একশ্রাবণমেঘের_দিনে
neela_rahman
পর্ব ২৯
সবাই একসাথে চলে আসলো রনিদের বাড়িতে ।শ্রাবণ অবশ্য বলেছিল আসবে না কিন্তু কেউ শুনতে রাজি নয় ।শ্রাবণকে একা রেখে কেউ আসবে না তাই বাধ্য হয়ে শ্রাবণের আসতে হলো।
বাড়িটা দোতলা ।গ্রামে হলেও ভিতরে ডুপ্লেক্স সিস্টেম করে করা। রনি এবং রনির একটি বড় বোন আছে ।এই দুই ভাই বোন দরজায় দাঁড়িয়েছিল। রনি থেকে এক বছরের বড় ।রনির বোন কলেজে পড়ে রনি এসএসসি দিবে।
রনির বাবা-মা ও বারান্দায় বসেছিল তাদের অপেক্ষায় ।যখনই দেখলেন শহিদুল খান সাজ্জাদ খান সপরিবারে ভিতরে প্রবেশ করছে সাথে সাথে দাঁড়িয়ে উনি অভ্যর্থনা জানানোর জন্য সামনে এগিয়ে আসলেন।
রনির বাবার নাম সাফকাত হোসেন। পেশায় উনি আর্মি অফিসার ।ছুটিতে বাড়িতে এসেছেন এসেই শুনেছেন সাজ্জাদ ভাই এবং শহিদুল ভাই এসেছে পূর্ব পরিচিত তাই দাওয়াত করা হয়েছে।
এদিকে তানিয়া শ্রাবণ মেঘলা রাফি লামিয়া সিয়াম সবাই শহীদুল খান ও সাজ্জাদ খানের পিছনে হেঁটে হেঁটে বাড়িতে প্রবেশ করছিল ।রনি সাথে সাথে এগিয়ে এসে মেঘলা কে বললো,”এত দেরি হল কেন ?সে কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি!”
মেঘলা বললো কই দেরি।সময় মতো ই তো এলাম।
কথাটি শ্রাবণ এবং রাফি দুজনের কানেই গেল ।দুজনের কানে শ্রুতি মধুর লাগে নাই কথাটি ।তারপরও চুপচাপ ভিতরে প্রবেশ করল।
রনির বড় বোনের নাম রাহা ।রাহা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সিয়ামের দিকে।সিয়াম কে চিনে রাহা। যেহেতু এক মাস আগে পর্যন্ত এই এলাকায় ছিল তাই কলেজে যাওয়ার সময় আশেপাশে মাঝেমধ্যে সিয়ামকে দেখতো ।সিয়ামের প্রতি হিউজ একটা ক্রাশ আছে রাহার।
এদিকে সিয়ামের দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে আছে রাহা, লামিয়ার নজর এড়ালো না ।মেয়েরা এসব জিনিস গুলো বেশি খেয়াল করে ।লামিয়ার যেনো শরীরের ভিতর হঠাৎ র*ক্ত বারো গুণ বেশি দৌড়াতে শুরু করল।
সবাইকে নিয়ে বাড়ির হলরুমে বসানো হলো ।বাড়িটা গ্রামের মধ্যে হলেও আভিজাতের ছোঁয়া আছে ।বুঝাই যাচ্ছে খুব সৌখিন মানুষ শাফকাত হোসেন এবং তার স্ত্রী।
রনি সাথে সাথে বললো,” চলো মেঘলা সবাই আমরা উপরে যাই ।বড়রা এখানে বসুক ।”
মেঘলা তাকালো কেন যেন শ্রাবণের দিকে ।শ্রাবণের মোটেও ইচ্ছে নেই কিন্তু হঠাৎ শহিদুল খান বলে বসলেন ,”হ্যাঁ তোমরা যাও উপরে গিয়ে গল্প করো ।আমরা এখানে বড়রা গল্প করছি তোমাদের ভালো লাগবে না ।”
অগত্যা শ্রাবণকে উঠতে হল ।সবাইকে নিয়ে উপরের দিকে যেতে লাগলো।
দোতলায়ও ছোট্ট একটি ড্রয়িং রুম আছে যেখানে ৮-১০ জন মানুষ ইজিলি বসতে পারবে ।সেখানে বসেই সবাই আড্ডা জুড়ে দিল ।শ্রাবণ চুপচাপ তানিয়াও চুপচাপ।
সবাই হাসি ঠাট্টা করছে কথা বলছে ।সিয়াম মাথা নিচু করে বসে আছে ।সিয়াম জানে রাস্তায় আসতে যেতে মেয়েটা মাঝেমধ্যে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতো ।এখনো তাই ।কিন্তু সিয়ামের চিন্তা হচ্ছে অন্য জায়গায় ।যদি ভুল করেএ লামিয়ার চোখে পড়ে তাহলে লামিয়া ছাড়বার পাত্রী নয়।তাই সিয়াম চোখ তুলে তাকাবারও সাহস পাচ্ছে না।
এভাবে আড্ডায় আড্ডায় অনেকক্ষণ চললো। খাবারের আয়োজন সেইরকম রাজকীয় আয়োজন করা হয়েছে ।খাসির মাংস গরুর মাংসের কালা ভুনা দেশি মোরগের ঝাল ঝাল ঝোল কাবাব তারপরে পোলাও খিচুড়ি বেগুন ভাজা কয়েক পদের ভর্তা সব ধরনের আইটেম করা হয়েছে। চিংড়ি দোপেঁয়াজা।সরষে ইলিশ। যার যেটা পছন্দ সে অনুযায়ী খাবে ।খাওয়া-দাওয়া শেষ হলো সবার । শ্রাবণ হাত মুখ ধুয়ে একটু ছাদে গেল সিগারেট খেতে হবে তাই।অবশ্য সবার অনুমতি নিয়েই। শ্রাবণ অদ্ভুত চুপচাপ। তানিয়া ভাবছে শ্রাবণ এতো চুপচাপ কেনো আজ।
নিচে সবাই বসে আড্ডা মারছে বড়রা আর দোতলায় আড্ডা মারছে ছোটরা ।এরমধ্যে রাহা সবার জন্য কফি নিয়ে এলো ।নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সিয়ামের হাতে কফি দিয়ে ওইখানে দাঁড়িয়ে রইল ।সিয়ামের কেমন ইতস্তত বোধ হচ্ছে।
সিয়াম কফিতে চুমুক দেওয়ার সাথে সাথে রাহা বললো,” কেমন হয়েছে কফিটা ?”
এই প্রথম সিয়াম রাহার মুখ থেকে কোন কথা শুনল ।সিয়াম মুচকি হেসে তাকিয়ে বললো,” হ্যাঁ ভালো হয়েছে।”
রাহা বললো,” আপনাকে সবসময় দেখতাম কলেজের কাছে।”
সিয়াম না জানার ভান করে বললো,” ওহ তাই?”
রাহা বললো,” হুম।তবে এখন দেখিনা।”
সিয়াম বললো,” বাবার পোস্টিং ঢাকায় তাই স্বপরিবারে ঢাকায় থাকা হয়।”
রাহা বললো,” আমি ও এক বছর পর ঢাকায় চলে যাবো।”
লামিয়া সব কথাই শুনছে।
শ্রাবণ ছাদে দাঁড়িয়ে সি*গারেট খাচ্ছে ।ভীষণ বিরক্ত লাগছে শ্রাবণের ।বারবার দেখেছে রনি মেঘলা দিকেই তাকিয়ে থাকবে ।কিন্তু মেঘলা দিকে কেন তাকিয়ে থাকবে ছেলেটি ?মেঘলা দিকে তাকিয়ে থাকার কোন অধিকার তো ওর নেই।ওর বাড়ির মেয়েদের দিকে কেন আরেকটা ছেলে এরকম হা করে তাকিয়ে থাকবে?
ভাবতে ভাবতে সিগারেট খাওয়া শেষ করে পায়ের নিচে ফেলে সিগারেটটি নিভিয়ে আবার নিচের দিকে আসবে ঠিক এমন সময় সিঁড়ির কাছাকাছি আসতেই দেখল মেঘলা খিলখিলিয়ে হাসছে ।শ্রাবণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেঘলার দিকে ।হঠাৎ করে রনি আবার মেঘলার টোল পড়া গালে একটি আঙ্গুল টাচ করে বললো,” তোমার এই টোল পড়া গালে হাসি দেখলে আমার ভীষণ ভালো লাগে।”
সাথে সাথে শ্রাবণে যেন মাথায় র*ক্ত উঠে গেল ।এত বড় দুঃসাহস কেন এই ছেলের কেন ওর বাড়ির মেয়ের গালে হাত দিয়ে টাচ করে বলবে ওর টোল পড়া হাসি ভালো লাগে ?আর মেঘলা কেউ ইচ্ছে করছে চাপকে দাঁতগুলো সব ফেলে দিতে ।বারবার কেন খিলখিল করে হাসতে হবে এই মেয়ের?
রাফি চুপচাপ উঠে দাঁড়িয়ে গেল ।দাঁড়িয়ে একটু মন খারাপ করে হেঁটে নিচে চলে গেল ।কিছুক্ষণ আগে লামিয়া এখন রাফি ।শ্রাবণ দাঁড়িয়ে আছে ।শ্রাবণ ও চুপচাপ নিচে চলে গেল ।নিচে গিয়েই সাজ্জাদ খান এবং শহিদুল খান কে বললো,” আমি একটু বাইরে যাচ্ছি ।তোমরা চলে এসো ।বাকি সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল শ্রাবণ।”
ওইখানে থেকে আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না শ্রাবণের।রাগে যেন ভীষণ গা জ্বলছে শ্রাবণের ।তাই চুপচাপ বের হয়ে নিরুদ্দেশ যাত্রা শুরু করলো ।এখানে ওখানে ঘুরাঘুরি করলো ।এদিকে সাজ্জাদ খান শহিদুল খান বিকাল হতেই সবাইকে সাথে নিয়ে তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের বাসায় চলে আসলো ।এসে দেখল এখনো শ্রাবণ বাসায় আসেনি ।সবাই দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল ।সেই দুপুরে খাওয়ার পরে তো তিনটার দিকে ছেলেটা বাসায় ফিরেছিল এখন বাজে সাড়ে পাঁচটা এখনো ছেলেটা বাসায় নেই ।এখানে কিছু চিনে না জানে না একা একা কোথায় যেতে পারে ?সবাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে এদিক-ওদিক খোঁজা শুরু করল ।সিয়াম বের হয়ে গেল খুঁজতে কোথায় গিয়েছে শ্রাবণ ভাই?
তানিয়া বুঝতে পারছে না দুপুর পর্যন্ত সব ঠিক ছিল হঠাৎ সবাইকে না বলে কোথায় চলে গেল শ্রাবণ ?রুমে বসেই টেনশন করছে।
এদিকে লামিয়া ভাইয়ের জন্য টেনশন আর সিয়ামের প্রতি এতটা রাগ হয়েছে ওইখানে থেকে আসার পথে এমন কি আসার পরও সিয়ামের সামনে একবারও যায়নি লামিয়া।
সন্ধে নাগাদ কেউ খুঁজে না পেলেও একা একা বাড়িতে চলে এলো শ্রাবণ ।বাড়িতে এসেই শহিদুল খান জিজ্ঞেস করতে বললো,” এইতো বাজারে ছিলাম ।কোথাও যায়নি ।”
তারপর চুপচাপ হেটে ছাদে চলে গিয়েছিল ।কারো সাথে কোন কথা বলেনি ।আসমা বেগমের সন্দেহ হলো।আসমা বেগম আবার বুদ্ধি করে কফি পাঠালেন ভাবলেন হয়তো মেঘলাকে দেখলে রাগ কমে যেতে পারে বা মেঘলা কাছে বলতে পারে কি হয়েছে ।তাই কফি দেওয়ার সময় মেঘলা কে বলে দিয়েছেন যেয়ে জিজ্ঞেস করিস তো কোথায় গিয়েছিল ?কেন গিয়েছিল ?মেঘলা অবাক হয়ে গেল ।মনে মনে বলল ,”আমি জিজ্ঞেস করবো?”
কিন্তু কিছু করার নেই ।আসমা বেগমের শেখানো কথা শিখে ছাদে কফি নিয়ে চলে গেল মেঘলা ।কেউ এ ব্যাপারে কিছুই জানে না ।আসমা বেগম চুপ করে পাঠিয়েছেন মেঘলা কে।
মেঘলা রুমে এসে নক করলো ।দরজা খোলা থাকায় মেঘলা কোন সারা শব্দ না পেয়ে নিজে থেকে ঢুকে পড়ল ।দেখলো বিছানায় চুপচাপ পা নিচের দিকে ঝুলিয়ে বসে আছে শ্রাবণ।হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ ।উপরে তাকাচ্ছে ও না ।দরজা নক করার শব্দ শুনে হ্যাঁ হু কিছুই বলেনি।
মেঘলা ধিরপায়ে এগিয়ে এসে কফির মগ টা সামনে ধরলো শ্রাবণের। শ্রাবণ কফির মগ নিচ্ছে না ।মেঘলা কফির মগটা টেবিলে রেখে বললো,” কোথায় গিয়েছিলেন ভাইয়া ?সবাই আপনার কথা কত বলছিল।”
শ্রাবণ মাথা নিচু করে বললো,” আর তুই ?”
মেঘলা বললো,” আমি ?আমি তো সবার মধ্যেই আছি ।”
শ্রাবণ এবার চোখ তুলে তাকাল মেঘলার দিকে ।চক্ষু দুটো লাল টকটকে হয়ে আছে । বললো,” না সবার মধ্যে নেই ,আলাদা।”
মেঘলা অবাক হয়ে গেল ।কিছুই বুঝতে পারছে না শ্রাবণ ভাইয়ের কথা ।তাই বললো,” মানে কি বলতে চাচ্ছেন ?”
শ্রাবণ কিছুই বলতে চায় না এই মুহূর্তে ।এই মুহূর্তে কথা বললে ভুলভাল কিছু বলে ফেলবে তাই বললো,” কিছু না যা রুম থেকে।”
মেঘলা বললো,” ঠিক আছে যাচ্ছি ।”
বলে যেই চলে যাবে অমনি আবার শ্রাবণ বললো, দাড়া।”
মেঘলা দাঁড়িয়ে গেল ।শ্রাবণ বললো,” যাচ্ছিস কেন ?”
মেঘলা অবাক হয়ে বললো,”আপনি তো বললেন চলে যেতে ।”
শ্রাবণ এবার দাঁড়ালো ।দাঁড়িয়ে মেঘলার সামনাসামনি এসে দাঁড়িয়ে বললো,” আর ও তো কত কিছু বলেছিলাম সেগুলো তো শুনিস নি।”
মেঘলা অবাকের উপর অবাক হচ্ছে ।এরকম টোনে কেন কথা বলছে শ্রাবণ ভাই ?তাই জিজ্ঞেস করলো,” কি বলেছিলেন ?কি শুনিনি ?”
শ্রাবণ আরেকটু কাছে দাঁড়িয়ে ডান হাত দিয়ে মেঘলা চোয়ালটা চেপে ধরে বললো,” রনি তোর গালে টাচ করে কেন ?আমি যে বলেছিলাম আমার বাড়ির মেয়েদের কেউ টাচ করবে এটা আমার পছন্দ না।”
মেঘলা সাথে সাথে হাত দিয়ে শ্রাবণে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বললো,” ও তো ছোট বেলা থেকে এরকম করে ।আমার বন্ধু সবাই জানে কেউ তো কিছু বলে না।”
শ্রাবণ এবার আরেকটু কাছে এসে বললো,” কেউ কিছু না বললেও আমি বলছি ।আমার কথা কি কোন গুরুত্ব নেই ?”
শ্রাবণে প্রত্যেকটি উষ্ণ গরম নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে মেঘলা চোখে মুখে ।মেঘলা ব্যথা পাচ্ছে ।চোখ বন্ধ করে ফেললো।আস্তে করে বললো ,”ছাড়ুন আমি ব্যথা পাচ্ছি।”
শ্রাবণ ওই ভাবেই র*ক্তচক্ষু নিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মেঘলা দিকে। কেন এত রাগ কিসের অধিকারে এত রাগ শ্রাবণ কিছুই বুঝাতে পারছে না ।মেঘলা কে কেএ টাচ করবে সহ্য হচ্ছে না শ্রাবণের।অন্য কোন পর পুরুষ ওর গালে টাচ করে ওর টোল পড়া হাসি সুন্দর বলবে তাও শ্রাবণের সামনে কোনোভাবেই সহ্য হচ্ছে না শ্রাবণের।
চলবে__
Share On:
TAGS: এক শ্রাবণ মেঘের দিনে, নীলা রহমান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৮১
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৭৩
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ৪৭
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ২৭+২৮
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ১৫৩+১৫৪+১৫৫
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৩৫+৩৬
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ৯৫
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৭০
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৮২
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ৪৩