Golpo romantic golpo ওরা মনের গোপন চেনে না

ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৯


ওরা মনের গোপন চেনে না

পর্ব সংখ্যা [ ১৯ ]

বিছানা গুছিয়ে পরিপাটি করেছে মৃত্তিকা। ঘুম পাচ্ছে খুব। চোখ জোড়া বেজায় ক্লান্ত। তার ঘরটা সাদামাটা। আফিমদের ঘর গুলোর মতো অত বড়সড় নয়। আফিম আশেপাশে নেই। মৃত্তিকা বেলকনির দিকে অগ্রসর হতেই বিদঘুটে ধোঁয়া নাকে এসে ঠেকল। সঙ্গে সঙ্গে মুখ কুঁচকে ফেলল মৃত্তিকা। আফিম অনেক বেশি সিগারেট খায়। এসব মোটেই পছন্দ না মৃত্তিকার। কিন্তু তাকে বলে লাভ নেই, লোকটা শোনে না কারো কথা।

মৃত্তিকা নাকে ওড়না চেপে বলে,
“- ঘরে আসুন”।

আফিমের গায়ে মেরুনের শার্টটাই। এক হাতে কোমর চেপে অপর হাতের আঙুলের ফাঁকে সিগারেট চেপে ধরে আছে। মৃত্তিকাকে দেখা মাত্র সামান্য নড়ল সে। হাতের ইশারায় মৃত্তিকাকে কাছে ডাকলেও মৃত্তিকা এগিয়ে এলো না। বলল,
“- সিগারেটটা ফেলে দিন”।

আফিম যথেষ্ট শান্ত। ওকে শান্ত দেখলেই বুঝি ভয়টা চেপে বসে মৃত্তিকার। আফিম সিগারেটটা ফেলল না, বরং ওটা শেষ করেই আরেকটা সিগারেট ধরাল। মৃত্তিকা নিরুত্তর, দেখল কেবল লোকটার ভাবভঙ্গি। বিরক্ত হয়ে ঘরে ফিরে যেতো উদ্যত হতে আফিম বলল,
“- তুমি যদি ভেবে থাকো আমাকে শোধরাবে, এসব থেকে ফিরিয়ে আনবে। তাহলে ভুল ভাবছো। আমি কোনোদিনই বউয়ের কথায় চলবো না। আমার সাথে ওসব যায় না”।

মৃত্তিকা ভ্রু কুচকে বলল,
“- তাহলে কি যায়? মাস্তানি করা”?

আফিম শান্ত স্বরে ফের বলল,
“- তৈরি হও, ও বাড়ি যেতে হবে”।

“- মানে কি? আপনি না বললেন থাকবেন”?

“- এখন থাকতে ইচ্ছে করছে না”।

“- আপনি চলে যান, আমি থাকবো”।

“- তোমাকে না নিয়ে যাবো না।”

“- আমি তো বললাম এখানে থাকবো”।

আফিম সহসা রেগে উঠল। বাজখাঁই কণ্ঠে বলল,
“- তোমাকে তৈরি হতে বলেছি আমি।”

তার প্রকট চিৎকারে মৃত্তিকার এবার চোখে পানি জমল। একটা মানুষ কি করে এতটা নিষ্ঠুর হয়? এতদিন পর বাবার বাড়ি এসেছে মৃত্তিকা, ভেবেছিল কটা দিন থাকবে এখানে, বাবা-মায়ের সময় কাটাবে। সে সুযোগটুকু দিল না আফিম। তাগাদা দিল মৃত্তিকাকে। মৃত্তিকা দ্বিরুক্তি করল না। মলিন মুখে বাবা-মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলো বাইরে। ফ্যাকাসে বদনে কয়েকবার দেখল আফিমকে। মানুষটা পাষাণ বড্ড। মৃত্তিকার জলে ভাসা চোখ দুটো দেখেও তার কোনো হেলদোল নেই। মৃত্তিকার হুট করে বেজায় কান্না পেল। আফিম তাকে এখানে বুঝি আর আসতে দেবে না?

ব্যাকসিটে বসে সিট চেপে বসল মৃত্তিকা। আফিম বাইক স্টার্ট দিতে দিতে বলল,
“- আমাকে ধরে বসো”।

মৃত্তিকা ত্যাড়া কণ্ঠে জবাব দিল,
“- প্রয়োজন নেই”।

আফিম ও কঠিন সুরেই বলে উঠল,
“- পড়ে যাবে মৃত্ত”

“- মরে গেলেও আপনাকে ছোঁবো না”।

আফিম থমকাল ক্ষণকাল। মিররে উদাস মেয়েটার মুখটা দেখল। অভিমানে গাল দুটো দেবে গেছে মৃত্তিকার। ঠোঁট জোড়ায় ফাঁক নেই। নিগূঢ় অভিমানে চুপসে আছে মুখ খানা। আফিমের বাইকটি চলতে শুরু করলে আর লথা হয় না ওদের মাঝে। বাড়িতে ফিরে মৃত্তিকা কোনো কথা না বলেই চলে আসে ঘরে। দরজা আটকে দেয় ভেতর থেকে। মৃত্তিকা ভেবেছিল আফিম বুঝি ওকে ডাকবে, দরজা খোলার জন্য চোটপাট করবে। কিন্তু অনেকটা সময় চলে যাওয়া পরেও আফিমের কণ্ঠস্বর শোনা গেল না। যেন মানুষটা নেই। এখানে। মৃত্তিকা দরজা একটুখানি ফাঁক করে আশপাশটা দেখল। আফিমকে না দেখে উঁকি দিল নিচের ড্রইংরুমের দিকে। সেখানেও আফিমকে না পেয়ে ঘরে ফিরলে দরজার পাশে একটি সাদা কাগজ দেখতে পায় মৃত্তিকা। চট করে কাগজটা তুলে নিতেই স্পষ্ট কালির ইংরেজি অক্ষর দেখতে পায়।

“- i will be back, just for you Mrittoo”
~ Afim..


পিচঢালা রাস্তায় একসাথে দশের অধিক বাইক ছুটে যাচ্ছে অবিরাম। চলন্ত বাইকের বিকট শব্দ উড়ে বেড়াচ্ছে। যেন কাঁপছে রাস্তার প্রতিটি বাঁক। এতটাই দ্রুত, এতটাই তেজী বাইকগুলো। তাদের ছুটে চলায় গাছের ডালে বসে থাকা পাখিগুলোও ভয়ে উড়ে যাচ্ছে। ধুলো উড়ে বেড়াচ্ছে, শব্দের ঝংকারে পথচারীরাদের মনেও আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে। সবার মাথায় হেলমেট। মুখ দেখার অবকাশ নেই। আফিমের বাইকটি সবচে দ্রুত ছুটছে দক্ষ ভঙ্গিতে। এক হাতে বাইক ধরে অপর হাতে ফোন কানে চেপে ছেলেটা বলে,

“- ওর বোনকে তুলে আনতে গেলি কেন? ওর বাপকে আনতে পারলি না? নাটক করিস আমার সাথে”?

ওপাশ থেকে কেউ কিছু বলতেই আফিম ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে উঠল,

“- হয়েছে, আর কিছু করতে হবে না। আমি আসছি”।

শহরের বেশিরভাগ ছেলেই আফিমের ভক্ত। আফিমকে ভাই বলে সম্বোধন করে। দেখা হলেই লম্বা সালাম জানায়। বিপদে-আপদে বখাটে আফিমকে সর্বদা পাওয়া যায়। নিজের ছেলে-পেলের ক্ষতি হতে দেখতে পারে না আফিম। জান প্রাণ দিয়ে হলেও তার দলের ছেলেগুলোকে সে রক্ষা করে। এপাশে একটি ছোট্ট জঙ্গল আছে। অনেক গাছপালায় আবৃত স্থানটি রাতে ভয়ানক দেখায়। সাপখোপ থাকলেও থাকতে পারে। খুব একটা ঘন না হলেও ভিতরে পথের বাক খুঁজে পাওয়া কঠিন। ঝোপঝাড় দিয়ে ভর্তি পুরোটা। এই জঙ্গলের মধ্যে একটা ছোট্ট আধপোড়া ঘর আছে। টিন, মাটি আর খড় দিয়ে তৈরি ঘরটা। আগুন লেগে কিছুটা পুড়ে খসে পড়েছে। রাতের আধারে শহরের বখাটেরা এ ঘরে বসে নেশা করে। মদ, গাঁজা, ইয়াবা সহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় করে। শহরের থেকে কিছুটা দূরে বলে পুলিশ-আনসারের সদস্যদের চোখে পড়ে না জায়গাটা। অথচ সব চোরাচালান হয় এ পথেই।

আফিমের সবচে বড় শত্রু হলো শিহাব। কোনো কারণ ছাড়াই আফিমকে শিহাব সহ্য করতে পারে না। না না, কারণ অবশ্য একটা আছে। শহরে আধিপত্য এবং দাপট খাটাতে না পারার একটা ক্ষোভ রয়েছে শিহাবের মনে। ঢাকার সমস্ত অলিগলির ছেলেরা আফিমের কথায় চলে। তার এক কথায় শহরের সকল ছেলেপেলে ছুটে আসে। নামকরা মাস্তান, গুণ্ডা বলা যায় তাকে। দলবল নিয়ে ঘোরাফেরা করায় তার জুড়ি নেই। অপরদিকে শিহাব বড় ঘরের ছেলে। তারও ছোটখাটো দল আছে। গলিতে গলিতে আড্ডা দেয়া, নেশা করা, ইভজিটিং করা শিহাবের প্রধান কাজ। বাবার ক্ষমতা আছে বলে যখন যা খুশি করে ফেলে। শহরে আফিমের এই নামডাক, ক্ষমতা, আধিপত্য খাটানোর বিষয় গুলো শিহাবের একদমই পছন্দ না। একটি রাজ্যে দুজন রাজা কখনোই থাকতে পারে না। যুদ্ধ, সংঘাত করে হলেও কোনো একজনকে পরাজিত করতে হয়। তবেই দাপট খাটানোর পরিকল্পনা শক্ত হয়।
কোনো কারণ ছাড়াই আফিমের পিছে লাগা, ওকে হুমকি দেয়া, দেখা হলে কটুক্তি করা শিহাবের অন্যতম প্রিয় কাজ। আফিমও কম নয়। ওকে দেখলেই সমস্ত রাগ উড়ে এসে জুড়ে বসে ওর মাথায়। শিহাব এক কথা বললে আফিম দু কথা বলতে ছাড়ে না। গায়ে হাত তুলতেও কোনোরকম দ্বিধা করে না আফিম। ফলে তুমুল ঝগড়া, গর্জন, হাঙ্গামা হয়। ওরা একে অপরের চোখের বিষ। কারো খুশিই কেউ সহ্য করতে পারে না।

বিগত কয়েকদিন ধরে আফিমের নামে নোংরা তথ্য ছড়াচ্ছে শিহাব। তার দলবল গুলো বাড়াবাড়ি করছে চাঁদা তোলা নিয়ে। আফিমের দলের সদস্যদের দেখতে পেলেই আক্রমণ করছে। বিষয়টাতে এবার ভারী ক্ষেপে গেছে আফিম। রাগে, ক্ষোভে দাউদাউ করে জ্বলছে মস্তিষ্ক। ছেলেদের নির্দেশ দিয়েছে শিহাবের পরিবারের কোনো একজন সদস্যকে তুলে আনতে। আপন জন হারানোর মর্মান্তিক, লোমহর্ষক দৃশ্য সে তুলে ধরতে চেয়েছিল শিহাবের সামনে। আফিম ভেবেছিল শিহাবের বাবা, ভাই অথবা বিশস্ত কোনো বন্ধুকে তুলে আনবে ওরা। কিন্তু না, বেআক্কেল গুলো শিহাবের ছোট বোনকে তুলে এনেছে। ঘরের মেঝেতে শিকল পড়িয়ে রাখা মেয়েটিকে দেখে আফিমের ভ্রু কুঁচকে এলো। মেয়েটির মুখ গাম টেপ দিয়ে আটকানো। হাত পিঠের দিকে টেনে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা। পরনে গোলাপী রঙের ফ্রক। মেয়েটির বয়স কম। নামধাম ও জানে না আফিম। এত ছোট একটা মেয়েকে তুলে আনায় পেছনে কাচুমাচু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেপেলের দিকে কটমট করে তাকায় আফিম। রাগে শরীর তার জ্বলছে। দাঁতে দাঁত পিষে সে সে দেখে সবাইকে। পাশ থেকে শান্ত বলে,

“- আফিম, মেয়েটাকে ছেড়ে দে। এসব করিস না”।

রূপক বিদ্রূপাত্মক স্বরে বলে,
“- এত ছোট মেয়ে? আমাদের দেখেই তো ভয়ে জ্ঞান হারাবে”।

রায়ান একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল, ফোনে কথা বলছিল। সে তড়িঘড়ি করে ওদের মাঝে এসে বলল,
“- এই তন্বী বাড়ি ফিরতে বলতেছে”।

রূপক ফিক করে হেসে রেগে বলে,
“- বউ রেখে এসেছিস কেন গাধা? নতুন বউ রেখে কেউ মাস্তানি করতে আসে? একবার বিয়েটা হোক আমার। এক মাস ঘর থেকে বেরই হবো না”।

বোকা শান্ত বুঝল না রূপকের কথার মানে। বলল,
“- একমাস ঘরে থেকে কী করবি? থাকবিই বা কিভাবে? খেতে হবে না”?

রূপক সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“- খাবো তো, খাবো বলেই তো ঘর খুলে রাখা যাবে না”।

শান্ত অবুঝ, নাদান। এসব বিষয়ে তার জ্ঞান খুবই কম। রূপকের অদ্ভুত কথাগুলো তার মাথায় ঢুকল না। বলল,
“- তুই এত খারাপ কেন রে? ঘরে বসে বসে বউকে ফরমায়েশ করবি তাই না? নিজে ঘর থেকে বেরিয়ে একটা কাজও করবি না?”

রায়ান ধমকে বলে ওঠে,
“- ওরে বলদ রে, মাঝে মাঝে ভাবি কোন কুক্ষণে তোর মতো হাবাগোবা বন্ধু পেলাম? এই খাওয়া সেই খাওয়া না। এই খাওয়া মানে বউয়ের সাথে লুতুপুতু করা, বিড়াল মারা”।

শান্ত বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করল,
“- বিড়াল মারবে কেন? আশ্চর্য! তুই জানিস না বিড়াল পোষা ভালো”?

রায়ান মাথা চাপড়ে বিরক্ত হয়ে তাকাল শান্তর দিকে। আফিম ওদের উল্টাপাল্টা কথাবার্তা শুনে বিরক্ত হলো প্রচন্ড। হুংকার ছেড়ে বলল,
“- থাপড়ে সবগুলোর চোপা ফাটিয়ে ফেলব। কাজ করতে দিবি আমাকে”?

আফিমের গর্জনে থেমে গেল সবাই। মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে এলোমেলো ভাবে। তাকে জাগাতে মুখে পানি ছেটাল আফিম। একটু পরই ঘুমের ঘোর কেটে যেতেই মেয়েটি ভীতু চোখে পিটপিট করে তাকাল আফিমের পানে। কিছু বলার জন্য নড়চড়ে উঠল, হাত পা ছোড়াছুড়ি করল। কিছু একটা বলার চেষ্টা করল খুব। আফিম মেয়েটির ঠোঁটে আটকে থাকা গামটেপ খুলে দিল। সাথে সাথে মেয়েটি চিকন কণ্ঠে প্রশ্ন তুলল,

“- তোমরা কারা? আমাকে বেঁধে রেখেছো কেন”?

মেয়েটা নিতান্তই ছোট। বয়স সতেরো কি আঠারো। ওজন, উচ্চতাও কম। বাচ্চা প্রকৃতির, ভীষণ আদুরে। তবে তার এই সুন্দর মুখ খানা দেখে পাষাণ হৃদয়ের পুরুষ গুলোর মন গলে না। গাম্ভীর্যপূর্ণ কণ্ঠে আফিম জিজ্ঞেস করে,

“- নাম কী তোর”?

মেয়েটা ভড়কাল না। মিষ্টি হেসে জবাব দিল,
“- আমি সাবিহা, আর তুমি”?

পেছন থেকে একটি ছেলে এগিয়ে এসে আফিমের কানে কানে নিচু আওয়াজে বলল,

“- ভাই, মেয়েটার মানসিক সমস্যা আছে, প্রতিবন্ধী। নিজে থেকেই আমাদের সাথে চলে আসছে। বলেছি শিহাব তোমাকে ডাকে, সাথে সাথে গাড়িতে উঠে বসছে।”

বলে ছেলেটি আগের মতো পিছনে গিয়ে দাড়াল। আফিম দৃঢ় দৃষ্টিতে দেখল মেয়েটাকে। নিষ্পাপ, পবিত্র মুখ মেয়েটার। মুখে মায়া, ঠোঁটে হাসি। কোনো রাগ ঢাক না রেখে সাবিহা বলে,
“- তোমরা কী বললে? আমাকেও বলো”।

হাঁটু গেড়ে বসে ছিল আফিম। মেয়েটি আসলেই মানসিক ভাবে অসুস্থ। নইলে এত রাতে এত গুলো ছেলেকে একসাথে দেখে ভয় পেত, এমন হাসি মুখ করে বসে থাকতো না। আফিম সাবিহাকে ভয় দেখাতে বলে,

“- আমরা তোকে কিডন্যাপ করেছি। তোর ভাই আসলে তোর সামনেই তোর ভাইকে মেরে বালি চাপা দেব”।

সাবিহা অবুঝের ন্যায় চেয়ে থেকে বলল,
“- তোমরা আমাকে তুমি করে না বলে তুই করে বলছো? উঁহু, ইটস ব্যাড ম্যানার্স”।

রায়ান বলে,
“- তোমার ভয় করছে না”?

সাবিহা নির্বিঘ্নে উত্তর দিল,
“- ও মা ভয় পাবো কেন? তোমরা তো আমার ভাইয়ার মতো। আমার ভাইয়াও তোমাদের মতো রাগী। কিন্তু ভাইয়া আমাকে কখনো বকে না, তোমরাও বকবে না, আমি জানি”।

মেয়েটির সরল বিশ্বাসে সবাই হকচকিয়ে উঠল। সাবিহার মাঝে ভয় নেই, রাগ নেই। খুব স্বাভাবিক ভাবেই বসে আছে সে। যেন ভয় পাওয়ার মতো তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।
আফিম সাবিহার পায়ের শিকল খুলে দিল। আফিমের পরনে কালো শার্ট আর কালো জ্যাকেট। গলায় সিলভার রঙের চেইন। হাতে রাবারের মতো কয়েকটি ব্রেসলেট। আঙুলে পাথরের কয়েকটি আংটি, চুলগুলো অগোছালো। বখাটেদের মতো চালচলন সবার। আফিম সহ বাকিদের মাথায় হেলমেট আটকে আছে। মুখ লুকোনোর এই পন্থা ওরা সর্বদা অবলম্বন করে। নইলে সাবিহাকে মুখ দেখালে পরে পুলিশ কেস হতে পারে।

সাবিহার ওদেরকে মাস্তান বলে মনে হলো না। বরং সে গাল ভরে হেসে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে আফিমকে বলে উঠল,

“- এই তোমার চোখটা এত সুন্দর কেন? হায় আল্লাহ! তোমার চোখের মণি সবুজ, আমার প্রিয় রঙ ও সবুজ।”

বলেই সাবিহা খিলখিল করে হাসে। খুব আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকে আফিমের দিকে। যেন বিরল চোখ সে আগে কখনো দেখেনি।
সাবিহা মানসিক ভাবে অসুস্থ। হয়তো জন্ম থেকেই। আর পাঁচটা মানুষের মতো স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা করতে পারে না সে। বয়সের তুলনায় তার আচরণ ছোট বাচ্চাদের মতো। এত কিছুর মাঝেও মেয়েটি মুক্তি পেতেই হামাগুড়ি দিয়ে ঘরের কোণার মেঝেতে পড়ে থাকা তুলো আর কাপড়ের তৈরি পুতুলটা নিয়ে আসে নিজের কাছে। পুতুলটা জড়িয়ে ধরে ফের বলে,

“- তুমি খুব সুন্দর।”

মুখ না দেখে স্রেফ গায়ের গড়ন, কণ্ঠ আর চোখ দেখেই সাবিহার আফিমকে পছন্দ হয়েছে।
আফিম মুচকি হেসে ফেলল সাবিহার কাণ্ডে। বলল,
“- আমাকে তোর শিহাব ভাইয়ের চেয়েও বেশি ভালো দেখতে”?

সাবিহা তৎক্ষনাৎ মাথা নেড়ে বলল,
“- না শিহাব ভাইয়া বেস্ট”।

আফিম ছোট ছোট চোখ করে তাকাতেই সাবিহা উত্তেজিত, অস্থির কণ্ঠে বলল,
“- তুমিও আজ থেকে আমার ভাইয়া। আমি রোজ তোমায় ফেইরি টেলস শোনাবো।”

আলতো হাসল আফিম। তার কোনো উদ্দেশ্যই ছিল না মেয়েটাকে এখানে নিয়ে আসার। যদি জানতো মেয়েটি বাচ্চা, তবে এখানে না এসেই ছেলেদের আদেশ দিতো সাবিহাকে ফিরিয়ে দিয়ে আসার জন্য। এতক্ষণে শিহাব নিশ্চয়ই ক্ষেপেছে। তন্ন তন্ন করে খুঁজছে সাবিহাকে। শুনেছে শিহাবের প্রাণ ভোমরা এই সাবিহা। তাই ওর ছেলেপেলে সাবিহাকে পেয়ে আর সময় ব্যয় করেনি। আফিম কড়া চোখে চেয়ে সবাইকে বলল,

“- ওকে ফিরিয়ে দিয়ে আসছি। তোরা বাড়ি যা”।

শান্ত খুব খুশি হলো বন্ধুর এই কথায়। যে যার বাইক নিয়ে ছুটে চলল বাড়ির দিকে। আফিম দুজনকে পাঠাল শিহাবের খোঁজ নিতে। শিহাব আপাতত পুলিশ স্টেশনে। ওর দল গুলো উত্তরা, বাড্ডা, সাভারে ছুটেছে। এই সুযোগে সাবিহাকে নিয়ে বেরিয়ে আসে আফিম। বাইকের পেছনে বসে মেয়েটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আফিমকে। যেতে যেতে দোকানের দেখা পেতেই সাবিহা বায়না ধরে সে ললিপপ খাবে, আইসক্রিম খাবে। আফিম কেন যেন রাগ দেখাতো গিয়েও পারে না। দোকান থেকে আইসক্রিম বক্স, চকলেট বক্স এনে সাবিহার হাতে তুলে দিতেই সাবিহা খিলখিল করে হাসে। বলে,

“- তুমিও আমার বেস্ট ভাইয়া। তুমি খুব ভালো”।

আফিম সাবিহার চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে বলে,
“- তুইও আজ থেকে আমার বোন”।


সাবিহাকে ফিরিয়ে দিয়ে বাসায় ফিরে আসে আফিম। রাত দুটো বাজে তখন। এক্সট্রা চাবি দিয়ে বাড়িতে ঢুকতেই দেখে সোফায় শুয়ে আছে মৃত্তিকা। মুখটা শুকনো, মলিন। দু হাত মাথায় রেখে জড়সড় ভঙ্গিতে একপাশে কাত হয়ে শুয়ে আছে মেয়েটা। মাথা এবং বুকে খুব ভালো করে ওড়না পেঁচিয়ে রেখেছে। মৃত্তিকার দিকে তাকিয়ে আফিমের হৃদয় ছলকে উঠল। মৃত্তিকা কি আফিমের জন্য অপেক্ষা করছিল? অপেক্ষা করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়েছে?

মৃত্তিকার সামনে সোফার কাছে বসল আফিম। গভীর নয়ন জোড়া নিবদ্ধ করল মৃত্তিকার দিকে। মৃত্তিকা কেঁদেছে কি? চোখ-মুখ এতটা শুকনো, ফ্যাকাসে লাগছে কেন? যেন প্রাণ নেই, আনন্দ নেই। আফিম তার শীতল আঙুলের পৃষ্ঠ ছোঁয়ায় মৃত্তিকার গালে। অতিরিক্ত ঠাণ্ডা স্পর্শ পেয়ে নড়েচড়ে ওঠে মেয়েটা। আফিম ধীর, নিচু, শান্ত স্বরে বলে,

“-, মৃত্ত”।

ঘুমের ঘোরে মৃত্তিকা হেসে উঠল। ঠোঁটের কোণ প্রসারিত হলো মেয়েটার। ঘুমের ঘোরে মেয়েটিকে হাসতে দেখে আফিম নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইল তার অপরূপার দিকে। আফিমকে বোধহয় মৃত্তিকার স্বপ্ন মনে হচ্ছে। আফিমের ডাক, স্পর্শ মেয়েটির ভ্রম বলে মনে হচ্ছে। তার হাসিতে আফিমের মন ও দুলে উঠল। তার সামনে মৃত্তিকা সচরাচর হাসে না। তাকে দু একবারের বেশি হাসতে দেখেনি আফিম। মৃত্তিকা হয় আফিমের উপর রাগ করে, নয়তো কাঁদে। কখনো আবার অভিমানও করে। কিন্তু হাসে না মেয়েটা, ভুল করেও না।

আফিম সোফায় নিজের চিবুক ঠেকিয়ে মৃত্তিকার মুখের কাছে মুখ নিয়ে আসে। ঘুমের কারণে মৃত্তিকার নিঃশ্বাস ভারি। নিঃশ্বাসের তোপে বুক ওঠানামা করছে। আফিম দৃঢ় অথচ শান্ত কণ্ঠে বলে,

“-, অ্যাই মৃত্ত,”।

এবারে মৃত্তিকা নড়ে ওঠে। তন্দ্রাচ্ছন্ন ঘন নেত্রপল্লব চোখ জোড়া ধীরে মেলে। অতি নিকটে আফিমকে দেখে থমকায় মেয়েটা। স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে সুদর্শন পুরুষটির মুখ পানে। তাকে এতটা বিব্রত হতে দেখে দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে নুইয়ে হাসে আফিম। মৃত্তিকা বিস্মিত সুরে ডাকে,

“- আফিইইইম”।

খুব নিচু স্বর। যেন মনে মনে আওড়াল নামটা। তবে অতি নিকটে থাকায় ডাকটা শুনতে পেল আফিম। তার ঠোঁট নাড়ানো দেখে আফিমের বুকে তোলপাড় বাড়ে। নামের মাঝের “ফ”শব্দটা এতটাই কোমল সুরে আওড়ায় মেয়েটা, শুনতে অদ্ভুত মোহনীয় লাগে।

“- বলো”।

“- কোথায় ছিলেন”?

“- আড্ডা দিচ্ছিলাম, বন্ধুদের সাথে”।

দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে মৃত্তিকার বুক চিঁড়ে। বলে,
“- এত রাতে কেউ বাড়ি ফেরে”?

আফিম তৎক্ষনাৎ জবাব দেয়,
“- আমি তো এরকমই”।

“- এরকম মানুষদের বিয়ে করা উচিত নয়, পরিবারের সাথেও থাকা উচিত নয়। আপনি জানেন না? আপনি নিয়ম ভাঙছেন আফিম। আপনার উচিত একা, আলাদা থাকা। যেখানে আপনার কোনো আপনজন থাকবে না, যেখানে আপনার পিছুটান থাকবে না, আপনার প্রতি কারো মায়া থাকবে না, অপেক্ষারত কোনো সঙ্গী থাকবে না”।

বলতে গিয়ে কণ্ঠ ভেঙে আসে মৃত্তিকার। আফিম এমন কেন? সে অভিমান করেছিল, আফিমের কি উচিত ছিল না তার অভিমান ভাঙানোর? একটু ভালোবাসা, একটু আশ্রয়ের জন্যই তো সব ছেড়ে ছুঁড়ে চলে এসেছে মৃত্তিকা। এখানে তার কেই বা আছে এক আফিম ছাড়া? খুব দ্রুত সম্পর্ক ভেঙে ফেলাটা পছন্দ না মৃত্তিকার। যতদিন না সীমা লঙ্ঘন হচ্ছে, সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে যাচ্ছে, ততদিন অন্তত সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা উচিত। এক জীবনে একাধিক বিবাহে আবদ্ধ হতে চায় না মৃত্তিকা। আফিমের সাথে বিয়েটা জোর করে হলেও সে পণ করেছিল এ সম্পর্ককে স্থায়ী করার চেষ্টা করবে, আফিমকে ভালো পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে। অন্তত ইয়াসিনের থেকে আফিম যদি ভালো হয়, প্রতারণা না করে, তবে মনের বিরুদ্ধে গিয়েও আফিমের সাথে সম্পর্কটা ঠিক রাখার চেষ্টা করবে মৃত্তিকা।

কিন্তু বিয়ের এতদিন পরেও আফিমের মাঝে পরিবর্তন নেই। না কমেছে তার উগ্রতা, না কমেছে মাস্তানি। আগের মতোই সে নিজের মত চলে, বড় ছোট কাউকেই সম্মান করে না, ভদ্রতা নেই তার মাঝে। লোকমুখে শুনতে হয় আফিমকে বিয়ে করাটা সবচেয়ে বড় বোকামি হয়েছে মৃত্তিকার। ভবঘুরে, বেকার বখাটে ছেলেকে বিয়ে করা মানে নিজের ভাগ্যকে চরমভাবে অপদস্ত করা। কিন্তু ভাগ্যের লিখন কিভাবে খণ্ডানো যায়? না চাইতেও ওদের বিয়েটা হয়েছে। একসূত্রে বাঁধা পড়েছে তারা।

নিরবতা ভেঙে আফিম বলে ওঠে,
“- আমার মতো পাষাণ মানুষের জন্য কাঁদছো? কেন? একটা গুণ্ডার জন্য কেন অপেক্ষা করছো মৃত্ত? তুমি তো আমায় ভালোবাসো না”।

মৃত্তিকা কেঁপে উঠল খানিক। বলল,
“- ভালোবাসি না ঠিক, তবে ভালোবাসা চাইছি। যতটা ভালোবাসা পেলে অতীতকে চিরতরে মুছে ফেলা যায়, যতটা ভালোবাসা পেলে বেঁচে থাকার স্বাদ উপলব্ধি করা যায়, ঠিক ততটাই ভালোবাসা চাইছি”।

চোখ জোড়া জ্বলে উঠল আফিমের। মৃত্তিকার সহজ স্বীকারোক্তিতে আফিমের বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেল। কি অমায়িক আবেদন! এমন আবেদন কেউ কখনো করেছে কাউকে? ভালোবাসা না দিয়েও ভালোবাসা পাওয়ার এত তীব্র আকাঙ্খা আফিম দেখেছে কখনো? মৃত্তিকাকে ভালোবাসার কারণ কি ছিল? মেয়েটা মাত্রাতিরিক্ত সরল, ঠকে যাওয়া আপাদমস্তক একজন দূর্বল নারী তাই? নাকি মেয়েটার গভীর মায়ায় হৃদয় ওলটপালট হয়েছিল, বুকের মাঝে শান্ত সাবলীল ঝড় বয়ে চলেছিল সেজন্য?

হাত বাড়িয়ে মৃত্তিকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল আফিম। মৃত্তিকার দেহ ক্ষণে ক্ষণে কাঁপছে। আফিম প্রচণ্ড ধীর কণ্ঠে বলে ওঠে,

“- তোমার মতে ভালোবাসার সংজ্ঞা কী মৃত্ত”?

“- ভালোবাসা? ভালোবাসা হলো বেঁচে থাকার মূলমন্ত্র। একমাত্র ভালোবাসা পেলেই মানুষ বেঁচে থাকার আনন্দ উপভোগ করতে পারে। আবার ভালোবাসায় সামান্যতম ধোঁকা পেলে মানুষের মন পঁচে-গলে যায়। ভালোবাসা আমার কাছে আপেক্ষিক সুখ। জানেন, এক বেলা ভাত না খেলেও মানুষ বাঁচে, কিন্তু এক মুহুর্ত ভালোবাসা না পেলে মৃত্যু ঘনিয়ে আসে”।

চলবে?
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি_শেখ

[নোটঃ স্পয়লারের পর্ব আসবে রাতে। আরো একটি পর্ব পাবেন। ২৫৫০+ শব্দ লিখেছি। আর গল্পটা এত দ্রুত শেষ হবে না। তাই স্যাড এন্ডিং দিচ্ছি বলে মাথা নষ্ট করিয়েন না। ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply