এক শ্রাবণ মেঘের দিনে পর্ব ২৫+২৬
একশ্রাবণমেঘের_দিনে
neela_rahman
পর্ব ২৫
রাত বাজে বারোটা ।শ্রাবণ ঘুমাতে পারছে না ।চোখ বন্ধ করলে বারবার ভেসে আসে ওর আঙ্গুল নিয়ে যখন মেঘলা র*ক্ত থামানোর চেষ্টা করছিল ওর আঙুল মুখে নিয়ে সে দৃশ্যটি ।এরকম ভাবতে ভাবতে বিছানায় উঠে বসলো শ্রাবণ ।
প্যাকেট থেকে একটি সিগারেট বের করে খাটে হেলান দিয়ে সিগারেট ধরালো। এরপর আবার মনে হল আজ সকাল থেকেই কেমন যেন করছে মেঘলা ?ওর সাথে ঠিকঠাক মতো কথা বলছে না ।কিন্তু হঠাৎ করে এমন দূরত্ব কেন বজায় রাখছে ?এমন তো কিছু বলেনি শ্রাবণ ?রাগ করেনি বকা দেয়নি তাহলে কেন ওর থেকে দূরে দূরে থাকছে?
মনে পড়লো সন্ধ্যার কথা…….
সন্ধ্যায় দোকান থেকে ফিরে যখন শ্রাবণ ছাদের রেলিং এর পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সি*গারেট খাচ্ছিল হঠাৎ করে দোলনার আওয়াজে ডান দিকে তাকাতেই দেখতে পেল মেঘলা দোলনায় বসে আছে।
শ্রাবণ সাথে সাথে সিগারেট নিভিয়ে দিয়ে মেঘলার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালো ।মেঘলা হক চকিয়ে গেল হঠাৎ শ্রাবণ এসেছে তাই।এত ধীরপায়ে এসেছে আর তাছাড়া মেঘলা হয়তো অন্য কোন চিন্তা ভাবনায় ছিল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে মেঘলা শ্রাবণের আসা টা বুঝতে পারে নি।
অবাক নয়নে তাকিয়ে রইল মেঘলা।অন্ধকার পুরোপুরি নয় তবে কুয়াশার কারণে আবছা আবছা বুঝা যাচ্ছে শ্রাবণ ভাইকে ।তবে এটা জানে শরীরের অবয়ব দেখে বুঝতে পারছি এটা শ্রাবণ ভাই আর তাছাড়া শ্রাবণ ভাইয়ের শরীরে আলাদা একটা সুগন্ধ আছে।
খুব কাছ থেকে মেঘলা শ্রাবণের গায়ের সুগন্ধ টের পাচ্ছে ।কেমন ধরনের যেন একটি পুরুষালি স্মেল সাথে বডি স্প্রের গন্ধ মিশে একটি অন্যরকম মোহনীয় সুগন্ধ সৃষ্টি হয়েছে ।মেঘলা নিজের অবচেতন মনেই নাক টেনে নিঃশ্বাস নিল।সাথে সি*গারেট এর ধোয়ার গন্ধ।
শ্রাবণ দাঁড়িয়ে রইল মেঘনার মুখোমুখি ।সামনাসামনি ।এতো ঠান্ডার মধ্যে ও শ্রাবণের উষ্ণ গরম নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে মেঘলার চোখে মুখে।সাথে হাল্কা সি*গারেট এর গন্ধ।মেঘলা কিছু বলছে না ।দোলনা থেমে গিয়েছে ।শ্রাবণ দুই হাত দিয়ে দোলনার চেইন দুটো ধরে বললো,” কি হয়েছে কথা বলছিস না কেন?”
মেঘলা আমতা আমতা করে বললো,” কি কথা বলব ?”
বলেই যেই দোলনা থেকে উঠতে যাবে শ্রাবণ সাথে সাথে দোলনায় মেঘলা পাশাপাশি বসে বললো,”এক পা ও নরবি না বিনা অনুমতিতে।বসে থাক।”
বলেই যেন মেঘলা নামতে না পারে তাই সাথে সাথে পা দিয়ে নিচে ধাক্কা দিয়ে দোলনাটি সজরে চালিয়ে দিল ।দোলনায় জোরে জোরে শব্দ হচ্ছে আর এত জোরে চলছে যে মেঘলা নিজে থেকে নামতেও পারবেনা ।মেঘলা চুপচাপ চেইন ধরে বসে রইল।
শ্রাবণ মেঘলা দিকে না তাকিয়ে বললো,” আমি আমার প্রশ্নের উত্তর পাইনি ।কি হয়েছে বলছিস না কেন ?”
মেঘলা এবার একটু গলার স্বর উচু করে বললো,” কি বলবো ?কিছু হয়নি তো ভাইয়া ।”
শ্রাবণ বললো ,”আবার মিথ্যা কথা বলছিস ?কালকে রাত পর্যন্ত ঠিক ছিলি সকালে এমন কি হলো ?সকাল থেকে দেখছি তুই আমার দিকে চোখ তুলে তাকাচ্ছিস না পর্যন্ত।
আমার কোন ব্যবহার কি খারাপ লেগেছে ?আমি কি কোন ভাবে তোকে কিছু বলেছি যদি হয়ে থাকে তাহলে আমাকে বল।”
দোলনা একটু থেমে এসেছিল ।মেঘলা তাকিয়ে ছিল শ্রাবণের চোখের দিকে ।মেঘলা বললো,” না কিছু হয়নি ।”
বলে যেই দোলনা থেকে নামতে যাবে অমনি শ্রাবণ সাথে সাথে মেঘলা হাত ধরে ফেলল। বললো,” আমি কি তোকে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছি ?কতটুকু সাহস তোর তুই আমাকে না বলে দোলনা থেকে নামছিস ?”
বলে আবার দোলনা সজরে চালিয়ে দিল।
মেঘলা বললো,” আস্তে করেন পড়ে যাবো তো ?”
শ্রাবণ বললো ,”আগে বল কি হয়েছে ?তা না হলে এভাবে চলতে থাকবে ।তোকে নিচে নামতে দিব না।”
মেঘলা বললো,” বললাম তো কিছু হয়নি ।হাত ছাড়ুন ।”
শ্রাবণ মেঘলার হাত ছালো না ।হাত ধরে কিছুক্ষণ বসে রইল ।তারপর ধীরে ধীরে দোলনা গতি স্লো হলো। কি মনে করে যেন শ্রাবণ মেঘলার হাত ছাড়লো ।তবে হাত ছাড়ার আগে বললো,”রাত হয়ে যাচ্ছে নিচে যা ।না হলে সবাই খোঁজাখুঁজি করবে ।তাই ছাড়লাম।সকাল ভোরবেলা যদি আমাকে আবার বলতে হয় যাওয়ার জন্য তাহলে ভীষণ খারাপ হবে মেঘলা।কারো কথাই ভাববো না।”
বলেই হাত ছেড়ে বললো,” যা এবার নিচে যা ।”
মেঘলা আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না ।দৌড়ে সাথে সাথে নিচে চলে গেল।
এসব ভাবতে ভাবতেই শ্রাবণ আর রাতভর ঘুমোতে পারেনি ।বারবার চোখের সামনে ভেসে আসছে মেঘলার না বলা কথাগুলো ।কি হয়েছে কেনো মেঘলা শ্রাবণকে এরকম উপেক্ষা কেন করছে ? শ্রাবণ মেঘলার উপেক্ষা নিতে পারছে না।ভাবতে ভাবতে পুরো একটি সি*গারেট শেষ করে শ্রাবণ বিছানায় উপর হয়ে শুলো।
চারটায় এলার্ম বাজতেই বাড়ির সবাই উঠে গিয়েছে।বড়রা কেউ না বাচ্চা পার্টি সবাই ।সিয়াম উঠে সবাইকে উঠাচ্ছে ।লামিয়া ঘুম থেকে উঠতে চাইনি ।লামিয়া উঠে মেঘলাকে উঠিয়েছে তবে মেঘলা যাবে না মানে যাবেই না।গো ধরে বিছানায় চুপটি মেরে বসে আছে ।
রাফি রেডি হয়ে শ্রাবণ ভাইকে ডাকতে গিয়েছে। দেখলো শ্রাবন আগে থেকে রেডি ।সবাই রেডি হয়ে বাইরে এসে দাঁড়াতেই শ্রাবণ দেখল মেঘলাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না ।এমনকি তানিয়া ও রেডি ।তানিয়া কোনভাবেই মেঘলার সাথে শ্রাবণকে একা ছাড়বে না তাই এই চারটা সাড়ে চারটার দিকেও রেডি হয়ে বাইরে দাঁড়িয়েছে।
যদিও শ্রাবণ অবাক হয়ে গিয়েছে এই সময় তো তানিয়ার আসার কথা না তারপরও এদিক ওদিক তাকিয়ে কোথাও মেঘলা কে না দেখে রাফিকে জিজ্ঞেস করল মেঘলা কোথায় ?
রাফি বললো ,”মেঘলা যেতে চাচ্ছেনা ভাইয়া।আমার খুব খারাপ লাগছে।”
লামিয়া বললো,” আমি অনেকবার বললাম ও শুধু একটাই কথা যাবে না ।ওর নাকি ভালো লাগছে না ।”
তানিয়া বললো,” থাক না ও যখন যেতে চাইছে না তখন ………
সাথে সাথে শ্রাবণ তানিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,” আমি বলেছি যাবে মানে যাবে ।এখানে না বলার কোন সুযোগ নেই ।”
বলে যেই মেঘলা রুমের দিকে যাবে ওমনি সিয়াম বললো,” থাক না ভাইয়া ,ও যখন যেতে চাইছে না …….শ্রাবণ বললো,” আমি কিন্তু তোর বড় ভাই হই সিয়াম।ভুলে যাসনি নিশ্চয়ই আমি কে?”
সিয়াম চুপ হয়ে গেল ।সিয়াম জানে বড় ভাইয়ের মুখের উপরে কথা বলা যাবে না ।এটি এই বাড়ির নিয়ম না ।বড় ভাই যদি অন্যায় করে তারপরও চুপচাপ থাকতে হবে কারো সামনে অপমান করে কথা বলা যাবে না।
শ্রাবণ হেঁটে হেঁটে মেঘলার রুমের কাছে এসে দরজা নক না করেই ঢুকে পড়ল ।মেঘলা মাত্র শোয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল ভেবেছে সবাই চলে গিয়েছে ঠিক এমন সময় শ্রাবণ এসে মেঘলার কাছে দাঁড়িয়ে কম্বল সরিয়ে ফেলল।মেঘলা হকচকিয়ে গেল।
মেঘলা বললো,” কি করছেন ভাইয়া ?”
শ্রাবণ বললো,” তোকে রেডি করছি ।আমি রেডি করব নাকি নিজে রেডি হতে পারবি?যেতে হবে না যাওয়ার কোন অপশন নেই ।এখন নিজে নিজে রেডি হবি নাকি আমার হাত দিয়ে রেডি করতে হবে?”
মেঘলা অবাক হয়ে গেল শ্রাবণের কথা শুনে ।শুকনো ঢোক গিললো বার বার।অবাক নয়নে তাকিয়ে রইল শুধু।
মেঘলা ভয়ে সাথে সাথে বলে উঠলো ঠিক আছে আমি রেডি হচ্ছি আপনি শান্ত হন প্লিজ বলেই মেঘলা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো শ্রাবণ মুচকি হাসলো জানে এই তেরা মেয়ের সাথে নরম কথায় কাজ হবে না তারা মেয়ে করতে হবে তাই চুপচাপ বিছানায় বসলো।
মেঘলা উঠে আলমারি থেকে কাপড়চোপড় নিয়ে ওয়াশরুমে গেল ।১০ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে একবারে ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে বললো,” ঠিক আছে চলুন ।”
বাহিরে সবাই কনকনে শীতে দাঁড়িয়ে আছে ।সবাই বারবার মুখ হাঁ করে নিশ্বাস বাইরে দিচ্ছে সাথে ধোয়া বের হচ্ছে ।ঠিক এমন সময় সবাই দেখল শ্রাবণ মেঘলাকে নিয়ে দরজা পর্যন্ত চলে এসেছে ।তানিয়া দৃশ্য টি দেখে রাগে ফোসফোস করতে লাগল। এই দশ মিনিট শ্রাবণ মেঘলার রুমে ছিল ।মেঘলা রুমে রেডি হয়েছে শ্রাবণের সামনেই।ভাবতেই সাথে সাথে মাথা নিচু করে ফেলল তানিয়া।
রাফি খুশি হয়ে গেল ।সাথে সাথে মেঘলা হাত ধরে বললো,” আমার যে কি ভীষণ খারাপ লাগছিল তুমি যাবে না এটা ভেবেই ?”
সিয়াম তাকিয়ে রইল মেঘলা দিকে ও শ্রাবণ ভাইয়ের দিকে ।শ্রাবণ ভাই কেন এত জেদ ধরছে ?কেন মেঘলার বলা কোন কিছুর জন্য না শ্রাবণ ভাই শুনতে পারে না?
সবাই হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে হাড় হুম করা শীতে ।কুয়াশার জন্য রাস্তা মনে হয় দুহাত পরেই কিছু দেখা যাচ্ছে না।পাশের গ্রাম খুব বেশি দূরে নয় এই কাছেই। পাশের গ্রামে সেখানে এক লাইনে শাড়ি শাড়ি অনেক খেজুর গাছ ।সেখান থেকে ওরা গাছ থেকে খেজুরের রস পেড়ে খাবে আর সাথে করে আসার সময় বাড়ির জন্য রস নিয়ে আসবে।
সবাই হেটে চলেছে কাঁপতে কাঁপতে।সিয়াম এবং শ্রাবণ সবার আগে ।পাশে তানিয়া ।
মেঘলা ও লামিয়া রাফি তার পিছন পিছন হাঁটছে।
শ্রাবণ একবার তাকালো পিছনে ।তাকালো মেঘলার দিকে ।মেঘলা মাথা নিচু করে চুপচাপ হেঁটে আসছে। কিছু একটা তো হয়েছে মেঘলার শ্রাবণ বুঝতে পারছে ।কিন্তু কি হয়েছে জানেনা !
চলবে_
একশ্রাবণমেঘের_দিনে
neela_rahman
পর্ব ২৬
সবাই মোটামুটি হেঁটে অভ্যস্ত কষ্ট হয়ে গেল শুধু তানিয়ার।তানিয়া স্নিকার্স না পড়ে মোটামুটি পেন্সিল হিলের জুতা পড়েছিল বাধ্য হয়ে লাস্টে জুতো খুলে হাতে নিয়ে হাঁটতে হয়েছে এই ঠান্ডার মধ্যে।
বাকি সবাই শীত মাথায় রেখেই পোশাক পরিধান করেছে।মেঘলা এবং লামিয়া সালোয়ার কামিজের সাথে স্নিকার পড়েছে।
প্রায় ২০-২৫ মিনিট হেঁটে হেঁটে ওরা চলে এলো কাঙ্খিত জায়গায় ।চোখ যতদূর যাচ্ছে দেখতে পাচ্ছে পুকুরের পাড়ে একনাগাড়ে কতগুলো সারি সারি খেজুরের গাছ।
সব গাছেই একটি করে হাড়ি বাঁধা আছে। আজ শীত একটু বেশি কুয়াশা ও একটু বেশি থাকার কারণে এখনো রস ওয়ালা আসেনি রস নামাতে হয়তো এখনই চলে আসবে। একটি গাছ ছোট থাকায় রাফি স্রাবনের দিকে তাকিয়ে বায়না ধরে বললো,” ভাইয়া এই গাছ থেকে রসের হাঁড়িটা পেরে দাও না আমরা সবাই মিলে এই গাছ থেকে রস খেতে থাকি ।যতক্ষণ না রসের মালিক আসবে ততক্ষণ আমরা এটা খেতে থাকি।”
শ্রাবণ রাফির দিকে তাকিয়ে বললো,” এটা ঠিক হবে না ।আর রসের মালিক না তাকে বলে গাছি ।উনি আসুক উনার কাছ থেকে অনুমতি না নিয়ে খেলে কেমন দেখায় ?”
সিয়াম বললো,” সমস্যা নেই ভাইয়া ।সবাইকে চিনি আর এক হাড়ির রসের দাম কত সে অনুযায়ী টাকা দিয়ে দিলেই হবে ।হাড়ি তো একটাই।”
শ্রাবণ সিয়ামের দিকে তাকিয়ে বললো,” ঠিক আছে তাহলে পারছি ।”
বলেই হাতটি একটু উঁচু করে গাছ থেকে রসের হাঁড়িটি নামিয়ে দেখলো রসে টইটুম্বুর ।পুরোপুরি ভরে আছে রসের হাঁড়িটি।
সিয়াম সাথে করে কয়েকটি গ্লাস নিয়ে এসেছে প্লাস্টিকের ওয়ান টাইম এর গ্লাস।
সিয়াম এখানকার গাছিদের কাছ থেকে গ্লাস নিয়ে খেতে পারলেও বাকি সবাই শহর থেকে এসেছে তাই বুদ্ধি করে কয়েকটি ওয়ান টাইম এ গ্লাস নিয়ে এসেছে।
শ্রাবণ রসের হাঁড়িটি নাকের কাছে নিয়ে সুঘ্রান নিয়ে বললো,” ওয়াও সেই টেস্টি হবে ।সেই ছয় বছর আগে খেয়েছিলাম যেন সুগন্ধটা এখনো নাকে লেগে আছে।”
বলেই তাকালো মেঘলার দিকে।রসের কথা মনে হলেই মেঘলার কথা মনে পড়ে যায়।
শ্রাবণ প্রত্যেকটি গ্লাসে রস ঢালতে লাগলো ।সবার গ্লাসে রস ঢালা হলেও একটি গ্লাস শর্ট পড়ে গেল।
সবাইকে রস ঢেলে দিলে সবাই সাথে সাথে চুমুক দিয়ে ফেলেছিল ।একটি গ্লাস শর্ট পড়ার কারণে শ্রাবণ আগের রসের গ্লাসটি মেঘলার দিকে দিল ।মেঘলা বললো ,”আমি খাব না।”
শ্রাবণ আর মেঘলাকে সাধলো না ।সাথে সাথে গ্লাস টি চুমুক দিয়ে অর্ধেক রস খেয়ে ফেললো। খেয়েই অর্ধেক বাড়িয়ে দিল মেঘলার দিকে।
মেঘলা প্রথমে তো অবাক হল দ্বিতীয়বার না সাধায় তবে এবার অবাক হল নিজের খাওয়া অর্ধেক রস মেঘলাকে সাধায়। মেঘলা আড় চোখে তানিয়ার দিকে তাকালো ।তাকিয়ে আবার শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বললো,” আমি খাব না ভাইয়া আপনি খেয়ে নিন।”
শ্রাবণ মেঘলা দিকে তাকিয়ে বললো,” তোকে আমি জিজ্ঞেস করিনি খাবি কি খাবি না।খেতে বলেছি। তর্ক করতে না।”
সাথে সাথে তানিয়া বলে উঠলো ,”তুমি তো এই গ্লাসে খেয়েছ মেঘলা কি করে খাবে?”
সাথে সাথে শ্রাবণ তানিয়া দিকে তাকিয়ে বললো,” কেন আমি খেলে ও এই গ্লাসে খেতে পারবে না কেন ?আমার কি কোন ছোঁয়াচে রোগ আছে?
আর যদি আমার এমন কোন বংশগত রোগ থেকেও থাকে ছোঁয়াচে রোগ থেকেও থাকে তাহলে ও আমারই রক্ত আমার বংশের মেয়ে ।তাই আমার গ্লাসে খেতে ওর না করার কোন কারণ নেই।”
কথাগুলো বলেই সামনে তাকিয়ে দেখল মেঘলা এখনো গ্লাস ধরে দাঁড়িয়ে আছে ।সাথে সাথে ধমক দিয়ে বললো,” খাচ্ছিস না কেন ?কখন দিয়েছি গ্লাস হাতে ?তাড়াতাড়ি খা।”
মেঘলা আর কথা বাড়াতে চাইল না এই টপিকে তাই চুপচাপ রস টুকুন খেয়ে নিল এই গ্লাসেই।
এমন টাইমে গাছিরা আসতে শুরু করলে প্রথমে এক হাড়ি দাম মিটিয়ে দিল ।তারপরে এভাবে ওরা কয়েক গ্লাস খেয়ে হাঁড়ির দাম মিটিয়ে দিয়ে বাড়ির জন্য কিছু রস নিয়ে নিল।
রস দিয়ে আসবে বাসায় গাছি ।সে সাথে সবকিছু প্যাক করে নিল নিয়ে ওদের সাথে হাটা ধরল ।সবাই সামনে সামনে হেঁটে যাচ্ছে ।তানিয়ার মেজাজ গরম ।তানিয়ার আগে-পিছে না তাকিয়ে চুপচাপ আছে ।শ্রাবণ হঠাৎ মেঘলা কে পিছনে দেখে দুই এক কদম পিছিয়ে গেল।
তারপর মেঘলা কাছাকাছি এসে মেঘলা দিকে তাকিয়ে বললো,” এত পিছনে হাটছিস কেন এনার্জি নাই? মাত্রই তো রস খাওয়ালাম।”
মেঘলা বললো,” না ভাইয়া এমনি ।আপনি সামনে যান ।সামনে গিয়ে হাঁটুন ।আমার জন্য পিছনে আসতে হবে না ।”
শ্রাবণ কোন কথার উত্তর না দিয়ে হঠাৎ মেঘলার দিকে তাকিয়ে বললো,” ছয় বছর আগে একটি মেয়ে আমার রুমে এসে গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ।বলেছিল যতক্ষণ পর্যন্ত রস না খাব ততক্ষণ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকবে।”
মেঘলা সাথে সাথে চোখ তুলে তাকাল ।মেঘলার অতোটা মনে নেই কিন্তু কথা শুনে বুঝতে পারছে মেয়েটার আর কেউ না মেঘলা ছিল।
শ্রাবণ বললো,” মেয়েটা হঠাৎ করে দেখি আমার রুমে রসের গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ।আমি জিজ্ঞেস করলাম কি চাই ?বলল আমি রস না খেলে নাকি দাদি বলেছে রুম থেকে বের হতে মানা ।তাই যতক্ষণ আমি রস খাইনি ততক্ষণ মেয়েটা গ্লাস হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।”
মেঘলা সামনের দিকে তাকিয়ে বললো,” মেয়েটা বোকা ছিল তাই দাঁড়িয়ে ছিল ।রস টুকুন নিজে নিজেই খেয়ে নিয়ে নিচে গিয়ে দাদিকে বললেই হতো শ্রাবণ ভাইয়াকে খাইয়ে দিয়েছে।”
শ্রাবণ অবাক হয়ে তাকালো মেঘলার দিকে ।তারপর বললো,” ছিঃ এত কুটিল বুদ্ধি তোর মাথার ভিতরে ?ভাগ্যিস মেয়েটা তোর মত ছিল না।”
মেঘলা কিছু বলল না ।শ্রাবণ বললো,” মেয়েটা আরও অনেক কিছু বলেছিলো।”
মেঘলার কিছুই মনে নেই তাই মেঘলা শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বললো,” ছয় বছর আগে নিশ্চয়ই মেয়েটা অনেক ছোট্ট ছিল ।তাই ছোট বাচ্চাদের কথা ধরতে হয় না ।ছোট বাচ্চারা অনেক কিছুই বলে। আর ছোটবেলা যেই ভুলগুলো করেছে নিশ্চয়ই বড় হয়ে সেগুলো করত না।”
শ্রাবণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মেঘলার দিকে ।তারপর বললো,” কোনটা ভুল ?”
মেঘলা বললো,” এই যে ঘন্টার পর ঘন্টা রসের গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ।আপনার ঘুম ভাঙলে আপনাকে খাওয়াবে তারপর নিচে যাবে এর থেকে ভালো নিজেই খেয়ে নিতো ।তাই নিশ্চয়ই এরকম বোকা বোকা অনেক কথাই বলেছে মেয়েটা।কিন্তু বড় হলে মেয়েটা নিশ্চয়ই ধরনের বোকা বোকা কথা বলত না।”
শ্রাবণ হাঁটতে হাঁটতে মেঘলার দিকে তাকিয়ে বললো,” তাই ?মেয়েটা কি অনেক বড় হয়ে গেছে ?”
মেঘলা শ্রাবণের দিকে এক নজর তাকালো ।তাকিয়ে বললো,” নিশ্চয়ই এতোটুকু বড় হয়েছে এখন আর ঘন্টার পর ঘন্টা রসের গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে না।”
বলেই জোরে জোরে পা ফেলে সামনের দিকে হেঁটে গেল মেঘলা।
শ্রাবণ মেঘলার যাওয়ার পানে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।
লামিয়া সিয়ামের সাথে পায়ে পা ফেলে হাঁটার চেষ্টা করছে ।কিন্তু সিয়াম লামিয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছে না ।লামিয়ার খুব মেজাজ গরম হচ্ছে ।আজ এর একটা শিক্ষা দিতেই হবে ।ভেবেছিল মাফ করে দেবে কিন্তু না ।এই রগচটা ছেলেকে মাফ করা যাবে না ।তাই কোন কিছু আগে পরে না ভেবেই হুট করে একটি ল্যাং মেরে দিল সিয়াম কে।
সিয়াম পড়ে গেল না তবে ভালো একটি হোঁচট খেলো ।পায়ে ব্যথা পেয়েছে যেহেতু শীতের দিন ।সাথে সাথে চিৎকার দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
শ্রাবণ বলে উঠলো ,”কি হয়েছে ব্যথা পেয়েছিস?”
সিয়াম বললো,” না ভাইয়া ।নিচে হয়তো মাটির চাকা ছিল বুঝতে পারিনি হোঁচট খেয়েছি।”
কাউকে বলল না যে এটি এই পা*গলি মেয়ের কাজ ।বললে শুধু শুধু বকা খাবে ।সিয়াম কথা বাড়াতে চায় না। তবে ভীষণ ব্যথা পেয়েছে সিয়াম ।এখন লামিয়ার একটু অনুশোচনা হচ্ছে ।শীতের দিন পায়ে ব্যথা পেলে ঠিক কতটা ব্যথা পেতে পারে জানা আছে লামিয়ার।একদিন ও নিজেও খাটের পায়ার সাথে ব্যাথা পেয়েছিলো।
হাত দিয়ে কিছুক্ষণ পায়ে মালিশ করে আবার জুতো পড়ে নিলো সিয়াম ।তারপর উঠে দাঁড়িয়ে একবার শুধু তাকালো লামিয়ার দিকে ।লামিয়ার মন খারাপ বুঝতে পারছে সিয়াম। তাই লামিয়া কে কিছু না বলে আবার চুপচাপ সামনের দিকে হাঁটা শুরু করলো ।এদিকে রাফি মেঘলার হাত ধরে বলতে লাগলো,” সামনে বছর আবার আমরা বেড়াতে আসবো কেমন ?”
মেঘলা বলল ঠিক আছে ।বলেই রাফির চুলগুলো আবার এলোমেলো করে দিল ।মেঘলা যখনই রাফির চুলগুলো ছুঁয়ে দেয় রাফির মনে হয় আশেপাশে সময়টা থমকে গিয়েছে ।এক নজরে কিছুক্ষণ মেঘলার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,” তুমি যখন এভাবে আমার চুলগুলো এলোমেলো করে দাও তখন আমার খুব ভালো লাগে।”
কথাটা শুনেই মেঘলা হেসে দিল ।হেসে আবার দুজন হাঁটতে শুরু করল ।এদিকে পিছন থেকে সবগুলো কথাই শুনতে শ্রাবণ। মনে মনে ভাবছে ,”মাত্র ১২ বছর বয়সেই এতটা কি করে পেকে গেল রাফি ?ও যদি বাংলাদেশে থাকতো তাহলে কখনোই এরকম পাকতে দিত না ।আর ভাবা যায় নিজে থেকে চার বছরে বড় একটা মেয়ের সাথে কিনা এভাবে সবার সামনে ফ্লার্ট করছে !”
সবাই বাসায় চলে আসলো ।রসজাল দেওয়া হচ্ছে ।চলছে পিঠাপুলি বানানোর আয়োজন ।পাশের বাসা থেকে আরও দুইজন মহিলা এসে যোগ দিয়েছে কাজে।গ্রামের এই এক আনন্দ এক বাড়িতে পিঠা তৈরি করা হলে আশেপাশের কয়েকজন এসে ওর সাথে সাহায্য করে ।আর এখানে তো তারা ঢাকা থেকে অনেকদিন পরে এসেছে তাই আরো খুশিতে এসে হাতে হাতে কাজ করে দিচ্ছে।
বাড়িটা এল সিস্টেম হওয়ায় ছাদ থেকেই আড়াআড়ি ভাবে উঠানের অনেক কিছুই দেখা যায় ।ছাদের এক কোনায় দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছে শ্রাবণ চালের গুড়ি কোটা হচ্ছে ।এখানে অনেকে কাহিল সিয়া অথবা ঢেকি দিয়ে চালের গুড়ি কুটে।যদিও মেশিন আছে মেশিনে কেউ করেনা। ঢেঁকি দিয়ে করা অথবা কাহিল সিয়া দিয়ে করার মজাই আলাদা।
মেঘলা ও লামিয়া খুশিতে খুশিতে চাচি দুজনের হাত থেকে নিয়ে কাহিল সিয়া নিয়ে গুড়ি কুটতে লাগলো ।খুব একটা পারছে না ভারি হওয়ায় তারপরও দুজন চেষ্টা করছে ।উপরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্যটি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে দেখছে শ্রাবণ।
এদিকে তানিয়া ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠছে।এই বিষয়ে বেখেয়াল শ্রাবণ। হঠাৎ শব্দ পেতেই শ্রাবণ পিছনে তাকিয়ে দেখে তানিয়া দাঁড়িয়ে আছে।
তানিয়া বললো,” কি করছিলে ?”
শ্রাবণ বললো এইতো দাঁড়িয়ে আছি সবাই কাজকর্ম করছে দেখছি ।তানিয়া শ্রাবণের দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকিয়ে দেখলো সবাইকে দেখা যাচ্ছে না এখান থেকে শুধু চালের গুড়ি কোটা দৃশ্যটি দেখা যাচ্ছে ।যেখানে মেঘলা ও লামিয়া চালের গুড়ি কুটছে।
চলবে__
Share On:
TAGS: এক শ্রাবণ মেঘের দিনে, নীলা রহমান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
এক শ্রাবণ মেঘের দিনে পর্ব ৩৪+৩৫
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ২৩+২৪
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ২৭+২৮
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৩৭+৩৮
-
এক শ্রাবণ মেঘের দিনে পর্ব ৬+৭
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ১৫১+১৫২
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ১৩+১৪
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ১৩৭+১৩৮
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৮৪
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ৪৭