুখ। আফিমের চওড়া বুক লাল বর্ণ ধারণ করেছে। পেটের কাছে একটি মোটা কালসিটে দাগ। ঠোঁটের কোণেও লালচে হয়ে আছে। এসব মোটেই দেখতে ইচ্ছে করছে না মৃত্তিকার। আফিমের দিকে তাকালেই বুক ভার হয়ে আসছে, পুড়ে যাচ্ছে বক্ষ। আফিম মৃত্তিকাকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
“- তোমার মাথায় ওড়না নেই কেন?”
থমকায় মৃত্তিকা। রাশভারি কণ্ঠে মাথা তোলে। সবুজ রঙের ওড়নাটা ঘাড়ে নেমেছে, আর তোলা হয়নি। আফিম তেজ দেখিয়ে বলে,
“- ওড়না দাও মাথায়। আমি কাছে নেই বলে খুব উড়ছো”।
মৃত্তিকা অস্থির হয়ে মাথার কাপড় তোলে। আফিম মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় চেয়ে এই সাধারণ দৃশ্যটুকুও অবলোকন করে। মৃত্তিকার এবার চোখ জ্বলে ওঠে। এদিক ওদিক তাকিয়ে চোখের পানি আড়াল করার চেষ্টা চালায় সে। হু হু করে কাপে তার কায়া। আফিম মৃত্তিকার এই লুকোচুরি ঠিক ধরে ফেলে। খানিক গম্ভীর স্বরে বলে,
“- একদম কাঁদবে না মৃত্ত, চোখের পানি মুছে ফেল”।
মৃত্তিকা হকচকিয়ে ওঠে। কান্নার বেগ আরো বাড়ে। এবার জলপ্রপাতের মতো গড়িয়ে পরে তপ্ত নোনা পানি। কম্পিত কণ্ঠে সে বলে,
“- কেন? কাঁদবো না কেন? আমি কাঁদলেই তো আপনি সুখ পান। আমাকে কাঁদাবেন বলেই তো এত ছলচাতুরী করে বিয়ে করলেন। নিজের পাশাপাশি আমাকেও নরকের দ্বারপ্রান্তে এনে ছেড়ে দিলেন, দান করলেন বিভীষিকাময় জীবন”।
মৃত্তিকার ঘন নেত্রপল্লবে পানি জমেছে। নাকের পাটা লাল রঙ ধারণ করেছে। বুকের ওঠানামা বাড়ছে। কান্না গুলো গিলে ফেলতে চাইলেও তারা অবাধ্য হচ্ছে। আফিম কপাল কুঁচকে বলে,
“- কাঁদবে, অবশ্যই কাঁদবে। তবে দুঃখে নয়, সুখে কাঁদবে। আমার বাড়াবাড়ি রকমের ভালোবাসায়, আমার স্পর্শে, আমার অপ্রত্যাশিত উপস্থিতিতে তুমি কাঁদবে। আমি যখন এখান থেকে বের হবো, তখন হাউমাউ করে দাপিয়ে কাঁদবে। আমি বুক পেতে দেবো। আমার শার্ট ভিজিয়ে দেবে, বুক ভিজিয়ে দেবে। আমি একটুও বাঁধা দেব না। কিন্তু এখন, এখানে কাঁদবে না”।
মৃত্তিকা হেচকি তোলে। আফিম বলে,
“- একটু কাছে আসো তো”।
মৃত্তিকা বোঝে না। অবুঝের ন্যায় বলে,
“- হু”?
“- শিকের কাছে এসো”।
মৃত্তিকা একটু এগিয়ে আসে। আফিম শিকের ফাঁক গলিয়ে হাত বের করে। মৃত্তিকার চোখের পানি নিজের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে মুছে দেয় সন্তপর্ণে। তার আঙুলের শীতল স্পর্শে মৃদু কেঁপে ওঠে মৃত্তিকা। আফিম মৃত্তিকার গালে হাত গলিয়ে বলে,
“- বাড়ি ফিরে যাও, আমি খুব দ্রুত ফিরবো”।
মৃত্তিকা কিছু একটা ভাবে। চেয়ে রয় দীর্ঘক্ষণ। ভীষণ ভীতু, অসহায় চোখে চেয়ে শেষ প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। বলে,
“- সাবিহা কে, তার সাথে আপনার কি পরিচয়, তাকে কেন আপনি কিডন্যাপ করেছিলেন এসব কিছুই আমি জানতে চাই না। আমি শুধু জানতে চাই আপনি.. আপনি কি ওই মেয়েটার গা ছুঁ.. ছুঁয়েছেন? ওর সাথে ঘ..ঘ..ঘনিষ্ঠ হয়েছেন? ওকে ওই নজরে দে..দেখেছেন?”
মৃত্তিকার কণ্ঠ কাঁপছে। অজানা ভয় গ্রাস করেছে তার কণ্ঠনালী। ক্রমাগত তুতলে যাচ্ছে শব্দ গুলো। বুক কাঁপছে দুরুদুরু। আফিমের প্রত্যুত্তর কতটা সহজ হবে জানে না সে। তবে জানতে চায়, শুনতে চায় আফিমের স্বীকারোক্তি। আফিম শান্ত চোখে দেখে মৃত্তিকাকে। মৃত্তিকার ছটফটানি টের পায় সে। অস্থির, অধৈর্য হয়ে মৃত্তিকা ফের বলে ওঠে,
“- বলুন? ওই মেয়েটাকে আপনি ছুঁয়েছেন? ওর কাপড় ছিঁড়েছেন? মেয়েটাকে আপনি..আপনি..
মৃত্তিকার শ্বাস রোধ হয়ে আসে। বলতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠে সে। জিভ দিয়ে শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়। আফিম ব্যগ্র কণ্ঠে বলে,
“- সাবিহাকে আমি ওই নজরে দেখিনি। ছোঁয়া অনেক দূরের কথা। সব প্রমাণ করে দেব আমি। সময় দাও একটু”।
মৃত্তিকার কেন যেন শান্তি লাগে। বুকের উপরের ভারটা কিঞ্চিৎ কমে। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে পুনরায় বলে,
“- সত্যি বলছেন? আপনি করেননি? মেয়েটা মিথ্যে বলেছে? কিন্তু কেউ কেন বিশ্বাস করছে না? সবাই কেন আপনাকে দোষারোপ করছে”?
আফিম হেসে মৃত্তিকার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
“- তোমার ছোট মাথায় এতকিছু ঢুকবে না। বাড়ি ফিরে যাও, শান্তদেরকে নিয়ে যেও। চিন্তা করো না”।
আজ এক ঘন্টা লেট করে অফিসে এসেছে শান্ত। বস তাকে কিছু বলেনি। শান্ত আগেই কল করে বলেছিল তার আজ যেতে দেরি হবে। ছুটির পর আরো এক ঘন্টা অফিসে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বসকে ম্যানেজ করেছে শান্ত। দুর্বল পায়ে আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে অফিসে প্রবেশ করে শান্ত। ডেস্কে বসেই নিজের বরাদ্দকৃত কাজগুলো করতে থাকে মন দিয়ে। মাঝেসাঝে ফোনে রূপকদের সাথে কথা বলে। আফিমকে কিভাবে ছাড়ানো যা, কিভাবে নির্দোষ প্রমাণ করা যায় ওকে এসব নিয়েই আলোচনা করে।
লাঞ্চ ব্রেকে অফিসের ক্যান্টিনে ছুটে যায় সবাই। শান্তর খেতে ইচ্ছে করছে না। প্রিয় বন্ধু কারাগারে বন্দি, পুলিশের মার খেয়ে আহত, তাকে এত বাজে অবস্থায় রেখে সে কি করে ভালো খাবার গিলতে পারে? কোনোমতেই গলা দিয়ে খাবার নামবে না শান্তর। আফিম ওখান থেকে বের না হলে শান্ত শান্তি পাবে না।
রাইমা হেলেদুলে যাচ্ছিল ক্যান্টিনে। ডেস্কে শান্তকে বসে থাকতে দেখে এগিয়ে আসে সে। গভীর ভাবনায় মত্ত শান্ত রাইমার উপস্থিতি টের পায় না। রাইমা ওর চোখের সামনে আঙুল দিয়ে তুড়ি বাজিয়ে বলে,
“- কোন ধ্যানে আছেন মশাই”?
শান্ত নিস্তেজ শ্বাস ফেলে বলে,
“- না কিছু না”।
“- লাঞ্চ করবেন না”?
“- না”।
“- কেন”?
“- খিদে নেই”।
“- ছুটি হতে হতে খিদে পেয়ে যাবে। তখন খাওয়ার সময় পাবেন না। উঠুন, হালকা-পাতলা কিছু খেয়ে আসি”।
শান্ত লজ্জিত ভঙ্গিতে বলে,
“- আপনি যান রাইমা। ধন্যবাদ।”
রাইমা দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে শান্তর দিকে চেয়ে রয়। শান্তর ভাব-গতিক বোঝার চেষ্টা করে কিছুক্ষণ। অতঃপর পাশ থেকে একটি চেয়ার টেনে এনে শান্তর একদম মুখোমুখি বসে সে। পায়ের উপর পা তুলে দু হাত বুকে গুঁজে শান্তকে দেখে। শান্ত রাইমার এই কাণ্ডে বিব্রত হয়, হকচকিয়ে ওঠে। সংকোচ, আড়ষ্টতায় দুলে ওঠে কায়া। রাইমা এক ভ্রু উঁচিয়ে সন্দেহী চোখে চেয়ে বলে,
“- কি হয়েছে বলুন তো? আপনাকে খুব আপসেট দেখাচ্ছে”।
শান্ত মাথা দুলিয়ে বলে,
“- কই না তো”।
“- উঁহু আপনি মিথ্যে বলছেন। আপনাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে আপনি কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত। সমস্যা কি বলুন তো? কি হয়েছে”?
শান্ত কম্পিউটারের স্ক্রিন নামিয়ে বলে,
“- সমস্যাটা বেশ জটিল”।
রাইমা হেসে বলে,
“- সমস্যা জটিল হলেও সমাধান অসম্ভব নয়”।
“- আমার এক বন্ধুকে মিথ্যে মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। না বাঁচানো পর্যন্ত আমার কিছুতেই স্বস্তি হচ্ছে না”।
“- শুনুন, পেট ঠিক থাকলে মন ঠিক থাকে। মন ঠিক থাকলে ব্রেইন ঠিক থাকে। তখন মাথায় বুদ্ধি আপনা-আপনি চলে আসে। তাই ব্রেইনকে সুস্থ, সবল রাখতে হলে পেটকে শান্ত করতে হবে। লাঞ্চ করুন, ভালো লাগবে। এরপর ভাবুন কি করা যায়”।
শান্ত আলতো হেসে বলে,
“- তা এসব কোন বিজ্ঞানী বলেছে”?
বোকা হাসে রাইমা। বলে,
“- বিজ্ঞানী রাইমা আহমেদ”।
তার বলার ভঙ্গি দেখে হেসে ফেলে শান্ত। বলে,
“- আপনি এত এনার্জি কোথায় পান রাইমা”?
“- এসব মাদার হরলিক্সের কামাল”।
হতভম্ব হয়ে পরে শান্ত। মেয়ে বলে কি? মাদার হরলিক্স খেলে রাইমা এনার্জি পায়? অবিবাহিত মেয়ে কোন জ্ঞানে মাদার হরলিস্ক খায়? বিব্রত কণ্ঠে শান্ত বলে বসে,
“- কি আজব কথা বলছেন আপনি”?
রাইমা মুখে হাত চেপে হেসে বলে,
“- আমার আপু প্রেগন্যান্ট। কিন্তু ওর হরলিক্স খেতে ভালো লাগে না। তাই আমিই আপুর হরলিক্স খাই। প্রতিদিন দু বেলা এক কাপ দুধের সাথে দু চামচ করে খাই। বিশ্বাস করুন, ওটা খাওয়ার পর থেকে আমি খুব এনার্জি পাচ্ছি। সারাদিন লম্ফঝম্প করলে একটুও ক্লান্ত লাগে না”।
কপাল চাপড়ায় শান্ত। এ মেয়েটা এত বদ। না আছে বুদ্ধি, না আছে ব্যসিক নলেজ। মাদার হরলিক্স কি বাদবাকি মেয়েরা খেতে পারে? ডক্টর স্পেশালি গর্ভবতী মেয়েদের এটা রেকমেন্ড করে, পেটের বাচ্চার যেন পুষ্টির ঘাটতি পূরণ হয় সেজন্য। নাম দেখেও তো বোঝা যায়। কোন জ্ঞানে মেয়েটা এই হরলিক্স দু বেলা গেলে? অসুস্থ হয়ে যাবে না? সাইড ইফেক্ট পরলে?
“- শুনুন রাইমা, আপনার না সাইকোলজিক্যাল প্রবলেম আছে”।
অত্যন্ত স্বাভাবিক কণ্ঠে রাইমা বলে,
“- হ্যাঁ, এটা তো আমিও জানি”।
“- জেনেও এত কুল থাকেন কি করে”?
“- কুল? কোথায়। এই দেখুন আমার গাল, ঘাড়, কপাল কত গরম। দেখুন”।
শান্তর হাত টেনে নেয় রাইমা। নিজের কপালে শান্তর হাত ছোঁয়াতে ব্যস্ত হয়ে পরে সে। লজ্জায় মরিমরি অবস্থা হয় শান্তর। সংকোচে নুইয়ে পরে। মেয়েটা এত বোকা কেন তার মাথায় আসে না। অপরিচিত একটা ছেলের সাথে এত কিসের ঘনিষ্ঠতা তার? হাত ধরারই বা সাহস করে কিভাবে? শান্ত জোর করে হাত টেনে নেয় নিজের। ছোঁয় না মেয়েটিকে। এক পর্যায়ে ধমকে বলে,
“- রাইমা, ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিট। আ’ম ইওর সিনিয়র। প্লিজ কিপ ইওর ডিসট্যান্স ফ্রম মি”।
রাইমা থমকায়। হাসি মুখটা চুপসে যায় তার। চেয়ার কিছুটা পিছনে ঠেলে নত হয়ে উঠে দাঁড়ায় সে। ভীষণ অপ্রস্তুত হয় মেয়েটা। অপমানে গাল দুটো জ্বলে ওঠে। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলে,
“- স্যরি স্যার। আর এমন হবে না”।
শান্ত ফিরেও দেখে না রাইমাকে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে মনোনিবেশ করে। মাথা তুলে শান্তকে ল্যাপটপে মনোযোগী দেখে রাইমার মন খারাপ তড়তড় করে বেড়ে যায়। পা ফিরিয়ে সে চলে আসে সেখান থেকে। লজ্জায়, অপমানে মূর্ছা যায় মেয়েটা। বুঝতে পারে নিজের ভুলগুলো। শান্ত রাইমার যাবার পানে তাকিয়ে থাকে। সে আড়াল হলে শান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“- স্যরি রাইমা, আপনি খুব বোকা। আপনার বোকামো গুলোকে বাড়তে দেয়া যায় না। “
থানার এস আই এর ফোনে কল এসেছে। এস আই কারো সাথে কথা বলে ফোনে। কথা বলতে বলতে লোকটা জিভ কাটে। প্রচণ্ড আতঙ্কিত দেখায় তাকে। দ্রুত কনস্টেবলকে নির্দেশ দেয় আফিমকে মুক্ত করার জন্য। তাড়াহুড়ো করে সেলের সামনে আসে এস আই। আগের মতো লোকটার হম্বিতম্বি নেই, নত হয়ে সে বলে,
“- স্যরি, স্যরি স্যার। বুঝতে পারিনি”।
আফিম সেল থেকে মুক্ত হয়ে বুক ভরে শ্বাস টানে। কনস্টেবল আফিমের শার্টটা নিয়ে আসে। সেলে ভরার পর আফিমকে বেশ কয়েকটা লাঠির বারি দেয়া হয়েছে। শার্ট ছিঁড়ে গেছে। তবুও আফিম শক্ত, সটান হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মুখ দিয়ে কোনোরূপ শব্দ করেনি। কোনো রকমেই স্বীকার করেনি যে সে সাবিহাকে রে*ইপ করেছে। আফিম একজন আন্ডারকভার এজেন্ট। প্রায় চার বছর ধরে ফিল্ড অপারেটিভ হিসেবে সরকারি সংস্থা গুলোর হয়ে কাজ করছে সে। বখাটে হয়ে শহরে রাজত্ব করলেও তার আসল পরিচয় ভিন্ন। মাস্তান, বখাটে এসব আফিমের ছদ্মনাম। প্রকৃতপক্ষে সে ভীষণ দায়িত্ববান, বিচক্ষণ, দক্ষ আন্ডারকভার এজেন্ট। কাজে, ভাবনায়, দক্ষতায়, বুদ্ধিমত্তায় আফিম মন জয় করেছে এজেন্সির টিমদের। টিম পরিচালনা করে আফিম। মাঠ পর্যায়ের সকল কাজ সে নিজে করে।
গতকাল সাবিহা যখন রেইপ হয় তখন আফিম ফিল্ড অফিসে ছিল। দুপুর থেকে রাত নয়টা অব্দি তাকে ফিল্ড রুমেই দেখা গেছে। আফিমের আন্ডারে কাজ করা সদস্য গুলো তদন্ত করে জেনেছে সাবিহা বিকেলের শেষ দিকে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে এবং তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে সাতটা থেকে আটটা মাঝামাঝি সময়ে। অথচ এই সময়টয় আফিম তার টিমের সদস্যদের সাথে অপারেশনের বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিল। ফিল্ড অফিসের ফুটেজে আফিমকে দেখা গিয়েছে। সবাই নিশ্চিত আফিম এ ধরণের কাজ করেনি, কারণ সে সবার সাথেই ছিল। সবাই তাকে ওই সময় অফিসেই দেখেছে। কেউ আফিমকে ফাঁসানোর জন্য এমন জঘন্য চাল চেলেছে। আফিম যেহেতু শহরটাকে ভালোমতো চেনে, এই শহরটাকে সে হাতের মুঠোয় আঁকড়ে ধরতে পেরেছে, বছরের পর বছর বখাটে, মাস্তান সেজে জনগনের সাথে মিশে গিয়েছে। সেহেতু আফিমই এই কেস হ্যান্ডেল করতে পারবে, অপরাধীকে শনাক্ত করতে পারবে। কিন্তু এজন্য আফিমকে বের হতে হবে, তদন্ত করার সুযোগ তাকে দিতে হবে। একজন এজেন্ট বিনা অপরাধে সেলে আটকে থাকতে পারে না।
আফিমদের টিমের বস থানার এস আইকে কল করে আফিমের পরিচয় জানিয়েছে। আফিমের ওই সময়ের উপস্থিতির ফুটেজ পাঠিয়েছে। অগত্যা পুলিশ জেনে গিয়েছে আফিমের আসল পরিচয়। তাকে ছেড়ে দিতে হবে আফিমকে। কোনোমতেই আফিমকে সে আটকাতে পারবে না। তার চেয়েও মর্যাদাপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত আফিম।
পুলিশের অভিব্যক্তি দেখে আফিম গাঢ় হেসে বলে,
“- আমি কে বল তো”?
ভড়কে যায় এসআই। ভয় পায় ভীষণ। বলে,
“- এলাকার নামকরা মাস্তান”।
দূর্ভেদ্য হাসে আফিম। বলে,
“- গুড, যা শুনেছিস, সব ভুলে যা।”
আফিম পকেটে হাত গুঁজে বেরিয়ে আসতে নিলে পেছন থেকে এসআই বলে,
“- আমার চাকরিটা কেড়ে নেবেন না স্যার। আপনার কাছে অনুরোধ”।
আফিম পিছু না ফিরেই ত্যাছড়া হেসে বলে,
“- দু ঘন্টার মধ্যে ইউনিফর্ম রেখে থানা থেকে বেরিয়ে যাবি।”
আর থাকে না আফিম। গটগট করে চলে আসে বাইরে।
ফিল্ড অফিসের রুমটা জানালাবিহীন, মোটা কংক্রিটের দেয়ালে ঘেরা। ঢুকতেই কানে আসে হালকা ইলেকট্রনিক কম্পিউটার সার্ভার আর এয়ার কন্ডিশনের নিরবচ্ছিন্ন শব্দ। ঘরের আলো পুরো উজ্জ্বল না; নীলচে আর সাদা আলো মিশে একটা ঠান্ডা, চাপা পরিবেশ বিরাজমান।
এক দেয়াল জুড়ে বিশাল ডিজিটাল স্ক্রিন। সেখানে ভেসে উঠছে শহরের ম্যাপ, লাল আর হলুদ ডট দিয়ে চিহ্নিত টার্গেট লোকেশন। কোনো স্ক্রিনে লাইভ সিসিটিভি ফুটেজ, কোথাও স্যাটেলাইট ইমেজ, কোথাও আবার টার্গেটের ফাইল, নাম, ছবি, কভার আইডেন্টিটি, ঝুঁকির মাত্রা।
মাঝখানে লম্বা কনফারেন্স টেবিল। টেবিলের উপর ছড়িয়ে আছে সিকিউর ট্যাবলেট, এনক্রিপ্টেড রেডিও সেট, ফোল্ডারভর্তি টপ সিক্রেট নথি। দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে আছে দুইজন টেক অফিসার। হেডফোন কানে, আঙুল কিবোর্ডে, চোখ এক মুহূর্তের জন্যও স্ক্রিন থেকে সরে না।
ঘরের এক কোণে কাচঘেরা কন্ট্রোল বুথ। ভেতরে বসে অপারেশন ডিরেক্টর, চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা, ঠোঁটে কঠোর রেখা। তার সামনে লাল রঙের একটা ফাইল, কভারে বড় করে লেখা: CLASSIFIED
আফিম সেল থেকে বেরিয়ে সিনিয়র অপারেটিভদের সাথে কথা বলে। কিছু আলাপ-আলোচনার পর আফিম বেরিয়ে আসে রুম থেকে। তার মুখে মাস্ক এঁটে রাখা। চাহনি গম্ভীর। আফিম বাড়ি ফিরে আসে। সারাদিন পেটে দানাপানি না পড়ায় শরীর কিছুটা দুর্বল লাগছে এখন। চামড়া জ্বলছে। মৃত্তিকাকে দেখেনি অনেকক্ষণ। মেয়েটা ঠিক আছে কিনা কে জানে? সাবিহার সাথে দেখা করতে হবে, ওর জবানবন্দি নিতে হবে। নইলে এই কেসের কোনো ক্লু পাওয়া যাবে না। আসল অপরাধীকে ধরতে হলে সাবিহার কাছে যেতে হবে আফিমকে। খুব দ্রুত এ কেস ডিশমিশ করতে হবে। প্রচার মাধ্যমগুলোতে নিজেকে প্রমাণিত করতে হবে।
তন্বীকে আজ দুপুরে নিয়ে গেছে রায়ান। রায়ানের বাবা-মা ওদের বিয়েটা মেনে নিয়েছে। তাই রায়ান আর বিলম্ব করেনি। তন্বীকে নিজের বাড়ি নিয়ে গেছে। ওদিকে আশরাফ মির্জা অফিসে রাত কাটাচ্ছে। মৃত্তিকার মুখোমুখি হবার সাহস তার নেই। কোথাও যেতে পারছেন না তিনি। সব জায়গায় আফিমকে নিয়ে কুৎসা রটাচ্ছে সবাই। এসব কথা কানে এলেই আশরাফ মির্জা দুর্বল হয়ে পড়ছেন, প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে তার। তাই অফিস থেকে আর বাড়ি ফেরেননি তিনি। মৃত্তিকার মুখোমুখি হবার স্পর্ধা করেননি।
আফিম এক্সট্রা চাবি দিয়ে দরজা খোলে। সরাসরি সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে সে। মৃত্তিকার ঘরের দরজা ভিড়িয়ে রাখা। খুব ধীরে দরজাটা খুলে দেয় আফিম। মৃত্তিকাকে পায় না ঘরে। এগিয়ে গিয়ে বেলকনিতে যেতেই মৃত্তিকাকে এলোমেলো অবস্থায় শুয়ে থাকতে দেখে আফিম। বাতাসের ঝাপটায় মেয়েটা কুঁকড়ে শুয়ে আছে। গায়ে কোনো মোটা বস্ত্র নেই। মাথায় দু হাত দিয়ে ঘুমোচ্ছে মৃত্তিকা। ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে মুখটা। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে মুখে। ঠাণ্ডায় রীতিমতো কাঁপছে মৃত্তিকা। আফিমের প্রথমে রাগ হয় মৃত্তিকার উদাসীনতায়। পরক্ষণেই মেয়েটার মুখ পানে তাকিয়ে রাগ উধাও হয়ে যায়। এগিয়ে এসে এক হাঁটু গেড়ে বসে মৃত্তিকাকে কোলে তুলে নেয় সে। আচমকা শূন্যে ওঠায় মৃত্তিকা নড়েচড়ে ওঠে। ভীত নয়ন জোড়া মেলে আফিমকে দেখতেই থমকায় সে। দু হাতে চোখ কচলে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকায় আফিমের পানে। শরীর দুলে ওঠে মেয়েটার। আফিম মৃত্তিকাকে কোলে তুলে বিছানায় নিয়ে আসে। খুব যত্নের সাথে নরম বিছানায় শুইয়ে দেয় মৃত্তিকাকে। মৃত্তিকাকে নামিয়ে বাঁকানো দেহটা সোজা করতে নিলে মৃত্তিকা টেনে ধরে আফিমের কাঁধ। অস্থির হয়ে উঠে বসে বিছানায়। ব্যগ্র কণ্ঠে বলে,
“- আপনি? আপনি.. আপনাকে ওরা ছেড়ে দিয়েছে? আপনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন? বলুন না”?
উত্তেজিত, অধৈর্য্য স্বর মৃত্তিকার। আফিম মৃত্তিকার কথার উত্তর না দিয়ে বলে,
“- এখন ঘুমাও”।
মৃত্তিকা প্রতিবাদী সুরে বলে ওঠে,
“- না, আপনি জবাব দিন।”
“- তোমায় দেখবো বলে পালিয়ে এসেছি।
আফিম দুষ্টুমি করে বলে কথাটা। তবে মৃত্তিকা কথাটা সত্য ভেবে বসে। আঁতকে ওঠে মেয়েটা। চোখ জোড়া ছলছল করে ওঠে। উত্তেজিস কণ্ঠে বলে,
“- কিহ্? আপনি পালিয়ে এসেছেন? ওরা আপনাকে ধরে ফেললে? ওরা আপনাকে খুব মারবে আফিম। দয়া করে চলে যান, চলে যান ওখানে”।
আফিম মৃত্তিকার অগোচরে হাসে মিটিমিটি। মৃত্তিকার উৎকণ্ঠা, উদ্বিগ্নতা তাকে আনন্দ দেয়। মৃত্তিকার ছোট্ট দেহটা আফিম নিজ দেহের মাঝে মিশিয়ে নিয়ে বলে,
“- আমায় মারবে, একটা বখাটে, মাস্তানকে মারবে। তাতে তোমার কী? তুমি এত কষ্ট পাচ্ছো কেন মৃত্তওও”?
নাকের পাটা তিরতির করে কাঁপে মৃত্তিকার। গাল ভিজে পুকুর হয়ে আসে। ভয়ে, চিন্তায় হুঁশ হারায় মেয়েটা। আফিমের বুকে কিল বসিয়ে বদ্ধ উন্মাদের ন্যায় বলে ওঠে,
“- আর কত ক্ষতি করবেন নিজের? দেখুন না, দেখুন কিভাবে ওরা আপনাকে মেরেছে, কতটা দাগ হয়েছে দেখুন। শরীরটাকে অকেজো বানিয়ে দিয়েছে। আপনি চলে যান, ওরা আপনাকে আরো মারবে আফিম। আমার সহ্য হবে না। আমাকে আর নরকযন্ত্রণা দেবেন না আফিম। একটু করুণা করুন আমার উপর। আমি পারছি না, আমার বাঁচতে ইচ্ছা করে না। দম বন্ধ হয়ে আসে”।
বলতে বলতে হাঁপিয়ে ওঠে মৃত্তিকা। আর বলতে পারে না কিছুই। আটকে আসে কণ্ঠ। আফিম সেই মুহুর্তে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মৃত্তিকাকে। বুকের মাঝে একদম ঠেসে ধরে নতজানু দেহ। মৃত্তিকাকে সামলাতে বাচ্চা সূলভ কণ্ঠে বলে,
“- আমাকে ছেড়ে দিয়েছে, আমি মজা করছিলাম মৃত্ত। আমি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছি। কেঁদো না, সব ঠিক হয়ে গেছে।”
চকচক করে ওঠে মৃত্তিকার চোখ। বিশ্বাস করতে পারে না আফিমকে। বুক থেকে মাথা তুলে সন্দেহ নিয়ে সে ফের শুধোয়,
“- ওরা আপনাকে আর নিতে আসবে না তো”?
“- না”।
মৃত্তিকার মলিন মুখে হাসি ফোটে। চোখ জোড়া তৃষ্ণার্ত পথিকের ন্যায় নজর বুলায় আফিমের পুরো শরীরে। আফিমের ঠোঁটের কোণের লালচে অংশে আঙুল ছোঁয়ায় মৃত্তিকা। হুঁশ হারিয়ে সহসা নিজের ঠোঁট জোড়া আফিম এগিয়ে আনে মৃত্তিকার ঠোঁটের নিকটে। দু ঠোঁট ফাঁক করে মৃত্তিকার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় আফিম। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রয় মৃত্তিকা। দেহে শীতল শিহরণ বয়ে যায়। মেরুদণ্ড কুঁচকে আসে। আফিমের উদ্দীপনা তার দেহে আগুন ধরিয়ে দেয়। আফিম থামে না। পর পর শুষ্ক ঠোঁট জোড়া চেপে ধরে মৃত্তিকার পাতলা ঠোঁটে। মৃত্তিকা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে আফিমের দিকে। আফিম চু্ষে নেয় স্ত্রীর ঠোঁটের স্বাদ। মত্ত হয়ে পরে মৃত্ততে, হাতের বিচরণ চালায় কোমল পিঠে। অতঃপর দু হাতের আজলায় তুলে ধরে মেয়েটার ছোট্ট, গোলগাল মুখ খানা। মৃত্তিকার পুরো মুখে একের পর এক অধৈর্য্য, উত্তেজিত ভঙ্গিতে চুমু দেয় আফিম। তার লালায় ভিজে ওঠে মৃত্তিকার গাল। চুমুতে চুমুতে মেয়েটার গাল লাল করে ফেলে আফিম। দাঁত দিয়ে আঁচড়ে দেয় কয়েকবার। মৃত্তিকা কম্পিত স্বরে বলে,
“- আফিইইইম, লাগছে”।
আফিম গভীর, মোহগ্রস্ত কণ্ঠে বলে,
“- লাগুক”।
মৃত্তিকার কপালে কপাল ঠেকায় আফিম। ঘনঘন ভারী শ্বাস ফেলে সে। তার নিঃশ্বাসের তোপে মৃত্তিকার গাল শীতল হয়ে ওঠে। খানিক সময় নিয়ে আফিম নেশাগ্রস্ত কণ্ঠে ডাকে,
“- নেশাআআআআ”।
মৃত্তিকা আনমনেই উত্তর দেয়,
“- হু”?
“- আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ আ লট।”
আফিমের ফিসফিসিয়ে বলা কণ্ঠে শিউড়ে ওঠে মৃত্তিকা। আফিম তার গলায় স্লাইড করতে করতে বলে,
“- বি মাইন মৃত্ত, ইনটায়ারলি”।
চমকায় মৃত্তিকা আফিম অনুমতি নিতে বলে,
“- ভালোবাসি মৃত্ত? একটু খানি? ভরসা করে দেখবে আমায়?”
পরক্ষণেই অধৈর্য হয়ে বলে,
“- তোমার নেশা আমাকে টানছে মৃত্তও, একটু খানি আদর করি? একটুও কষ্ট দেবো না, প্রমিস”।
মৃত্তিকা ভীত চোখে তাকায়। অস্বস্তি, আড়ষ্টতায় নুইয়ে পরে সে। চিবুক ঠেকায় বুকে। নীরবতা সম্মতির লক্ষণ ভেবে হাসে আফিম। তবুও শুনতে চায়,
“- অনুমতি দিচ্ছো? ছুঁয়ে দেবো মৃত্ত? কাঁদবে না তো?”
মৃত্তিকা মাথা ঠেকায় আফিমের বুকে। বুক ভরে প্রশান্তির শ্বাস টানে আফিম। চট করে মৃত্তিকার গলায় হাত রেখে উঁচু করে মুখ খানা। ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয় মৃত্তিকাকে। ঘরের হলদেটে আলো নিভিয়ে দেয়। আফিম কথা রাখে। এতক্ষণ তাকে ভীষণ অধৈর্য্য, উত্তেজিত লাগলেও মৃত্তিকাকে কাছে টানার সময় লোকটাকে ধীর, স্থির আর মাত্রাতিরিক্ত শান্ত দেখায়। জোর না খাটিয়ে খুব নরম করে ধরে মৃত্তিকাকে। যেন ছুঁলেই মেয়েটা ব্যথা পাবে, মচকে যাবে। আলতো করে মৃত্তিকাকে কাছে টানে। ভালোবাসা ভরিয়ে দেয় মেয়েলি দেহের সমস্ত কোণায়। এক নতুন আফিমকে আবিস্কার করে মৃত্তিকা। যার দেহ, মন জুড়ে মৃত্তিকার বসবাস। মৃত্তিকাকে সত্যিই আঘাত করে না আফিম। খুব আদুরে ভঙিতে, যত্নের সাথে তাকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে। প্রথমবারের মতো আফিমের সাথে ঘনিষ্ঠ হয় মৃত্তিকা। পুরোপুরি উজার করে দেয় নিজেকে। সুখানুভূতি আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে তাকে। আফিম ছাড়ে না তাকে। লজ্জায় মৃত্তিকা মুখ তুলে চায় ও না।
চলবে?
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি_শেখ
[ গত পর্ব গুলোর রিচ কম। টার্গেট দিতে বাধ্য হলাম। ২.৫কে না হলে পরবর্তী পর্ব আসবে না। ]
Share On:
TAGS: ওরা মনের গোপন চেনে না, বৃষ্টি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ওরা মনের গোপন চেনেনা পর্ব ৬
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১২
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৪
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৪
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৫
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৮
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৭+৮
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩