এক শ্রাবণ মেঘের দিনে পর্ব ১৭+১৮
একশ্রাবণমেঘের_দিনে
neela_rahman
পর্ব_১৭
অনেক প্রশ্নের উত্তর আসলে মুখ ফুটে দেয়া যায় না ।সিয়াম ওই মুহূর্তে ঐ সিচুয়েশনে আমি ওই বয়সটা ছিলাম এখন হয়তো তুই সেই বয়সে আছিস ।হয়তো তোর থেকে একটু ছোট ছিলাম আমি ।
বুঝে উঠতে পারিনি বাবা মা দাদীর ম্যানিপুলেশনে পড়ে হ্যাঁ করে দিয়েছিলাম কিন্তু আমি ভিতর থেকে রাজি ছিলাম না। ওই মুহূর্তে আমি জানিনা কি করে তাদেরকে অস্বীকার করে সবকিছু ছেড়েছুড়ে চলে যেতাম ।দাদী যখন হাত ধরে বলল আমি না করতে পারিনি ।কিন্তু তুই এখন সেই সময়টা পার করছিস ।
ওই সময় আমার মত একটা ছেলের সাথে ১০ বছরের একটা মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া যাকে বোনের চোখে দেখেছিলাম সেটা কি মেনে নেওয়া যেত বল ?আর ওই মুহূর্তে এত কিছু মাথায় কাজ করেনি ।বয়সটা অল্প ছিল আমেরিকা চলে যাব রঙিন স্বপ্ন সবকিছু আমি কোন কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
সিয়াম হয়তো কিছুটা বুঝতে পারলো তবু আক্ষেপের স্বরে বললো,” এখন তো বুঝতে পারো।” এখন?আচ্ছা তানিয়া কে? মানে আমার যা মনে হচ্ছে আমি যা অনুভব করছি তাই কি ?তানিয়া আপুর সাথে কি তোমার কোন সম্পর্ক রয়েছে?”
শ্রাবণ হকচকিয়ে গেল সিয়ামের প্রশ্নে ।তানিয়ার সাথে কোন সম্পর্ক ?সম্পর্ক তো বন্ধুত্বের ছিল এখন সামনে বিয়ের জন্য রাজি হয়ে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে কিন্তু আদৌ কি তানিয়া সাথে ওর কখনো আত্মিক কোন সম্পর্ক আছে?
এ প্রশ্নের কি উত্তর দিবে শ্রাবণ যেখানে উত্তর ও নিজেই জানে না যদি বিয়ের জন্য রাজি হয়ে বাংলাদেশে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে আসাটা সম্পর্ক হয় তাহলে সম্পর্ক আছে বৈকি কিন্তু মন থেকে কোন কিছুই অনুভব করতে পারছে না শ্রাবণ।
কোন কথার উত্তর দিতে পারল না শ্রাবণ ।সিয়াম বললো,” ঠিক আছে ভাইয়া চলো।”
ফিরে আসলো বাড়িতে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে ।শ্রাবণ এসেই সবার সাথে সন্ধ্যায় চা নাস্তা খাওয়ার জন্য উঠানে বসলো।
লামিয়া ও মেঘলা আজকে চা তৈরি করছে ।সবাই বসে আছে আসমা বেগম বললেন,” আজকে চা খাবি লামিয়া ও মেঘলার হাতের তাও যেন কেনো চা না খেজুরের ঝোলা গুড়ের চা।”
এগুলো ভিতর থেকে শুনেছিল তানিয়া ।তাই তানিয়া ধীরে ধীরে হেঁটে এসে বাইরে দেখল শ্রাবণ চলে এসেছে ।একটি চেয়ার টেনে শ্রাবণের পাশে বসে পড়লো তানিয়া। তানিয়ার এভাবে সবার সামনে শ্রাবণের পাশে বসে পড়াটাকে মোটেও পছন্দ করলেন না আসমা বেগম।
শ্রাবণ আসমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলো মায়ের জিনিসটা পছন্দ হচ্ছে না শ্রাবণ একটু চেয়ারটা সরিয়ে আলাদা হয়ে বসল ঠিক এমন সময় রান্নাঘর থেকে দুটো ট্রেতে করে চা এবং কিছু নাস্তা নিয়ে বের হল লামিয়া এবং মেঘলা।
মেঘলা কলাপাতা সেই থ্রিপিসটি এখনো পড়ে আছে তবে ওড়না আঁটসাঁট করে বেঁধে কোমরে গুঁজে রেখেছে চুলগুলো ।হালকা বিনুনি করা যেন পাক্কা গৃহিনীর মতো লাগছে ছোট্ট একটা বউয়ের মত লাগছে।
শ্রাবণ না চাইতেও চোখ জোড়া বারবার চলে যায় মেঘলার দিকে ।মেঘলা একে একে সার্ভ করতে লাগলো ।সবার শেষে শ্রাবণের কাছাকাছি আসতেই মেঘলা দেখতে পেলো শ্রাবণ এক দৃষ্টিতে মেঘলার দিকে তাকিয়ে আছে ।শ্রাবণের খেয়ালই নেই মেঘলা ওর খুব কাছাকাছি চলে এসেছে।
মেঘলা শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বললো,” এই নিন ভাইয়া চা। শ্রাবণের কোন খেয়াল নেই হাতটা বাড়িয়ে দিল ঠিকই হঠাৎ করে চায়ের কাপে লেগে গরম চায়ের কাপে লাগা মাত্রই হাত সাথে সাথে ঝারা দিয়ে উঠলো।
হাত ঝাড়া দেওয়ার কারণে চা কাপটি পরে সাথে সাথে কাপটি পড়ে গিয়ে শ্রাবণের হাতেই ।আবার একটু চা পরল হাতে বেশি নয় তবে হালকা একটু ।চা গরম থাকায় আহ বলে চিৎকার দিয়ে উঠল শ্রাবণ।
তানিয়া শ্রাবণের হাত ধরবে তার আগেই মেঘলা ট্রে মাটিতে ফেলে সাথে সাথে হাতটি ধরে ফেলল শ্রাবণের ।তারপর শ্রাবণ কে হাত ধরে টান দিয়ে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো রান্নাঘরে । শ্রাবণ চুপচাপ উঠে মেঘলার সাথে যেতে লাগলো।কে কি ভাববে কোন কিছু মাথায় নেই।রান্নাঘরে এসে কল পাড়ে কলের পানি দিয়ে হাত ধুয়ে দিতে লাগলো ।শ্রাবণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মেঘলা দিকে।
রান্নাঘরের দিকে সবাই উঠে এলো সাথে তানিয়াও ।দেখল শ্রাবণ হাঁটু ভেঙ্গে বসে আছে মেঘলা কলপাড় থেকে পানি নিয়ে একটু একটু করে হাত ধুয়ে দিচ্ছে ।খুব যত্ন সহকারে যেনো জোরে দিলেই ব্যাথা পাবে।শ্রাবণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেঘলার দিকে যেন জলা ব্যথা সব কিছুই ভুলে গিয়েছে শ্রাবণ।
কিছুক্ষণ এভাবে পানি দিয়ে ধুয়ে দিয়ে মেঘলা একটু লবণ পানি নিয়ে এসে লবণ পানিতে হাত চুবিয়ে দিল শ্রাবণের ।ঠান্ডা লবণ পানি । বললো,” এটাতে হাত ডুবিয়ে দিলে আস্তে আস্তে আপনার জ্বলা কমে যাবে ফোসকা পড়বে না।”
শ্রাবণ বললো,” তাই ?মলম দিলেই তো হয়ে যেত ।মলম নেই বাসায় ?”মেঘলা বললো ,”আমরা তো অনেকদিন ধরে বাড়িতে থাকি না তাই আছে কিনা বলতে পারব না ।এটি হচ্ছে গ্রামীণ নুসকা এটি দিলে কাজ হয়ে যাবে ।দেখবেন কোনো ফোসকা পরবেনা এবং কিছুক্ষণ পর জ্বলুনি ও কমে যাবে।”
শ্রাবণ মুচকি হেসে বললো,” তাই ?এত কিছু জানিস ?”
মেঘলা বললো,” ওমা এটা জানার কি আছে ?ছোটবেলা থেকে তো শিখে আসছি দাদি আমাদের কত কিছু শিখাতো ।”
বলেই মেঘলার মনটা খারাপ হয়ে গেল ।দাদিকে দেখে না সেই কত বছর হয়ে গেল ।ছোটবেলা দাদীর কথা কিছু কিছু মনে আছে সবকিছু মনে নেই মেঘলার।
ও তো একসাথেই থেকেছে জন্মের পর থেকে দাদীর সাথে দাদির সাথে ঘুমাতো তাই কিছু কিছু স্মৃতি এখনো মেঘলার মনে পরে।
শ্রাবণের জন্য আরো এক কাপ চা নিজ হাতে বানালো মেঘলা ।খেজুরের গুড়ের চা।শ্রাবণ চা খেয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল ।আসলেই খেজুরের গুড়ের চা এত মজা না খেলে বুঝতে পারত না ।কফি টফি তো কিছুই নাই এর কাছে।খুশি হয়ে বললো,” চা অনেক স্বাদ হয়েছে।কি চাস বল?”
মেঘলা বললো কিছু না।তবে বাকি থাকলো।পরে নিবো।
শ্রাবণের মনে পড়লো সেই ছোট্ট মেঘলার চাওয়া জিনিস গুলো।
রাত বাজে নয়টা ।গ্রামে শীতের দিন নয়টা মানে অনেক রাত ।আটটার মধ্যে খাওয়া-দাওয়া কমপ্লিট করে ফেলেছে সবাই। শ্রাবন চিলেকোঠার রুমে থাকে সেই সুবাদে ছাদে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা হাওয়ায় হিমশীতল পরিবেশে সি*গারেট খাচ্ছিল শ্রাবণ।
এমন সময় হঠাৎ কারো পায়ের শব্দ শুনতে পেয়েই শ্রাবণ পিছনে ঘুরে দেখে তানিয়া । শ্রাবণ অবাক হয়ে যায় এত রাতে তানিয়া এখানে কেন কি করছে?
শ্রাবণ জিজ্ঞেস করে ,”তুমি এখানে এত রাতে ?”
তানিয়া বললো,” কেন আসতে পারি না ?”
শ্রাবণ বললো,”না আসতে পারো না।গ্রামে এখানে ৯ টা মানে এখন অনেক রাত যে কেউ দেখলে খারাপ মনে করবে।”
“শহরে ও তো আসতে পারতাম না ।কোথাও তো আসতে পারি না ।কেউ দেখুক বা না দেখুক। সবার সাথে তুমি দ্বিধাহীন ভাবে মিশো শুধু আমার বেলায় তোমার একটু বাধা কাজ করে ।কেন আমাদের তো কিছুদিন পর বিয়ে হচ্ছে !
আমার সাথেই তোমার যত সংকচ যত দ্বিধা ।বাধাহীন হয়ে কেন আমার সাথে মিশতে পারো না ?আমি যাও একটু তোমার কাছে আসার চেষ্টা করি আমাকে সব সময় দূরে সরিয়ে রাখো ।অথচ আমাদের সামনে বিয়ে হচ্ছে আমার চাইতে তো বেশি সখ্যতা তোমার মেঘলার সাথে ।লামিয়া না হয় তোমার আপন বোন কিন্তু মেঘলা তো নয়?”প্রশ্ন করলো তানিয়া।
কথা শুনতেই অবাক হয়ে গেল শ্রাবণ ।এর মধ্যে মেঘলা আসলো কি করে ?মেঘলা লামিয়ার মত একদম আপন না হলেও মেঘলার রক্ত ওর শরীরে আছে ।মেঘলা ওর বংশের মেয়ে ।মেঘলা কে দেখলে কখনোই অতটা সংকোচ হয় না পর মনে হয় না নিজের মনে হয় আপন মনে হয়।
আজকাল কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনা শ্রাবণ ।উত্তর নিজেও জানেনা ।কিছুক্ষণ আগে যখন সিয়াম প্রশ্ন করেছিল তানিয়া কে উত্তর দিতে পারিনি ।এখন তানিয়া প্রশ্ন করছে মেঘলা সাথে কেন ওর সখ্যতা কেন মেঘলা সাথে এত সহজ হয়ে মিশতে পারে উত্তর দিতে পারছে না শ্রাবণ।শুধু এতটুকু জানে মেঘলা কে ওর পর মনে হয় না আপন মনে হয় আপনের চেয়েও আপন মনে হয়।
ঠিক এমন সময় শ্রাবণ যখন ভাবছিল কিছু একটা তানিয়া হুট করে শ্রাবণকে জড়িয়ে ধরে ।শ্রাবণ ভাবাচ্যাকা খেয়ে যায় ।শ্রাবণকে জড়িয়ে ধরার সাথে সাথেই হঠাৎ দেখে ছাদের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে মেঘলা। মেঘলার দৃষ্টি শ্রাবণ এবং তানিয়ার দিকে ।মেঘলা ভাবছে ,”ছিঃ এই মুহূর্তে এসে যেন কোনো ভুল করে ফেলেছে মেঘলা।শ্রাবণ ভাইয়া আর তানিয়া এখানে একাকী কিছুটা সময় পার করছিল মেঘলার এখানে আসা ঠিক হয়নি।”
এদিকে শ্রাবণ অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে মেঘলার দিকে ।হুট করে এমন একটি সিচুয়েশনে পড়ে যাবে বুঝতে পারেনি শ্রাবণ ।জানে না কেন কিন্তু নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে মনে ।হচ্ছে মেঘলা পৃথিবীর সেই শেষ ব্যক্তিটি হত যে এইরকম একটি দৃশ্য এই মুহূর্তে দেখেছে ।কেন মেঘলাকে আসতে হলো ?
শ্রাবণ হঠাৎ করে তানিয়াকে নিজের বুক থেকে সরিয়ে দিল ।সরিয়ে দিয়ে সাথে সাথে ঘুরে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে লাগলো ।কি বলবে কি উত্তর দিবে শ্রাবণ?
মেঘলা যেন নিজের ভুল বুঝতে পারল ।সরি বলে বললো,” আমি ভুল সময় চলে এসেছি ।”
বলেই দৌড়ে নিচে চলে গেল।
শ্রাবণের রাগ হলো ভীষণ রাগ হলো, মেঘলা চলে গিয়েছে তানিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,” কেন করলে এরকম একটি কাজ ?মেঘলা এসে দেখে ফেলল। আর তাছাড়া তোমার আমার এমন কোন সম্পর্ক আছে কি তুমি রাতের আধারে আমাকে জড়িয়ে ধরবে? “
জানে না শ্রাবণের কি হয়েছে বুকের ভিতর কেমন যেন উথাল পাথাল করছে ।খালি মনে হচ্ছে কিছু একটা ভুল হয়ে গেল মেঘলা ভুল কিছু দেখে ফেলল।
তানিয়া বললো,” কি এমন হয়েছে বড় ভাই বড় ভাইয়ের বউর সাথে সময় কা*টাচ্ছে ।দেখতেই পারে ।”
শ্রাবন অবাক হয়ে গেল ।বললো,”বউ ?বড় ভাইয়ের বউ মানে ?তোমার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে এখনো ?এখনো কেউ জানে বাড়ির তোমার আমার কি ধরনের সম্পর্ক বা কি কারণে এখানে এসেছ?”
তানিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল এতে এত রিঅ্যাক্ট করার কি আছে ?মেঘলা ওর চাচাতো বোন না হয় বড় ভাইকে একটি মেয়ের সাথে দেখে ফেলেছে তো এমন কি ?তানিয়া বললো,” মেঘলা দেখলে কি সমস্যা ?আজ হোক কাল হোক ও তো দেখতোই। বড় ভাই বিয়ে করলে দেখবে না ?”
শ্রাবনে কানে বড় ভাই কথাটি বারবার যে লাগতে শুরু করল।
কি করে বুঝাবে শ্রাবণ কাউকে বড় ভাই হলেও মেঘলা ধর্মীয় মতে ওর স্ত্রী ।শ্রাবণ ওর স্বামী ।মেঘলা ওর স্বামীকেই পরনারীর সাথে দেখেছে ।দেখে লজ্জা পেয়ে চলে গেছে।যদিও মেঘলা জানেনা কিন্তু এটা অন্যায় এটা পাপ এটা মহা অন্যায় হয়ে গেছে। শ্রাবণ যার জন্য তালাকের আগে কারো সাথেই জড়ায়নি।আজ মেঘলা ভুলে একটি ভুল দৃশ্য দেখলো যার সত্যতা নেই।
চলবে__
গল্পএকশ্রাবণমেঘেরদিনে
লেখিকা_neela_rahman
পর্ব_১৮
মেঘলা নিচে নেমে এলো ।নিচে নেমে এসে নিজের রুমে দরজা বন্ধ করে চুপচাপ খাটের উপরে বসল ।কিন্তু কেন যেন ভিতরে কিছু একটা ছটফট করছে ।ভালো লাগছে না ছাদে যা দেখেছে তাই।শ্রাবণ ভাইয়া হয়তো তার প্রেমিকা বা হবু স্ত্রীর সাথে কিন্তু এমন কেন লাগছে ?ভালো লাগছে না দৃশ্যটি মোটেও।
তারাই বা কি মনে করবে মেঘলা ইচ্ছা করে গিয়ে তাদের ডিস্টার্ব করেছে ?মেঘলা তো আসলে গিয়েছিল অনেক দিন ধরে ছাদে যাওয়া হয় না ভাইয়াও নিশ্চয়ই দরজা লাগিয়ে বসে ছিল তাই একটু ছাদে গিয়েছিল।
কিন্তু এখন ভাবতেই কেমন লজ্জা লাগছে ।এমন অবস্থায় দেখে ফেলল ভাইয়াও নিশ্চয়ই লজ্জা পেয়েছে।
কিন্তু আর কিছু ভাবতে চাইলো না মেঘলা ।চুপচাপ বিছানা ঠিক করে বিছানায় কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল।
এদিকে তানিয়া নিচে চলে গেল ।আর বারগেনিং করতে চাইলো না ।চুপচাপ নিচে গিয়ে নিজের রুমে বসে রইল ।মনে মনে ভাবছে মেঘলা দেখেছে তো কি হয়েছে ?এমন অদ্ভুত বিহেভিয়ার কেন করছিস ?শ্রাবণ মেঘলা সামনে থাকলে কেন বারবার শ্রাবণের চোখ দুটো মেঘলার দিকে যায়। বয়সে মেঘলা অনেক ছোট চাচাতো বোন হয় ওর তবুও বলা যায় না ।মেঘলা দেখতে অনেক সুন্দরী ছেলে মানুষ যদি মেঘলা দিকে অন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তাই যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে ।ভাবল আগামীকালই বাবার সাথে কথা বলবে তানিয়া।
শ্রাবণ রুমে এসে বিরক্ত হয়ে বিছানায় বসলো ।কিছুই ভালো লাগছে না ।কেমন একটি দৃশ্য মেঘলা সামনে পড়লো ! কেন এমন হতে হল ?এই দৃশ্য না দেখলে কি হত না?
যদিও মেঘলা ওদের বিয়ের কথা জানে না কিন্তু শ্রাবন তো জানে মেঘলা ওর বিবাহিত স্ত্রী ।তাই কেমন যেন শ্রাবণের নিজের কাছেই মনে হচ্ছে ও কোন অন্যায় করে ফেলেছে ।এটলিস্ট মেঘলার এই দৃশ্যটা দেখা উচিত হয়নি।
আর কিছুই ভাবতে পারছে না শ্রাবণ। এত অদ্ভুত অনুভূতির কারণ ও জানে না ।তাই চুপচাপ বিছানায় কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল শ্রাবণ।
পরদিন সকালে শ্রাবণ ঘুম থেকে উঠতেই হঠাৎ দরজায় নক করার শব্দ পেল। রাতে দরজা চাপিয়ে রেখে ঘুমিয়ে ছিল শ্রাবণ ।দরজা লাগায়নি তাই ঘুমো ঘুমো কন্ঠে বললো দরজা খোলা আছে।”
মেঘলা দরজা দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,” ভাইয়া ভিতরে আসব ?”
মেঘলার আওয়াজ পেতেই শ্রাবণ বালিশ থেকে মাথা তুলে চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে একটু যেন ধাতস্থ হল ।তারপরে বললো,” দরজা খোলা আছে ভিতরে আয়।”
মেঘলা ভিতরে আসতেই শ্রাবণ তাকিয়ে দেখলো,” মেঘলার হাতে একটি গ্লাস শ্রাবণ বুঝতে পারলো সেই ছোটবেলার মতো নিশ্চয়ই খেজুরের রস নিয়ে এসেছে গ্লাসে ।শ্রাবণ একটু কাত হয়ে বললো,” নিশ্চয়ই খেজুরের রস নিয়ে এসেছিস?
মেঘলা বললো,” হুম খেজুরের রস নিয়ে এসেছি ।বড় আম্মু বলল আপনাকে দিতে।”
শ্রাবনের মনে পড়ে গেল সে ছোট্ট মেঘলার কথা ।টোল পরা গালে হাসি হাসি মুখ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল খেজুরের রস হাতে ।সেবার বলেছিল দাদি পাঠিয়েছে পার্থক্য শুধু এটাই এবার আর দাদি বেঁচে নেই এবার মা পাঠিয়েছে।
শ্রাবণ একদৃষ্টিতে মেঘলা দিকে তাকিয়ে থেকে আবার ভাবল না আরো কিছু পার্থক্য আছে বৈকি ।সেবার মেঘলা বিয়ে করার জন্য অনেক অনুরোধ করেছিল এক কথায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল ১০ বছরে মেঘলা ।কিন্তু এবার শ্রাবণ মেঘলাকে ডিভোর্স দিতে এসেছে এমন ডিভোর্স যে বিয়ের কথাও জানে না ডিভোর্সের কোথাও জানেনা মেঘলা। আর তাছাড়া মেঘলা এতোটুকু বড় হয়ে গেছে এবার সেধে নিজে থেকে বিয়ের প্রস্তাবও দিবে না শ্রাবণকে। টোলপড়া গালে হাসি হাসি মুখ নিয়ে আর বলবে না মেঘলা ,”আমাকে বিয়ে করবেন শ্রাবণ ভাই? কিছু দিতে হবে না ।শুধু একটি শাড়ি একটি আলতা একটি কাজল ও একটি লিপস্টিক দিলেই হবে। “
এবার মেঘলা এতোটুকু বড় হয়েছে ওকে বলতেও পারবেনা ,”ঠিক আছে বিয়ে করব আয় পিঠে উঠে পিঠ পাড়িয়ে দে।”
শ্রাবণ কম্বলটি গায়ে নিয়ে বিছানায় উঠে বসলো ।বসে মেঘলার হাত থেকে রসের গ্লাসটি নিয়ে এক চুমুকে এক গ্লাস রস পান করে মেঘলা দিকে তাকিয়ে বলল ,”মেঘলা গতকাল রাতে তুই যা দেখেছিস………
“আপনাকে আর ভাবিকে ভীষণ মানিয়েছে শ্রাবণ ভাই ।আপনারা কবে বিয়ে করবেন?”বলে উঠলো মেঘলা।
“ভাবি ?আরে ওর সাথে তো আমার …….আর বলে শেষ করতে পারল না শ্রাবণ ।তানিয়া দরজায় দাঁড়িয়েই বলে উঠলো ,”শ্রাবণ শুনছো?”
তানিয়ার কথা শুনতেই মেঘলা সাথে সাথে পেছন ফিরে তাকালো ।দেখল তানিয়া গোমরা মুখো হয়ে তাকিয়ে আছে এদিকেই ।তাই মেঘলা শ্রাবণের দিকে হাত বাড়িয়ে বলে উঠলো ,”ভাইয়া ভাবী ডাকছে ।আমি বরং চলে যাই।”
বলেই শ্রাবণের হাত থেকে রসের গ্লাসটি নিয়ে সাথে সাথে রুম থেকে বাহিরে চলে গেল।
আজ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেছে লামিয়া তবে সিয়াম এখনো উঠেনি ।লামিয়া ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে পুরো বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক হঠাৎ কি মনে করে যেন সিয়ামের রুমের দিকে চোখ পড়ল।
ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সিয়ামের রুমের দিকে ।দরজা খোলাই ছিল ।হালকা চাপানো ।লামিয়া দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে ভিতরে ঢুকে দেখলো কম্বল গায়ে উপুর হয়ে শুয়ে আছে সিয়াম।
লামিয়ার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চাপল ।একটি বাড়িতে থাকে চাচাতো ভাই তবুও কথা বলে না তাই শাস্তি প্রাপ্য।টেবিলে দেখলো ঠান্ডা পানির জগ।
পানির জগ থেকে একটু পানি নিয়ে সিয়ামের পিঠে ছুড়ে মারতে সিয়াম সাথে সাথে হকচকিয়ে গেল। ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠলো।
উঠে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে লাগল ।সিয়াম ভয় পেয়ে গিয়েছিল ।ঘুমন্ত অবস্থায় ঠান্ডা কিছু স্পর্শ পেতেই ভেবেছিল মনে হয় সা*প।
সিয়াম হুড়মুড়িয়ে উঠে তাকিয়ে রইল লামিয়ার দিকে ।কিছু বলতে পারছে না ।অনেক ভয় পেয়েছে ।সিয়াম কিছুক্ষণ পর নিজেকে ধাতস্থ করে বললো,” এটা কি হলো ?সকাল সকাল পানি দিয়ে দিলি কেন গায়ে?”
লামিয়া বললো,” তোমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছি আর তোমরা নিজেরা নাক ডেকে ঘুমাচ্ছ ।আমরা যে উঠে গিয়েছি আমাদের যে সেবা যত্ন করতে হয় তার কি খেয়াল আছে?”
“সেবা যত্ন করতে হবে মানে ?এত সকালে আবার কিসের সেবা যত্ন ?আর তাছাড়া নাস্তা খাওয়ার জন্য মা আছে বড় আম্মু আছে। জমির কাকা আছে ।আমি কি করতে পারি ?”বললো সিয়াম।
লামিয়া বললো,” ঘুরতে যাব তাড়াতাড়ি রেডি হও ।আজকে কি মনে নেই ?মেঘলার স্কুলের রেজিস্ট্রেশন করতে যাব ।তাই আমরা ঠিক করেছি সবাই যাব ও রেজিস্ট্রেশন করতে থাকবে আমরা অপেক্ষা করবো তারপর একসাথে ঘুরবো।”
সিয়াম আর কিছুই বলল না ।কি বলবে ?আসলেই তো মেঘলাকে নিয়ে যেতে হবে রেজিস্ট্রেশন করাতে ।তাই বললো,” ঠিক আছে বাহিরে যা আমি রেডি হয়ে বের হচ্ছি।”
লামিয়া বললো,” কেন বাহিরে যাব কেন?”
সিয়াম অবাক হয়ে জানতে চাইলো ,”তাহলে কি তোর সামনে রেডি হবে?”
লামিয়া মুচকি হেসে বললো,” হও সমস্যা কি ?আমার তো কোন সমস্যা নেই ।”
বলে বিছানায় বসে পড়ল ।সিয়াম অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল লামিয়ার দিকে ।এমন করছে কেন মেয়েটা? বুঝতে পারছে না।তবে কিছু বলতেও পারছে না।
এদিকে তানিয়া ভিতরে ঢুকবে তার আগেই শ্রাবণ বলে উঠল ,”ওখানেই দাঁড়াও ।আমি আসছি ।ভিতরে আসতে হবে না ।”
বলেই শ্রাবণ বিছানা থেকে নেমে দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বললো,” বল কি হয়েছে?”
তানিয়া বললো,” বাবা তোমার সাথে কথা বলতে চাইছে বিয়ের ব্যাপারে ।”
শ্রাবণ অবাক হয়ে গেল ।এখনো শ্রাবণ বাড়িতে জানাতে পারলো না ।শ্রাবণ কারো সাথে কথা বলতে পারল না ।তানিয়া অলরেডি নিজের বাবার সাথে কথা বলে ওর সাথে কথা বলিয়ে দিতে চাইছে ?এখন যেন এটা একটু বেশি মনে হচ্ছে !বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে শ্রাবণের কাছে।শ্রাবণ বললো,” দেখো তানিয়া এখন আমার বাড়ির কেউ জানে না ।কারো সাথে আমি কথা বলতে পারিনি ।শুধু বাবা জানে বাবা এখনো ফ্রি হয়নি যে কারো সাথে কথা বলবে।
আর তাছাড়া আমি বলেছি বিয়েটা আমি একা একা করবো না ।পারিবারিকভাবে করবো ।আমার পরিবার সিদ্ধান্ত নেবে কার সাথে কখন কিভাবে কথা বলবে ।আমি কারো সাথে আগে থেকে কথা বলতে পারব না ।আমার আত্মীয়স্বজন আছে মুরুব্বিরা আছে ।আমার বাবা ছোট আব্বু মা তারা সবাই মিলে যে সিদ্ধান্ত নিবে তাই হবে।”
তানিয়া কিছু বলবে এমন সময় ছাদে প্রবেশ করল আসমা বেগম ।আসমা বেগমের ছাদে শ্রাবণ এবং তানিয়াকে দাঁড়িয়ে থেকে কথা বলতে দেখে মেজাজ যেন সপ্তম আকাশে চড়লো। উনি চুপচাপ হেটে এসে শ্রাবণের সামনে দাঁড়িয়ে তানিয়াকে বললো,” তানিয়া নিচে যাও আমার একটু শ্রাবনের সাথে কথা আছে।”
তানিয়া অপমানিত বোধ করল ।তাই চুপচাপ কোন কথা না বলে নিচে চলে গেল ।আসমা বেগম শ্রাবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন ,”এসব কি হচ্ছে শ্রাবণ? এই মেয়েটা সব সময় তোর আশেপাশে ঘুরঘুর কেন করে ?এমন কিছু আছে যা তুই আমাদেরকে এখনো জানাস নি বা বলার প্রয়োজন মনে করিস নি?
যদি এমন কিছু হয়ে থাকে তাহলে ভুলে যা ।ভুলেও ভুলবি না তুই এখনো বিবাহিত ।তোর ডিভোর্স হয়নি তাই এখন এমন ধরনের কিছু করার চিন্তাভাবনা করবি না যা আমরা মেনে নিতে পারব না।”
শ্রাবণ চুপ করে রইল কি বলবে ?শ্রাবণ বাবাকে তো বলেছে একটি মেয়ে আছে বিয়ে করতে চায় কিন্তু শ্রাবন তো শিওর না ।বুঝতে পারছে না কি করবে? মা কে হ্যাঁ বলবে নাকি না বলবে ?তাই চুপচাপ রইল।
আসমা বেগম বললেন ,”কি হল জবাব দিচ্ছিস না কেন ?কি লুকাচ্ছিস আমাদের কাছ থেকে ?তুই কি ভুলে গিয়েছিস তুই এখনো বিবাহিত ?তোর এখনো ডিভোর্স হয়নি?”
শ্রাবণ মাথা নিচু করে বললো, “না মা ভুলিনি ।ইন ফ্যাক্ট ভুলতে পারছিনা ।যে আমি বিবাহিত আমার এখনো ডিভোর্স হয়নি চাইলেও ভুলতে পারছি না।”
চলবে__
Share On:
TAGS: এক শ্রাবণ মেঘের দিনে, নীলা রহমান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৮৭
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ১৫৬+১৫৭
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৭৭
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ১৩৩+১৩৪
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৭+৮
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৫৫
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৩৯
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ৪১
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ৯৫
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৮৬