ওরা মনের গোপন চেনে না
পর্ব সংখ্যা [১৬] (আফিমের আগমন)
আশরাফ মির্জা বাড়ি ফেরার পর খাবার খাননি। মৃত্তিকা জিজ্ঞেস করেছিল খাবার দেবে কিনা। তিনি কিছুই বললেন না। মৃত্তিকা বুঝতে পারে বাবার মতো মানুষটাকে। প্রথমে অনেকটা হম্বিতম্বি করলেও সপ্তাহে খানেক সময় চলে যাওয়ার পরও আফিমের সংবাদ না পেয়ে তিনি আতঙ্কিত। ভাত গিলেন খুব কষ্ট করে। বাইরে থেকে তাকে খুব শক্ত দেখা যায়, মনে হয় ছেলের জন্য তার কোনো চিন্তাই নেই। অথচ ভিতরে ভিতরে যে বাবার হৃদয়টা কেঁদে ওঠে, তা মৃত্তিকা বোঝে।
রাতে আশরাফ মির্জা ও মৃত্তিকা, কেউই ডিনার করল না। আশরাফ মির্জা গোমড়া মুখে চলে গেলেন ঘরে। একা একা ভালো লাগছিল না বলে মৃত্তিকা তার শ্বশুর বাবার ঘরের সামনে আসে। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখে বয়স্ক মানুষটা দেয়ালে টানানো আফিমের ফটোফ্রেমের দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে উঠেছে কি? পেছন থেকে দেখতে পারে না মৃত্তিকা। দরজায় কড়াঘাত করে সে। তাকে দেখে আশরাফ মির্জা নড়েচড়ে দাঁড়ান। শক্ত আবরণ উন্মুক্ত করে বলেন,
“- এসো মা”।
মৃত্তিকা এগিয়ে আসে। ক্লান্ত হেসে বলে,
“-, ছেলেকে বড্ড ভালোবাসেন, তাইনা বাবা”?
বাব ডাক শুনে চমকালেন আশরাফ মির্জার। হতভম্ব চোখে তাকালেন। আশরাফ মির্জা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন আফিম মৃত্তিকার সাথে যা করেছে তা অন্যায়। আফিম যদি মেয়েটার পিছু পড়ে না থাকতো তাহলে মেয়েটা কোনোদিনই তার বখাটে ছেলেকে বিয়ে করতো না। আফিম যা করেছে সবটা জোর জবরদস্তি করে। তিনি মাঝে মাঝে মৃত্তিকার সামনে যেতে লজ্জা পান। মেয়েটা যদি বলে বসে আপনার সন্তান আমার জীবনকে নরক বানিয়ে দিয়েছে। তখন কি বলবে? লজ্জা লাগবে না? তাই তিনি মৃত্তিকার মুখে এত দ্রুত বাবা ডাক শুনতে পাবেন, এটা তিনি আশা করেননি। তার চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠতেই মৃত্তিকা বলল,
“- বাবা ডাকলে কি রাগ করবেন”?
তিনি হাসলেন। গর্বিত ভঙ্গিতে বললেন,
“- একদমই না, তোমার মতো মেয়ে পেয়ে পিতৃ জীবন সার্থক’।
“- আমি আমার প্রশ্নের উত্তর পেলাম না”?
আশরাফ মির্জা কণ্ঠে জোর দিয়ে বললেন,
“- গুণ্ডা, বদমাশদের কে ভালোবাসে”?
“- সন্তান ভালো হোক বা খারাপ, পিতা-মাতার কাছে তার সন্তানই সেরা। আপনার সাথে আফিমের আচরণ, স্বভাব, ভাবনাচিন্তা কিছুই মেলে না, তবু রক্তের টান তো অস্বীকার করা যায় না তাইনা? আপনি খিটখিটে হলেও আপনার ভেতরটা খুব নরম বাবা। যতই রাগারাগি করেন, চতুর আফিম আপনার অভিনয় ধরে ফেলে”।
আশরাফ মির্জা চেয়ারে বসেন। চেয়ারে গা এলিয়ে তিনি বলেন,
“- কতবার বলেছি, ভালো হয়ে যাও। পড়াশোনাটা ঠিকমতো করো, বাজে আড্ডা বন্ধ করো, ব্যবসা দেখো নয়তো চাকরি করো। কোনো কথাই শোনে না আমার। একটুও মানে না আমাকে”।
বলতে গিয়ে ভদ্রলোকের চোখ ছলছল করে ওঠে। মৃত্তিকার চোখ ভরে ওঠে। আশরাফ মির্জা কম্পিত কণ্ঠে বলেন,
”- কোথায় আছে, খেয়েছে কিনা কিছুই জানি না। একটা ফোন বা মেসেজ তো দিতে পারে। কার সাথে মারামারি করে কোথায় বেহুঁশ হয়ে পরে আছে কে জানে”?
মৃত্তিকা বুঝতে পারে বাবার যন্ত্রণা। বলে,
“- আপনার কাছে ঘুমের ঔষধ আছে বাবা? আছে আপনার কাছে? অনেকদিন হলো রাতে ঘুম হয় না। আজ একটু ঘুমবো। ততক্ষণে যেন আফিম মির্জা চলে আসে কেমন? আমি উনার জন্য আজও রান্না করেছি। ও আসলে আমায় একটু ডেকে দেবেন বাবা”?
আশরাফ মির্জা দেখলেন মেয়েটাকে। মেয়েটার আলোহীন ভবিষ্যত উপলব্ধি করতে পেরে বুক ভার হয়ে আসে আশরাফ মির্জার। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছোট্ট টেবিলের ওয়ারড্রব খুলে ঔষধের পাতা বের করে দেন মৃত্তিকাকে। মৃত্তিকা ঔষধের পাতা নিয়ে ঘরে ফিরে আসে। আজ তার ঘুমতে ইচ্ছে করছে। ঘুমোলে কি আফিম ফিরবে?
সময়টা কত তা ধারণা নেই, তবে রাত গভীর হয়েছে। থাই গ্লাসের ফাঁক গলিয়ে দৃশ্যমান হচ্ছে না আলো। সমস্ত ধরণী আধারে তলিয়ে আছে। মৃত্তিকার চোখে ঘুম নেই। আজকাল রাতে ঘুম আসে না। কোথাও যেন একটা দুশ্চিন্তা ভেতরে বাসা বেঁধে আছে। আফিমের হদিশ নেই। কোথায়, কিভাবে আছে ছেলেটা তা কেউ জানে না। আশরাফ মির্জা নির্বিকার। কোনো রকম আওয়াজ তোলেন না আফিমকে ঘিরে। তিনি আজকাল একেবারেই নিশ্চুপ হয়ে গেছেন। কথাবার্তা খুব একটা বলেন না। তবে মৃত্তিকার সাথে ভীষণ আন্তরিক তিনি। মৃত্তিকা দুয়েকবার আফিমের খোঁজ নেয়ার কথা বলে বিশেষ লাভ করতে পারেনি। আশরাফ মির্জার ধারণা আফিম যদি সুস্থ থাকে তাহলে ফিরে আসবে৷ আর যদি না থাকে, তাহলে আসবে না। তবে একটা খবর অন্তত জানা গেছে। তা হলো রূপক, রায়ান আর শান্তও নিখোঁজ। ওদের বাবা-মা তন্ন তন্ন করে খুঁজছে ওদের। ওরা চারজন হয়তো একসাথেই আছে। কিন্তু কি অবস্থায় আছে কে জানে?
মৃত্তিকা ঘুমোনোর চেষ্টা করে। বালিশে মাথা ঠেকিয়ে বিভোর হয়ে ভাবে নিজের ভবিষ্যতের কথা। আফিম যদি কখনোই না ফেরে, তাহলে তার কি হবে? এখানেই পরে থাকবে, নাকি ফিরে যাবে পরিবারের কাছে? মৃত্তিকার পরিবারের কেউ কল করেনি একমাত্র মৃত্তিকার মা ছাড়া। মৃত্তিকার মা আফিমের খোঁজ মিলেছে কি না তা জানার জন্য কল করেছিল। ও বাড়ির সবার ধারণা আফিম ফিরবে না। ফিরলে এতদিনে ফিরে আসতো, অন্তত যোগাযোগ টুকু করতো। হাহাকার ও বাড়িতেও ছড়িয়ে পরেছে। কেবল নির্জীব মৃত্তিকা আর আশরাফ মির্জা। আফিম হয়তো কোথাও লাশ হয়ে পরে আছে, নয়তো লুকিয়ে আছে কোথাও। মৃত্তিকার বাবা জানিয়েছেন কয়েকদিনের মধ্যে আফিমের সন্ধান না পাওয়া গেলে ওদের ডিভোর্স নিয়ে তিনি আবারও ভাববেন। মৃত্তিকা দ্বিমত পোষণ করেনি। ভাগ্যের উপর সবটা ছেড়ে দিয়েছে।
আরো কিছুক্ষণ পর দরজায় খটখট আওয়াজ শুনতে পায় মৃত্তিকা। ঘরের দরজা সে ভেতর থেকে আটকে রাখে, বেলকনির দরজাও বন্ধ রাখে, নইলে ভয় লাগে। কিন্তু এত রাতে কে এসেছে? এত ধীরেই বা কেন দরজা ধাক্কাচ্ছে? মৃত্তিকা শোয়া থেকে উঠে বসে। গায়ের ওড়নাটা ভালোভাবে জড়িয়ে নেয় বুকে ও পিঠে। দরজার কাছে ঘেঁষে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে,
“- কে? বাবা”?
ওপ্রান্ত থেকে গভীর স্বরে পুরুষালি আওয়াজ ভেসে আছে। ফিসফিসিয়ে ডাকে,
“- মৃত্ত..
ডাকটা কর্ণকুহর পৌঁছানো মাত্র গা হীম হয়ে আসে মৃত্তিকার। শ্বাস আটকে আসে, হৃদয় ছলকে ওঠে। হৃদপিণ্ডের ধুকবুকানি থেমে যায়। মস্তিষ্ক দুর্বল আর ফাঁকা হয়ে দিগবিদিক হারায়। জ্ঞান-হুঁশ হারিয়ে ভাবাবেগ শূন্য হয়ে পড়ে মৃত্তিকা। কণ্ঠ জড়িয়ে আসে, জিভের ডগা ভার হয়ে যায়। ক্ষণকাল ভেবে হুট করে দরজার নব ঘুরিয়ে দেয় মৃত্তিকা। চওড়া দরজাটা মেলতেই পরিচিত চেহারাটা প্রতীয়মান হয়। সেই সবুজাভ, গভীর চোখ। সেই তিক্ষ্ণ চোয়াল, উষ্কখুষ্ক চুলের সুদর্শন পুরুষ। আফিম চেয়ে রয় মৃত্তিকার দিকে। মৃত্তিকাও চোখের তৃষ্ণা মিটিয়ে নেয়। হা করে তাকিয়ে থাকে মানুষটার দিকে। ভেবেছিল মানুষটাকে সামনে পেলেই ভয়ানক রাগ দেখাবে, প্রচণ্ড খারাপ ভাবে আফিমকে কথা শুনিয়ে দেবে। মৃত্তিকা ভেবে রেখেছিল আফিমকে দেখামাত্র সবকিছুর কৈফিয়ত চাইবে সে, অথচ মানুষটা যখন সামনে দাঁড়িয়ে, তখন বলার ভাষা নেই, মুখে সাজিয়ে রাখা কথা নেই। সব যেন গুলিয়ে গেছে, উড়ে গেছে ঝড় হাওয়ায়। আফিম নিজে থেকেই বলল,
“- এখনো জেগে আছো”?
মৃত্তিকার বুকটা ভার হয়ে আসছে। আফিমের প্রতি ভালোবাসা না থাকুক, টান না থাকুক। মানবিকতাটুকু তো আছে। এইযে বাড়ির মানুষটা নেই, কোথায় আছে, কি অবস্থায় আছে কিছুই জানে না মৃত্তিকা। প্রাণোচ্ছল, প্রানবন্ত মানুষটা আশপাশের কোথাও নেই, তার বেঁচে থাকার সংবাদ নেই, এতে একটু হলেও তো দুশ্চিন্তা হয়, ফাঁকা ফাঁকা লাগে বাড়িটা। মায়া না থাকুক, তবুও তো আগ্রহ আছে, ভালোমন্দ জানার ব্যস্ততা আছে, এই মানবিকতা টুকুর জন্যও তো বুক ফেটে যায়।
মৃত্তিকা জবাব দিতে পারে না। তার চোখের কার্ণিশ জ্বলে ওঠে। আচমকা আফিমের পেছন থেকে একটি মেয়ে বেরিয়ে আসে। চমৎকার মুখের আদল মেয়েটির। লাল টকটকে বেনারসি গায়ে জড়ানো, হাতে চুরি, নাকে নাকফুল। সদ্য বিবাহিত কনে। মুখের প্রসাধনী লেপ্টে গেছে। এক মুহুর্তের জন্য থমকে গেল মৃত্তিকা। মেয়েটির চেহারায় আতঙ্ক, আফিমের পেছনে জড়সড় ভঙ্গিতে লুকিয়ে আছে। তার বয়স মৃত্তিকার মতোই হবে। কে এই মেয়েটি? এত রাতে আফিমের সাথে মির্জা ভিলায় কি করতে এসেছে? মনটা কু ডেকে ওঠে। মস্তিষ্ক বার্তা দেয় মেয়েটি আফিমের পরিচিত। বিয়ের সাজে কনে রূপে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীকে আফিম নিয়ে এসেছে। কিন্তু, এমনটা কি করে হয়? মৃত্তিকা তো আফিমের বউ। আফিম কি করে এমনটা করতে পারে? আফিমের সাথে এই মেয়েটা তাহলে কে?
মাত্রাতিরিক্ত শান্ত কণ্ঠে মৃত্তিকা শুধোয়,
“- এই মেয়েটার জন্যই কি এতদিন ফিরতে পারেননি”?
আফিম মৃত্তিকার আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ মাথা নাড়ে। মৃত্তিকা চোখ বুজে নেয়। আফিম বিয়ে করেছে? নইলে মেয়েটি কেন তার সাথে এসেছে, তাও আবার এই সাজসজ্জায়? তার পরিচয় তার বেশভূষা বলে দিচ্ছে।
চোখ মেলে মৃত্তিকা ঘনঘন শ্বাস ফেলে বলে,
“- আপনিও আমাকে ঠকালেন? দ্বিতীয় বারের মতো বাজে ভাবে ঠকে গেলাম আমি? এত নিখুঁত, এত ভয়ানক”।
মৃত্তিকার গা দুলছে। সে সরে দাঁড়ায় দরজার সামনে থেকে। মেয়েটি নীরব। নরম চোখ জোড়া ভরসা পেতে আফিমকে দেখছে। মেয়েটির সাজসজ্জা দেখে আর কোনো বিভ্রান্তি থাকার কথা নয়। মেয়েটির হাতের কাগজটি কাবিননামার। তার মানে যা ভাবছে, সেটাই। মৃত্তিকা খানিক বাদে গাল ভরে হেসে বলে,
“- আমি চলে যাবো?”
আফিম এগিয়ে আসে মৃত্তিকার দিকে। কোমল সুরে বলে,
“- মৃত্ত, অনেক বড় সিদ্ধান্ত তোমাকে না বলেই নিয়েছি। শাফায়াত আফিম মির্জা কখনো কারো মতামতের তোয়াক্কা করেনি। তোমার জন্য আমার এ সহজাত আমি ভাঙতে পারি না”।
মৃত্তিকার ভয় বাড়ে ক্রমাগত। অস্থির লাগে খুব। ভাঙা স্বরে বলে ওঠে,
“- ও কে? আপনার.. আপনি বিয়ে, মানে ও”..
কণ্ঠনালী পেঁচিয়ে আসছে জড়তায়। মৃত্তিকার এহেন উত্তেজিত ভঙ্গি দেখে আফিম থমকে তাকায়। দরজায় আঁটসাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নতুন বউকে হাতের ইশারায় ডেকে নেয় ঘরে। মেয়েটিকে এগুতে দেখে ভয়ে আঁতকে ওঠে মৃত্তিকা। চোখ বুঁজে বলে,
“- ওকে যেতে বলুন, আমি,আমি দেখতে চাই না”।
আফিম ব্যস্ত কণ্ঠে বলে,
“- মৃত্ত, অ্যাই বোকা। ও আমার কেউ হতে যাবে কেন? তুই তো আছিস। ওর নাম তন্বী, রায়ানের বউ”।
মৃত্তিকা কিছু শুনতে চায় না বলে দু হাতে কান চেপে ধরে রেখেছিল। আফিমের কথা তবুও তার কর্ণকুহরে পৌছাল। বিস্ময়ে হাত নেমে গেল কান থেকে। চট করে মেয়েটির হাত থেকে কাবিন নামার কাগজটি কেড়ে নিয়ে নজর বুলাল সেথায়। রায়ানের নাম স্পষ্ট, সাথে তন্বীর নাম। ১০ হাজার টাকা দেনমোহর ধার্য করে রায়ান আর তন্বীর বিয়ে হয়েছে। তবে দিনটা আজকের নয়, আরো ছয় দিন আগেই বিয়ে হয়েছে ওদের।
মৃত্তিকার চনমনে, অশান্ত মনটা দমে যায়। আফিম তন্বীকে বলে,
“- তন্বী, পাশের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়। কোনো সমস্যা হলে ডেকো”।
তন্বী মেয়েটা চলে যায়। মৃত্তিকা থ বনে তাকিয়ে থাকে আফিমের পানে। শান্ত, স্বাভাবিক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“- এতদিন বাড়ি ফিরেন নি কেন?”
আফিম আলস্য ভঙ্গিতে বিছানায় শুয়ে পড়ে দু হাত-পা ছড়িয়ে। বলে,
“- তন্বীকে বিয়ের আসর থেকে তুলে এনেছি”।
মৃত্তিকার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। পাগল নাকি? একটা মেয়েকে কেন বিয়ের আসর থেকে তুলে এনেছে? এনে রায়ানের সাথে বিয়েও দিয়ে ফেলেছে, কি সাংঘাতিক! কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রয় মৃত্তিকা। বলে,
“- এজন্য বাইরে ছিলেন”?
আফিম হেসে তাকাল মৃত্তিকার দিকে। ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,
“- জানো কি হয়েছে? ওইদিন তোমার থেকে বিদায় নিয়ে বের হলাম না? তার একটু পরেই রায়ানের ফোন আসে। রায়ান তন্বীকে ভালোবাসে প্রায় তিন-চার বছর ধরে। কিন্তু তন্বী ওকে কোনোদিন পাত্তা দেয়নি। হঠাৎ ওইদিন তন্বী রায়ানকে ফোন করে বলে আজকে তন্বীর বিয়ে, আর ও বিয়েটা করতে চায় না। রায়ান যেন ওকে তুলে নিয়ে আসে। রায়ান তো খুশিতে আত্মহারা, মেঘ না চাইতেই জল পেয়ে গিয়েছে।”
মৃত্তিকা বাকিটুকু বলতে না দিয়ে রাগ দেখিয়ে বলে,
“- রায়ান ভাইকে বলেছে যেতে, আপনি কেন গিয়েছিলেন”?
আফিম গা দুলিয়ে হেসে বলে,
“- তন্বীর বাবা থানার এস আই, তোমার মনে হয় ও এত বড় দুঃসাহসিক কাজ করবে? রায়ান রীতিমতো কান্নাকাটি করছিল। দাঁড়াও তোমাকে ভিডিও দেখাই”।
বলেই আফিম শোয়া থেকে উঠে ফোন বের করতে উদ্যত হয়। মৃত্তিকা চটে গিয়ে বলে,
“- রাখুন আপনার ফালতু মজা, এতগুলো দিন বাইরে ছিলেন। একটা টেক্সট ও তো পাঠাতে পারতেন”?
“-, আরেহ্ বোকা! তন্বীরা চট্টগ্রামে থাকে। আমরা সবাই চট্টগ্রামে গিয়ে ওকে তুলে এনেছি। এসআই তার পুলিশ ফোর্স নিয়ে পুরো এক সপ্তাহ আমাদের কুত্তার মতো খুঁজেছে। আমরা সবাই ফোন অফ করে রাখতে বাধ্য হয়েছিলাম। ওরা সবার নম্বর ট্র্যাক করছিল”।
আফিম পুনরায় বলে,
“- এ কদিন আমরা লুকিয়ে লুকিয়ে থেকেছি। ঠিকমতো খেতে পারিনি, ঘুমতে পারিনি। তন্বীকে তুলে এনেই রায়ানের সাথে বিয়ে পরিয়ে দিয়েছি। এখন এসআই খুঁজে পেলেও কোনো ফায়দা নেই। রায়ানের বাবাকে এসবের কিছুই বলা হয়নি। দুদিন তন্বী এখানে থাকুক, ওদিকটা গুছিয়ে তারপর রায়ান বউ বাড়ি নিয়ে যাবে”।
মৃত্তিকা আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইল মানুষটার দিকে। রাগে মুখ লাল হয়ে উঠল মেয়েটার। ততক্ষণাৎ বেরিয়ে পরে ঘর ছেড়ে। আফিম পিছন থেকে ডেকে বলল,
“- একটু শরবত দিও তো, ফ্রিজের পানি দেবে”।
মৃত্তিকা শুনেও শুনল না। আফিম ভালো আছে এটাই অনেক। তবে যা বিপত্তি ঘটিয়েছে তাতে মৃত্তিকার মাথায় আগুন জ্বলছে। লোকটা এত বদমাশ কেন? বিয়ের আসর থেকে এত ঝুঁকি নিয়ে পুলিশের মেয়েকে তুলে এনেছে বন্ধুর জন্য। একটুও ভয় নেই লোকটার? ধরা পরলে কি হতো? মৃত্তিকা আশরাফ মির্জার ঘরে ছুটে যায়। তিনি ঘুমোননি এখনো। ছেলের চিন্তায় ঘুম হয় না। মৃত্তিকা আশরাফ মির্জাকে সবটা জানাতেই তিনি আগের রূপে ফিরে আসেন। ভয়ঙ্কর রেগে গিয়ে ছুটে আসেন মৃত্তিকাদের ঘরে। বাপ-ছেলের লড়াই দেখতে পিছু পিছু ছুটে আসে মৃত্তিকাও। এখন একটা তাণ্ডব হয়ে যাবে।
আশরাফ মির্জা এসেই ছেলেকে বলেন,
“- এখনই বেরিয়ে যাও, এ বাড়িতে তোমার জায়গা নেই”।
আফিম হাসে। বলে,
“- এতদিন পরে ফিরলাম, তবুও এত বিরক্তি আমার প্রতি”?
তিনি হুংকার ছেড়ে বলেন,
“-, রোজ রোজ তোমার মাস্তানি দেখে যাচ্ছি। বেয়াদব একটা ছেলে জন্ম দিয়েছি। না আছে আদব, না আছে সভ্যতা, আর না আছে জ্ঞান। তুমি এখনই বের হবে, নইলে আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না”।
আফিম হাই তুলে বলে,
“- আমি চলে গেলে মৃত্তিকাকেও নিয়ে যাবো”।
আশরাফ মির্জা খেঁকিয়ে বলে,
“- আমার মেয়েকে নিয়ে কোথায় যাবে তুমি? তোমার মতো গুণ্ডার কাছে আমি আমার মেয়েকে রাখবো ভেবেছো?”
আফিম বলে,
“- আপনার মেয়ে হলে আমার ও বউ। আমি এখন ওকে মেরে ফেললেও আপনি কিছু বলতে পারবেন”।
তড়তড় করে রাগ বাড়ে আশরাফ মির্জার। বলে,
“- দাঁড়াও, দারোয়ান ডেকে তোমাকে আমি বাড়ি থেকে বের করবো। তুমি পুলিশের মেয়ে তুলে আনো, জোচ্চুরি করে একটা ভালো মেয়েকে বিয়ে করে আনো। কিছু বলি না বলে মাথায় উঠেছো।”
এবার আফিমকে কিছুটা শান্ত হতে দেখা যায়। বাবার কথাগুলো গায়ে লেগেছে বোধহয়। শান্ত কণ্ঠে বলে,
“- কাল চলে যাবো, আজকের রাতটা যাক”।
“- তোমাকে এক মিনিটের জন্য এখানে দেখতে চাই না। তুমি অপকর্ম করে বেড়াবে, আমি বসে বসে দেখবো? আমার মান-সম্মান মাটিতে পিষে ফেলেছো তুমি”।
আশরাফ মির্জাকে এই প্রথম মৃত্তিকা এত রেগে যেতে দেখল। তিনি রাগে রীতিমতো ঠকঠক করে কাঁপছেন। মনে হচ্ছে এই বুঝি টেনে হিঁচড়ে আফিমকে বেধড়ক পেটাবেন। মৃত্তিকার ভয় হয় কিছুটা। আফিম তীব্র চিৎকার সহ্য করতে না পেরে বেরিয়ে যায় বাড়ি ছেড়ে যাবার পথে বিড়বিড় করে বলে,
“- যাচ্ছি, আর ফিরবো না”।
চেঁচামিচি শুনে পাশের ঘর থেকে তন্বী নামের মেয়েটি বেরিয়ে আসে। আশরাফ মির্জার সামনে এসে নত কণ্ঠে বলে,
“- আঙ্কেল, আফিম ভাইকে তাড়াবেন না। আমিই বলেছিলাম বিয়েতে আমার মত নেই। তাই ভাইয়া আমাকে নিয়ে এসেছে”।
তন্বীর কথা গায়ে মাখলেন না আশরাফ মির্জা। আফিমকে তাড়িয়ে তিনি রেগেমেগে ঘরে চলে গেলেন। তন্বীকে তার ঘরে পাঠিয়ে মৃত্তিকা ঘরে চলে আসে। সোজা ছুটে যায় বেলকনিতে। মৃত্তিকার দৃঢ় বিশ্বাস আফিম যায়নি। এত রাতে যাবে কোথায়? বাড়ির আশপাশেই নিশ্চয়ই ঘুরঘুর করবে।
মৃত্তিকার ভাবনাটি সত্য হলো। আফিম দাঁড়িয়ে আছে খোলা প্রান্তরে। ছোট ছোট সবুজ ঘাসের উপর স্থির তার কায়া। দৃষ্টি এদিকেই। বৃষ্টি পড়বে বোধহয়। মেঘ ডেকে যাচ্ছে। বৃষ্টি এলে আফিম ওখানে থাকতে পারবে? মৃত্তিকা চঞ্চল পাখির ন্যায় উঁকি বুকি দেয় পর্দার আড়ালে থেকে। সুঠাম দেহের বখাটে ছেলেটাকে দেখে যায়। আলো ছড়ানো ঘরের পর্দার পেছনে ছোট্ট প্রতিবিম্বটাকে দেখে ফেলে আফিম। মেয়েটাকে দেখে আফিমের ঠোঁটের কোণ উঁচু হয়। হাতের ফোনে টাইপ করে টেক্সট পাঠায় মৃত্তিকাকে,
“- বেরিয়ে আসো। অনেকদিন দেখিনি মৃত্ত, দেখা দাও। ওটুকু সময় তোমাকে দেখে মন ভরেনি।”
টুং করে ওঠে মৃত্তিকার ফোন হাতের মুঠোয় ফোনটা নিতেই আফিমের আবেগি বার্তা দেখে সরে আসে পর্দার পেছন থেকে। তাকে সরে যেতে দেখে আফিম কল দেয় মৃত্তিকার সিমে। দোনামনা করে মৃত্তিকা কল ওঠালেই ওপাশের অধৈর্য পুরুষ তেজ দেখিয়ে বলে,
“- সরে গেলি কেন? সামনে আয়।”
মৃত্তিকা আমতা আমতা করে বলে,
“- বাড়ি আসুন, বৃষ্টি পড়বে”।
তাচ্ছিল্য করে হাসে আফিম। বলে,
“- আমি তো ভিজছি”।
“- সে কি! বৃষ্টি পড়ছে”?
“- তোর প্রেমের বৃষ্টিতে ভিজছি”।
“- নাটক করবেন না। এ সময়েও এমন কথা আসে?”
“- সবসময়ই আসে, আমার মৃত্ত ভীষণ নাজুক। তাকে সব কথা বলা যায় না।”
মৃত্তিকা কথা বদলে ফেলে। বলে,
“- বাবা আপনাকে খুব ভালোবাসে”।
“- নমুনা তো দেখতেই পাচ্ছি”।
“- আপনি ভালো হতে পারেন না”?
“-, ভালো হওয়ার বয়স শেষ”।
“- মাস্তানি করেন কেন? এসব কি ভালো কাজ”?
“- না”।
“- তাহলে”?
“- মৃত্ত।
“- হু”?
“- আমি তোকে মিস করেছি”।
“- ওহ্”।
“- তুই করিসনি”?
“- না”।
“- তাহলে তন্বীকে দেখে অমন করলি কেন”?
“- কোনো স্ত্রীই তার স্বামীর সাথে অন্য নারীকে দেখতে পারে না।”
“- মেনে নিচ্ছিস আমি তোর স্বামী”?
থতমত খায় মেয়েটা। আফিম সরু চোখে বেলকনির দিকে তাকিয়ে আছে। বাজ পড়ছে। মৃত্তিকা কানে ফোন চেপে বেলকনিতে এসে দাঁড়ায়। আফিম স্পষ্ট চোখে দেখে মৃত্তিকাকে। মৃত্তিকা নরম সুরে বলে,
“- আপনার জন্য রান্না করেছিলাম। আপনি ফিরলেন না”।
আফিম গাঢ় হাসে। মুখটা উজ্জ্বল হয়ে আসে ছেলেটার। নিখুঁত চোখে মৃত্তিকার সৌন্দর্য দেখে। মৃদু আলোয় মায়াবিনীকে একান্তই নিজের বলে মনে হয়। আফিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“- আমি ফিরতাম না মৃত্ত, ধরা দিয়ে দিতাম। অত দৌড়ঝাঁপ আমার পোষাচ্ছিল না। কেন দেইনি জানিস? তোর জন্য। আমার মনে হলো ঘরে আমার নতুন বউ আছে, আমি বাড়িতে না থাকলে সে ভয় পায়।”
মৃত্তিকার বুক চিড়ে আর্তনাদ বেরিয়ে আসে। শান্ত স্বরে বলে,
“- আপনি আরো আগে ফিরতে পারতেন, আমার মনে হচ্ছিল আমি বহুদিন আপনাকে দেখিনি”।
চলবে?
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি_শেখ
[নোটঃ রি-চেইক দিতে পারিনি]
Share On:
TAGS: ওরা মনের গোপন চেনে না, বৃষ্টি শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১১
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৯
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩
-
ওরা মনের গোপন চেনে না গল্পের লিংক
-
ওরা মনের গোপন চেনেনা পর্ব ৬
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৫
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৩
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১২
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৪
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৭+৮