Golpo romantic golpo সুখময় যন্ত্রণা তুমি সিজন ২/এক শ্রাবণ মেঘের দিনে

এক শ্রাবণ মেঘের দিনে ৩৮+৩৯


একশ্রাবণমেঘের_দিনে

neela_rahman

পর্ব ৩৮

খাওয়ার পর্ব শেষ করে শহিদুল খান রুমে এসে বসে শান্তিতে একটি বই পড়ছিলেন ।তবে বইয়ের দিকে খুব একটা মনোনিবেশ করতে পারছিলেন না ।থেকে থেকে বারবার ছেলের আচরণ কেমন সন্দেহ মনে হচ্ছে ।এমন সময় আসমা বেগম রুমে ঢুকে বিছানা গোছাতে গোছাতে বললেন ,”শুনছেন?”

শহিদুল খান বই বন্ধ করে চোখ তুলে তাকালেন স্ত্রীর দিকে ।তারপরে দীর্ঘ একটি শ্বাস ফেলে বললেন ,”হ্যাঁ আমিও ভাবছিলাম ।আসলে আমিও বুঝতে পারছি না ছেলের মতি গতি ।তবে বোঝার চেষ্টা করছি।

আসলে কি ছেলে বড় হয়েছে !এখন তো আর ছোট নেই মুখের উপরে সব কিছু বলে দেয় না ।আর তাছাড়া ছয় বছর দূরে থাকার কারণে হয়তোবা ওর মনের কথা আমরা ঠিকমতো পড়তে পারছি না ।আমার মনে হয় ওকে কয়েকটা দিন সময় দেওয়া উচিত ।ও নিজের সাথে একটু বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নেক ।ছয় বছর আগে বাচ্চা ছিল জিদের মাথায় অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছে এখন বুঝে শুনে চোখের সামনে দেখে কি সিদ্ধান্ত নেয় সেটাই দেখি।”

আসমা বেগম বললেন ,”ঠিক আছে দেখছি ছেলেকে সিদ্ধান্ত নেয় !তবে আমি কিন্তু মেঘলাকে মনে মনে ছেলের বউ হিসেবে অনেক আগে থেকেই ধরে নিয়েছি।

তবে আমার কি মনে হয় জানেন !?মায়ের মন তো ছেলের চোখ দেখলে বুঝতে পারি ।ও মেঘলার দিকে অন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ।হয়তো ছেলেটা ধোঁয়াশার মধ্যে আছে ।বুঝতে পারছে না কি করবে।

তাই ওদের একটু সময় দেওয়াই ভালো ।দেখি কি হয় ! আমার মনে হয় ভালো কিছুই হবে।”

“তোমাকে আমি ভালো করে চিনি আসমা ।ওরা সময় না নিলেও তুমি ঠিক খুঁজে খুঁজে ওদেরকে সময় দিয়ে দিবে ।তুমি কি ভাবো আমি তোমাকে কিছু লক্ষ্য করিনি ?সেই ছোট্টবেলা থেকে চিনি তোমাকে। দুষ্টু বুদ্ধি তোমার মাথায়ও কম নেই ।ছেলেমেয়েগুলো তোমার মতই হয়েছে।”বললো শহীদুল খান।

রাত বাজে বারোটা ।শ্রাবণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে ।রুমের মধ্যে সিগারেট খুব কম খায় শ্রাবণ ।কেমন সবকিছু গুমোট লাগে তাই খোলামেলা পরিবেশে খাচ্ছে ।আর তাছাড়া রুমের সি*গারেট গন্ধ থাকলে মা সকালে পরিষ্কার করতে এলে সব কিছু বুঝতে পারবে ।এটা তো আর আমেরিকা নয় তাই নিজের রুমে খায় না।

কিছুক্ষণ ধূমপান করে ধীরে ধীরে ছাদ থেকে নিচে নেমে এলো শ্রাবণ ।নিজের রুমে যাবে ঠিক তার আগেই চোখ পড়লো মেঘলা রুমে। মেঘলা রুমে দরজা লাগানো না ।হালকা একটু চাপানো ।কি মনে করে যেন শ্রাবণের পা জোড়া থমকে গেল ।দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষন রুমের বাইরে ।আনমনে হাত উঠে গেল দরজায় ।দরজায় হালকা ধাক্কা দিয়ে শ্রাবণ ভিতরে প্রবেশ করল।

রুমে ড্রিম লাইট জালানো ।ডিসেম্বরের এই শীতেও মেয়েটা জুহু থুবু হয়ে শুয়ে নেই। গায়ে কম্বল একটু সরে গিয়েছে ।শোয়াটা খুবই বাচ্চামে স্বভাবের শোয়া ।এত বড় একটা মেয়ে এইভাবে শোয় নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারত না শ্রাবণ।

মাথার নিচ থেকে বালিশ সরে গিয়েছে অথবা বালিশ থেকে মাথা সরে গিয়েছে ।চুলগুলো সব ফ্লোরে বিছিয়ে আছে যেন মনে হচ্ছে ঘন কালো অন্ধকার এর মতন কোন সাপ ফণা তুলে আছে।

শ্রাবণ কি মনে করে যেন হাটু ভেঙে ধীরে ধীরে মেঘলার কাছে বসলো ।বসে কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মেঘলার দিকে ।দেখছে মেঘলার কাজল কালো ভ্রু জোড়া সরু নাক।

পাতলা ফুলের পাপড়ির মতো দুটো ঠোঁট যেন শীতে একটু তির তির করে কাঁপছে।

চুল গুলো যেন ঘন কালো মেঘ ।যেন আকাশে বুকে বিছিয়ে আছে মেঘ কালো চুল।

শ্রাবণ অবচেতন মনেই চুলগুলো হাতে নিল। নিয়ে কি মনে করে যেন নিজের নাকের সামনে ধরল।

চুলগুলোতে তেল দিয়েছিল হয়তো শ্যাম্পু করেছে তবুও চুলগুলোতে তেলের সুন্দর একটি হালকা সুগন্ধি ভেসে আসছে ।শ্রাবণ নাক টেনে সুগন্ধি নিলো চুল থেকে।

এমন অদ্ভুত মহনীয় চুলের সুগন্ধি শুধুমাত্র ছোটবেলা শ্রাবণ যখন মাকে জড়িয়ে ধরে লেপ্টে থাকত তখন পেত ।আর আজ বড় হয়ে মেঘলা চুলে এরকম সুন্দর সুগন্ধি পাচ্ছে ।শ্রাবণ আবার নাক টেনে সুন্দর করে চুলের সুগন্ধি নিজের ভিতরে নিয়ে নিল।

মনে মনে ভাবল মেঘ কালো চুল গুলো যেন একদম মেঘের মতো ।নামের সাথে যায় ।ঠিক আছে মেঘলার মেঘ কালো চুল ।

“আজকে থেকে তোকে আমি মেঘ বলে ডাকবো ।”মনে মনে বলল শ্রাবণ ।

তারপর একটি গান ধীরে ধীরে গুনগুন করল শ্রাবণ ।

“শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে
অঝোরে নামবে বুঝি শ্রাবণে ঝড়ায়ে
আজ কেন মন উদাসী হয়ে
দূর অজানায় চায় হারাতে”

শ্রাবণ মেঘ
শ্রাবণ মেঘ
শ্রাবনের মেঘ
কথাটি গুনগুন করে বলেই মনে মনে হাসলে শ্রাবণ ।তারপর চুপচাপ উঠে দাঁড়ালো ।চুলগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে দিল বালিশের পাশে।
কম্বল টেনে দিলো বুক বরাবর।

তারপর উঠে ধীরে ধীরে আরেকবার শেষবার মেঘলাকে আর চোখে দেখে আবার গুনগুন করে গানটি গাইতে গাইতে রুম থেকে বের হয়ে গেল শ্রাবণ।

এদিকে সাবিহা সুলতানার ঘুম আসছে না ।থেকে থেকে মেয়ের ভবিষ্যতের কথা শুধু বারবার ভেবেই চলেছে ।শ্রাবণ যেভাবে সবকিছুতে মেঘলার বিষয়ে অধিকার বোধ দেখায় মেঘলা বাড়ন্ত বয়স কৈশোর পার করে সদ্য যৌবনে পা দিচ্ছে ।একবার যদি শ্রাবণের প্রেমে পড়ে যায় ভালো লেগে যায় আর শ্রাবণ যদি ওকে তখন স্বীকার না করে তখন কি হবে মেঘলার?

মেঘলা তো জানে না শ্রাবণ ওর বিয়ে করা স্বামী ।কিন্তু শ্রাবণ তো জানে ।মেঘলা কে যখন মানবেই না তাহলে কেন এত অধিকারবোধ দেখায় ?কেন এত কাছে যায় ?যদিও সাবিহা সুলতানা জানিয়ে দিয়েছেন মেঘলা থেকে দূরে থাকতে কিন্তু শ্রাবণ কেন কথা শুনছে না ?

কি চলছে শ্রাবণের মনে ?মনে মনে ভাবলো সাবিহা সুলতানা।

আমতা আমতা করে সাজ্জাদ খান কে ডেকে বললো,” শুনছেন ?কিছু কথা বলার ছিল।”

সাজ্জাদ খান ঘুমাননি ।সাজ্জাদ খানও আজ ভাবছে ।সারাদিনে শ্রাবণের করা আচরণ গুলো উনাকেও ভাবাচ্ছে তাই বললেন,” হ্যাঁ বল ঘুমাওনি কেন?”

সাবিহা সুলতানা বললেন ,”ঘুম আসছে না ।অনেক ঘুমানোর চেষ্টা করছি ।বারবার শুধু একটি কথাই মাথায় আসছে ।”

সাজ্জাদ খান মুচকি হেসে বললেন ,”শ্রাবণের কথা তো ?মেঘলার ব্যাপার তাই না?”

সাবিহা সুলতানা মুচকি হাসলো। হেসে বললো,” আপনি সব কথাই বুঝে যান আমার। কোন কিছুই তো আর লুকানো নেই ।ভাবছি মেঘলা বাড়নত বয়স শ্রাবণের করা আচরণগুলোর জন্য যদি মেঘলা ওর প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে তবে কি হবে ?শ্রাবণ যদি ওকে মেনে না নেয় ভবিষ্যতে স্ত্রী হিসেবে ?কষ্ট তো আমার মেঘলাই পাবে।

৬ বছর আগে অস্বীকার করেছে শ্রাবণ ।৬ বছর পর বিদেশ থেকে এসেও অস্বীকার করেছে ।তবে এই কয়েকদিনে ওর আচরণ আমাকে অনেক ভাবাচ্ছে ।আমি জানিনা আপনি খেয়াল করছেন কি না।”

সাজ্জাদ খান বললেন ,”খেয়াল করছি সাবিহা খুব খেয়াল করছি ।ছেলেটাও তো নিজের ।খুব রুড হয়ে যে কিছু বলতে পারিনা ।ও তো আমার ছেলের মত ।আব্বু বলে ডাকে ।আমরাও তো অন্যায় করেছিলাম জোরজবরদস্তি ছেলেটাকে বিয়ে করিয়ে দিয়ে ।ও তো কখনো বিয়ের জন্য রাজি ছিল না।

তবে এখন সবকিছুই অদ্ভুত লাগে ।বড়ই অদ্ভুত লাগে ওর আচরণ গুলো ।দেখি ২-১ দিন যাক ।এরকমই চলতে থাকলে আমি ওর সাথে কথা বলব তবে এই মুহূর্তে কথা বলতে চাচ্ছি না ।সবকিছুর একটা সময় আছে।”

শ্রাবণ মুচকি হাসতে হাসতে আর গান গাইতে গাইতে নিজের রুমে ঢুকলো ।এখনো গুনগুন করে গেয়ে চলেছে ,”শ্রাবনের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে “
খুব ভালো লাগছে আজ শ্রাবণের এই গানটি গাইতে ।মনে মনে কয়েক বার আওড়ালো “শ্রাবণের মেঘ”

চলবে_

একশ্রাবণমেঘের_দিনে

neela_rahman

পর্ব ৩৯

কোচিং এর সময় চারটা থেকে ছয়টা ।তাই সাড়ে তিনটার দিকেই বাসা থেকে বের হবে শ্রাবণ ও মেঘলা ।দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে শ্রাবণ একটু শুয়ে ছিল ।এক থেকে দেড় ঘন্টা পর ঘুম থেকে উঠে দেখল ৩.১৫ বাজে।

চোখ খুলতে চাচ্ছে না শ্রাবণের কিন্তু দায়িত্ব নিয়েছে তাই যেতেই হবে ।হুড়মুড়িয়ে উঠল শ্রাবণ উঠেই সাথে সাথে শার্ট প্যান্ট পড়ে রেডি হয়ে নিল।

সাড়ে তিনটা বেজে গিয়েছে ।সাথে সাথে শ্রাবণ মেঘলা রুমের দরজা কাছে এসে দরজা নক করবে দেখতে পেলো দরজা খোলা
শ্রাবণ দরজা নক করার প্রয়োজন মনে করল না ।ঢুকে পড়ল রুমের ভিতর।

দেখলো মেঘলা ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ।সালোয়ার কামিজ পড়া ওড়নাটা চেয়ারের উপরে ঝুলানো ।চুলগুলো বেনি করার চেষ্টা করছে বড় চুল তাই দেরি হচ্ছে।

মেঘলা হঠাৎ শ্রাবণ ভাইকে এভাবে ঢুকতে দেখে হকচকিয়ে গেল ।চুল থেকে হাত সরে যাওয়ায় বেনী আরো কয়েকটা গিট খুটে খুলে গেল ।মেঘলা সাথে সাথে বিরক্ত হয়ে বললো,” ধ্যাত আবার নতুন করে করতে হবে বেনি।”

শ্রাবণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেঘলার দিকে ।তাকালো গালের দিকে।চোখ পড়ল চেয়ারে ভাজ করে রাখা ওড়নাতে।তারপর কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মুচকি হেসে বললো,” বেনি করতে হবে কেন? দুই পাশে দুইটা ঝুটি করে নিলেই তো হয় ।”

মেঘলা বললো ,”চুল অনেক বড় ।এত বড় চুল ঝুঁটি করলে ভালো লাগবে?”

শ্রাবণের ভ্রু দুটো সাথে সাথে কুঁচকে গেল ।অবাক হয়ে জানতে চাইলো ,”ভালো লাগবে মানে ?ভালোলাগা দিয়ে তোর কি কাজ ?আর ভালো লাগতে হবে কেন ?তুই ওখানে লেখাপড়া করতে যাচ্ছিস একভাবে গেলেই তো হলো।

আচ্ছা এক কাজ কর ।চুলগুলো খোপা করে নে ।খোপা করে পিছনে একটা ব্যান্ড দিয়ে টাইট করে বেধে নে।যেন খুলে না যায়। যেমন বড় আম্মু আর ছোট আম্মু করে কাজ করার সময় ।টাইট করে খোঁপা বেঁধে নেয় ,তুই এরকম খোঁপা বাঁধ।”

মেঘলা সাথে সাথে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,” খোপা তাই বলে ?খোপা করে যাব লেখাপড়া করতে ওইখানে এত মানুষের সামনে?”

শ্রাবণ উঠে দাঁড়ালো ।দাঁড়িয়ে মেঘলার পিছনে এসে আয়না দিয়ে মেঘলা কে দেখে বললো,” এখানে লেখাপড়া করতে যাচ্ছিস নাকি নিজের রূপ দেখাতে ?চুপচাপ খোপা কর খোপা করে এইযে ওড়না টা নে ।মাথা সুন্দর ঘোমটা দিয়ে নিচে নেমে আয় ।দুই মিনিট এর বেশি হলে সমস্যা হবে দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

কি আর করা ! না চাইতেও মেঘলা চুলগুলো মাঝখানে সিঁথি করে সুন্দর করে খোপা করে একটি হেয়ার ব্যান্ড দিয়ে টাইট করে তারপর ওড়নাটি নিয়ে ঘোমটা দিয়ে নিল।

শ্রাবণ মেঘলা দিকে তাকিয়ে বললো,” তাড়াতাড়ি আয় ফাস্ট ।”

বলেই রুম থেকে বের হয়ে গেল ।মেঘলা ও কাঁধে ব্যাগ নিয়ে চুপচাপ শ্রাবণের পিছনে পিছনে যেতে লাগলো।

পুরো রাস্তা মেঘলা চুপচাপ বসেই রইলো।কোন কথা বলল না ।এভাবে খোঁপা করে আসা মেঘলার পছন্দ না ।মেঘলা তো প্ল্যান করেছিল দুইদিকে দুইটা বেনী করে সুন্দর করে আসবে কিন্তু শ্রাবণ ভাই পুরা প্লানটাই চেঞ্জ করে দিল।

মেঘলা বুঝতে পারছে আজকে প্রথম দিনই এরকম এরপর না জানি আর কি কি অপেক্ষা করছে মেঘলার জন্য ।

মেঘলা আর চোখে একবার তাকালো শ্রাবণের দিকে।

শ্রাবণের নজর সামনে । মনোযোগ দিয়ে ড্রাইভ করছে।সানগ্লাস পড়ে গাড়ি চালাচ্ছে ।রোদ এখনো পুরোপুরি কমেনি শীতের দিন হলে ও কিছুটা রোদ এখনো আছে।

রোদ পড়েছে সরাসরি শ্রাবণের চেহারায় ।শ্রাবণ এমনিতে অনেক সুন্দর তার উপরে বিকালের রোদ পড়ায় কেমন সোনালী একটি উজ্জ্বল রং মনে হচ্ছে শ্রাবণ ভাইয়ের ।সরু নাক ঠোঁটগুলো পাতলা সুন্দর তামাটে বর্নের ।খোঁচা খোঁচা দাড়ি । সিল্কি চুল।মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে মেঘলা। এমনিতেও শ্রাবণ ভাইয়ের সবকিছুই সুন্দর কিন্তু আজকে একটু অদ্ভুত সুন্দর লাগছে মেঘলার কাছে ।তাই এমন ভাবে তাকিয়ে আছে যেনো চোখ সরলেই কোথাও দূরে সরে যাবে শ্রাবণ।

হঠাৎ এমন সময় শ্রাবণ বলে উঠলো ,”এভাবে চেয়ে আছিস কেন ?খেয়ে ফেলবি নাকি ?”

মেঘলা হকচকিয়ে গেল। কি করে দেখল লোকটা ?উনি তো সামনে তাকিয়ে ছিল গাড়ি চালানোতে মনোযোগী ছিলো। একবারের জন্য তো এদিকে তাকাইনি।

সাথে মেঘলা বলে উঠলো ,”কই আমি আপনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম ?একবারো তাকাইনি ।”

শ্রাবণ বললো,”মিথ্যা বলবিনা খবরদার ।না হলে থা*পরে গাড়ি থেকে ফেলে দিব। শুধু কি চেয়েছিলি? গিলে খাচ্ছিলি।”

দিতেও পারে ।থা*পরে গাড়ি থেকে ফেলে দিতেও পারে ।তাই মেঘলা তর্ক না করে চুপচাপ অন্য দিকে তাকিয়ে রইল ।

শ্রাবণ একটু মুচকি মুচকি হাসলো ।চশমার আড়ালে শ্রাবণের চোখ কতবার মেঘলার দিকে গিয়েছে মেঘলা নিজেও জানে না। সেই মনমুগ্ধকর চাহনি শ্রাবণের প্রতি শ্রাবণ প্রত্যেকটি জিনিসই লক্ষ্য করেছে কিন্তু ধরা দেয়নি শ্রাবণ ।ধরা দিবেও না।

২ ঘন্টা এভাবে কোচিং করানো শেষে মেঘলা কে নিয়ে বাসায় ফিরলো শ্রাবণ । বাড়িতে ঢুকতেই দেখল লামিয়া সিয়াম সাবিহা সুলতানা ও আসমা বেগম ড্রইং রুমে বসে ছিলেন ।সন্ধ্যা যেহেতু চা নাস্তা খাচ্ছিলেন ।আসমা বেগম সাথে সাথে ওদের দেখে বললেন,”কিরে মেঘলা মা কোচিং কেমন হয়েছে? “

মেঘলা ব্যাগটা সোফার উপরে রেখেই সাথে সাথে আসমা বেগমের সাথে বসে বললো,” খুব ভালো হয়েছে বড় আম্মু ।অনেক ভালো লেখাপড়া করায়।”

শ্রাবণ বললো,” আমি একটু ক্লান্ত উপরে যাচ্ছি ।”

বলেই উপরে চলে গেল ।আর নিচে দাঁড়ালো না ।মেঘলা তাকিয়ে রইল শ্রাবণে যাওয়ার দিকে ।লোকটা হাটেও কত সুন্দর করে ।অদ্ভুতভাবে হাটে।ঠিক ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না ।আসমা বেগম এবং সাবিহা সুলতানা দুজনেই খেলয়াল করে মেঘলার তাকিয়ে থাকা শ্রাবণের দিকে।

সাবিহা সুলতানা এটার ভয় পাচ্ছিলেন। মেয়ে যদি কোন ভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে শ্রাবণের প্রতি ?তখন কি হবে?

সাবিহা সুলতানা বললেন ,”যা উপরে যা।কাপড়চোপড় ছেড়ে নিচে আয় তোর জন্য আমি নাস্তা দিচ্ছি।”

মেঘলা বললো ,ঠিক আছে আম্মু ।”

বলে যেই না চলে যাবে লামিয়া বললো,” দাড়া আমিও যাচ্ছি ।”মেঘলা ও লামিয়া চলে যাবে তার আগেই সিয়াম মেঘলাকে বললো,” কোন কোন সাবজেক্ট পড়ায় ওইখানে?”

মেঘলা বললো,” ভাইয়া সব সাবজেক্ট পড়ায় তবে রুটিন করে দিয়েছে স্কুলের মত ।একেক দিন একেকটা সাবজেক্ট ধরবে ।”

সিয়াম বললো,” আচ্ছা ঠিক আছে ।ভালোভাবে লেখাপড়া করিস ।”

বলেই সাবিহা সুলতানা দিকে তাকিয়ে বললো,” আম্মু আমি একটু বাইরে যাব ।আমার কিছু খাতা কিনতে হবে।”

সাবিহা সুলতানা বললেন,” আচ্ছা ঠিক আছে যা ।তাড়াতাড়ি চলে আসিস।”

কথাগুলো বলেই সাবিহা সুলতানা রান্নাঘরে গেলেন ।সিয়াম একবার তাকালো লামিয়ার দিকে ।কিন্তু লামিয়া সিয়ামের দিকে একবারও তাকায়নি।

এটাই তো চেয়েছিল সিয়াম লামিয়া যেন বাড়াবাড়ি না করে কিন্তু এই দুই তিন দিন ধরে লামিয়া যখন ওর দিকে তাকাচ্ছে না কেমন যেন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে সিয়ামের কাছে ।কেমন যেন মনে হচ্ছে কিছু একটা নেই মিস করছে ভীষণ।

লামিয়া ও মেঘলা উপরে চলে গেল সিয়াম চলে গেল বাইরে।

লামিয়া নিজের ঘরে যে পড়তে বসেছে ।এতক্ষণ নিচে বসে ছিল ।মেঘলা কাপড়চোপড় ছেড়ে নিচে আসবে শ্রাবণের রুম দিয়ে আসার সময় একটু হালকা করে থামলো। থেমে উঁকি ঝুঁকি মারছে ঠিক এমন সময় শ্রাবণ ভিতর থেকে বলে উঠলো ,”মেঘ ?”

মেঘলা হকচকিয়ে গেল।”মেঘ” ! মেঘ মানে ?শ্রাবণ ভাই কি মেঘলাকে ডাকছে?মেঘ নামটা কানে অদ্ভুত সুন্দর লাগলো মেঘলার।

মেঘলা সাথে সাথে বললো,” জি আমাকে কিছু বলছেন ?”

শ্রাবণ বললো,” এখানে আর কেউ কি আছে?”

মেঘলা আশে পাশে তাকিয়ে দেখলো আসলে কেউ নেই ।তাই বুকে একটু ফু দিয়ে ভাবলো,” আল্লাহ জানে এবার কি করেছে মেঘলা?কিসের ক্লাস করাবে ।”

তাই চুপচাপ দরজা ঠেলে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে উঁকি মেরে বললো,” কিছু বলবেন?”

শ্রাবণ বললো,” আমার জন্য উপরে কফি নিয়ে আয়।”

মেঘলা মনে মনে ভাবল বেঁচে গেছে ।শুধু কফির উপর দিয়েই গেলো।তাই বললো,” ঠিক আছে ।কিন্তু ভাইয়া আমার নাম তো মেঘ না । মেঘলা।”

শ্রাবণ বললো,”জানি কিন্তু নামটা অনেক বড় তাই ছোট করে নিলাম ।এভাবে ডাকতে সুবিধা হয় ।আর শোন?

কি কি কাজ করতে পারিস রে তুই ?”

মেঘলা বললো,” সব কাজ করতে পারি।”

শ্রাবণ বললো,” ঘর গোছাতে পারিস ?”

মেঘলা বললো,”হ্যাঁ ভাইয়া ।আমার ঘর তো আমি গোছাই।”

শ্রাবণ বললো,” গুড তাহলে প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে আমার ঘুম থেকে ওঠার পর আমার রুম এসে রুম তুই গুছাবি।”

মেঘলা সাথে সাথে অবাক হয়ে গেল। বললো,” আমি গোছাবো কেন ?আপনার রুমটা সব সময় বড় আম্মু গুছায়।”

শ্রাবণ বললো,” শুরু হয়ে গেছে মুখে মুখে তর্ক বড়দের সাথে তাই না ?আমি বলেছি নিশ্চয়ই কিছু একটা ভেবেই বলেছি ।আমি সিগারেট খাই ।আম্মু রুমে আসলে আমার সমস্যা হয় ।তাই এখন থেকে রুমে এসে তুই আগে রুম গুছিয়ে পরিষ্কার করে যাবি যেন আম্মুর রুমে ঢুকলে কোথাও সিগারেটের গন্ধ বা সি*গারেটের কোন কিছু না পায়।”

মেঘলা অবাক হয়ে গেল ।এটা কি ধরনের আবদার ? বললো,” আপনি রুমে সি*গারেট না খেলেই হয় !তাহলে তো আর সমস্যা নেই।”

শ্রাবণ বললো,” আবার মুখে মুখে তর্ক তাই না ?একটি কথা বলেছি চুপচাপ বলবি হ্যাঁ করে দিব ।কোন এক্সকিউজ চাবি না ।আর আমি কতবার যাবো বাহিরে সিগারেট খাওয়ার জন্য ?আমার তো একটু পরপর সিগারেট খেতে হয় ।তাই আগামীকাল সকাল থেকে আমি ঘুম থেকে ওঠার পর সবার আগে তুই আমার রুম পরিষ্কার করবি ।রুম একদম টিপটপ করে যাবি যেন কোথাও দেখে বোঝা না যায় যে এই রুমে সি*গারেট খাওয়া হয়েছে ।তারপর যে কেউ আসুক সমস্যা নেই।”

মেঘলা মনে মনে ভাবতে লাগলো ,”এটা কোন কথা ! সিগারেট খাবে উনি ঘটনা ঘটাবে উনি অকাম কু*কাম করবে উনি আর এগুলো ঢেকে রাখা দায়িত্ব মেঘলার?”

মেঘলা হতাশায় একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,”ঠিক আছে আমি কফি আনছি ।যেন মেঘলা যতোটুকু এনার্জি ছিল সবটুকু এনার্জি এই মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল ।আগামীকাল সকালের কথা চিন্তা করেই।”

মেঘলা চলে যেতেই শ্রাবণ মুচকি মুচকি হাসলো।

১০ মিনিট পর মেঘলা কফি নিয়ে উপরে আসলো ।এসে ভিতরে ঢুকে দেখল শ্রাবণ আলমারি থেকে কয়েকটি কাপড় বের করে বিছানায় এলোমেলো করে ফেলে রেখেছে।

মেঘলা বললো ,”কি হলো ভাইয়া ?কাপড়চোপড় গুলো এখানে ফেলেছেন কেন ?”

শ্রাবণ বললো,” একটি জিনিস খুঁজছিলাম তাই বিছানায় রেখেছি।

কফি নিয়ে এসেছিস আচ্ছা দে ।”

বলেই মেঘলার হাত থেকে কফি নিয়ে চেয়ারে বসে কফি পান করবে ঠিক এমন সময় মেঘলা ঠিক আছে ভাইয়া বলে বাহিরে চলে যাবে শ্রাবণ বলে উঠলো,”এক মিনিট তুই বাহিরে যাচ্ছিস কেন?”

মেঘলা অবাক হয়ে বললো,” বাহিরে যাব না? কফি তো দিলাম আপনাকে মাত্রই।”

শ্রাবণ বললো,” দেখলি বিছানাটা এলোমেলো কাপড়চোপড়ে এগুলো অন্তত আলমারিতে ভাঁজ করে রেখে যা।”

মেঘলা অবাক এর উপর অবাক হচ্ছে ।এটা কোন ধরনের শাস্তি !দিচ্ছে শ্রাবণ ভাই ! নাকি ওকে নিয়ে দুই ঘন্টা কোচিংয়ে বসে থাকবে যাতায়াতের সময় এক ঘন্টা এই তিন ঘন্টা উনি ধরে নিয়েছে মেঘলা কে দিয়ে নিজের রুমে কাজ করাবে।

তাই মেঘলা বললো,” শ্রাবণ ভাই আপনি কি ইচ্ছা করে এগুলো করছেন তাই না ?আপনি আমাকে নিয়ে কোচিংয়ে নিয়ে যাবেন নিয়ে আসবেন তাই সেই সময়টুকু আপনি আমাকে দিয়ে কাজ করাতে চাচ্ছেন।আমি বুঝতে পারছি।”

শ্রাবণ মেঘলার দিকে তাকিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বললো,” মাথামোটা মেয়ে ।খুব বুঝতে পেরেছিস ।”

তারপর বললো,” চাপ কে দাঁতগুলো সব ফেলে দিব ।আমি অত্যন্ত জরুরি একটি ডকুমেন্ট খুঁজছিলাম এই যে দেখছিস মোবাইল এটা দিয়ে ছবি তুলে আমার আমেরিকা পাঠাতে হবে ।আমি একটি রিসার্চ করছিলাম সেই বিষয়ে যার জন্য তাড়াহুড়া করে এগুলো এখানে ফেলেছি ।এখন ছোট বোন হিসেবে তোর দায়িত্ব কি ?বড় ভাইয়ের এলোমেলো রুমটা সুন্দর করে পরিষ্কার করে গুছিয়ে যাওয়া।

তবে বুদ্ধি খারাপ দেসনি।নেই তোকে তিন ঘন্টা খাটানোই যায় ।কি বলিস?”

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply